শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

একদিন দুর্গা আমাকে মাঝরাতে ঘুম থেকে ঠেলে তুলে বলল, শুনছ? বলে বালিশে কনুইয়ের ভর রেখে মাথা তুলে উৎকর্ণ হয়ে রইল। শিয়রের জানালা দিয়ে রাস্তার ফিকে আলো জ্যোৎস্নার মতো ওর সুন্দর মুখটিতে এসে পড়েছে। বড় করে তাকানো চোখ আর একটু ফাঁক-হয়ে-থাকা ঠোঁটে ওকে বড় ভিতু দেখাচ্ছিল। বললাম, কী শুনছ? ও বলল, শোনো। রাত বাড়লেই কারা যেন রাস্তায় রাস্তায় চিৎকার করে ঘুরে বেড়ায়। খাবার চায়।
এ আমার চেনা চিৎকার। আমাদের একতলার ঘর। জানালার কাছেই কে যেন একটু টেনে টেনে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, মা গো। একটু কান পাততেই আরও দূরে দূরে প্রতিধ্বনির মতো শোনা যায়— মা গো। গলিতে গলিতে, রাস্তায়, বড়োরাস্তায় কারা যেন ছায়ার মতো শরীর নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের গলায় ওই অপার্থিব চিৎকার। কলকাতায় আজকাল প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। এরা পাত-কুড়ুনি। মানুষের রাতের খাওয়ার সময় পার হয়ে গেলে রাস্তায় বেরোয়।
দুর্গার ভিতু সুন্দর মুখখানার দিকে তাকিয়ে ঘুম-চোখেও আমার হাসি পেল। বললাম, এ তো রোজকার ব্যাপার। আজ নতুন করে শোনার কী?
ওর মাথা নড়ে উঠল। ইয়াররিং-এ জ্যোৎস্নার মতো আলো ছোট্ট বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল। বলল, রোজ শুনি। তুমি তো ঘুমোও, আমার কেন যেন গায়ে কাঁটা দেয়, ঘুম আসে না। জেগে থেকে শুনি, অনেক মেয়ে-মদ্দ রাত জেগে পথে পথে চিৎকার করে বেড়াচ্ছে। কলকাতার এত রাতেও ভিক্ষে। মা গো! বুকের মধ্যে কেমন করে।
—কেমন? বলে আমি স্মিতমুখে চেয়ে থাকি।
দুর্গা বলল, হেসো না। আগে এরা এত বেশি ছিল না। দিনকে দিন বাড়ছে।
—জানি। বলে পাশ ফিরবার চেষ্টা করলাম, অমনি দুর্গার, একরাশ সুগন্ধি চুলওয়ালা মাথাটা টুপ করে আমার বুকের মধ্যে ডুব দিল— ঘুমিও না। আমার ভয় করছে।
—ভিখিরিকে ভয় কীসের, দুর্গা?
ও প্রথমে কথা বলল না অনেকক্ষণ। চুপ করে শুয়ে রইল আমার বুকে। অনেকক্ষণ। যে জায়গায় ও মাথা রেখেছিল, আমার বুকের সেই জায়গাটা আস্তে আস্তে ঘেমে উঠল। তারপর ও আস্তে আস্তে বলল, ওদের সবাই কি ভিখিরি?
—তা না তো কী? গাঁয়ে যখন খরা কিংবা বন্যা হয় তখন দলে দলে চলে আসে শহরে। এবারও হয়তো কিছু একটা হয়েছে। প্রতিবছরেই হচ্ছে তো!
—কী হয়েছে?
—কী জানি! সব জেলার খবর তো আর অত খুঁটিয়ে দেয় না কাগজে। যতদূর জানি এবারকার ফলন ভালো নয়।
—আহা, তুমি চাষবাসের কথা কত বোঝো!
—হাসলুম— আমি যেটুকু বুঝি, তুমি তাও না।
দুর্গা মফসসলের মেয়ে। সেই অহংকারে মাথা তুলে বলল, খেতখামার আমি তোমার চেয়ে বেশি দেখেছি।
—ছাই! ও তো রেলগাড়িতে বসে গ্রাম দেখার মতো।
ও আবার চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ শিউরে উঠে বলল, দেখো, দেখো।
মুখ তুলে বললুম, কী!
—আমাদের জানালায়।
বালিশে কনুইয়ের ভর রেখে আমি উঠে দেখলুম রাস্তার আলোয় আমাদের জানালার কাচের শার্সিতে একটা ছায়া। ঘোমটা মাথায় একটা বউ, তার কোলে বাচ্চা ছেলে। স্থির হয়ে আছে। যেন আড়ি পেতে আমাদের কথা শুনবার চেষ্টা করছে। বুঝবার চেষ্টা করছে আমরা জেগে আছি কি না।
গভীর রাতে জানালার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে-এটা ভাবতে ভালো লাগে না। আমি উঠতে যাচ্ছিলুম।
দুর্গা আমার বুকের ওপর তার নরম হাতখানা দিয়ে আমাকে শুইয়ে রাখল। বলল, উঠো না।
—কেন?
—কে না কে, কে জানে?
—দুর!
—ওরকম বোলো না। আমি প্রায় রাত্রেই ছায়া দেখি। কে কেন আমাদের জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝে মাঝে গোঙাতে গোঙাতে বলে, 'মা গো।' কী যে বিশ্রী লাগে। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে একটু ইতস্তত করে দুর্গা বলল, প্রায় রাত্রেই যাদের ছায়া আমি জানালায় দেখি তারা সবাই কি ভিখিরি?
হেসে বললুম, চোর-টোরও হতে পারে। বলতে বলতে দুর্গা আবার তার মাথা আমার বুকের মধ্যে ডুবিয়ে দিল—আমার মনে হয়, ভিখিরিও নয়।
তবে?
অস্বস্তির হাসি হাসল দুর্গা— কেন যেন মনে হয়, জানালার কাছে গেলে দেখতে পাব কেউ নেই, শুধু ছায়াটাই আছে ওখানে। দুপুররাতে যারা রাস্তায় খাবার চেয়ে বেড়ায় তারাও আসলে কেউ নয় বোধহয়। মনেহয় রাস্তায় গেলে দেখতে পাব কেউ নেই, কেবল চিৎকারগুলো ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঠিক এরকম অদ্ভুত মনে হয় আমার।
—তাহলে ওরা বোধহয় ভূতই হবে।
দুর্গা আমার বুকের ওপর ঘাড় কাত করে অনেকক্ষণ জানালাটার দিকে চেয়ে রইল। তারপর একসময়ে বলল, দেখো, দেখো।
মাথা না তুলেই বললুম, কী?
—ছায়াটা চলে গেল।
বললুম, ছায়াটা নয় দুর্গা, ভিখিরিটা।
আঙুল দিয়ে আমার বুকের ওপর আঁকিবুকি কাটছিল দুর্গা। আরও অনেকক্ষণ আমাদের ঘুম আসবে না। আমি মশারিটা তুলে টেবিলের ওপর সিগারেটের প্যাকেটের দিকে হাত বাড়িয়েছিলুম। দুর্গা আমার হাত টেনে আনল— এখন না। তারপর আস্তে আস্তে বলল, আচ্ছা গো, এই যে দিনরাত জুড়ে দেশময় ভিখিরিরা হাঁটছে তার মানে কি ভিখিরি খুব বেড়ে যাচ্ছে?
—খুব?
—ভয় করে গো?
—ভয় কীসের?
—কী জানি। মনে হয়, ওরা শিগগিরই দলে ভারী হয়ে যাবে খুব। আর দেখো, আজকাল আর আগের মতো কানা-খোঁড়া-ঘেয়ো ভিখিরি বেশি নয়। এখন হাত-পাওয়ালা সুস্থ অল্পবয়সি ভিখিরিই বেশি। এরা দল বাঁধলে...
হাসলুম—ওদের সকলেই আসল ভিখিরি নয়। এটা একটা ব্যবসার মতোই তো। দেখো, রোববারে ওদের সংখ্যা বেড়ে যায়। তার মানে সারাসপ্তাহ চাকরিবাকরি করে কোথাও রোববারে ভিক্ষেয় বেরোয় উপরি রোজগারের আশায়। ভয় পেও না, এদের জোট বাঁধার কোনও কারণ নেই।
—তুমি বলছ। বলে ও আগের মতোই আমার বুকের ওপর আঁকিবুকি কাটতে লাগল। আমি ওর পিঠে হাত বোলাচ্ছিলুম, ভাবছিলুম, কীভাবে ওর মন ভালো করা যায়। ও আস্তে আস্তে বলল, দেখো, তুমি যখন আমাকে আদর করো তখন তো আমার খুব সুখ হওয়ার কথা। আমার পেটে পাঁচ মাসের বাচ্চা। তার কথা ভাবলেও তো আমার সুখ হওয়ার কথা কিন্তু হয় না গো, কেবলই মনে হয়, দেশময় ঘুরে বেড়াচ্ছে না-খাওয়া খিদে-পাওয়া লোক। দিনরাত জুড়ে ঘুরে ঘুরে ডাকছে। বড় ভয় করে গো।
—ভয়, দুর্গা? ভয় কীসের?
—কী জানি, আমি যেন টের পাই, আমাদের এই ছোট্ট একটু ঘরসংসারের দিকে আমাদের এক ফোঁটা না-হওয়া বাচ্চাটার দিকে চারদিকের দেশজোড়া খিদে-পাওয়া মানুষের শাপশাপান্ত ছুটে আসছে। আমার বিধবা ঠাকুমা মাঝে মাঝে মা-র সঙ্গে ঝগড়া হলে আক্রোশে মাটিতে লাথি মারতে মারতে বলত, তোর অবস্থা যেন আমার মতো হয়। আমার মতো হয়। ঠিক সেইরকম, বুঝলে ঠিক সেইরকম আমি চারদিকে মাটিতে লাথি মারার শব্দ শুনি। আমার বুকের মধ্যে ধুপ ধুপ শব্দ হয়। কারা যেন আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে, তোদের অবস্থা যেন আমার মতো হয়। আমার মতো হয়। অনেক সময়ে শাপশাপান্ত ভীষণ ফলে যায়, জানো?
শুনতে শুনতে আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। ও বাচ্চা মেয়ের মতো শান্তভাবে আমার বুকের মধ্যে মিশে রইল। আধফোটা গলায় বলল, তুমি এসব বিশ্বাস করো না, না?
বিশ্বাস করি কি না কে জানে। কিন্তু আমার অস্বস্তি আমি চাপা দিলুম। ফিসফিস করে বললুম, এবার আমাকে একটা সিগারেট খেতে দাও।
ও মাথা নাড়ল— না। আর-একটু জড়িয়ে থাকো আমাকে। আমার বিশ্রী লাগছে গো। একটু চুপ করে থেকে দুর্গা আবার আস্তে আস্তে বলল, দেখো, কাল রাত্রে একটা খুনখুনে বুড়ি এসেছিল। বোধহয় তিনশো বছর বয়স। দেখলে বিশ্বাস হয় না যে সে হাঁটতে-চলতে পারে। এক্কেবারে জটাই বুড়ি। সিঁড়ির নিচে একগোছা ছেঁড়াখোঁড়া এঁটো রুটি নিয়ে বসে ছিল। আমাকে দেখেই বলল, একটু বেনুন দেবে মা? আমি ঢাকা জেলার মেয়ে, 'বেনুন' মানে বুঝি না, মঙ্গলা বুঝিয়ে বলল, তরকারি চাইছে। জিজ্ঞেস করলুম, রুটি কোথায় পেলে? বলল, তোমাদের বাড়ির তিনখানা আগে দাড়িওয়ালা পাগড়িবাবুদের বাড়ি থেকে দিলে। ছেঁড়াখোঁড়া রুটি মা, পাতের। বেনুন দিলোনি। শুকনো রুটি মা, বেনুন ছাড়া কী দে খাই বল। জিজ্ঞেস করলুম, দাঁত নেই, কী দিয়ে খাবে? বলল, দাঁত? না, মা, নেই। ছোটলোকের মুখ মা, আমরা কি দাঁতে চিবিয়ে খাই? মুখে ফেললেই সব তল হয়ে যায়। সেই কবে থেকে খিদে পাচ্ছে। বোধবুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই মা, কেবল খিদে টের পাই। যখন-ত্যাখন। ঠিকঠাক মেটে না কখনও। খিদে ছাড়া আর তেমন কিছু টের পাইনে মা, তেমন কোনও দুঃখু নেই। খিদে মিটলেই হাওয়া-বাতাস, খিদে মিটলেই চাঁদের আলো।
—দুর্গা!
—উঁ।
—তুমি বানিয়ে বলছ।
—না গো, ও ঠিক অমনি সাজিয়ে-গুছিয়ে বলেছিল। শুনে আমার এমন বুক কাঁপছিল। ও হাওয়া-বাতাস চাঁদের আলোর কথা বলতেই আমার যেন দম আটকে এল। আরও কত কী বলল গো, হিঁদুর ঘরের বিধবা হয়েও গরুর মাংস খেয়েছে। বলল, ভিক্ষে তো আর হিঁদু-মোচরমান দেখে চাওয়া যায় না। সেই একটা ছোঁড়া আমার কোঁচড়ে অ্যাই বড়ো বড়ো টুকরো ফেলল খুব ধোঁয়া আর বাস। ফুটপেতে বসে চিল-কুকুর তাড়িয়ে সেই মাংস খেলুম। একটু কষা আর নোনা আর স্বাদ, বড় বড় হাড় আর মোটা রোঁয়া। সেই গোমাংস খেয়ে মা জাতধর্ম চলে গেল সেদিন। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম। অ্যাদ্দিন পর্যন্ত মা জাতধর্মের বড় বালাই ছিল।
আমি চুপ। দুর্গা আবার বলল, বুড়ির স্বামীর শোক, পুত্রশোক নেই, ভয়ডর নেই, সব তলিয়ে গেছে কোথায়। ঘুমও নেই বোধহয়। আমার বড়ো দুরদুর করছিল বুক, মনে হচ্ছিল চারদিকেই বড় অমঙ্গল। বুড়ি যখন আমার দেওয়া বড় ঢ্যাঁড়শ চচ্চড়ি আর ডাল দিয়ে রুটি খাচ্ছিল গপাগপ তখনও তার চোখে একটুও আশীর্বাদ ছিল না, কৃতজ্ঞতাও না। খাওয়ার সময়ে ওর চোখ দুটো কী যে ভয়ংকর হয়ে গেল, যেন যুদ্ধ জয় করে নিচ্ছে— এমন বিভোর আর নিষ্ঠুর দেখাচ্ছিল ওকে। আমার কী মনে হল, আঁচলে পেট ঢেকে ঘরে পালিয়ে গেলুম, যার স্বামী-পুত্র-ধর্ম গেছে তাকে বড় ভয় করে গো। কেননা আমার তো সব আছে। এমন খিদে-পাওয়া চারদিক আমাদের, এমন ধর্ম-ছাড়া, এর মধ্যে দেখো, আমাদের বাচ্চাটাকে আনতে বড় খারাপ লাগছে।
আস্তে আস্তে আমরা দু'জনেই উঠে বসেছিলুম। আমি মশারির বাইরে হাত বাড়িয়ে নিয়ে এলুম আমার সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই আর ছাইদানি। এবার দুর্গা আপত্তি করল না। মুখোমুখি বসলুম দু'জনে। হঠাৎ দুর্গা বলল, হ্যাঁ গো, তোমার কি মনে হয় আমরা খুব সুখে-স্বচ্ছন্দে আছি?
—না। আমি মাথা নেড়ে বললুম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে এখন দুর্গার আবছা মুখের দিকে চেয়ে মনে পড়ে যে আমার ভিতরেও অনেক ক্ষোভ। আমার কত সাধ মেটেনি। মিটবে না। জিনিসপত্রের দাম, বিক্ষোভ, মিছিল, এলোমেলোভাবে আমার মনে পড়ে গেল। মিটছে না, কিছুই মিটছে না। দুর্গা অভিশাপের কথা বলছিল। মনে পড়ল, মিছিলের স্লোগানেও কত অভিশাপ থাকে। সব কি ফলছে? দুর্গার শুধু শুধু ভয়। ভেবে দেখলে আমারও মনভরা অভিশাপ। কাকে দিতে হবে তা জানি না।
দুর্গা বলল, দেখো, আমার মনে হয় আমাদের কিছু করা দরকার, আমরা খুব সুখে নেই। বরং অভাবেই দিন চলে আমাদের। তবু চারদিক বিচার করলে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা বড় বেশি সুখে আছি। দেখো, চারদিকটা ভালো না হলে আমরা কি ভালো থাকব? কেবল মনে হবে, আমরা আর কারওরটা কেড়ে খাচ্ছি।
আমি ম্লান হেসে বললুম, কী করব, দুর্গা? আমার পৃথিবী তো এইটুকু মাত্র। এই তুমি, এই ছোট্ট দুটো ঘরের সংসার, ভাবী সন্তান। এর বাইরে ভাবতে মাথায় কুলোয় না যে।
আমার বলার ভঙ্গিতে দুর্গা হাসল। বলল, মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে তোমাকে বড় জ্বালাচ্ছি, না গো?
বলতে বলতে ও আমার আধ-খাওয়া সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে ছাইদানিতে গুঁজে দিয়ে বলল, এবার শোও।
শোয়ার পর দুর্গা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, বীরপুরুষ, আর যদি কিছু না পারো তবে অন্তত সারারাত আমাকে আদর কোরো, যেন বাইরের কোনও শব্দ কানে না আসে।
দুর্গার সুন্দর মুখখানা আমি আমার বুক ও থুতনির খাঁজের মধ্যে ধরে রেখে আস্তে আস্তে বলছিলুম, দেখো দুর্গা, ছেলেবেলা থেকে আমারও বড় ইচ্ছে ছিল একটা কিছু করি। কিছু করা বড় দরকার। আমার চারদিকটার জন্য আমারও একটা কিছু যেন করার ছিল। তবু দেখো নিজেদেরই এত ঝামেলা। অথচ দেখো তবু তোমার কথা শোনার পর এখানে মনে হচ্ছে, আমাকে ছাড়িয়েও আমাদের অস্তিত্ব রয়েছে আমার চারদিকে। সব ভালো না থাকলে আমি থাকব না। সন্তানের জন্ম দিতে ভয় পাব, রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে যাবে নিশাচর ভিখিরিরা...
বলতে বলতে আমি ঘুমে ঢলে পড়ছিলুম। আর তখন বাইরে বহু দূরে দূরে কলকাতায় অলিতে-গলিতে রাস্তায় অলীক ভিখিরিরা অপার্থিব চিৎকার করে খাবার চেয়ে বেড়াচ্ছিল। আর পরস্পরের কুক্ষিগত আমরা দু'জন সারাটা রাতের জন্য ছোট্ট একটু দ্বীপের মতো জায়গায় হাওয়া-বাতাস আর চাঁদের আলোর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ছিলুম। আমাদের ঘিরে স্বপ্নের মধ্যে চারদিকে সমুদ্রের গর্জন ফিরতে লাগল।
আনন্দবাজার পত্রিকা—২১ এপ্রিল ১৯৬৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন