নিধে

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

নিধে চোরের দিন গেছে। মাজায় বাত, চোখে ছানি, রক্তচাপের রোগ। চুরি করা বড় সোজা কথা নয়। দেখার চোখ, শোনার কান, গন্ধের নাক, সবই চাই। আর চাই ঠান্ডা মাথা, সাহস। নিধের এককালে সবই ছিল। দশটা গাঁয়ে ছিল তার নামডাক। দিনমানে তাই লোকালয়ে যেতে পারত না নিধে। লোকে তাড়া করত। আমাদের গাঁয়ের দু'ক্রোশ উত্তরে কবরখানার পিছনে আমবাগানের ধারে একটা ঝোপড়ামতো তৈরি করে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে থাকত। সারাদিন ঘুমিয়ে রাতে বেরোত চুরি করতে। কিন্তু নিধের সেই দিনকাল আর নেই। কান শুনতে ধান শোনে। দড়ি দেখতে সাপ দেখে বিপদের সময় মধ্যে গোলমাল হয়ে যায়। সেবার মোড়লের বাড়ি চুরি করতে এসে শোবার ঘর ভুল করে ঢেঁকিঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর এদিক-ওদিক ঘুরে তার মনে হল, এ গোয়াল ঘরে ঢুকেছে। তখন ঢেঁকির মুষলটাকে গরুর শিং মনে করে সে কী টানাটানি। সেই সময় এক আরশোলা গায়ে বেড়ে ওঠে। নিধে কাঁকড়াবিছে ভেবে ভয়ে চেঁচিয়েমেচিয়ে একশা। মোড়ল উঠে দেখে নিধে রক্তচাপে ছটফট করছে, চোখ উলটে ভয়ে একশেষ। তখন মোড়লই নুনপোড়া খাইয়ে মাথায় জল চাপড়ে সঙ্গে লোক আর হ্যারিকেন দিয়ে নিধেকে বাড়ি পাঠায়। তাই বলছিলুম, নিধে চোরের দিন গেছে। তার ছেলে চাকরিবাকরি করে, বাপের চুরি করা পছন্দ করে না। নিধে তাই চুরি করা ছেড়েই দিল। কেবল তার নাতি হওয়ার পর নিধে এ গাঁয়ে-সে গাঁয়ে ঢুকে খোকাখুকিদের পুতুল চুরি করে এনে নাতিকে দিত।

নাতি বড় হয়েছে। দাদুর সঙ্গে বেড়ায়। চোর-পুলিশ খেলে। মাঝে মাঝে বলে, দাদু, গাঁয়ে নিয়ে চলো রঙিন পিরান কিনে আনি।

নিধে ভয় পায়। গঞ্জে সবাই তাকে চেনে। নাতির সামনেই হয়তো বলে বসবে, কী রে নিধে, এখনও চুরি-টুরি করিস নাকি? তাই নাতিকে বলে-কয়ে যাই কী করে? অনেক ব্যাপারীকে ধারকজ্জ দিয়েছি গেলে তারা ভাববে তাগাদায় গেছি। সে বড় লজ্জার কথা। ভদ্রলোক কখনও ধার দিয়ে তাগাদা করে না। তার চেয়ে চ, পিরসাহেবের কবর দেখে আসি।

নাতি মুখ ভার করে বলে, তাহলে চলো সাতগাঁয়ে যাই, শিবরাত্রির মেলা দেখি গিয়ে।

সাতগাঁয়ে লোকেরা নিধেকে একবার মাথা কামিয়ে উলটো গাধায় ঘুরিয়েছিল। নিধে তাই বলে, কী করে যাই বল। সেবার জমিদারমশাইয়ের নাতির অন্নপ্রাশনে একাশিটা কই মাছ খেয়েছিলাম, দশটা গাঁয়ের লোক সেই খাওয়া দেখতে ভিড় করেছিল। আধ হাত-পৌনে এক হাত বড় চ্যাটালো মাছ, ল্যাজা-মুড়ো-কাঁটা পর্যন্ত চিবিয়ে ছিবড়ে করেছিলাম। সেই থেকে আশপাশের গাঁয়ে গেলেই লোকে এসে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যায়। বলে, সেই খাওয়া, আবার আমাদের দেখাও কিছুতেই ছাড়ছি না। সেইটেই হয়েছে বিপদ। বুড়ো বয়সে, এখন তো আর খেতে পারি না, খেলে পেট ঢাক হয়ে যায়, ফলে চোখ ওলটাব, তার চেয়ে চ পুকুর থেকে গেঁড়াগুগলি তুলি দু'জনে, ঝোল খাবখন...।

আজকাল নিধের বড় ভূতের ভয়। অন্ধকার হয়ে এলেই সে অস্থির হয়ে পড়ে। নাতিকে কাছে ডেকে বসায়, ছেলের বউকে ডাকাডাকি করে। মাঝরাতে বাইরে শব্দ পেলেই ঘুম ভেঙে উঠে রামনাম করে। একা বেরোয় না।

ছেলের বউ ভারী দজ্জাল। নিধেকে খুব শাসনে রাখে। ডালের বড়ি কি আমসত্ত্ব রোদে দিয়ে, নিধেকে পাহারায় বসিয়ে বলে যায়, যদি কাকপক্ষী মুখ দেয় তাহলে কিন্তু ভালো হবে না। নিধে খুব সাবধানে পাহারা দেয়। ছেলের বউ বাপের বাড়ি যখন যায় তখন নিজেদের ঘরে তালা দিয়ে নিধেকে বাড়িতে রেখে বলে যায়, সাত দিনের জন্য বাপের বাড়ি যাচ্ছি, এর মধ্যে যদি কুটোগাছটা এধার-ওধার হয়েছে তাহলে রক্ষে থাকবে না। নিধে ভয় পেয়ে খুব সাবধানে সব পাহারা দেয়।

একদিন দারোগাবাবু পাশের গাঁয়ে তদন্তে চলেছেন মস্ত ঘোড়ার পিঠে। নিধের বাড়ির কাছে ঘোড়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কার বাড়ি রে?

একটা পাইক বলল, আজ্ঞে, নিধে চোরের।

—দিব্যি বাড়ি তো। ডাক তাকে।

খবর পেয়ে নিধে এসে হাতজোড় করে দাঁড়াল। বলল, বড়োবাবু, একটু পায়ের ধুলো দিন, তামাক ইচ্ছে করুন। আপনার বিস্তর নুন খেয়েছি।

দারোগাবাবু খুশি হয়ে নিধের উঠোনে গিয়ে মোড়া পেতে বসলেন। নিধের ছেলের বউ মোয়া নাড়ু-জল দিল, নিধে তামাক সেজে আনল।

দারোগাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, তোকে আজকাল বড় দেখিনি নিধে, কী করিস?

—আজ্ঞে, সময় কই যে দেখা করব?

—কেন, সারাদিন করিস কী?

—আজ্ঞে, ছেলে চাকরিতে যায়, ছেলের বউ ঘাটের কাজ সারতে যায়, নাতিটা পাড়ায় পাড়ায় খেলে বেড়ায়, আমি বসে বাড়ি আগলাই।

—আগলাস? দারোগাবাবু চোখ বড় বড় করে বলেন, কেন আগলাস রে?

নিধে দারোগাবাবুর কথা শুনে হেসে বাঁচে না। বলে, না, আগলালে রক্ষে আছে? সারাদিন আগলাই, রাতেও ঘুম হয় না চিন্তায়, মাঝে মাঝে জেগে শব্দ সাড়া করি, পাহারা দিই। ওরা যা ঘুমকাতুরে।

—পাহারা দিস কেন?

নিধে ভারী রেগে গিয়ে বলে, দেব না, যা চোরছ্যাঁচড়ের উপদ্রব চারদিকে, দারোগাবাবু। পাহারা না দিলে রক্ষে আছে? চোরছ্যাঁচড়দের যে বড় বাড়াবাড়ি। একটু অসাবধান হলেই...

দারোগাবাবু এমন হাসতে থাকেন যে তাঁর চোখে জল এসে যায়।

আনন্দবাজার পত্রিকা—১২ মার্চ ১৯৭৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%