ভূত ও ভাসান

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ঈশান পণ্ডিতের বাগানের দক্ষিণ পুকুরপাড়ের আম গাছে ঠিক দুপুরবেলা ঢেলা মারছিল ভাসান। এ সময় দেখল, পুকুরের অন্যধারে একটা উটকো লোক দাঁড়িয়ে তাকে দেখে ফিক ফিক করে হাসছে। রাস্তায় নানারকম ভোজবাজি দেখিয়ে বেড়ায় যে তাজু ওস্তাদ, অনেকটা তারই মতো চেহারা লোকটার। মাথার একটায় নোংরা পাগড়ি— তাতে পায়রার পালক গোঁজা, ময়লা জামা, পরনে লুঙ্গি, কাঁধে গামছা। ভাঙাচোরা মুখ, তাতে বিজবিজে দাড়ি। লোকটা হাসছে দেখে একটু ভ্রূ কুঁচকে তাকাল ভাসান, তারপর আবার ঢেলা মারতে যাচ্ছিল, ঠিক এ সময়ে লোকটা ওপরের ঘাট বেয়ে জলে নামল, তারপর দিব্যি জলের ওপর দিয়ে হেঁটে সটান এপারের ঘাটে এসে উঠল, বলল, কী করছ খোকা? ভাসান ভালো করে লোকটার পা দেখল, একটুও ভেজেনি। ভাসান শুনেছে বটে যে ঈশান পণ্ডিত ভূত পোষে। তা সেই ভূত কেউ কখনও চোখে দেখেনি। এ লোকটা কি সেই ভূতেদেরই একজন? সে আমতা আমতা করে বলে, এই, এই আম পাড়ছি। আ-আপনি কে?

—আমি! লোকটা ভারী কাপ্তানের মতো হেসে বলে, তোমার হাতের একটা ঢেলা আমাকে ছুঁড়ে মারো। বুঝতে পারবে। ভাসান একটু ভেবে-টেবে আলটপকা একটা ঢিল ছুড়ুল লোকটাকে। ঢিলটা লোকটার বুক ফুটো করে ওধারে মাটিতে পড়ল। লোকটা তাজুর চেয়েও বড় ওস্তাদ, বুঝল ভাসান। লোকটা হেসে বলে, বুঝতে পারছ তো। আমি হচ্ছি ঈশান পণ্ডিতের ভূত। এইসব বাগান-টাগান, পুকুর-টুকুর, জমি জিরেত পাহারা দিই। বলে লোকটা ভাসানের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাসান একটু শ্বাস ছেড়ে বলে, তাহলে আর আম পাড়ব না। চলেই যাই।

লোকটা ভারী অবাক হয়ে বলে, সে কী! তুমি যে আমাকে দেখে ভয় পেলে না। এ কী কাণ্ড! অ্যাঁ?

ভাসান হাই তুলে বলে, ভয় লাগছে না যে।

—লাগছে না! লোকটা খুব মুষড়ে পড়ে—একটুও লাগছে না! কিন্তু এই যে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে এলুম, আমার শরীর ফুঁড়ে তোমার ঢিল বেরিয়ে গেল— এমন মারাত্মক দুটো খেলা দেখেও তোমার ভয় লাগছে না!

—মাইরি না। ভাসান লোকটার জন্য দুঃখিত হয়ে বলল, তাজু ওস্তাদও এরকম কত দেখায়।

—কিন্তু ভয় পাওয়াই এর নিয়ম। চিরকাল ভূত দেখে মানুষ ডরায়। তা তুমি সে নিয়ম ভাঙছ কেন? মাইরি, একটু ভয় পেয়ে যাও, নইলে প্রেস্টিজ থাকে না। চাও তো আরও ভয় দেখাই তোমাকে। আরও অনেক জানা আছে আমার। আমি ওই তাল গাছটার মতো লম্বা হয়ে যেতে পারি, নিজের মুন্ডু খুলে লোফালুফি করতে পারি, কিংবা অদৃশ্য হয়ে যাই।

ভাসানের দুঃখ হয়, বলে, থাক গে। কষ্ট করে কী হবে। একবার ভয় ভেঙে গেলে আর ভয় পাওয়া কি সোজা? আমার আর কিছুতেই ভয় করবে না যে।

—করবে না।... আমার আরও চার স্যাঙাত আছে, বলো তো তাদেরও ডেকে আনি, তারপর সূর্যের আলো সুইচ টিপে নিভিয়ে দিয়ে এমন ভূতুড়ে নাচ নাচব অন্ধকারে।

ভাসান, বিরক্ত হয়ে পিছন ফিরে চলে যেতে যেতে বলে, তাতে লাভ কী? আমি তো জানি আপনারা ভূত, তার বেশি কিছু নন।

ভূতটা কথা খুঁজে পায় না। অবাক হয়ে চেয়ে দেখে ভাসান ভয় না পেয়ে চলে যাচ্ছে। দিনকাল পালটে গেছে, এখন আর ভূতেদের সেই দিন নেই। এইসব ভেবে বড়ো দুঃখিতচিত্তে সে বসল গাছতলায়। দুঃখে তার চোখে জল এসে গেল। তারপর অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল ঈশান পণ্ডিতের পোষা ভূতটা।

আনন্দবাজার পত্রিকা—১৯ এপ্রিল ১৯৭১

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%