শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আচ্ছা, আমি কি এই বেঞ্চটার এই ধারে একটু বসতে পারি?
বসুন-না, অসুবিধে কী? বেঞ্চ তো ফাঁকাই রয়েছে।
হ্যাঁ, তা ঠিক। রাতের দিকটায় লেকটা ফাঁকা হয়ে যেতে থাকে। আর এবার কলকাতায় শীতটাও পড়েছে জেঁকে, কী বলেন?
হুঁ, শীতকালে শীত তো পড়ারই কথা।
যা বলেছেন। কিন্তু যে সময়ে যা হওয়ার কথা, তা আর হচ্ছে কোথায় বলুন। বর্ষায় বৃষ্টি হচ্ছে না, শীতে ফি-বছর শীত পড়ছে না, উত্তর মেরু গলে যাচ্ছে, গ্রীষ্মকালে দিব্যি ফুলকপি, বাঁধাকপি ফলছে।
হুঁ, কথাটা ভাববার মতো।
কিছু মনে করবেন না, আপনি একজন বেশ টাফ লুকিং ইয়াং ম্যান, রক্তের জোর আছে, মানছি। তবু আজ যা শীত পড়েছে, তাতে আপনার আরও একটু প্রোটেকশন নিয়ে বেরোনো উচিত ছিল। আপনার গায়ে তো গরম জামার নামগন্ধও দেখছি না, মশাই। শুধু শার্ট-প্যান্টে এই দারুণ ঠান্ডা সহ্য করছেন কী করে?
ওটা অভ্যাস বসতে পারেন। শীতের শীত ভাবটা অনুভব করতে হলে বেশি গরম জামা পরলে হয় না।
আমার তো মশাই গায়ে দু-দুটো সোয়েটার, বাঁদুরে টুপি এবং কম্ফর্টারেও শীত সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।
আপনি বেশ বয়স্ক মানুষ, আপনার কথা আলাদা। এই শীতে এত রাতে লেকের ধারে বসে থাকাটাও আপনার উচিত হচ্ছে না।
ঠিকই বলেছেন। যৌবনে শরীর বলে কিছু যে আছে, তা যেন টেরই পেতাম না। ব্যথা-ট্যথা পেলে বা অসুখ হলে অন্য কথা, নইলে নয়। কিন্তু বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের সব ক-টা প্রত্যঙ্গই যেন জানান দিচ্ছে যে, তারা আছে এবং তারা খুব একটা সুখে নেই। হাঁটু বলুন, ঘাড় বলুন, চোখ বলুন, হার্ট বলুন, লাংস বলুন— কেউই নালিশ করতে ছাড়ছে না। সারা শরীরে যেন সারাক্ষণ কোলাহল।
এত রাত অবধি আপনি বাইরে রয়েছেনই-বা কেন? বাড়ির লোক নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন।
না মশাই, সে উপায় নেই। রাস্তায়-ঘাটে বা বাড়িতেও যদি হঠাৎ কিছু হয়, তাই ছেলে আমাকে এই বুড়ো মোবাইল ধরিয়ে দিয়েছে। তাতে আবার ডিসট্রেস অ্যালার্ম সেট করা আছে। বিপদ বুঝলেই একটা বোতামে চাপ দিলে আমার দুই ছেলে আর এক মেয়ের কাছে খবর চলে যাবে।
হ্যাঁ, কিন্তু বিপদকে ডেকে আনার দরকার কী আপনার? শীতকালে বয়স্ক মানুষদের প্রেশারজনিত বিপদ বেশ বেড়ে যায়। ঘাম হয় না বলে শীতকালটা একটু বিপজ্জনক।
আপনি ডাক্তার নাকি?
আজ্ঞে না। আজকাল এসব ছোটোখাটো ইনফর্মেশন সকলেই রাখে। আমার বাড়িতে বয়স্ক মানুষ আছেন। ডাক্তারদের আসা-যাওয়া আছে।
তা তো ঠিকই। কিন্তু আমি সন্ধের পর লেকের ধারে মোটেই থাকি না। বাড়ি ফিরে গিয়ে টিভি দেখি বা বই পড়ি। আজ বিশেষ কারণে যাইনি।
কোনো পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল, নাকি কীর্তন শুনতে গিয়েছিলেন?
কোনোটাই নয়। আসলে আমি একটু ইনকুইজিটিভ টাইপের। ছেলেবেলা থেকে আমার সব বিষয়ে একটা অনাবশ্যক কৌতূহল। সেটা অনেক সময়ে বিপদের কারণ হয়েছে।
কৌতূহল। সে তো ভালো জিনিস।
কৌতূহল থেকেই তো মানুষের সভ্যতা শুরু হয়েছিল!
সেটা তো অনেক বড়ো কথা, মশাই। তবে কৌতূহল কখনো কখনো বিপজ্জনক হলেও সেটা থাকাই ভালো। নেসেসিটি যদি ইনভেনশনের মা হয়, তাহলে ইনকুইজিটিভনেস ইজ দ্য মাদার অফ নলেজ— কী বলেন?
কথাটা শুনতে মন্দ লাগল না। তা আপনার আজকের কৌতূহলটা কী নিয়ে?
আপনার জানবার কথা নয়, আমি মোটেই স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য লেকের চারপাশে রোজ ঘুরপাক খেতে আসি না। আমি আসি নানারকম মানুষ দেখতে, আর তাদের মুখ ও ভাবভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করে তাদের সম্পর্কে অনুমান করতে। এই যেমন লোকটা কেমন, তার আজ কোষ্ঠ পরিষ্কার হয়েছে কি না, মেয়েছেলে দেখলে ছুঁকছুঁক করে কি না, চোরচোট্টা বা পকেটমার বা নেশাখোর বা গুন্ডা-মস্তান কি না— এইসব আর কী! মানুষের তো ভ্যারাইটির কোনো শেষ নেই। আর ওই অনুমান এবং ইনফারেন্স ড্র করা— ওটাই আমার হবি।
বাঃ, বেশ ভালো। মানুষকে অবজার্ভ করা তো আমাদের সকলেরই হবি হওয়া উচিত। আর অবজার্ভেশনের জন্যই না শার্লক হোমসের অত কদর।
হেঃ হেঃ, যা বলেছেন। আমি অবশ্য শার্লক হোমস জাতীয় লোক নই। কারণ, কোনান ডয়েল হোমসের মধ্যে একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় স্থাপন করেছিলেন বলে আমার ধারণা। নইলে ওরকম সূক্ষ্ম ডিডাকশন সম্ভব নয়। তবে আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় শার্লক হোমস নন, আপনি।
আমি অবাক করলেন মশাই। আমি তো বসে থাকা ছাড়া আর কিছু বিশেষ কিছু করিনি।
তবেই বুঝুন। একজন শক্তপোক্ত চেহারার লম্বা-চওড়া লোক এবং বেশ অ্যাট্রাকটিভ ইয়াং ম্যান চুপচাপ দু-তিন ঘণ্টা লেকের ধারে বসে থাকাটা নিশ্চয়ই স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।
আপনার কিন্তু এখন বাড়ি যাওয়া উচিত। টুপটাপ করে হিম পড়ছে এবং বেশ ঘন কুয়াশা জমছে চারদিকে।
আজ আমাদের বাড়িতে ভোলা মাছ রান্না হয়েছে। ভোলা মাছ আমি দু-চোখে দেখতে পারি না। রাতে ওই ভোলা মাছের ঝোল দিয়ে রুটি খেতে হবে ভেবে আর বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে না।
তার মানে কি ভোলা মাছের ভয়ে আপনি আজ বাড়ি ফিরবেন না?
না মশাই, তা বলিনি। আসলে আজ বাড়ির দিকে টানটা এমনিতেই একটু কম। আর তার কারণ হল ভোলা মাছ।
বুঝেছি, কিন্তু ভোলা মাছ যে খেতে এত খারাপ তা আমার জানা ছিল না।
খারাপ নয়। আমি পছন্দ করি না বলেই জিনিসটা খারাপ হবে কেন? আমার গিন্নি, দুই ছেলে, বউমারা এবং আমার জামাইও ভোলা মাছ তোলা তোলা করে খায়। আপনি কি ভোলা মাছের ভক্ত?
সেটা বলা শক্ত। বড়ো মাছের টুকরো আমার সবই একরকম লাগে। কোনটা ভোলা, কোনটা রুই, তা বুঝবার মতো বিচক্ষণতা আমার নেই।
বেঁচে গেছেন মশাই। যাদের খাওয়া নিয়ে বায়নাক্কা নেই, তারা 'লক্ষ্মী-পুরুষ' কথাটা প্রথম শুনলাম।
সব কথা ডিকশনারিতে পাবেন না মশাই, মানুষ নিত্য নানারকম নতুন শব্দ সুবিধেমতো তৈরিও করে নিচ্ছে তো! এ কথাটা আমার গিন্নি ব্যবহার করেন, তবে আমার প্রসঙ্গে নয়। আমার প্রসঙ্গে তাঁর ভালো কথা কমই আসে।
মনে হচ্ছে আপনারা বেশ হ্যাপি ফ্যামিলি।
আনহ্যাপিও নয়। তবে আমার ফ্যামিলি আজ আমাদের আলোচ্য বিষয় নয় কিন্তু। আপনি কথা ঘোরাচ্ছেন।
আচ্ছা বেশ। এবার বরং আপনার কথাই শোনা যাক।
আপনার নামটা জিজ্ঞেস করতে পারি কি?
অবশ্যই। আমার নাম গন্ধর্ব মহাপাত্র। আমার নাম শতদ্রু বসুঠাকুর। হ্যাঁ যা বলছিলাম, আমি রোজ লেকে মোট চারবার চক্কর দিই। প্রথম চক্করে আমি আপনাকে দেখতে পাইনি। দ্বিতীয় চক্কর থেকে আপনাকে আমি লক্ষ করতে শুরু করি। আমার মনে হল আপনি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন। কোনো লেডি কি?
আরে না। এর মধ্যে আবার লেডি আনার কী দরকার।
আহা, লজ্জা পাবেন না মশাই। ওতে লজ্জার কী আছে? আজকাল তো প্রেম-ভালোবাসা জল ভাত। আর কত সুবিধেও হয়ে গেছে বলুন। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক, হোটেল-রেস্তরাঁ, ডিস্কো, মেলামেশায় কোনো বাধাই নেই। আর আমাদের আমলে শুধু একবার চোখাচোখি ঘটাতেই কত কাঠখড় পোড়াতে হত। রেবার বাবা তো আমাকে একবার ট্যাঁটা নিয়ে তাড়া করেছিলেন।
রেবা কে?
সে ছিল একদিন। পৃথিবীতে রেবা? এক পিসই এসেছিল। বাই দি বাই, ট্যাঁটা কাকে বলে জানেন?
আজ্ঞে না।
ডেঞ্জারাস জিনিস, মশাই। বাঁশের ডগা চিরে সরু সরু একগুচ্ছ বল্লম বানানো হয়। তা-ই নিয়েই গেঁথে জল থেকে মাছ তোলে।
ও বাবা!
তবেই বুঝুন, আমাদের আমলে প্রেম করাটাও কত বিপজ্জনক ছিল।
শেষ অবধি কী?
না, উনি পারেননি। ট্যাঁটাটা চালিয়েছিলেন ঠিকই, তবে আমি তখন দারুণ দৌড়বাজ ছিলুম। চারশো আর আটশো মিটারে বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন ও ন্যাশনাল মিটে অল্পের জন্য সেকেন্ড হই।
সে কথা নয়, আমি রেবাদেবী সম্পর্কে জানতে চাইছিলাম।
না মশাই, শেষ অবধি রেবার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়নি। হল বরানগরের শ্রীমন্ত ঘোষের সঙ্গে। রেবা কাঁদতে কাঁদতে শ্বশুরবাড়িতে স্বামীর ঘর করতে চলে গেল। আর আমি পুরোনো সব কথা আগলে পড়ে রইলুম। তবে আমার মনে হয়, আপনাদের সময়টাই বেশ ভালো। বিরহে বেশি কষ্ট পেতে হয় না। একজন রেবা হড়কে গেলেও তার জায়গায় কেয়া কি শ্রেয়া, কি সুদেষ্ণা কি চৈতালি—কেউ-না-কেউ ঠিক এসে জুটে যায়। মেয়েদের বিপুল সংখ্যাধিক্য দেখলে অন্তত তা-ই মনে হয়। আমি অকপটে স্বীকার করি যে, আমাদের সময়টা ছিল যাচ্ছেতাই। চালের মন আট টাকা, সরষের তেল আড়াই টাকা সের, টাকায় কুড়িখানা ল্যাংড়া আম হলে কী হয়, লাইফ ওয়াজ নট ওয়ার্থ লিভিং। আজকে? আমাদের আলোচ্য বিষয় অবশ্য এইসব স্মৃতিচারণও নয়। আসল কথা হল, আপনি আজ যার জন্য বসেছিলেন তিনি আজ নির্দিষ্ট সময়ে আসেননি, তা-ই তো!
ব্যাপারটা ওরকমই মনে হতে পারে বটে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আপনাকে আমি একবারও মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেখিনি। লেডিটির দেরি হচ্ছে কেন, কোথায় আটকে রইলেন, শরীর খারাপ হল কি না, এসব জেনে নেওয়ার কোনো চেষ্টাই কেন করলেন না?
তাঁর মোবাইলের নম্বর আমার জানা নেই।
এঃ হেঃ, নতুন আলাপ বুঝি? আজকাল তো শুধু মোবাইল নম্বরটা হলেই হয়, আর কিছুই দরকার হয় না। একখানা খুদে মোবাইল থেকে কত কী হয়ে যাচ্ছে, মশাই। লাখ লাখ টাকার ট্রানজ্যাকশন, রোমান্টিক প্রেম, রাস্তা হারালে পথের হদিশ, কত কী? আর আপনি সেই মোবাইল নম্বরটিই নিয়ে রাখেননি। তবে শেষ অবধি আমার মনে হল, মামলা এত সহজ নয়। লেডিটি আসেননি এবং হয়তো আর আসবেনও না। তিনি হয়তো আমার রেবার মতোই আপনাকে বিরহ সংসারে ভাসিয়ে গেছেন। এবং আপনার মনের অবস্থা স্টেবল নেই। এমনকী আমার এমন ভয়ও হল, লেক নির্জন হয়ে গেলে আপনি হয়তো আত্মহত্যা করে বসতে পারেন। আর সেইজন্যই আমি আজকের ভয়ংকর শীতকে গ্রাহ্য না করে আপনার ওপর নজর রাখছিলাম। আমার ডিডাকশনটা কি আপনার লজিক্যাল বলে মনে হচ্ছে না?
হচ্ছে। শুধু লজিক্যালই নয়, নির্ভুলও। দু-একটা জায়গায় একটু মেরামত করে নিলেই হবে।
যেমন?
যেমন লেডিটি আসেননি, এ কথাটি ঠিক নয়। তিনি এসেছেন এবং হয়তো এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
সর্বনাশ! তিনি কোথায় বসে আছেন, সেটা কি খুঁজে দেখেছেন?
খোঁজার প্রয়োজন নেই। তিনি কোথায় বসে আছেন তা আমি জানি।
আপনি তো আচ্ছা লোক, মশাই। একজন লেডি এসে আপনার জন্য এই ঠান্ডায় বসে আছেন আর আপনার মোটে গা নেই। না, না, মেয়েদের অমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা কষ্ট দেওয়াটা মোটেই পৌরুষের লক্ষণ নয়, মশাই।
ব্যাপারটাই মধ্যে একটা ঘাপলা আছে।
ঘাপলা? কীরকম ঘাপলা, গন্ধর্ববাবু?
ঘাপলাটার নাম নয়নিকা।
একটু বুঝিয়ে বললে হয় না? আপনার ভোকাবুলারি— আমি বুড়ো মানুষ তো না-ও বুঝে উঠতে পারি।
নয়নিকার পিছনে আমি আট বছর ঘুরেছি। নয়নিকা আমাকে কখনো প্রত্যাখ্যান বা গ্রহণ, কোনোটাই করেনি, হাতে রেখেছে মাত্র। আমি যখন মিলিটারি সার্ভিসে অরুণাচলের বর্ডারে ছিলাম, সেই সময়ে সে একটা বেসরকারি এয়ারলাইনসে এয়ারহোস্টেসের চাকরি করত। একবার বিখ্যাত শিল্পপতির ছেলে অভিষেক মেহরার সঙ্গে একটা ফ্লাইটে তার পরিচয় আর ঘনিষ্ঠতা হয়। অভিষেক নয়নিকাকে বিয়ে করে সোজা লন্ডনে চলে যায়। সেখানেও মেহরাদের বিরাট ব্যাবসা। অ্যান্ড দ্যাট ইজ দ্যাট।
এ তো সেই রেবারই গল্প। তবে রেবা স্বেচ্ছায় শ্রীমন্তকে বিয়ে করেনি, তফাত এটুকুই। কিন্তু ফল আউট তো একই।
যে আজ্ঞে। তবে রেবার সঙ্গে নয়নিকার যুগোপযোগী একটু তফাত আছে। আগে মেয়েরা বিয়ে হওয়ার পর সেটল হয়ে যেত। আজকাল নানারকম ফ্যাঁকড়া হয়। আমি অরুণাচল থেকে ফিরে এলে হঠাৎ একদিন চয়নিকা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে।
চয়নিকাটা কে? নয়নিকার বোন নাকি?
হ্যাঁ, ছয় বছরের ছোটো। শি ইজ আ টিনএজার।
বুঝলাম, এরপর বলুন।
প্রথমটায় কথাই বলতে পারে না। ভীষণ নার্ভাস, ভীষণ অ্যাজিটেটেড। তিনটে আইসক্রিম খাইয়ে তাকে খানিকটা ঠান্ডা করার পর সে খুব সংকেতে খানিক কথায়, খানিক চাউনিতে, খানিক চোখের জলে যা বলল, তাতে মনে হল, শি ইজ অর অলওয়েজ ওয়াজ হেড অ্যান্ড ইয়ারস ইন লাভ উইথ মি। কিন্তু দিদির জন্য সে সেটা এক্সপ্রেস করতে পারেনি। তার দিদি আমাকে ডিচ করায় সে একটুও দুঃখ পায়নি।
বলেন কী মশাই, এ তো নভেল।
যে আজ্ঞে।
তা আপনি কী করলেন?
আমার মনের অবস্থা অনুমান করে নিন। নয়নিকা গন। আমি ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছি, ঠিক এই সময়ে চয়নিকা ইজ নকিং অন দ্য ডোর। অ্যাকসেন্ট করার প্রশ্নই ওঠে না।
ঠিক ঠিক। ওরকমই হয় বটে।
কিন্তু চয়নিকা হাল ছাড়ল না। আমার মানসিক অবস্থা বুঝে সে আমাকে কম্পানি দিয়েছে, এগজিবিশন, উচ্চাঙ্গসংগীতের অনুষ্ঠান, থিয়েটার ইত্যাদি নিয়ে গেছে। কবিতা শুনিয়েছে, গল্পের বই এবং ধর্মগ্রন্থ পড়তে দিয়েছে, গঙ্গার ধারে বা থেকেছে পাশে।
তবু কি মেয়েটার প্রতি আপনার মন নরম হল না?
হল, চয়নিকা নয়নিকার মতো অত সুন্দরী নয় ঠিকই, কিন্তু শি হ্যাজ আ চার্ম অফ হার ওন। স্মার্ট বা ছলবলে মেয়ে নয়। একটু ঘরোয়া, শান্ত। আস্তে আস্তে আমার মন নরম হচ্ছিল। এমন একটা সময় এল যে, আমার মনের মধ্যে নয়নিকা আর চয়নিকার একটা দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হল। দুজনেই আমার মনের দুটো দিক দখল করে দুটো বনবেড়ালের মতো ফুঁসছে।
না না গন্ধর্ববাবু, এই উপমাটা ঠিক জুতসই হল না। দু-জন লেডিকে বনবেড়ালের সঙ্গে তুলনা করাটা আনরোমান্টিক।
উপমাটা জুতসই হল না ঠিকই। তবে কথা আছে।
কী কথা!
ঠিক এই সময়ে নয়নিকা অভিষেক মেহরাকে ডিভোর্স করে বিলেত থেকে দেশে ফিরে এল এবং এসেই হন্যে হয়ে সে তার পুরোনো জমি পুনরুদ্ধারে নেমে গেল। বাপের বাড়িতে পুরোনো ঘর দখল করল, পুরোনো চাকরি ফিরে পেল এবং পুরোনো প্রেমিকের ওপর চড়াও হল।
মানে আপনি?
যে আজ্ঞে। ফলে দুই বোনের মধ্যে প্রবল প্রবলেম।
ভাগ্যবান লোক মশাই আপনি, দু-জন লেডি আপনাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করছে।
আমার তো উলটোটাই মনে হয়। দোটানায় পড়ে আমার তো নিজেকে জরাসন্ধর মতোই লাগছে।
আহা, গল্পটা আপডেট করুন। এরপর কী হল?
সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। নয়নিকা আর চয়নিকাকে আমি বলে দিয়েছি তারা নিজেরা বসে একটা সিদ্ধান্ত নিক। আমি তাদের দুজনকেই অ্যাকসেপ্ট করতে রাজি, কিন্তু তা আইনে আটকায়। তবে আমার পক্ষপাত নেই। তারা যে সিদ্ধান্তই নিক, আমি মেনে নেব। হয় নয়নিকা, নয় চয়নিকা।
তা শেষ অবধি কী হল?
হল নয়, হচ্ছে। কাছেই দেশপ্রিয় পার্কে নয়নিকা আর চয়নিকা পাশাপাশি বসে একটা সেটলমেন্টে আসার চেষ্টা করছে। রায় যার পক্ষে যাবে সে এসে আমাকে জানাবে।
আর সেইজন্যই আপনি এই ঠান্ডায় বসে আছেন?
যে আজ্ঞে।
এ তো খুব টেনশনের ব্যাপার হল, মশাই।
খুব।
তা রায়টা কার পক্ষে যাবে বলে আপনার মনে হয়?
আপনিই বলুন।
আমার ভোট চয়নিকা।
তা-ও হতে পারে।
তবে নয়নিকাও তো ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। বড্ড মুশকিল হল, গন্ধর্ববাবু। তবে আমি মশাই এখন বাড়ি যাচ্ছি না। এই চেপে বসে রইলাম। এর একটা হেস্তনেস্ত না দেখে বাড়ি গেলে রাতে আমার ঘুম হবে না।
ইউ আর ওয়েলকাম।
আনন্দবাজার পত্রিকা—৭ নভেম্বর ২০১০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন