সেই ফুলের দল – ৪

অভীক মুখোপাধ্যায়

গডসে কিন্তু একটা সময়ে সত্যিই সঙ্ঘের স্বয়ংসেবক ছিল। কিন্তু যখন সে গান্ধীহত্যার কাণ্ডটিকে ঘটায়, তখন তার সঙ্গে সঙ্ঘের আদৌ কোনও সম্পর্ক ছিল কিনা তা কেউ প্রমাণ করতে পারেননি। গডসের নিজের জবানবন্দিতে জানা গেছে সে তার আগেই সকল সূত্র ছিন্ন করে দিয়েছিল, এবং স্বয়ং গুরুজি গোলওয়ালকরও একই কথা বলেছেন। গান্ধীজিকে নিয়ে সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব সুন্দর কাজ করেছেন রামচন্দ্র গুহ। তাঁর মতানুসারে গডসে যখন গান্ধীজিকে হত্যা করে তখন তার সঙ্গে আরএসএস-এর কোনও সম্পর্কই ছিল না। আডবানিজিও একই কথা লিখেছেন। অপরদিকে নাথুরাম গডসের ভাই গোপাল গডসে বলেছেন যে তাঁর দাদা কখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে সঙ্ঘ ত্যাগ করেনি।

ইতিহাসের এই এক মজা। অন্ধ মানুষের মতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা হচ্ছে হাতির মতো ইতিহাসকে। একই হাতি, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গে স্পর্শ করে অন্ধগণ বলছে, এখানটা মোটা, ওখানটা সরু। সঙ্ঘের বিপক্ষের লোকেরা বলে, যে যাই বলুক এই হত্যার পেছনে সঙ্ঘই ছিল। কিন্তু এখানে সঙ্ঘের বিপক্ষের সবার বিরুদ্ধে সবথেকে বড় প্রশ্ন ওঠে সঙ্ঘের পলিটিক্যাল মোটিভের জায়গাটা থেকেই। সঙ্ঘ সেই সময় রাজনীতি নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহী ছিলই না, তাহলে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিকেশ করে দেওয়ার কথা আসবে কেন? এমনকি রাজনীতিতে এই বীতস্পৃহার কারণে শ্রী সাভারকর কিংবা গডসে সঙ্ঘকে রীতিমতো ভর্ৎসনাই করে গিয়েছেন সমানতালে।

গান্ধীজির প্রাণহানির চেষ্টা করে মোট সাতবার অ্যাটেম্পট হয়েছিল। এই চেষ্টাগুলোর মধ্যে পাঁচবার জড়িত ছিল হিন্দু মহাসভার পুনে ইউনিটের লোকেদের নাম। গান্ধীজির মৃত্যুর অব্যবহিত কাল পরে দেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী বল্লভভাই পটেল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে উদ্দেশ্য করে লিখলেন, ‘আমার দৃঢ় সন্দেহ যে হিন্দু মহাসভার কিছু উগ্রপন্থী সদস্য এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।’ খুব ভুল ছিলও না। গডসে আর আপটে সক্রিয় সদস্য ছিল। দলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট শ্রী সাভারকরের নামটাও জড়িয়ে গিয়েছিল। এবং তদানীন্তন সভাপতি সলজ্জ ভঙ্গীতে একথা মানতে বাধ্য হয়েছিলেন যে দলের সদস্যের হাতেই গান্ধী-নিধনের মতো ঘৃণ্য একটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল গান্ধীহত্যার পরে হিন্দু মহাসভাকে কেউ ব্যান করেননি। করবেন কী করে? নেহরুজি বলুন বা পটেল, তাঁদের মন্ত্রীসভাতে তো হিন্দু মহাসভাও ছিল।

আর শ্রী সাভারকর? তাঁর কী হল?

প্রাথমিক তদন্তের পরে পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষ থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল বেশ ভালোই ফেঁসেছেন তিনি। লালকেল্লায় যখন ট্রায়াল চলত, তখন তিনি হাজির বিবাদীপক্ষের একেবারে অন্তিম সারিতে বসে থাকতেন। পরে অনেকেই বলেছেন তিনি এমনটা করতেন যাতে গডসের চোখে চোখ রাখাটা এড়ানো যায়। সরকারি উকিলেরা প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন যে গডসে আর আপটে ষড়যন্ত্র করার জন্যে শ্রী সাভারকরের সঙ্গে দেখা করেছিল। কিন্তু সেই আসরে কী যে কথা হয়েছিল তা কেউ প্রমাণ করতে পারেননি।

মহামান্য বিচারপতি গডসে’কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি কি বিনায়ক দামোদর সাভারকরের নির্দেশে এমনটা করেছেন?’

ক্ষুরধার দৃষ্টি নিয়ে ততোধিক ক্ষুরধার ভঙ্গিমায় গডসের উত্তর ছিল, ‘আজ্ঞে না। এসব সর্বৈব ভুল এবং মিথ্যা।’

দিগম্বর বাড়ে রাজসাক্ষী হয়ে গিয়েছিল। তার সাক্ষ্য বলছিল, ২০শে জানুয়ারি গান্ধীহত্যা ঘটে, ঠিক তার তিনদিন আগে আপটে আর গডসে শ্রী সাভারকরের সঙ্গে দেখা করেছিল। ফেরার সময় শ্রী সাভারকর নিজের বাড়ির দোরগোড়া অবধি নেমে এসে বিদায় জানানোর সময়ে বলেছিলেন, ‘যশস্বী হোভুন ইয়া’–বিজয়ী হয়ে ফিরো। কিন্তু অপর কোনও সাক্ষ্য, কোনও প্ৰমাণ শ্রী সাভারকরকে পর্যুদস্ত করতে পারেনি। এই বিচারের পরে সসম্মানে মুক্ত শ্ৰী সাভারকর পরবর্তী ১৮ বছর বোম্বেতে কাটান। গডসের পরিবারের সঙ্গে তাঁর পরিবারের বৈবাহিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছিল।

১৯৬৬ সালে শ্রী সাভারকরের মৃত্যু ঘটে। গান্ধী হত্যা নিয়ে আবার কমিশন বসে তখন। বিনায়ক দামোদর সাভারকরের আপ্ত সহায়ক এবং দেহরক্ষী বয়ান দেন যে, সত্যিই সাভাকরের সঙ্গে আপটে-গডসেদের একটা সাক্ষাৎকার ঘটেছিল। কমিশন সমস্ত সূত্র জুড়তে-জুড়তে এক ভয়ানক সিদ্ধান্তের মুখে গিয়ে উপনীত হয়। কিন্তু এটা কমিশনের তদন্ত রিপোর্ট হলেও কোনও বিচারকের বিচার ছিল না। তাই আইনগত ভাবে কোনোদিনই শ্রী সাভারকরকে গান্ধী হত্যার সঙ্গে যুক্ত বলে প্রমাণিত করা যায়নি।

গান্ধীজির নিহত হওয়ার ৫৫ বছর পরে সুপ্রিম কোর্টে আবার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করানোর আবেদন করা হয়েছিল। কোর্ট দ্বারা নিযুক্ত উকিলেরা তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে বলেছিলেন, যেহেতু বিনায়ক দামোদর সাভারকরকে তখন নির্দোষ বলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তাই এখন মহাত্মা গান্ধীর হত্যায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে পুনর্বার বিচার না-করাটাই ভালো।

গান্ধীজি নিহত হওয়ার পরে সঙ্ঘকে যে নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে হয়েছিল সেকথা আগেই লিখেছিলাম। আডবানিজি তখন রাজস্থানের আলওয়াড়ে। সঙ্ঘের অন্যান্য সকলের মতোই তিনিও গান্ধীজির মুসলিম লীগকে সমর্থন করার ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেননি, সেরকমই তিনি গান্ধীজিকে হত্যা করার ঘটনাটাকেও মানতে পারেননি। অন্য অনেক স্বয়ংসেবকের মতোই তাঁকেও জেলে পুরে দেওয়া হয়েছিল। তিনমাস তিনি আলওয়াড়ের জেলে ছিলেন।

জেলের খাবার নিয়ে আর নতুন করে কী বলি? দিনে দুবার করে গোটা তিনেক মোটা-মোটা পোড়া রুটি, আর জলের মতো ডাল। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরেও আডবানিজি পুনরায় গ্রেফতারি এড়াতে এর বাড়ি ওর বাড়ি পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াতেন। তখন আর কে জানত যে ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে? ২৭-২৮ বছর পরে আবার এমন কিছু ঘটবে যার ফলে আরএসএস ব্যান হয়ে যাবে, আডবানি আবার জেলে যাবেন।

একদম ঠিক ধরলেন। এমারজেন্সির সময়কালের কথাই বলছি। গান্ধীহত্যার পরে সঙ্ঘের আডবানিকে জেলে যেতে হয়েছিল। সেইসময়ে অটলজি ঠিক কোথায়, কী করছিলেন তার হদিশ মেলে না। এমারজেন্সি পিরিয়ডেও আডবানিজি জেলে যাবেন, কিন্তু অটলবিহারী বাজপেয়ীজি সেবারে অসুস্থ ছিলেন বলেই জানা যায়। মোদ্দা কথা, এমারজেন্সি পিরিয়ডে অটলবিহারীজিকে জেলে যেতে হলেও খুব বেশিদিন জেলের পোড়া রুটি কিংবা জোলো ডাল খেতে হয়নি।

চলুন, আমরা ১৯৪৯ সালে ফিরে যাই। ফেব্রুয়ারি মাস। ভারত সরকার তদ্দিনে বুঝে গিয়েছে যে গান্ধীজিকে হত্যার করার পেছনে আরএসএস -এর ভূমিকা ছিল না। জুলাই মাসে গিয়ে ব্যান উঠে গেল। এবং এই সময়ে সরকারের অনুরোধে সঙ্ঘের মধ্যে নতুন একটি বিষয়ের জন্ম হল। সঙ্ঘের নিজস্ব সংবিধান লিখিত হল, যেখানে সঙ্ঘ ভারতের সংবিধান এবং জাতীয় পতাকার প্রতি অনুগত থাকবে এবং অরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখবে বলে অঙ্গীকৃত হল।

তবে আরএসএস সংবিধানে যা-ই বলে থাকুক না কেন, রাজনীতি নিয়ে তাঁদের চিন্তায় কিন্তু পরিবর্তন আসছিল। সঙ্ঘ দুটো জিনিস ভোলেনি।

১. গান্ধী-হত্যার পরে রাজনৈতিক নেতা বা দল একটা স্বাভাবিক ইমিউনিটি পেয়েছিল।

২. সঙ্ঘকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হলে পর কিন্তু কোনও রাজনেতাই সংসদে এই ব্যান নিয়ে মুখ খোলেননি। সঙ্ঘ বুঝে গিয়েছিল, এবার সংসদে সঙ্ঘের নার্সারি থেকে লোক পাঠানোর সময় এসে গিয়েছে।

আরও একটা কারণ ছিল। কংগ্রেস দলটিতে বেশ কিছু রদবদল ঘটছিল। গান্ধীজির হত্যার পরে দলের নায়ক তখন দুজন। তাঁদের চোখে নতুন ভারত গঠনের স্বপ্নটা একই ছিল, কিন্তু হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী ছিল পৃথক। ঠিকই বুঝেছেন, আমরা মহামান্য নেহরুজি এবং পটেলজির কথা পড়ছি। এবং আরএসএস এই পুরো দ্বিধাবিভক্তির দিকে নজর রেখে চলেছিল। লোহা ক্রমশ গরম হচ্ছিল, দরকার ছিল সঠিক সময়ে সঠিক আঘাত। সঙ্ঘ সুযোগ বুঝে সেটাই করল।

পটেল গুজরাতের মানুষ। পরিবারের জমিজমাও ভালোই ছিল। তবে তিনি হয়ে যান উকিল। গুজরাতের একটি অঞ্চলে ডিস্ট্রিক্ট প্লিডার হিসেবে কাজ করতেন। এই জায়গা প্রায় একশো বছর পরে এক নৃশংস কাণ্ডে কেঁপে উঠবে। একটি ট্রেনে আগুন লাগিয়ে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হবে করসেবকদের। দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র গুজরাত জুড়ে। সবাই ভাববে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কেরিয়ার শেষ, গুজরাত রাজ্যের গৃহমন্ত্রী অমিত শাহের রাজনৈতিক জীবনেরও সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। কিন্তু বিধাতা অলক্ষ্যে হাসবেন। অটলজি-আডবানিজি জমানার শেষে ফুলের দলে নতুন ফুল মোদী-শাহ জুটিই ফোটাবেন। আশা করি বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই, গোধরার কথা বলছি। ওখানেই কাজ করতেন পটেলজি।

মাথাজোড়া টাক। বিরক্ত, রসকষহীন মুখ। নেহরুজির চেয়ে বয়েসে একটু বড়। হাবেভাবে ইংরেজ ভাবটা নেই। মিতবাক। গম্ভীর। এই ছিলেন সর্দার পটেলজি। তিনি ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ৫২৯ খানা রিয়াসতকে ভারতের মানচিত্রে গেঁথেছিলেন। আর এখান থেকেই তিনি হয়ে গেলেন অ-কংগ্রেসী হিন্দুত্ববাদীদের নয়নমণি। আসলে এই শ্রেণীটা দেশভাগের ক্ষতটাকে ভুলতে পারছিল না।

অনেক-অনেক পরে নেহরু আর পটেলকে একে অন্যের প্রতিদ্বন্দী করে তোলা হবে। বারংবার মনে করিয়ে দেওয়া হবে পটেলজি প্রাইম মিনিস্টার হলে কী হতো। হতো হয়তো অনেক কিছুই, সে নিয়ে বলে আমাদের কাজ নেই। আমরা বরং দেখি যে সত্যিই দুজনের মধ্যে কতটা মতভেদ ছিল বা আদৌ ছিল কিনা।

ছিল, ছিল। কিছু তো ছিলই। নইলে কি আর এত কথা ওঠে?

এই ধরুন, কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে ছিল। সেটা সবাই জানে। আরও একটা বিষয় নিয়ে মতের ফারাক হয়েছিল। সোমনাথ মন্দির নিয়ে। সোমনাথ মন্দির জুনাগড়ে পড়ে। এই জুনাগড় পটেলের দক্ষতাতেই ভারতের মানচিত্রে এসে পড়ে। গজনীর এক দুর্দান্ত লুটেরা মামুদ সোমনাথ মন্দির লুট করেছিল একাধিক বার। অনেক বিদগ্ধ ঐতিহাসিকই মামুদকে ‘গজনীর সুলতান’ লেখেন। ঈশ্বরই জানবেন যে কোন দিক থেকে মামুদ সুলতান ছিল! তো যাই হোক, মামুদ সোমনাথকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। হিন্দু সেন্টিমেন্টে বিরাট ধাক্কা ছিল সোমনাথের মন্দিরের ওপরে হয়ে থাকা এই আক্রমণগুলো। জুনাগড় ভারতে আসার মাত্র তিনদিনের মধ্যেই পটেল সেখানে গেলেন এবং ঘোষণা করে দিলেন সরকার এই মন্দিরটির পুনর্নির্মাণের কাজ করাবে। সবাই ধন্য ধন্য করে উঠল। নেহরুজি ক্ষেপে গেলেন–এ আবার কী? সেকুলার স্টেট ধর্ম নিয়ে কোনও কাজ করবে কেন?

সরকার কিচ্ছু দেবে না? তাহলে অর্থ কোথা থেকে আসবে?

আর ঠিক এই জায়গা থেকেই সুতো ধরে নিল সঙ্ঘ। মানুষের সাহায্য নিয়ে মন্দিরের পুনর্গঠনের জন্যে অর্থ জমা করতে লাগল আরএসএস।

আরও একটি বিষয় নিয়ে নেহরু-পটেল দ্বন্দ্ব চলেছিল। সেটা অবশ্য সেভাবে সামনে আসে না। কী বলুন দেখি?

.

নেহরুজি আর পটেলজির মধ্যে একটি ‘হিন্দু’ ইস্যু নিয়ে মতান্তর হচ্ছিল। এই ইস্যু এর পরের কয়েক দশক ধরে ভারতকে ভোগাবে। বাবরি মসজিদ-রামমন্দির ইস্যু। পণ্ডিতজির সঙ্গে সর্দারজির এই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে রামমন্দিরের বিতর্কিত স্থলে ভগবান শ্রীরামের বালক রূপ রামলাল্লার বিগ্রহ আবির্ভূত / স্থাপিত হয়। এই কাণ্ডে নেহরুজি অত্যন্ত বিরক্ত হন। তাঁর ভাবমূর্তি সেকুলার, সেই ছবিতে আঘাত লাগছিল। তিনি উত্তর প্রদেশের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রীকে টেলিগ্রাম পাঠালেন, ‘undo the wrong’। সর্দার পটেল সেই টেলিগ্রামের কথা শুনে চিঠি লিখলেন, ‘আমার মনে হয়, যা ঘটেছে তাঁর পেছনে এক বিশাল আবেগ কাজ করেছে।’ তবে পটেলজি কোনও ধরণের জবরদস্তির পক্ষে কখনওই ছিলেন না।

কিন্তু নিয়তির কী খেলা! পরে নেহরুজির নাতি রাজীব গান্ধী অযোধ্যার বিতর্কিত অংশের দরজাতে লাগানো তালা খোলাবেন। মসনদে কংগ্রেস সরকার থাকাকালীন বাবরি ধ্বংস হবে। নেহরুজি-পটেলজির এই চিঠিচাপাঠির প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে বাবরি ধ্বংসের অভিযোগ কাঁধে নিয়ে জুডিশিয়াল কমিশনের মুখোমুখি হতে হবে আডবানিজিকে। তিনি সর্দার পটেলের ওই চিঠি থেকেই সন্দর্ভ তুলে ধরবেন: আমি তাঁর লেখা প্রতিটা শব্দকে অক্ষরে-অক্ষরে বিশ্বাস করি।

বল্লভভাই পটেল এবং জওহরলাল নেহরুর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দু শরণার্থী আসা নিয়েও মতান্তর হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এদেশ থেকে ৬,৫০,০০০ মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান, এবং ওপার থেকে ৮,৬০,০০০ হিন্দু ভারতে আসেন। পটেলজি এসব দেখে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি দেন, ‘যদি হিন্দুদের বিতাড়ন করতে বদ্ধপরিকর থাকো, তাহলে তাঁদের বসবাসের জন্যে জমিও তোমাদেরই ছাড়তে হবে।’ নেহরুজি আবার এসব দেখেও উদাসীন ছিলেন। তাঁর মতে ভূমি সংক্রান্ত এধরণের দাবিদাওয়ার কোনও জায়গাই ছিল না। তাই কোনও যুদ্ধ হয়নি। নেহরুজি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন, সেইমতো দুই দেশ নিজ-নিজ ভূখণ্ডে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার অঙ্গীকার করে।

ইত্যবসরে এক বঙ্গসন্তানের মনে ক্ষোভের মেঘ সঞ্চারিত হচ্ছিল। তিনি হলেন শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। হিন্দু মহাসভায় অহিন্দুদের জায়গা না- দেওয়া নিয়ে তীব্র মতবিরোধের পরে তিক্তবিরক্ত হয়ে মুখোপাধ্যায় মশাই হিন্দু মহাসভা ত্যাগ করেছিলেন। এবার তিনি নেহরু-ক্যাবিনেট থেকেও ইস্তফা দিয়ে বসলেন। মন্ত্রীত্ব ত্যাগের এই পদক্ষেপ সেই সময়ে দৃষ্টান্তমূলক ব্যাপার। সঙ্ঘ শ্যামাপ্রসাদবাবুকে স্বাগতম জানাল, মহাসভাও সাধুবাদ দিল তাঁকে। কিন্তু দুপক্ষ‍ই বুঝতে পারছিল যে, সরকারে তাঁদের কণ্ঠ কমছিল।

একটা সময়ে সঙ্ঘের হয়ে ভারত সরকারের কাছে কথা বলার লোক বলতে আর কিছুই রইল না।

কখন বলুন তো?

শ্যামাপ্রসাদবাবুর ওই পদক্ষেপের ঠিক মাস আটেক পরে যখন সর্দার পটেলজির মৃত্যু ঘটল। পটেল সত্যি-সত্যিই সঙ্ঘের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তাঁর মতে, সঙ্ঘীরা রাষ্ট্রকে ভালোবাসে, শুধু ভাবনাচিন্তার পদ্ধতিটা আলাদা। মৃত্যুর কয়েকমাস আগে তিনি সঙ্ঘের লোকেদের কংগ্রেসে আনার জন্য চেষ্টাও চালিয়েছিলেন, নেহরুজি তাতে বাধ সাধেন।

আজকাল নেহরু আর পটেলকেই একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। আদপে কিন্তু দুজনে একে অন্যের বিরোধী ছিলেন না, কমরেড ছিলেন, স্বাধীনতার আগে বা পরের যুদ্ধটা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন। তবে অনেক বিষয়েই মতানৈক্য হতো:পাকিস্তান, কাশ্মীর, সোমনাথ মন্দির, অযোধ্যা কিংবা আরএসএস নিয়ে। মতান্তরের বিন্দুগুলিকে একটা সুতোয় গাঁথলেই বুঝে যাবেন কেন আজকাল হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রাষ্ট্রবাদীরা বলেন, সর্দার পটেল এদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলে দেশটা অন্যরকম হতো।

যাই হোক, পটেলের ওই চেয়ার একটা সময়ে সামলাবেন লালকৃষ্ণ আডবানি। তিনি ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেই অনুকরণ করবেন। আর বাজপেয়ীজি অনুসরণ করবেন ভারতের প্রথম প্রাইম মিনিস্টারকে। আডবানি হয়ে উঠবেন সঙ্ঘের ‘লাল’ হয়ে, আর বাজপেয়ীর সঙ্গে আরএসএস এর দূরত্ব ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। বাজপেয়ী হয়ে উঠবেন ভারতের এমন একজন প্রধানমন্ত্রী, যিনি কাশ্মীর এবং পাকিস্তান নিয়ে সবার চেয়ে উদার হবেন।

তবে এসব হবে অনেক পরে। ১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে পটেলজি চলে গেলে পরে প্রধানমন্ত্রী নেহরুজির মতবিরোধ করার মতো কেউ রইল না। বিবেকের কাজটাও তো কাউকে করতে হয় নাকি? কেউই কি ছিল না? ছিল তো। সঙ্ঘ ছিল। কিন্তু সঙ্ঘেরও এবার একটি রাজনৈতিক বিমার প্রয়োজন ছিল।

শ্যামাপ্রসাদবাবু দিল্লি থেকে চলে গেলেন নাগপুরে। সেখানে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক গুরুজির সঙ্গে। স্বাধীন ভারতের প্রথম লোকসভা ভোট হতে তখন আর মাত্র একটি বছর বাকী ছিল। শ্যামাপ্রসাদ গুরুজিকে বোঝালেন, একটি রাজনৈতিক দল তৈরী করতে হবে যা হিন্দু মহাসভার ভোট নিজের দখলে আনবে। কিন্তু গোলওয়ালকরজি কোনওভাবেই রাজনীতির মহাপঙ্কে নামতে চাইছিলেন না। অপরদিকে শ্যামাপ্রসাদ বুঝতে পারছিলেন, বোঝাতে থাকলে ঠিকই হবে, কারণ গান্ধী-হত্যার পর সঙ্ঘ যে ধরণের পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল তাতে তাঁদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অনাক্রম্যতা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছিল।

মুখোপাধ্যায় মশাই হাল ছাড়লেন না। তিনি চলে গেলেন হিন্দু মহাসভার প্রেসিডেন্টের কাছে। বললেন, আপনার দল বন্ধ করে আমার সঙ্গে আসুন, গোলওয়ালকরজির সাহায্য নিয়ে আমার নেতৃত্বে নতুন দল শুরু করতে চাই।

মাস চারেক পরে নতুন দল গঠনের জন্যে তিনি একটি মিটিং ডাকলেন। শ্যামাপ্রসাদবাবু চাইছিলেন সঙ্ঘের লোকজন যেন অতি অবশ্যই সেখানে উপস্থিত থাকেন। কিন্তু তিনি সঙ্ঘকে এভাবে মনেপ্রাণে চাইছিলেন কেন?

কারণ সঙ্ঘের মতো এমন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভারতে বিরল। এবং সঙ্ঘের নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে একটি সমান্তরাল মিডিয়া জন্ম নিচ্ছিল। সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের মতো প্রখর মেধাও অন্যত্র খুব কমই দেখেছিলেন শ্রী মুখোপাধ্যায়। আশা করি, আজকের বিজেপির সঙ্গে সঙ্ঘের আত্মীয়তার সূত্রটা স্পষ্ট করতে পারছি এবার।

গুরুজি বুঝতে পারছিলেন যে, রাজনীতি থেকে সঙ্ঘের দূরে থাকার নির্দেশ অনেক সঙ্ঘীই মনে-মনে মানতে পারছিলেন না। হিন্দুত্বের হাত শক্ত করে তোলার জন্যে এতদিন যে হিন্দু ফেভিকলকে কাজে লাগানো হচ্ছিল তা কমজোর মনে হচ্ছিল রাজনীতির টানের সামনে। সেদিন গুরুজি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত না-নিলে হয়তো সঙ্ঘেই ফাটল দেখা দিত। তিনি শ্যামাপ্রসাদবাবুকে বললেন, ‘আপনাকে আমি পাঁচটি মোহর দিলাম।

মোহর?

মোহরই তো! নিজের স্বয়ংসেবকদের মধ্যে বাছাই করা পাঁচ জনকে তিনি তুলে দিলেন বঙ্গসন্তানের হাতে। তাঁদের নাম?

দীনদয়াল উপাধ্যায়, সুন্দর সিং ভাণ্ডারী, নানাজি দেশমুখ, বাপুসাহেব সোহনি এবং বলরাজ মঢোক। বাজপেয়ী আর আডবানি তখনও সোনার ছেলে হয়ে ওঠেননি।

.

ক’মাসের মধ্যে ৪০০ জন অভ্যাগতকে নিয়ে একটি মিটিং-এর ব্যবস্থা করা হল। তারিখ ছিল ২১শে অক্টোবর, ১৯৫১। জন্ম নিল ‘ইন্ডিয়ান পিপল’স অর্গানাইজেশন’। এবার নামটার ভারতীয় সংস্করণখানা লিখছি, চেনার সুবিধে হবে একটু। ‘ভারতীয় জনসঙ্ঘ’। পার্টি ম্যানিফেস্টোতে বলা হল ‘ওয়ান কান্ট্রি’, ‘ওয়ান নেশন’, ‘ওয়ান কালচারের কথা’। আর বলা হল, ‘ধর্মরাজ্য নট থিওক্র্যাসি বাট রুল অব ল’। আর প্রতীক? একটি প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ। পার্টির প্রেসিডেন্ট শ্যামাপ্রসাদবাবু প্রখর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রইলেন ভারতভাগের মতো বীভৎস সিদ্ধান্তের প্রস্তাবে রাজী হয়ে যাওয়া পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। হিন্দু মহাসভার প্রাক্তনী উন্মুক্ত মনে ঘোষণা করলেন, তাঁর হাতে তৈরি নতুন দল সকল ধর্মের মানুষের জন্যে নিজের দরজা খোলা রাখবে।

আরএসএস কখনও আলোয় আসতে চায়নি। রাজনৈতিক দিকে তো একেবারেই নয়। সঙ্ঘের পক্ষ থেকে তাই শ্যামাপ্রসাদবাবুর অধিনায়কত্বে জনসঙ্ঘের অগ্রগতি নিয়ে কোনও আপত্তি ছিল না। সঙ্ঘ যেহেতু গান্ধী-হত্যার পর নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়েছিল, তাই তাঁদের সমস্ত পদক্ষেপ ছিল মাপা। রাজনীতি না-করেও রাজনীতিতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারার আজকের এই ক্ষমতার জন্ম সম্ভবত ওখান থেকেই। এটাকেই কেউ বলবেন সিংহাসনের পেছনের রিমোট কন্ট্রোল, কেউ বলবেন মুখ আর মুখোশের যুগলবন্দি, কেউ বলবেন কৃষ্ণ এবং অর্জুনের জুটি। অর্জুনটি না হয় শ্যামাপ্রসাদবাবু হলেন, তাঁর সারথী-তাঁর কৃষ্ণ? তাঁর চালিকাশক্তি হয়ে সঙ্ঘের পক্ষ থেকে রাশ ধরলেন জনসঙ্ঘের নবনিযুক্ত, ক্ষমতাবান জেনারেল সেক্রেটারি শ্রী দীনদয়াল উপাধ্যায়। তাঁর চোখে একখানা কালো মোটা ফ্রেমের চশমা থাকত, এখনকার দিনে পরলে ওটাকেই বলা হতো রেট্রো লুক। ঝকঝকে কাচের পেছনে তাঁর দুটি চোখে বুদ্ধির ঝিলিক খেলা করে যেত। বুদ্ধি আর যুক্তির অদ্ভুত মিশেলে ক্রমশ অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিলেন দীনদয়ালজি।

শ্যামাপ্রসাদবাবু এবং দীনদয়ালজির মধ্যে একটা সাদৃশ্য ছিল। দুজনে যথাক্রমে ইংরেজি এবং হিন্দিতে দুর্দান্ত ভাষণ দিতে পারতেন। আবার মজার ব্যাপার হল মুখুজ্জে মশাই হিন্দিতে কাঁচা ছিলেন, আর দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ইংরেজি নিয়ে সমস্যা ছিল। শ্রী উপাধ্যায় পরিচিতি পেতেও পছন্দ করতেন না, নীরবে কাজ করাটাই তাঁর পদ্ধতি ছিল। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের লেখার ক্ষমতাও ছিল অসামান্য, তবে মৌলিক ধ্যানধারণা, চিন্তাভাবনার চেয়েও তিনি অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই লিখতেন বেশি। এবং যে বিন্দুটির কথা না-লিখলে তাঁর এবং তাঁর উত্তরসূরীদের কথাতে প্রবেশই করা যাবে না তা হল, তিনি রাজনৈতিক মেধা অন্বেষণে অদ্ভুত দক্ষ ছিলেন। শুধুমাত্র এই ক্ষমতাটাই দীনদয়াল উপাধ্যায়কে এত বছর পরের দীনদয়াল উপাধ্যায় হিসেবে স্মরণে রাখতে বাধ্য করে রেখেছে।

মুখোপাধ্যায়-উপাধ্যায়ের এই জুটি জনসঙ্ঘের মধ্যে অদ্ভুত একটি কাঠামোর জন্ম দেবে। মুখোপাধ্যায় হবেন ন্যারেটর, উপাধ্যায় হবেন স্ক্রিপ্টরাইটার। দলের কেন্দ্রীয় স্তরের এই ছাঁচ রাজ্যস্তরেও অনুসৃত হবে। জেনারেল সেক্রেটারির পরে থাকবেন দলের অর্গানাইজেশন সেক্রেটারি বা সংগঠন মন্ত্রী। এই জনসঙ্ঘ কালক্রমে ভারতীয় জনতা পার্টি হবে, কিন্তু ছাঁচ বদলাবে না। সংগঠন মন্ত্রীর পদ বরাবর অলংকৃত করতে থাকবেন কোনও-না-কোনও সঙ্ঘী।

শ্যামাপ্রসাদবাবু যে কারণে হিন্দু মহাসভা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তা মনে আছে নিশ্চয়ই। তিনি কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। হিন্দুত্ব তাঁর পরিচয় হতে পারে, কিন্তু অহিন্দুদেরও দলে স্বাগতম। উদ্বোধনী মঞ্চে হিন্দু দেবী-দেবতাদের ছবি থাকলেও, কোথাও ‘হিন্দু’ শব্দটির অস্তিত্ব রাখা হয়নি। এই জিনিসগুলো সঙ্ঘের সঙ্গে জনসঙ্ঘের দূরত্বও সৃষ্টি করেছিল। আস্তিক নাস্তিকের মধ্যে যেমন বিভেদ থাকে, কতকটা তেমনই। কিন্তু ভেতরে যাই হোক না কেন, বাইরে এসবের ছাপ সঙ্ঘ বা জনসঙ্ঘ কেউই পড়তে দেয়নি।

একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ শত্রু হতে পারেন দুধরণের নেতারা।

১. যারা সদাসর্বদা আলোকবৃত্তে থাকতে পছন্দ করেন। তাঁরা নিজেদের অহমিকাকে তৃপ্ত করার জন্যে দলকে ভেঙে দিতে পারেন। এঁদের বক্তব্য হতে পারে, ‘দলে থেকে কাজ করতে পারছি না।

২. নীতিবাগীশ নেতা। যারা কোনও এক থুথুড়ে বুড়োর লিখে যাওয়া উপপাদ্যকে কপচিয়ে-কপচিয়ে চুল সাদা করে ফেলেন। এ জাতীয় উপদ্রবে দল স্থবির হয়ে যায়। নিজস্ব নীতির জন্ম হয় না। জনসঙ্ঘের সৌভাগ্য যে, মুখোপাধ্যায়-উপাধ্যায় এই দুপ্রকারের কোনটাই ছিলেন না। বাগ্মী মুখোপাধ্যায় নিজের ভাষণে বুঁদ করে রাখতেন সংসদের সদস্যদের, দৃঢ় চরিত্রের উপাধ্যায় নিজের ক্যাডারদের সঙ্ঘবদ্ধ করে রাখার মন্ত্রটা জানতেন। এগুলো যে সময়ের কথা, তখনও কিন্তু বাজপেয়ী আর আডবানির দেখা হয়নি।

জনসঙ্ঘের জন্মদিবসের ঠিক চারদিন পরেই স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের প্রথম ভোটপর্ব আরম্ভ হল। একেবারে ব্রিটিশ স্টাইলের ইলেকশন হয়েছিল কিন্তু। দেশকে বিভিন্ন সংসদীয় ক্ষেত্রে বিভক্ত করে দেওয়া হল। প্রত্যেক দল সাংসদ হিসেবে নিজের সদস্যকে দিল্লিতে পাঠানোর জন্যে সুযোগ পেল। জনগণ যাকে বেছে নেবে, সে যাবে দিল্লি। হবে এমপি। যে দলের সাংসদ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে, সেই দলের মধ্যে থেকেই কাউকে বেছে নেওয়া হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, তিনি মন্ত্রীসভা গঠন করে দেশ চালাবেন। ১৭ কোটি ৬০ লক্ষ ভারতীয় ২,২৪,০০০ পোলিং বুথের মাধ্যমে ব্যালট পেপারে ভোট দিলেন। ৫৬,০০০ আধিকারিক, ২,৮০,০০০ সহায়ক এবং ২,২৪,০০০ পুলিসকর্মী ছিল।

মুখোপাধ্যায়-উপাধ্যায় জুটির কথা যেমন বলতেই হয়েছে, তেমনই অপর একটি জুটিকে ভুললে চলবে না। সেই জুটির একজন পার্লামেন্ট মাতিয়ে রাখতে জানতেন, অন্যজন দলীয় সংগঠনকে অক্সিজেন জোগাতেন। নেহরু-পটেল জুটি। তদ্দিনে পটেল চলে গিয়েছেন, কিন্তু পেছনে একটি সুন্দর এবং শক্তিশালী সংগঠন রেখে গিয়েছেন অবশ্য। দেশের মানুষ তখন নেহরুর হাতে ভারতকে গড়ে উঠতে দেখতে চাইছিল। বুদ্ধিমান শ্যামাপ্রসাদ তাই নিজের বক্তৃতায় নেহরুকে আক্রমণ করলেও, বিভিন্ন নীতির ক্ষেত্রে নেহরুভিয়ান মেইনস্ট্রিম থেকে সরলেন না। দেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ বিরোধ করেননি। হিন্দু কোড বিল নিয়ে ইচ্ছে পোষণ করলেও তার জন্যে কোনও জেদাজেদি ছিল না। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের এই অদ্ভুত প্রকৃতির রাজনৈতিক বিরোধীতার সুন্দর ছাপ পড়ে দেখা যাবে অপর একজনের মধ্যে। কে বলুন তো? আসছি, আসছি। তাঁর কথাতেই আসছি এবার।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিন্দিতে সড়গড় ছিলেন না। গোবলয়ে পার্টির ভিত মজবুত করতে গেলে দরকার ছিল হিন্দিতে প্রখর ভাষণ। দীনদয়াল উপাধ্যায় তখন জহুরির চোখ নিয়ে হিরে খুঁজতে লাগলেন। লোক চাই। এমন লোক চাই যে মুখোপাধ্যায় মশাইয়ের ভাষণগুলোর হিন্দি অনুবাদ করবে।

অনুবাদকের কাজটা ভারী মজার! কিঞ্চিৎ দুঃখেরও বটে। পরকায়াপ্রবেশের মতো। নিজেকে লেখার মধ্যে ঢেলে দিতে হয়, লেখাটাকে যেন কাঠ-কাঠ না মনে হয়, আবার মূল লেখকের সমস্ত বক্তব্য যেন অটুট থাকে। অনুবাদ ভালো হলেও অনুবাদককে লোকে ভুলে যায়। শ্যামাপ্রসাদবাবুর অনুবাদক হিসেবে উপাধ্যায়জি বেছে নিলেন সঙ্ঘের পত্রিকার তরুণ সম্পাদক অটলবিহারী বাজপেয়ীকে। ভারতের রাজনীতিতে সম্ভবত তিনিই অনুবাদকের সফল হওয়ার চূড়ান্ত নিদর্শন রেখেছিলেন। একজন অনুবাদক নিজস্ব মেধার ভিত্তিতে পরে প্রধানমন্ত্রী আসনে আসীন হবেন। আবার অটলবিহারীর রাজনৈতিক জীবনে তাঁর বক্তব্যের ইংরেজি অনুবাদকের কাজটা করবেন লালকৃষ্ণ আডবানিজি। পরে যেমন ইন্দিরা গান্ধীর তামিল ট্রান্সলেটর হবেন পি সি চিদাম্বরম, ইংরেজি অনুবাদক হবেন মার্গারেট আলভা। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সাফল্য পাবেন।

‘৫১-’৫২ সালের ভোটের আগে অটলবিহারীকে নিয়ে উত্তর প্রদেশ চষে বেড়ালেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এর বাইরেও দুজনে একসঙ্গে অনেক জায়গায় গেছেন। যেমন রাজস্থানের কোটায় প্রচারের জন্যে যেতে হল। জনসঙ্ঘের মেরুদণ্ড তখন আরএসএস। তাঁদের প্রচারকেদের শক্তিতেই বলীয়ান হয়ে জনসঙ্ঘ লড়তে নামছে। শ্যামাপ্রসাদবাবুকে নিয়ে অটলবিহারী যখন কোটায় গিয়ে নামলেন, তখন সেখানে তাঁর সঙ্গে এক যুবকের দেখা হল। ছেলেটির নাম লালকৃষ্ণ আডবানি। এই সেই প্রেক্ষাপট যেখানে ভারতেতিহাসের অপর এক কৃষ্ণ-অর্জুন জুটির সম্ভাবনা জন্ম নিল। আডবানি অবশ্য কখনোই নিজেকে অটলবিহারীর সমকক্ষ বা জুড়িদার বলে ভাবেননি, তাঁর চোখে প্রথম থেকেই অটলবিহারী নায়ক ছিলেন, কবি ছিলেন।

আর লালকৃষ্ণ?

তিনি শুধুই অটলবিহারীর গুণমুগ্ধ ছিলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%