শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

কিল, ঘুসো, চড়চাপড়, লাথিঝাঁটা—সে একরকম। তাতে অন্তত প্রাণের ভয়টা নেই। কিন্তু দা-কুড়ুল বেরোলেই মুশকিল। গণেশ ভাবে, এতটা না করলেও হত। লকড়ির ঘর থেকে কুড়ুল নাচাতে নাচাতে কার্তিক আর রান্নাঘর থেকে দা হাতে দামিনী না বেরোলেও কি আর গণেশ ঘর ছাড়ত না? ছাড়ত। ছাড়তে তাকে হতই। অনেকদিন ধরেই সে বুঝতে পারছে, অবস্থাটা দিনে দিনে বড্ড টাইট হয়ে পড়ছে।
কার্তিক মিলিটারিতে ছিল। মাঝে মাঝে একেবারে মিলিটারির পোশাক পরেই হাজির হয়ে যেত গ্রামে। বাপ রে, বুটের কী ঘটাং ঘটাং শব্দ! শুনলে গণেশের বুকের ভিতরটা ঢিপঢিপ করত। কার্তিক মিলিটারি ছেড়ে এখন ঘরে এসে জুত করে বসেছে, এখন আর বুট-টুট নেই। তবু শব্দটা যেন এখনও রয়ে গেছে। কেবল গণেশ শুনতে পায়।
পীতাম্বর কি শুনতে পায়? কে জানে। তবে পীতাম্বরের অবস্থাও আর সুবিধের নয়। কার্তিক তার দুটো ধানের গোলা পুড়িয়েছে, ফি-বছর খেতের ধান কেটে নিয়ে আসছে। সেই ডাকসাইটে পীতাম্বর তো করছে কাঁচকলাটা। ভাগ্য ভালো, কার্তিক এখনও তার ধানকল বা সোনার দোকান বা বাড়িতে হানা দেয়নি। তাও দেবে, পীতাম্বর জানে, তারও ঘণ্টা বেজে গেছে।
মুশকিল হল, তামাশা দেখার জন্য গণেশ আর গাঁয়ে থাকবে না। তারও নোটিশ পড়ে গেছে।
কিন্তু কার্তিকের কথাও নয়, পীতাম্বরের কথাও নয়। খেতের ধারে এক গাছতলায় বসে গণেশ আজ নিজের কথা ভাবছিল। বরাবরই তার মাথাটা গবেট। ভাবনাচিন্তা বড় একটা আসতে চায় না। তার সুখ-দুঃখ কম, নেই বললেই হয়। তার শোকতাপ খিদে-তেষ্টা সবই যেন কেমন সেঁতানো। তার শরীরে রাগ-টাগ মোটে নেই। সাহসও নেই। সে যে কেমনধারা তা সে আজও বুঝতে পারল না।
আগে তাকে ভালো লোকই বলত পাঁচ গাঁয়ের মানুষ। তারপর হল কী, একদিন সিদ্ধিনাথখুড়োর সঙ্গে নোনাপুকুরের বিখ্যাত রাসমেলায় গেল। সেখানে সিদ্ধিনাথ খুড়ো ট্যাঁক থেকে একখানা লাল গোঁজ বের করে বসে গেল জুয়ায়। পাশে গনো। সারাক্ষণ সে চোখের পলক ফেলেনি। আর তার পলকহীন চোখের সামনে একখানা অদ্ভুত দুনিয়ার দরজা খুলে যেতে লাগল।
সিদ্ধিখুড়ো একবার চোখ টিপে বলল, 'খেলবি?'
না না করেও একসময়ে বসে গেল গণেশ। তিন পাত্তির খেলা। আঃ, গায়ে যেন নতুন একখানা জোয়ার এল।
ব্যাস, সেই যে বারোটা বাজল গণেশের, এখনও বেজেই চলেছে। তিন পাত্তি, সাট্টা, এমনকী কলকাতায় গিয়ে মাঝে মাঝে রেস খেলা, গণেশের কিছুই বাকি নেই। শেষে এমন অবস্থা দাঁড়াল যে, হাঁড়ি চড়ে না, চাষবাস চুলোয় গেছে। সেই ফাঁকে বিচক্ষণ পীতাম্বর যথেষ্ট হাতিয়ে নিল।
বাপ রেখে গিয়েছিল মন্দ নয়। দেখেশুনে চললে দুই ভাইয়ের ভেসে যেত। কিন্তু গণেশ এমন অবস্থা করে তুলল যে, মা মরলে পর ঘাটকাজের খরচটা পর্যন্ত ঘরে ছিল না।
তখন থেকে গণেশকে ভালো লোক বলার অভ্যেসটা লোকে ছাড়ল।
বলতে নেই মিলিটারিতে কার্তিক যে চাকরিটা করত তাতে কাঁচা পয়সার ছড়াছড়ি। প্রতিমাসে মোটা টাকা আসত ইনশিয়োর করা খামে। কার্তিক লিখত, 'এই টাকায় অমুক জমিটা কিনিবে, তমুক পুকুরটা বন্দোবস্ত লইবে, অমুকের বাগানটা ডাকিয়া লও।' কিন্তু অতসব ভাববার সময় কোথায় তখন গণেশের। টাকা হাতে এলেই তাকে টানে তাস, তাকে টানে রেস, তাকে হাতছানি দেয় সাট্টা।
কার্তিকের টাকা পাখা মেলে উড়ে গেল। উড়ে গেল ফুলকুঁড়িও।
লজ্জার কথা, ফুলকুঁড়ি তার বিয়ে-করা বউ। একেবারে রাইকিশোরী। দিব্যি দেখতে ছিল। কিন্তু দেখবে কী গণেশ, তার চোখ তখন ভাগাড়ে। যার দিনমান এ গাঁয়ে, ও গাঁয়ে হাটে মেলায় জুয়া খেলে বেড়াচ্ছে। রাতবিরেতে ফিরত কমই। ঘরে সোমত্ত বউ আর বুড়ি মা।
ফুলকুঁড়ির নামে কিছু কুচ্ছো কানে এসেছিল বটে গণেশের। মাছির মতো সেসব কথা উড়িয়ে দিয়েছে। কে এক ঢ্যামনা নাকি প্রায়ই এসে ফুলকুঁড়ির সঙ্গে গুজগুজ ফুসফুস করে। তা করুক গে।
মায়ের শ্রাদ্ধটা মিটিয়ে গণেশ গিয়েছিল নবাবগঞ্জের দত্তবাবুদের বাড়ি। কালীপুজোর রাতে সেখানে হাজার হাজার টাকার হাতবদল হয়। খুব জমে গিয়েছিল।
সকালে এসে শুনল, ফুলকুঁড়ি উড়ে গেছে। পাশের বাড়ির নবীনের মা বলল, বাপু, দোষ তো ওর নয়। কচি মেয়ে, একা বাড়িতে ভূতের ভয়ও তো করতে পারে।
পারে বই কী। খুব পারে।
ফুলকুঁড়ি যাওয়ায় দুখানা পাখা গজাল গণেশের। আর পিছুটান নেই। কেবল ওড়ে; আর ওড়াও।
সেই ফাঁকে পীতাম্বর খুব টাইট মারতে লাগল। টাকা ফেলত আর এটা-ওটা লিখিয়ে নিত।
সবই চলে গিয়েছিল প্রায়, আচমকা কার্তিক এসে হাজির না হলে। না এসে তারও উপায় ছিল না। চাকরি গেছে চুরির দায়ে। ধরা পড়ে জেল খাটার কথা। তা কোন ফাঁকফোকর দিয়ে গলে বেরিয়ে এসেছে। এবার গাঁয়ে জমিদারি হাঁকিয়ে গেড়ে বসার ইচ্ছে।
কিন্তু জমিদারি কোথায়! তার পাঠানো টাকা যে কবে ফুঁকে দিয়েছে গণেশ।
কার্তিক বড় ভাইকে কিছু বলল না। তবে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল দাওয়ায় অনেকক্ষণ।
তারপর যখন তাকাল তখন চোখটা অন্যরকম। সেই চোখ দুটির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। লোকটাকে কেমন যেন ভাই বলে আর মনেও হয় না। বড্ড ভয় খেয়ে গিয়েছিল গণেশ।
তিন-চার দিন গুম হয়ে বসে থাকার পর কার্তিক গাঁয়ের বদ কয়েকটা ছোঁড়াকে ডাকিয়ে এনে আমবাগানে গোপনে মিটিং করল। তারপর আরও কিছু শাগরেদ জুটে গেল তার। মাসখানেকের মধ্যেই গোটা তিনেক ডাকাতি করে ফেলল তারা।
এদিকে ঘরে মেয়েমানুষের অভাব। রান্নাবান্না একরকম শিকেয় উঠেছে।
কার্তিক একদিন ডাকাতি করে লুটের মালের সঙ্গে একটা মেয়েছেলেও এনে ফেলল। সে ওই দামিনী। বিয়ে-টিয়ে কিছু করল না, তবে সিঁদুর পরিয়ে দিল। দিব্যি ঘরসংসার পেতে ফেলল দু'জনে। আর তার চেয়ে বড় কথা, গণেশকেও ফেলল না। যে কাণ্ড করেছে গণেশ তাতে অন্য কেউ হলে তার হাল বেহাল করে ছেড়ে দিত, বড়োভাই বলে রেয়াত করত না। তবে কার্তিকটা বরাবরই গণেশকে একটু খাতির-টাতির করত। ছেলেবেলায় ভাইটাকে কোলেকাঁখে গণেশ বড় কম করেনি। গণেশ ওকে সাঁতার শিখিয়েছে, গাছ বাইতে শিখিয়েছে, বাঁশি বাজাতে শিখিয়েছে।
গাছতলায় বসে গণেশ সেইসব কথা ভাবছে। ভেবে অবশ্য লবডঙ্কা। মানুষ বিয়ে করলেই কেমন হন্যে হয়ে ওঠে। এই যে গণেশ পৈতৃক বাড়িতে টিকে ছিল, ও শুধু কার্তিক বিয়ে করেনি বলেই। যেই করল অমনি সব সম্পর্ক পালটাপালটি হয়ে গেল। ভাইকে শালা বলতে মুখে আটকাল না আর কার্তিকের।
অবশ্য পালটেছে আরও অনেক কিছুই। কার্তিকের এখন কাঁচা পয়সা হয়েছে মেলা। সোনাদানা হয়েছে। গাঁ-সুদ্ধু লোকের কাছে কার্তিক এখন মহা মান্যগণ্য লোক। সবাই ভয় খায়। খাটো গলায় গালমন্দ করলেও প্রকাশ্যে সেলাম বাজায়।
গণেশ একেবারে পোষা বেড়ালটার মতো ছিল। সাতে-পাঁচে থাকত না। দু'বেলা দু'মুঠো পেলেই যথেষ্ট। কিন্তু দামিনীর তাও সইল না। লাগানি-ভাঙানি শুরু হল কার্তিকের কাছে।
পীতাম্বর শালার অবস্থাও যে ভালো নয়, এত দুঃখের মধ্যে এটাই যা একটু ভেবে সুখ হচ্ছে গণেশের। খুব পাম্পু হচ্ছে পীতাম্বরের। দু-দুটো ধানের গোলা পুড়েছে, লুঠপাট হয়েছে, ভরসার কথা আরও হবে। কার্তিক যা মিলিটারি।
আপনমনেই হাসল গণেশ। পেটে খিদে, গলায় তেষ্টা, মনে দুঃখ, তবু হাসল। ঘুরেফিরে চিন্তাটা ফের নিজের জায়গায় ফিরে এল। গণেশ ভাবতে লাগল, সে কেমন লোক? সে কি লোক ভালো? না খারাপ? জুয়াটা ধরলে অবশ্য তাকে খুবই বিপাকে ফেলা হবে। অত ধরলে মানুষের মধ্যে আর ভালো লোক পাওয়াই যাবে না। কিন্তু জুয়ার নেশাটা যদি না ধরো, তাহলে কি গণেশ খুব খারাপ?
গণেশ অনেক ভাবল। নানা দিক দিয়ে নিজেকে মাপজোখ করল। তারপর মাথা নেড়ে বেশ জোর গলায় বলে উঠল, না হে, আমি লোকটা খারাপ নই। উঁ, তেমন খারাপ কিছুতেই বলতে পারা যায় না।
বাঁই করে কী যে একটা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল চোখের পলকে তা ঠাহর পেল না গণেশ। কিন্তু এমন দিনেদুপুরে এরকম অশৈলী কাণ্ড দেখে সে চোখ বুজে ফেলল। তার মনের মধ্যে একটা টিকটিকি ডেকে উঠল। বিপদ। বিপদ। ঘোর বিপদ।
জিনিসটা কী, তা জানে না গণেশ। কিন্তু সেটা পিছনে গাছের গুঁড়িতে গিয়ে লেগেছে। গণেশ সাবধানে ঘাড় একটু ঘোরাতেই জিনিসটার ডগা দেখতে পেল। পাখির পালক-গোঁজা বাহারি জিনিস। ফলাটা একেবারে গোটা সেঁধিয়েছে গাছের গায়ে।
গণেশ 'বাবা গো!' বলে উপুড় হয়ে পড়ল। তিরটা যে-ই মারুক, সে কাছেপিঠেই আছে। দু-নম্বর তিরটা এল বলে।
কিন্তু এল না। সামনে দুখানা লম্বা ঠ্যাং এসে দাঁড়াল! গণেশ মিটমিট করে চেয়ে লোকটাকে বুঝবার চেষ্টা করল।
এই শালা!
গণেশ উঠে বসল, তারপর হাঁ করে চেয়ে রইল। লোকটা ভারী, লম্বা, হাড়েমাসে জড়ানো পাকা শরীরখানা, গায়ে ফতুয়া আর পরনে হেঁটো ধুতি। চোখ দুখানা ফোঁস ফোঁস করছে। কাঁধে ধনুক, কোমরে লতায় বাঁধা একগোছা তির।
গণেশ কাঁপা গলায় বলল, যে আজ্ঞে।
তুই কার্তিক দাস?
গণেশ শশব্যস্ত বলল, আজ্ঞে না, আমি গণেশ।
তার সঙ্গে কার্তিকের চেহারা খুব মিল। মিলটা থাকাটা যে কত খারাপ তা আজ বুঝল গণেশ।
লোকটা কিছুক্ষণ সন্দেহের চোখে চেয়ে থেকে বলল, তা-ই হবে। কার্তিক আর যা-ই হোক তোর মতো ময়দার বস্তা নয়। ওঠ শালা, গাঁ ছেড়ে লম্বা দে। ফের এই তল্লাটে দেখলে ফুঁড়ে দেব।
যে আজ্ঞে। বলে গণেশ খুব বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল। তারপর অতিশয় বিনয়ের সঙ্গে বলল, আপনি কে বটেন আজ্ঞে?
তোর যম। যা, শালা।
একটু তফাতে বকুলতলায় ছাতা মাথায় পীতাম্বর দাঁড়িয়ে। ওখান থেকেই হাঁক মারল, বটকেষ্ট, চলে আয়।
বটকেষ্ট— অর্থাৎ যমদূতটা ফিরে দাঁড়াল।
পীতাম্বর তাহলে ভাড়াটে খুনে এনেছে। গণেশের বগল বাজাতে ইচ্ছে করছিল। ওঃ খুব লেগে যাবে এবারে। এক্কেবারে শুঙ্গ-নিশুঙ্গর লড়াই যাকে বলে। খেলাটা দেখে গেলে হত।
গণেশ উঠল। কাঁধের গামছাখানা নিয়ে কপালটা মুছল। তারপর বিগলিত মুখে বলল, পীতাম্বরদা যে! বলি কাণ্ডখানা কী?
পীতাম্বর তার দিকে গম্ভীর বদনে একটু চেয়ে থেকে বলল, টের পাবি।
আমার তো হয়ে গেছে গো। কার্তিক খেদিয়ে দিয়েছে।
ভালোই হয়েছে। এবার প্রাণটা নিয়ে কেটে পড়।
সে আর বলতে! তা ইনিই বুঝি—! বলে কথাটা অসমাপ্ত রেখে একটু রেশ টেনে গণেশ খুব বুঝদারের মতো একটু হাসল।
গাছ থেকে তিরটা টেনে নিয়ে বটকেষ্ট তার দিকে আর-একবার চেয়ে বলল, পেট থেকে যদি কথা বের করেছ তাহলে ত্রিভুবনে কোথাও গিয়ে আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না। বলে দিচ্ছি।
কার্তিকটাকে তাহলে বটকেষ্টই নিচ্ছে। তা-ই বলে যে মায়া একটা না হচ্ছে এমন নয়। তবে পাপের শাস্তি তো হবেই। সে-ও তো ঠেকানো যাবে না।
গণেশ গামছাটা দিয়ে রোদ ঠেকাতে মাথায় একটা পাগড়ি বাঁধল। তারপর রওনা হয়ে পড়ল।
কোথায় যাবে তার অবশ্য ঠিকঠিকানা নেই। বোধহয় কিছুদিন মুনিশ বা মজুর খাটতে হবে। তারপর কপালে যা আছে তা হতে থাকবে। আর কী করবে গণেশ?
বটকেষ্টর চেহারাটা চোখের সামনে ভাসছিল গণেশের। বাপ রে, যেন যমের দোস্ত। কার্তিকটাও বড় কম যায় না। সে-ও তো মিলিটারি। কিন্তু বেচারা এ যাত্রা রক্ষে পাবে বলে মনে হচ্ছে না গণেশের। বটকেষ্ট আধ মাইল দূর থেকে তির মেরে ফুঁড়ে দেবে।
একটা বাঁশবনের আড়ালে গ্রামটা ঢাকা পড়তেই গণেশ একটা বিড়ি ধরিয়ে ফের একটা গাছতলায় বসল। জীবনটা নতুন করে শুরু করতে হবে। তবে তাড়া নেই। ঢের সময় আছে হাতে।
সামনে পতিতপাবনের বীজতলা। পিছনে কুঁড়ে। একটু জল খেয়ে নিলে হয়।
গণেশ গিয়ে হাঁক মারল উঠোনের বাইরে থেকে, পতিত আছ নাকি হে?
পতিত বেরিয়ে এসে গণেশের দিকে চেয়ে বলল, আছি বটে হে। কিন্তু কী সব হচ্ছে বলো তো?
গণেশ হেসে কুটিপাটি, খুব হচ্ছে হে, খুব লেগে পড়েছে। এক ঘটি জল খাওয়াও, সব বলছি। না বললে কথাগুলো পেটে বুজকুড়ি কাটবে হে।
পতিতপাবন তাড়াতাড়ি দাওয়ায় একটা মাদুর বিছিয়ে দিল।
বোসো, বোসো, ঠান্ডা হও।
ঠান্ডাই মেরে গেছি হে। ওফ, তিরটা যা মেরেছিল, একচুল এদিক-সেদিক হলেই হয়েছিল আর কি?
পতিতপাবন খাপ পেতে বসে গলা খাটো করে জিজ্ঞেস করল, আমিও নানারকম শুনছি। ঘটনাটা তাহলে কত দূর গড়াল?
অনেক দূর। পীতাম্বর একটা জাঁকালো রকমের খুনেকে আনিয়েছে। ওদিকে কার্তিকের দলবলও শানাচ্ছে। আমাকে কুকুর-তাড়ান তাড়িয়েছে। এবার নারদ নারদ বলে লেগে গেল আর কী, দেখো ভায়া, ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। আমাকে না খেদালে বটকেষ্ট তোর আমাকেও গেঁথে ফেলত। খুব বাঁচা বেঁচে গেছি।
পতিতপাবন সব শুনল। মন দিয়েই শুনল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, আমাদের রামে মারলেও মারবে, রাবণে মারলেও মারবে। যাঁহা কার্তিক তাঁহা পীতাম্বর।
একটা বাজি ফেলবে নাকি ভায়া?
কিসের বাজি?
আমি বলি কী, পীতাম্বর শালাই জিতবে। তুমি কী বলো?
আমি আর কী বলব?
আহা, একটা কিছু বলোই-না। পাঁচটা টাকা বাজি ধরে রাখি।
আমি ওসব বুঝি-টুঝি না। তবে কার্তিকও কম নয়।
তাহলে তুমি কার্তিকের দিকেই ধরো। ওই পাঁচ।
পতিতপাবন একটু হাসল, তোমার স্বভাবটা আর গেল না হে গণেশ।
জীবনটাই জুয়া রে ভাই। তাহলে ওই কথাই রইল।
গণেশ উঠে পড়ল। বেলা অনেক হয়েছে। একটা ঠেক খুঁজে বের না করলেই নয়। দশটা গাঁ তার চেনা। চেনা জায়গায় কাজকারবার করতে যাওয়া ঠিক নয়। জুয়াড়িকে তেমন ভালো নজরে দেখেও না কেউ।
হঠাৎ মাথায় চিড়িক করে একটা মতলব খেলে গেল। আজকের রাতটা শ্বশুরবাড়িতে কাটালে কেমন হয়? ফুলকুঁড়ি হাওয়া হওয়ার পর আর অবশ্য খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। গিয়ে দাঁড়ালে কি আর ফেলবে? জামাই-আদর না করলে লোকনিন্দের ভয়ে দুর ছাইও করবে না। শত হলেও জামাই। বেশি দূরও নয়। মাইল কুড়ি-পঁচিশ রাস্তা। বাস যায়।
গণেশ রওনা হয়ে পড়ল।
শ্বশুরবাড়ির অবস্থা ভালোই। বড় গেরস্ত।
পেল্লায় সংসার। ভাই-ভাই সব মিলেজুলে রাবণের গুষ্টি। বড় বড় উনুন জ্বলে, ফলে বিশাল সব হাঁড়ি-কড়াইয়ে রান্না হয়, আর নেমন্তন্ন বাড়ির মতোই সারি বেঁধে পাত পড়ে রোজ। বড় বড় ধানের গোলা, বিশ-ত্রিশটা গাই, পাকা বাড়ি, ভুসিমালের ব্যাবসা, বাতাসার কারখানা, আরও সব আছে, আর চাই কী? বেশি আসেনি গণেশ। মেরেকেটে বার তিনেক হবে। তবে মনে আছে বেশ।
গণেশ পৌঁছল সন্ধের মুখটায়। শ্বশুরবাড়ির উঠোনে তখন খুব নামগান হচ্ছে। মেলাই লোক মোয়ার ওপর মাছির মতো জুটে গেছে। কারও কথা কওয়ার সময় নেই। কার কাছে যে পরিচয়টা দাখিল করবে তা-ই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিল গণেশ। বড় মুশকিলে পড়া গেছে।
এদিক-সেদিক একটু হাঁটাহাঁটি করল গণেশ। তারপর আধবুড়ো একটা লোককে দাওয়ায় একটু অন্ধকারের দিকে বসে হুঁকো টানতে দেখে এগিয়ে গেল।
মশাই, বাড়ির কর্তা কোথায় বলতে পারেন?
কর্তা সবাই। কাকে চাই, বাপু?
আজ্ঞে আমার নাম গণেশ। এ বাড়ির জামাই।
লোকটা হুঁকো নামিয়ে হাঁ করে তার দিকে চেয়ে থেকে বলল, জামাই?
আজ্ঞে, একটু গোলমাল আছে। ফুলকুঁড়ি আমার বউ। এখন অবশ্য...
লোকটা হুঁকোটা নামিয়ে তার একটা কাঁধ খামচে ধরে বলল, জুতোপেটা করতে হয়, বুঝলে? জুতোপেটা!
গণেশ ভয় খেয়ে ককিয়ে উঠে বলল, তা বটে। তবে এখন ততটা না করলেও চলবে। বিপদে পড়েই এসে পড়েছিলুম। তা না হয় যাচ্ছি।
লোকটা তার কাঁধ ছাড়ল না। একখানা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, তোমাকে নয় হে, তোমাকে নয়। ফুলুর কথাই বলছিলুম। আমি তার খুড়ো হই, সতীশ। চিনতে পারলে না?
ফুলকুঁড়ির মেলা খুড়ো-জ্যাঠা, সবাইকে মনে রাখা সম্ভব নয়। তবু গণেশ মাথা নেড়ে বলল, খুব চিনতে পেরেছি। খুব।
আর বাপু, তুমিও ম্যাদামারা বড় কম নও। জুয়াও নাকি খেলো বাপু?
আজ্ঞে...
তুমিও লোক ভালো নও। কিন্তু তা বলে ফুলু কাণ্ডটা যা করল তারই কি মাপ আছে? তবে প্রায়শ্চিত্তও বড় কম হয়নি। পল্টু ছোঁড়া তো রাত না পোয়াতেই ম'ল।
ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল না গণেশ। ধাতস্থ হতে সময় লাগছে। পাশে বসিয়ে মেলা বকে গেল। গণেশ বুঝল, পালানোর সময়েই মনসা ঠুকে দিয়েছিল সেই ছোঁড়াকে। রাত না পোয়াতেই ছোঁড়া মরে। তবে তাকে বাঁচাতে বেহুলার মতো একটা চেষ্টা করেছিল ফুলু, অর্থাৎ ফুলকুঁড়ি। ছোঁড়া তো আর লখিন্দর ছিল না, তাই বাঁচেনি। ফুলু নাকি তারপর বিধবা সাজবারও চেষ্টা করেছিল। তা সেই ভূতও ছাড়ানো হয়েছে।
খুড়ো এতসব বৃত্তান্তের পর বলল, তা বাপু, আমরাও সব তোমার কাছে যাচ্ছিলুম। গিয়ে ধরে পড়তুম, ফুলুর দোষঘাট যা-ই থাক, ঘরে নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
গণেশ বেজার মুখে বলল, ঘরই নেই তার—
নেই মানে?
তখন গণেশকেও তার বৃত্তান্ত বলতে হল।
খুড়ো হুঁকোটা সরিয়ে রেখে শিরদাঁড়া সোজা করে বলল, বটে। তা তুমি যদি ফুলকুঁড়িকে ঘরে তোলো তাহলে তোমার ব্যবস্থাও আমরাই করব।
ঘাড়ে যেন হাড় নেই এমনভাবে ঘাড়খানা হেলিয়ে দিল গণেশ, তা আর বলতে।
এরপর গণেশের যা খাতির হল তা সে সাত জন্মে পেয়েছে বলে মনে হয় না। গরম ভাতে ঘি পর্যন্ত জুটে গেল রাতে। স্বয়ং শাশুড়ি সামনে পাখা হাতে বসে। নষ্ট মেয়ের মা হলে কত সইতে হয়। তার আরও রাতে যা হল তা গণেশ স্বপ্নেও ভাবেনি। বিছানায় ফুলকুঁড়ি। ঘোমটায় মুখ ঢেকে কৃতকর্মের জন্য কাঁদছে। গণেশের পা জাপটেও ধরল।
তারপর রাতখানা একেবারে ফুলশয্যার রাতের মতো কেটে গেল। দু'জনের কারওরই দু-চোখের পাতা এক হল না। কখনও গণেশ ফুলুর মুখপানে চেয়ে থাকে হাঁ করে, কখনও ফুলু হাঁ করে থাকে গণেশের পানে চেয়ে, আর কখনও দু'জনেই দুজনের দিকে।
রাত না পোয়াতেই ফুলুর তিন জবরদস্ত খুড়ো তাদের জন্য দশেক ডাকাবুকো শাগরেদ নিয়ে রওনা হয়ে গেল। ফুলু গণেশের কানে কানে বলল, আমার মেজকাকা হল ডাকাত। মস্ত দল।
শুনে গণেশের ধাত ছাড়ার উপক্রম।
বিকেলের দিকে মেজ খুড়ো হাসতে হাসতে ফিরে এল, ওঃ খুব রগড় হল যা হোক। হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ—
সবাই ভিড় করল চারপাশে। রগড়টা কীসের?
মেজ খুড়ো দাওয়ায় ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে বলল, সে খুব রগড়। বটকেষ্ট কার্তিককে গাঁথবে বলে আপসাচ্ছিল, তা তার জ্বর এসেছে। কাঁথা মুড়ি দিয়ে কোঁ কোঁ করছে। আর কার্তিক আমাকে দেখেই ধড়াস করে পায়ের ওপর পড়ে হাউমাউ করতে লাগল। ছাড়াতে পারি না। তা বাড়ি-টাড়ি সব ভাগজোখ করে দিয়ে এলাম। বটকেষ্টকে জ্বর গায়েই একটা গো-গাড়িতে তুলে রওনা করে দিয়ে এসেছি। ওঃ খুব রগড় হল। ভেবেছিলুম বুঝি একটু গা গরম করতে হবে, দুটো-চারটে লাশও পড়বে। কোথায় কী। হাসতে হাসতে মরি।
গণেশ কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। ভগবান একসঙ্গে এত দিলে লোকে সামলায় কী করে! গণেশ হার্টফেলই করত। তবে ঘোমটার আড়াল থেকে ফুলকুঁড়ি চোখের একটা ইশারা করায় হার্টটা ফেল হতে হতেও ফের নেচে উঠল।
আনন্দবাজার পত্রিকা—২০ ডিসেম্বর ১৯৮৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন