সেই ফুলের দল – ৬

অভীক মুখোপাধ্যায়

১৯৬৫ সালের কথা। গুরুজি গোলওয়ালকর নাগপুর থেকে দিল্লিতে গেলেন। ঝাণ্ডেওয়ালাঁ-তে সঙ্ঘের দফতরে তাঁর নেতৃত্বে একটি মিটিং বসল। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘বাজপেয়ীর জীবনে নারী’ মিসেস কৌলের ব্যাপারটাকে সঙ্ঘের তরফ থেকে কীভাবে দেখা হবে। উত্তর প্রদেশে সঙ্ঘের প্রান্ত প্রচারক তখন ভাউসাহেব দেওরস। তিনি বললেন, ‘যদ্দিন লোক-জানাজানি না-হচ্ছে তদ্দিন ঠিক আছে।’ জনসঙ্ঘের খাজাঞ্চি তখন নানাজি দেশমুখ, তিনি আবার এই যুক্তি মানতে চাইলেন না, বললেন— ‘আমার মনে হয়, ও বরং রাজকুমারী কৌলকে বিয়ে করে নিক।’ পটনার একটি হোটেলে বসে নানাজি একথা আগেও অটলজিকে বলেছিলেন। আসলে নানাজি ঘটকালি করতে ভালবাসতেন। প্রেমিক-প্রেমিকাদের মিলন ঘটিয়ে দেওয়ার শুভ কাজ তিনি আগেও একাধিক বার করেছেন। লোকে বলে, শত্রুঘ্ন সিনহা আর পুনমের বিয়েটা নানাজির কথায় ভিত্তি করেই এগিয়েছিল। রাজনীতির অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, মধ্যপ্রদেশের এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতীয় জনতা পার্টির একজন প্রাক্তন সেক্রেটারির মধ্যে ঘনীভূত প্রেমের সম্পর্ককেও নানাজি পরিণতি দিতে চেয়েছিলেন, তবে সেইবারে তিনি সফল হননি। প্রেমে কিছু অন্তরায় ছিল। প্রেমী- যুগলের একজন কিঞ্চিৎ মানাভিমানেই সংসার জীবন থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। গল্পটা আর এগোয়নি তাই।

ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নানা জনের বক্তব্য শোনার পর গুরুজি গোলওয়ালকর বাজপেয়ী-কৌল প্রসঙ্গে নিজের মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর মত ছিল, বাজপেয়ী

যেন এধরণের সম্পর্ক থেকে সরে আসেন। বাজপেয়ীজি রাজী ছিলেন না। কঠোর কোনও পদক্ষেপ নিতে পারেননি গুরুজি। নিন্দুকে বলে, বাজপেয়ী ব্ৰাহ্মণ বলেই তিনি শাস্তি পাননি, একমাত্র ব্রাহ্মণরাই ব্রাহ্মণ্যবাদ ভাঙলে শাস্তি পায় না।

কিন্তু শাস্তি কি সত্যিই পাননি অটলবিহারী?

সঙ্ঘের মধ্যে তাঁর আসন টলে গিয়েছিল। উচ্চতম কোটির যে বলয় সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত, সেখান থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যে বাজপেয়ী সঙ্ঘের জন্যে জাতিবাদ ত্যাগ করেছিলেন, সেই সঙ্ঘ তাঁকে তাঁর সম্ভাব্য প্রেমের জন্যে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। ভয়ও নেই, ভরসাও নেই গোছের একটি সম্পর্কের সুতোয় ঝুলতে আরম্ভ করে দিল বাজপেয়ী-সঙ্ঘ বেরাদরি। এবং সম্ভবত এখান থেকেই আরম্ভ হল রাজনৈতিক বাজপেয়ীর প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার কাহিনিটা। প্রতিষ্ঠান আর ব্যক্তির দড়ি টানাটানিতে প্রতিষ্ঠান সর্বদা এগিয়েই থাকে, কিন্তু এক্ষেত্রে একক মেধার জোরেই সঙ্ঘের সাথে টানাপোড়েনে আজীবন স্পর্ধা দেখিয়ে যাবেন বাজপেয়ী। আসলে জন্ম-প্রেমিক বাজপেয়ীর কাছে ভালোবাসাই সবকিছু ছিল।

দাঁও পর সব কুছ লগা হ্যায়,
রুক নহিঁ সকতে।
টুট সকতে হ্যায় মগর হম,
ঝুঁক নহিঁ সকতে।

তবে গুরুজির মনে শুধু বাজপেয়ীর প্রেম-প্রসঙ্গই ছিল এমনটাও নয়, তিনি হিন্দুত্বের লড়াইটাকে একটু অন্য আঙ্গিকে দেখতে চাইছিলেন। একদম জন্মলগ্ন থেকেই শ্রী সাভারকর কিংবা ডক্টরজির হিন্দুত্বের নীতিতে ভর করে চলে আসছিল সঙ্ঘের নীতি। সঙ্ঘের নীতিতে বদল আনার প্রয়োজন অনুভব করছিলেন গুরুজি। এবার তিনি সঙ্ঘের গায়ে ভারতের সনাতন ধর্মের ছোঁয়া চাইছিলেন। গুরুজি নিজে রামকৃষ্ণ মিশনে দীক্ষিত হয়েছিলেন। সন্ত-সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি তিনি স্বাভাবিক একটা আকর্ষণ অনুভব করতেন বরাবরই। হিন্দুত্বের রাজনীতিতে এবার তিনি হিন্দু সন্তদের আনতে চলেছিলেন।

১৯৬৪ সালের ২৯শে আগস্ট। পোয়াই, বোম্বে। গুরুজির ডাকে সাড়া দিয়ে এসে উপস্থিত হলেন এক প্রাক্তন বিপ্লবী। প্রথম জীবনে তিনি সাংবাদিকতার কাজও করেছিলেন। পরবর্তী কালে প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে তিনি নির্মোহী হতে সন্ন্যাস নেন। একটি মিশনের স্থাপনা করেন। প্রাক্তন এই বিপ্লবী পুরুষের সন্ন্যাস জীবনের নাম স্বামী চিন্ময়ানন্দ, তাঁর মিশনকে সকলে চেনে চিন্ময় মিশন নামে। গুরুজি এবং স্বামী চিন্ময়ানন্দের সংকল্পে জন্ম নিল ওয়ার্ল্ড হিন্দু কাউন্সিল। হিন্দিতে তর্জমা করলে নামটা চেনা-চেনা ঠেকবে— বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ট্যাগলাইনে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হল, তুমি ধর্মকে রক্ষা করো, ধর্ম তোমাকে রক্ষা করবে— ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ। মনু সংহিতা থেকে তুলে আনা এই পঙক্তি আসলে শতধারায় বিভাজিত সনাতন ধর্মের সাধু- সন্ন্যাসী-মহাত্মাদের একজোট করার জন্যে ব্যবহার করা হয়েছিল। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, শ্রী সাভারকরের নীতি থেকে সরে আসার একটা প্রচ্ছন্ন প্রয়াস দেখালেও তাঁর উপপাদ্য কিন্তু বহাল ছিল। শ্রী সাভারকর ভারতভূমিতে জন্ম নেওয়া সকল ধর্মকে এবং সকল ধর্মধারীকে ভারতীয় বলতে চেয়েছিলেন। এক্ষেত্রেও তা-ই বলা হচ্ছিল। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ছাতার তলায় কেবলমাত্র সনাতন হিন্দু ধর্মই নয়, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ধর্মকেও এনে ফেলা হল। জায়গা পেল না ইহুদি, ইসলাম কিংবা খ্রিস্ট-মত। আসলে ভারতজাত ধর্মগুলির মাথা সৃষ্টির প্রয়াসেই বিহিপ-এর জন্ম হয়েছিল। ইহুদিদের জন্যে জেরুসালেম ছিল, ইসলামের জন্যে মক্কা ছিল, খ্রিস্টানদের জন্যে ভাটিকান। সঙ্ঘ বিহিপ-এর মাধ্যমে হিন্দুদের ভাটিকান সৃষ্টি করতে চাইছিল।

বিহিপ-এর পক্ষ থেকে সোচ্চার কণ্ঠে বলা হল, ‘আমরা ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য ও চিহ্নগুলিকে পুনরুদ্ধার করব।’ চিহ্ন অর্থে মন্দিরগুলির কথা বলা হয়েছিল। এই ভাষণ ধীরে ধীরে আন্দলনের রূপ নিতে থাকবে। প্রায় দুদশক ব্যাপী আন্দোলনের পরে দেখা দেবে রামজন্মভূমি নিয়ে প্রবল সংগ্রাম। তবে বিহিপ-এর প্রাথমিক অ্যাজেন্ডায় ছিল গোহত্যা বন্ধ করতে হবে। বিহিপ-এর আবির্ভাবের আগে থেকেই নীরবে একটা আন্দোলন চলছিল এই নিয়ে, কিন্তু তা ভরবেগ লাভ করল বিহিপ আসার পরেই।

৭ই নভেম্বর, ১৯৬৬। লালবাহাদুর শাস্ত্রীজির মৃত্যুর পরে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সংগঠিত নেতৃত্বে সংসদের উদ্দেশে একটি পদযাত্রা বেরোল। গোহত্যা বন্ধ করতে হবে। ভারতীয় জন সঙ্ঘ, আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, আর্য সমাজ এবং সাধু-সন্নাসীদের জমায়েত দেখা দিল দিল্লিতে। সকাল থেকে আবহ উৎসবের মতো ছিল। এদিনের আন্দোলনের নেতা হিসেবে করপাত্রী মহারাজকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তিনি ভাষণ শেষ করতেই মঞ্চে উঠলেন স্বামী রামেশ্বরানন্দ সরস্বতী। ইনি এক বর্ণময় চরিত্র। আর্য সমাজের সন্ন্যাসী। স্বামীজির সন্ন্যাস ধারণের আগের জীবনের কথা কমই জানা যায়। তবে হায়দ্রাবাদে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহী ছিলেন। পরবর্তী কালে অবশ্য গান্ধীবাদ থেকে সরে এসে তিনি চরমপন্থাকেই পছন্দ করেছেন। রাজনীতিতে আগ্রহী হয়েছেন সন্ন্যাস গ্রহণের পরেও। বেছে নিয়েছেন ভারতীয় জনসঙ্ঘকে। কারনাল থেকে লোকসভার সাংসদ নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে গিয়েছিলেন। ইনি কোনও বেতন, কোনও ভাতা কিংবা কোনও সরকারি সুবিধা নিতেন না। সরকার থেকে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ দান করে দিতেন ভারতের প্রতিরক্ষা কোষে। নিজে দিল্লির সীতারাম বাজারের আর্য সমাজের মন্দিরের একটি ঘরে থাকতেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে সংসদে যেতেন। সরকারি ক্যান্টিনে কখনও খাননি। নিজের হাতে করে দুটো রুটি বানিয়ে নিয়ে যেতেন, সেই খাবারই খেতেন খিদে পেলে। একবার ইন্দিরা গান্ধী সমস্ত সাংসদদের একটি পাঁচতারা হোটেলে আমন্ত্রণ করেছিলেন। মহাভোজের আয়োজন। সকলে যখন বুফে টেবলের দিকে এগিয়ে গেলেন, তখন রামেশ্বরানন্দকে দেখে হতচকিত হয়ে গেলেন শ্রীমতী গান্ধী। স্বামীজি তখন নিজের সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া বাজরার রুটি খাবার জন্যে মাটিতে বসে পড়েছেন। শ্রীমতী গান্ধী বলেছিলেন, ‘এখানে সাংসদদের খাবার সমস্ত আয়োজন করা হয়েছে।’ স্বামীজির উত্তর ছিল, ‘এসব আমার জন্যে নয়। আমি বরং একটু আচার আর জল চেয়ে নিচ্ছি।’ ওই দিয়েই ক্ষুন্নিবৃত্তি করে হোটেলে আচার আর জলের দাম নিজেই মিটিয়ে দিয়েছিলেন মহারাজ।

স্বামীজি টানা কয়েকদিন ধরে সংসদে গোহত্যা বন্ধ করার আবেদন জানিয়ে এতটাই বিকট পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন যে তাঁকে দশদিনের জন্যে সংসদ-হল থেকে নিলম্বিত করে দেওয়া হয়। প্রখর বক্তব্যে মঞ্চ কাঁপিয়ে দিলেন স্বামীজি। উগ্র কথার ধারে জনতা তখন ফুঁসছে। স্বামীজি বলছিলেন, ‘উনহে শিকসা দেনা হ্যাঁয়!’ পার্লামেন্ট হাউজ বন্ধ করিয়ে দিয়ে উচিত শিক্ষা দেওয়ার এই মন্তব্য শুনে উৎসবের আবহ পালটে কেমন একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ রূপ নিতে শুরু করে দিল। যেহেতু সর্বদলীয় গোরক্ষা মহা-অভিযান সমিতির ডাকে ভারতীয় জনসঙ্ঘের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে থেকে একজন মঞ্চে উঠে এসে জনগণকে শান্ত হওয়ার আপিল করলেন। ভদ্রলোক বরাবরই কথার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে বিশ্বাসী। কার কথা বলছি বলুন তো?

সেদিন যাতে উপস্থিত জনতা উন্মত্ত না হয়ে পড়ে, সেজন্যে সমানে আবেদন করেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তায় কুশপুত্তলিকা জ্বালানো আরম্ভ হল। তারপর আগুন লাগানো হল পথচলতি গাড়িতে। জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেল বেশ কিছু দোকানপাট। সরকারি দফতরে ভাঙচুর হল। ভিড় এবার এগোচ্ছিল সংসদ ভবনের দিকে। পুলিশ এবার গুলি চালাল। সাতজনের মৃত্যু ঘটল, আহতের সংখ্যাটা একশো পার করে গিয়েছিল।

পরে সংসদে এক কংগ্রেস এমপি বলেছিলেন, গোহত্যা বিরোধী অভিযানের নেতারা সবাই মন্ত্রীদের পুড়িয়ে মারার কথা বলে উন্মত্ত জনগণকে উসকানি দিয়েছিল। অটলবিহারী বাজপেয়ী তখন ওই সাংসদের কথার তীব্র বিরোধ করেছিলেন।

গোহত্যা বিরোধী আন্দোলন অস্ত গেলেও এক অদ্ভুত রাজনীতির উদয় হচ্ছিল জনসঙ্ঘের অন্দরমহলে। আন্দোলনের চরিত্র বদল করে জনসঙ্ঘ নিজের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনছিল। সঙ্ঘ আর জনসঙ্ঘ সাধু-সন্তদের হাত ধরে রাজনীতির ময়দানে প্রথমবারের জন্যে যে খেলা শুরু করেছিল, তা পরিপূর্ণ হতে চলেছিল অযোধ্যার বুকে। তখন আর কে জানত যে, একদিন এই হাত ধরাধরি বাবরি মসজিদকে ধুলিস্মাৎ করে দেবে?

.

জনসঙ্ঘ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দেখানো লিক ধরে না-চলে এবার হিন্দুত্বের দিকে ঝুঁকছিল। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে জনসঙ্ঘ লড়ল গোহত্যা বন্ধের দাবি নিয়ে। ‘৬২ সালের ভোটে অটলবিহারী বাজপেয়ী বলরামপুর লোকসভা সিটে কংগ্রেসের সুভদ্রা জোশির কাছে হেরেছিলেন, এবারে আবার সেখানেই দাঁড়ালেন। ইস্যু কী ছিল তা আগেই লিখেছি।

একেবারে গোড়ার দিকে জনসঙ্ঘের রাজনীতিতে  গ্বালিয়রের রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়ার প্রবেশের কথা লিখেছিলাম। মনে আছে নিশ্চয়ই। রাজমাতা একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু নারী। আজ এই ব্রত করছেন, তা খবরে আসছে। কাল ওই উপবাস, সেটাও সংবাদের শিরোনামে। তিনি হয়ে দাঁড়ালেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ট্রাস্টি। রাজনৈতিক দল, আন্দোলন ইত্যাদি চালিয়ে জেতে গেলে প্রচুর অর্থের দরকার পড়ে, বিপুল অর্থ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন রাজমাতা। সেই টাকা তিনি তুলে দিয়েছিলেন নানাজি দেশমুখের হাতে। বিজয়ারাজে না-থাকলে ‘৬৭ সালের ভোটের ফলাফল অন্য ধরণের হতে পারত।

জনসঙ্ঘ তখন ক্রমশ জাগছিল, আর কংগ্রেস প্রস্তুত হচ্ছিল কোমায় প্রবেশের জন্যে। নেহরুজি চলে যেতেই আরম্ভ হল অন্তর্দ্বন্দ্ব। নেহরু-তনয়া প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরার হাতে আসছিল ভারতের রাশ। প্রধানমন্ত্রী রূপে উত্তরাধিকারে তিনি লালবাহাদুর শাস্ত্রীর হাত থেকে এমন এক ভারত পেয়েছিলেন, যে দেশ তখন খাদ্যাভাবের সঙ্গে যুঝছে। অন্তিম ভারত-পাক যুদ্ধের অনির্ণয় দেশের আত্মবিশ্বাসকে শক্তি দিতে পারছিল না। আর দলনেতা ইন্দিরার সামনে তখন দুটো চ্যালেঞ্জ-

১. পার্টির ভেতরকার কলহ মেটানো।

২. জনসঙ্ঘের রাজনীতির মোকাবিলা করা। কুড়ি বছর অনায়াসে রাজত্ব করে আশা কংগ্রেস এবার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে চলেছিল। রাজনীতি করতে গেলে বিরোধী পক্ষের হাতে একটা ন্যারেটিভ থাকার দরকার, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের হাত ধরে জনসঙ্ঘ সেই ন্যারেটিভ জোগাড় করে ফেলেছিল। ইন্দিরা কাউন্টার ন্যারেটিভ সৃষ্টি করার চেষ্টা করলেন। জিগির তোলা হল, ‘ভোট নহিঁ দেঙ্গে হম, গান্ধী কে হতয়ারে কো- গান্ধীজির খুনিদের আমরা ভোট দেব না।’

১৯৬৭ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল কী দাঁড়াল?

’৬২ সালের ভোটে ৩৬১টি আসনের বিজেতা ছিল কংগ্রেস। ’৬৭ সালের ভোটে কংগ্রেসের সাংসদ সংখ্যা হয়ে দাঁড়াল ২৮৩। ভারতীয় জনসঙ্ঘ এবারে পঁয়ত্রিশ জন সাংসদকে পেল। বলরামপুরের সিট থেকে বিজয়ী হলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। সকলে ভাবছিল, অটল এবারে দলে দীনদয়াল উপাধ্যায়জির উত্তরসূরী রূপে উঠে আসবেন। কিন্তু সকলের অলক্ষ্যে একটা লড়াই চলছিল। বলরাজ মাঢোক নিজেকে অটলবিহারীর প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছিলেন। তিনিও সেবারে ভোটে জিতে সংসদে গিয়েছিলেন।

অটলবিহারীর ছত্রছায়ায় আডবানির রাজনৈতিক দূরদর্শীতা ক্ৰমশ বাড়ছিল। আডবানির নেতৃত্বে জনসঙ্ঘ দিল্লিতে তিনটি ভোটে বেশ ভালো ফল করেছিল। লোকসভা ভোট, দিল্লির মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন ইলেকশন এবং মেট্রোপলিট্যান কাউন্সিলের ভোটে। আডবানি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেন, পদাধিকার বলে এবং তৎকালীন দিল্লির প্রশাসনিক পরিকাঠামো মেনে তিনিই হলেন দিল্লি অ্যাসেম্বলির স্পিকার। পাণ্ডারা রোডের কাছে একটি সরকারি বাসভবন তাঁর জন্যে বরাদ্দ করা হল। এক দশক আগে সঙ্ঘ থেকে আসা আডবানি দায়িত্ব নিয়েছিলেন একজন নব্য সাংসদের সেক্রেটারি রূপে, সেই যাত্রা তাঁকে লুটিয়েন্স দিল্লির পাওয়ার করিডরে এনে উপনীত করল।

আডবানির রাজনৈতিক চরিত্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেও অটলের কাছে তিনি তখনও সেই ‘অধস্তন’ আডবানি। তবে তখনও এই সম্পর্কে বন্ধুত্বের কোনও ধরণের অভাব দেখা দেয়নি। বরং অন্য একজনের সঙ্গে ক্রমশ দূরত্ব বাড়ছিল অটলজির। প্রথমে নেহরুভিয়ান এবং পরবর্তী কালে ইন্দিরা-প্রিয় অটলবিহারীর রাজনীতির অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন কট্টর হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী, কলহপ্রিয় বলরাজ মাঢোক

জনসঙ্ঘে তখনও সঙ্ঘ পরিবার থেকে আসা রেফারির ভূমিকা পালন করে চলেছিলেন দীনদয়াল উপাধ্যায়। নিষ্কলুষ চরিত্র ভদ্রলোকের। অর্থলোভ নেই। জীবনচর্যা এমন যে তার উল্লেখ না-করে পারা যায় না। দীনদয়ালজির মাত্র দু’খানা কুর্তা ছিল। প্রতিদিন একটা কুর্তা কেচে না-রাখলে পরেরদিন কী প’রবেন তা নিয়ে চিন্তা করতে হতো।

১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসের কালিকট সম্মেলনে বলরাজ মাঢোককে প্রতিস্থাপিত করে জনসঙ্ঘের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন দীনদয়াল উপাধ্যায়। অসামান্য ধী-শক্তি সম্পন্ন উপাধ্যায়জির সামনে তখন অনেক কাজ, সারা দেশে দৌড়ে বেড়ানো আরম্ভ করলেন।

.

১০ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৮। সন্ধেবেলায় লখনউ থেকে পটনাগামী শিয়ালদা এক্সপ্রেসে চড়ে বসলেন শ্রী উপাধ্যায়। ট্রেন বারাণসী পেরোলো রাত ১:৪০। কাশীতে পাঁচ মিনিটের জন্যে থামল। মোগলসরাই ঢুকতে-ঢুকতে ঘড়ি ছুঁল রাত ২:১০। ইত্যবসরে দেখা গেল যে, দীনদয়াল উপাধ্যায় নিজের কেবিনে নেই। মিনিট দশেক পরে মোগলসরাই স্টেশনের যে প্ল্যাটফর্মে শিয়ালদা এক্সপ্রেস দাঁড়িয়েছিল, তা থেকে ৭৪৮ ফুট দূরের একটি ট্র্যাকশন পোলের গোড়ায় তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হল। হইচই বেঁধে গেল।

দীনদয়াল উপাধ্যায়জি খুন না হয়ে গেলে হয়তো ভারতের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। একজন বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে খুন করার হাজারটা কারণ থাকতে পারে, কিন্তু কে খুন করল তাঁকে?

.

রাজনীতির খেলায় একটি চাঞ্চল্যকর অধ্যায় আসতে চলেছিল। দীনদয়াল উপাধ্যায়জি যখন খুন হন, গুরুজি গোলওয়ালকর তখন ছিলেন এলাহাবাদে। সঙ্ঘের একটি শাখা নিয়ে তিনি ব্যস্ত ছিলেন। সঙ্ঘেরই এক স্বয়ংসেবককে তিনি বলেন, ‘এখুনি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে আমায় বারাণসী নিয়ে চলো। শিবির শেষ হলেই আমি বেরিয়ে পড়ব। আমি পৌঁছনোর আগে যেন পোস্ট মর্টেম না করা হয়।’ সেইসময় সংসদে অধিবেশন চলছিল। অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং বলরাজ মাঢোক দিল্লিতে ছিলেন। দুঃসংবাদ পেয়েই তাঁরা দুজনে এয়ারফোর্সের বিশেষ বিমানে চড়ে বারাণসীর উদ্দেশে রওনা দেন। মাঢোক পরে দাবি করেছিলেন যে, তিনি বারাণসী থেকে মোগলসরাইতে গিয়ে উপস্থিত হলেও অটলবিহারী বারাণসী থেকেই উধাও হয়ে গিয়েছিলেন।

দীনদয়াল উপাধ্যায় কিন্তু কোনও সাধারণ নেতা ছিলেন না। দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে বিগত পনেরো বছর ধরে ঢেলে সাজিয়েছিলেন তিনিই। জনসঙ্ঘে তিনি ছিলেন সিংহাসনের পিছনের শক্তি। এহেন ব্যক্তির খুনের ঘটনার তদন্তভার সিবিআই হাতে নিল। সেই কাজ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখার জন্যে কমিশন বসল। সবাই শেষ পর্যন্ত একই কথা বলল, এই খুন নিতান্ত ছিঁচকে চোরদের কাজ। ছিনতাই করতে গিয়ে বাধা পাওয়ায় তারা দীনদয়ালজিকে আক্রমণ করে, যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়ানক হয়।

মাঢোক কিছুতেই এই তত্ত্ব স্বীকার করলেন না। তিনি বলেছিলেন যে, যখন তিনি মোগলসরাইতে গিয়ে পৌঁছান, তখন তাঁকে দীনদয়ালজির কুর্তা, গেঞ্জি আর উলের সোয়েটার দেখানো হয়েছিল। কোথাও রক্তের কোনও দাগ ছিল না। পরে ময়নাতদন্তের শেষে যখন তিনি শ্রী উপাধ্যায়ের মৃতদেহ দেখেন, তখন ঘাড়ের কাছে খুব ছোট্ট একটি রক্তের জমাট বাঁধার দাগ দেখতে পান। তাঁর মতে দীনদয়াল উপাধ্যায়জিকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছিল। সাদাচোখে এগুলো দেখে এবং নিজের মনে দুই আর দুইয়ে চারের হিসেব মিলিয়ে তিনি সোচ্চারে ঘোষণা করে বসলেন, দীনদয়াল উপাধ্যায়জিকে ঠাণ্ডা মাথায়, সুপরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। পুরো ব্যাপারটাই রাজনৈতিক। মাঢোকের বক্তব্য অনুসারে বাজপেয়ী এই ঠান্ডা মাথায় খুনের তত্ত্বটিকে খারিজ করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘উপাধ্যায় বাজপাখির মতো লড়াকু ছিলেন। তাঁকে মারতে এলে তিনি সহজে হার মানবেন না। এটা পরিকল্পিত হত্যা হতে পারে না।’

বলরাজ মাঢোকের তত্ত্ব যে শুধু বাজপেয়ীর কাছে অস্বীকৃত হয়েছিল তা-ই নয়, সরকারি রিপোর্টেও কিন্তু এই তত্ত্বের কোনও গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যায়নি। সঙ্ঘের পক্ষ থেকে যারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের কথানুসারে দীনদয়ালজির শরীরে ওই ধরণের কোনও ছিদ্র বা রক্তজমাট চিহ্ন দেখা যায়নি। গুরুজি গোলওয়ালকর দীনদয়ালজির মরদেহ দেখে ব্যথিত স্বরে বলেছিলেন, ‘হে প্রভু, যদি ওঁকে এত তাড়াতাড়ি কাছেই টেনে নেবে, তাহলে পাঠিয়েছিলে কেন?’

দীনদয়াল উপাধ্যায় নাহয় চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর পর?

কে হবেন জনসঙ্ঘের পরবর্তী মাথা?

জনসঙ্ঘ প্রথম থেকেই একটা কাজ করে এসেছে। নিজের রাশ নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে একটা শক্তপোক্ত রিজার্ভ বেঞ্চ প্রস্তুত রেখেছে সদা। তাই একাধিক নাম উঠে আসছিল। কে.এল.শর্মা, এম.এল.সোঁধি, নানাজি দেশমুখ, অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং অতি অবশ্যই বলরাজ মাঢোক। কিন্তু একান্নবর্তী পরিবারের সব ভালোদিকের শেষে এক আধখানা খারাপ দিক-ও থাকে। পিতার মৃত্যুর পরে সন্তানেরা পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে ঝগড়াও করে। কেউ কারো দিকে অভিযোগের আঙুল তোলে, কেউ-কেউ শুধু অধিকার বুঝে নেয়। এক্ষেত্রেও তা-ই হতে চলেছিল। বলরাজ মাঢোক আঙুল তুললেন অটলবিহারীর দিকে। তিনি বললেন, অটলবিহারী বাজপেয়ী দীনদয়াল উপাধ্যায়জিকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%