অভীক মুখোপাধ্যায়
দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন রাজীব গান্ধী। শিখ-বিরোধী দাঙ্গায় ভারত কেঁপে উঠল। এক্ষেত্রে রাজীব গান্ধীর বক্তব্য ছিল, যখন কোনও বড় গাছ ধরাশায়ী হয়, তখন মাটি কেঁপে ওঠে। ইন্দিরা গান্ধীর পতনের পর শিখদের ধরে ধরে মারা হচ্ছিল। খুন কা বদলা খুন।
কিছুদিন পরে সাধারণ নির্বাচনের তোড়জোড় আরম্ভ হল। শিখদের ত্রস্ত করে পোস্টার পড়তে থাকল— দেশে থাকতে চাও কি?
ভোটের প্রচার চলাকালীন কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ভাজপার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হল যে, ব্রিটেনের শিখ উগ্রপন্থীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। কংগ্রেস ভাজপাকে হিন্দু-বিরোধী প্রমাণ করতে চাইছিল।
আর ভাজপা কী করছিল?
তারা তখন পঞ্জাবে অটলজির বক্তৃতার ক্যাসেট বিলি করছিল। ইস্তাহারে লিখছিল, আমরা পঞ্জাবে কোনও নির্দোষ ব্যক্তির ক্ষতি হতে দেব না, সে হিন্দু বা শিখ যেই হোক না কেন।
’৮৪ সালের ভোটের আগে আরএসএস ও ভাজপার মধ্যে প্রায় আর কোনও তালমিলই রইল না। শোনা যায় নানাজি দেশমুখ নিজের রাজনৈতিক সন্ন্যাস ভেঙে ফিরে রাজীব গান্ধীকে ভোট দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন।
ইন্দিরা গান্ধী সঙ্ঘকে যতটা আক্রমণ করতেন, রাজীবের নির্বাচনী বক্তব্যে কিন্তু সেই ঝাঁঝ দেখা গেল না। মিডিয়া প্রশ্ন রাখল এই নিয়ে। রাজীব বললেন, পরিস্থিতি বদলেছে। আসলে নজরে ছিল শিখগণ।
তৃণমূল স্তরে অসম্ভব দখল রাখা আডবানিজি কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন জনতার মেজাজ। কিন্তু তাঁর পথিকৃৎ বাজপেয়ী তখনও নিজের গোঁ ধরে রাখতে ব্যস্ত। আডবানিজি বাজপেয়ীজিকে দু’জায়গা থেকে ভোটে লড়তে বললেন।
কোথায় কোথায়?
১. নিজের শহর ম্বালিয়র। এবং ২. রাজস্থানের কোটা।
আসলে আডবানিজির কাছে গোপন সূত্রে একটা খবর ছিল।
কী খবর?
রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়ার বিদ্রোহী পুত্র মাধবরাও সিন্ধিয়া নাকি ম্বালিয়র থেকে ভোটের মনোনয়ন পত্র জমা দেবেন। গ্বালিয়রে রাজবংশের কেউ ভোটে দাঁড়ানো মানে তাঁর জয় অবশ্যম্ভাবী হবে।
অটলজি বললেন চিন্তার কোনও কারণ নেই। এসব ভুয়ো খবর। মাধবরাও সিন্ধিয়া নাকি নিজে তাঁকে এই আশ্বাস দিয়েছেন যে তিনি অপর কোনও জায়গা থেকে ভোটে দাঁড়াবেন।
বাজপেয়ীজি শুধুমাত্র গ্বালিয়র থেকেই মনোনয়ন পেশ করলেন। এবং ঠিক তার অব্যবহিতকাল পরেই গ্বালিয়র থেকে ভোটে নিজের দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করলেন মাধবরাও সিন্ধিয়া। বাজপেয়ীজি বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে ছলনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রেমে আর যুদ্ধে যে সবই জায়েজ। ভোটও তো যুদ্ধ, তাই না?
ডেভিড আর গোলিয়াথের অসম লড়াই হল। অটলজির ভাষায়, ‘ইয়ে তো রাজা অউর রঙ্ক কি লড়াই হ্যায়।’ রাজা কে বুঝতেই পারছেন, আর ‘রঙ্ক’ মানে ফকির, নির্ধন অটলবিহারী নিজেকেই ‘রঙ্ক’ বলেছিলেন। অটলবিহারী হেরে গেলেন।
দেশজুড়ে কংগ্রেস বিপুল জনমত পেল। ৪০৩ / ৫১৫।
আর ভাজপা?
মাত্র দুটি আসনে জিতল ভাজপা।
‘৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ভাজপার জন্য শোকসভা নির্বাচনে পরিণত হল। সঙ্ঘের মুখপত্র ‘অরগানাইজার’ ছাপল, বিপুল হিন্দু জনসমর্থন রাজীব গান্ধীর পক্ষে গিয়েছে।
পরাজিত অটলজি তখন স্তম্ভিত। লাঞ্ছিত। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তখন অনিশ্চিত। সামনে গহীন আঁধার। সূর্য অস্ত গিয়েছে। সেই ফুলের দল মূর্ছাগ্রস্থ।
*****
ভাজপা একটা ব্যাপার খুব ভালোভাবে করে থাকে। নিজেদের জয়-পরাজয়ের পোস্টমর্টেম। বাজপেয়ীজি বললেন, ‘নিরাশ হলে চলবে না। আত্মনিরীক্ষণ করে শিক্ষা নিতে হবে, ১০১খানা সিটে ভাজপা দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তারমানে দল কিন্তু জনগণের যথেষ্ট সমর্থন পেয়েছে।’
বোম্বের শিবাজি পার্কে ভাজপার সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হল। অটলজি বলতে উঠলেন। করতালিতে ফেটে পড়তে লাগল ময়দান। হাততালির রেশ কমতেই অটলজি বললেন, ‘আমি জানি, আপনারা দেখতে এসেছেন পরাজিত অটলকে কেমন দেখাচ্ছে।’ এরপর দিল্লির ফিরোজশাহ কোটলাতে অভ্যন্তরীণ বৈঠকে অটলজি বলেছিলেন, ‘আমরা মরেও ফিরে আসার মন্ত্রটা জানি।’ ভাজপার রাজনৈতিক বনবাস চলছিল। তখন আর কে জানত যে, ভগবান রামচন্দ্রের বনবাসের মতোই ঠিক চোদ্দ বছর পরে বনবাস কাটবে।
ভোটে পরাজয়ের পর ভাজপার মধ্যে কট্টর হিন্দুত্বের পথে হাঁটার প্রবণতা বাড়ছিল। আডবানিজি যেহেতু কর্মীদের কাছাকাছি ছিলেন, এক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে ও পরিবর্তন দেখা দিচ্ছিল। গান্ধীবাদী সমাজবাদের পথিক অটলবিহারী নেপথ্যে যাচ্ছিলেন।
১৯৮৫ সাল, কলকাতা। ভাজপার রাষ্ট্রীয় কার্যকারিণী বৈঠক বসল। বাজপেয়ীজি বললেন যে, দলের পরাজয়ের দায় মাথায় নিয়ে তিনি অধ্যক্ষের পদ থেকে ইস্তফা দিতে চান। তাঁর প্রস্তাব স্বীকৃত হল না।
আত্মমন্থনের মতো তিনি তখন দুটি প্রশ্ন সবার সামনে রাখলেন।
১. ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টিতে জনসঙ্ঘের মিশে যাওয়া এবং ১৯৮০ সালে সেখান থেকে বেরিয়ে আসাই কি পরাজয়ের প্রধান কারণ?
২. ভাজপাকে মুছে দিয়ে কি আবার জনসঙ্ঘকে পুনরুজ্জীবিত করা উচিত? দ্বাদশ সদস্যের একটি কমিটি খাড়া করা হল। তাঁরা স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দুটি প্রশ্নের উত্তরেই ‘হ্যাঁ’ বললেন। পাশাপাশি আরও একটি রিপোর্ট জমা পড়ল। জনসঙ্ঘের জন্মলগ্ন থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দলের ভোটযাত্রাকে তিনটি পর্বে বিভক্ত করে চুলচেরা বিশ্লেষণ সাজানো হল সেই রিপোর্টে। কী রকম, তা দেখে নেওয়া যাক—
ক) ১৯৫২-১৯৭১ জনসঙ্ঘ হিসেবে ভোটের ফলাফল,
(খ) ১৯৭৭-১৯৮০ জনতা পার্টিতে মিশে যাওয়ার পর জনসঙ্ঘের প্রার্থীদের ভোটের ফলাফল,
(গ) জনতা পার্টি থেকে বেরিয়ে আসার ১৯৮৪ সালের ভোটে ভাজপার ফলাফল।
বেশি নজর ছিল (খ) ও (গ) -এর ওপরে। ১৯৮০ সালের ভোটে জনতা পার্টির খিচুড়ি ফ্রন্টের পাওয়া ৩১টি আসনের মধ্যে জনসঙ্ঘের লোকেরা পেয়েছিল ১৬টি। প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৮.৬%। ১৯৮৪ সালের ভাজপা পেল ২টি মা সিট। প্রাপ্ত ভোট ৭.৬৬%। ভাজপা হিসেবে একা লড়ে মাত্র ১% ভোট কমেছিল। সিট জয়ের অঙ্কটা বেজায় কমে গেলে আষাঢ় ব্যাপার ছিল এই যে, ১০১টি আসনে ভাজপা প্রার্থীরা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল। হিসেব বলছিল, ভাজপা যতটা না হেরেছিল, তার থেকে বেশি জিতেছিল কংগ্রেস। কারণ রূপে খালিস্তান প্রসঙ্গ, জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ, ধর্মান্তরকরণ এবং ইন্দিরা-হত্যার সেন্টিমেন্ট এক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছিল।
সমস্ত কাটাছেঁড়ার শেষে অটল-আডবানি আবার একমত হয়ে গেলেন। কিন্তু অটলবিহারীর সামনে তখনও পাহাড়প্রমাণ এক চ্যালেঞ্জ — সঙ্ঘ।
সঙ্ঘ চাইছিল ভাজপার নেতৃত্ব বদল হোক। দলে বাজপেয়ীর ক্ষমতা কমুক ১৯৮৫ সালের অক্টোবর মাসে গান্ধীনগরে ভাজপার ন্যাশন্যাল এগজিকিউটিভ মিটিং। বালাসাহেব দেওরসের বার্তাবাহক এসে রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়াকে জানালেন দেওরসজি চাইছেন অটলবিহারী বাজপেয়ী যেন অধ্যক্ষের পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং রাজমাতা অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যক্ষ রূপে কার্যভার গ্রহণ করেন। বৈঠক শুরু করার আগে দলীয় পতাকা উত্তোলনটাও যেন অতি অবশ্যই রাজমাতার হাত দিয়ে হয়।
রাজমাতা সঙ্ঘকে নিজের পরিবার মনে করতেন। আবার বাজপেয়ীজিকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতোই দেখতেন। তাঁর সামনে তখন শ্যাম রাখি না কূল রাখি দশা। কিন্তু তিনিও প্রাজ্ঞ রাজনীতিক। প্রত্যুৎপন্নমতি। দলের পতাকা সেদিন তিনিই তুললেন। তোলার আগে বললেন, ‘আমি এই পতাকা আমার দলের অধ্যক্ষের নির্দেশে উত্তোলন করলাম।’ সঙ্ঘের আদেশ যেমন পালিত হল, তেমনি বাজপেয়ীর মর্যাদাও অক্ষুণ্ন রইল। রাজমাতা অধ্যক্ষ হবেন না এটাও বুঝিয়ে দিলেন।
ভাজপার নেতৃত্বের বদল সেই মুহূর্তে অবশ্যম্ভাবী, মানে অটলবিহারীকে সরতেই হবে। রাজমাতা রেসের বাইরে। তাহলে উপায়? অটলজি এবং সঙ্ঘ দু’পক্ষই দেখলেন আর একটাই পথ খোলা আছে। যিনি উভয়পক্ষেরই কাছের মানুষ। তিনি হলে লালকৃষ্ণ আডবানি।
মে, ১৯৮৬। আডবানিজি ভাজপার নতুন অধ্যক্ষ রূপে শপথ নিলেন। দিল্লিতে নেতৃত্ব বদলে হলেও রিমোট কন্ট্রোল তখন সঙ্ঘের হাতে। বাজপেয়ীজির গান্ধীবাদের সমাজবাদের পথ থেকে দলকে সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রবাদের দিকে নিয়ে যেতে হবে এই ছিল আদেশ। বাজপেয়ীর ছায়া থেকে ভাজপাকে সরিয়ে আনা গেলেও বাজপেয়ীকে ছেঁটে ফেলা সহজ কাজ ছিল না। অমন ওজস্বী বক্তা দলে আর দ্বিতীয়টি নেই। মধ্যপ্রদেশ থেকে বাজপেয়ীকে রাজ্যসভায় পাঠানো হল। ৩০শে জুন, ১৯৮৬ বাজপেয়ীজি পুনরায় রাজ্যসভার সাংসদ রূপে শপথ গ্রহণ করলেন। ওদিকে ভাজপার নতুন রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছিল। ইংরেজি শিক্ষায় সুশিক্ষিত ‘মেকলেপুত্র’ আডবানিজি কট্টর হিন্দুত্বের পোস্টার বয় হতে চলেছিলেন অথচ গ্বালিয়রের মরাঠা পরিবেশে লালিত পালিত ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে আগত অটলবিহারী বাজপেয়ীর অমনটা হওয়ার কথা ছিল। তা না হয়ে তিনি রয়ে গেলেন সেকুলার, উদার, গান্ধীবাদী, সমাজবাদী, কিছুটা বাম-মনস্ক। সবই নিয়তি, বন্ধু। তিনি যা ঠিক করবেন, তার ওপরে আর কোনও হিসেবই চলবে না।
.
তখন ভারতের মসনদে রাজীব গান্ধী। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বসে তিনি দাদু, মায়ের রাজনৈতিক ইমেজকেও ছাপিয়ে গিয়েছেন। তিনি প্রগতিশীল। কম্পিউটার ক্রান্তির আহ্বায়ক। প্রগতিশীল বাজেট পেশ করে দেশকে মুগ্ধ করে দিচ্ছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে মরিয়া। পঞ্চায়েতি রাজকে শক্ত করতে দৃঢ় সংকল্প
১৯৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শতবর্ষ পূর্ণ হতে চলেছিল। রাজীব গান্ধী কংগ্রেস দলের অধ্যক্ষ হিসেবে ৭৫ মিনিটের একটি ভাষণ দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন দলকে দালালদের হাত থেকে মুক্তি দিতে তিনি বদ্ধপরিকর। কিন্তু সব ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া থাকে। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট কমলাপতি ত্রিপাঠীসহ অন্যান্য কয়েকজন নেতা রাজীবকে এগারো পাতার একটি চিঠি লিখলেন। ‘আপনি কাদের পাওয়ার ব্রোকার বলছেন?’ বিভিন্ন মন্ত্রকের সর্বময় কর্তা রূপে সামঞ্জস্য বিধানের অভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হল। বাইরে রাজীবের যে ইমেজই তৈরি হোক না কেন, দলের ভিতরে তাঁর কার্যপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। সিনিয়র নেতারা বঞ্চিত, লাঞ্ছিত মনে করেছিলেন।
রাজীব গান্ধীকে লেখা চিঠিতে কমলাপতি ত্রিপাঠীর সই থাকলেও চিঠির ড্রাফট তৈরি করেছিলেন অন্য কেউ। এবং রাজীব তাঁকে চিনেও ফেলেছিলেন। আসলে এগারো পাতার চিঠিতে একজন ব্রিটিশ কবির কবিতার লাইন কোট করা হয়েছিল। সেই মুহূর্তে দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে যারা ঘোরাফেরা করতেন, তাঁদের মধ্যে কেবল একজনেরই এত জ্ঞান, এবং লেখার এতখানি ধার ছিল। তিনি ছিলেন শ্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। রাজীব প্রণব মুখোপাধ্যায়কে দল থেকে বের করে দিলেন। কিন্তু এ ছিল শেষের শুরু মাত্র। রাজীব গান্ধীর আসল প্রতিপক্ষ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল বন্ধুর বেশেই।
রাজীব গান্ধী স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কারণে তখনও ‘মিস্টার ক্লিন’। কথায় বলে, প্রদীপের নিচেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি আঁধার জমাট বেঁধে থাকে। তেমনি অন্ধকারের বুক চিরে একটা টেলিগ্রাম এল প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে। দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভিপি সিং তদন্তের আদেশ দিয়ে দিলেন।
১০ই এপ্রিল, ১৯৮৭। ভিপিকে ডেকে পাঠালেন।
রাজীব বললেন, ‘আপনি আমার কোনও পরামর্শ না নিয়েই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।’
‘যে টেলিগ্রাম এসেছে তার তদন্ত হওয়াটা দরকার,’ উত্তরে বললেন ভিপি সিং।
‘আপনি কীভাবে জানলেন যে ওই টেলিগ্রামে আসা খবর সঠিক?’
‘এটা কী করে মানব যে ওই টেলিগ্রামে আসা খবর ভুল? থ্রু প্রপার চ্যানেল এসেছে। কোডেড। ভাষাও সঠিক। কোনও গন্ডগোল আছে বলে মনে হচ্ছে না।
‘আপনার তদন্তের ফল কী বেরোতে পারে জানেন?
‘অত শত জানি না। তবে এটুকু জানি যে, তদন্ত করাটা ভীষণ জরুরি। কারণ নিয়ম ভাঙা হয়েছে।’
১৯৮৭ সালের ১৬ই এপ্রিল একটি সুইডিশ রেডিও চ্যানেল খবর সম্প্রচার করল— সুইডেনের একটি কোম্পানি ভারত সরকারকে বোফর্স কামান বিক্রি করার জন্য ভারতের কয়েকজন রাজনীতিককে কয়েক লক্ষ ডলার ঘুষ দিয়েছে, যার পরিমাণ ভারতীয় টাকায় ৬৪ কোটি। অভিযোগের আঙুল উঠল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, তাঁর পরিবার, তাঁর বন্ধুদের দিকে। মারাত্মক অভিযোগ রাজীবের সেনাপতি বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং (ভিপি সিং) তদন্তের সঙ্গে আপোষ করা হবে না বলে জানিয়ে দিলেন। ভিপিকে বহিষ্কার করলেন প্রধানমন্ত্রী। আজন্ম কংগ্রেসী ভিপি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে পদত্যাগ করে রাজীব তথা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন। ভারতীয় রাজনীতির আঙিনায় ঝড় উঠতে চলেছিল। অক্ষে ভিপি সিং।
এর আগে আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল। যেমন মহম্মদ আহমেদ খান বনাম শাহবানো মামলা। শাহবানো, একজন মুসলিম রমণী। পাঁচ সন্তানের মা। তিনি বিবাহ বিচ্ছিন্না হওয়ার পর ভরণপোষণের জন্য নিজের প্রাক্তন স্বামীর কাছে প্রতি মাসে ১৭৯ টাকা মাসোহারা দাবি করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট শাহ বানোর পক্ষে রায়দান করে। কিন্তু মুসলিম সমাজ এই রায়ের ফলে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে পারে ভেবে রাজীব গান্ধী পার্লামেন্ট থেকে আইন পাস করিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে নস্যাৎ করে দিলেন।
এক পক্ষ না হয় তুষ্ট হল। রাজীব তখন ভাবলেন হিন্দু ভোট যদি এর ফলে নষ্ট হয়? তিনি অযোধ্যার শ্রীরামজন্মভূমির তালা খোলালেন। দূরদর্শনে ৭৮ পর্বের ‘রামায়ণ’ সিরিয়াল আরম্ভ হয়েছিল। এই আবহে শ্রীরামজন্মভূমির তালা খোলার ঘটনা অন্য মাত্রা পেল।
‘রামায়ণ’ ধারাবাহিক রূপে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। ভারতীয় টিভিতে সবথেকে বেশি দেখা প্রোগ্রামে পরিণত হল অল্পদিনের মধ্যেই। সরকার প্রতি সপ্তাহে ৪০ লক্ষ ডলারের বিজ্ঞাপন পাচ্ছিল। সিরিয়ালের সময়ে পথঘাট শুনশান হয়ে যেত। আসল মন্দির ছেড়ে মানুষ টিভির পর্দার সামনে হাত জোড় করে বসত। মা তাঁর অন্ধ সন্তানকে টিভিতে হাত ছোঁয়াতে বলতেন যাতে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসে। সম্প্রচারের সময়কালে কোনও এলাকায় লোডশেডিং হলে বিক্ষোভ শুরু হয়ে যেত। সে এক অদ্ভুত উন্মাদনা।
হিন্দু ভোট ব্যাঙ্ক লালন পালনের লোভটা হয়তো রাজীবের মধ্যে কাজ করেছিল। এর বিরোধও হচ্ছিল বহুমাত্রিকভাবে। করুণানিধি বলেছিলেন, অ-হিন্দি অঞ্চলের ওপরে হিন্দি আরোপ করার অভিনব পন্থা হল রামায়ণ সিরিয়াল।
সত্যি বলতে কী, রাজনীতির মুখ্যধারার ব্যক্তিত্ব হিসেবে রাজীব গান্ধীই প্রথম শ্রীরামজন্মভূমির দাবিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। হিন্দুত্বের সফট ভার্সানের মডেলটা সম্ভবত তিনিই প্রথম উপহার দিয়েছিলেন দেশের রাজনীতির ইকোসিস্টেমকে।
রামায়ণ ধারাবাহিকে শ্রীরামচন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অরুণ গোভিল। তাঁর জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। গ্রামগঞ্জের মানুষজন তাঁকে দেখলে ‘শ্রীরাম’ ভেবে নতজানু হয়ে প্রণাম করতেন। রাজীব অরুণ গোভিলকে নিজের বিজ্ঞাপনী প্রচারের কাজে লাগালেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে হিন্দু ভোট ব্যাঙ্ক সেভাবে রাজীবের পক্ষে ভোট দিল না। অবশ্য তার অন্য কারণও ছিল।
কারণ ছিলেন ভিপি সিং। উত্তর প্রদেশের মাণ্ডার রাজা। ঠাকুর নেতা একদা সঞ্জয় গান্ধীর ঘনিষ্ঠ। উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। ’৮৪ সালে রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন, ভিপি তখনই রাজীবের কিচেন ক্যাবিনেটে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তিনি হয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব হাতে নিয়েই তিনি প্রভাবশালী অথচ কর ফাঁকি দেয় এমন ব্যক্তিদের ধাওয়া করা শুরু করে দেন। এই তালিকায় ধীরুভাই অম্বানির মতো কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি থেকে শুরু করে রাজীব-বন্ধু অমিতাভ বচ্চন সকলেই ছিলেন। একের পর এক ইনকাম ট্যাক্স রেইড হচ্ছিল। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে একবার রেইড চলাকালীন এক বিখ্যাত শিল্পপতির প্যারালাইসিস দেখা দেয়। বিদেশি ব্যাঙ্কে ভারতীয়দের অবৈধভাবে গচ্ছিত অর্থের ব্যাপারেও ভিপি জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। একজন স্বচ্ছ রাজণিতিক রূপে ভিপির ছবি তৈরি হচ্ছিল। দেশের কাস্টম রেভিনিউ বাড়ছিল। ঠিক এই সময়ে ভিপিকে অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব থেকে রাজীব অব্যাহতি দিলেন। তবে নতুন মন্ত্রকও পেলেন। প্রতিরক্ষা দফতর। সীমান্তে পরিস্থিতি সরগরম বলে ভিপিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কথায় আছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলে ধান ভানে। ভিপি এখানেও নিজের ক্যারিশমা দেখাতে শুরু করলেন। বোফর্স মামলার তদন্ত ঘোষণা করে দিলেন। ভিপি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন। নিজের পদত্যাগ পত্র তৈরি করেই রেখেছিলেন। সেটা যথাসময়ে জমা করে দিলেন। তারিখ ছিল ১২ই এপ্রিল, ১৯৮৭। এর ঠিক চারদিন পর রেডিওতে বোফর্স দুর্নীতির কথা সম্প্রসারিত হল।
সংসদের ভেতরে বাইরে তখন হাওয়া গরম। দেশের মানুষের মেজাজ বদলে যাচ্ছে দেখে রাজীব গান্ধী ১৬ই মে, ১৯৮৭ দিল্লির একটি সভায় বললেন, ‘ভারতের স্বাধীনতা কীভাবে গিয়েছিলে জানেন? যখন গদ্দার মিরজাফর আর রাজা জয়চন্দের মতো লোকজনেরা বিদেশি শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। আপনারা এমন লোকেদের থেকে সতর্ক থাকুন, যারা বিদেশি শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশকে বিকিয়ে দিচ্ছে।’ ‘গদ্দার’, ‘রাজা’ এসব শব্দ কিন্তু এমনি এমনিই ব্যবহার করা হয়নি। নিশানায় ছিলেন ভিপি সিং।
ভিপি, মাণ্ডার রাজা, দমবার পাত্র নন। ১৭ই মে রাজা মাণ্ডা রাজীবকে আসল মিরজাফর, আসল রাজা জয়চন্দ বললেন।
শুরু হল যুদ্ধ।
কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন নেতা রাজীবের বিপক্ষে দাঁড়ালেন। যেমন অরুণ নেহরু, আরিফ মোহম্মদ খান, বিদ্যাচরণ শুক্ল। শাহ বানো মামলা নিয়ে আরিফ রাজীবের ওপরে ক্ষুণ্ণ ছিলেন। অরুণ নেহরু সম্পর্কে রাজীবের ভাই হলেও রাজীব তাঁর ডানা ছেঁটে দেওয়ায় তিনিও তখন ক্ষুব্ধ। এই তিনজনকে দল থেকে বিতাড়িত করা হল। এতদিন ভিপি মন্ত্রীত্ব ছাড়লেও রাজ্যসভার পদ ছাড়েননি। তিনি এবার পদত্যাগ করলেন রাজ্যসভা থেকেও। জবাবে রাজীব তাঁকে কংগ্রেস থেকে বের করে দিলেন।
লাভ অবশ্য ভিপি সিং-এরই হল। তিনি সারা দেশে দুর্নীতি-বিরোধী মুখ হয়ে উঠলেন। ঠিক ওই সময়েই এলাহাবাদের লোকসভা সিট খালি হল। ভিপি নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়লেন ওই সিটেই। ভিপির প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন সুনীল শাস্ত্রী, লালাবাহাদুর শাস্ত্রীর ছেলে। সুনীল একদা ভিপির উত্তর প্রদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। আরও একজন প্রার্থী এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন কাশীরাম, বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেতা। ভিপি জিতলেন। হারলেন সুনীল শাস্ত্রী, থুড়ি রাজীব গান্ধী। আর কাঁশীরাম? ভিপি যেমন রাজনৈতিক চিত্রপট আঁকছিলেন, কাঁশীরাম আঁকছিলেন সামাজিক রূপরেখা। ওই ভোটে তিনি ভিপির রাজনীতিকে সাপোর্ট দিয়েছিলেন। সেই গল্প অন্য কোথাও বলব’খন।
ভিপি সিং, বিদ্যাচরণ শুক্ল, অরুণ নেহরুরা একটি দল গঠন করলেন। নাম দিলেন ‘জনমোর্চা’।
আগস্ট, ১৯৮৮। সাতটি বিপক্ষ দল জোটের মাধ্যমে একটি ন্যাশন্যাল ফ্রন্ট প্রস্তুত করল। ভাজপা এবং বামদলগুলি তখনও এর মধ্যে ছিল না। নিজেকে মুসলিমদের মসীহা মনে করা ভিপি ভাজপার হিন্দুত্বের নীতিকে অপছন্দ করতেন। ন্যাশন্যাল ফ্রন্টের অধ্যক্ষ হলেন এন টি রামারাও, এবং সংযোজক হলেন ভিপি নিজে। পরে চন্দ্রশেখরের জনতা পার্টি, দেবীলাল ও অজিত সিং-এর লোকদল এবং ভিপির জনমোর্চা একাকার হয়ে তৈরি হল জনতা দল।
ভিপি ঘুরে ঘুরে সভা করছিলেন। বোফর্স ইস্যুকে পার্লামেন্ট থেকে পথে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন ভিপি সিং। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভিপি বলছিলেন, রাজীব গান্ধী বোফর্স ঘোটালায় টাকা নিয়ে ‘লোটাস’ নাম দিয়ে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে তাতে জমা করেছেন। ‘লোটাস’ মানে ‘কমল’ বা ‘পদ্ম’। রাজীব নামের মানেও পদ্ম। ক্ষমতায় এলে তিনি এই নিয়ে তদন্ত করাবেন। ছ’মাসের মধ্যে রাজীবকে দোষী সাব্যস্ত করাবেন। চারিদিকে স্লোগান শুরু হল, ‘গলি গলি মে শোর হ্যাঁয়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যাঁয়!’ ভিপি নিজের বক্তব্যশৈলী যথেষ্ট নাটকীব্য ভঙ্গীতে পেশ করতেন। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে মঞ্চ থেকেই সবাইকে দেখিয়ে বলতেন, ‘সেনার জওয়ানদের সঙ্গে ছলনা করা হয়েছে। ওই কামানের গোলা সামনে না গিয়ে পিছন দিকে পড়ে। আমার কাছে সেইসব সুইস অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তালিকা আছে।’ বলে তিনি কাগজটা উঁচুতে মেলে ধরতেন। এসবের মাঝে তিনি কংগ্রেসকে যথেচ্ছ আক্রমণ করলেও ভাজপাকে বন্ধু বা শত্ৰু কোনটাই বানাননি। ভাজপা এবং জনতা দলে উভয়পক্ষেরই ঘনিষ্ঠ কিছু নেতা দুই দলকে কাছে আনার চেষ্টা করছিলেন। একটা সময়ে ভাজপা ভিপির হাত ধরতে রাজী হয়ে গেলে ভিপি কিছুতেই রাজী হচ্ছিলেন না।
এরই মধ্যে জনতা দলের কয়েকজন নেতা সঙ্ঘের ভাউরাও দেওরসের (বালাসাহেব দেওরসজির ভাই) সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মধ্যস্থতা করার অনুরোধ জানালেন। ওই নেতাদের বক্তব্য ছিল আগামী লোকসভা ভোটে জনতা দল সবথেকে বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে সামনে আসবে। তখন রাজীব গান্ধীকে সরকার থেকে সরাতে গেলে ভাজপার সাহায্য দরকার। ভিপির আঙ্গিক থেকে জোটের জায়গা ছিল না, কিন্তু সিট ভাগাভাগি নিয়ে কথা শুরু হয়েছিল। ভিপি বিহার আর ইউপি-তে ভাজপার সঙ্গে সিট শেয়ার করতে চাইছিলেন না। সম্ভবত মুসলিম ভোট বেহাত হওয়ার ভয় কাজ করছিল। ভাজপাও এই দুই রাজ্যকে হাতছাড়া করতে চাইছিল না। তবে এসব কিছুর মাঝে ভাজপা ও জনতা দলের দূরত্ব অনেকটাই কমে এসেছিল। একসঙ্গে প্রেস কনফারেন্সও হচ্ছিল। এমনই একটি প্রেস কনফারেন্সে ভিপি এবং বাজপেয়ীজি দুজনেই উপস্থিত, সাংবাদিকদের তরফ থেকে বাজপেয়ীজির দিকে প্রশ্ন ধেয়ে এল, ‘ভোটে যদি ভাজপা সবথেকে বড় দল হিসেবে উঠে আসে তবে কি আপনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত হবেন?’ বাজপেয়ীজি মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ইস বারাত কা দুলহা ভিপি সিং হ্যাঁয়।’
১৯৮৯ সালে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল। হিমাচল প্রদেশের পালমপুরে ভাজপার বৈঠকে ঠিক হয় যে, দল অযোধ্যার রামজন্মভূমি আন্দোলনকে সমর্থন করবে। হিন্দুত্বের রোডম্যাপ তৈরি করতে থাকা ভাজপা শিবসেনার সঙ্গে জোটে যাওয়ার ব্যাপারেও সম্মতিসূচক সিলমোহর দিল। ২৫শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৯ বোম্বেতে ভাজপার রাষ্ট্রীয় পরিষদের মিটিং ছিল। ওই বৈঠকে ভাজপার সঙ্গে শিবসেনার জোটের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়।
হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় কে কতটা ওতরাতে পারে তাই ছিল দেখার বিষয়। রাজীব গান্ধী বিহিপ-কে শ্রীরামজন্মভূমিতে রামমন্দিরের শিলান্যাস করার অনুমতি দিলেন। লোকসভা ভোটের ক’দিন আগে বজরঙ্গ দলের প্রায় ১০,০০০ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে বিহিপ বাবরি মসজিদের কাছাকাছি একটি স্থানে মাটি খুঁড়ে মন্দিরের ভিতের জন্য ইট গাঁথল।
রামমন্দিরের জন্য ইট গাঁথা হলেও কংগ্রেসের দুর্গ থেকে ইট খুলে যেতে দেখা গেল নির্বাচনের ফলাফলে। ১৯৮৪ সালের ভোটে ৪০১ আসনে জয়ী কংগ্রেস নেমে এল ১৯৬-এ। জনতা দল পেল ১৩৯টি আসন। ভাজপার ঝুলিতে এল ৮৫।
ফল বিশ্লেষণের পরে আডবানিজি দিল্লিতে দলের আভ্যন্তরীন বৈঠকে বললেন, ‘…ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে নিয়ে অনেক তর্ক হয়েছে, কিন্তু ভাজপা সবসময় ইতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই বলেছে। তবে এর মানে হল সকলের জন্য ন্যায়, কাউকে তুষ্টিকরণ নয়। ত
শাহ বানো মামলায় রাজীব গান্ধী সুপ্রিম কোর্টের রায়কে নস্যাৎ করার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। ভাজপা তখন থেকেই ‘সমান আচার সংহিতা’র কথা তুলছিল। কিন্তু যখন দল সরকার গ্রহনে ভূমিকা গ্রহণ করল, তখন এই নিয়ে উচ্চবাচ্য করল না। হয়তো ক্ষমতায় কুলোয়নি। হতে পারে বাজপেয়ীজি নিজের সেকুলার ইমেজ খোয়াতে নারাজ ছিলেন, হতে পারে আডবানিজি নিজেকে মুসলমান-বিরোধী রূপে তুলে ধরতে চাননি।
তবে আডবানিজি অন্য কিছু ভাবছিলেন। বড় কিছু করার কথা। ৮৫ জন এমপি নিয়ে যা করা সম্ভব নয় এমন কিছুর কথা। আডবানিজি এবারের ভোটে জিতে লোকসভায় প্রবেশ করেছিলেন। কিং মেকার হিসেবে গুরুত্ব বেড়েছিল। প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। এবার দরকার ছিল ক্ষমতায় আসার। ফুলের দলকে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল থেকে দেশের এক নাম্বার দলে পরিণত করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। অবশ্য সেই লক্ষ্যের পথে অন্তরায়ও ছিল তিনটি।
কী কী?
মণ্ডল, কমণ্ডল এবং মার্কেট।
*****
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন