অভীক মুখোপাধ্যায়
মুরলি মনোহর জোশি এবং আডবানিজির মধ্যে মতভেদ চলছিল। জোশিজি তখন পার্টি প্রেসিডেন্ট। নিজের চারিপাশে নিজের পছন্দের লোকজনের বৃত্ত তৈরি করছিলেন। কাছের লোকেদের ক্ষমতা প্রদান করে বলয় গঠন করছিলেন। কল্যাণ সিংকে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী রূপে চয়ন করা ছিল এমনই একটি উদাহরণ। মুরলি মনোহর জোশির পছন্দানুসারে ১৯৯১ সালের জুন মাসে ভারতের বৃহত্তম রাজ্যের প্রথম ভাজপা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কল্যাণ সিং শপথ নিলেন।
দলের মধ্যে যখন এমন সূক্ষ্ম চিড় মাথাচাড়া দিচ্ছিল, তলের বাইরে সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন শাখার মধ্যেও তখন ঐক্যতানের সামঞ্জস্য বিধান হচ্ছিল না। অযোধ্যা নগরীর শ্রীরামজন্মভূমির আন্দোলনের ক্ষেত্রে হিন্দু রাষ্ট্রবাদী ও হিন্দু ধর্মবাদীদের মধ্যে কোথাও একটা টিউনিং -এর তফাত দেখা দিচ্ছিল।
হিন্দু ধর্মে ‘সম্প্রদায়’ শব্দটির গুরুত্ব অশেষ। আমরা সাধারণ দৃষ্টিতে সাধু, সন্ত, ঋষি, মুনি ইত্যাদি শব্দগুলির মধ্যে বিশেষ ফারাক করি না। কিন্তু ফারাক অতি অবশ্যই আছে। তবে তা নিয়ে এখন মাথা ঘামাতে বসব না। যা বলতে চাই, তা হল হিন্দু ধর্মে এমন কিছু সম্প্রদায়ের সাধক আছেন, যারা প্রথা মেনে সাধনা করার পাশাপাশি অস্ত্র ধারণ করে যুদ্ধ করতে সক্ষম। তাঁদের জমায়েতকে ‘আখড়া’ বলা হয়। বিভিন্ন কুম্ভ মেলার সময়ে ‘আখড়া’র সাধুরা জনসমক্ষে আসেন। মোগল আমলে এমন অনেক আখড়ার সাধুরা যোদ্ধা হিসেবে বাদশাদের বাহিনীর সঙ্গেও ভিড়ে গিয়েছিলেন।
সঙ্ঘের মডেল, পরিকাঠামো ইত্যাদি আখড়ার ধাঁচেই গড়া। কিন্তু ডক্টরজি সঙ্ঘকে সাধুসঙ্গ থেকে দূরে রেখেছিলেন। বিবেচক ডক্টরজি এটা বুঝেছিলেন যে, এই ধারাটিকে সঙ্ঘের প্রবাহের সঙ্গে মিশিয়ে ফেললে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন। ১৯৬৪ সালে যখন বিহিপ-এর জন্ম হল, তখন থেকে কিন্তু সঙ্ঘ এবং সন্ত-রা কাছাকাছি আসতে শুরু করলেন। ১৯৬৬ সালে করপাত্রী মহারাজের নেতৃত্বে গো-হত্যা বিরোধী আন্দোলনে কী ঘটেছিল তাও সবার মনে আছে নিশ্চয়ই? ১৯৮৩ সালে অযোধ্যা আন্দোলন যখন গতি নিচ্ছে, তখনও সাধু-সন্তদের ভূমিকা ছিল মনে রাখার মতো। নয়ের দশক আসতে-আসতে সাধু-সন্তরাই বসে গেলেন এই আন্দোলনের ফ্রন্ট সিটে।
রামমন্দির নিয়ে হিন্দু রাষ্ট্রবাদীদের মাথায় নির্বাচনী হিসেব ঘুরছিল, আর সাধুরা এসেছিলেন ধর্মীয় আবেগ নিয়ে। তাঁরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, যেখানে বাবরি মসজিদ দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই একদা প্রভু শ্রীরাচমন্ত্রের জন্ম হয়েছিল। সঙ্ঘ পরিবারের শাখা বিহিপ ও বজরং দলের মাধ্যমে সোচ্চার উঠছিলেন তাঁরা।
যদি ভাজপা নিজের মধ্যে লবির লড়াইতে বিভক্ত না থাকত, তাহলে হয়তো এই আন্দোলন ভাজপার নিয়ন্ত্রণে থাকত। কিন্তু সে অবকাশ তখন কই? জোশি-আডবানি দ্বৈরথের মাঝে রামজন্মভূমি আন্দোলনের রাশ ভাজপার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
.
হালফিলে বাবরি ধ্বংস নিয়ে আনন্দ পটবর্ধনের তৈরি বিতর্কিত ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘রাম কে নাম’ বেশ চর্চায় চলে আসে। দেখলে আডবানিজিকেই বিহারে রথ ঢোকার প্রাক্কালে বলতে দেখবেন— ‘ইয়ে জো রথ হ্যায়, লোকরথ হ্যায়, জনতা কা রথ হ্যায়। জো সোমনাথ সে চলা হ্যায় অউর জিসকে মন মে সঙ্কল্প হ্যায়। সঙ্কল্প কিয়া হুয়া হ্যায় কে, তিশ অক্টোবর কো ওঁহা পর পৌঁছ কর কারসেবা করেঙ্গে অউর মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে…’
ব্যাস! সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা ভারতে মীম ছড়িয়ে পড়ল—
মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে,
পর তারিখ নহিঁ বতায়েঙ্গে।
‘মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে…’ এই স্লোগান কিন্তু আডবানিজি প্রথম দেননি। দিয়েছিলেন অন্য একজন।
‘মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে…।’ ১৯৮৬ সালে এক ছাত্রের দেওয়া এই স্লোগান যে ভারতকেই বদলে দিয়েছিল, তার প্রমাণ আজ মিলছে। ৫০০ বছর ধরে চলে আসা এক মহা সংঘর্ষের সমাপনে আজ সেই ছাত্র জনমানসে বিস্মৃত হলেও তার স্লোগান রয়ে গেছে আগের মতোই তেজস্বী, অটুট, অক্ষুণ্ণ।
এক এমকম পড়ুয়ার দেওয়া এই স্লোগান সারা ভারতে অনুরণিত হয়েছিল। প্রথমে ভক্তদের মুখে-মুখে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। পরে এই নিয়ে অজস্ৰ জোকস আর মীম বানায় রামমন্দিরের বিরোধীরা। মধ্যপ্রদেশের রাজগড়ে এমকম-এ পাঠরত এক ছাত্র যখন বজরং দলের শিবির থেকে এই স্লোগান তুলেছিলেন, তখন এই স্লোগানকে ঠিক স্লোগান নয় হুঙ্কার বলে মনে হয়েছিল —
রামলল্লা হম আয়েঙ্গে
মন্দির ওহিঁ বনায়েঙ্গে
প্রতিপক্ষ ব্যাপারটাকে খিল্লি করতে জুড়ে দিল ‘তারিখ নহিঁ বতায়েঙ্গে। অর্থাৎ বলতে চাইল, রাজনৈতিক স্বার্থে এই স্লোগানটাকে চালিয়েই যাওয়া হবে। এর কোনো শেষ নেই। এবং তাই মন্দির নির্মাণের কোনো নির্দিষ্ট তারিখের কথা কোনো দিনই বলা হবে না।
মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেই কল্যাণ সিং অযোধ্যা গেলেন, সঙ্গে মুরলি মনোহর জোশি। চতুর্দিকে তখন স্লোগান… মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে। কল্যাণ সিং এবং জোশিজি সরেজমিনে ঘুরে দেখে কমবেশি এই স্লোগানটাকেই সমর্থন করে শপথ গ্রহণ করলেন যে, বিতর্কিত জমির ওপরেই মন্দির নির্মাণ করা হবে।
উত্তর প্রদেশের রাজ্য সরকার বাবরি চত্বরে ২.৭৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে বিহিপ-এর হাতে তুলে দিল। বাবরির মূল কাঠামোয় হাত না দিলেও চবুতরার এলাকায় মন্দির তৈরি করার কাজে হাত দিল বিহিপ। সুপ্রিম কোর্টের আদেশে অবশ্য সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
ভাজপার পক্ষ থেকে সিং-জোশি বিহিপ-এর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে রামমন্দিরের কাজ করতে চাইলেও চরমপন্থী সাধুরা চাইছিলেন বাবরি ধ্বংস করে মন্দির তৈরি করা হোক। তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করলেন। মজার ব্যাপার হল এই বিক্ষোভ কেন্দ্রে থাকা নরসিমহা গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে না হয়ে রামমন্দির আন্দোলনের সমর্থনে থাকা কল্যাণ সিং সরকারের বিরুদ্ধে হচ্ছিল। কল্যান সিংকে মিডিয়া প্রশ্ন করছিল যে তিনি এর ফলে চাপে পড়ছেন কিনা। কল্যাণ সিং জবাব দিয়েছিলেন যে, চাপে থাকার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ তিনি নিজেই মন্দির নির্মাণের শপথ নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও একটু সূক্ষ্মভাবে খেলতে চাইছিলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল হিন্দু রাষ্ট্রবাদীদের রাজনৈতিক মোর্চা থেকে হিন্দু সাধুদের আলাদা করা। বিভিন্ন আখড়ার মাথা, পীঠাসীন ব্যক্তিত্ব, মঠাধীশদের সঙ্গে বিভিন্ন লবির মাধ্যমে কথা চলছিল। তবে তিনি যে খুব সাবলীলভাবে এসব করতে পারছিলেন এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। তাঁর নিজের দলের মধ্যে থেকেই কিছু মুখ তাঁর বিরুদ্ধে ‘মুসলিমদের ক্ষুণ্ণ করার’ অভিযোগ তুলছিল। এমনই একজন ছিলেন অর্জুন সিং। রাও-এর বক্তব্য ছিল, ‘মসজিদ যেমন আছে, থাকবে। আমরা বিশাল একটি মন্দিরও তৈরি করব।’ নরসিমহা রাও-এর প্রচেষ্টায় হিন্দু-মুসলিম পক্ষ এক বছরের মধ্যে প্রায় নব্বই বার মুখোমুখি বসেছিল। একশোর কাছাকাছি বৈঠক হলেও ফল হয়েছিল দেওয়াল ঠেলার মতোই। বার বার একটাই উত্তর এসেছিল- — মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে!
ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের অবমাননা করেই ১৯৯২ সালের জুলাই মাসে কল্যাণ সিং আবার নির্মাণের কাজ আরম্ভ করালেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে একটা সময় নরসিমহা রাও কল্যাণ সিং-এর সরকারকে ভঙ্গ করবেন বলেও ঠিক করে নিয়েছিলেন। তবে ইত্যবসরে সুপ্রিম কোর্ট থেকে আবার নির্দেশ আসায় কল্যাণ সিংকে বিরত হতে হল।
অবস্থা বুঝে নরসিমহা রাও বাজপেয়ীজি, আডবানিজি এবং মুরলি মনোহর জোশিকে ডেকে পাঠালেন। অটলবিহারী পরামর্শ দিলেন প্রধানমন্ত্রী যেন নিজে একবার সাধু-সন্তদের পক্ষটিকে ডেকে এই বিষয়ে বোঝান। শৃঙ্খলাপরায়ণ সঙ্ঘের পক্ষ থেকেও একই বার্তা এল। সঙ্ঘ বুঝে গিয়েছিল যে, আন্দোলনের চালকের সিট আপাতত সাধু-সন্তদের দখলে চলে গিয়েছে।
সাধুদের পক্ষের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছিলেন ‘প্রতিবাদী ভয়ঙ্কর’ উপাধিধারী সাধু মহন্ত রামচন্দ্র দাস পরমহংস। তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম ছিল চন্দ্রেশ্বর তিওয়ারি, জন্মভূমি বিহার। সাধু হিসেবে দিগম্বর আখড়ায় যোগদানের পর তাঁর নাম হয় রামচন্দ্র দাস।
সাধু হলেও রামচন্দ্র দাস বাবাজি শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিমণ্ডলে নিজের কর্মকাণ্ড আবদ্ধ রাখেননি। দস্তাবেজ বলছে, ১৯৪৭ সালে তিনি ফৈজাবাদে হিন্দু মহাসভার নগরাধ্যক্ষ ছিলেন।
এই বইতে আগেই আমি অভিরাম দাস বাবাজির ‘রামলাল্লা অভিযান’ নিয়ে লিখেছি। মনে করা হয় গোরখপীঠের মহন দিগ্বিজয় নাথের ঘনিষ্ঠ রামচন্দ্র পরমহংসই ছিলেন সেদিনের অভিযানের সূত্রধার। মহন্ত দিগ্বিজয় নাথ এবং মহন্ত রামচন্দ্র পরমহংসের হাত ধরেই সেদিনের গোরখপীঠ দক্ষিণপন্থী রাজনীতির শক্তিকেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৯৪৯ সালে রামলাল্লার মূর্তি প্রকট হওয়ার পর ২৩শে ডিসেম্বর সকাল ৯টায় যখন এফআইআর দাখিল করা হয়, তখন তাতে অভিরাম দাস, রামশকল দাস, সুদর্শন দাস প্রমুখের নাম থাকলেও রামচন্দ্র দাসের নাম কোথাও ছিল না। নথিপত্রের নিরিখে পরমহংস রামচন্দ্র দাসের নাম কোথাও উল্লেখ করা না হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেই দাবি করেছিলেন যে, ১৯৪৯ সালের সেই রাতে তিনিই রামলাল্লার প্রকট হওয়াতে ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঘটনা পরম্পরার বিচার করলে বলা চলে ওই নির্ধারিত রাতের ঘটনাটি না ঘটলে বাবরি মসজিদকে ‘বিবাদিত’ বলে ঘোষণা করাই হতো না। রামচন্দ্র দাসের হাত দিয়েই ১৯৮৯ সালে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ বিপদ বুঝে সমঝোতার পথে আসতে চাইলেও পরমহংস রামচন্দ্র দাস কিন্তু কোনভাবেই আপোষে রাজী হলেন না। ভাজপা, সঙ্ঘ এমনকি বিহপ পর্যন্ত তাঁকে বোঝাতে পারছিল না।
৩০শে অক্টোবর, ১৯৯২। বিহিপ ঘোষণা করল যে, ৬ই ডিসেম্বর থেকে মন্দিরের নির্মাণকার্য আরম্ভ করা হবে।
.
খবর পেতেই কেন্দ্রীয় সরকার তৎপর হয়ে উঠল। গৃহমন্ত্রক গোপন অফিস মেমো জারী করল যে সুরক্ষার তাগিদে কেন্দ্র বাবরি মসজিদের দখল নিতে পারে। ঠিক হল সিআরপিএফ, সিআইএসএফ, আরপিএফ-এর বাহিনী কীভাবে দিল্লি থেকে লখনউ পর্যন্ত উড়ে যাবে এবং সেখান থেকে গাড়ির বেষ্টনী তৈরি করে অযোধ্যা ঘিরে ফেলবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এই পরিকল্পনা বাইরে জানাজানি হলে আগেই মসজিদের ওপরে হামলা হতে পারে বলে এই প্রস্তাবও প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হল যে, যদি উত্তর প্রদেশে কেন্দ্র নিজের শাসন জারী করতে চায় তবে ২৪শে নভেম্বরের আগেই তা করে ফেলা উচিত।
লালকৃষ্ণ আডবানির সঙ্গে বার বার কথা বলে মসজিদটিকে সুরক্ষিত রাখার অনুরোধ জানালেন প্রধানমন্ত্রী। ভাজপাতে রাও-এর বন্ধুবর অটলবিহারী বাজপেয়ী থাকা সত্ত্বেও আডবানিজিকে এই অনুরোধ করার একটাই কারণ ছিল। তিনি জানতেন এই আন্দোলনের অটলবিহারীর বিশেষ ভূমিকা নেই। পারলে আডবানিই পারবেন।
ক্ষুরধার বিবেচক অটলবিহারী সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই আন্দোলন থেকে ভাজপা মাইলেজ পেলেও আডবানি একসময় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারেন। সংসদে হিন্দুত্বের পক্ষ ধারণ করাটা অনেক নমনীয় পথ, এবং তিনি সেটাই ধারণ করলেন। আর আডবানিজি চললেন আপন খেয়ালে সেই পথে, যে পথ বড় বন্ধুর ছিল।
আডবানিজি রামমন্দির আন্দোলনের পক্ষ থাকলেও আন্দোলনের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যে বিশেষ মোলাকাত হচ্ছিল তা নয়। নরসিমহা রাও-এর সঙ্গে একাধিক সাক্ষাৎ পর্বের পর থেকে মাত্র একবার তিনি বিহিপ-এর সঙ্গে বসতে পেরেছিলেন, অন্যদের সঙ্গে সেটা হওয়ার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনোটাই তাঁর কপালে জোটেনি।
২৪শে নভেম্বর এসে গেল। নখদন্তহীন বাঘের মতো এতদিনের গোপন তর্জন গর্জন সার হল। কেন্দ্র সরকার কিছুই করল না। ২৫ তারিখ প্রাইম মিনিস্টারের বাসভবনে বৈঠকে বসলেন নরসিমহা রাও, আডবানিজি, বাজপেয়ীজি এবং কল্যাণ সিং। প্রতিপক্ষের সকলে প্রধানমন্ত্রীকে কথা দিলেন মসজিদ অক্ষতই থাকবে।
.
২৮শে নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট বলল সুষ্ঠু আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে যাওয়া উচিত। ৬ই ডিসেম্বর মসজিদের সম্মুখস্থ ভূমিতে করসেবা করার শর্তসাপেক্ষ অনুমতিও প্রদান করল। শর্ত কী কী ছিল? না, বিধিবদ্ধ উপাসনা, মন্ত্রোচ্চারণ ছাড়া অন্য কোনও কিছু (নির্মাণজনিত কাজ) করা চলবে না।
ভাজপা দেখল সুপ্রিম কোর্ট যখন একটা পরিধি বেঁধে দিয়েছে তখন বিপদ কম। এবারে ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামানো যেতেই পারে। আইন ভাঙার প্রশ্ন ওঠে না।
কিন্তু এরই মধ্যে ১লা ডিসেম্বর আডবানিজি বেফাঁস ভাবে বললেন যে, কোর্ট-নির্ধারিত পদ্ধতিতে করসেবা আরম্ভ হলেও তা মন্দির নির্মাণে পর্যবসিত হবে।
পরদিন সংসদে এই বিতর্কিত বয়ান নিয়ে ঝড় উঠল। নিজের ভাবশিষ্যকে আগলে বাজপেয়ীজি বললেন, ‘পরিস্থিতি মোটেই ততটা গুরুতর নয়, যতটা প্রেস রিপোর্টে দেখানো হচ্ছে।’
আইবি থেকে প্রধানমন্ত্রীকে একটি টপ সিক্রেট রিপোর্টে জানানো হল অতিবাদীদের পক্ষ থেকে আত্মঘাতী বিস্ফোরণের মাধ্যমে মসজিদ উড়িয়ে দেওয়ার ছক কষা হয়েছে বলেই খবর মিলেছে। এই ধরণের সাবধানবাণীর একটা সুবিধে হল ঘটনাটি ঘটলে বলা যাবে যে, আমরা তো আগেই সতর্ক করেছিলাম; আর না-ঘটলে বলা যাবে খবরটা ভুল ছিল।
৫ই ডিসেম্বর জোশি-আডবানিজি লখনউতে পৌঁছালেন। গন্তব্য অযোধ্যা। সেখানে যাওয়ার পথে রাতে আমিনাবাদে ঝান্ডেওয়ালা পার্কের একটি সভায় বক্তব্য রাখার ব্যাপার ছিল।
এবং এই সভা ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসের অটল পুরুষের জীবনে সম্ভবত প্রথম তথা সবচেয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের জন্ম দেবে। উপস্থিত করসেবকদের উদ্দেশে অটল বলেছিলেন, ‘থামার তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কাল করসেবা করলে সুপ্রিম কোর্টের কোনও সিদ্ধান্তের অসম্মান করা হবে না। করসেবা করলে সর্বোচ্চ আদালতের নির্ণয়ের সম্মান করা হবে। …আমি জানি না কাল ওখানে কী হবে। আমার অযোধ্যা যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু আমাকে বলা হয়েছে তুমি দূরেই থাকো। আমাকে আদেশের পালন করতেই হবে। …সুপ্রিম কোর্ট ভজন-কীর্তন করার অনুমতি দান করেছে। একলা ভজন করা যায় না। কীর্তন করতে গেলে অনেককে লাগে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কীর্তন হয় না। …মাটিতে কিছু এবড়োখেবড়ো পাথর উঠে এসেছে। তাতে বসা যাবে না। জমিন সমতল করনা পড়েগা।’ শব্দ নিয়ে খেলার এই পর্ব সাঙ্গ হতেই লালবাতিওয়ালা গাড়ি এসে দাঁড়ায়। বাজপেয়ীজি এরপর দিল্লি ফিরে যান। জোশিজি আডবানিজিকে নিয়ে অযোধ্যার পথে রওনা দেন।
৫ই ডিসেম্বর পর্যন্ত অযোধ্যায় ২ লক্ষ করসেবক জড়ো হয়েছিলেন। আডবানিজিরা প্রশাসনিক কর্তাদের আশ্বস্ত করছিলেন যে, সবকিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হবে। কী বুঝে অবশ্য বলেছিলেন তা জানা নেই।
অযোধ্যার একটি ধর্মশালা জানকী মহল-এ ভাজপা নেতৃত্ব রাতটা কাটান। পরদিন সকালে বিহিপ-এর অশোক সিঙ্ঘল এবং বজরং দলের বিনয় কাটিয়ারকে সঙ্গে নিয়ে আডবানিজি ও মুরলি মনোহর জোশি বাবরির দিকে রওনা দিলেন।
সকাল সাড়ে দশটা। বাবরি মসজিদের সামনে তখন গেরুয়া সাগর। খাঁকি প্যান্টের স্বয়ংসেবকেরাও ভিড় করেছেন। করসেবার কাজকে সুশৃঙ্খলভাবে সারা জন্য তাঁরা সকলকে পঙক্তিবদ্ধ করাচ্ছেন। প্রচুর পুলিশ। পুলিশের ইউনিফর্মের খাঁকি রঙ স্বয়ংসেবকদের খাঁকির সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে। ততক্ষণে প্রায় দেড় লাখ মানুষের সমাবেশ হয়ে গেছে।
ভিড় ক্রমশ বাড়ছে দেখে জোশি, আডবানিজিরা তাকে ভাগ করার কথা ভাবলেন। স্বেচ্ছাসেবকদের অনুরোধ করা হল, হাতে হাতে ধরে মানব বেষ্টনী বানিয়ে যাতে ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেওয়া যায়। আডবানিজিরা মসজিদ থেকে কয়েকশো মিটারের দূরত্বে থাকা একটি মঞ্চে গিয়ে উঠলেন।
বেলা ১২টা। টিভির পর্দায় সব দেখানো হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও যেমন দিল্লিতে বসে টিভিতে চোখ রেখেছিলেন, তেমনি নজর রেখেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ীও। পরিস্থিতি তখনও স্বাভাবিক।
মিনিট পনেরো-কুড়ি পরেই ঘটনাটা আকস্মিকভাবে ঘটে গেল। এক কিশোর প্রতিরক্ষার বেষ্টনী অতিক্রম করে মসজিদের গম্বুজে চড়ে বসল। পুলিশ হাঁ করে তাকিয়ে আছে। মসজিদ চত্বরের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা তখন কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। হাজার-হাজার মানুষ তখন ছেলেটিকে অনুসরণ করতে শুরু করেছে। সেই কিশোর ততক্ষণে গম্বুজের গায়ে ঘা মারছে হাতিয়ার দিয়ে। ছেলেটিকে অনুকরণ করাও শুরু হল মুহূর্তের মধ্যে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে দেখে আডবানিজি তখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইকের সামনে হাত জোড় করে অনুরোধ করছেন। সঙ্ঘের পক্ষ থেকে মঞ্চে থাকা এইচ ভি শেষাদ্রী নানান ভাষায় করসেবকদের উদ্দেশে শান্তি বজায় রাখার আপিল করলেও কাজ মিলল না। মঞ্চে সেদিন বিজয়ারাজে সিন্ধিয়াও উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিজেকে উপস্থিত করসেবকদের মাতৃতুল্য বলে অনুরোধ করলেন। কিছুতেই কিছু হল না। শৃঙ্খলার গর্ভগৃহ থেকে জন্ম নেওয়া এক আন্দোলন বিশৃঙ্খলতার চরমে পৌঁছে বাবরি ধ্বংস করতে উদ্যোগী হয়ে উঠেছিল। দুপুর দুটো নাগাদ বাবরি মসজিদের প্রথম গম্বুজের পতন ঘটল।
আডবানিজি স্তম্ভিত, জোশিজি স্তব্ধ, শুধু অশোক সিঙ্ঘলের মধ্যে চনমনে ভাব দেখা যাচ্ছিল। মিশ্র এই প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছিল ভারতের কোনায় কোনায়। নতুন এক ভারতের জন্ম হচ্ছিল বাবরির পতনের মধ্যে দিয়ে। যে মাইকিং সিস্টেমের মাধ্যমে করসেবকদের থামতে অনুরোধ করা হচ্ছিল, ধীরে ধীরে সেগুলোতেই বাজতে শুরু করল আধ্যাত্মিক সঙ্গীত। বিনয় কাটিয়াররা গেরুয়া সমুদ্রে মিশে গিয়েছিলেন। মহন্ত রামচন্দ্র দাস পরমহংস এই ফলাফলের জন্যই জীবনভর অপেক্ষা করছিলেন। এসবের মধ্যে ঘা খেতে-খেতে মন্দিরের তৃতীয় তথা শেষ গম্বুজ ভেঙে পড়তে সন্ধে ছ’টা বেজে গেল।
.
কল্যাণ সিং-এর বাড়িতে কী চলছিল ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর দুপুরে?
ফাইভ কালিদাস মার্গ। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে বসে লালজি ট্যাণ্ডন এবং ওমপ্রকাশ সিং। বসে আছেন কল্যাণ। সামনে খোলা টিভি সেটে অবস্থার দিকে সমানে নজর রেখে চলেছেন তিনজন। মধ্যাহ্ন ভোজন চলছে।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের বাইরে উপস্থিত রয়েছেন তাঁর প্রধান সচিব যোগেন্দ্ৰ নারায়ণ। সেখানে বেশ কয়েকজনকে খেতেও দেওয়া হয়েছে। হঠাৎই টিভিতে দেখাতে শুরু করল একজন করসেবক বাবরি মসজিদের গম্বুজে উঠে পড়ে কোদাল দিয়ে ঘা মারতে শুরু করে দিয়েছে। তাকে দেখাদেখি অনেকেই উঠে পড়ল।
মসজিদের সামনে যথেষ্ট সংখ্যায় আধা সামরিক বাহিনী উপস্থিত থাকলেও করসেবকের দল বাবরি মসজিদ আর বাহিনীর মধ্যে এমন একটা মানব-বন্ধনী বানিয়ে রেখেছে যে তাদের পেরিয়ে ভেতরে যেতে পারছে না বাহিনী।
ঠিক সেই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী নিবাসে দৌড়ে ঢুকলেন উত্তর প্রদেশের পুলিশের মহানির্দেশক এস এম ত্রিপাঠী। ঢুকেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। প্রধান সচিব তাঁর সাক্ষাৎ প্রার্থনার খবর ভেতরে পাঠালে মুখ্যমন্ত্রী বলে দিলেন যে তাঁর খাওয়া শেষ না- হওয়া পর্যন্ত ত্রিপাঠী যেন বাইরেই অপেক্ষা করেন।
নির্দিষ্ট সময় পরে ত্রিপাঠী ভেতরে ঢুকেই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে করসেবকদের ওপরে গুলি চালানোর পারমিশন চাইলেন। মুখ্যমন্ত্রী বললেন— ‘ম্যায় গোলি চলানে কা আদেশ নহিঁ দুঙ্গা— নহিঁ দুঙ্গা, সরকার জানি হ্যায় তো জায়ে।’
‘লেকিন স্যার, গোলি চালানে সে বাবরি মসজিদ কো গিরনে সে বচায়া জা সকতা হ্যায়।’
‘অগর গোলি চলাই জাতি হ্যায় তো কেয়া বহুত সে করসেবক মারে জায়েঙ্গে?’
‘জ্বি হ্যাঁ, বহুত সে লোগ মরেঙ্গে।’
‘ম্যায় আপকো গোলি চলানে কি অনুমতি নহিঁ দুঙ্গা। আপ দুসরে মাধ্যমোঁ জ্যায়সে লাঠিচার্জ ইয়া আঁসুগ্যাস সে হালাত পর নিয়ন্ত্রণ করনে কি কোশিশ করিয়ে।’
ডিজিপি এই কথা শুনে নিজের দফতরে ফিরে চলে গিয়েছিলেন। বাবরির শেষ ইট খুলে পড়ার পরে নিজের রাইটিং প্যাড টেনে আনিয়ে নিয়ে নিজের হাতে নিজের পদত্যাগপত্র লিখে সন্ধের মধ্যেই রাজ্যপালের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। লোকে বলে— ‘রাম কে নাম পর সরকার কুর্বান কর দি।’
.
বাবরি মসজিদের শেষ গম্বুজের পতনের পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে নরসিমহা রাও কল্যাণ সিং সরকারকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনা বহুল ওই দিনে কল্যাণ সিংকে আগে পদচ্যুত করা হয়েছিল নাকি তিনি আগেই পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন তা বলা মুশকিল। তবে নরসিমহা রাও সেদিন বাবরি নিয়ে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে বিস্তর অভিযোগ উঠেছিল। এই ব্যাপারে তাঁর কী বক্তব্য ছিল তা জানতে টাইম মেশিনে চেপে জাম্পকাট করে আমাদের চলে যেতে হবে ১৯৯৯ সালের গরমকালে। বিকেলের দিকটাতে মতিলাল নেহরু মার্গের একটি বাড়িতে বসে এক বিরল রাজনীতিকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন সাংবাদিক শেখর গুপ্তা। বাড়ি বড়সড়, কিন্তু আসবাবের বিলাস নেই। যে ক’টা ফার্নিচার রয়েছে, সেগুলোও বেশ লঝঝড়ে। নড়েচড়ে বসলেই ক্যাঁচকোঁচ শব্দ হয়। একটা বুড়ো ট্রেডমিল। অজস্র বইপত্র। খবরের কাগজ পড়ে আছে ইতিউতি। আর আছে একখানা কম্পিউটার। এটুকুই সম্পত্তি। শেখর গুপ্তার সামনে বসে আছেন অন্ধ্রপ্রদেশের বৃহস্পতি তথা ভারতীয় রাজনীতির অন্তিম চাণক্য। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ ঠাকুরদাদার মতোই তিনি গল্প বলে চলেছেন। কখনো কারগিল যুদ্ধ নিয়ে মন্তব্য করছেন, কখনো বা নিজের কপাল নিয়ে। কথার পিঠে কথা এসে পড়ছিল। শেখর গুপ্তা অযোধ্যার বাবরি ধ্বংসের কথা তুললেন— ‘কেন্দ্রীয় বাহিনীকে গুলি চালানোর অর্ডার আপনি দিলেন না কেন?’
উলটো দিকের মানুষটা কিন্তু প্রশ্নের উত্তরে একটা প্রশ্নই ছুঁড়ে দিলেন— ‘যারা মসজিদ ভাঙছিল, তারা কী বলে চিৎকার করছিল জানেন?’
ঘাগু সাংবাদিক শেখর। তিনি প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন আশা করেননি। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইলেন নরসিমহা রাওয়ের দিকে। আজ্ঞে হ্যাঁ, শেখরের সামনে তখন পি ভি নরসিমহা রাও। এমনি এমনি তাঁকে অন্ধ্রের বৃহস্পতি বলা হতো না— তিনি কুশাগ্র মেধার অধিকারী, হিন্দুশাস্ত্রে তাঁর বিরল পাণ্ডিত্য, তিনি পনেরোটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারা ব্যক্তিত্ব। নরসিমহা রাও যখন যুক্তি রাখছেন, প্রশ্ন রাখছেন, তার মানে সেই প্রশ্নের উত্তর নিজেই এক প্রহেলিকা হবে। সাংবাদিক উত্তর দেওয়ার সাহস দেখালেন না।
নরসিমহা রাও বললেন— ‘উয়ো বোল রহে থে… রাম রাম… য়হিঁ না?’
নরসিমহা কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা করলেন না। তিনি বলেই চললেন— ‘আচ্ছা, ধরে নিলাম আমার আদেশে বাহিনী গুলিও চালাত। শ’য়ে শ’য়ে লোক মরতো। যারা আদেশ পালন করতে গুলি চালাত, তারাও তো মানুষ— এত মৃত্যু দেখে তারা কী বলত?
‘রাম রাম…’
শেখর নির্বাক।
‘কারণ তাঁদের মনেও ওই একই রাম। এখন যদি ওই বাহিনীরই কয়েকজন উন্মত্ত জনতার পক্ষ নিয়ে বন্দুক ধরে বেঁকে দাঁড়াত? তাহলে আগুন জ্বলত! আর সেই আগুনে পুড়ে যেত গোটা ভারত…’
এই হলেন পি ভি নরসিমহা রাও, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল যে, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়ে নাকি তিনি ধ্বংসের খবর শুনে কোনো পদক্ষেপ নেননি। সুবিখ্যাত সাংবাদিক শ্রী কুলদীপ নায়ার নিজের আত্মজীবনী ‘বেয়ণ্ড দ্য লাইন্স’ বইতে লিখেছেন:আমি যদ্দূর জানি, (বাবরি) ধ্বংসের ব্যাপারটাতে রাওয়ের একটা গোপন সম্মতি ছিল। করসেবকরা যখন মসজিদ ভাঙতে ওঠে, তখন তিনি পূজায় বসেন; আর সেই পূজা শেষ হল কখন, না যখন শেষ পাথরটাকে উপড়ে ফেলা হল। মধু লিমায়ে আমাকে বলেছিলেন, পূজা চলাকালীন রাওয়ের এক সহযোগী রাওকে গিয়ে বলেন, মসজিদ ধ্বংস হয়ে গেছে— ব্যাস পূজাও তখনই শেষ হয়ে যায়।’
কূলদীপ নায়ার। ভারতীয় সাংবাদিকতার অন্যতম উজ্জ্বল মুখ। এহেন ব্যক্তিত্ব যখন রাও সাহেবকে নিয়ে এমন কথা লেখেন তা অবশ্যই জনমানসে প্রভাব ফেলবে। রাওয়ের বিরোধীরা আজও বলেন, রাও পুজোর নাটক করে মসজিদ ধংসে বাধা দেননি। আর রামমন্দিরের পক্ষধারীরা বলেন, রাও চার ঘণ্টা ধরে পুজো করে মন্দিরের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। যে যার মতো ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু কুলদীপ নায়ার এত বড় কথা কীসের সাপেক্ষে লিখে দিলেন? মধু লিমায়ের কথা শুনে।
কোন মধু লিমায়ে?
সোশ্যালিস্ট লিডার। নরসিমহা রাওয়ের বিরোধী ব্যক্তি।
তিনি কি রাওয়ের গৃহে সেই সময়ে উপস্থিত ছিলেন?
না। ছিলেন না।
তিনি কীভাবে রাওয়ের পূজার কথা জানলেন?
মধু লিমায়ে নাকি পিএমও-এর কারো কাছ থেকে এই কথাটা শুনেছিলেন।
কী মারাত্মক এক তথ্য বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হল। রাওয়ের তৎকালীন মিডিয়া অ্যাডভাইজার শ্রী পিভিআরকে প্রসাদ লিখছেন, ‘শ্রী রাওয়ের বাসভবনে পূজার জন্য কোনো আলাদা ঘরই ছিল না। তাঁর শয়নকক্ষে প্রভু ভেংকটেশ্বরের একটি ছবি টাঙানো ছিল। প্রতিদিন স্নান সেরে শ্রী রাও ছবির সামনে দশ সেকেণ্ডের জন্য প্রার্থনা জানাতেন। তাঁর সহযোগীরা ছবির সামনে ধূপ জ্বেলে দিত।’
কেউ বলে রাও বাবরি ধ্বংসের সময় পূজা করছিলেন, কেউ বলে ঘুমোচ্ছিলেন। অর্জুন সিং, রাও-এর বিরোধী লবির নেতা। তিনি নিজের আত্মজীবনী ‘আ গ্রেইন অব স্যাণ্ড ইন দ্য আওয়ারগ্লাস অব টাইম’ বইতে লিখেছেন যে, ওই সময়ে রাও সাহেবকে ফোন করেও তিনি নাকি পাননি। রাও নিজের ঘরে ঢুকে বসেছিলেন। নির্দেশ ছিল, কোনো মতেই যেন তাঁকে বিরক্ত না করা হয়। অথচ সেই সময়ে রাওয়ের কাছেই অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটিতে থাকা এক পুলিশ আধিকারিক কিশোর কুণালের বক্তব্য অনুসারে রাও সাহেব পূজাতেও ব্যস্ত ছিলেন না, ঘুমোতেও যাননি। তিনি তৎকালীন ইউনিয়ন হোম সেক্রেটারি মাধব গোড়বলের কাছ থেকে ফোনে সমানে সম্পূর্ণ ঘটনার বিবরণ নিচ্ছিলেন। মাধব গোড়বলে নিজের বই ‘অ্যান আনফিনিশড ইনিংস’-এ এই কথাকেই সমর্থন করে গেছেন।
*****
বাবরি মসজিদ ধ্বংস হল। সঙ্ঘ এবং বিহিপ নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হল। তিনটি রাজ্যের ভাজপার সরকারকে ডিসমিস করে দিলেন নরসিমহা রাও। আডবানিজি লোকসভায় প্রতিপক্ষের নেতার পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। ভাজপার একাধিক নেতা গ্রেফতার হলেন। এতদিন ধর্মের বিষয়ে যেমন রাজনীতিকেরা কথা বলছিলেন, তেমনি এখন টিভিতে রাজনৈতিক বিষয়ে বাইট দিচ্ছিলেন সাধু- সন্ন্যাসীরা। বামপন্থীরা বলছিলেন, ধর্ম আর রাজনীতিকে একাকার করে ভাজপা দেশকে মধ্যযুগীয় শাসন ফিরিয়ে এনেছে।
সব মিলিয়ে ভাজপার তখন রাজনৈতিকভাবে অচ্ছুৎ।
শক্তি প্রদর্শনের জন্য কিংবা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব অনুভব করাতে বাজপেয়ীজি নরসিমহা রাও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনলেন। ভাজপার পক্ষে ১১১ জন এমপি ভোট দিলেন, বিপক্ষে গেল ৩৩৬টি ভোট। স্বাধীনতার পরে দ্বিতীয়বার এবং গান্ধী-হত্যার পরে আবার হিন্দুত্ব কাঠগড়ায় উঠল। আর ভাজপার অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠছিল দলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন? কারণ মুরলি মনোহর জোশির সময়কাল শেষ হতে চলেছিল। সদ্য জেল থেকে বেরিয়ে আসা আডবানিজি তখনও অযোধ্যায় আন্দোলনের রাশ হারানোর আঘাতটা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। হাতের পাঁচ হিসেবে বাজপেয়ীজি ছাড়া দলের কাছে অন্য কোনও উপায় নেই। কিন্তু সঙ্ঘ আবার ভেটো জারি করল। ১৯৯৩ সালের জুন মাসে আডবানিজি পুনরায় ভাজপার অধ্যক্ষ হলেন। তবে মুরলি মনোহর জোশির বদলে আডবানিজির প্রত্যাবর্তনে বাজপেয়ীজি মোটেই অখুশি হননি। বাজপেয়ীজি লোকসভায় প্রতিপক্ষের নেতা মনোনীত হলেন। এক্ষেত্রে নামের প্রস্তাব আডবানিজিই করেছিলেন।
বাগ্মী বাজপেয়ীজি সংসদে একেবারে খোশ মেজাজে থাকতেন। কি পক্ষ, কি প্রতিপক্ষ সবাইকে নিয়ে আড্ডা জমাতেন। দলের অচ্ছুৎ দশা কাটাতে তিনিই ভূমিকা নিচ্ছিলেন।
চারটি রাজ্যে ভোট এসে পড়ল। ভোটে তিনটিতে পরাজয় এবং একটিতে জয়ের মুখ দেখল ভাজপা। কোথায় কোথায় কী হল বলছি। দিল্লি এল ভাজপার দখলে। হিমাচল প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, উত্তর প্রদেশে ভাজপা হারল। প্রসঙ্গত এই তিনটি রাজ্যে ভাজপার সরকারকেই নরসিমহা রাও বরখাস্ত করে দিয়েছিলেন।
১৯৮৯-১৯৯১ পর্বে রামমন্দির নিয়ে আন্দোলন ভাজপার রাজনৈতিক উত্থান ঘটিয়েছিল। ‘৯২ সালে বাবরি ধ্বংসের পর ভাজপার গ্রাফ নামছিল। এর পাশাপাশি একটা ফ্রন্টে অন্য প্রয়াস চলছিল। আডবানিজি নিজের সহজাত ইংরেজি বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজি সংবাদ মাধ্যমের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন। দলের অচ্ছুৎ দশা কাটানোর জন্য আডবানিজি অনেক সেকুলার মুখকে দলে আনছিলেন। সঙ্ঘের নার্সারির বাইরে থেকে লোক এসে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে চলেছিল।
১৯৯৪ সালে বাজপেয়ীজি ‘বেস্ট পার্লামেন্টারিয়ান’ পুরস্কার পেলেন। কোণঠাসা হয়ে যাওয়া ভাজপার জন্য পরিস্থিতি ক্রমশ বদলাচ্ছিল। আরও একটা সুবর্ণ সুযোগ এসে গেলে অপ্রত্যাশিতভাবে।
১৯৯৪ সালের মার্চ মাস। পাকিস্তান জেনেভার ইউনাইটেড নেশন কমিশন অন হিউম্যান রাইটস্-এ একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে চলেছিল— ভারত নাকি কাশ্মীরে অত্যাচার চালায় এবং মানবাধিকারের উল্লঙ্ঘন করে।
বিদেশে ভারতের পরিস্থিতি সেই সময়ে এমনিতেই খুব একটা সুবিধেজনক ছিল না। বছর তিনেক আগে সোভিয়েত ভেঙেছে। ভারতের অর্থনীতিতে বড় রদবদল এসেছে। সোভিয়েত ভাঙার পরে ভারতের নতুন বন্ধুর প্রয়োজন। ওদিকে পাকিস্তান আর আমেরিকার ঘনিষ্ঠতা আরও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও আমেরিকায় গেলে সেখানকার প্রেসিডেন্ট দেখা করার মতো সময়টুকুও দেননি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ছবি নষ্ট করার সকল সম্ভাব্য প্রয়াস চালাচ্ছিল পাকিস্তান। জেনেভায় তারই নেট প্র্যাকটিস চলছিল।
পাকিস্তানের মসনদে তখন বেনজির ভুট্টো। দেশে-বিদেশে বেনজিরের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছিল। ঐসলামিক দেশগুলো ঝুঁকছিল পাকিস্তানের দিকে।
এমতাবস্থায় পাকিস্তানের প্রস্তাব জেনেভায় পাস হয়ে গেলে ভারত বড়সড় ধাক্কা খেত। হয়তো তারপরেই পাকিস্তান হুজুগ তুলত, কাশ্মীরে জনমত সংগ্রহ করা হোক।
বেনজির যেমন বেনজির, নরসিমাও তেমনি নৃসিংহ। অদ্ভুত একটি সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অনন্য বন্ধু তথা বিরোধী দলের নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ীর কাছে সাহায্য চাইলেন। জানালেন, জেনেভায় যে দল পাঠাতে চান, তাতে তিনি অটলজিকে রাখবেন বলে ঠিক করেছেন। দলের অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন হামিদ আনসারি, ই আহমেদ, সালমান খুরসিদ, ফারুখ আবদুল্লা। নরসিমহা নিজের পাঠানো প্রতিনিধিদলের নেতা করে পাঠালেন অটলজিকে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যাওয়া দলটির প্রত্যেক সদস্যই মুসলিম এবং তাঁদের দলনেতা এমন একজন রাজনীতিক যার দল হিন্দুত্বের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। কী অভাবনীয় একটি কম্বিনেশন!
ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচের থেকে বেশি রোমাঞ্চকর ছিল এই সমাবেশ। অধিবেশনের গোড়ায় পাকিস্তান নিজেদের জিত সম্পর্কে সুনিশ্চিত ছিল। অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে, দীর্ঘ সময় ধরে ইরানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে থাকা হামিদ আনসারি যখন নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইরানকে ভারতের পক্ষে এনে ফেললেন, তখন পাকিস্তান প্রমাদ গণল। বেনজির নিজেই জেনেভায় গিয়ে উপস্থিত হলেন।
অটলবিহারী বাজপেয়ী, সালমান খুরসিদদের পেশ করা দলিলে নাস্তানাবুদ হয়ে পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়েছিল। ভারতীয় প্রতিনিধিদল যে ‘car phone’ সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল, তা থেকে নরসিমহা রাওকে ফোন করা হল। কোড হিসেবে চারটি শব্দ বলা হয়েছিল সেদিন— ‘Batsman re- fused to play.’
বিজয়ী প্রতিনিধিদল ভারতে ফিরে এলে দারুণ ভাবে স্বাগত জানানো হয়। সালমান খুরসিদের সঙ্গে অটলবিহারী বাজপেয়ীর আলিঙ্গনবদ্ধ ছবি দেশের জনতার আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ‘অচ্ছুৎ’ হয়ে যাওয়া ভাজপা আবার মূল ধারায় ফিরছিল।
.
আরও একটা বছর কেটে গেল। ১৯৯৫ সালে তিনটি রাজ্যের ভোট এসে পড়ল। মহারাষ্ট্র, গুজরাত আর বিহারের বিধানসভা নির্বাচন। ভাজপা এবারে হিন্দুত্বের কথা সেভাবে না তুলে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং দুর্নীতি নিয়ে জিগির তুলল। ভালো সাড়া মিলল। মহারাষ্ট্র আর গুজরাতে ভাজপার সরকার গঠিত হল। বিহারে ভাজপা কংগ্রেসকে সরিয়ে হয়ে উঠল প্রধান বিরোধী দল।
তবে এই রাজ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত পরিস্থিতির জন্ম হল গুজরাতে। ভাজপা সেবারে প্রথম সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। ১২১/১৮২। মুখ্যমন্ত্ৰী হিসেবে বিধায়কদের প্রথম পছন্দ ছিলেন শঙ্করসিং বাঘেলা। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী চাইছিলেন কেশুভাই পটেলকে। নরেন্দ্র মোদী তখন গুজরাত ভাজপার জেনারেল সেক্রেটারি। বেশ কয়েকজন বিধায়কের নাপসন্দ হওয়া সত্ত্বেও আডবানিজি নরেন্দ্র মোদীকে ওই পদে বসিয়েছিলেন। আরও একবার আডবানিজি নরেন্দ্র ভাইয়ের ইচ্ছেকে সমর্থন জানিয়ে কেশুভাইকে মুখ্যমন্ত্রী করলেন।
বাঘেলা খেপে গেলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল নরেন্দ্র মোদির কথাতেই কেশুভাইয়ের ঘনিষ্ঠ লোকেদের বেছে বেছে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হচ্ছিল।
২৭শে সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫। কেশুভাই রাজ্যের শিল্পে বিনিয়োগের জন্য ইনভেস্টর খুঁজতে বিদেশে গিয়েছেন। বাঘেলা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। সঙ্গে ঊনপঞ্চাশ জন বাগী বিধায়ক। বাঘেলা নিজের লবির বিধায়কদের নিয়ে উড়ে গেলেন মধ্য প্রদেশের খাজুরাহোতে।
আডবানিজি বাঘেলাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তিনি মানলেন না। অবস্থা বেগতিক বুঝে বাজপেয়ীজি নিজে বাঘেলাকে বোঝাতে ছুটলেন। বাঘেলা শর্ত রাখলেন। নরেন্দ্র মোদীকে গুজরাত থেকে সরাতে হবে। মোদীকে সরিয়ে দেওয়া হল। সরানো হল কেশুভাই পটেলকেও। বাঘেলা লবির সুরেশ মেহতাকে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী করা হল। শঙ্কর সিং বাঘেলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। আর নরেন্দ্র মোদি? তাঁর কী হল? তাঁর হল শাপে বর। তিনি আডবানিজির ছত্রছায়াতে দিল্লি এলেন। ভাজপার ন্যাশন্যাল জেনারেল সেক্রেটারির পদ পেলেন নভেম্বর মাসে। দলের প্রবক্তা রূপে নিজের বাচনশৈলী এবং কর্মকুশলতাকে নেতৃত্বের সামনে আরও প্রখরভাবে মেলে ধরার সুযোগ পেলেন যা পরবর্তীতে তাঁকে ইতিহাস তৈরিতে সাহায্য করল।
‘বাঘেলা বিদ্রোহ’ আডবানিজিকে একটা শিক্ষা দিল। তিনি যা পারেননি বাজপেয়ীজি তা করে দেখিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি এখনও একত্রীকরণের কাজে পাকাপোক্ত হয়ে উঠতে পারেননি। সম্ভবত তিনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলেন নিজের দলের মধ্যেই যার গ্রহণযোগ্যতা কম, তিনি সরকার চালানোর সময়ে সংসদে কীভাবে সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বজনমান্য হয়ে উঠতে পারবেন?
উত্তর তিনি খুঁজে পেয়ে গিয়েছিলেন। যা সবার সামনে মেলে ধরলেন উপযুক্ত সময়ে।
.
নভেম্বর ১৯৯৫, মুম্বাই। ভাজপার অধিবেশন চলছে তিন দিন ধরে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কর্মীরা এসেছেন। পটভূমিতে বড় বড় ছবিতে ভাসছে নেতৃত্বের উজ্জ্বল মুখ। মঞ্চে বসে আছেন অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং আডবানিজি
বিগত এক দশকের অধিকাংশটা জুড়ে দলের অধ্যক্ষের পদ সামলেছেন আডবানিজি। নিজের মেকলেপুত্র ইমেজ ভেঙে তিনি হিন্দুত্বের পোস্টারবয় হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে সঙ্ঘের চাপে একটু একটু করে পিছোতে পিছোতে অটলবিহারী অনেকটাই ন্যুব্জ। দল এবং অটলজি দুপক্ষই মনে করেন আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনে আডবানিই হবেন প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার। লালকৃষ্ণই প্রাইম-মিনিস্টার-ইন-ওয়েটিং।
দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবসের দিন লালকেল্লা থেকে ভাষণ দেন বলে খুব ভেবেচিন্তেই মঞ্চের একদিকে লালকেল্লার ছবিও রাখা হয়েছে। আগামী প্রধানমন্ত্রী ভাজপা থেকে হবেন এটাই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে দল।
আডবানিজি বলতে উঠলেন। সভার একটা বড় অংশের শ্রোতা তখন অপেক্ষা করছে যে, আডবানিজি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী বলে ঘোষণা করবেন। কিন্তু সকলকে হতভম্ব করে তিনি বাজপেয়ীজির নাম নিলেন। অটলবিহারী নিজেও স্তম্ভিত। আডবানিজিকে জানতে চাইলেন যে, আগে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি কেন। আডবানিজি বললেন, জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি থোড়াই অনুমতি দিতেন? আত্মমন্থনের পরে পাওয়া এই উত্তর নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন আডবানিজি। কারণ তিনি জানতেন বাইরে খবর গেলে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ কখনোই সম্মতি দেবেন না। গুরুকে এগিয়ে রাখতে শিষ্য নিজেকে চিরকালের জন্য পিছিয়ে দিয়েছিলেন।
* * * * *
আডবানিজির সঙ্গে অনেক বৈঠকের পরেও যখন বাবরি ধ্বংস হওয়া আটকানো গেল না, তখন নরসিমহা রাও মনে করেছিলেন লালকৃষ্ণ আডবানি তাঁর সঙ্গে কথার খেলাফি করেছেন। আডবানিজিকে শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতেই তিনি প্রতিশোধটা নিলেন প্রাণভরে।
আমরা ক’বছর পিছিয়ে যাব। ২৫শে মার্চ ১৯৯১। কাশ্মীরে তখন অশান্তি চরমে উঠেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হাতে পেয়ে জামাত-ই-ইসলামির দিল্লি হেড কোয়ার্টার থেকে এক কাশ্মীরি যুবককে গ্রেফতার করল দিল্লি পুলিশ। তার নাম আশফাক হুসেইন লোন। পরে আশফাকের কাছে তথ্য পেয়ে পুলিশ জামা মসজিদ এলাকা থেকে শাহাবুদ্দীন গোরি নামে একজন আটক করে। গোরি ছিল জেএনইউ-এর ছাত্র। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেল তারা হাওয়ালার মাধ্যমে টাকা জোগাড় করে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জম্মু-কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টকে পৌঁছে দেয়। টাকা পাঠায় কারা? লণ্ডন থেকে কোনও এক ডক্টর আয়ুব ঠাকুর আর দুবাই থেকে কোনও এক তারিক ভাই। যাই হোক, মামলার গুরুত্ব অনুসারে তা সিবিআই-এর হাতে চলে গেল।
৩রা মে ১৯৯১। সিবিআই একইসঙ্গে দেশের কুড়ি জায়গায় রেইড করল। এর মধ্যে একটি ঠিকানা ছিল ভিলাই ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের ম্যানাজিং ডিরেক্টর সুরেন্দ্র কুমার জৈনের মেহরোলির ফার্ম হাউজ। সুরেন্দ্র জৈনের ভাই জেকে জৈনের অফিসেও রেইড হল। সব মিলিয়ে নগদ ৫৮ লাখ টাকা, ১০.৫ লাখের ইন্দিরা বিকাশ পত্র, চার কেজি সোনা, প্রচুর পরিমাণে বিদেশি মুদ্রা পাওয়া গেল। আর মিলল দুটো ডায়েরি। দিল্লির হাওয়া গরম করার মতো খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, জৈন ভাইরা দেশের তাবড় তাবড় সব নেতাদের সব মিলিয়ে ষাট কোটি টাকা দিয়েছে।
২২শে জুন ১৯৯৩। ডক্টর সুব্রাহ্মণিয়ান স্বামী প্রেস কনফারেন্স করে বললেন যে, তাঁর হাতে এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে যার মাধ্যমে বলা যায় লালকৃষ্ণ আডবানি এস কে জৈনের কাছ থেকে দু কোটি টাকা নিয়েছেন।
১২ই নভেম্বর ১৯৯৪। ‘জনসত্তা’ সংবাদপত্রের একটি খবরে সোশ্যালিস্ট নেতা মধু লিমায়ের জবানিতে ৫৫ জন বড় নেতা সহ অনেকের নাম ছাপা হল। বলা হল জৈনের ডায়েরিতে এসব নাম পাওয়া গেছে। আডবানিজি ৬০ লক্ষ টাকা নিয়েছেন বলে লেখা হয়েছিল।
এ পর্যন্ত আরোপ প্রত্যারোপের খেলা ঠিকই চলছিল। কিন্তু ১৬ই জানুয়ারি ১৯৯৬ হাওয়ালা কাণ্ডের গতিপ্রকৃতি বদলে গেল। সিবিআই চার্জশীট পেশ করল। সেই চার্জশীটের প্রথম দুটি নাম ছিল লালকৃষ্ণ আডবানি এবং বিদ্যাচরণ শুক্লার। কংগ্রেসের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে বলে আসা ভাজপার চাদরেও দুর্নীতির কালি এসে লাগল।
সত্তর ছুঁই ছুঁই আডবানিজির কাছে তখন নিজের ভাবমূর্তির ঔজ্জ্বল্য রক্ষা করাই প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল। তিনি ঘোষণা করে দিলেন যতদিন পর্যন্ত না তিনি সসম্মানে প্রত্যাবর্তন করছেন, ততদিন পর্যন্ত তিনি লোকসভায় প্রবেশ করবেন না, ভোটে দাঁড়াবেন না। এই বক্তব্যের পরেই আডবানিজি এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করলেন।
Man proposes, God disposes. সঙ্ঘ আডবানিজিকে চাইছিল, আর নিয়তি অটলজিকে এগিয়ে দিচ্ছিল। তবে অটলবিহারী বাজপেয়ী নিজের ভাবশিষ্য আডবানিকে তাঁর বিপদের দিনে নিঃসঙ্গ করে এগিয়ে যাননি। অটলজি লোকসভায় লখনউ সিটের পাশাপাশি আডবানিজির গান্ধীনগর সিট থেকেও দাঁড়ালেন। এই প্রতীকী সমর্থন বুঝিয়ে দিচ্ছিল তিনি আডবানিজির সঙ্গে আছেন।
পরে দিল্লি হাইকোর্ট ‘হাওয়ালা কাণ্ড’ থেকে আডবানিজিকে সসম্মানে রেহাই দেয়। পরে মামলা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে পৌঁছালে পরেও হাইকোর্টের রায়ই বহাল থাকে। নরসিমহা রাওয়ের প্রতিশোধ সাময়িক বিভীষিকার রূপ ধারণ করলেও সুদূরবিস্তারী হতে পারেনি। তবে সময় রাওকে ছাড়েনি। শেষ বয়সে দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়েই তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন