শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

'আচ্ছা বাবা যদি সিংহের সঙ্গে অসুরের লড়াই লাগে তবে কে জিতবে?'
'অসুর।'
'অসুর! কী করে? সিংহ তো দুর্গার বাহন।'
'তাতে কী! অসুরই জিতবে। অসুরের গায়েও দারুণ জোর।'
'আচ্ছা, সিংহের সঙ্গে যদি শিবের ষাঁড়ের লড়াই হয় তবে?'
'সিংহ।'
'কেন! শিবের ষাঁড় কি সোজা কথা?'
'না, সিংহ তো ষাঁড়-টাড় খেয়েই থাকে!'
'কার্তিক আর গণেশে যদি লড়াই লাগে?'
'কার্তিক!'
'কালী আর দুর্গায়?'
'দুর্গা।'
'দুর্গার দশ হাত বলে।'
'হুঁ।'
'আচ্ছা বাবা, দুর্গা কি শিবের বউ?'
'তা-ই তো শুনি। তবে কথাটা ঠিক না-ও হতে পারে। শুনেছি, অসুরকে মারার পর দুর্গাকে নিয়ে দেবতারা খুব ফ্যাসাদে পড়েন। কী করা যাবে দুর্গাকে নিয়ে? তিনি তো আলাদা কোনও দেবী নন, অনেক দেবতার অংশ দিয়ে তৈরি। তারপর—'
ছেলে ধৈর্য হারাচ্ছিল। সে পুরাণ ইতিহাস চাইছে না। তার কৌতূহল গায়ের জোরের ব্যাপারটা নিয়ে। ছ'বছর বয়সে সেটাই সবচেয়ে জরুরি তথ্য বলে মনে হতেই পারে। সুতরাং সে বাধা দিয়ে বলল, 'অসুরের গায়ে অত জোর হল কী করে?'
'বোধহয় ব্যায়াম করত!'
'বক্সিং জানত? কুং ফু?'
'জানারই কথা।'
'কত হাজার বছর ধরে লড়াই হয়েছিল দুর্গা আর অসুরের?'
'দশ হাজার বছর।'
'এতদিন লাগল কেন?'
'কেউ কাউকে হারাতে পারছিল না যে।'
'দশটা হাত নিয়েও দুর্গা পারছিল না? অসুরের তো মোটে দুটো হাত।'
'সেটাই তো মজা।'
'আর দেবতারাও তো দুর্গাকে শক্তি দিচ্ছিল।'
'হ্যাঁ।'
'তাহলে কে বেশি বীর?'
'শক্ত প্রশ্ন।'
'তোমার সঙ্গে যদি মা-র লড়াই হয় তবে কে জিতবে?'
'তোমার মা-ই তো জেতে রোজ। দেখো-না তোমার মা বকুনি শুরু করলেই আমরা কেমন জুজুবুড়ি হয়ে যাই।'
'আর' বকাবকির কথা নয়। যদি মারপিট হয়?'
'তাও বলা শক্ত।'
'ছেলেরা কি মেয়েদের সঙ্গে পারে না?'
'বেশির ভাগ সময়েই পারে না।'
'ইঃ, দিদি যে আমার কাছে হেরে যায়।'
'তোমার কথা আলাদা। তুমি তো বীর।'
'আচ্ছা বাবা, অসুর আর রাক্ষস কি এক?'
'না, তফাত আছে?'
'বক রাক্ষসের সঙ্গে মহিষাসুরের লড়াই লাগলে কে জিতবে?'
'মহিষাসুর।'
'কেন?'
'বেশি বীর বলে।'
'ভীমের সঙ্গে মা দুর্গার লড়াই লাগলে?'
'মা দুর্গা।'
এরকম অন্তহীন প্রশ্ন এবং উত্তর চলতে থাকে। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি, কিন্তু আমার ছেলে ক্লান্ত হয় না। তার প্রশ্ন এবং উত্তর শুনে তার প্রতিক্রিয়া দেখে ধরতে পারি, সে অর্জুনের কাছে কর্ণর পরাজয়টা যেমন ভালো চোখে দেখে না, তেমনি তার অপছন্দ রামচন্দ্রর অন্যায়যুদ্ধে বালি-বধ। নারী-পুরুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য ভেঙে মা দুর্গার জয়লাভটাও তার কাছে কিন্তু বিস্ময়কর। দশ হাত হলেই বা, মেয়ে তো।
'বামা, তুমি চামুণ্ডা পাহাড়ে গেছ?'
'গেছি!'
'কোথায়?'
'মহীশূর। কর্নাটকে।'
'কেমন পাহাড়? খুব বড়। এভারেস্টের মতো?'
'না না। সামান্য একটা ছোট্ট পাহাড়। তেমন উঁচুও নয়।'
'দুর্গার আর অসুরের লড়াই তাহলে সেখানেই হয়েছিল?'
'লোকে তা-ই বলে।'
ছেলে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে দৃশ্যটা কল্পনা করে। যুদ্ধ হবেই, সাংঘাতিক যুদ্ধ। যুদ্ধ থামছে না। মানুষ জন্মাচ্ছে, বড় হচ্ছে, বুড়ো হয়ে যাচ্ছে, একের পর এক প্রজন্ম কেটে যাচ্ছে, তবু চামুণ্ডা পাহাড়ে দুর্গা আর অসুরের লড়াই শেষ হচ্ছে না।
'সিংহটা অসুরকে কামড়ে দিয়েও পারল না?'
'সিংহ? সিংহ তার কাছে ছেলেমানুষ।'
'আচ্ছা, দুর্গার চেয়ে তো অসুর অনেক মোটা। তা-ই না?'
'তা বটে।'
'তাহলে পারল না কেন?
'আসলে কী জানো, এটা ঠিক যুদ্ধ নয়। এটা হল পাপ আর পুণ্যের লড়াই। ন্যায় আর অন্যায়ের লড়াই। এ লড়াই আজও চলছে। আসলে—'
'বুঝেছি বুঝেছি, এখন বলো তো গণেশ কী করে খায়। হাতির মতো শুঁড় দিয়ে না মানুষের মতো হাত দিয়ে?'
'বোধহয় হাত দিয়ে।'
'ভাত খায়, না ঘাস আর কলাপাতা?'
'ভাতই হবে। অমৃতও হতে পারে।'
'কার্তিকের ক-টা হাত, বাবা?'
'কেন, দুটো।'
'দুটো কেন? মা দুর্গার দশটা আর কার্তিকের মোটে দুটো!'
'তা-ই তো দেখি।'
'কার্তিকের গায়ে তো অনেক জোর।'
'হ্যাঁ, তা ভালোই হবে।'
'কৃষ্ণর সঙ্গে পারবে?'
'কী জানি। তবে দেবতায় দেবতায় লড়াই হয় না তো।'
'কেন হয় না?'
'ওরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে না।'
'আচ্ছা বাবা, মা দুর্গার বাপের বাড়ি কোথায়?'
'এই তো, এইখানেই।'
'কলকাতায়!'
'তা ঠিক নয়। তবে ভারতবর্ষেই বলতে পারো।'
'কিন্তু তুমি যে বলো মা দুর্গার বাবাই নেই।'
'সেটাও একটা কথা।'
'মা-ও নেই তো।'
'না।'
'তবে বাপের বাড়ি আসে কী করে?'
'কী জানো, আমরা মা দুর্গাকে এই বাঙালির ঘরের মেয়ে হিসেবে কল্পনা করি, তাই...'
'আচ্ছা বাবা। ও কথা থাক। এখন বলো তো, মা দুর্গা যদি অসুরের কাছে হেরে যেত তাহলে কী হত?
'খুব মুশকিল হত।'
'কী মুশকিল?'
'পৃথিবীটা ছারখার হয়ে যেত।'
'রাবণের কাছে রাম যদি হারত?'
'তাহলেও তা-ই হত।'
'আর কর্ণর কাছে অর্জুন?'
'তাহলেও বিপদ ছিল।'
'তাহলে এখন আর বিপদ নেই তো?'
'না।'
'পৃথিবী কী যেন বললে, ছারখার না কী যেন?'
'হ্যাঁ। মানে লন্ডভন্ড হয়ে যেত।'
'তাহলে অসুর হেরে গিয়ে ভালোই হয়েছে তো বাবা?'
'হ্যাঁ। তা তো বটেই।'
'তাহলে পৃথিবীটা এখন বেশ ভালো আছে?'
একটু মাথা চুলকোই। তারপর নরম করে বলি, 'না বাবা, ঠিক তাও নয়। আসলে লড়াইটা এখন চলছে।'
'কোন লড়াইটা?'
'ওই মা দুর্গার সঙ্গে অসুরের। রামের সঙ্গে রাবণের। কর্ণর সঙ্গে অর্জুনের।'
ছেলে অবাক হয়ে বলে, 'চলেছে কোথায়, বাবা?'
চলছে সেটা টের পাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু ছেলেকে বোঝাই কী করে?
আনন্দবাজার পত্রিকা—৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন