সেই ফুলের দল – ৭

অভীক মুখোপাধ্যায়

কিছু-কিছু মানুষ বিকট মেধার অধিকারী হন। তাঁরা সবসময় মনে করেন যে তাঁদের প্রবল মেধার দাম অন্যরা দিচ্ছেন না। তখন সত্যকে সামনে আনা কিংবা সত্যের নামে অপলাপ করতে থাকার মতো কাজ করে অনেক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকেন। ওতেই তাঁদের শান্তি। বলরাজ মাটোকের ক্ষেত্রেও অনেকটা তেমনই ঘটছিল। বলরাজ জন্মসূত্রে জম্মুর ছেলে। তিনি যে পঞ্জাবি পরিবার থেকে এসেছিলেন সেই পরিবার অনেক দিন ধরেই আর্য সমাজের রীতিনীতি মেনে আসছিল। মাঢোকের সঙ্গে বাজপেয়ীর অনেক মিল ছিল। অটলজির মতোই তিনিও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন, ইংরেজিতে দখল তেমন ছিল না। বাজপেয়ীজি সঙ্ঘের স্বয়ংসেবক হওয়ার আগে তিনি সঙ্ঘের সাথে যুক্ত হন। ‘৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাকিস্তান থেকে বহু শরণার্থীকে এপারে আসতে সাহায্য করেছিলেন।

পেন্সিলের মতো সরু গোঁফ, তীক্ষ্ণ নাক, আর শিকারির মতো দৃষ্টিভরা দুটি চোখ, এই ছিল বলরাজ মাটোকের ক্ষুরধার ব্যক্তিত্বের বাহ্যিক রূপরেখা। শ্রীনগরে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি চলে এসেছিলেন দিল্লিতে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দ্বারা উদ্বুদ্ধ ছিলেন, হিন্দু রাষ্ট্রবাদ নিয়ে নিয়মিত লিখতেন। মুসলিম সমাজের মনোভাব থেকে শুরু করে বিদেশনীতি প্রায় সকল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর নিবন্ধ ছিল। মনে রাখতে হবে, যখন বাজপেয়ীজি পাঞ্চজন্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন, তখন কিন্তু মাঢোককে গুরুজি নিজের পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রার একখানি বলে চিহ্নিত করে তুলে দিচ্ছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হাতে। তাই সময়সারণী (এবং গুরুত্বের দিক থেকে একটা সময়কাল পর্যন্ত) মানলে তিনি ছিলেন দীনদয়াল উপাধ্যায়ের উত্তরসূরী।

কিন্তু মেধাবীর রাজনীতিকে কখনও কখনও চালে মাত দিয়ে যায় রাজনৈতিক মেধা। মাঢোক পার্টি প্রেসিডেন্ট হিসেবে জায়গা পেলেও তাঁকে পদ আবার ছেড়ে দিতে হয়েছিল দীনদয়াল উপাধ্যায়ের হাতে। অর্থাৎ, তাঁর কার্যকালে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল নিশ্চিত। পরবর্তী কালে আডবানিজি নিজের আত্মজীবনীতে লিখছেন, মাঢোকের সময়কালে যে ক্ষতি হয়েছিল, তা শুধরে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।

সঙ্ঘ এবং জনসঙ্ঘ দুই জায়গাতেই হিন্দু ফেভিকল একটা নীতিতে জোর দেয়, কোনও ব্যক্তি যেন কোনও ভাবেই প্রতিষ্ঠানের থেকে বড় না হয়ে যায়। মাঢোক এই পঙক্তি মানতেন না। প্রতিষ্ঠান বা দল যা বলবে, তার সঙ্গে মতে না-মিললেও মাঢোক নিজের মনের কথাই বলে যেতেন। হয়তো এত স্বচ্ছতা রাজনীতির ক্ষেত্রে নেতাদের প্রতিবন্ধী করে তোলে। বাস্তববাদীতার অভাবে ভুগতেন বলরাজ মাঢোক। মুড সুইং করত। রেগে গেলে লঘুগুরুর সম্মান রাখতেন না, নিজের ভাষার ওপরে নিয়ন্ত্রণ থাকত না। সঙ্ঘ পরিবার কিংবা জনসঙ্ঘের ক্ষেত্রে এটা শিষ্টাচার ভঙ্গের মধ্যেই পড়ত।

দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে মাটোক সরাসরি বলে বসলেন, ‘এর পেছনে বাজপেয়ী আর বালাসাহেব দেওরস রয়েছে।’ বালাসাহেব দেওরস তখন সঙ্ঘের শীর্ষ কর্তা। পরবর্তী কালে এই দেওরসই সরসঙ্ঘচালকের ভুমিকায় আসবেন। যার সঙ্গে যেখানে সাক্ষাৎ হতে লাগল, সেখানেই হিন্দি সিনেমার প্লটের মতো রোমহর্ষক গল্প শোনাতে বসলেন মাঢোক। কাউকে বললেন, ‘নেপালে একটা মিটিং হয়েছিল। বাজপেয়ী নিজে পার্টি প্রেসিডেন্ট হবে বলে হত্যার ছক কষেছে।’ একথা শুনে কেউ প্রতিবাদ করলে পরে তাঁকে মাঢোক বলেছিলেন, ‘নাগপুরে মগজধোলাই করে তোমার মস্তিস্কটা নাগ নদীতে ফেলে দেবে ওরা।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ না- করলেই নয় যে মাঢোকজি নাগপুর বলতে এখানে সঙ্ঘের হেড কোয়ার্টার আর নাগ নদী বলতে নাগপুরের সন্নিকটস্থ নদীটির কথা বলেছেন।

মাঢোকজি আরও একটি কথা হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন, গুরুজি নাকি তাঁকে মোগলসরাইতে দেখে কাঁদতে-কাঁদতে বলেছিলেন, ‘এখন থেকে জনসঙ্ঘের সমস্ত দায়দায়িত্ব তোমায় নিতে হবে।’ কয়েকদিন পরেই যখন অটলবিহারী বাজপেয়ীকে সর্বসম্মতিক্রমে পার্টি প্রেসিডেন্ট রূপে নির্বাচিত করা হয়, তখন মাঢোক অতি অবশ্যই অবাক হয়ে যান। যে গুরুজি অটলবিহারী আর রাজকুমারী কৌলের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে নারাজ ছিলেন, সেই গুরুজি এবং তাঁর নেতৃত্বে থাকা সঙ্ঘ অটলবিহারীর উত্থানের পিছনে সর্বশক্তি নিয়ে এসে দাঁড়ালেন। আসলে সময় সর্বশক্তিমান। সে যখন যাকে বেছে নেয়, তখন তাঁকে রাজা থেকে ফকির করে দিতে পারে কিংবা ফকির থেকে করে দিতে পারে রাজা। সময়ের হস্তক্ষেপে গুরুজি আর বাজপেয়ীর সম্পর্কের ক্ষত নিরাময় হয়ে এসেছিল। গুরুজি স্নেহ সম্বোধন করে অটলবিহারীকে চিঠি দিতে লাগলেন, শরীর নিয়ে খোঁজ খবর করতে লাগলেন। গুরুজি লিখতেন যাতে অটলবিহারী নিজের পেটের আলসারের সমস্যা নিয়ে সচেতন হন এবং এলোপ্যাথি ওষুধের বদলে আয়ুর্বেদিক কোনও সমাধান বেছে নেন।

দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মরদেহ দিল্লিতে আনার পরে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারি বাংলোতে রাখা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। অটলবিহারীর ছবি বৃহত্তর হয়ে উঠল এই ঘটনার পরে, কারণ তিনিই ছিলেন অন্তিম সংস্কারের সম্পূর্ণ কর্মকান্ডের কাণ্ডারি। এমন গুরুদায়িত্ব সাধারণ এত অল্পবয়েসি কাউকে দেওয়া হতো না। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের চিতাগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদেছিলেন লালকৃষ্ণ আডবানি।

১২ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৮। সংসদে দাঁড়িয়ে শ্রী বাজপেয়ী দীনদয়াল উপাধ্যায়জিকে নিয়ে বললেন, ‘হয়তো তিনি এই সংসদের সদস্য ছিলেন না, কিন্তু আজ ভারতীয় জনসঙ্ঘের যতজন সদস্য দুই হাউজে বসে আছেন, তাঁদের এই অবধি আনার কৃতিত্ব তাঁরই ছিল।’ দীনদ্যাল উপাধ্যায়জির চিতাধূম পঞ্চতত্ত্বে বিলীন হয়ে গেল বটে, কিন্তু অন্যত্র ধোঁয়া দেখা দিচ্ছিল। তা ছিল বাজেপয়ীজি আর বলরাজ মাঢোকের মধ্যে। বাজপেয়ীজি মাঢোককে ছেঁটে ফেলছিলেন। সম্ভবত তাঁর প্রেম-প্রসঙ্গে মাঢোকের টিকা-টিপ্পনী করার ব্যাপারটা তিনি ভুলে যাননি।

.

দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর দলে অটলবিহারী বাজপেয়ীর অবস্থান ক্রমশ উন্নত হচ্ছিল। একজন দেহরক্ষীও মোতায়েন করা হল তাঁর জন্যে। সেই দেহরক্ষী শিবকুমারই অটলবিহারীজিকে আমৃত্যু রক্ষা করবেন।

তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী একটু ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জনসঙ্ঘের মাঢোক যেমন সব জায়গায়, সবার মধ্যে নিজের শত্রু দেখতে পাচ্ছিলেন, কংগ্রেসের মধ্যে ঠিক সেই আচরণটাই করছিলেন শ্রীমতি গান্ধী। সদা সন্ত্রস্ত। ভয়ঙ্কর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী আর মাঢোকের এই মিলের মাঝেও অনেক ফারাক ছিল। ইন্দিরাজি ‘৬৭ সালের ভোটের আগে সারা দেশে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা হাওয়াটা আঁচ করে ফেলেছিলেন। আর সেই হাওয়ায় পাল তুলে তিনি নিজেই কংগ্রেস এস্ট্যাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি বললেন কংগ্রেস কট্টর হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৯ সালে কংগ্রেস দলটি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেল। পরে এই নীতিতে ভর করেই ‘গরিবি হটাও’ স্লোগান এল। ইন্দিরা গান্ধী নির্ধনের মসিহা রূপে অবতীর্ণ হলেন। তাঁর হাত ধরে একাধিক ব্যাঙ্কের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ হবে। বিভিন্ন রিয়াসতের রাজা-রানিদের প্রিভি পার্স বন্ধ করে দেওয়া হবে। অর্থনীতির লাগাম ধরার চেষ্টা শুরু হবে।

ইন্দিরাজির এই সব অর্থনৈতিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মোর্চা গড়ে তুলতে চাইছিলেন বলরাজ মাঢোক। সবথেকে বড় কারণ ছিল সরকারি কোষাগার থেকে রাজারাজড়াদের ভাতা দেওয়া বন্ধ করাটা। আসলে জনসঙ্ঘের পৃষ্ঠপোষক তো এই সব রাজা-জমিদাররাই ছিলেন। মাঢোক একবার জামশেদপুরে টাটার কারখানায় গিয়েছিলেন। সেখানে কিছু জিনিস দেখে তাঁর মনে দুটো কথা এসেছিল।

১. প্রাইভেট সংস্থাগুলি চুটিয়ে মুনাফা করছে।

২. রাষ্ট্রায়ত্তকরণের আড়ালে ধুঁকতে থাকা সংস্থার ক্ষতিটাকে সুন্দর ভাবে বন্টন করে দেওয়া হচ্ছে দেশের মানুষের মধ্যে। সমাজতন্ত্রের নামে সরকারি আমলা আর রাজনৈতিক নেতারা সুযোগ নিচ্ছেন।

শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ফ্রন্টেই নয়, অন্য আরও একটি দিকে মাঢোক যুগান্ত আনতে চাইছিলেন। দীনদয়াল উপাধ্যায়জির বলা একাত্ম মানবতাবাদকে তিনি অন্য মাত্রা দিতে চাইছিলেন। মাঢোক সোজা চলে গেলেন জার্মানি। সেখানে তখন ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নের দাপট চলছে। তাঁদের চান্সেলর ছিলেন হেলমুট কোল। কোল বললেন, ‘মিস্টার মাঢোক, আমি যদ্দূর জানি, আপনি ইন্ডিয়ার হিন্দু ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা। …কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্ট আর অন্যান্য লিব্রেয়াল দলগুলির প্রত্যেকটির ক্ষেত্রেই কিন্তু একটি করে আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে। ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি আর হিন্দু ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এবার নিজস্ব আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলা উচিত।’ কমিউনিস্টদের কমিউনিজম, সোশ্যালিস্টদের সোশ্যালিজম, মার্কিনদের ক্যাপিটালিজমকে টেক্কা দেওয়ার জন্যে এবার মাঢোক ইন্টিগ্রাল হিউম্যানিজমকে ধোঁয়া দিতে চাইছিলেন।

.

তবে শুধু যে বলরাজ মাঢোকই সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করছিলেন তা নয়, আরও একজন ছিলেন। এবং মাঢোকের সঙ্গে তাঁর একটা বড় মিলও ছিল। দুজনেই বিকট মেধার অধিকারী, দুজনেরই ইগো ছিল পাহাড়প্রমাণ (ছিল লিখছি, কারণ এই সময়ে দাঁড়িয়ে শ্রী মাঢোক আর জীবিত নেই)। অপর এই ব্যক্তিটি তেজস্বী সোশ্যালিস্ট নেতা শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি পজিশন ছেড়ে এদেশে ফিরে এসেছিলেন। ভারতের মতো রাষ্ট্রের হাতে কেন পরমাণু অস্ত্র থাকা উচিত, তা নিয়ে তাঁর লেখা নিবন্ধের কারণে তিনি তখন হিন্দু-রাষ্ট্রবাদীদের নয়নের মণি। মাত্র ৩১ বছর বয়সী সুব্রাহ্মণ্যন স্বামী তখন সঙ্ঘের প্রিয় হয়ে উঠেছেন। জনসঙ্ঘের অর্থনীতির খসড়া তৈরি করার দায়িত্ব তাঁকেই দেওয়া হল। তিনি ‘স্বদেশী প্ল্যান’-এর ছক কষলেন।

ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন ওয়েবপোর্টালে সার্চ করতে পারেন ‘অটলবিহারী বাজপেয়ী ভার্সেস সুব্রাহ্মণ্যন স্বামী’, অগুণতি রেজাল্ট চলে আসবে। কিন্তু যে সময়ের কথা লিখছি, সেই সময়ে বাজপেয়ী আর স্বামী একে অন্যের প্রতিপক্ষ ছিলেন না। বরং যথেষ্ট সৌহার্দ্য ছিল দুজনের মধ্যে। মারকাটারি ইংরেজি বলা হাফ-ইংরেজ স্বামীকে বাজপেয়ীজিই ধুতি প’রতে শিখিয়েছিলেন। বাজপেয়ীর ঠিকানা তখন ১ ফিরোজ শাহ রোডে। ‘৭০-৭১ সালে এমন একটা দিনও ছিল না, যখন স্বামীকে নিজের বাসায় ডাকতেন না বাজপেয়ীজি। মিসেস কৌলও স্বামীকে খুব পছন্দ করতেন। এক্ষেত্রে অবশ্য অন্য একটা বোধ কাজ করত। যেহেতু স্বামী পাশ্চাত্য সভ্যতার সঙ্গে ওয়াকিফহাল ছিলেন, তাই মিসেস কৌলের মনে হতো যে তিনি বাজপেয়ী-কৌল সম্পর্কটাকে যোগ্য সম্মান দেবেন। যদিও বাজপেয়ী-স্বামীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী হতে চলেছিল। তার বড় কারণ ছিল স্বামী কাউকে ভয় পেতেন না, এবং কোনও বিষয়ে বলার সময়ে নিজেকে কীভাবে তুলে ধরতে হয় সেটা খুব ভালোরকম জানতেন। আর হয়তো এই জন্যই বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন বাজপেয়ী। নিজের দলে নিজের রাজনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলতে কোন নেতাই বা চাইবেন?

আরও একটা বড় কারণে জনসঙ্ঘ ইন্দিরাজির অর্থনীতির বিরুদ্ধাচরণ করতে চাইছিল। সাতের দশকে বোম্বের অনেক ব্যবসায়ী জনসঙ্ঘকে চাঁদা দিচ্ছিল। তারা ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ মানতে চাইছিল না। নিজেদের ব্যবসায়িক লাভটাই ছিল তাদের কাছে মূল বিষয়। বিদেশের বহুজাতিক কোম্পানির আগমনকে আটকে ব্যবসায় একাধিপত্য কায়েম রাখার জন্যে তারা ছল-বল-কৌশল প্রয়োগ করতে পিছপা হচ্ছিল না।

এই সকল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগের মূল সূত্রধার ছিলেন চণ্ডিকাদাস অমৃতরাও নানাজি দেশমুখ। আগেই বলেছি, তিনি ছিলেন জনসঙ্ঘের খাজাঞ্চি। শোনা যায়, দলের জন্যে চাঁদা জোগাড় করতে তিনি ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা রাজার পিছনে খালি পায়ে দৌড়তে পারতেন। নানাজির একটা বিষয় তাঁকে বাকী সকলের থেকে আলাদা করে তুলেছিল, তিনি অসম্ভব ধরণের সৎ ব্যক্তি ছিলেন। নানাজির পরে যত খাজাঞ্চিই এসেছেন, তাঁদের কাউকে একলা টাকা তুলতে পাঠানো হয়নি, সবসময়েই দুজন গিয়েছেন।

নানাজি টাটাদের থেকে টাকা এনেছেন, মফতলালদের থেকে চাঁদা জোগাড় করেছেন। আর ভি পণ্ডিত-কে নিয়ে এসেছেন। পণ্ডিত কালো টাকাকে চাদায় পরিণত করার বিপক্ষে ছিলেন। তিনি জনসঙ্ঘে তথা বিজেপিতে শুধুমাত্র চেকের মাধ্যমে চাঁদা দেওয়ার প্রথা চালু করিয়েছিলেন।

জনসঙ্ঘের জন্যে টাকা আসছিল, চাঁদা আসছিল। এবং আরেকজন জনসঙ্ঘের খুব কাছাকাছি আসছিলেন। তিনি একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী। তাঁর ব্র্যান্ড তৎকালীন ভারতের ঘরে-ঘরে বা বলা ভালো শোওয়ার ঘরের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। ধর্মে পার্সি এই ব্যক্তির পরিবার ব্রিটিশ ভারতেই বিত্তশালী হয়ে ওঠে। তাঁর কোম্পানির নাম বোম্বে ডায়িং। ওয়াডিয়া গ্রুপের তদানীন্তন কর্ণধার নুসলি ওয়াডিয়ার পরিচয় দেওয়ার জন্যে এসব কিছুই যথেষ্ট নয়। জনসঙ্ঘের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা এই ব্যক্তির আরেকটা বড় পরিচয় রয়েছে। তিনি ভারত ভাগের কাণ্ডারি স্বর্গত মুহম্মদ আলি জিন্নাহ সাহেবের নাতি। নুসলি হলেন রোটি জিন্নাহ আর মুহম্মদ আলি জিন্নাহর মেয়ে ডিনা জিন্নাহর সন্তান।

মুহম্মদ আলি জিন্নাহ নিজে একজন অমুসলিমকে বিয়ে করলেও যখন তাঁর মেয়ে ডিনা সেই একই কাজ করে পার্সি নেভিল ওয়াডিয়াকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, তখন মুহম্মদ আলি সাহেব যারপরনাই ক্ষুণ্ণ হন। মুহম্মদ আলি জিন্নাহ তো চলে গেলেন পাকিস্তানে, ডিনা রয়ে গেলেন এদেশেই। ডিনার সাথেই থেকে গেল নুসলিও। নুসলির বাবা নেভিল নুসলিকে বারবার বলতেন রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে। পরিবারের একজন রাজনেতা পরিবার আর দেশের বড় ক্ষতি করেছিলেন বলেই তাঁকে মানা করা হতো। কিন্তু নিয়তিতে যা থাকবে, তাকে কে খণ্ডাবে? নুসলির সঙ্গে জনসঙ্ঘের তার জুড়ছিল। মুসলি অনেককে এনে জনসঙ্ঘের সঙ্গে জুড়ছিলেন। জাহাঙ্গীর রতনজি দাদাভাই টাটাকে জনসঙ্ঘের সঙ্গে নুসলিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কী অদ্ভুত, যে পাকিস্তান নিয়ে আজ এত হইচই হয়, সেই পাকিস্তানের স্রষ্টার রক্তই আবার কোনও-না- কোনও ভাবে এদেশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছিল। হয়তো এটাই অমোঘ বিধান ছিল বিধাতার। আসলে সময় সবাইকেই সবকিছু নিজের ছন্দে ফিরিয়ে দেয়।

.

জনসঙ্ঘের দরকার ছিল প্রচার। প্রচারের জন্য প্রয়োজন ছিল মাধ্যম। নানাজি দেশমুখ বুঝেছিলেন খবরের কাগজ আর পত্রিকার মাধ্যমে প্রচার করতে হবে, কারণ রেডিও আর টিভির মঞ্চ তখন কংগ্রেসী সরকারের দখলে। আরএসএস আগে থেকেই পাঞ্চজন্য চালাচ্ছিল। পাঞ্চজন্য ছিল হিন্দি সাপ্তাহিক। সঙ্ঘের পক্ষ থেকে আরও দুটো কাগজ চলত, মরাঠি দৈনিক তরুণ ভারত, আর ইংরেজিতে পাক্ষিক পত্রিকা অর্গানাইজার। নানাজি চাইছিলেন ইংরেজিতে একটি দৈনিক সংবাদপত্র বেরোক, তাহলে জনসঙ্ঘ শহুরে মানুষদের কাছাকাছি যেতে পারবে আরও বেশি করে। নতুন একটি সংবাদপত্র জন্ম নিল। মাদারল্যান্ড। সম্পাদক হলেন কে আর মালকানি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন বীরেন্দ্র আর কুমি কপূর। খবরের কাগজটির প্রধান কার্যালয় ছিল উত্তর দিল্লির দীনদয়াল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একতলা আর দোতলা জুড়ে। নানাজি নিজেও ওই বাড়ির ছ’তলায় থাকতেন। বিজ্ঞাপন ছাড়া কাগজ চলে না। সরকারে কংগ্রেস থাকা মানে জনসঙ্ঘের কাগজে সরকারি বিজ্ঞাপন আসবে না, এবং কোনও ব্যবসায়ীও ওই কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলটির চক্ষুশূল হতে চাইবে না। এক ব্যবসায়ী বললেন, আমি আপনাদের কাগজকে কিছু টাকা দান করতে চাই। মালকানি নারাজ, ‘দিলে চেকেই টাকা দিতে হবে। বিজ্ঞাপন দিন না, মশাই।’ ভদ্রলোক টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপনের জায়গাই কিনে নিলেন অগত্যা। বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হল। ক’দিন পরে কংগ্রেসের কোনও এক বড় নেতা ওই ব্যবসায়ীকে বললেন, সেদিন দেখলাম মাদারল্যান্ডে আপনার কোম্পানির বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। সমঝদার কো ইশারা হি কাফি হ্যাঁয়। ব্যবসাদার মানুষ, নেতার কথার ওজন এবং অর্থ বুঝে নিয়ে আর ওমুখো হলেন না। এমতাবস্থাতেও কিন্তু মাদারল্যান্ড শুধুমাত্র একটি কোম্পানির বিজ্ঞাপনে ভর করে চলেছিল। বোম্বে ডায়িং নিয়মিত বিজ্ঞাপন চালিয়ে গিয়েছিল। নেপথ্যে ছিলেন নুসলি ওয়াদিয়া।

.

ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনীতিতে সোশ্যালিস্ট ছোঁয়া ছিল। মাঢোক এবং স্বামী ব্যক্তিগত ভাবে তার বিরোধ করছিলেন। জনসঙ্ঘ সুকৌশলে পুঁজিবাদকে না –ছেড়েও ছেড়ে দেওয়ার ভান করছিল। ছয়ের দশকের একেবারে শেষ দিকে শ্রীমতি গান্ধী ১৪টি ব্যাঙ্কের রাষ্ট্রায়ত্তকরণের প্রক্রিয়া শুরু করে দিলেন। তখন গ্রামেগঞ্জে প্রচুর ছোট- বড় শিল্প উদ্যোগ মাথাচাড়া দিচ্ছিল। দরকার অনেক টাকা। টাকা কোথায় মিলবে? ঋণ নিলে মিলবে। ঋণ কে দেবে? যদি ব্যাঙ্ক দেয়? দিলে তো ভালোই। ইন্দিরা গান্ধী এই সুযোগটাকেই কাজে লাগালেন। সংসদে ব্যাঙ্কগুলির রাষ্ট্রায়ত্তকরণের প্রস্তাব পেশ করা হল। মাঢোক বিরোধ করলেন, ‘মানুষ ঋণ নিতে গিয়ে ঘুষখোর ব্যাঙ্ক আধিকারিকদের পা চাটতে বাধ্য হবে।’ কিন্তু মাঢোকের সতীর্থ বাজপেয়ী একটু অন্য সুর ধরলেন, ‘অধ্যক্ষ মহোদয়, যদি এই পদক্ষেপ জনস্বার্থে করা হয়, তবে জনসঙ্ঘ এই রাষ্ট্রায়ত্তকরণের বিরোধ করবে না।’ জনসঙ্ঘ আসলে মঝঝিম বা মধ্যপন্থা নিয়েছিল। নীল নকশা ঠিক রেখে রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করলে কোনও বিরোধ করা হবে না তা বুঝিয়ে দিয়েছিল। তবে সংসদে যখন এই নিয়ে ভোটাভুটি হয়, তখন জনসঙ্ঘের কোনও সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। মাঢোক আবার এই সিদ্ধান্ত দেখে বাঁকা কথা শোনাতে ছাড়লেন না।

মাঢোককে নিয়ে একদিকে যেমন বাজপেয়ীজির চাপ বাড়ছিল, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এক বন্ধুর জন্ম হচ্ছিল। আডবানি ততদিনে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ীর ভক্ত, কিন্তু মাঢোককে সরাতে গেলে বাজপেয়ীর একজন বন্ধুর দরকার হয়ে পড়ছিল।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাজপেয়ীর জনসঙ্ঘ ইন্দিরার সোশ্যালিজমকে স্বীকার করে নিয়েছিল। প্রখর রাজনীতিক বাজপেয়ী ভারতের হাওয়া বুঝে সেদিকেই তরী বয়ে যেতে দিয়েছিলেন। পরবর্তী কালে বাজপেয়ী যখন স্বহস্তে দেশচালনা করবেন, তখন কিন্তু তিনি সোশ্যালিজম থেকে সরে আসার বাজারনীতিকে প্রশ্রয় দেবেন। অথচ ‘৭০ সাল নাগাদ জনসঙ্ঘ ঠিক এর উলটো পথে হাঁটাকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন জুগিয়েছিল। যে পুঁজিপতিদের অর্থে জনসঙ্ঘের চাঁদা আসছিল, তাদের নীতি জনসঙ্ঘের তৎকালীন অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না। আসলে ইন্দিরার নীতির বিরোধ করা মানে ভারতের জনগণের আবেগের বিরোধ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। জনসঙ্ঘ মানুষের আবেগকে ধাক্কা দিয়ে ভোটবাক্সে তার প্রভাব দেখতে চাইছিল না। জনসঙ্ঘের অর্থনীতি কোনও আদর্শ কিংবা অর্থলোভের দ্বারা চালিত হচ্ছিল না, তাকে পথ দেখাচ্ছিল মানুষের ভোট পাওয়ার রাজনীতি।

তবে লাভ হল না। ইন্দিরা-বিরোধ না-করার ফলই ভুগতে হল জনসঙ্ঘকে। ’৭১ সালের লোকসভা ভোটে ইন্দিরা হৃত ভোট-সাম্রাজ্যের অনেকটাই পুনরুদ্ধার করলেন। ৬৯ খানা সিট বেশি পেল কংগ্রেস। কংগ্রেস বিরোধীদের হাওয়া ঝড় হতে পারল না তো বটেই, সেটা আর হাওয়াই রইল না বলতে গেলে। জনসঙ্ঘের ফল খারাপ হল। শেষ ভোটের মাত্র এক তৃতীয়াংশ সিট দখলে রাখতে পারল। ২২টি আসন। জেতা আসনের মধ্যে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সিট ছিল। তিনি জিতেছিলেন মধ্যপ্রদেশের গ্বালিয়র থেকে। বলরাজ মাঢোক দিল্লিতে লড়ে হেরেছিলেন। মাঢোক আবার বলে বেড়াতে শুরু করলেন যে, ইন্দিরা গান্ধী, ভারতের বামপন্থীরা, সোভিয়েত ইউনিয়ন আর অটলবিহারী বাজপেয়ী মিলে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হারিয়ে দিয়েছেন।

এহেন কোনও ষড়যন্ত্র হয়েছিল কিনা তা কেউ জানে না, তবে মাঢোক হেরে যাওয়াতে অটলবিহারী লোকসভায় জনসঙ্ঘের পক্ষ থেকে বৃহত্তম প্রতিনিধি রূপে মর্যাদা পেলেন।

.

’৭১ সাল ইন্দিরা গান্ধীর জীবনে একের পর এক সাফল্য আনছিল। নির্বাচনের জয় এল। তারপর এল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ভাগ। বাংলাভাষী পূর্ব পাকিস্তান কিছুতেই পাকিস্তানের আধিপত্য মেনে নিতে পারছিল না। পঞ্জাবি মুসলিম সেনা নামিয়ে নরহত্যা ঘটানো হচ্ছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে এসে শরণ নিচ্ছিলেন। এমন একটা পরিস্থিতির উদ্রেক হল যে, ইন্দিরা গান্ধী কিছু না করলেই নয়। মুক্তি বাহিনী তৈরি করার জন্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু মানুষ ভারতে এসে প্রশিক্ষণ নিতে লাগল। ভারত বলছিল, আমরা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের জঘন্য অত্যাচার থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে ওদের সাহায্য করছি। পাকিস্তান বলছিল, ভারত জঙ্গী তৈরি করে পাকিস্তানকে ভাঙতে চাইছে। মুক্তি বাহিনী ভারতের সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বাংলাদেশের জন্ম দিল। এই ঘটনার প্রায় বিশ সাল পরে এই একই যুক্তি এবং পদ্ধতিতে পাকিস্তান ভারতকে আঘাত করবে। নব্বইয়ের দশকে কাশ্মীরিদের জঙ্গী প্রশিক্ষণ দিয়ে ভারতকে তারা ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে।

জিন্নাহ ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করে পাকিস্তানের জমি বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন। ভারত ৪৭-৪৮ সালে পাকিস্তানের জঙ্গীপনায় উত্যক্ত হয়েছিল। ‘৬২ সালে চিনের সঙ্গে যুদ্ধে হেরেছিল। ‘৬৫ সালের যুদ্ধে না-হারলেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঠিক প্রথামাফিক জয় লাভ করতে পারেনি। কিন্তু ‘৭১- এর যুদ্ধে ভারত জিতেছিল। সোজাসাপটা পরাজয় ছাড়া এটাকে আর অন্য কিছু বলার পথই ছিল না পাকিস্তানের কাছে। ভারত পাকিস্তানকে হাড়েহাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, যে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল, সেই ধর্মও কিন্তু পাকিস্তানকে অটুট, অক্ষত রাখতে পারল না। অটলবিহারী বাজপেয়ী শ্ৰীমতি ইন্দিরা গান্ধীর প্রশংসা করলেন। মিডিয়া লিখতে থাকল বাজপেয়ী শ্রীমতি গান্ধীকে দুর্গা বলেছেন। পুপুল জয়কর অনেক পরে যখন ইন্দিরা গান্ধীর জীবনী লিখতে শুরু করলেন, তখন তিনি অটলবিহারী বাজপেয়ীর কাছে যান। দুর্গা প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চেয়ে সম্মতি আদায় করার অনেক চেষ্টা করেন। বাজপেয়ী বলেন, ‘আমি একথা কখনও বলিনি।’ পুপুল জয়কর সংসদ সদনের সমস্ত রেকর্ড খুঁজে দেখেন, কিন্তু কোথাও এই প্রসঙ্গের উল্লেখ মেলে না। ইতিহাসের এই দুর্গা পৰ্ব অলিখিতই রয়ে যায়। তবে আমৃত্যু ইন্দিরা গান্ধীর দুর্গা অবতার বাজপেয়ীজির পিছনে প্রশ্ন হয়ে তাড়া করে বেরিয়েছে। তাঁকে হাফ-কংগ্রেসী বলা হয়েছে, আর তিনি সমানে বলে গিয়েছেন, ‘ম্যায়নে দুর্গা নহিঁ কাঁহা …’

.

’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক জমিকে শক্ত করে তুলেছিল। তাঁর জনমোহিনী পদক্ষেপ তাঁর জনপ্রিয়তাকে বাড়িয়েই চলেছিল। লোকসভা নির্বাচনের জয় তো ছিলই। এই সবকিছু অটলবিহারী বাজপেয়ীকে দারুণ ভাবে প্রভাবিত করছিল। বছর তিন-চার ধরে যখন বাজপেয়ী নিজের হাতে জনসঙ্ঘের রাশ ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এইসব পরিস্থিতি তাঁকে ক্রমাগত পুনর্বিচার করতে বাধ্য করছিল সঙ্ঘ আর জনসঙ্ঘের নীতিগুলোকে নিয়ে— সঙ্ঘের আদর্শ আর জনসঙ্ঘের রাজনৈতিক বিজয়কে কি এক সেতুতে বাঁধা সম্ভব? তাঁর মনের মন্থনে যে সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসবে সেই সুতো ধরেই পরবর্তী তিন দশক ধরে হাঁটবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ।

১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে একটি ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্রে সঙ্ঘের জনৈক স্বয়ংসেবকের একটি লেখা প্রকাশিত হল। হইচই পড়ে গেল সেই লেখাটিকে দেখার পর। বলা হয়েছিল, সঙ্ঘ আর জনসঙ্ঘের সামনের এখন দুটো পথ খোলা রয়েছে। তারা তাদের আদি নীতিতে অটল থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে সশক্ত বিরোধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলটির ওপরে চাপ সৃষ্টি করা যাবে। অন্য পথ ধরতে হলে তাদের পুরোনো আদর্শের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে, তবেই ক্ষমতায় আসা সম্ভব।

কে লিখেছিলেন এই নিবন্ধ?

স্বয়ং অটলবিহারী বাজপেয়ী।

নাগপুর থেকে ডাক এল। অটলজিকে ডেকে পাঠালেন গুরুজি গোলওয়ালকর। নিজের মতের ব্যাখ্যা দিতে বলা হল। বাজপেয়ী বললেন যে, হিন্দুরা আদপে নরমপন্থী। কোনও কট্টরপন্থাকে তারা গ্রহণ করবে না। সঙ্ঘের বহুজন অটলবিহারীর কথার বিরোধ করলেন। এসব আলোচনার মধ্যে দুপুরের খাওয়া হল। ভোজন শেষ করে আবার পর্ব শুরু হল। গুরুজি বললেন, ‘আমি অটলজির সঙ্গে এ ব্যাপারে সহমত যে পুরোনো আদর্শ নিয়ে চলতে থাকলে ক্ষমতায় আসা কঠিন। কিন্তু একথাও বলব না যে, কখনোই ক্ষমতায় আশা সম্ভব হবে না।’ রাজনীতির জ্ঞানে ধনী গুরুজি ইংল্যান্ডের লেবার পার্টির প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। স্পষ্ট উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে ছাড়লেন, কনজারভেটিভদের তৈরি করা ওয়েস্টমিনিস্টার সিস্টেমেও কীভাবে তারা জয়ী হয়েছে। তবে সেইদিনে, সেই মুহূর্তে গুরুজি তথা সঙ্ঘ বাজপেয়ীর নেতৃত্বে আদর্শে ফেরবদল করে রাজনৈতিক বিজয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন।

সম্ভবত বাজপেয়ীজির চিনে নেওয়া পথ ঠিকই ছিল। সেদিনের সেই অলিখিত চুক্তির ডানায় ভর করে পরের প্রায় তিরিশ বছর ধরে হিন্দুর রাজনৈতিক চিন্তা ও হিন্দুত্বের রাজনীতি সমান্তরাল ভাবে চললেও মিলেমিশে যাবে না। নীরবে এক অদ্ভুত মঝঝিম পন্থার জন্ম হল। হিন্দুত্বের রাজনীতি পার্টির ক্যাডারদের উদ্বুদ্ধ করবে, আর হিন্দুর রাজনৈতিক চিন্তা আনবে দলগত জয়। বহুবার রাজনৈতিক দল রূপে জনসঙ্ঘ কিংবা ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে সঙ্ঘ ও বিহিপ-এর মতানৈক্য ঘটবে, কিন্তু কখনোই রাজনৈতিক ফ্রন্টকে জলাঞ্জলি দিয়ে আদর্শের কট্টর খুঁটি আঁকড়ে ধরে থাকবেন না সঙ্ঘ বা বিহিপ-এর শীর্ষ

নেতৃত্ব। অটলবিহারীর তর্ক মেনে চলতে চলতে একসময় পদ্ম ফুটবে বটে, সেই পদ্ম মূর্ছাও যাবে। ২০০২ সালে আবার এক নতুন মহারথীর হাত ধরে ফিরে আসবে গুরুজি গোলওয়ালকরের বক্তব্যের শেষ পঙক্তি, ‘…কিন্তু একথাও বলব না যে, কখনোই ক্ষমতায় আসা সম্ভব হবে না।’ গোধরা দাঙ্গা পরবর্তী বিধানসভা ভোটে জিতে গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রমাণ করে দেবেন গুরুজির বলা কথাও ভুল ছিল না।

*****

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%