সবুজ বিড়াল

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সবুজ বেড়ালটা যখন লাফিয়ে জানালার তাকে নেমে এসে দুই জ্বলন্ত চোখে আমার দিকে তাকাল, ঠিক তখনই মিলি দরজা খুলে ঘরে আসে।

কোনটা আমার নিয়তি তা আমি সঠিক জানি না। কিন্তু আমার সারা শরীরে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিদ্যুৎতরঙ্গ বয়ে যেতে লাগল।

মিলি দরজার চৌকাঠে থমকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল জানালার দিকে। সবুজ বেড়াল। হ্যাঁ, সবুজ বেড়ালের কথা সে জানে।

বেড়ালটা অবশ্য মিলিকে লক্ষও করছিল না। তার তো মিলির সঙ্গে প্রয়োজন নেই। সে চেয়ে আছে আমার দিকে। বিশাল এক শূন্যতার পরপার থেকে তার যাত্রা কেবলই আমাকে লক্ষ করে। কেবলই আমাকে, অনন্ত আকাশ পাড়ি দিয়ে সে আজ পৌঁছে গেছে আমার জানালায়।

এরকমই কথা ছিল। তবু খুব ধীরে ধীরে মিলি তার মুখ ফেরাল আমার দিকে। তাই দুই চোখে দৃষ্টি যেন মাঝদরিয়ার স্রোতের ভিতরে মাল্লাহীন টালমাটাল নৌকা।

মিলি পৃথিবীর মেয়ে। তাকে আমার কিছু বলার নেই। নিজের লম্বা চুলের মধ্যে আঙুল দিয়ে আমি আমার ফাইবার অ্যান্টেনা ক্রিয়াশীল করে তুলি। তারপর সবুজ বেড়ালের চোখের দিকে তাকাই।

একরাশ ঝোড়ো শব্দ এসে ধাক্কা দেয় আমার অ্যান্টেনায়। এক অদ্ভুত গমগমে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর জিজ্ঞেস করতে থাকে, তুমি ভালো আছ? কোনো জীবাণু তোমাকে আক্রমণ করেনি তো? খাদ্যে কোনো বিষক্রিয়া? তেজস্ক্রিয়তা? জলের বিষ? যুদ্ধ? প্রেম?

আমি আমার আংটিসুদ্ধ আঙুলটা মুখের কাছে তুলে আনি। মৃদুস্বরে বলি, আমি ভালো আছি। সুস্থ ও সবল। দ্বিধাহীন।

চমৎকার। আমরা জানতাম, তুমি যথেষ্ট সহনশীল। কোনো কাজ বাকি রয়ে যায়নি তো?

না।

চারশো মাইল ওপরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে মহাকাশযান। সংকেত পাঠানোমাত্র আমাদের আবরণরশ্মি তোমাকে ঢেকে ফেলবে। চৌম্বকরশ্মি টেনে আনবে মহাকাশযানে। তার আগে তোমার স্পেসসুট পরে নিতে ভুলো না।

ভুলব না।

আমি আংটিটা সরিয়ে নিই। মিলির দিকে তাকাই। মিলি রোগা, কালো। মোটেই সুন্দর নয়। শুধু তার চোখ দুখানা বড়ো গভীর। আমি গভীর চোখের কোনো মর্ম জানি না। নীহারিকাপুঞ্জের ভিন্ন এক পরিমণ্ডলে যে গ্রহে আমার বাস সেখানে এরকম কোনো চোখ নেই। তবে দেবীর মতো সুন্দরীরা আছে।

আমি হাসিমুখে মিলির দিকে দু-হাত বাড়িয়ে ডাকলাম, মিলি।

রোজকার মতো মিলি এগিয়ে এল না। দুই অস্থির চোখ আমার দিকে নিবদ্ধ রেখে বলল, তোমার সেই সবুজ বেড়াল?

আমি মাথা নাড়লাম।

মিলির হাতে একটা সেলাই। কিছুদিন যাবৎ সে আমার জন্য একটা সোয়েটার বুনছে। নীল রং। মাঝে মাঝে কিছুটা বোনা হয়ে গেলে সে সেটা আমার শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে মাপ নিয়ে যায়। অসমাপ্ত সেই সোয়েটার কাঁটা সমেত খসে পড়ে গেল মেঝেয়।

দৃশ্যটা তথ্য হিসেবে চমৎকার। এই গ্রহের মানুষদের প্রতিক্রিয়া কত দ্রুত, কত সহজ ও নাটকীয়। আমাদের গ্রহে এরকম কখনো দেখা যায় না। দৃশ্যটা দেখে আমি বিদ্যুদবেগে আমার মাছের আঁশের মতো পাতলা রেকর্ডারটা আমার রগের পাশে চেপে ধরি। আমার চোখে দেখা, কানে শোনা, আমার প্রতিটি ক্রিয়া ও প্রক্রিয়া এই ছোট্ট রেকর্ডারের পরতে পরতে নথিভুক্ত হতে থাকে। আমাকে কোনো নোট নিতে হয় না, কিছু মনে রাখতে হয় না। সরাসরি আমার মস্তিষ্কের স্পন্দন থেকে রেকর্ডার তার যাবতীয় তথ্য নিয়ে নেয়।

মিলি দু-হাতে মুখ ঢেকে ফোঁপাতে লাগল। আমি নানান ঘটনায় মিলিকে কয়েকবারই কাঁদতে দেখেছি। তার যখন মন খারাপ হয়, যখন কেউ অপমান করে বা তার অভিমান হয় তখন সে কাঁদে। পৃথিবীর অভিধানে কান্না, অভিমান ও অপমান শব্দগুলির অর্থ আমি খুঁজে দেখেছি। কিন্তু কিছুই বোধগম্য হয়নি। গত এক বছর ধরে আমি মিলিকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেছি। যে যখন ঘুমিয়েছে তখন তার শরীরে ইনফর্মেশন পিন লাগিয়ে আমি সরাসরি তার অভ্যন্তর থেকে সব কথা টেনে বের করেছি। রাতের পর রাত জেগে বিশ্লেষণ করেছি। অনেক কিছুই দুর্বোধ্য রয়ে গেছে। মিলি ভালোবাসা নামক অদ্ভুত এক শব্দ ব্যবহার করে। শব্দটা সম্পর্কে আমার গ্রহের বৈজ্ঞানিকরাও আমাকে সচেতন করে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা কীরকম তা আমি এখনও স্পষ্ট বুঝিনি। একজন মানুষকে ছাড়া একজন মহিলার জীবন বৃথা বলে মনে হবে এ কেমন কথা। কিংবা সেই মহিলাকে দেখলে সেই পুরুষটি হৃৎপিণ্ড দ্রুততর চলবে, রক্তস্রোত উদ্দাম হবে, ওটাই-বা কোন নিয়ম? আমাদের এরকম কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

আমি আড়ষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করি, মিলি, কাঁদছ কেন?

মিলি তার সজল তীব্র দু-খানা চোখ আমার দিকে চেয়ে বলে, কেন জানো না?

আমার তো একদিন চলে যাওয়ার কথা, মিলি।

এসবই সত্য। মিলির মতানুসারে বাস্তবিকই আমি ওর স্বামী। পৃথিবীর এক মানবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করার নির্দেশ ছিল আমার ওপর। আমি সেই নির্দেশ বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করেছি। পরিচয় হওয়ার কিছুদিন পরই মিলি আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি বিয়ে করবে না আমাকে?

বিয়ে জিনিসটা কী তা আমি তাকে জিজ্ঞেস করি। সে খুব হাসতে থাকে এবং অবশেষে যা বলে তা শুনে আমি অবাক। নারী ও পুরুষের অবাধ সম্পর্ক এরা জানে না। এরা তাতে নানা গ্রন্থি সংস্কার ও মন্ত্র আরোপ করতে ভালোবাসে। ভারী ছেলেমানুষি সব প্রক্রিয়া। কিন্তু মিলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করার জন্য আমি সেই প্রক্রিয়া স্বীকার করে নিই। হ্যাঁ, পৃথিবীর নিয়ম অনুসারে ও আমার স্ত্রী, আমি ওর স্বামী কিন্তু মহাকাশে তো এ নিয়ম নেই, আমি স্বস্তির শ্বাস ফেলি।

মিলি আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে আমার কাছে। আমার অ্যান্টেনায় মৃদু নানা শব্দ এসে আঘাত করতে থাকে। চারশো মাইল ওপরে মহাকাশে আমাদের আকাশি খেয়ায় চলছে নানা আয়োজন। একটু পরেই শুরু হবে কাউন্টডাউন। তার আগে আমাকে পরে নিতে হবে মাধ্যাকর্ষণ-নিরোধ জুতো, স্পেসসুট। খুব বেশি সময় হাতে নেই।

মিলিকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে আমি এই গ্রহে শেখা কিছু কথা বলে যেতে থাকি। সবই ভালোবাসার কথা। যদিও আমি এসব কথার অর্থ জানি না তবু আওড়ে যেতে আমার অসুবিধা হয় না। রেকর্ডার সবই নথিভুক্ত করে নিচ্ছে। মিলির চোখের জলে কী ধরনের কতটা রাসায়নিক মিশে আছে, কান্নার সময় ওর হৃৎপিণ্ডের গতি রক্তচাপ, মস্তিষ্ক কোষের প্রসারণ ও শরীরের অন্যান্য প্রক্রিয়া।

সবুজ বেড়ালটা জানালার তাকে একটু সরে বসে। আমার চোখের দিকে জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে থাকে। তার শরীরে একটা যান্ত্রিক ঢেউ।

মিলি আমার বুকে দু-হাতের ছোটো মুঠিতে কিল মারতে মারতে রুদ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে, কত দূরে চলে যাবে তুমি, কত দূরে,

খুব বেশি দূরে নয়, মিলি।

তবু তো কয়েক হাজার আলোকবর্ষ।

আমি হাসলাম। আলোকবর্ষ দিয়ে দূরত্ব মাপবার প্রাচীন রীতি এখনও এই গ্রহে প্রচলিত। এরা জানে না বিপুল প্রসারণশীল এই মহাকাশে আলোকবর্ষ অত্যন্ত ছোটো মাপকাঠি।

ওর পিঠে হাত বুলিয়ে আমি বলি, দূরত্বটা কোনো সমস্যা নয় মিলি?

আর ফিরবে না? কোনোদিন না?

ফিরতেও পারি। হয়তো তখন পৃথিবীর কয়েক হাজার বছর কেটে যাবে।

কয়েক হাজার! আমি তো তখন থাকব না।

মানুষ থাকবে, মিলি।

কিন্তু আমি! আমি তো তোমাকে দেখতে পাব না আর।

আমি একটু বিরক্ত হয়ে বলি, কয়েক হাজার বছর বেঁচে থাকা কিছু শক্ত নয়, মিলি। তোমরা যে কেন পারো না।

মিলি অসহায় মুখে তুলে বলে, আমরা যে বুড়ো হই, মরে যাই।

কথাটা সত্য। এই গ্রহে মানুষের আয়ু বড়ো ক্ষণস্থায়ী। আমাদের গ্রহে যেমন মানুষের প্রায় অফুরন্ত আয়ু ও যৌবন, এখানে তেমন নয়। আমাদের গ্রহে একটি ফুল ফুটলে একশো বছর ফুটে থাকে, এখানে ভোর না হতেই ঝরে যায়।

মিলি তার মুখখানা আকুলভাবে তুলে থাকে আমার মুখের দিকে। ফিসফিস করে বলে, দেবদূত, স্বামী, প্রিয়তম, আমাকে কয়েক হাজার বছরের আয়ু দাও। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।

এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। পৃথিবীর এই মানবী শুধুমাত্র তার নির্দিষ্ট পুরুষটিকে ফিরে পাওয়ার জন্য কয়েক হাজার— মাত্র কয়েক হাজার বছরের আয়ু চায়।

আমি পৃথিবীর নিয়ম অনুসারে মিলির মুখ চুম্বন করি। ভয় নেই। আমার ঠোঁটে লাগানো আছে অতি মসৃণ জীবাণুনাশক। আমি যথাসম্ভব গদগদ স্বরে বলি, তোমাদের গ্রহটি কিছু কম সুন্দর নয়, মিলি। চমৎকার পুরুষেরা আছেন। তুমি একা বোধ করবে না বেশি দিন।

মিলি আকুল হাতে আমাকে এত জোরে চেপে ধরে যে, আমার যান্ত্রিক হৃৎপিণ্ড টুং করে একটা বিপদসংকেত জানায়।

সবুজ বেড়ালটা তার থাবার দিকে চেয়ে আছে। আমি জানি ওই থাবায় একটি ছোট্ট ডিজিটাল যন্ত্রে মহাকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ধরা পড়ছে। ধরা পড়ছে আকাশি খেয়ার গতি ও প্রকৃতি।

সময় নেই। আর সময় নেই।

মিলি মুখ তুলে বলে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও। আমি তোমাকে ছাড়া কি আর বাঁচব?

আমাদের এরকম কোনো সমস্যা নেই। আমরা একে আর-একজনকে ছাড়া দিব্যি বেঁচে থাকতে পারি। কিন্তু সে কথা বলা যায় না। বললে মিলি দুঃখ পাবে।

দুঃখ, এই পার্থিব শব্দটাও আমার নতুন-শেখা। কিন্তু লক্ষ করেছি, পৃথিবীর মানুষ খুব বোকার মতো দুঃখ পায় এবং কখনো-সখনো গাড়লের মতো সুখও বোধ করে।

আমি গাঢ় স্বরে মিলিকে বলি, মিলি, পৃথিবী থেকে কাউকে নিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই। আমাদের গ্রহের পরিবেশ অন্যরকম।

কীরকম, যেখানে তুমি থাকতে পারো সেখানে আমি পারব না?

না মিলি, তোমাদের তুলনায় সে অনেক নিষ্ঠুর জায়গা।

সবুজ বেড়ালের চোখে নীল সংকেত এল। কাউন্টডাউন শুরু হতে আর কয়েক সেকেন্ড মাত্র বাকি।

মিলিকে ছেড়ে আমি দ্রুত আমার জুতো আর স্পেসসুট পরতে থাকি। মিলি মেঝেয় পড়ে কাঁদে। বীজাণুতে ভরা, নোংরা, গন্ধময়, যুদ্ধ ও ভয়ে ভারাক্রান্ত এই ছোটো গ্রহটিতে আমার প্রবাস শেষ হয়ে এল। স্বর্গের মতো পবিত্র ও সুন্দর আমার জননী গ্রহে আমি ফিরে যাচ্ছি।

সবুজ বেড়ালটা আমার দিকে তাকাল। ডান পা তুলে নিজের গলায় আঁটা বকলসে একটা সুইচ টিপে দিল সে। তার চোখ থেকে অদৃশ্য এক রশ্মি এসে আমাকে ঘিরে ধরল।

আমি ধীর দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে জানালার বাইরে আমার শরীর ভাসিয়ে দিই। বহু দূর থেকে এক চৌম্বকরশ্মি আমাকে বিদ্ধ করে তারপর টেনে নিতে থাকে।

দুঃখ বা বিষাদ, প্রসন্নতা বা ক্ষোভ কিছুই আমি বোধ করি না।

মহাকাশযানে এক তদন্তকারী অফিসার আমাকে নানা প্রশ্ন করছিলেন।

পৃথিবীর কিছুই তোমাকে স্পর্শ করেনি তাহলে?

না।

ধুলো বা জীবাণু?

না!

তেজস্ক্রিয়তা?

না।

অফিসার মৃদু একটু হাসলেন। বললেন, প্রেম নামে একটা ছোঁয়াচে মানসিকতা আছে এইসব প্রাচীন গ্রহে। জানো?

শুনেছি।

তোমাকে স্পর্শ করে না?

আমি চুপ করে থাকি। তারপর মাথা নাড়ি।

না, আমাকে তেমন কিছু স্পর্শ করে না। তবে আমার আবার ফিরে যাওয়ার একটা ইচ্ছে হচ্ছে। খুব ইচ্ছে হচ্ছে, গিয়ে দেখে আসি, একজন মানবী আমার জন্য, শুধু আমার জন্য, শুধু আমার বিরহে কাঁদছে আর কাঁদছে।

অফিসার উচ্চকণ্ঠে হাসলেন।

আনন্দবাজার পত্রিকা—৩ এপ্রিল ১৯৮৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%