সেই ফুলের দল – ২৩

অভীক মুখোপাধ্যায়

বর্তমান কে মোহজাল মেঁ আনে বালা কল ন ভুলায়েঁ।
আও ফির সে দিয়া জলায়েঁ।।

-অটলবিহারী বাজপেয়ী

২৮শে সেপ্টেম্বর ২০১৪। নিউ ইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন। প্রবাসী ভারতীয় বিশেষত গুজরাতিদের ভিড় উপচে পড়ছিল। শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক নয়, আমেরিকার বিভিন্ন জায়গা থেকেই দলে দলে লোক আসছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দেখতে, দেখা করতে, এবং তাঁর বক্তব্য শুনতে। কেউ মোদিকে ‘বিকাশ পুরুষ’ বলছিল, আবার কেউ বলছিল ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’। ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গার পর ২০০৫ সালে আমেরিকা নরেন্দ্র মোদিকে ভিসা দিতে অস্বীকার করে। সেই মোদিই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের জন্য আমেরিকা গেছেন। হয়তো মোদিজি মনে মনে হাসছিলেন আর আমেরিকার উদ্দেশে বলছিলেন, ‘ওয়াক্ত ওয়াক্ত কি বাত হ্যায়, বরনা তেরি কেয়া ওউকাত হ্যায়?’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সমেত গোটা আমেরিকান প্রশাসন মোদি জিকে স্বাগত জানাবে বলে দাঁড়িয়ে ছিল। অনেক ধরণের প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছিল। এসবের আগে সংযুক্ত রাষ্ট্র সঙ্ঘের মহাসভায় মোদির ভাষণ হল। ম্যাডিসন স্কোয়ার ফেটে পড়ছিল ‘মো-দি… মো-দি…’ রবে। পিছনে একটা জায়ান্ট টিভি স্ক্রিনে একটা ভিডিওতে ভারতের অগ্রগতির গাথা, ভাজপার তরফ থেকে প্রথম প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং তাঁর সরকারের প্রশংসা বিধৃত করা হচ্ছিল। নরেন্দ্র মোদি নিজের ভাষনেও একাধিকবার অটলবিহারীর কথা উল্লেখ করলেন।

মোদি এর আগেও আমেরিকায় এসেছেন। দীর্ঘদিন থেকেছেন। পোখরানের পর মার্কিন কংগ্রেসে প্রবাসী (গুজরাতি) ভারতীয়দের লবি দিয়ে স্যাংশন তোলাতে তাঁর যে বিরাট ভূমিকা ছিল সেই উল্লেখ আমি আগেই করেছি।

২০০০ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী মার্কিন মুলুকে গেছেন। প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে তাঁর একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা। তখন মোদি গুজরাত থেকে নিষ্কাশিত হয়ে রাজনৈতিক অজ্ঞাতবাসে আমেরিকায়। তাই তিনি অনুষ্ঠানে আসেননি। এক গুজরাতি বন্ধুর বাড়িতে অটল-মোদি সাক্ষাৎ হল। অটল প্রশ্ন করলেন, ‘এভাবে পালালে কাজ হবে না, কত দিন থাকবেন এখানে? দিল্লিতে চলে আসুন…’। বাজপেয়ীর সঙ্গে দেখা হওয়ার অব্যবহিতকাল পরেই মোদি দিল্লিতে ফিরে আসেন। বনবাস শেষ হল। শুরু হল রাজযোগ।

.

নরেন্দ্র মোদি কে, কীভাবে রাজনীতিক নরেন্দ্র মোদির জন্ম হল তা নিয়ে বিশদে লিখতে বসলে গোটা একটা বইও কম পড়ে যাবে। আমি আপাতত সেদিকে যাব না। এখানে শুরু করব গুজরাতে তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া থেকে, আর শেষ করব… থাক, সেটা শেষ পর্যন্ত পড়ে আপনারাই না হয় উদ্ধার করে নেবেন।

.

১লা অক্টোবর ২০০১। সকালবেলা। হাওয়ার তাপ এখনও পুরোপুরি উধাও হয়নি। হবে কী করে? শ্মশানভূমির উত্তাপ কখনও কমে না। নীরব কয়েকটি মুখ পরস্পরের দিকে তাকাতাকি করছিল। প্রত্যেকের চোখ প্রশ্ন ছিল, কিন্তু প্রত্যেকেই জানত উত্তর কারো কাছেই নেই। দিল্লির একটি শ্মশানে একটি চিতা জ্বলছিল। একটি প্রাইভেট চ্যানেলের একজন ক্যামেরাম্যান গোপাল বিষ্ট মারা গিয়েছিলেন, তাঁর অন্তিম সৎকারের কাজ চলছিল। তাঁর কয়েকজন রিপোর্টার বন্ধু এবং দু- একজন অখ্যাত রাজনীতিক ছাড়া বিশেষ কেউ উপস্থিত নেই। দাহকাজের মাঝেই একজন নেতার মোবাইল ফোন বেজে উঠল।

রিসিভ করতেই ফোনের ওপার থেকে পরিচিত কণ্ঠের প্রশ্ন ভেসে এল, ‘কোথায় আছেন?’

‘শ্মশানে।’

‘এসে দেখা করুন।’

এটুকুই কথা হয়েছিল। ফোন কেটে গেল। সেদিন কে আর অত খেয়াল করেছিল যে, একজন শ্মশানবন্ধুকে করা ফোনে ভারতের ইতিহাস বদলে যেতে চলেছে।

গোপাল বিষ্ট বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন। হয়েছিল কি, কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতা মাধবরাও সিন্ধিয়া বিমানে করে ‘পরিবর্তন যাত্রা’য় অংশগ্রহণের জন্য দিল্লি থেকে কানপুরে যাচ্ছিলেন। তারিখ ছিল ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০০১। দুপুর ১টা বেজে ৫০ মিনিটে বিমানটির নামার কথা ছিল মৈনপুরীতে। ঠিক তার পনেরো মিনিট আগেই বিমানটি দুর্ঘটনাগ্রস্থ হয়। সিন্ধিয়া ছাড়াও বিমানের পাইলট, কো পাইলট, সিন্ধিয়ার ব্যক্তিগত সচিব রুপিন্দর সিং, তিনজন সাংবাদিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সঞ্জীব সিনহা, ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর অনু শর্মা, ‘আজতক’-এর রঞ্জন ঝা এবং ক্যামেরা ম্যান গোপাল বিষ্ট, মোট আটজনের মৃত্যু ঘটে। খারাপ আবহাওয়ার ফলে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছিল।

মাধবরাওয়ের মৃত্যু নিঃসন্দেহে কংগ্রেসের কাছে বড় ধাক্কা ছিল। সারা দেশ শোকসন্তপ্ত। মরদেহগুলিকে নিয়ে আসার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আইন মন্ত্রী অরুণ জেটলি, পিএমও কার্যালয়ের রাজ্যমন্ত্রী বিজয় গোয়েল এবং কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সালমান খুরশিদ গিয়েছিলেন।

উত্তরপ্রদেশের মৈনপুরীর একটি গ্রামের কাছে প্লেনটি দুর্ঘটনায় পড়ে। মৃতদের পার্থিব শরীর সড়কপথে আগ্রায় আনা হয়েছিল। সেখান থেকে বায়ুসেনার বিমানে করে দিল্লিতে। সিন্ধিয়ার অন্তিম সৎকারের জন্য  গ্বালিয়রের সেই স্থানটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল, যেখানে রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়ার সমাধি আছে। মাধবারওয়ের অন্তিম যাত্রায় উপস্থিত ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী, সোনিয়া গান্ধী সমেত দেশের দিগগজ রাজনীতিকের দল।

টিভি চ্যানেলে তখন শুধু সিন্ধিয়াকে নিয়েই খবর চলছিল। যে যেভাবে পারছিলেন তাঁকে স্মরণ করছিলেন। নিজের নিজের জীবন থেকে কাহিনি উদ্ধৃত করছিলেন। সবাই  গ্বালিয়রের দিকে তাকিয়ে ছিল, সবাই গ্বালিয়র ছুঁতে চাইছিল। এমতাবস্থায় কোনও রাজনীতিকের পক্ষে একজন টিভি ক্যামেরাম্যানের অন্তিম সৎকারের সময় উপস্থিত থাকাটা কিন্তু সত্যিই খুব বিরাট বড় ব্যাপার।

এই নেতার নাম নরেন্দ্র মোদি। গুজরাটের ভাজপা নেতা, যিনি শঙ্করসিং বাঘেলার কোপে পড়ে গুজরাত থেকে নিষ্কাশিত হতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন তিনি দিল্লির অশোকা রোডের ভাজপা অফিসের পিছনের দিকটাতে একটা ছোট্ট ঘরে থাকতেন। সেই ঘরে আসবাব বলতে ছিল শুধু একটা তক্তপোশ, আর দুখানা চেয়ার। দলে তখন প্রমোদ মহাজন, অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজদের স্বর্ণযুগ চলছে।

হাফ হাতা কুর্তা আর পায়াজামা পরনে মোদি সেদিন অদূরে জ্বলতে থাকা চিতার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখনই তাঁর মুঠোফোনটা বেজে উঠেছিল। স্বয়ং অটলবিহারী বাজপেয়ী ফোন করেছিলেন। মোদি সেদিন রাতে অটলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নতুন দায়িত্ব হাতে পেলেন। তিনি নরেন্দ্র মোদিকে গুজরাতের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যেতে বললেন।

এখন প্রশ্ন হল গুজরাতে এমন কী ঘটল যে সেখানে নতুন মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে মোদীকে পাঠানোর প্রয়োজন পড়ল?

২৬শে জানুয়ারি ২০০১। সাতসকালেই গুজরাত কেঁপে উঠল। মারাত্মক একটি ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে গেল বিস্তীর্ণ এলাকা। তাসের ঘরের মতো ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছিল। বহু মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। তার থেকেও বহুগুণ বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কষতে বসলে চোখ কপালে উঠবে।

গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন কেশুভাই পটেল। তাঁর সরকার ত্রাণের কাজ ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেনি। জনগণের ক্ষোভ বাড়ছিল। ভোটের বাক্সে তার ফল দেখা যাচ্ছিল। ভূমিকম্পের ক’মাস আগেই ২০০০ সালে ভাজপা আমেদাবাদ আর রাজকোটের মিউনিসিপ্যাল ইলেকশনে হেরে গিয়েছিল। এই আমেদাবাদে ‘৮৭ সালের পর ২০০০ এ হারল ভাজপা। রাজকোটেও ভাজপা প্রায় কুড়ি বছর নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। ২৫টি জেলা পঞ্চায়েতের ভোটের মধ্যে ভাজপা ২৩টি তে হারল। অথচ এর আগে ভাজপা ২৪টি জেলা পঞ্চায়েতে জিতেছিল। পার্টির হাইকমান্ড বুঝতে পারছিল, এভাবে চললে ২০০৩ সালের বিধানসভায় পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।

এসব যখন ঘটছে তখন মোদি দিল্লিতে জমি মজবুত করছিলেন। প্রতিদিন ভোরে বন্ধুস্থানীয় অরুণ জেটলির সঙ্গে লোধি গার্ডেনে হাঁটতে যেতেন। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে গুজরাতের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর কাছে কোনও খবরই ছিল না। তবে ভূমিকম্পের পর ভাজপার রাষ্ট্রীয় মহাসচিব রূপে তিনি ত্রাণকার্যে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন।

২০শে সেপ্টেম্বর ২০০১ ভাজপা গুজরাতের দুটি উপ-নির্বাচনে হেরে গেল। একটি ছিল আমেদাবাদের এলিসব্রীজ সিট, অন্যটি ছিল জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার সাবরকাণ্ঠার লোকসভার আসন। আডবানির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কারণ এলিসব্রীজ তাঁর লোকসভার অন্তর্গত একটি বিধানসভা। কেশুভাইকে সরানো ছাড়া গতি ছিল না।

যে কেশুভাইকে গদিতে বসানোর জন্য মোদিকে বাঘেলার রোষে পড়তে হয়েছিল, সেই কেশুভাইকে সরিয়ে এবারে মোদীকে মুখ্যমন্ত্রীত্ব দেওয়া হচ্ছিল। দায়িত্ব দেওয়া হতে চলেছে শোনা মাত্র মোদী প্রাথমিকভাবে ‘না’ বলে দিয়েছিলেন। পরদিন আডবানির সঙ্গে তাঁর দেখা হলে তিনি একটু রেগেই বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে ঠিক করার পরেও আপনি প্রত্যাখ্যান করছেন কেন?’

২রা অক্টোবর ২০০১। কেশুভাইকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হল। ভাজপার অধ্যক্ষ জনা কৃষ্ণমূর্তি তাঁকে ইস্তফা দিতে বললেন। কেশুভাইয়ের কাছে তখন আর কোনও পথ খোলা রইল না। ওদিকে গুজরাতে বসে সুরেশ মেহতা তখনও মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি মোদির কথাও শুনে ফেলেছেন ততক্ষণে। তিনি বললেন, ‘মোদিকে নেতা করা যাবে না, উনি বিধায়ক নন।’ কিন্তু এদিকে যা হওয়ার হয়েই গেল। কেশুভাই নিজেই মোদির নাম প্রস্তাব করলেন। ৭ই অক্টোবর ২০০১, নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি গুজরাতের নতুন মুখ্যমন্ত্রী রূপে শপথ নিলেন। দেশের প্রথম কোনও মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণে অনুষ্ঠান ইন্টারনেটে লাইভ টেলিকাস্ট করে দেখানো হল।

.

নরেন্দ্র মোদির মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রায় দশ মাস আগের কথা। জানুয়ারি ২০০১। এলাহাবাদ।

এলাহাবাদে তখন কুম্ভমেলা চলছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাধু সন্ন্যাসীরা উপস্থিত হয়েছেন। বিহিপ এই সম্ভ সমাগমে ঘোষণা করে দিল পরের বছরের মহাশিবরাত্রির মধ্যে অযোধ্যায় রামমন্দির খাড়া করে ফেলা হবে। ক্যালেন্ডার বলছিল মার্চ 2002-এর মধ্যেই তাহলে বিহিপ ব্যাপারটাকে বাস্তবায়িত করতে চায়।

আমরা এবার চলে আসব ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০০২। নানান টালবাহানার মাঝে বাজপেয়ী সরকার পার্লামেন্টে অঙ্গীকার করল যে, অযোধ্যার বিবাদিত ভূমিতে কোনও ধরণের নির্মাণকাজের অনুমতি দেওয়া হবে না।

বিহিপর করা ঘোষণা শুনে অনেক করসেবক অযোধ্যায় আসছিলেন। গুজরাত থেকেও এমনি একটি দল গিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপের কথা শুনে তাঁরা ফিরতে লাগলেন। ট্রেনপথে ফিরছিলেন। সবরমতী এক্সপ্রেসে। ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০০২, ট্রেনটি গোধরা স্টেশনে দাঁড়ায়। তারপর যা ঘটল তাতে সারা দেশের বুক কেঁপে উঠল।

গোধরায় করসেবকদের সঙ্গে সংখ্যালঘু পক্ষের একটি দলের বচসা বাঁধার ফলস্বরূপ সবরমতী এক্সপ্রেসের কোঁচ এস সিক্সকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৫৯ জন করসেবকের মৃত্যু ঘটেছিল। পালটা হিংসায় আক্রান্ত হতে শুরু করল সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলি। মোদির গুজরাত জ্বলছিল।

নিউ দিল্লিতে সেদিন বাজেট পেশ হবে। প্রধানমন্ত্রী ভাবছিলেন যশবন্ত সিনহার বাজেটে আবার কী কী খুঁত ধরবেন বিরোধীরা। কিন্তু আক্রমণ ধেয়ে এল ভাজপার এমপি-দের পক্ষ থেকেই। গোধরায় করসেবকদের অগ্নিদগ্ধ হয়ে মরা নিয়ে তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে উম্মা উগড়ে দিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময়েই খবর এল মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে দাঙ্গাকারীরা আক্রমণ করেছে। লোকসভার প্রাক্তন সাংসদ এহসান জাফরিকে নৃশংসভাবে খুন করার খবরে সাংসদরা শিহরিত হলেন। আডবানি নিজেও এই সংবাদে ভয়ানক ব্যথিত হয়েছিলেন। তৎক্ষণাৎ লোকসভার সদস্যদের একটি প্রতিনিধি দল গুজরাতে পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে পৌঁছল। ওই প্রতিনিধি দলের এক প্রতিনিধি নরেন্দ্র মোদিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘নরেন্দ্রভাই, এসব কীভাবে ঘটল?’ মোদি বলেছিলেন, ‘জর্জ জওয়ানদের পাঠালেন না কেন?’

মোদি জর্জ ফার্নাণ্ডেজের কথা বলছিলেন। তেহেলকা কাণ্ড ফাঁসের পর ইস্তফা দেওয়া জর্জ ততদিনে আবার ফিরে এসেছেন।

ঠিক ওই সময় নাগাদ কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধি দল বাজপেয়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে সেনা নামানোর কথা বলায় জর্জ বলেছিলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী আমাদের জানালে তবেই পাঠানো যায়… তিনি এখনও জানাননি।

কয়েক ঘণ্টার তৎপরতায় সেনা পৌঁছে গেল গুজরাতে। নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জামির উদ্দিন শাহ। ইনি আবার সম্পর্কে অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ-এর ভাই হন। তবে পর্যাপ্ত গাড়ির জোগান না থাকায় দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে সেনা নামতে একটু বিলম্ব হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

করসেবকদের প্রাণহানি নিয়ে হিন্দুপক্ষ, এবং দাঙ্গায় নিহতদের নিয়ে মুসলিম পক্ষ উভয়েই গুজরাত সরকারকে দোষারোপ করছিল। গুজরাতের ১৫১টি ছোট বড় শহরে, ৯৯৩টি গ্রামে, সব মিলিয়ে ১২৭২ জন নিহত হয়েছিলেন। ১ লক্ষ মুসলিম, আর ৪০,০০০ হিন্দু গৃহহারা হয়েছিলেন দাঙ্গায়।

দাঙ্গার রাজনীতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। সবাই তখন মোদিকে দোষ দিতে ব্যস্ত। সবাই বলছিল, একজন প্রচারককে (সঙ্ঘের) মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসালেও সে প্রচারকের মতোই কাজ করে। অথচ পরবর্তী কালের সব ধরণের তদন্তেই মোদি ক্লিন চিট পেয়েছেন। মিডিয়ার একটা বড় অংশ মোদীর বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করে তাঁকে শুধুমাত্র একজন ‘হিন্দু’ মুখ্যমন্ত্রীতে পরিণত করছিল। ব্যাপারটা অনেকটা ‘গাইড’ সিনেমার দেব আনন্দের মতো। দেব আনন্দ একটি মন্দিরের বাইরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে শুয়ে থাকা দেব আনন্দকে দেখে এক সাধুর মায়া হয়। তিনি একটি গৈরিক বস্ত্র তাঁর গায়ে জড়িয়ে দেন। সকালে গ্রামবাসী গেরুয়াধারী দেব আনন্দকে দেখে সাধু ভাবে। সেভাবেই মিডিয়ার চাপিয়ে দেওয়া গেরুয়া বসন মোদীকে ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’ করে তুলছিল। শাপে বর হচ্ছিল।

.

সবদিক থেকে একটাই দাবি উঠছিল-নরেন্দ্র মোদিকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরাতে হবে। বাজপেয়ী যখনই সংসদে আসছিলেন, তখন তাঁর বিরোধী পক্ষের প্রত্যেক এমপি বলতে উঠে তাঁর চার দশকের সেকুলার ইমেজকে ছারখার করে দিচ্ছিলেন।

আডবানি মোদীকে খুব পছন্দ করতেন। তাই তাঁকে সরানোর ব্যাপারে তিনি কখনোই ভাবেননি। দল থেকেও এমন কোনও দাবি উঠছিল না।

আডবানি দলের কথা শুনে এগোতে চাইছিলেন, আর অটলবিহারী শুনতে চাইছিলেন পার্লামেন্টের মত।

সংসদে অধিবেশন চলছে এমন একদিন আচমকাই জশবন্ত সিং-এর কাছে মহাজনের ফোন এল। বার্তা ছিল, এখুনি সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে আসুন।

জশবন্ত পড়ি কি মরি করে ছুটে গেলেন। তাঁকে দেখেই মহাজন বললেন যে, তাঁর বাপজি পদত্যাগপত্র লিখতে বসে গেছেন। সে যাত্রা কোনও মতে ইস্তফা রোধ করা গিয়েছিল।

তাহলে কি এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, বাজপেয়ী মোদিকে সরাতে চেয়েছিলেন? গুজরাত দাঙ্গায় বাজপেয়ী ভীষণ আহত হয়েছিলেন এটা সত্য। দলের মধ্যেকার একটি অংশ মোদিকে যাতে কিছুতেই না সরানো হয় সেই নিয়ে অনড় হয়ে বসেছিল। বিশেষত আডবানি এটা একদমই চাইছিলেন না। তাঁর মনে হয়েছিল এতে দল ভেঙে যাবে।

২৮শে মার্চ বাজপেয়ী মোদীকে দিল্লিতে ডেকে পাঠালেন। মোদি এলেন, এবং পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই এলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল একটি ওপিনিয়ন পোলের রেজাল্ট, যাতে বলা ছিল যে, যদি তক্ষুনি গুজরাতে বিধানসভার ভোট হয় তবে ভাজপা দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতবে। মাত্র একমাস আগে যে নরেন্দ্র মোদিকে সেভাবে কেউ চিনত না, সেই মোদিই গুজরাতের নাম্বার ওয়ান পলিটিশিয়ানে পরিণত হয়েছিলেন।

আডবানি মোদির সঙ্গে সহমত হলেও বাজপেয়ী হতে পারলেন না। ভোট একজন রাজনীতিকের জীবনের অনেক কিছু হলেও সবকিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী তখুনি গুজরাতে ভোট করানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে কিছুতেই একমত হননি।

এই প্রথম আঁটল এবং আডবানির মধ্যে কোনও বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য বাইরে প্রকাশ পাচ্ছিল। আডবানি নিজেই বলেছেন, ‘যদিও অটলজি এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু প্রকাশ করেননি, আমি জানি তিনি মোদির পদত্যাগই চাইছিলেন। আর আমি সেটাই চাইছিলাম না।’

ক’দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী প্রেসকে বার্তা দিলেন যে, তিনি গুজরাতের দাঙ্গা পরবর্তী অবস্থা তথা পুনর্বাসনের কাজ খতিয়ে দেখার জন্য নিজেই গুজরাতে যাবেন। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত গুজরাতের ত্রাণকার্য দেখার জন্য গতবারে বাজপেয়ী সঙ্গে আডবানিকে নিয়ে গিয়েছিলেন, এবারে একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। নরেন্দ্র মোদিকে সরিয়ে দেওয়ার মঞ্চ প্রস্তুত হচ্ছিল।

.

৪ঠা এপ্রিল ২০০২ প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী আমেদাবাদ পৌঁছালেন। একটু দেরীতে যাওয়ার জন্য তিনি গুজরাতবাসীদের কাছে ক্ষমাও চাইলেন। দাঙ্গাকে ‘কলঙ্ক’ বললেন। প্রথমে দেখতে গেলেন সবরমতী এক্সপ্রেসের সেই কোচ নাম্বার এস- সিক্স, যার মধ্যে ৫৯ জন করসেবককে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।

তারপরে গেলেন গান্ধীনগরে। সেখানে শাহ আলম রিফিউজি ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছতেই সবাই প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে নিজের নিজের দুর্দশার কাহিনি শোনাতে লাগল। নিজভূমে পরবাসী হয়ে যাওয়া শরণার্থীদের কথা শুনতে শুনতে প্রধানমন্ত্রী বিহ্বল হয়ে পড়ছিলেন। কেউ বলছিল তার আত্মীয়কে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা, কেউ বলছিল অ্যাসিড ঢেলে দেওয়া হয়েছে, কেউ হাহাকার করছিল নিজের সর্বস্ব খুইয়ে ফেলার জন্য। বাজপেয়ীর সঙ্গে মোদিও ছিলেন। কেউ কেউ তাঁর দিকে দেখিয়ে এই সবকিছুর জন্য দায়ী করছিল।

শাহ আলম রিফিউজি ক্যাম্প থেকে যখন তাঁদের গাড়ির কনভয় বেরিয়ে আসছে, তখন মোদির বিরুদ্ধে স্লোগান শোনা যাচ্ছিল। দলে অরুণ জেটলিও ছিলেন। তিনি আবার এই পর্বের অন্য একটি ভাগের কথা বলেছেন, ‘শাহ আলম ছেড়ে বেরোনোর পর আমাদের ড্রাইভার জানলার কাচ নামাতে বলল। এবং তখন আমরা শুনলাম ‘নরেন্দ্র মোদি জিন্দাবাদ।’ বাজপেয়ী যেখানে ছত্রাখান হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে পেয়েছিলেন, সেখানেই বাজপেয়ীর ক্যাবিনেটের অনেকের একত্রিত হওয়ার কারণ খুঁজে পেয়েছিলেন।

সন্ধ্যায় দিল্লিতে ফেরার আগে বাজপেয়ী গান্ধীনগর এয়ারপোর্টে একটি প্রেস কনফারেন্স করলেন, সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী। একজন মহিলা রিপোর্টার বাজপেয়ীকে প্রশ্ন করলেন যে, মুখ্যমন্ত্রীর জন্য আপনার কোনও মেসেজ আছে? বাজপেয়ী বললেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী কে এক হি সন্দেশ হ্যায় কি উয়ে রাজধর্ম কা পালন করে। রাজধর্ম— য়হ শব্দ কাফি সার্থক হ্যায়। ম্যায় উসি কা পালন করনে কা প্রয়াস কর রহা হুঁ। রাজা কে লিয়ে, শাসক কে লিয়ে, প্ৰজা-প্রজা মেঁ ভেদভাব নহিঁ হো সকতা। ন জন্ম কে আধার পর, ন জাতি কে আধার পর, ন ধর্ম-সম্প্রদায় কে আধার পর।’

পাশে বসে থাকা মুখ্যমন্ত্রী বাজপেয়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললেন, ‘হম ভি ওহি কর রহে হ্যাঁয়, সাহেব।’

নিজের চিরপরিচিত মেজাজে একটু থমকে গিয়ে বাজপেয়ী আবার মুখ খুললেন, ‘মুঝে বিশোয়াস হ্যাঁয় কি নরেন্দ্র ভাই য়হি কর রহে হ্যাঁয়। বহুত-বহুত ধন্যবাদ।’

অর্থাৎ বাজপেয়ী কোনও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাজধর্ম পালন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেভাবেই মোদির পালটা জবাব ছিল গুজরাতি অস্মিতা। ছ’কোটি গুজরাতির অস্মিতার কথা বলেছেন মোদি। তাঁর জনপ্রিয়তা হু হু করে বেড়েছে। কিন্তু বাজপেয়ী কিছুতেই মাথা থেকে গুজরাতের দাঙ্গা আর মোদিকে সরাতে পারছিলেন না। তাঁর মনে হচ্ছিল এই ঘটনায় তাঁর এনডিএ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। ভাজপার আমলে মুসলমানরা দেশে সুরক্ষিত থাকবে বলে তিনি যে প্রচার চালিয়েছেন তাতে প্ৰশ্ন উঠতে পারে মনে হচ্ছিল তাঁর। এমতাবস্থায় যদি এনডিএ-এর কোনও জোট সঙ্গী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের জন্য চাপ দেয়? বাস্তবে অবশ্য অমন কোনও ঘটনাই ঘটেনি। কারণ সরকারের স্থায়িত্ব কেউই বিঘ্নিত করতে রাজী ছিল না।

এই বিষয় নিয়ে বাজপেয়ী কম করে ছ’টি বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকে লালকৃষ্ণ আডবানি, কুশাভাউ ঠাকরে, সঙ্ঘ এবং ভাজপার মধ্যে সমন্বয় সাধনকারী মদনদাস দেবী এবং বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। বাজপেয়ী মোদির ইস্তফা চাইছিলেন। কুশাভাউ ঠাকরে আর মদনদাস দেবী মোদিকে রক্ষা করার সমস্ত সম্ভাব্য প্রয়াস করছিলেন। আডবানি প্রথম থেকেই নরেন্দ্র মোদির পক্ষে ছিলেন। দেবী, ঠাকরেরা সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক রাজ্জু ভাইয়ার সঙ্গে কথা বললেন। সেখান থেকেও মোদিকে রাখার জন্য সবুজ সঙ্কেত আসছিল।

ভাজপার বাইরের হয়েও মোদিকে সমানে রক্ষা করে চলেছিলেন জর্জ ফার্নান্ডেজ। তিনি দাঙ্গার পরে সংসদে বিরোধীদের প্রত্যুত্তরে ভাষণ দিয়েছেন। এবারেও তিনিই বললেন, মোদিকে সরানো উচিত নয়, কারণ তিনি যে ভুল করেছেন তার কোনও প্রমাণ নেই এবং তারপরেও সরালে তিনি সরকার আর দলের বিরুদ্ধে হয়ে যাবেন।

এই বিতর্ক নিয়ে আডবানি নিজের আত্মজীবনী My Country My Life বইতে লিখেছেন, ‘যে দুটি বড় বিষয় নিয়ে বাজপেয়ীজি আর আমার মধ্যে একমত হয়নি, তার প্রথমটা হল অযোধ্যা ইস্যু, যেক্ষেত্রে বাজপেয়ী পার্টির রায়কে মেনে নিয়েছিলেন, এবং দ্বিতীয়টা হল গুজরাত দাঙ্গার পরে নরেন্দ্র মোদির ইস্তফার দাবি।’

সমাজের নানা স্তরে কথা বলে আডবানির মনে হয়েছিল যে, মোদিকে অহেতুক টার্গেট করা হচ্ছে। তাই তিনি ঠিক করেছিলেন, সদ্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়া একজন ব্যক্তিকে শুধুমাত্র জটিল সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির উদ্রেক হওয়ার কারণে বলির পাঁঠা করা ঠিক হবে না। বাজপেয়ীর অস্বস্তিটাও তিনি অনুভব করছিলেন। কেন্দ্রে ’৯৮ সালের মার্চ মাস থেকে ভাজপার সরকার গঠনের পর থেকে দেশে দাঙ্গা কমে গিয়েছিল একথা শীর্ষ নেতৃত্ব খুব গর্ব করে বলতেন। দেশে ও বিদেশে মুসলিম সমাজেও বাজপেয়ীর সুন্দর ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছিল। গুজরাতের দাঙ্গা পর্বের পর বিরোধীরা সেই ভাবমূর্তিটাকে নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছিল।

.

এপ্রিল ২০০২। দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছিল। গোয়াতে ভাজপার রাষ্ট্রীয় কার্যকারিণী বৈঠক হচ্ছিল তখন। মিডিয়া আর রাজনীতিকের দল বলাবলি করছিল যে, এই বৈঠকেই মোদীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে চলেছে। বাজপেয়ী আডবানিকে দিল্লি থেকে গোয়া সঙ্গে যেতে বললেন। প্লেন সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। ভেতরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বসে ছিলেন আডবানি, জশবন্ত সিং এবং অরুণ শৌরি। সবার সামনে টেবলে সেদিনের খবরের কাগজ রাখা ছিল। তাদের সবকটাতেই কমবেশি একটাই বার্তা ছিল— প্রধানমন্ত্রী মোদিকে সরাতে চলেছেন। সবাই চুপচাপ বসে ছিল। প্রধানমন্ত্রীর মুখে গাম্ভীর্য অন্যদের থেকে বেশি দেখাচ্ছিল। জশবন্ত কথা শুরু করলেন, ‘অটলজি আপ কেয়া সোচতে হ্যাঁয়?’ বাজপেয়ী বললেন, ‘কম-সে-কম ইস্তিফা অফার তো করতে।’ আডবানি ডিফেন্ড করলেন মোদিকে, ‘যদি নরেন্দ্র ভাই ইস্তফা দিলে গুজরাতের পরিস্থিতি শুধরে যায় তাহলে আমিই ওঁকে ইস্তফা দিতে বলব। কিন্তু আমার মনে হয় না এতে অবস্থার কোনও উন্নতি হবে এবং আমার মনে হয় না রাষ্ট্রীয় কার্যকারিণী ওঁর ইস্তফা মঞ্জুর করবে।’

এরপরের ঘটনা-পরম্পরা পলিটিক্যাল থ্রিলারকেও হার মানাবে। গোয়াতে নেমেই আডবানি মোদিকে ইস্তফা দেওয়ার কথা বলেন এবং মোদিও সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে যান। মোদী রাষ্ট্রীয় কার্যকারিণীতে বলতে উঠে নিজের ইস্তফার কথা ঘোষণা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে পুরো সভাকক্ষ অভ্যাগতদের সমস্বরে গুঞ্জরিত হয়ে উঠল, ‘ইস্তিফা মত দো, ইস্তিফা মত দো।’ আডবানি তখন প্রতির বরিষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করলেন। তাঁরা বললেন মোদির ইস্তফা দেওয়াটা ঠিক হবে না। প্রমোদ মহাজনের মতো নেতাও বলেছিলেন যে, প্রশ্নই ওঠে না। দলের মধ্যে এই বিষয় নিয়ে আর কোনও দ্বিমত ছিল না।

মোদি সেদিন রাষ্ট্রীয় কার্যকারিণীতে একধরণের শক্তির হস্তান্তরই ঘটিয়ে ফেলেছিলেন। মোদির দিল্লিতে বনবাস পর্বের বন্ধুরা মোদির পক্ষে হাওয়া তুলছিলেন। পার্টির দ্বিতীয় শ্রেণীর সমস্ত নেতাই মোদির পক্ষে কথা বলছিলেন। বাজপেয়ীর মুখ তখন থমথমে। তিনি বুঝতে পারছিলেন না এ কী করে সম্ভব হল।

এমনকি বৈঠকের শেষ বেলাতে অটলবিহারী যখন বলতে উঠলেন, তখনও তাঁর সুরও নরম হয়ে গিয়েছিল। আর চারিপাশে তখন একটাই সুর, ‘মোদি… মোদি…’।

.

গোয়াতে নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবনদান ঘটল। তারপরই তিনি গুজরাতে ভোট করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু ইলেকশন কমিশন গুজরাতের সংবেদনশীলতা খতিয়ে দেখে তখুনি ভোট করাতে রাজী ছিল না। মোদি এবারে ‘গুজরাত গৌরব যাত্রা’ বের করলেন। দিল্লিতে বসে বাজপেয়ী সব দেখছিলেন। বিহিপ গুজরাতের ভোটে মোদিকে চাইছিল। এরই মধ্যে গুজরাতের স্বামীনারায়ণ মন্দিরে জঙ্গী হামলা ঘটল। ত্রিশজনের মৃত্যু হল সেই আক্রমণে। গুজরাতের লোকেরা বলছিল, রুটির রুজির চিন্তা তাঁরাই করে নেবেন, মোদি শুধু সন্ত্রাসবাদীদের হাত থেকে তাঁদের রক্ষা করুন।

মোদি একটা সময়ে সঙ্ঘের প্রচারক হিসেবে গুজরাত চষে বেরিয়েছেন। গুজরাতের ‘caste dynamics’ তাঁর থেকে ভালো আর কেউ কখনও বোঝেনি। সেই অঙ্ক কাজে লাগিয়ে মোদি গুজরাত জয় করতে নামছিলেন। কংগ্রেস একটা বড় ভুল করেছিল। দাঙ্গা পীড়িতদের কথা বলতে গিয়ে গোধরায় নিহতদের কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিল।

মোদি নিজের প্রচারের কাজে মিডিয়াকে ব্যবহার করছিলেন। প্রাইভেট চ্যানেলের যুগে মিডিয়া কভারেজ যে কত বড় পার্থক্য তৈরি করে দিতে পারে তা অনুধাবন করা প্রথম রাজনীতিক সম্ভবত তিনিই, কারণ সম্ভবত তিনিই এমন একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন যার পকেটে একটি টিভি ম্যানেজমেন্ট কোর্সের সার্টিফিকেট ছিল। ভালো হোক বা মন্দ, যে কোনও বক্তব্যকে কীভাবে প্রচারের আলোয় এনে ফেলা যায় তা মোদি শেখাচ্ছিলেন। মোদি যখনই টের পেলেন যে, তাঁর র‍্যালিকে কভার করতে যাওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ত্রিশ জন দিল্লি থেকে গেছেন এবং তাঁরা প্রত্যেকেই অ-গুজরাতি, তিনি তখনই র‍্যালিতে গুজরাতির বদলে হিন্দিতে ভাষণ দিতে লাগলেন। টিভি নামক গণমাধ্যমটি বুঝে কিংবা না- বুঝে দেশ জুড়ে মোদিকে মেলে ধরছিল। মোদি তখন যত্র তত্র সর্বত্র।

ভাজপার শীর্ষ নেতৃত্ব সব দেখছিল। তাঁরা তখনও বুঝতে পারেননি আর কিছুদিনের মধ্যেই এই ব্যক্তি নিজের রাজনৈতিক ওজন এমনভাবে বাড়াবেন যে গোটা দলের লোককে দাঁড়িপাল্লার একদিকে তুলে দিলেও তাঁকে পরাস্ত করা যাবে না।

ভোট পর্ব শুরু হল ১২ই ডিসেম্বর ২০০২ সকাল ৮টায় এবং শেষ হল ওইদিনই বিকেল ৫টার সময়। গুজরাত শুধু নিজের নয় ভারতবাসীর ভাগ্য নির্ধারিত করতে চলেছিল।

ফল বেরোলো। ভাজপা (বকলমে মোদি) ১২৭/১৮২ সিট পেলেন। গুজরাত কংগ্রেস সেই যে পিছোতে শুরু করল আর হালে পানি পেল না। আমেদাবাদে সর্দার পটেল স্টেডিয়ামে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হল। বাজপেয়ী নিজে উপস্থিত ছিলেন। বাজপেয়ীর উপস্থিতি মোদির রাজনৈতিক উচ্চতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছিল, হয়তো তিনিও স্বীকার করে নিচ্ছিলেন ‘হিন্দুত্ব’ আর ‘মোদিত্ব’ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%