শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বেলগাঁও থেকে হসপেটের বাসে উঠলাম বিকেলে। লাক্সারি বাস নয়, বেশ লজঝড়ে চেহারা। তার ওপর ভিড়। ভারতীয় জনগণ সম্পর্কে আমার ধারণা, তারা যথেষ্ট বিনয়ী এবং ভীরু। জনগণের অধিকাংশই তথাকথিত ভদ্রলোক নয়, এবং সেজন্যই তারা ভালো পোশাক পরিহিত তথাকথিত ভদ্রলোকদের সমীহ করে। তাদের সেই অযাচিত সমীহ ভাঙিয়েই জানালার ধারে একটা সিট পেয়ে গেলাম। বেলগাঁওয়ে যাদের বাড়িতে ছিলাম তারা আমার বন্ধুর দিদির জামাইবাবু। দু-দিন হাতে পেয়ে তারা যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল আমার অভ্যন্তর নানা সুখাদ্যে ঠেসে নিশ্ছিদ্র করে দিতে। পার্টিং কিক হিসেবে রওনা হওয়ার আগেই একপ্রস্থ অনাবশ্যক পরোটা-আলুর দম সৌজন্যবশত গিলিয়েছে। সঙ্গে প্রায় জনা পাঁচেক লোকের মাপমতো খাবার বেঁধে দিয়েছে তারা।
যা-ই হোক, ভরা পেট এবং বাসের দোলাচলে বেশ ঘুম-ঘুম এসে যাচ্ছিল। কিন্তু জানলার ধারে বসলে আমার চোখ কিছুতেই বিশ্রাম নিতে চায় না। বাইরে যে প্রকৃতি বয়ে যাচ্ছে পিছনের দিকে, তার মধ্যে নতুন কিছু নেই। সেই পাহাড়, জঙ্গল, নদী, গাঁ। তবু আকণ্ঠ পান করতে থাকি দৃশ্যাবলি। যখন অন্ধকারে ঢেকে গেল চারদিক তখনও প্রেতের মতো চেয়ে আছি, বাসের মধ্যে যাত্রীবদল ঘটছে ক্রমাগত। বাস থামছে, কিছু লোক নামছে, উঠে আসছে নতুন মানুষ। প্রতিটি মানুষই আলাদা, বিশিষ্ট। কিন্তু আমার আনমনা চোখ কোনও তফাত বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে একই রকম, হুবহু একইরকম মানুষ উঠছে, নেমে যাচ্ছে, নামছে, উঠে আসছে।
রাত যত গভীর হতে থাকল, যাত্রীসংখ্যা তত কমে যেতে লাগল। দাঁড়ানো যাত্রী আর নেই। বহু সিট খালি। গুটিকয়েক যাত্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাসে ঢুলছে।
নিশুত রাত্রি এবং নির্জনতার একটা মাদকতা আছে। নেশাগ্রস্ত করে তোলে আমাকে। রাত বারোটায় একটা ভারী নির্জন জায়গায় বাস থামল। কয়েকটা চা-কফির দোকান। নিতান্তই দীনদরিদ্র তাদের চেহারা। পায়ের ঝিঁঝি ছাড়াতে সেখানে নেমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক গেলাস গরম চা খাচ্ছিলাম। রাস্তার ওধারে গাছপালা, ফাঁকা মাঠে জ্যোৎস্না, তার ওপাশে নাতিউঁচু টিলা। চেয়ে থাকতে থাকতে আমার ভিতরে এক পুরনো আমলের বাতাস বয়ে গেল।
এরকম আমার মাঝে মাঝে হয়। বহু ব্যথাবেবদনার কথা আমি ভুলে থাকি। কাজকর্মে ডুবে থেকে মনেও পড়ে না সেসব। কিন্তু এইরকম বিরল অবসরে, নির্জনে বা নিশুত রাতে হঠাৎ বাতাস আসে। বহুকালের পুরনো সেই বাতাসে উড়ে আসে অতীতের খড়কুটো, ছিন্নপত্র। সেই নিশুতি রাতে জয়শ্রীর কথা কেন মনে পড়েছিল কে জানে।
নারীপ্রেম না পেলেও পুরুষের তেমন কিছু যায়-আসে না, আজ এই সরসতা জানি। বাইশ বছর বয়সে এই সত্যের মুখ আবৃত ছিল। জয়শ্রী আমার সেই রকমের অঘটন। আট বছর বাদেও আমার জীবনের সাফল্য ঠেকল এসে শিক্ষকতায়। তার বেশি কিছু নয়। গরিবের স্বপ্ন জোরালো হয়, অনেক বেশি ইম্যাজিনেটিভ হয় তাদের প্রকৃতি। তার জোরেই সুন্দরী জয়শ্রীকে বিয়ে করার কথা ভাবতে পারতাম।
জয়শ্রীও কি তা-ই ভাবত না?
মাঝে মাঝে বলত, তুমি চেষ্টা করলেই আর-একটা বেটার কিছু করতে পারো, তা-ই না?
নিস্পৃহভাবে বলতাম, কী বলো তো?
ধরো যদি প্রফেসরি বা অন্য কিছু।
বুঝতাম আমার কেরিয়ার সম্পর্কে জয়শ্রীর সংশয় এবং দ্বিধা আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। তবু জানতাম, অসফল এই লোকটিকে বিয়ে করা ছাড়া জয়শ্রী আর কী-ই-বা করতে পারে?
কিন্তু জয়শ্রী করল। এত অপ্রত্যাশিত ও নিপুণভাবে যে, তার টেকনিক দেখে আমি প্রথমে শুধু বিস্ময় বোধ করেছিলাম, শোক বা দুঃখ নয়।
কানাডা প্রবাসী এক জীববিজ্ঞানী স্বদেশে এসেছিলেন বিয়ে করতে। প্রবাসী বাঙালিরা খুব ঝটিতি বিয়ে করতে আসেন বলে মেয়ে দেখা থেকে বিয়ে অবধি ঘটে যায় দ্রুতগতিতে।
সেই ঝটিকা-বিবাহের এক ঈগল ছোঁ মেরে তুলে নিলে জয়শ্রীকে। সেই সময়টায় কপালদোষে আমি কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দিঘায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। বেড়াতে না গেলেও যে ইতরবিশেষ হত এমন নয়। পরে শুনেছি, আমি হামলা করতে পারি আশঙ্কা করে জয়শ্রীর বাবা কয়েকজন পেশাদার গুন্ডাকে ভাড়া কবে এনেছিলেন।
প্রেম নয়, অপমানটাই সহজে ভোলা যায় না। প্রত্যাখ্যান কি এভাবে করতে হয়? আমার তো জানাই ছিল, জয়শ্রী আর-একধাপ ওপরে ওঠার কথা ভাবে। আমাকে আমার কেরিয়ার সম্পর্কে সচেতন করে দেয়।
নিশুত রাতে অখ্যাত অজ্ঞাত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ আজ জয়শ্রীকে মনে পড়ল। খুব মনে পড়ল। জয়শ্রীর সেই বিয়েটা টেকেনি জানি। কয়েক বছর পর এক ছেলে নিয়ে জয়শ্রী একা হয়ে যায়।
তার এক বছর বাদে এক বিদেশিকে বিয়ে করে। তারপর আর খবর পাইনি। বহু দূরে কোথাও জয়শ্রী তার নিজস্ব জীবন যাপন করছে, সুখ-দুঃখ-স্মৃতিজড়িত এক জীবন। এখন, এই মুহূর্তে সে জেগে আছে কি পশ্চিম গোলার্ধে!
কে জানে! আমি আরও একটু নির্জনতার দিকে সরে গেলাম। তারপর হঠাৎ আকাশের দিকে মুখ করে বললাম, আজ কেন মনে পড়ল তোমাকে, জয়শ্রী? বডদিনের বিস্মৃতির ধুলোয় ম্লান হয়ে গেছে পুরনো প্রত্যাখ্যান, ক্ষতস্থানে পড়েছে প্রলেপ, আমি আর সেই আমিও তো নেই। তবে কেন মনে পড়ল? বেঁচে আছ তো জয়শ্রী? ভালো থেকো, যতদূর ভালো থাকা যায়।
এই টেলিপ্যাথি শূন্যে ভাসিয়ে আমি ফিরে এলাম সিটে। বাস ছাড়ল। আস্তে আস্তে রাত গভীর হতে লাগল। আমার ঢুলুনি এল কখন যেন।
শেষরাত্রে হঠাৎ ঝলমলিয়ে উঠল অনেক আলো। চারদিক আলোয় আলোময়। একটা টিলার ওপর থেকে বাঁধ বেয়ে জল নেমে আসার প্রবল শব্দ। চমকে খাড়া হয়ে বসলাম।
ওই তো তুঙ্গভদ্রা ড্যাম। এই তো হসপেট।
হ্যাভারস্যাক, অ্যাটাচি, সুটকেস আর জলের বোতলের গন্ধমাদন বয়ে নেমে পড়লাম।
প্রচলিত মত অনুযায়ী হসপেটেই প্রাচীন কিষ্কিন্ধা। কিষ্কিন্ধার উপকণ্ঠেই জটায়ু আর রাবণের প্রবল মরণপণ যুদ্ধ ঘটেছিল। রামচন্দ্রর প্রাচীন পদচিহ্ন ধরে ধরে আমি এক অদ্ভুত পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়েছি। আমাকে শেষ অবধি যেতে হবে।
হসপেটের রিকশার মতো রিকশা আমি জীবনে দেখিনি। সিট এত নিচু যে, সেটা প্রায় পিঁড়ির মতো। ফুলপ্যান্টের অবরোধে লম্বা হাঁটু ভেঙে বসা রীতিমতো কসরতের ব্যাপার। বিচিত্র সেই রিকশায় উঠে হোটেলের নাম বললাম।
রিকশাওয়ালা মাথা নেড়ে জানাল, চেনে।
কিন্তু কার্যকালে সে সেই নির্জন লোকশূন্য মধ্যরাত্রে গোটা শহর পেরিয়ে একটা ঘিঞ্জি রহস্যময় পাড়ায় আর একটি এঁদো গলির সামনে নামিয়ে যে হোটেলটা দেখিয়ে দিল তা মোটেই সেই হোটেল নয়। তা ছাড়া হোটেলটার চেহারায় একটা ধূর্ত ঠকবাজের ছাপ আছে। ভুক্তভোগী ছাড়া এটা কেউ বুঝবে না।
আবার রিকশা ফিরিয়ে ভিন্ন পথে ঘুরে ঘুরে যখন ভদ্রগোছের হোটেলটা খুঁজে পেলাম তখন প্রায় ভোর। কর্নাটকে চোরছ্যাঁচড়-গুন্ডা-বদমাশ, একটা নেই, থাকলে সেই নির্জন রাত্রে সব কেড়েকুড়ে নিতে পারত। গুপ্ত পকেটে হাজার পাঁচেক টাকা, দামি ক্যামেরা, ঘড়ি।
স্নান সেরে সকালের দিকেই বেরিয়ে পড়া গেল, বিজয়নগর বাহমনি রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ দেখতে। ট্যাক্সিওয়ালা নিজে থেকেই বলল যে, সে আমার গাইড হবে। সবই সে জানে। এখানেই তার জন্ম, কর্ম।
তুঙ্গভদ্রা দিয়ে একসময়ে সমুদ্রগামী বহিত্র চলাচল করত। বাণিজ্যও সেই কারণে ছিল প্রবল।
এখন বাঁধে বাঁধা-পড়া তুঙ্গভদ্রার সেই তেজ নেই, গভীরতা নেই, চারদিকে পাহাড় আর পাথরের ভিতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নাতিপ্রশস্ত এক স্রোতধারা। তার দুই তীর ধরে বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে একদা সমৃদ্ধ এক সম্পৎশালী মহানগরীর ধ্বংসাবশেষ।
ডাইনে পাহাড়, সেখান থেকে পাথরের এক অসমান চাতাল নেমে এসেছে কূর্মপৃষ্ঠের মতো। সেই কালচে পাথরের ওপর দুটি চওড়া দাগ। একটি সোনালি, একটি রুপোলি। আমার গাইড সে দুটো দেখিয়ে বলল, ডাইনের ওই পাহাড়ের ওপর জটায়ু আর রাবণের যুদ্ধ লেগেছিল। জটায়ু যখন রাবণকে আটকায় তখন রাবণ সীতাকে রথ থেকে চুল ধরে নামিয়ে ছেঁচড়ে নিয়ে এসে বাঁ ধারে একটা গুহায় পুরে দেয়। তারপর জটায়ুর সঙ্গে লড়াই করতে যায়। হেঁচড়ে আনার সময় সীতার গায়ের গয়নার ঘষটানিতে পাথরে ওই সোনালি দাগ পড়েছিল। আর সীতার শাড়ির দাগ ওই রূপোলি রেখা।
কিংবদন্তি বটে, কিন্তু পাথরের ওপর ওই আশ্চর্য দাগ মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো। যে গুহায় সীতাকে রাখা হয়েছিল সেটি যথেষ্ট প্রাচীন এবং খুবই সংকীর্ণ। আমি গুহার মধ্যে নেমে ঝুম হয়ে থাকি। চারদিকের পাথর স্পর্শ করি। রাম কি সত্য? সীতা কি সত্য?
হয়তো সত্য, হয়তো নয়। কিন্তু রামকথা আজও বিশাল ভারতবর্ষে, আসমুদ্রহিমাচল, প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। প্রাসাদে, গাছতলায়, হাটেবাজারে সেই প্রাচীন বাতাস আজও বয়ে চলেছে।
বিজয়নগর ধ্বংসাবশেষের যেন শেষ নেই। যতদূর চোখ যায় কেবল ভাঙা খিলান, গম্বুজ, প্রাসাদ, সেতু, ঘরবাড়ি, মন্দির। অজস্র, অসংখ্য। আমার ট্যাক্সি ডাইভার আমাকে দুটি মন্দির দেখাল, যার থামের নীচে নানা কারুকার্যময় কয়েকটি ছ-ইঞ্চি লম্বা মিনি স্তম্ভের সারি আছে। আশ্চর্য এই যে, তাতে কঠিন কোনো বস্তু দিয়ে সামান্য আঘাত করলেই বাদ্যযন্ত্রের সুরেলা শব্দ ওঠে। বাঁশি, বীণা, মৃদঙ্গ। এই অদ্ভুত সুরেলা পাথর আমি আর কোথাও দেখিনি।
আশ্চর্য আর-এক বস্তু হল পাথরের একটি প্রকাণ্ড রথ। অখণ্ড একটিমাত্র বিশাল প্রস্তরখণ্ড কুঁদে তৈরি। এই রথটির কারুকার্য এবং গতিময়তা বেশ অনেকক্ষণ সম্মোহিত রাখল আমাকে।
চারদিকে নানা শিল্পকীর্তি, অফুরন্ত ভাণ্ডার। কিন্তু কোনও যত্ন নেই, মেরামতি নেই। সরকার নিযুক্ত চৌকিদার হয়তো আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, কিন্তু তাদের গরজ বা উদ্যোগ কিছু নেই, নেহাত চাকরি করছে বলে করা। ফলে যে কী অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে এইসব পুরাকীর্তির, তা সহজেই অনুমেয়। সুরেলা ওই পাথরের কথাই ধরুন। যদি রোজ একশো দর্শক এসে ওগুলোতে পাথর বা লোহা দিয়ে ঠোকে তবে ক'দিন আর অক্ষত থাকবে ওগুলো। যেসব শিল্পমণ্ডিত প্রস্তরখণ্ড খসে পড়ছে সেগুলো যে কেউ কুড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে এবং যাচ্ছেও। যে সতর্কতা ও যত্ন এর জন্য প্রয়োজন তা একেবারে নেই। বাঁচোয়া যে হসপেটে পর্যটক-সমাগম খুব বেশি নয়।
কিছুক্ষণ তুঙ্গভদ্রার তীরে দাঁড়িয়ে চারদিককার উচ্চাবচ ভূমিখণ্ডে শিলাকীর্ণ পরিবেশে এক সভ্যতার বিস্তার দেখতে দেখতে মনে হাচ্ছিল, সেই মহার্ঘ শিল্পসৃষ্টির দিন শেষ হয়ে গেছে নাকি? সে আমলে রাজা-বাদশারা এইসব শিল্পসৃষ্টির পিছনে যে অর্থব্যয় করেছেন তা আজকের দিনে অর্থনীতি-সচেতন সমাজে আর সম্ভব নয়। ভুবনেশ্বরের মন্দিরে একখণ্ড পাথর খসে পড়ে গিয়েছিল। আধুনিক ভাস্করকে দিয়ে হুবহু ওরকম কারুকার্য করানো হচ্ছিল। সে সময়ে আমি ওখানে হাজির ছিলাম। জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছিলাম, সামান্য একখণ্ড পাথরের ওপর শিল্পকর্মটি করতে খরচ হচ্ছে ছত্রিশ হাজার টাকা। গোটা মন্দিরটি তৈরি করতে তাহলে কত কোটি টাকা খরচ পড়বে এখন তা ভাবতে মাথা ঘুরে যায়। এ যুগে তাই এসব আর হয়ে উঠবে না। কিন্তু যা হয়েছিল এবং যার ধ্বংসাবশেষ এখনও রয়েছে সেটুকু যথোচিত রক্ষা করতে পারলে একটা মস্ত জাতীয় কৃত্যই করা হবে।
এখান থেকে শুরু উপলাকীর্ণ কিষ্কিন্ধার, কথিত আছে, বিস্তার অন্ধ্রের কিছু অভ্যন্তর অবধি। তবে কিষ্কিন্ধা প্রকৃত কোথায় তা কে বলবে? সে আমলের কোনও ধ্বংসাবশেষ তো নেই। শুধু আছে কিংবদন্তি, শুধু আছে কাব্যের সাক্ষ্য।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রানিদের স্নানাগার দেখতে চললাম। প্রাসাদ থেকে প্রাসাদে, ছাদহীন ভবনে, ভাঙা প্রাচীর ইতিহাস গায়ে মাখতে মাখতে পরিক্রমাটি যখন শেষ হল তখন শরীর ক্লান্ত বটে, কিন্তু মনটি ভারী তরতাজা।
দুপুরে সামান্য কিছু খেয়ে ট্যাক্সিতে চেপেই চললাম তুঙ্গভদ্রার বিখ্যাত বাঁধ দেখতে।
এই অঞ্চলটায় নাতিউচ্চ পাহাড়ের ছড়াছড়ি, তারই একটিতে বিশাল বাঁধ তুলে আটকানো হয়েছে তুঙ্গভদ্রাকে, আছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। বাঁধের বিভিন্ন ধাপে জাপানি বিশেষজ্ঞদের তৈরি অসামান্য সব বাগান।
একদম ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় একটি অতিথিনিবাস। কোনও রহস্যময় কারণে সেখানে কাউকে থাকতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু চারদিকে গাছপালায় সমাচ্ছন্ন এবং তুঙ্গভদ্রার বিপুল জলরাশির অলোকসামান্য দৃশ্যের মুখোমুখি এই নিবাসটি যে রোমাঞ্চকর তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু নির্জন অবহেলায় কেয়ারটেকারের আশ্রয়ে পড়ে আছে। কেন এখানে কাউকে থাকতে দেওয়া হয় না তা বহুবার জিজ্ঞেস করেও কেয়ারটেকারের কাছ থেকে বের করতে পারলাম না। অন্য সব প্রশ্নের জবাব দিল, শুধু এই প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল বার বার মৃদু হেসে।
কেয়ারটেকার আর ট্যাক্সিওয়ালা গল্প করছে, আমি পায়ে পায়ে তুঙ্গভদ্রার বিশাল জলরাশির ওপর সুউচ্চ বাঁধে এসে দাঁড়ালাম। তুঙ্গভদ্রা এবং তার পশ্চাৎপটে বহুযোজনব্যাপী এক প্রসার। আকাশ-মাটি-জল-মেশানো সেই ব্যাপ্তিতে এক প্রখর অ্যালকেমি।
কেন যে হঠাৎ সেই দিগন্ত থেকে ধেয়ে এল এক আশ্চর্য বাতাস তা কে বলবে। সেই বাতাসে সুস্পষ্ট বিজয়নগর সভ্যতার ঘ্রাণ, সেই বাতাসে জননী সীতার ক্রন্দন, সেই বাতাসে জটায়ুর পক্ষনিধন। কী যে হয়েছিল, কে বলবে? কিন্তু আচমকাই আমার স্মৃতি গুলিয়ে গেল। ভুলে গেলাম আমি কে, ভুলে গেলাম আমি কোথা থেকে আসছি। তুঙ্গভদ্রার বিপুল নীলবর্ণ জলরাশি এক আশ্চর্য চুম্বকের মতো আমাকে টানতে লাগল।
কেউ বিশ্বাস করবে না, যদি বলি যে, সেদিন লাফিয়ে পড়া ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। আত্মবিস্মৃত আমি সেই জলের দিকে ঝুঁকে পড়লাম।
ঠিক সেই সময় বাতাসে সাত হাজার মাইল দূর থেকে এল টেলিপ্যাথি, তুমি ভালো আছ তো রন্টু! রোজ তোমার কথা ভাবি আর কাঁদি। কত কাঁদি যে। ভালো থেকো রন্টু, পায়ে পড়ি, ভালো থেকো।
চমকে উঠি। টানটান শরীরে ফের দাঁড়াই।
হয়তো সত্য নয়, তবু কত সত্যের মতো। এভাবেই তো কিছু সত্য আর কিছু কল্পনার মিশেল দিয়ে তৈরি হয় এই জীবন।
আনন্দবাজার পত্রিকা—২৫ নভেম্বর ১৯৮৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন