অভীক মুখোপাধ্যায়
কেয়া হার মেঁ, কেয়া জিত মেঁ
কিঞ্চিৎ নহিঁ ভয়ভীত ম্যায়
-কবি শিবমঙ্গল সিং ‘সুমন’
.
২০০৩ সাল ভারতের ইতিহাসের একটি সোনালি বছর। নাতিবৃষ্টি, খরাও ছিল না, একেবারে ঠিকঠাক ফসল ফলেছিল। সেনসেক্স ঊর্দ্ধমুখী হয়ে থেকেছে। আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। টেলি কমিউনিকেশন এবং সড়ক যোগাযোগে বিপ্লব ঘটেছে। ভারতের অর্থনীতি উন্নত হয়ে হয়ে উঠছিল বলেই দাবি করছিলেন অর্থনীতিবিদের দল। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছিল, মোবাইল ফোন, চারচাকার গাড়ি, দ্বিচক্রযান এবং হাতে নগদ অর্থের আমদানি বলছিল সব ঠিকই চলছে। টিভি চ্যানেলগুলোতে তখন নিয়মিত বিভিন্ন গেম শো চলছে, মানুষ ফকির থেকে ঝপ করে ক্রোড়পতি হয়ে যাচ্ছিল। মধ্যবিত্তের জীবনে ফীলগুড ফ্যাক্টর রূপে বেড়ে চলেছিল শপিং মলের হাতছানি, ঝাঁ-চকচকে রেস্তোরাঁর খাবারের সুগন্ধ। বাজপেয়ী তখন ভারতীয় রাজনীতির পিতামহ। তাঁকে টিভির পর্দায় দেখলে তখন দেশের মানুষ বাপ-ঠাকুরদাকে খুঁজে পাচ্ছিল। হিন্দুর কাছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী, অন্যান্যদের কাছে সেকুলার। তাঁর ভাষণ মানে গীতার অটল বাণী। দলের কাছে তিনি বিজয়ী অর্জুন। অন্তত প্রধান বিরোধী দলের ভাঙা-ভাঙা হিন্দি বলা নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর তুলনায় তিনি হিমালয়ের মতো বিরাট।
এত এত কিছু অস্ত্র রূপে যার তৃণীরে রয়েছে, সেই অটল কী কারণে বিরোধীদের নিয়ে ভয় পাবেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন? শুধুমাত্র দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তখন অটলের প্রকাণ্ড ভাবমূর্তি। এপ্রিল ২০০৩-এ তিনি শ্রীনগরের একটি সভা থেকে পাকিস্তানের জন্য বুকভরা সৌহার্দ্যই রেখেছেন। কাশ্মীর ইস্যুতে তাঁর দেওয়া ইনসানিয়ত, জমহুরিয়ত, কাশ্মীরিয়তের তত্ত্বের কথা তখন সর্বত্র। মে মাসে রাশিয়া গেছেন। সেখানে সেন্ট পিটার্সবার্গের ৩০০তম প্রতিষ্ঠা দিবসে ভ্লাদিমির পুতিন এবং জর্জ ডব্লিউ বুশ জুনিয়রের সঙ্গে এক টেবলে বসেছেন। জুন মাসে হঠাৎ চিনে গিয়ে ওয়েন জিয়াবাও-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দু-দেশের সমস্যাসঙ্কুল সীমানা নিয়ে আলোচনা সেরেছেন, তিব্বতের কথা পেড়েছেন, জিয়াবাও-কে ভারতের আম খাইয়েছেন, চিনদেশে যাতে বলিউড মুভির রপ্তানি বাড়ানো যায় তাতে সচেষ্ট হয়েছেন। জুলাই মাসে আমেরিকা যখন ইরাকে হানা দিয়েছে, তখন প্রাথমিকভাবে ইরাকে ভারতীয় সৈন্যদের টুকরি পাঠানোর একটা আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও বিরোধীদের মতামত নিয়ে ইরাকে সৈন্য পাঠানো থেকে দেশকে বিরত রেখেছেন। তবে এর ফলে যে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে এমনও হয়নি। সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে ইউনাইটেড নেশন্স –এর জেনারেল অ্যাসেম্বলি মিটিং-এ গিয়ে তিনি বুশ সাহেবের সঙ্গে লাঞ্চও করেছেন। এই সেপ্টেম্বর মাসের গোড়ার দিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন ভারতে এসেছেন। এবং এখানে মনে রাখার মতো ব্যাপার হল ভারতে আগত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে শ্যারনই ছিলেন প্রথম। আবার এই শ্যারন যখন বাজপেয়ীকে বলেছেন যে, প্যালেস্তাইনের ইয়াসের আরাফাতকে ব্ল্যাক লিস্টেড করুন, তখন তা এড়িয়ে গেছেন বাজপেয়ী, তিনি নিজের সীমানা খুব ভালোভাবে জানতেন। বাজপেয়ী সিরিয়াতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে আরব দেশগুলির মৈত্রীকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। অক্টোবরে যখন বালিতে গেছেন, সেখানে তাঁকে রেড কার্পেট সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছে। আধুনিক ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীকে সারা বিশ্ব অতিথি রূপে আপ্যায়ণ করছিল।
আডবানি, বাজপেয়ীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা প্রমোদ মহাজন, ভাজপার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভেঙ্কাইয়া নাইডু প্রত্যেকেই বলছিলেন ভোট এগিয়ে আনা হোক। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন ভাজপার গুরুত্বপূর্ণ জোটসঙ্গী চন্দ্রবাবু নাইডু নাইডু তখন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী।
চন্দ্রবাবু তখন পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল মুখ। দেশে-বিদেশে সবাই জেনে গেছে হায়দ্রাবাদকে তিনি ‘সাইবারবাদ’ বানিয়ে দিয়েছেন। ভারতের আইটি ইন্ডাস্ট্রির অপর নাম তখন চন্দ্রবাবু। ২০০০ সালে বিল ক্লিন্টন নিজে সাইবার সিটি ঘুরে দেখে আসতে গিয়েছিলেন। ‘চন্দ্র’-ছটায় ঢাকা পড়ে গেছে অন্ধ্রপ্রদেশের বেশ কিছু জ্বলন্ত ইস্যু। অবশ্য অন্ধ্রে তখন বড় বাড়ি, বড় গাড়িগুলো আরও বড় হচ্ছিল, চাপা পড়ে যাচ্ছিল গ্রামের অনুন্নয়ন। চন্দ্রবাবুও সেইসব অনুন্নয়নকে উপেক্ষা করে বসে ছিলেন।
নাইডু বাড়তি একটা স্পটলাইটও পেয়েছিলেন। ২০০৩ সালে তিরুপতি মন্দিরে যাওয়ার পথে তাঁর ওপরে মাওবাদীরা আক্রমণ করে, অল্পের জন্যে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর কনভয়ে মাইন বিস্ফোরণ ঘটে, বুকে, মুখে আঘাত লাগে। নিজের হাই-টেক ইমেজের পাশাপাশি সহানুভূতির ঢেউকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভোট নামক বৈতরণীটিকে পার করে নিতে চাইছিলেন। আসলে সেবারে দেশের সাধারণ নির্বাচনের সমান্তরালে অন্ধ্রপ্রদেশের বিধানসভার ভোটও হওয়ার কথা ছিল।
তদানীন্তন ডেপুটি-প্রাইম মিনিস্টার আডবানিও নিজের হিসেবমতো ভোট করাতে চাইছিলেন। তাঁর সামনে তখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার হাতছানি ছিল। জনসমক্ষে অটলবিহারীকে মুখ করা হলেও অটল ঘনিষ্ঠ মহলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি কিছুটা ক্লান্তই। ২০০৪ সালের নির্বাচনে জিতলে আডবানির হাতে ব্যাটন ট্রান্সফার করে দিয়ে তিনি সিংহাসন ছেড়ে দেবেন। তাছাড়া কয়েক মাস আগেই রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশের বিধানসভায় ভাজপার জয়ের পরে ওপিনিয়ন পোল বলছিল, তখনই ভোট হলে এনডিএ ৩৩০+ আসন পাবে।
আডবানি আরও একটি রথযাত্রা করবেন বলে ঘোষণা করলেন। তবে মানুষ যদি ‘রথ’ শব্দটাকে শুধুমাত্র হিন্দুত্বের দ্যোতক ভেবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাই সচেতনভাবে আডবানির পক্ষ থেকে বলা হল, ‘এটা রথ যাত্রা নয়, শুধুই একটা যাত্রা হতে চলেছে।’ নামকরণ হল ‘ভারত উদয় যাত্রা’। ঠিক হল ৭৭ বছরের আডবানি দেশের দক্ষিণে কন্যাকুমারী থেকে শুরু করে ১২০০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে উত্তরে অমৃতসর পর্যন্ত যাবেন। পথে ১২১টি লোকসভা আসনের এলাকা পড়বে। প্রাইম মিনিস্টার-ইন-ওয়েটিং নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা বোঝানোর জন্য দক্ষিণ থেকে উত্তরের পথটাকেই বেছে নিলেন।
আডবানির এবারের যাত্রা রামরথযাত্রার থেকে কয়েকটা বিষয়ের আঙ্গিকে ভিন্নই ছিল। তিনি গতবারে গুজরাতের সোমনাথ মন্দির থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। এবারে করলেন কন্যাকুমারী থেকে। আজমেঢ় শরীফের দিওয়ান আডবানির হাতে শাল তুলে দিলেন, তামিলনাড়ু আর কেরালার খ্রিস্টান পাদ্রীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, উপস্থিত ছিলেন বেশ কয়েকজন মুসলিম রাজনেতাও। এবারের যাত্রায় অযোধ্যা, কাশ্মীর ইত্যাদি শব্দ তাঁর সঙ্গী ছিল না। তিনি কেবল বিগত ছ’বছরে বাজপেয়ী সরকারের কৃতিত্বগুলোকেই গোণাচ্ছিলেন। উন্নয়ন, সুশাসন আর শান্তির কথা বলছিলেন।
এই যাত্রার হয়তো আরও একটা কারণ ছিল। নিজের ওপর থেকে আলোর বৃত্ত জাতে না সরে যায় তাতেই সচেষ্ট ছিলেন অটলবিহারী বহু যুদ্ধের সেনাপতি আডবানি। একটা কথা মানতেই হয়, আডবানি না থাকলে অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা হয়তো হতোই না। কিন্তু এতদিন ধরে করা তাঁর ব্যক্তিগত আদর্শের রাজনীতি ছাপিয়ে দ্রুত উঠে আসছিল কিছু নতুন মুখ। যেমন ছিলেন প্রমোদ মহাজন। আত্মবিশ্বাসে ভরা তরুণ তুর্কি। কেতাদুরস্ত মহাজনকে সবসময় হাসিমুখে দেখা যেত। বাজপেয়ী সরকারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পোর্টফলিও হোল্ড করেছেন। পলিটিক্যাল ম্যানেজমেন্টের বিশারদ। সঙ্ঘের পৃষ্ঠভূমি থাকলেও বাহ্যিক রূপে মহাজন ছিলেন স্বয়ংসেবকদের অ্যান্টিথিসিস। সদা হাতে সেলফোনধারী ভাজপার এই বিশ্বকর্মাকে মিস্টার ফিক্সিট বলা চলে, যিনি দলের যে কোনও আপদ বিপদকে সামাল দিতে প্রস্তুত থাকতেন। বিজনেস টাইকুনরাও মহাজনকে সমীহ করতেন। যুগোপযোগী ব্যাকরুম তৈরি করে স্মার্ট ইলেকশন করানোর গুরুদেব।
মহাজন একটি ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘আমি চাই বাজপেয়ী ভারতের এমন প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন, যিনি চারবার শপথ নিয়েছেন। ‘৫২ সালের পর থেকে হওয়া নির্বাচনের মাধ্যমে কেউ চারবার প্রধানমন্ত্রী হননি। আমি চাই, বাজপেয়ী সেই রেকর্ডটাকে ভেঙে দিন।’ আডবানির ‘প্রচারক ভাজপা’ থেকে ‘পাঁচতারা বিজেপি’ হয়ে ওঠা দলের নতুন মুখ ছিলেন মহাজন। কুর্তা-পায়াজামাতে তিনি যেমন সাবলীল, নকশাকাটা শার্টে তেমনি স্মার্ট, আবার স্যুট-বুট প’রলে দর্শনদারী আরও খুলে যেত ভদ্রলোকের।
মহাজন ভাজপার ২০০৪ নির্বাচনের মিডিয়া ম্যানেজার হয়ে কাজ করছিলেন। আডবানির ‘ভারত উদয়’ শব্দের অনুবাদস্বরূপ ‘India Shining’ স্লোগান চালু করলেন। সরকারের বিভিন্ন সাফল্যকে নিজের মানসপুত্র ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’-এর মাধ্যমে মহাজন পেশ করছিলেন। বাজপেয়ীর ব্যক্তিত্বের উচ্চতা বাড়ছিল। এই প্রথম ভারতের কোনও নির্বাচনের জন্য একটি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন চালু হল। ফোনের রিসিভার কানে দিলেই রেকর্ড করা ভয়েস মেসেজ শোনা যাচ্ছিল, ‘ম্যায় অটলবিহারী বাজপেয়ী বোল রহা হুঁ…’। মহাজন বলছিলেন, ‘It’s not just an election with There is No Alternative (TINA) fac- tor, it’s an election with the TITA (There is The Atal) factor.’
দিল্লির সাত নাম্বার সফদরজং রোডের ঠিকানাতে মহাজন থাকতেন। তাঁর বাসভবন সারাদিন মুখরিত থাকত কর্মীদের গুঞ্জনে। প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে উন্নত কম্পিউটার, ইন্টারনেট দিয়ে ওয়াররুম সাজানো হয়েছিল। মার্বেলের মেঝেতে ঠিকরে পড়ত আলোর দ্যুতি, ভেসে আসত শীতাতপ যন্ত্রের ঠাণ্ডা হাওয়া। ভাজপার ‘মিশন ২০০৪’ ওয়েবসাইট জন্ম নিয়েছিল এই ঘর থেকেই। দলীয় কর্মীদের দায়িত্ব ভাগ করে দিনের অন্তত ১৪ ঘণ্টা খবরের দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছিল। সেখান থেকে ‘নেতিবাচক’ সমস্ত রিপোর্ট, সমস্ত বক্তব্য বাছাই করে নেওয়া হতো আত্মমূল্যায়নের জন্য। ২৫ লক্ষ ইমেইল আইডি আর ১৫,০০০ ফোন নাম্বারের ডেটাবেস তৈরি করে ইমেইল আর এসএমএস পাঠানো হয়েছিল। কলসেন্টার তৈরি হয়েছিল। টি-শার্ট, ক্যাপ, কফিমাগের গায়ে দলের বিজ্ঞাপন ছাপা হল। কমবয়েসিরা যেসব প্রাইভেট চ্যানেল বেশি দেখত, সেগুলোতে দলীয় বিজ্ঞাপন ভেসে উঠতে লাগল। টিভির বিতর্ক সভায় অংশগ্রহণের জন্য দলের বক্তাদের উৎসাহী করা হচ্ছিল।
‘ভারত উদয়’ থেকে ‘India Shining’ না হয়ে ‘India Rising’ হলে হয়তো শোনাতো ভালো। স্বপন দাসগুপ্ত বলেছেন, ‘আডবানি রোনাল্ড রিগানের ‘It’s Morning Again in America’ বিজ্ঞাপনটাকে মাথায় রেখেই অনুপ্রেরণা টেনেছিলেন।’ প্রথমবারে রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ করার পর ‘৮৪ সালের ভোটে ফিরে আসতে রোনাল্ড এই বিজ্ঞাপন ব্যবহার করেছিলেন। আডবানিও ২০০৪ সালে দলকে সরকারে ফিরিয়ে আনতে চাইছিলেন। সরকারের অপূর্ণ কাজকে পূর্ণ করে ২০২০ নাগাদ ভারতকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করা হবে এই সংকল্প নিয়ে ভাজপা প্রস্তুত হল। এনডিএ প্রস্তুত হল।
১২ই মার্চ ২০০৪। ‘ফ্রন্টলাইন’ ম্যাগাজিন খবর ছাপল যে, সেনসেক্স যাই বলুক, দেশের ৬৫% মানুষের কাছে তখনও ব্যাংক অ্যাকাউন্টই নেই এবং দশ লক্ষ কৃষক দেনার দায়ে জর্জরিত, অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। বাজপেয়ীর কাছে হয়তো এই খবর পৌঁছেও ছিল।
বাজপেয়ীর মন বলছিল ভোট এগিয়ে আনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাঁর চুল রোদে সাদা হয়নি। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা, দেশে-বিদেশে ঘোরার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া জ্ঞানভাণ্ডার, মানুষকে দেখার চোখ তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে শোনার আকুল আকুতি জানাচ্ছিল। যদিও তিনি দলের রায়কে মাথা পেতে নিয়েছিলেন।
অরুণ শৌরি যে বিজয়রথ চালিয়েছিলেন হয়তো তার কথাও মানুষ ভোলেনি।
নির্বাচনী প্রচারের মাঝে আডবানির ভারত উদয় যাত্রার নেতিবাচক ফল পড়ছিল। এত বড় মাপের নেতা যদি যাত্রার মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তোলেন তা বৃহত্তর মঞ্চ প্রস্তুত করে বইকি। রামরথযাত্রা তার সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু সেই নেতাই যদি যাত্রায় ব্যস্ত থাকেন, তাহলে দলের প্রচার মার খায়, পরিকল্পনায় ফাঁকফোকর জন্মায়। নতুন ওপিনিয়ন পোল এল। দেখা গেল ভাজপার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে কংগ্রেস। দলের আভ্যন্তরীণ রিপোর্ট বলছিল ভাজপা নিজের সমস্ত সিটে জয় ধরে রাখতে পারবে না।
বাজপেয়ী ভিড়ের মেজাজ অনেকের থেকে অনেক বেশি ভালো বুঝতেন। সভায় ভিড় পাতলা হয়ে আসছিল। দূরদর্শন সভায় ফাঁকা জায়গাগুলোকে দেখাচ্ছিল না। বাজপেয়ী বলেছিলেন, ‘নিজেদের লোক ছাড়া আমাদের কেউ হারাতে পারবে না।’
নিজের লোকেরাই সঙ্গ ছাড়ছিল। এনডিএ থেকে আটটি দল বেরিয়ে গেল। মহাজনের মত ছিল যে, তারা স্থানীয় সমস্যার বেরিয়ে যায়, নেতৃত্ব নিয়ে সমস্যা হয়নি, জোট অসফল হওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। এনডিএ-এর জোটসঙ্গীরা বাজপেয়ীকে দেখে এসেছিল। যেমন ‘৯৮ -এর ভোটের জোটে ডিএমকে-এর ১২ সাংসদ প্রায় নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছিলেন। আডবানি ডিএমকে সঙ্গ পরিত্যাগ করে জয়ললিতার দলের দিকে ঝুঁকলেন। হয়তো তার মনে হয়েছিল জয়ললিতা হিন্দুত্বের দিক থেকে ভাজপার অনেক কাছাকাছি।
সোনিয়া গান্ধী একটু অন্যভাবে প্রচারে নেমেছিলেন। ভাজপার ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’-এর পালটা স্লোগান তৈরি করা হয়েছিল— ‘কংগ্রেস কা হাথ, আম আদমি কা সাথ।’ কংগ্রেস জিততে পারে শুধুমাত্র এমন আসনগুলিকেই লড়ার জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছিল। ভাজপা কিন্তু আগেরবারের চেয়ে এবারে পঁচিশটি বেশি আসনে লড়ছিল। সোনিয়ার সঙ্গে ঘুরছিলেন তাঁর ছেলে রাহুল, রাহুল প্রথমবারের জন্য অমেঠি থেকে লড়তে চলেছিলেন। বাজপেয়ী পরিস্থিতি দেখে নিজের ঘনিষ্ঠ সুধীন্দ্র কুলকর্নিকে বলেছিলেন, ‘ইয়ে দেবী ওয়াপস আ রহি হ্যাঁয়!’
.
ধাক্কাটা এল নির্বাচনী প্রচারের মাঝামাঝি সময়ে। এখনা থেকেই ভাজপা হোঁচট খেতে শুরু করল। ১২ই এপ্রিল ২০০৪। সকাল থেকে লখনউয়ের চন্দ্রশেখর আজাদ পার্কে ভিড় বাড়ছিল। ভিড়ের মুখ মহিলারা, অনেকে কোলে শিশু নিয়েও এসেছিলেন।
বাজপেয়ীর ক্যাম্পেইন ম্যানেজার তথা দীর্ঘদিনের সঙ্গী লালজি ট্যান্ডনের সত্তরতম জন্মদিন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। বিরাট শামিয়ানার নীচে মঞ্চ। মঞ্চ থেকে বেশ কিছুক্ষণ আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার পরে ঘোষণা করা হল শাড়ি বিতরণ করা হবে। খবরটা আগে থেকেই ছড়িয়েছিল, তাই সকাল থেকে গ্রহীতাদের ভিড় জমেছে।
মঞ্চের কয়েক মিটার দূরে একটা কাউন্টার, শাড়ি বিতরণের কাজটা সেখান থেকেই সারবেন উদ্যোক্তারা। বিতরণের কাজ শুরু হতেই হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধল। বেশ কয়েকজন মহিলা ধাক্কাধাক্কি, হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে বেসামাল হয়ে পড়ে গেলেন। একজনের কোল থেকে তাঁর দুধের শিশু মাটিতে ছিটকে পড়ল। ভিড় ততক্ষণে ভয়ানক রূপ নিয়েছে। বাচ্চাটা পদপিষ্ট হয়ে গেল নিমেষে। একজনের ওপরে একজন, তার ওপরে একজন এভাবে মহিলারা মাটিতে লুটোপুটি খেতে লাগলেন। যতক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এল ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গিয়েছিল। মোট একুশজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল সেদিন। নারী আর শিশুদের কান্নার আওয়াজ থামছিল না। টিভি চ্যানেলে দেখানো হচ্ছিল মৃতদেহগুলিকে কীভাবে ভ্যানে তোলা হচ্ছে। একটি কিশোরীর নিথর শরীর যখন সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন একজন রমণী এলোথেলো বেশবাসে বিলাপ করছিলেন, ‘কিঁউ গয়ি থি শাড়ি লেনে, কিঁউ গয়ি থি?’
বাজপেয়ী ঝাড়খণ্ডে প্রচার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। খবর পেয়েই সবকিছু ছেড়েছুড়ে লখনউতে দৌড়ে এলেন। সেই ‘৯১ সাল থেকে লখনউতে জিতে আসছেন, মনে আলাদা একটা জায়গা থাকবেই। নিহতদের পরিবারপিছু এক লক্ষ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ঘোষণাও করলেন। লালজি ট্যাণ্ডনকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। এই ঘটনার তিন দিন পর ১৫ই এপ্রিল বাজপেয়ী মনোনয়ন দাখিল করতে গেলেন। কারো মুখে তখন হাসি নেই। অমন একটি দুর্ঘটনার পরে শোকের ছায়া সবাইকে গ্রাস করেছিল। বাজপেয়ী সাংবাদিকদের কাছে দুঃখও প্রকাশ করলেন। সারা দেশ দেখছিল চল্লিশ টাকার শাড়ি পেতে যদি এমন হুলস্থূল কাণ্ড ঘটে, তবে ‘ইণ্ডিয়া শাইনিং’-এর সার্থকতা কোথায়? বিচক্ষণ বাজপেয়ী আঁচ করে ফেলেছিলেন কী ঘটতে চলেছে। নিজের বহুদিনের সঙ্গী শিব কুমারকে বলেছিলেন, ‘সরকার তো গয়ি। হাম হার রহেঁ হ্যাঁয়।’ শিব কুমার অবাক হলে পরে বাজপেয়ী একটু রেগেই গিয়েছিলেন, ‘কোথায় থাকেন আপনি? আমি লোকের মাঝে ঘুরছি। আমি বুঝতে পারছি। আমরা হারতে চলেছি।’
.
লখনউতে দুর্ঘটনার পর নির্বাচনী প্রচারের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হতে লাগল। বাজপেয়ীর হাবভাবে বদল আসছিল। কিছুটা ন্যুব্জ, তিক্তবিরক্ত, চিন্তিত মনে হচ্ছিল তাঁকে। টিভি ইন্টারভিউতে আসা বাজপেয়ীকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। জোটধর্ম পালন করতে করতে শ্রান্ত বাজপেয়ী একটি ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘এটাই আমার শেষ নির্বাচন।’ এবার ‘সাঁই’-এর পালা। বাজপেয়ী আডবানিকে সাঁই বলতেন। সিন্ধ্রিদের মধ্যে ভাইকে ‘সাঁই’ বলা হয়। গণতান্ত্রিক পদ্ধতির এই নির্বাচন প্রণালীতে ঢুকে পড়া অর্থ নিয়েও তিনি বিশেষ চিন্তিত ছিলেন। বলেছিলেন, ‘জনতন্ত্র ধনতন্ত্র হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই অর্থবলই ভারতের অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।’
ফল বেরোল। যে গুজরাতের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস বিপর্যয়ের পথে গিয়েছিল, সেখানে ১২টি সিট পেল। অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু মুখ থুবড়ে পড়লেন। কংগ্রেস নেতা ওয়াই এস আর রেড্ডির পদযাত্রা দলকে অনেক এগিয়ে দিল। চন্দ্রবাবুকে ৫/৪২টি সিট নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হল। ভাজপা ডিএমকে-এর সঙ্গে সমঝোতায় যায়নি, কিন্তু সেই ডিএমকে এবারে তামিলনাড়ুর আসনগুলিকে কংগ্রেসের থালায় সাজিয়ে দিল। বলা হয়, চন্দ্রবাবুর ভোট বিপর্যয় স্বত্তেও যদি ভাজপা ডিএমকে-এর হাত ধরে থাকত, তাহলে সরকার ভাজপাই গড়ত। সবথেকে বড় বিপর্যয় অবশ্য অন্যত্র বাকী ছিল। বলা হয়, দিল্লির পথ উত্তর প্রদেশ হয়ে যায়। সেই উত্তর প্রদেশেও ভাজপার ভরাডুবি হল। বিগত ভোটে পাওয়া ২৯টি আসনের জায়গায় ভাজপার স্কোরশীট এবারে মাত্র ১০টি আসনেই থমকে দাঁড়াল। বিনয় কাটিয়ার, মুরলী মনোহর জোশির মতো রাজনৈতিক দিগগজেরা হারলেন। বহুজন সমাজবাদী পার্টি নিজেদের ‘দলিত’ রাজনীতির ঊর্দ্ধে উঠে সবর্ণ ভোটেও ভাগ বসিয়েছিল। অবস্থা এমন হল যে ইউপি-তে পিছোতে পিছতে সপা, বসপার পর তিন নাম্বারে গিয়ে দাঁড়াল ভাজপা। ঝাড়খণ্ডের হাজারীবাগের সিট থেকে যশবন্ত সিনহা হারলেন। রাম নাইকের মতো প্রবীণ রাজনীতিক রাজনীতিতে হামাগুড়ি দিতে শেখা (অভিনেতা) গোবিন্দার কাছে হেরে গেলেন। বাজপেয়ীজিতলেন, কিন্তু ফুলের দল সেবারের জন্য মূর্ছা গেল।
.
নেটফ্লিক্স-এ একটি অসাধারণ ওয়েব সিরিজ আছে। ‘The Crown. ব্রিটেনের মহারানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে কেন্দ্র করে কীভাবে ব্রিটেন তথা বিশ্বের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছিল তাই নিয়ে এই সিরিজ। যখন বসে আমি এই বইয়ের কাজ শেষ করছি, তখনও পর্যন্ত পাঁচটি সিজন সম্প্রসারিত হয়েছে। সেকেন্ড সিজনে Gor- donstoun নামক একটি স্কুলের ছাত্রদের উজ্জীবিত করার তাগিদে মহারানির স্বামী ডিউক অব এডিনবরা, ফিলিপ বলেছেন, ‘The ethos of Gordonstoun is to embrace the community over the individual, the team over the star’
বাজপেয়ী ছিলেন ভাজপার ‘তারকা’। দল হয়তো কখনও-কখনও তাঁকে মুখ করে এগিয়েছে, তবে তিনি কখনও নিজেকে দলের ঊর্দ্ধে রাখেননি। জয়ের পরেও তিনি যেমন বিনম্র থেকেছেন, পরাজয়ের পরেও মনে করেছেন ভারতের জনতীর্থে তিনি এমন একজন তীর্থযাত্রী মাত্র, যিনি তীর্থের শেষ বিন্দু এখনও স্পর্শ করতে পারেননি।— ‘চুনাও মেঁ কভি হারতে হ্যাঁয়, কভি জিততে হ্যাঁয়, ইসমে কেয়া হ্যাঁয়!’
বাজপেয়ীর মতো পাহাড়প্রমাণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পরাজয় সম্ভবত প্রতিপক্ষ দলগুলিকেও অবাক করে দিয়েছিল। ২০০৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ছিল ‘রঙ্ক’, আর বাজপেয়ী ছিলেন ‘রাজা’। হয়তো কংগ্রেস ভাবেনি এমন বিপর্যয়ের মুখে ভাজপা পড়বে। নির্বাচনে দলীয় বিপর্যয়ের পর তৎকালীন RAW কর্তা এ এস দুলাত বাজপেয়ীর সঙ্গে দেখা করতে যান। বাজপেয়ীর প্রতি তাঁর প্রথম কথাই ছিল, ‘স্যার, ইয়ে কেয়া হো গয়া?’ বাজপেয়ী জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘ইয়ে তো উনহে ভি নহিঁ মালুম কি কেয়া হো গয়া?’ সত্যিই, প্রতিপক্ষও বুঝতে পারেনি যে, এমনটা ঘটে যাবে। অবশ্য তাতেই বা কী আসে যায়? ‘কবিরায়’ অটলবিহারীজির থেকেই শব্দ ধার করে নিয়ে বলা চলে যে, মানুষ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা বড় কথা নয়। পথে হোক, রথে হোক, তীরে হোক কিংবা প্রাচীরে হোক, শুধু একটাই কথা মাথায় রাখতে হয়–যেখানে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিংবা তাকে বাধ্য হয়ে দাঁড়াতে হয়েছে, সেই মাটিতে সে কতটা শক্তভাবে পা রেখেছে। তিনি জানতেন খারাপ পরিস্থিতিতেও টিকে থাকাটাই আসল ব্যাপার। পরাজয়ের মধ্যেও ‘জয়’ শব্দটি লুকিয়ে থাকে। সাজানো বাগান শুকিয়ে গেলেও ক্ষতি নেই, বসন্তের আগমনে, সুযোগ্য মালীর হাতের কেরামতিতে সেই বাগান আবার সেজে উঠতে পারে। তখন হয়তো একই সে বাগানে নতুন ফুল ফুটবে, শুধু সেই পুরোনো মালী থাকবে না। তাই না?
***
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন