সেই ফুলের দল – ৮

অভীক মুখোপাধ্যায়

ভবিষ্যতে যা হওয়ার তা হবে, আমরা ফিরে যাচ্ছি সেই ‘৭১ সাল নাগাদ সময়টাতে। তখন গুরুজি যেহেতু অটলবিহারীর হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মিলিয়ে দিলেন, সেহেতু বলরাজ মাঢোকের বেশ রাগ জন্মাল। আগে থেকেই একটা দড়ি টানাটানি চলছিল। অটলবিহারী তদ্দিনে নিজের গুণমুগ্ধ ভাবশিষ্য আডবানিকে নিজের সঙ্গী করে তুলেছেন। মাঢোক এবার ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে চলে গেলেন।

গুরুজির কাছে মাঢোক নালিশ করলেন অটলবিহারীর জীবনের নারীসঙ্গ নিয়ে। গুরুজি স্পষ্ট বলে দিলেন, ‘আমি ওঁর দুর্বলতার ব্যাপারে সব জানি, কিন্তু একটা সংগঠন চালাতে গেলে সবাইকে নিয়ে চলতে হয়। প্রতিদিন ভগবান শিবের মতো হলাহল পান করতে হয় আমাকে।’

মাটোকের অভিযোগ দিনে দিনে বেড়েই চলেছিল— বাজপেয়ী কীভাবে তর্কে জিতে যাচ্ছেন? পাশাপাশি বেড়েই চলেছিল বাজপেয়ীর অনুগামীদের সংখ্যা। জটিল ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব তুলে ধরতে ভালোবাসা মাঢোকের তুলনায় সোজা ভাবে কথাবলা বাজপেয়ী অনেক বেশি মানুষের পছন্দের ব্যক্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। দলের সকল শ্রেণীর মধ্যে এমনকি বিরোধী দলেও তাঁর একটা সর্বজনমান্য ছবি তৈরি হচ্ছিল। বাজপেয়ী জানতেন নিজেকে প্রেস-মিডিয়ার সামনে কীভাবে মেলে ধরতে হয়, আর সেটা একদমই পারতেন না বলরাজ মাঢোক। সঙ্ঘের যত পত্রপত্রিকা ছিল, তাদের সম্পাদকদের সঙ্গে সখ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় সঙ্ঘের যে কোনও অনুষ্ঠানে গেলে মিডিয়া কভারেজ নিয়ে বাজপেয়ীকে দুবার ভাবতে হতো না।

অটলবিহারী বাজপেয়ী স্পটলাইটে থাকা পছন্দ করলেও নিজেকে দলগত রূপে মেলে ধরতে পছন্দ করতেন। অনেক সময় তাঁর সঙ্গে দলের মত মেলেনি, তিনি নীরব থেকেছেন। হিন্দুত্বের যে ধারা থেকে তিনি সুচারু পদ্ধতিতে সরে আসার কথা বলেছিলেন, তা কিন্তু ভোলেননি মোটেই। হিন্দু ফেভিকলের জন্যে তাঁর নীরবতা আরও গাঢ় বন্ধনী জুগিয়েছে। অযোধ্যা প্রসঙ্গে অকুস্থলে তাঁর অনুপস্থিতি যেমন তাঁর দূরত্ব মেনে চলাকে বোঝায়, তেমনি অযোধ্যায় বাবরি পতনের আগের দিন তাঁর দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজ বুঝিয়ে দেয় তিনি হিন্দুত্ব-বিস্মৃত পুরুষ ছিলেন না। নরেন্দ্র মোদীজির গোধরা সামাল দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে একাধারে রাজধর্ম পালনের জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যের পরেও তিনি নরেন্দ্রকে বহিষ্কৃত করেননি।

মাঢক যত অভিযোগ করছিলেন, তাঁর বন্ধুদের সংখ্যা তত কমছিল। সঙ্ঘ একতায় বিশ্বাস করে। মাঢোক একা হতে চেয়ে সেই ঐক্যে আঘাত হানছিলেন। সঙ্ঘের পরিকাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে যৌথ পরিবারের নীতির ওপরে। মাটোকের একক মতবাদ সেই কাঠামোয় ঘুণ ধরিয়ে দিচ্ছিল। পরে এমন প্রশ্নও ওঠে যে, বলরাজ মাঢোক সম্ভবত সঙ্ঘের অফিসার্স ট্রেনিং ক্যাম্পের ত্রিস্তরীয় প্রশিক্ষণটাই সম্পূর্ণ করেননি।

মাঢোকের সঙ্গে সঙ্ঘ এবং জনসঙ্ঘ দুদিকেরই দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছিল। তিনি মনেপ্রাণে চাইছিলেন অটলবিহারীর প্রেসিডেন্সিয়াল টেনিওর শেষ হোক। রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়া জনসঙ্ঘের হাল ধরুন। কোনও একটি অজানা কারণে তাঁর মনে এই বিশ্বাস দানা বেঁধেছিল যে সিন্ধিয়াদের রাজমাতা জনসঙ্ঘের মাথা হলে পরে তাঁর গুরুত্ব আবার ফিরে আসবে।

কিন্তু তুচ্ছ মানব ভাবে এক, বিধাতা করেন আরেক। ১৯৭৩ সালে জনসঙ্ঘের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে অটলবিহারীর বদলে উঠে এল লালকৃষ্ণ আডবানির নাম।

দিল্লি মেট্রোপলিট্যান কাউন্সিলের শীর্ষব্যক্তি রূপে কাজ করলেও দলে কিন্তু আডবানির চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ এবং নানা ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যক্তিরা ছিলেন। আডবানি রাজ্যসভার সদস্য হতে পারেন, কিন্তু সংসদে মাঢোকের মতো প্রখর বক্তা হয়ে উঠতে পারেননি। জাতীয় ক্ষেত্রে নানাজি দেশমুখের মতো সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠেনি তাঁর। রাজমাতা সিন্ধিয়ার মতো জনগণের নেতা হওয়ার কোনও লক্ষণ তখনও ধরা পড়েনি তাঁর মধ্যে। তাঁর শান্ত, সমাহিত, সদা সতর্ক ভাবমূর্তি, এবং ক্রমশ পরিবর্ধমান ইন্দ্রলুপ্তসম্পন্ন মাথা দেখলে আর.কে.লক্ষণের সেই বিখ্যাত কার্টুন চরিত্রটিকে মনে পড়ে যায়, যে চরিত্রটি আমাদের সবার প্রতিনিধি। দ্য কমন ম্যান। সদা বিনীত এই মানুষটির বিনয়কে হয়তো মাঢোক দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেছিলেন। আডবানিকে তিনি আক্রমণ করতে ছাড়েননি। বলেছিলেন, আডবানি মেরুদণ্ডহীন। তাঁর নিজের কোনও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নেই, মতামত নেই।

.

লালকৃষ্ণ আডবানি নিজেও মেনে নিয়েছিলেন যে তিনি অমন গুরুদায়িত্ব বহনের ক্ষেত্রে অনেকের তুলনায় পিছিয়েই ছিলেন। কী বয়সে, কী জনপ্রিয়তায়, কী সুবক্তা রূপে— প্রায় সবেতেই। অটলবিহারী বাজপেয়ীকে তিনি বলেছিলেন, ‘… আমি অনেকের থেকেই বয়েসে ছোট, জনসমক্ষে ভাষণ দেওয়ার কোনও অভিজ্ঞতাও আমার নেই। অথচ জননেতা হয়ে উঠতে গেলে সেটাই সবচেয়ে দরকারি বিষয়, পার্টি প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রেও ওটাই লাগে।’ বাজপেয়ী নিজের স্বভাবসিদ্ধ ওয়ান লাইনারে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনি সব পারবেন।’

সঙ্ঘের শিষ্টাচার মেনে আডবানির বক্তব্য ছিল, আগে আগের ব্যক্তিদের সুযোগ দেওয়া উচিত। প্রথমেই রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়ার নাম উঠে আসে। কিন্তু রাজমাতা জনসঙ্ঘের জন্যে যা যা করেছিলেন, সেক্ষেত্রে অমন কোনও পদ দিয়েই তাঁকে সম্মান জ্ঞাপন করা সম্ভব ছিল না। এবং তদুপরি তাঁর গুরুদেবের বারণ ছিল বলে রাজনীতি করলেও তিনি কোনও দলীয় পদে আসীন হননি। পরবর্তীতে বিজয়ারাজের কন্যা বসুন্ধরারাজে তাই মায়ের পদগ্রহণের কথা উঠলে কোনও কিছু দান করার মুদ্রায় আঙুল জড়ো করে নীচের দিকে দেখিয়ে বলেন, ‘মা শুধু এটাই করে গিয়েছেন।’ তারপর হাত পেতে কিছু গ্রহণ করার মুদ্রা দেখিয়ে বলেন, ‘এটা কখনও করেননি।’

রাজমাতা ‘না’ বলে দিতেই গুঞ্জন ওঠে যে, আডবানিই হবেন পরবর্তী পার্টি প্রেসিডেন্ট। কিন্তু দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না-হলে কোনও কিছুই সর্বমান্য হয় না। তাই সকলকে অপেক্ষা করতে হচ্ছিল ‘৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কানপুর অধিবেশন অবধি।

.

৯-১১ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩। জনসঙ্ঘের কানপুর অধিবেশন। দলের সর্বস্তরের কর্মীরা জমা হয়েছিলেন। তাঁবু খাটিয়ে হইহই করে আলোচনা, বক্তৃতা হবে। দলের পরবর্তী প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষিত হবে।

সাধারণ অধিবেশনের আগে চার দেওয়ালের মধ্যে একটি বিশেষ অধিবেশন বসল। বলরাজ মাঢোকের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল একুশ পৃষ্ঠার একটি প্রশ্নপত্র বলা হল, উত্তর দাও। এই প্রশ্নপত্র অবশ্য জনসঙ্ঘের কেউ তৈরি করেননি। মাঢোক নিজেই এসব লিখে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে বাজপেয়ীজি, আডবানিজি এবং নানাজি দেশমুখের নাম তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী রূপে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে এসবকিছুর বাইরে মাঢোক একটা নতুন বিষয় প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন দলের সর্বোচ্চ পদগুলিতে কারা বসবেন তা নির্বাচনের মাধ্যমে স্থির করা হোক, যেখানে নির্বাচন মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের হাতের মোয়া হয়ে থাকবে না। দলের সাধারণ কর্মীরা পদাধিকারীদের নাম নির্ণয় করবেন।

যেহেতু জেলা স্তর পর্যন্ত জনসঙ্ঘের সমস্ত অর্গানাইজিং সেক্রেটারিদের সঙ্ঘই নিযুক্ত করত, সেহেতু মাঢোক বলছিলেন এইসব নেতারা জনসঙ্ঘের কোনও নেতার কাছে জবাবদিহি করবেন না। সঙ্ঘ যে জনসঙ্ঘের ওপরে ক্রমশ চেপে বসছিল তা অবশ্য প্রমাণিত সত্যই ছিল। ‘৬৮-’৭১ পর্যন্ত সময়কালে জনসঙ্ঘের মাত্র ১০% পদে সঙ্ঘের বাইরের লোক আসীন ছিলেন।

মাঢোক নাহয় এসব দাবি করছিলেন, কিন্তু জনসঙ্ঘের নেতৃত্ব তাঁকে কী বলছিল?

সেই মিটিংয়ে কী বলা হয়েছিল তা নিয়ে জনসঙ্ঘের পক্ষ থেকে কোনও বিবৃতি না-থাকলেও মাঢোক কিছু কথা বাইরে ফাঁস করেছিলেন। মাঢোককে নাকি বলা হয়েছিল যে, মুসলিমরা তাঁকে পছন্দ করেন না। তিনি নাকি মুসলিমদের বিতাড়িত করেন। মুসলিমরা তাঁর জন্যেই জনসঙ্ঘে আসতে চান না। মুসলিমদের জনসঙ্ঘে আসার পথ খোলার স্বার্থে মাঢোককে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল বলেই দাবি করেন স্বয়ং মাঢোক। এসব দেখেশুনে রেগে আগুন হয়ে গিয়ে বলরাজ মাঢোক সেই মুহূর্তে অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এটাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কফিনে শেষ পেরেক। অনেক পরে মাঢোকের রাজনীতি-জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অটলবিহারী বাজপেয়ীর জীবনেও এমন একটি ক্ষণ আসবে। কিন্তু অটলবিহারী আর বলরাজের মধ্যে এটাই ফারাক, অটলবিহারী এমন কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না যার ফলে তিনি নিজেই দল থেকে বেরিয়ে যাবেন। পরে কখনও সেই কথাতেও আসব’খন।

কানপুরের অধিবেশনে সর্বসাধারণের জন্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অটলজি একটি নজিরবিহীন কাণ্ড ঘটালেন। তিনি মাঢোকের নাম নিয়ে সরাসরি সমালোচনা করলেন। সঙ্ঘ এতদিন যা শিখিয়ে এসেছে, তার সঙ্গে অটলবিহারীর করা এই কাজের মিল ছিল না। সঙ্ঘের শিক্ষা বলে তুমি ভিতরে-ভিতরে লড়বে লড়ো, কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ কোরো না। তবে বাজপেয়ীজি অদ্ভুত চালে মাঢোককে মাত করে দিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মাঢোক উগ্র দক্ষিণপন্থায় বিশ্বাসী, কিন্তু জনসঙ্ঘ চাইছে মধ্যপন্থায় চলতে। দক্ষিণপন্থীদের হিন্দুত্বের রাজনীতিকে একদম নতুন একটি পরিভাষা দিয়ে তিনি বললেন, জনসঙ্ঘ কারো উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হবে না। এবং তাঁর সব কথার শেষে তিনি সেই গুঞ্জনকে শব্দ দিলেন, যা এতদিন রাজনীতির অলিন্দে ঘোরাফেরা করছিল। লালকৃষ্ণ আডবানির নাম পার্টির প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হল।

অধিবেশনে উপস্থিত সকলে অবাক। সত্যিই তাহলে আডবানি এখন থেকে পার্টির মাথায় বসবেন! এই চিন্তার মধ্যে ভুলও কিছু ছিল না, কারণ আডবানি সেভাবে জনপ্রিয় ছিলেন না। একটু অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হল। বাজপেয়ী বললেন, ‘এতদিন আপনারা অটলজি অটলজি করতেন, এবার থেকে আডবানিজি আডবানিজি করবেন।’

অধিবেশনের শেষটা হল লালকৃষ্ণ আডবানিজির রাজনৈতিক জীবনের প্রথম সার্বজনীন বক্তৃতা দিয়ে। দলগত নীতি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিলেন। তার কিছুদিনের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। আডবানি বললেন, অটলজির দিগদর্শনে দল এই ভোটে ভালো করার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সব শেষে তাঁর বাক্যটি ছিল— ‘কত প্রেসিডেন্ট আসবেন, কত প্রেসিডেন্ট যাবেন, কিন্তু অটলজি চিরকাল আমাদের নেতা হয়ে থেকে যাবেন।’

তবে যে সুর দিয়ে অধিবেশন সমাপ্ত হল, তা দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এর আগেও অনেকবার ভারতবাসী অনেক নেতাকে কংগ্রেস ছাড়তে দেখেছেন, অনেককে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই প্রথমবারের জন্যে জনসঙ্ঘের কোনও নেতার বিরুদ্ধে দল পদক্ষেপ নিল। তাও তিনি আবার দলের একজন প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য তথা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। দলবিরোধী কার্যকলাপের খতিয়ান টেনে মাঢোককে দল থেকে তিনবছরের জন্যে বহিষ্কৃত করা হল।

অনেক সময় আমরা যা করি, তাতে আমাদের পূর্ণ সমর্থন এবং নিয়ন্ত্ৰণ থাকে না। সম্ভবত আডবানির আগমনে মাঢোকের যে বহিষ্কার ঘটেছিল, তাতেও আডবানির বিশেষ কিছু করার ছিল না। হাত-পা বেঁধে যূপকাষ্ঠে ফেলে দিলে প’রে গলায় কোপ দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না যে। বলি দেওয়ার এই কঠোর কাজটা আডবানির হাত ধরেই ঘটেছিল। ব্যক্তিগত ভাবে তিনি যে মাঢোককে অপছন্দ করতেন তেমন কোন ব্যাপারই ছিল না কিন্তু।

বলরাজ মাঢোক কি এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেছিলেন?

তাঁর মতো মুখর ব্যক্তিত্ব নীরব থাকবেন একথা ভাবছেন কী করে?

তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা (ওরা বলতে এখানে বাজপেয়ীজি এবং মধুকর দত্তাত্রেয় দেওরসের কথা বলেছেন। এই দেওরসই গুরুজির পরে সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক হিসেবে পদভার গ্রহণ করেন। রাজনীতির আঙিনায় তিনি বালাসাহেব দেওরস নামেই বেশি পরিচিত) আডবানির কাঁধে বন্দুক রেখে গুলি চালিয়ে আমার রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ করে দিয়েছিল। আডবানি যদি একটু সাহস দেখাত, একটু আত্মবিশ্বাস দেখাতে পারত, তাহলে ওরা আর এই খেলাটা খেলতে পারত না।’ নিন্দুকে বলে, আডবানিজি যেভাবে মাঢোককে সরিয়ে দিয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই অনেক বছর পরে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আডবানিজিকেও অন্য কেউ রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছেন। আসলে শুধু সময়ই শক্তিমান, আর কেউ নয়। তুচ্ছ মানব ক্ষমতার মিথ্যে দন্তে ভুলে ধরিত্রীকে পায়ে দলে, সে বোঝে না আসলে ধরিত্রী তাকে ধারণ করেছে। ওই সামান্য সিংহাসনে বসে দণ্ড হাতে নেওয়ার নেশায় মত্ত মানুষ ভুলে যায় হাবিব জালিবের সেই বিখ্যাত শায়েরি—

তুম সে পেহলে জো ইক শখস্ য়হাঁ তখৎনশিঁ থা
উসকো ভি অপনে খুদা হোনে পে ইতনা হি য়কিঁ থা।

.

মাঢোকের বহিষ্কারের পর পরই একজন পণ্ডিত ব্যক্তি জনসঙ্ঘের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি ছিলেন মনোহর লাল সোঁধি। সোঁধি একজন প্রাক্তন ডিপ্লোম্যাট ছিলেন। তাঁর বিদেশনীতির অনেক ছায়া আজকের ভারতের বিদেশনীতির সঙ্গে মিলে যায়। রোডস স্কলার সোঁধি কিন্তু সঙ্ঘের শাখা থেকে জনসঙ্ঘে প্রবেশ করেননি। তাই সঙ্ঘ-জনসঙ্ঘের যুগলবন্দি তিনি ধরতেও পারেননি। ১৯৭১ সালে বাজপেয়ী যখন পার্টি প্রেসিডেন্ট হন, তখন সোঁধি তাঁর বিপক্ষে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী ছিল, যেখানে ৮৫% পার্টি সদস্য সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরাই ছিলেন, সেখানে কীভাবে জিততে পারতেন সোঁধি?

সোঁধি বাজপেয়ীর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কিনা বলা মুশকিল, মতভেদই হয়তো প্রধান বিষয় ছিল। তবে ইতিহাস বলছে, বাজপেয়ী যখন যাকে দেখে অস্বস্তিতে ভুগেছেন, তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারে সেখানেই ইতি টানা হয়ে গিয়েছে। হয়তো ব্যাপারটা নেহাতই কাকতালীয়, কিন্তু তা ঘটেছে। উদাহরণ রূপে আমরা বলরাজ মাঢোক, নানাজি দেশমুখ, সুব্রাহ্মণিয়ান স্বামী কিংবা গোবিন্দাচার্যর কথা বলতে পারি। শেষের জনকে বাদ দিয়ে অন্যদের বৈশিষ্ট্য দেখলে একটাই হিসেব করা যায়, নানাজি দেশমুখ সর্বমান্য রূপে এবং অন্যরা সুবক্তা রূপে নিজেদেরকে সংসদে প্রতিষ্ঠা করলেও করতে পারতেন।

বলরাজ মাঢোককে বহিষ্কারের মধ্যে দিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতি প্রথমবার ভাঙনের মুখে পড়েছিল। তবে মাঢোক যেভাবে বাজপেয়ীর দিকে একের পর এক আঘাত হেনে গিয়েছিলেন, সে তুলনায় তাঁর বিরুদ্ধে অনেক দেরিতেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। হয়তো মাটোকের এভাবে বেরিয়ে যাওয়াটাই নিয়তি ছিল এবং বাজপেয়ী তা বুঝতে পেরে নিজের ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে মাঢোককে পাঁচ বছর ধরে সহ্য করে গিয়েছিলেন। ভাঙন যেমন স্পষ্ট হয়েছিল, তেমনি গড়ে উঠছিল নতুন জুটি। বাজপেয়ী আর আডবানির বন্ধুত্ব। এই নতুন জুটির রেকর্ড মন দিয়ে ঘাঁটলেই চোখে পড়বে যে, ১৯৬৮ থেকে শুরু করে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জনসঙ্ঘের পার্টি প্রেসিডেন্টের পদের রাশ এঁদের হাতেই থেকেছে। তারপর যখন ভারতীয় জনতা পার্টির জন্ম হয়েছে, তখনও ‘৯৮ সাল পর্যন্ত দলের প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় এঁরাই দুজনে থেকেছেন নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে।

’৭৩ সালে যে শুধু আডবানির হাতে ভারতীয় জনসঙ্ঘের ব্যাটন ট্রান্সফার হল তা-ই নয়, আরও একটি বড় পরিবর্তন আসতে চলেছিল অপর এক মাত্রায়। সঙ্ঘের মাথায় স্রষ্টা এবং স্রষ্টার পরে প্রণেতা আসতে চলেছিলেন।

সঙ্ঘের মাথা বলতে সরসঙ্ঘচালক।

স্রষ্টা?

অতি অবশ্যই সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর কেশব বলিরাম হেডগেবার। তিনি এই পদে আসীন ছিলেন ১৯২৫-১৯৩০। মধ্যে লক্ষ্মণ বামন পরাঞ্জপে ১৯৩০- ১৯৩১ সরসঙ্ঘচালকের ভূমিকা পালন করলেও ১৯৩১-১৯৪০ অবধি আবার ডক্টরজিই সঙ্ঘকে দিশানির্দেশ করেছিলেন।

দ্রষ্টা মানে মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর। ১৯৪০ সাল থেকে তিনি সরসঙ্ঘচালকের পদে বসেন। সেই সময় থেকে টানা ’৭৩ সাল অবধি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সঙ্ঘের জন্যে দর্শন প্রস্তুত করতে থাকেন। ১৯৬৯ সাল থেকেই শোনা যাচ্ছিল গুরুজি কর্কটরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি স্বাস্থ্যের দিকে সেভাবে নজর দিতেন না। একবছর পরে শারীরিক পরীক্ষার ফলে খবরটা পাকা হয়। বোম্বের বিখ্যাত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডক্টর প্রফুল্ল দেশাই অপারেশনের পরামর্শ দেন। গুরুজি বলেন সঙ্ঘের শিক্ষা বর্গ মিটলে পরে দেখা যাবে’খন। বৰ্গ প্রবাস শেষ হলে ২৯শে জুন সমস্ত শারীরিক পরীক্ষা হয় টাটা ক্যান্সার হসপিটালে, তিনি ৩০শে জুন সেখানে ভর্তি হন। ১লা জুলাই তাঁর অপারেশন করা হয়। গুরুজির কথা মাথায় রেখে সেবছর অখিল ভারতীয় বৈঠকের আয়োজন নাগপুরের বদলে বোম্বেতেই করা হয়। ১০ই জুলাই থেকে ১২ই জুলাই এই তিনদিন ধরে বৈঠকে যা যা ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ গুরুজিকে দেওয়ার জন্যে প্রতিদিন হাসপাতালে যেতেন বালাসাহেব দেওরস।

সবদিক দিয়ে সঙ্ঘের জন্যে বেশ খারাপ সময় চলছিল। দিল্লির সরকার সঙ্ঘকে ঘিরে ফেলার ব্যবস্থা নিচ্ছিল। দিল্লি প্রশাসন জানিয়ে দিয়েছিল সেখানকার উদ্যানে শাখার আয়োজন করা চলবে না। হাওয়ায় ভাসছিল একটা ভয়ানক খবর, সরকার বিল এনে সঙ্ঘকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। বিভিন্ন প্রান্ত কার্যালয়ে আয়কর বিভাগ থেকে নোটিস পাঠিয়ে জানানো হচ্ছিল সঙ্ঘের গুরুদক্ষিণার ওপরে আয়কর দিতে হবে।

গুরুজি নাগপুরে ফিরে এসেছিলেন। গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল সরসঙ্ঘচালক মরণাপন্ন, তাঁর পদ নিয়ে টানাটানি চলছে। ৮-৯ই অক্টোবর বিজয়াদশমী ছিল সেবছর। গুরুজি ভাষণ দিতে উঠে বললেন, ‘উত্তরাধিকারী নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। কোনও স্বার্থ থাকলে তবে তো সংঘাত হবে। সরসঙ্ঘচালক হলে না কোনও সম্পত্তি মেলে, না অর্থ আসে, প্রাসাদের মতো বাড়িতে থাকার সুযোগও নেই— এসবের কোনটা হলে নাহয় মানা যেত, কিন্তু কিছুই নেই এখানে।

সঙ্ঘ প্রবাসের জন্য গুরুজি দেশব্যাপী ঘুরছিলেন। ১৪ই মার্চ, ১৯৭৩ তিনি কলকাতা থেকে নাগপুরে গিয়ে পৌঁছলেন। ওইদিনের পর তিনি নিজের জীবদ্দশায় আর কখনও হেডগেবার ভবনের বাইরে পা রাখেননি। ২২-২৫শে মার্চ অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভা ছিল, শেষ দিবসে বালাসাহেব দেওরস গুরুজিকে কিছু বলার জন্যে অনুরোধ করলেন। কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল, শ্বাস নিতে সমস্যা দেখা দিচ্ছিল, কিন্তু গুরুজি থামলেন না। টানা চল্লিশ মিনিট বলে গেলেন তিনি।

গুরুজির ভাষণ দেওয়ার শৈলী অনেকটা প্রফেসরদের মতো ছিল। হাত নাড়াতেন না, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বলতেন। একাধিক ভাষা জানতেন বলে যখন দেশের যে প্রান্তে যেতেন, সেখানকার ভাষাতেই কথা বলতেন। কথা যখন শুরু হতো, তখন কণ্ঠ মন্ত্র, ভঙ্গী গম্ভীর এবং লয় ধীর থাকত। সময় যত এগোতো, তিনি তত খোলা গলায় বলতেন। বেশিরভাগ সময় তিনি একঘন্টার মতো বক্তৃতা দিতেন। তাঁর সভা-ভাষণ এবং বৈঠকের আলাপচারিতায় ফারাক ছিল। বৈঠকে তিনি সৎসঙ্গের রীতিতে কথা বলতেন। ব্যক্তিগত খবর নেওয়া, ঠাট্টা, প্রশ্নোত্তর ইত্যাদির মাধ্যমে কার্যকর্তাদের কথা বুঝে নিতেন। বেশিক্ষণ ধরে অন্যের কথা শুনে, নিজে বলতেন দশ মিনিট।

পরদিন থেকেই গুরুজির শরীর খুব খারাপ হয়ে পড়ল। স্নান খাওয়াটাও করতে কষ্ট হচ্ছিল। নাগপুর এবং বিদর্ভ প্রান্তের পরম্পরা অনুসারে বর্ষ প্রতিপদের উৎসবে সঙ্ঘের অধিকারীদের নাম ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী বছরের নানা গতিবিধি তাঁদের তত্ত্বাবধানে আরম্ভ হওয়ার ব্যাপার থাকে। ২রা এপ্রিল নিজের লেটারহেডে গুরুজি নিজের মনোগতদের নাম লিখে তা একটি মুখ বন্ধ করা খামে ভরে কার্যালয়ের প্রধান পাণ্ডুরঙপত্ত ক্ষীরসাগরের হাতে দিয়ে বললেন, ‘আমার মৃত্যুর পর এটা খুলবেন।’ ক্ষীরসাগরের হাত কাঁপছিল। সেই রাতেই কাঞ্চীর শঙ্করাচার্য জয়েন্দ্রতীর্থ সরস্বতী গুরুজির সঙ্গে দেখা করতে এলেন।

১৯শে এপ্রিল গুরুজি নিজের পৈতৃক ভিটে, বাড়ির সবটুকুই কাগজে কলমে ভারতীয় উৎকর্ষে দান করে দিলেন। পরদিন নিজের পূজার সমস্ত সামগ্ৰী খুড়তুতো ভাই বাসুদেব রামচন্দ্র গোলওয়ালকরকে পাঠিয়ে দিলেন। দুটো জিনিস নিজের কাছে রাখলেন, একটা পকেট ঘড়ি, আর দ্বিতীয় বস্তুটা ছিল তাঁর অনিকেত জীবনের পরিচায়ক কমণ্ডুল। ঘড়িটার পিছনে তাঁর দীক্ষাগুরু রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী অখণ্ডানন্দের নাম খোদাই করা ছিল।

গুরুজির শরীর ভাঙছিল। ১লা জুন ছিল অমাবস্যা। গুরুজি নিজের পারায়ণ গ্রন্থটিকে খুব সুন্দর ভাবে মুড়ে আলমারিতে তুলে রাখলেন। তার নীচের তাকে তুলে রাখলেন সাফসুতরো খড়ম যুগল। দুদিন পরে রাষ্ট্র সেবিকা সমিতির সংস্থাপিকা লক্ষ্মীবাঈ কেলকর গুরুজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করলে গুরুজি বললেন, ‘যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত।’ লক্ষীবাঈ কেলকর অবাক। নমস্কার জানিয়ে তিনি ফিরে গেলেন।

৫ই জুন ভোরে উঠে নিজের নিত্যকর্ম সেরে গুরুজি জপে বসলেন। পৌনে ছ’টায় চা এল। সাতটার সময় স্নান সেরে শুরু করলেন সাধনা। সকাল আটটায় দেখা করতে এলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। আধঘণ্টা কথা হল। গুরুজি তখন ক্লান্ত। কথা বলতে সমস্যা হচ্ছিল। দম নিতে পারছিলেন না। অক্সিজেন দিতে হল তড়িঘড়ি। কিছুক্ষণ পরে অল্প ফ্যানভাত খেয়ে তিনি বিশ্রাম নিলেন। সন্ধের অন্ধকার নামতে রোগের প্রকোপ আরও বাড়ল। ডক্টর মুকুন্দ রাও শাস্ত্রী এবং ডক্টর ভাগবত এলেন, কিন্তু লাভ কিছুই হল না। সন্ধ্যার প্রার্থনার সময়ে এগিয়ে এল। চেয়ার এনে দেওয়া হল, যাতে তিনি বসে প্রার্থনা করতে পারেন। শ্বাসকষ্ট বাড়ছিল। অল্প জল চেয়ে খেলেন গুরুজি। একবার টয়লেটে যেতে চাইলেন, কিন্তু শরীর আর সঙ্গ দিল না। গুরুজিকে ধরে আরামকেদারায় শুয়ে দেওয়া হল। ডাকা হল তাঁকে, ‘গুরুজি… গুরুজি…’। কোনও সাড়া নেই। বুকের ধুকপুকানি তখনও চলছে। ইঞ্জেকশন পড়ল, অক্সিজেন দেওয়া হল, উন্নতি হল না। নাড়ির গতি কমে আসছিল। রাত ন’টা পাঁচে দীপ নিভে গেল। গুরুজির আত্মা পরমধামে লীন হয়ে গেল।

৬ই জুন কেন্দ্রীয় কার্যকারী আপৎকালীন বৈঠকে ক্ষীরসাগর গুরুজির দেওয়া খাম পেশ করলেন। খামের মুখ খলতে একটি নয়, দুটি নয়, তিন-তিনটে চিঠি বেরিয়ে এল। প্রথম চিঠি পড়লেন বাবাসাহেব ভিড়ে। পরবর্তী সরসঙ্ঘচালক রূপে মধুকর দত্তাত্রেয় দেওরসের নাম লিখে গিয়েছিলেন গুরুজি। দ্বিতীয় পত্র পড়লেন বালাসাহেব দেওরস। ‘আমাদের কাজ রাষ্ট্রপূজক, ধ্যেয়পূজক, সেখানে ব্যক্তি-পূজার কোনও স্থান নেই।…’ তৃতীয় চিঠিও দেওরসই পড়লেন। প্রত্যেক সঙ্ঘবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে গুরুজি লিখেছিলেন, ‘পরম প্রিয় আদরণীয় স্বয়ংসেবক বন্ধুগণ, ২১শে জুন ১৯৪০ আমাদের পরম পূজনীয় ডক্টর হেডগেবারের দেহান্তের পরে তাঁর ইচ্ছানুসারে সরসঙ্ঘচালোকের পদের গুরুভার আমাকেই নিতে হয়েছিল। আমি কিছুই জানতাম না। সবাই মিলে আমায় পথ দেখিয়েছেন। আমি ভার বহন করেছি। ইত্যবসরে আমার ব্যক্তিগত স্বভাব আর খামতির কারণে অনেকে হয়তো মনকষ্ট পেয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাছে আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি।’

সূর্যাস্তের সময়। ডক্টরজির প্রতিমার সামনে গুরুজির দেহ অগ্নিকে সমর্পিত করে দেওয়া হল। একটি যুগের সমাপন ঘটল। কোনও যুগই নিজের সমাপ্তির পরে ফিরে আসে না, এই যুগও একমুখী গতিতে নিজের যাত্রা শেষ করল। স্রষ্টা আর দ্রষ্টার পরে প্রণেতার (বালাসাহেব দেওরস) যুগ আরম্ভ হল। কঠিন থেকে কঠিনতর সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল ভারতের সময়সারণী। এমারজেন্সি আসতে চলেছিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%