অভীক মুখোপাধ্যায়
সঙ্ঘ কখনও স্বীকার করে না যে ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য হল, গন্তব্য একই হলে চলার পথে কেউ পাশাপাশি গেলে যেতেই পারে। একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য সমাজ সংস্কার, অন্যটির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। কিন্তু কোথাও না কোথাও একটা যোগসূত্র আছেই, সে কেউ মানুক বা না-ই মানুক। তাহলে শুরুটা কোথায়? আমরা সেই সম্পর্কটাকেই একটু খতিয়ে দেখব।
দেশের দুটি ভিন্ন প্রান্তে বাজপেয়ী আর আডবানি সঙ্ঘের বাতাবরণে বড় হচ্ছিলেন। ইতিহাসকে একটু অন্য আঙ্গিকে দেখতে শিখছিলেন তাঁরা। আর শিখছিলেন টিমওয়ার্ক বা সঙ্ঘশক্তি। তখন সঙ্ঘের রাশ হাতে নিয়েছেন রাসপুতিনের মতো দর্শনধারী এক সন্ন্যাসীবৎ ব্যক্তিত্ব। তাঁর নাম মাধবরাও সদাশিবরাও গোলওয়ালকর। সঙ্ঘের ভেতরে ও বাইরে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল ‘গুরুজি’ নামেই। গুরুজির বক্তব্য ছিল যে, যখন হিন্দু রাষ্ট্রের চেতনা ধূসর হয়ে যায়, তখন দেশ ও জাতি বহিঃশত্রুর সামনে অরক্ষণীয় হয়ে পড়ে। হিন্দু-চেতনাকে জাগ্রত করাই ছিল তাঁর ধ্যেয়।
সঙ্ঘের কাঠামোটা বুঝে নেওয়া যাক। একটি বিকেন্দ্রীকৃত সংস্থা, অথচ মাথার ওপরে নাগপুরের একটি ছোট্ট টিমের নিয়ন্ত্রণ। পিরামিড ধরে নেমে এলে দেখা যাবে ভূমিতে লক্ষ-লক্ষ স্বয়ংসেবকের দল। তাঁরা শাখার মাধ্যমে সঙ্ঘের সাথে যুক্ত। আর নাগপুর এবং শাখাগুলিকে একই সুতোয় বেঁধে রেখেছেন কিছু সঙ্ঘী, তাঁরা হলেন প্রচারক। প্রচারকদের কোনও বেতন হয় না, তবে তাঁদের জীবনধারণের যাবতীয় খরচ সঙ্ঘ দিয়ে থাকে। এই অবৈতনিক পদটির জন্মদাতা ছিলেন গুরুজি গোলওয়ালকর। তিনি প্রচারকদের অবিবাহিত থাকা বাধ্যতামূলক করেন। সম্ভবত নিজের খ্রিষ্টান মিশনারি কলেজের পড়াশোনার সময়কালে দেখা খ্রিষ্টান মিশনারিদের কাজের পদ্ধতি গুরুজির মনে প্রভাব ফেলেছিল। নিজ ধর্মের প্রচার ও প্রসারের কাজে আত্মনিবেদনের ক্ষেত্রে এমনই কোনও পদ তিনি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন সঙ্ঘের ভেতরেও। তা থেকেই আসে প্রচারক পদ। প্রাথমিকভাবে মিশনারিদের কাজ দেখে এবং পরে রামকৃষ্ণ মিশনে নিজের যোগদানের সূত্রে গুরুজি অনুভব করেছিলেন প্রচারকদের নিজেদের ঘর-সংসার থাকলে তাঁরা সামাজিক কল্যাণে আত্মনিয়োজিত করতে পারবেন না, তাই প্রচারকদের বাধ্যতামূলক ভাবে অবিবাহিত থাকার নিদান দেন তিনি।
গুরুজি গোলওয়ালকরের হাত ধরে আসা প্রচারকদের সংখ্যা কালক্রমে বাড়তে থাকবে। বাড়তে বাড়তে প্রায় চার হাজার ছোঁবে ২০২০ সাল নাগাদ। সঙ্ঘের মেরুদণ্ড এঁরাই। প্রচারকদের দেশের নানা প্রান্তের ভাষা জানতে হয়। হিন্দি বলার সময় এঁদের মুখে সংস্কৃতনিষ্ঠ হিন্দি শোনা যায়। সঙ্ঘই এঁদের পরিবার। সঙ্ঘের সুত্রেই এঁরা ঐক্যবদ্ধ।
সঙ্ঘে কে কতদিন সময় ব্যয় করছেন, তার জন্যে একটি নির্দিষ্ট শব্দের ব্যবহার করা হয়, তা হল ‘সঙ্ঘ আয়ু’। সঙ্ঘ আয়ুর ভিত্তিতে সঙ্ঘের ক্রমোচ্চ শ্রেণীবিভাগের বিভিন্ন ধাপে স্থান দেওয়া হয় সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের। তবে চয়নের ক্ষেত্রে সঙ্ঘ আয়ু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও একমাত্র বিষয় নয়। মেধা, বৌদ্ধিক বিশ্লেষণ ইত্যাদিও জায়গা পায়। সঙ্ঘের একটি অলিখিত নিয়ম হল, কারো সম্পর্কে কোনও ভালো কথা বলতে গেলে তা সকলের সামনে বলতে হবে। যদি কাউকে নিয়ে অভিযোগ করতে হয়, তাহলে তা কখনওই সমান মর্যাদার কারো সামনে বলা চলবে না, বলতে হবে বক্তার তথা যার সম্পর্কে বলা হচ্ছে তাঁদের থেকে উচ্চতর মর্যাদার কারো কাছে। সম্ভবত এই শিক্ষাই কালক্রমে সঙ্ঘ থেকে জনসঙ্ঘ হয়ে পৌঁছবে ভারতীয় জনতা পার্টির অভ্যন্তরে। সঙ্ঘের নার্সারি থেকে বেছে নেওয়া দুই সুযোগ্য ছাত্র বাজপেয়ী ও আডবানি শিষ্টাচারের মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে নিজেদের মধ্যে শত বিরোধ সত্ত্বেও এক হয়ে থেকে যাবেন। ভারতীয় জনতা পার্টিতে অনেক বড়-বড় নেতা আসবেন। উচ্চশিক্ষিত অনেক মুখ ভারতীয় জনতা পার্টির মালায় ফুল হবেন, কালক্রমে তাঁরা ঝরেও যাবেন মালা থেকে। অরুণ শৌরি, যশবন্ত সিং, যশবন্ত সিনহা, শত্রুঘ্ন সিনহা এমন অনেকেই যোগ আর বিয়োগের খেলায় ধরা খাবেন। এঁরা কেউ সঙ্ঘের ছাত্র নন বলেই হিন্দুত্বের ফেভিকল এঁদের একজোট করে রাখতে পারবে না। কিন্তু বৃদ্ধ দম্পতির মতোই অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আডবানি ঝগড়া-মনোমালিন্য সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সংসার করে যাবেন।
তবে এসব যতই বলতে থাকি, আমাদের এই ফুল-গাথায় কিন্তু এখনও তরুণ বাজপেয়ী আর আডবানির সাক্ষাৎ ঘটেনি। সময়ের হাত ধরে এই দুই ব্যক্তিত্ব স্বয়ংসেবক থেকে প্রচারক রূপে উত্তীর্ণ হবেন। তিন-চারটি ধাপের একটি অফিসার্স ট্রেনিং ক্যাম্পে যেতে পারলে তবেই প্রচারক হওয়া সম্ভব। প্রত্যেকটি ধাপ পেরোতে প্রায় একমাস সময় লাগে, অন্তিম পর্বের জন্য দরকার হয় ২৫ দিনের একটি ক্যাম্প। ভোর সাড়ে চারটে থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত টানা শারীরিক ও মানসিক কসরত। সকালে দুঘণ্টার ব্যায়াম, তারপর প্রাতরাশ। পরে গ্রুপ ডিসকাশন, তর্ক-বিতর্কের আসর। দুপুরের খাওয়া সারা হয়ে গেলে কোনও অতিথি এসে বৌদ্ধিক আলোচনা করবেন। বিকেল সাড়ে চারটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত আবার শরীরচর্চা চলবে। প্রত্যেকে একসাথে থাকতে শিখবে। কারো পৃথক থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই। গোপনীয়তা বলেও কিছু থাকে না। হিন্দুত্বের ছবিকে শক্তপোক্ত করাই এক এবং অদ্বিতীয় কাজ।
বাজপেয়ী এবং আডবানি একটি নতুন পরিচয় পেয়েছিলেন। সঙ্ঘের সাংস্কৃতিক পরিচয়। তখনও সঙ্ঘ রাজনীতিতে জড়াতে চাইছিল না। গুরুজির বক্তব্য ছিল হিন্দুদের একত্রিত করতে হবে সামাজিক ভাবে, রাজনীতি করা সঙ্ঘের কাজ নয়। ১৯৫১ সালের পর থেকে এই বিষয় নিয়ে অবশ্য আবার ভাবতে বাধ্য হলেন তিনি। আগেই সেকথা লিখেছি। গান্ধী-হত্যার ফলাফল গুরুজিকে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছিল। নাস্তিক শ্রী সাভারকরের সঙ্গে তাঁর সবকিছুতে মত মিলত না। তাই ১৯৪২ সালে যখন শ্রী সাভারকর গুরুজির কাছে রাজনৈতিক সাহায্য যাচনা করেন, গুরুজি মানা করে দেন। শ্রী সাভারকর কী বলেছিলেন তা আগেই লিখেছি।
সময়ের পিঠে চড়ে আগুপিছু করে লিখছি। বোঝাতে ভুল করলে নিজগুণে ক্ষমা করবেন, বন্ধু। ১৯৪৪ সাল। তখন আডবানি করাচির একটি স্কুলে পড়াচ্ছেন। ইংরেজি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, অঙ্ক যখন যা দরকার সেটাই পড়াচ্ছেন। রাজনীতিতে আসবেন এমন কথা ভুলেও ভাবেননি। এই সময় আরও একটা নেশা ধরছিলেন আডবানি। ইংরেজি গল্প, উপন্যাস পড়ার নেশা। এটা রয়ে যাবে। তাঁর পেশা পালটাবে, নেশা বদলাবে না।
তদ্দিনে বাজপেয়ী ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে গেছেন। আরও পড়ার ইচ্ছে। কিন্তু বাধ সেধেছে পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি। বাবার চাকরির মেয়াদ ফুরিয়েছে। বিবাহযোগ্যা দুই দিদি। পণ না-দিলে বিয়ে হবে না, সে মেয়েরা যতই গুণী হোক না কেন। তাহলে স্নাতকোত্তর পড়া কি আর হল না? না, হল। লাগে টাকা দেবে গৌরি সেন গোছের প্রবাদকে সত্য প্রমাণিত করে এগিয়ে এলেন দরিয়াদিল গ্বালিয়র মহারাজা। মাসিক পঁচাত্তর টাকা বৃত্তিসহ বাজপেয়ী ভর্তি হলেন কানপুরের ডিএভি কলেজে।
কলেজে বাজপেয়ীর সহপাঠী ছিলেন আরেক বাজপেয়ী। যখন অটলবিহারী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতেন, তখন অপর বাজপেয়ীকে অধ্যাপকেরা জিজ্ঞেস করতেন, আজ ছেলেটি (অটলবিহারী) কোথায়। আবার অপর বাজপেয়ীটি যখন যেতেন না, তখন প্রায় একই প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে অটলবিহারীকে করা হতো। প্রশ্ন করা হতো, ‘বাবা কোথায় হারিয়ে গেল?’ ‘বাবা’ পড়ে চোখ আটকে গেল বুঝি? বাবা-ই তো! অটলবিহারীর সেদিনের সেই ছাত্রবন্ধুটি ছিলেন তাঁর বাবা কৃষ্ণবিহারী বাজপেয়ী। চাকরি শেষ করে তিনি আবার পড়তে ঢুকেছিলেন। বাবার বটবৃক্ষের মতো ছত্রছায়ায় বড় হয়ে উঠছিলেন অটল।
আর গ্বালিয়রের যে মহারাজের কথা লিখলাম, তিনি কে বলুন তো?
জীবাজিরাও সিন্ধিয়া। বিজয়ারাজে সিন্ধিয়ার স্বামী তথা মাধবরাও সিন্ধিয়ার পিতা। যার কাছে বৃত্তি নিয়ে অটলবিহারী পড়াশোনা করলেন, একটা সময়ে তাঁর সন্তানের বিরুদ্ধেই তিনি ভোটে লড়বেন। বলা ভালো, মাধবরাও অটলবিহারীর বিরুদ্ধে লড়বেন।
.
১৯৪৬ সাল। বাজপেয়ী তখন কানপুরে পড়ছেন। স্বপ্ন আইনজীবী হবেন। দেশে সাধারণ নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। ডামাডোল চলছে রাজনীতির আঙিনায়। সঙ্ঘ থেকে তাঁকে বলা হল, এবার পড়াশোনা ছেড়ে তোমাকে একটা হিন্দি খবরের কাগজ খুলতে হবে। ইউনাইটেড প্রভিন্স হবে তোমার পরবর্তী ঠিকানা। সঙ্ঘের আদেশ মানার অর্থ ছিল নিজের সংসারকে জলাঞ্জলি দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। অটলবিহারী তা-ই করলেন। ওই বছরই আডবানি নাগপুরে শেষ করে ফেললেন সঙ্ঘের থার্ড অফিসার’স ট্রেনিং। আবার ফিরে গেলেন করাচিতে। সঙ্ঘের পক্ষ থেকেও তাঁকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল— করাচি শহরে সঙ্ঘের সিটি সেক্রেটারি।
নিউ দিল্লির বুকে তখন ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে ভারতের জাতীয় সরকার গঠিত হয়েছে। হলে কী হবে? কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের বচসায় কাজ মুলতুবি হয়ে যেত। ব্রিটিশ প্রাইম মিনিস্টার এসব কাজিয়ার জিগির তুলে বলে দিলেন, ১৯৪৮ সালের জুন মাসের আগে আমাদের ভারত ছাড়ার কোনও প্রশ্নই নেই।
জিন্নাহ দেখলেন সময় তাঁর পক্ষে নেই। তিনি ১৯৪৬ সালের ১৯শে জুলাই বোম্বের একটি সভা থেকে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বা ডিরেক্ট অ্যাকশনের ডাক দিলেন—‘Throughout the painful negotiations, the two parties with whom we bargained held a pistol at us; one with power and ma- chine guns behind it, and the other with non-cooperation and the threat to launch mass civil disobedience. This situation must be met. We also have a pistol,’ এখানে যে দুটি ফ্রন্টের বিরুদ্ধে জিন্নাহ বলছিলেন, তা আসলে ছিল ব্রিটিশ ফ্রন্ট এবং হিন্দু পক্ষ। জিন্নাহ চাইলেন, Either a divided India or a destroyed India! জিন্নাহর কথা শুনে জিগির উঠল, লড় কে লেঙ্গে পাকিস্তান! জিন্নাহ বড় নেতা। তাঁর উন্মত্ত অনুগামীদের মধ্যে তখন উন্মাদনাও প্রবল ছিল। ইতিহাস বলছে, জিন্নাহ সফল হয়েছিলেন। তিনি ভারতকে বিধ্বস্ত করেছিলেন, ভারত ভাগও তো হয়েছিল। তাই না? ভাগবাঁটোয়ারার কথায় আসছি, আগে দেখে নিই ডিরেক্ট অ্যাকশনের ফল কী হয়েছিল। সারা দেশ জুড়ে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল কলকাতা সহ বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা। ’৪৬ সালের ১৭ই আগস্ট দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি শিরোনাম আপামর ভারতবাসীকে ভাবাবে ৭৫ বছর পরেও। শিরোনামে লেখা ছিল ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’। দক্ষিণপন্থীরা এরই মধ্যে থেকে একজন নায়ককে খুঁজে বের করবেন। জাতে তিনি বাউন। হাতে নাকি পয়েন্ট চব্বিশ বোরের রিভলবার ছিল। খাস কলকাত্তাইয়া ছেলেটির কাকা ছিলেন বিশিষ্ট বিপ্লবী শ্রী অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আর ছেলেটির নাম ছিল শ্রী গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ওরফে গোপাল মুখুজ্জে ওরফে গোপাল পাঁঠা। ‘পাঁঠা’ কিন্তু কোনও খারাপ অর্থে জুড়ে যায়নি, তাঁর পাঁঠার মাংসের দোকান থাকায় এহেন সম্বোধন। বামপন্থীরা আবার গোপাল মুখুজ্জের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তাঁদের বক্তব্য থাকবে—
১. আদৌ কি গোপাল মুখুজ্জে সেদিন সাম্প্রদায়িক ইস্যু নিয়ে লড়তে নেমেছিলেন, নাকি পুরোটাই ছিল তাঁর এলাকা দখলের লড়াই।
২. দাঙ্গা হাঙ্গামা তখন রোজকার ব্যাপার বলে অনেকেই অমন রিভলবার কিংবা ভোজালি বাড়িতে রাখতেন। সেফটি ইস্যু। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে মুম্বাই দাঙ্গার সময় ভয়ভীত সঞ্জয় দত্ত অস্ত্র রেখে অপরাধী না হয়ে নায়ক বলে পরিগণিত হওয়ার কথা।
তবে বামপন্থীদের কথা যখন এসেই পড়ল, তখন একটু দেখে নেওয়া যেতে পারে যে, দেশভাগ নিয়ে তাঁদের কী বক্তব্য ছিল। চৌধুরী রহমত আলি ‘নাউ অর নেভার’ পুস্তিকা প্রকাশ করে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠনের যে দাবি জানালেন, তার সুর অনেকটাই মিলে গেল এক ক্ষুরধার মেধার তার্কিক, লেখক, বাম নীতিবাগীশের লেখা থিসিসের সাথে। গঙ্গাধর অধিকারী নামক কেমিক্যাল সায়েন্টিস্ট নিজের ‘অধিকারী থিসিস’-এর ছত্রে ছত্রে একটাই কথা বোঝাতে চাইলেন, এই যে ভারত… কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী… ওয়ান নেশন, ওয়ান পিপল, ওয়ান ল্যাংগোয়েজ তো কখনোই ছিল না। নানা জাতি এবং ধর্মে, নানা আঞ্চলিক অভ্যেসে অভ্যস্ত মানুষ কী করে একটি দেশের মানুষ হিসেবে থাকবে? ভুল হোক বা ঠিক, নিজের ন্যারেটিভ দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চাইলেন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হওয়া কেন প্রয়োজন। এ তো গেল একজন কমিউনিস্টের কথা। অপর এক কমিউনিস্ট, কমরেড হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখেছিলেন—
শোনো কংগ্রেস নেতাগণ
মুসলমানের আত্মশাসন
না-মানিলে হয় না মিলন
দেখ চিন্তা করি।
আমরা যেহেতু ভারতীয় জনতা পার্টির ইতিহাস পড়তে বসেছি, মাঝেমধ্যে তাদের বর্তমান কার্যপদ্ধতি থেকে তাদের ডিএনএ বিচার করতে হবে। বিজেপির একটি বড় শক্তির জায়গা হল আত্মসমীক্ষা। আজও ভুল পদক্ষেপ, খারাপ ফল নিয়ে আত্মচিন্তন করতে বসেন বিনয় সহস্রবুদ্ধের মতো থিংকট্যাঙ্কেরা। এই চিন্তন শিবিরের ছাঁচটা এসেছে সঙ্ঘের সূত্রে। গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং দেখে চিন্তন-শিবির থেকে বেশ কিছু সিদ্ধান্তে এলেন গুরুজি গোলওয়ালকর। হিন্দু ব্যবসায়ীদের বললেন, ‘এই বিপর্যয়ের জন্যে পঞ্জাবের হিন্দুদের অনৈক্য দায়ী। সঙ্ঘের কাজ হবে হিন্দুদের একত্রিত করা এবং এক্ষেত্রে পুঁজিপতিরা যেন চাঁদা দিয়ে সাহায্য করে।’ ১৯৪৭ সালের জুন মাস নাগাদ দাঙ্গা-হাঙ্গামা চরমে উঠল। পাঁচটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্পন্ন প্রভিন্সের প্রতিনিধিরা কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি থেকে বেরিয়ে এলেন। ব্রিটিশরা তখন ভারত ছাড়তে উন্মুখ। আর এই সবকিছু নিয়ে বামেরা যা-ই বলে থাকুক, দক্ষিণপন্থীরা যা-ই করে থাকুক, দাঙ্গায় যেখানে যত ক্ষতি ঘটে থাকুক, একজন ব্যক্তির চাহিদা এবং ভবিষ্যৎবাণীই সফল হয়েছিল। তিনি ছিলেন মুহম্মদ আলি জিন্নাহ। ভারতকে ভাগ করার সমস্ত সম্ভাব্য প্ৰয়াস শেষ অবধি সফল হয়েছিল। সূত্রপাতটা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং দিয়ে হলেও আর তা নিয়ে বেশি কিছু লিখছি না, দেশের উত্তপ্ত আবহে পুরোনো ঘায়ের কথা খুঁচিয়ে দিয়ে লাভ হতে পারে না, পাল্লাটা ক্ষতির দিকেই ঝুঁকে যাবে। শুধু একটাই টিপ্পনী করব, জিন্নাহ নিজের ইচ্ছা, নিজের সিদ্ধান্তকে একটি স্বতঃসিদ্ধ উপপাদ্যে পরিণত করতে পেরেছিলেন।
’৪৭ সালের মার্চ নাগাদ একজন নতুন ভাইসরয় নিযুক্ত হলেন। ভদ্রলোক ইংল্যান্ডের রাজার আত্মীয়। ডাকনাম ডিকি। ভালোনাম লুইস মাউন্টব্যাটেন। নিজের পোশাকআশাকের দিকে ভারী নজর ছিল মাউন্টব্যাটেনের। লেডি মাউন্টব্যাটেনও তাই। পরে এই লেডির সঙ্গেই এক ভারতীয় যুবকের প্লেটোনিক প্রণয়ের গল্প ভাসবে উপমহাদেশের হাওয়ায়। কালক্রমে সেই প্রণয়কাহিনি পরিণত হবে কেচ্ছায়। উগ্র দক্ষিণপন্থীদের সিলেবাসে ঢুকে পড়বে জওহরলাল নেহরু আর এডউইনা মাউন্টব্যাটেনকে নিয়ে রগরগে সব গল্প। হয়তো কিছু ছিল, তবে হয়তো এতটাও কিছু ছিল না।
মরুক গে ওসব প্রেমের গল্পগুলো। আমরা রাজনীতি নিয়ে মশগুল। সময়ের খাতায় দিবে আর নিবে, মেলাবে মিলিবের হিসেব করতে বসেছি। আমরা দেখতে বসেছি, কে কখন কাদের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কোন লাঠি চালিয়েছিল, আর কখন ভগবানের দণ্ড এসে তারই পিঠে দিয়ে গেছে লাঠির বাড়ি। সেই লাঠির আঘাতে শব্দ হয়নি, শুধু দাগ দেখা গেছে, আর খুব জোরে লেগেছে। তা এই লুইস মাউন্টব্যাটেন ঠিক করলেন ১৯৪৮ সালের জুন মাসের বদলে ১৯৪৭ সালের আগস্টে স্বাধীনতা দিয়ে দেওয়া হবে ভারতকে। ভালো কথা। মার্চে এলেন, আর জুনে বললেন যে আগস্টে স্বাধীনতা দেবেন, তার মানে হাতে ছিল মাত্র দুমাস। ব্রিটিশপক্ষের খেলা শেষ হতে চলেছে, আর ঠিক এই মোক্ষম মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের হাতের সমস্ত তাস মেলে ধরলেন। বললেন যে, মুসলিমদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি মেনে নিয়ে ভারতকে দুটি ভাগে ভাগ করে দিয়ে যাওয়া হবে। উন্মাদ শল্যচিকিৎসকের মতোই ভারতের দুদিক থেকে দুটি ডানা হেঁটে দিয়ে জন্ম দেওয়া হল পাকিস্তান নামক ক্ষতের। এ এক এমন ঘা, যার কষ্ট ভারতবাসী সম্ভবত কখনও ভুলতে পারবে না। ছলনার চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবে বিভিন্ন রিয়াসতের রাজাদের সামনেও একটা (একমাত্র বিকল্প অবশ্যই নয়) অদ্ভুত বিকল্প খুলে দেওয়া হল, যার যে-দেশে ইচ্ছে যোগ দিতে পারেন। ঔপনিবেশিক শক্তি এভাবেই যখন যে দেশে শাসন করেছে, সেই দেশকে ভাগ করে দিয়ে তবেই বিদায় নিয়েছে। একই ঘটনা দেখা যাবে ভিয়েতনামে, কোরিয়াতে, কঙ্গোতে। প্রায় সমস্ত উপনিবেশেই। তবে ডিকি সাহেব ভারত ভাগের মজা যেমন পেয়েছিলেন, তাঁকে নিজের জীবন দিয়ে চোকাতে হয়েছিল এই ঘৃণ্যতম কাজটির দাম। স্বদেশে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি নামক একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের প্লান্ট করা বোমার বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু ঘটেছিল। ভারত থেকে লুইস মাউন্টব্যাটেন যেভাবে পাকিস্তানকে ছিঁড়ে বের করতে আগ্রহী ছিলেন, সেই একইরকম ভাবে আই আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিও ব্রিটেন থেকে নর্দান আয়ারল্যান্ডকে ছিনিয়ে আনতে চাইছিল। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের ওপরে বহু নির্যাতন চালিয়ে গিয়েছিল। ভারতবাসী তাঁদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারেনি। কিন্তু সময় কাউকে ক্ষমা করেনি, ক্ষমা করে না, ক্ষমা করবেও না। এই সময়কেই ইতিহাস বলে। শশী থারুরের ভাষায়, ‘… You can’t revenge yourself upon history: history is it’s own revenge.’
.
ব্রিটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে ঘোষণা করল, এই দেশ দ্বিখণ্ডিত হবে–মুসলিম লীগের দাবি এবং জিন্নাহর ক্ষুরধার ওকালতি মেনে মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলি নিয়ে গঠিত হবে পাকিস্তান। মুসলিম প্রধান অঞ্চলের মধ্যে পড়ছিল পঞ্জাব প্রদেশ আর বাংলা। রিয়াসতের রাজাদের বলা হল, আপনারা ইচ্ছেমতো দুটি দেশের যে কোনওটিতে যোগ দিতে পারেন, চাইলে স্বাধীন থাকার অধিকারও রয়েছে।
কোনও পক্ষই খুশি হতে পারল না। কংগ্রেস দেশভাগ চায়নি। জিন্নাহ এমন পোকায় খাওয়া পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেননি। যাই হোক, অনেক সাধাসাধির পরে ১৯৪৭ সালের ৯ই জুন মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে দেশভাগের এই পরিকল্পনা মেনে নেওয়া হল। কংগ্রেসও মানল, ঠিক ছ’দিন পরে।
দেশভাগের ড্রাফট যখন তৈরি হচ্ছে, তখন হিন্দু মহাসভার মতো রাজনৈতিক দল কিংবা সঙ্ঘের মতো সাংস্কৃতিক সংস্থার তরফ থেকে কোনও কথাই কেউ শোনেনি। ক্ষুব্ধ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সঙ্ঘের কাগজে লিখলেন, ‘আমরা আমাদের এই পবিত্র ভূমির একটা খণ্ড বিনাযুদ্ধেই হারাতে চলেছি। অ্যাংলো-মুসলীম লীগের চক্রান্তে দর কষাকষিতে হার মেনেছে কংগ্রেস, বিনা প্রতিরোধে আত্মসমর্পণ করেছে।’
.
৫ই আগস্ট, ১৯৪৭। গুরুজি গোলওয়ালকর করাচিতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁকে রেলওয়ে স্টেশনে আনতে গিয়েছিলেন লালকৃষ্ণ আডবানি। গুরুজি করাচিতে সভা করলেন। এক লক্ষ হিন্দু শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে তাঁকে শুনেছিল। ১০,০০০ স্বয়ংসেবক পদযাত্রায় অংশ নিল, দেশাত্মবোধক গানের তালে-তালে পা মেলাল। নেতৃত্বে তরুণ আডবানি। সেই শুরু, এরপর আডবানির সাংগঠনিক ক্ষমতা নিয়ে আর প্রশ্ন উঠবে না দশকের পর দশক।
এর ঠিক ন’দিন পরে জন্ম নিল পাকিস্তান। রাজধানী হল করাচিতে। যারা পাকিস্তান চেয়েছিলেন, তাঁরা মণ্ডামিঠাই বিলোলেন। হিন্দুরা সেই মিষ্টি মুখে তুললেন না। পরের দিন, ১৫ই আগস্ট, ভারত স্বাধীন হল। বছর উনিশের আডবানি সেদিন অদৃষ্টকে দোষারোপ করেছিলেন মনে হয়— ‘হায় রে, পোড়া কপাল! পাঁচ বছর ধরে দেশের স্বাধীনতার জন্যে কত স্বপ্ন দেখেছি! আর আজ এমন দিন দেখালে?’ সম্ভবত তাঁর সিন্ধি আত্মাকে দুটুকরো করে দিয়েছিল ভারত- পাক সীমারেখা। আডবানি তাঁর পরের সত্তর বছর ধরে অনেক কিছু করবেন; সঙ্ঘের প্রচারক হবেন, রাজনৈতিক দল গঠন করবেন, সাংবাদিকতা করবেন, সরকারের অংশ হবেন, কিন্তু দেশভাগের প্রেত তাঁকে তাড়া করে বেড়াবে। মনে দাগ রয়ে যাবে।
.
এ তো গেল সীমান্তের ওদিকের ছেলেটির কথা। এপারে? বাজপেয়ী তখন কোথায়? খুব ব্যস্ত। নতুন জীবনে প্রবেশ করতে চলেছিলেন অটল। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট সঙ্ঘ একটি নতুন হিন্দি মাসিক পত্রিকা চালু করল। নাম ‘রাষ্ট্রধর্ম’। অফিস ছিল লখনউতে। ২২ বছরের অটলবিহারী হলেন সেই ম্যাগাজিনের প্রথম যুগ্ম- সম্পাদক। এরপরে তিনি ঢুকে পড়বেন সম্পাদনার কাজে। দফতর বদলে যাবে অবশ্য। তখন আর রাষ্ট্রধর্ম নয়, ‘পাঞ্চজন্য’র অফিসে বসবেন তিনি। ইত্যবসরে অটল সঙ্ঘের প্রথামাফিক সমস্ত সাংগঠনিক শিক্ষা শেষ করে ফেলেছিলেন। ইউনাইটেড প্রভিন্স বা অধুনা উত্তর প্রদেশের সীতাপুরে সঙ্ঘের প্রচারক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। কিন্তু প্রচারক রূপে যে ধরণের কষ্টের জীবন কাটাতে হয়, তার সঙ্গে কিছুতেই মানিয়ে উঠতে পারছিলেন না তিনি। অথচ এমন অমূল্য রত্নকে সঙ্ঘ হারাতেই বা চাইবে কেন? যুদ্ধক্ষেত্রে সব জওয়ান তো যুদ্ধ করে না, ডেস্কজবও তো থাকে রে বাবা! হিন্দি ভাষায় অসামান্য দক্ষ এই যুবককে তাই বলে দেওয়া হল, যাও তুমি জনসঞ্চারে সাহায্য করো। সঙ্ঘের জহুরীরা সেদিন হিরে চিনতে ভুল করেননি। শুধুমাত্র এই দক্ষতার ওপরে ভর করে পক্ষ আর বিপক্ষের লোকেদের নিজের কথার তারে অটলবিহারী খেলাবেন পরবর্তী ছয় দশক ধরে।
পাঞ্চজন্যের পাতায় কিন্তু দেশভাগের বিরুদ্ধেই লেখা চলছিল ক্রমাগত। মুসলিম লীগকে সুযোগসন্ধানী এবং লীগের অপকর্মে কংগ্রেসকে সম্মতিপ্রদানকারী বলা হচ্ছিল। দেশভাগের সমস্ত যুক্তিতর্ক অটলবিহারীর মাথায় ছিল। কিন্তু সীমান্ত থেকে ৮০০ কিলোমিটার ভেতরে বসে যেটুকু বোঝা যায় তা দিয়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম লেখা গেলেও ত্রাসটাকে অনুভব করা সম্ভব ছিল না।
কোটি-কোটি মানুষ বুঝতে পারছিলেন না কোনটা তাঁদের মুলুক হবে। কী হিন্দু, কী মুসলিম, কী শিখ সবাই তখন নতুন দেশের উদ্দেশে চলেছিল। পঞ্চাশ হাজার মুসলিম রমণী ধর্ষিতা হয়েছিলেন। হিন্দু আর শিখ নারীদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ছিল তেত্রিশ হাজার। হিসেবটায় ধর্ম ব্যতিরেকে শুধুমাত্র নারী রূপে বিবেচনা করলে সংখ্যাটা কোথায় দাঁড়াচ্ছে দেখুন, সুধী পাঠক। দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ মরেছিল দেশভাগের ফলে। আডবানি তখন নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে করাচি চষে বেড়াচ্ছেন। চাক্ষুষ করছেন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। চারিদিকে শুধুই শবের স্তুপ।
সাধারণ জনগণের কাছে উন্নত ভারতের প্রতীক ছিল রেলগাড়ি। পঞ্জাব প্রদেশের একদিক থেকে অপরদিকে ট্রেনে চড়ে রিফিউজিরা যাচ্ছিল। যার যেখানে জোর বেশি, সে সেখানে ট্রেন দাঁড় করিয়ে সব শরণার্থীকে হত্যা করে লাশে বোঝাই ট্রেন পাঠাচ্ছিল। ট্রেন লক্ষ্যে পৌঁছচ্ছিল, নীরবে, মৃতদেহের ভার বইতে-বইতে।
তুলনামূলক ভাবে করাচির হিন্দুরা অনেকটাই সুরক্ষিত ছিল। তবে ঝড়ঝাপটা তাঁদেরও পোয়াতে হয়েছিল। অনেক হিন্দুর পরিবারই দেশভাগের পরেও বেশ কিছুটা সময় ওখানে থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু সময় আর সমাজ দুটোই তখন বড় অস্থির। নিরাপত্তার অভাব বোধটা ছিলই। এমনই একটি পরিবার ছিল জগতিয়ানিদের। তাঁরা ১৯৪৮ সালে ভারতে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। যেদিন চলে আসেন, সেদিন করাচিতে তাঁদের বাড়ির সামনে থাকা একটা গুরুদ্বারা জ্বালিয়ে দিচ্ছিল ধর্মান্ধ কিছু লোকজন। জগতিয়ানিদের বাড়ির মেয়েই একটা সময়ে লালকৃষ্ণর লক্ষ্মী ঠাকুর হয়ে উঠবেন। অত্যুক্তি ভাববেন না যেন। মেয়েটির নামও কমলাই ছিল।
জগতিয়ানিদের মতোই আডবানিরাও এদেশে চলে আসেন। শরণার্থী হিসেবে এলেও, আর্থিক ক্ষমতা একটু অন্যপ্রকারই ছিল। অবশ্য সিন্ধের ব্যবসায়ী পিতার আনুকূল্যে লালকৃষ্ণ করাচিতে যে ধরণের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিলেন, তাতে ছেদ পড়েছিল। প্রাসাদোপম বাড়িতে বাস করা এবং ঘোড়ায় টানা গাড়িতে বসা ছেলেটিকে সিন্ধু রিসেটেলমেন্ট কর্পোরেশনের বন্দোবস্তেই খুশি হতে হচ্ছিল তখন।
আডবানি ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লিতে চলে আসেন। ব্রিটিশ ওভারসিজ এয়ারওয়েজ করপোরেশনের ফ্লাইটে করে। বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত আডবানির কষ্ট হচ্ছিল ঠিকই, তবে ধাক্কাটা বেশি খেয়েছিলেন মনে। ঘরবাড়ি ছেড়ে আসা ছেলেটির কাছে নতুন পরিবার হয়ে উঠছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। মেকলেপুত্র আডবানির গোত্রান্তর হচ্ছিল, তিনি ভারতের ভূমিপুত্রে পরিণত হচ্ছিলেন।
ঠিক দুমাস পরে আডবানি চলে যাবেন বোম্বে’তে। যে মানুষটার লেখা পড়ে তাঁর মনে চেতনার নবজাগরণ হয়েছিল, তাঁর সামনে গিয়ে বসবেন। ‘হিন্দুত্ব’ এবং ‘গ্রেট ওয়ার অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’ পড়তে-পড়তে শ্রী সাভারকরের যে ছবি তাঁর মনে জন্ম নিয়েছিল, তারই পূর্ণত্ব প্রাপ্তি ঘটাবেন। সত্যজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কু সিরিজের গল্পের সেই নকুড়বাবুকে মনে পড়ে? ক্লেয়ারভয়েন্ট। আগেই বুঝতে পারতেন কী ঘটতে চলেছে। আমাদের লালকৃষ্ণর মনকাহিনির ক্লেয়ারভয়েন্ট হয়ে উঠেছিলেন শ্রী সাভারকর। কয়েক দশক ধরে শ্রী সাভারকর কংগ্রেসের নীতির ভুল দিকগুলোকে তুলে ধরে যে ভবিষ্যৎবাণী করে চলেছিলেন, তা সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল দেশভাগের প্রকল্পে। সেদিন শিবাজী পার্কের বাড়িতে এক সংকল্পময় সন্ন্যাসীর সামনে বাধ্য শিষ্যের মতো বসে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন লালকৃষ্ণ। শ্রী সাভারকর দেশভাগের পরে সিন্ধ প্রদেশে হিন্দুদের অবস্থা নিয়ে খোঁজখবর নিয়েছিলেন।
তবে শ্রী সাভারকরের বিচক্ষণতা আডবানিকে স্পর্শ করলেও তাঁর বিপ্লবীস্বভাব কিন্তু লালকৃষ্ণর মনকে ছুঁতে পারেনি। এত কষ্ট, এত দৈন্য, এত আঘাত দেখে অনেকেই হয়তো হাতে অস্ত্র তুলে নিতে পারত, আডবানি বেছে নিয়েছিলেন মৌনতা, সঙ্ঘের প্রতি নিষ্ঠা, অরাজনৈতিক চিন্তাধারা, এবং সামাজিক পরিবর্তনের সংকল্প। আর এই গুণগুলোই রাজনৈতিক আডবানির মধ্যেও দেখা যাবে, সেই আডবানি দু -দুবার প্রধানমন্ত্রীর আসনের খুব কাছে এসেও গদি স্পর্শ করতে পারবেন না, কিন্তু তাঁর মধ্যে কোনও ক্ষোভ থাকবে না, হিংসে থাকবে না।
রাজস্থানে সঙ্ঘের প্রচারকের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছিল আডবানিকে। যেসব শাখা আগে থেকেই চলছিল, সেগুলোর তত্ত্বাবধান এবং নতুন শাখার প্রতিষ্ঠা। শাখাগুলির নেতৃত্ব নির্বাচন, স্বায়ত্ত শাসনের কথা বোঝানো, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলিয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক দিকগুলো খোলসা করে দেওয়া এসবই ছিল তাঁর কাজ। সঙ্ঘের দেশজ উৎপাদনের কোয়ালিটি ইনস্পেক্টরের ভূমিকা পালন করছিলেন তিনি। গ্রামে-গ্রামে ঘুরছিলেন, চলছিলেন কখনও সাইকেলে চেপে, কখনও বাসে চড়ে, আবার কখনও বা উটের পিঠে বসে। আর ওদিকে ভারত সরকার চলছিল নিজের ছন্দে।
ভারতের মসনদে তখন নেহরুজি। কংগ্রেসের পছন্দ ছিল সর্দার পটেল’কে, আর নেহরুজিকে পছন্দ করেছিলেন গান্ধীজি স্বয়ং। গান্ধীজি একথাও বলে দিয়েছিলেন কংগ্রেস সরকারে থাকলেও ক্যাবিনেটে কিন্তু সব দলের প্রতিনিধিকে রাখতে হবে। তাই ক্যাবিনেটে আম্বেদকর ছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন।
দেশভাগের পরে যেসব মুসলিম ভারতে রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা কিছুটা শঙ্কায় ভুগছিলেন। তখন তাঁরা সুরক্ষার জন্যে তাকাচ্ছিলেন কংগ্রেসের দিকে, মুসলিম লীগ তো জিন্নাহ সাহেবের সঙ্গে পাকিস্তানেই চলে গিয়েছিল। আরএসএস কিন্তু হিন্দুদের একত্রিত করার সুবর্ণ সুযোগ দেখল। ‘৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে গুরুজি বললেন, অবশিষ্ট মুসলিমরাও এবার ভারত থেকে বিদায় নিলেই ভালো হয়। মহাত্মা গান্ধী অবশ্য রয়ে যাওয়া মুসলিমদের ভারতেই রাখার পক্ষে ছিলেন, আর কংগ্রেস তো ছিলই— এমন সুরক্ষিত ভোট ব্যাঙ্ক কে-ই বা হারাতে চায়?
অসুরক্ষাই হোক বা অন্য কোনও কারণে, দেশভাগের পরেও এদেশ থেকে অনেক মুসলিম পরিবার পাকিস্তান চলে যাচ্ছিল এবং বহু হিন্দু এদেশে আসছিল। খেয়াল করুন, দুটোর যেটাই ঘটুক না কেন ভারতে হিন্দু পরিণত হচ্ছিল সুপার মেজরিটিতে। তার ফলে হিন্দু মহাসভার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং সঙ্ঘের ক্ষেত্রে সামাজিক উচ্চতা ক্রমশ বৃদ্ধি হচ্ছিল। বলাই বাহুল্য যে, ‘হিন্দুত্ব’ নামক বীজটিকে বপন করার উপযুক্ত সময় এসে উপস্থিত হয়েছিল। কিন্তু বিধাতা যখন নিজের কলম চালান, তখন সমস্ত পরিকল্পনা তছনছ হয়ে যায়। হিন্দুত্বের চাষআবাদে জল ঢেলে দিল স্বাধীন ভারতের প্রথম রাজনৈতিক হত্যা। ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি বিকেল ৫:১৭ তে গান্ধীজির বুকে তিনটে বুলেট দেগে দিয়ে গেল হিন্দু মহাসভার এক সদস্য নাথুরাম গডসে।
.
ভারতের মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীজি নাথুরাম গডসের হাতে নিহত হলেন। নাথুরামকে নিয়ে, তাঁর মরাঠা ব্রাহ্মণের লিনেজ নিয়ে আরও কিছু কথা লেখার আছে। নাথুরাম শ্রী সাভারকরকে শুধু যে অনুসরণ করত তা-ই নয়, অনুকরণও করত। তার বোলচালে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের একটা অদ্ভুত ছাপ পড়েছিল। একইরকমের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ক্লিন শেভড চিবুক ছবিতে দেখলে নাথুরাম গডসে-কে শ্রী সাভারকরের তরুণ সংস্করণ বলে মনে হয়। নাথুরামের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল কংগ্রেস আর ব্রিটিশদের সহযোগীতায় হিন্দু ঐক্যে কেউ বা কারা চিড় ধরাচ্ছে। হিন্দু মহাসভার বদলে হিন্দুরা কংগ্রেস নামক দলটিকে বেছে নিচ্ছিল বলে নাথুরাম মনে-মনে ক্ষুব্ধ হচ্ছিল, তার মনে হতো এসবের জন্যে মহাত্মা গান্ধীর ক্যারিশমাই দায়ী। তার মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা বাসা বাঁধছিল যে, গান্ধীজি নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে হিন্দুদের বিপথে চালিত করছেন। নাথুরাম মনে করত, জাতিভেদ বলে কিচ্ছু নেই। সমস্ত হিন্দুই সমান। জন্মের কারণে নয়, মেধার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করা উচিত।
নাথুরাম গডসের এহেন চিন্তাধারার সঙ্গে সঙ্ঘের চিন্তার মিল পাওয়া যায়, কিন্তু তার এবং সঙ্ঘের বিচারধারায় অমিলও ছিল বিস্তর। আক্রমণাত্মক হিন্দুত্বের ক্ষেত্রে দুপক্ষের মধ্যে একদমই মিল ছিল না। সঙ্ঘের বক্তব্য ছিল যদি হিন্দুদের ওপরে আক্রমণ নেমে আসে, তখন আত্মরক্ষার জন্যে হিংসার পথ বেছে নিতে পিছপা হওয়া যাবে না। আর গডসে? তার মতে বিপক্ষ আক্রমণ করার আগেই তাকে মেরে দাও। সঙ্ঘ হোক বা নাথুরাম, দুই পক্ষের কাছেই আদর্শ ছিলেন ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ। সঙ্ঘের বক্তব্য ছিল, যেভাবে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ হিন্দুদের একত্রিত করেছেন, সেটাই হবে নীতি। গডসের মত ছিল, শিবাজি মহারাজ যেভাবে আফজল খাঁয়ের বুক বাঘনখ দিয়ে চিরে দিয়েছিলেন, সেভাবেই আগে আক্রমণ করে দিতে হবে। যদি শিবাজি রাজা সেদিন শত্রুকে আগেভাগে না-মারতেন, তাহলে তাঁকেই মরতে হতো হয়তো।
আর গান্ধীজি কোনও প্রকারের হিংসাতেই আস্থা রাখতেন না। সঙ্ঘের সঙ্গে এই নিয়ে তাঁর মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সম্মানের কোনও অভাব ছিল না। তিনি একাধিক বার সঙ্ঘের শাখায় উপস্থিত থেকে সঙ্ঘের ভূমিকা নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। গোল বাঁধছিল অন্যত্র। গান্ধীজির নীতি মেনে নিতে পারছিল না নাথুরাম গডসে। গডসে ভাবছিল, গান্ধীজি হিন্দুদের সামাজিক আর রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল করে তুলছিলেন, দুর্বলতাগুলোকে মেলে ধরছিলেন।
১৯৪৩ সালে একটা মরাঠি কাগজ বেরোতে শুরু করে। নাম ছিল ‘অগ্রণী’। হোতার নাম নাথুরাম গডসে। কাগজটার মাথায় শ্রী সাভারকরের একটা ফটো থাকত। শোনা যায়, তিনি নাকি খবরের কাগজটিকে চালু করার জন্যে ১৫,০০০ টাকা দিয়েছিলেন। গান্ধীজি মুসলিম লীগের প্রতি কতটা সহৃদয় তা নিয়ে অগ্রণী বেশ কঠোর সমালোচনা করে খবর ছাপত। এবং গান্ধীজি ছাড়াও আরও একটি পক্ষের তীব্র সমালোচনা করে অগ্রণীতে লেখালিখি হতো।
কাকে টার্গেট করা হতো বলুন তো?
সঙ্ঘ-কে।
একদম ঠিক পড়লেন। নাথুরাম গডসের ছাপানো সংবাদপত্রে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে তীব্র সমালোচনা করা হতো। বলা হতো, সঙ্ঘ অত্যন্ত শ্লথ। নাথুরাম গডসের কাগজে হওয়া সঙ্ঘ-নিন্দা নিয়ে লালকৃষ্ণ আডবানিও পরবর্তীকালে লিখেছেন। সঙ্ঘের প্রতি নাথুরামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত তিক্ত ছিল। সঙ্ঘ নাকি জঙ্গিপনা থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে হিন্দুদের আক্রমণাত্মক ভাবটাকে দমিয়ে দিচ্ছে।
দেশভাগ তথা পাকিস্তানের জন্ম নাথুরামকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল আগের চেয়েও অনেক বেশি। ১৯৪৮ সালের ১২ই জানুয়ারি গান্ধিজি বললেন, ব্রিটিশ ভারতের ফান্ড থেকে পাকিস্তানকে যে অর্থ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল তার অনুপালনে স্বাধীন ভারতের সরকারকে বাধ্য করার জন্যে তিনি উপবাস করবেন। আর এই ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গেই নাথুরামের মনে গান্ধীজীর জন্যে জমে থাকা ঘেন্নাটা তীব্রতম রূপ ধারণ করে। গডসে মনে-মনে ঠিক করে এবার গান্ধী নামক এই ব্যক্তিত্বের জীবনে এবার ইতি টানতেই হবে। যেমনি ভাবা, তেমনি কাজ। অগ্রণী’র সহ-সম্পাদক নারায়ণ আপটে এবং দেশভাগে বিধ্বস্ত একটি পঞ্জাবি পরিবারের ছেলে মদনলাল পাহওয়াকে নিয়ে নেমে পড়ল গান্ধী-হত্যার পরিকল্পনায়।
২০শে জানুয়ারি, ১৯৪৮। গান্ধীজি তখন দিল্লির বিড়লা হাউজে। পাহওয়া সেখানে বিস্ফোরণ ঘটাল। ক্ষয়ক্ষতি কিছুই হয়নি, পাহওয়াও পালিয়ে বাঁচল। দশদিন পরে আপটেকে সঙ্গে নিয়ে গডসে বিড়লা হাউজে গেল। পকেটে ছিল একখানা বেরেট্টা নাইন এম এম সেমি অটোম্যাটিক পিস্তল। বাকীটা ইতিহাসে লেখাই হয়েছে। তবুও ছোট্ট করে লিখেই দিই। প্রার্থনা তখনো আরম্ভ হয়নি। প্রায় ২০০ জন মানুষ মহাত্মাকে দেখার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। গডসে ভিড়েই ঘুরছিল তখন। আচমকা গুঞ্জন উঠল— গান্ধীজি আসছেন। উপস্থিত সকলে সরে গিয়ে গান্ধীজির চলার পথ করে দিল। দেখে মনে হচ্ছিল মোজেসের সম্মানে ভাগ হয়ে যাচ্ছে লোহিত সাগর। গান্ধীজিকে দেখা গেল। দুদিকে দুই তরুণীর কাঁধে ভর দিয়ে বৃদ্ধ মহাত্মা চলেছেন। সবাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি নিজের হাত তুললেন, আর তখনই তাঁর সামনে এগিয়ে গিয়ে ডানদিকের তরুনীটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল নাথুরাম। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে তিন-তিনটে বুলেট দেগে দিল গান্ধীজির বুকে। গান্ধীজি মাটিতে পড়ে কিছু একটা বললেন। শেষ শব্দ। পরে মনু গান্ধী (ওই দুই তরুণীর একজন ছিলেন মনু, অপরজনের নাম ছিল আভা) বলেন গান্ধীজি ‘হে রাম’ বলেছিলেন। অসমর্থিত সূত্রে জানা যায়, গান্ধীজির সহায়ক ভি কল্যাণম অবশ্য বলেছিলেন যে, গান্ধীজি কোনও ‘হে রাম’ গোছের শব্দ বলেননি।
গডসে গ্রেফতার হল, সঙ্গে নারায়ণ আপটেও, আর গ্রেফতার হল দিগম্বর বাড়ে। এই দিগম্বর রাজসাক্ষী হয়ে যাবে। মোট ন’জন অ্যারেস্ট হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন হিন্দুত্বের ধ্বজা বাহক শ্রী বিনায়ক দামোদর সাভারকর।
লালকেল্লায় শুনানি শুরু হল। দশ মাস ধরে ১৪৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গৃহীত হল। বিচারক গডসে আর আপটেকে ফাঁসির সাজা শোনালেন। অন্যদের জেল হয়। একমাত্র শ্রী সাভারকরকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় আদালত, কোনও সাক্ষ্য প্রমাণই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারেনি। গডসেকে আম্বালা জেলে ১৯৪৯ সালের ১৫ই নভেম্বর ফাঁসি দেওয়া হয়। শোনা যায়, ফাঁসির মঞ্চের দিকে যাওয়ার সময় তার মুখে হাসি এবং হাতে ভগবতগীতা ছিল।
গান্ধীজিকে গডসে হত্যা করেছিল কিনা এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কেন মেরেছিল তা নিয়েও কুয়াশা নেই বিন্দুমাত্র। নিজের স্বপক্ষে যুক্তি রেখে ৯৩ পাতার বয়ান দিয়েছিল গডসে।
গডসে গান্ধীজি এবং ভারতের ইলেক্টোরাল সিস্টেমে তাঁর প্রভাব নিয়ে ভয়ানক তর্ক রেখেছিল। হিন্দুধর্মী লোকেদের ভোটাধিকার খর্ব করা নিয়েই দলিল পেশ করেছিল। বিষয়টা নিয়ে একই রকমের চিন্তায় ভুগতেন শ্রী সাভারকর এবং তাঁর হিন্দু মহাসভা। এবং সম্ভবত আরএসএস-ও। গডসে গান্ধীজিকে হত্যা করেছিল, আর হত্যার মোটিভ মিলে যাচ্ছিল অন্য একাধিক ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের চিন্তাধারার সঙ্গে।
তাহলে কি গান্ধী হত্যায় সঙ্ঘ, শ্রী সাভারকর কিংবা মহাসভার ভূমিকা ছিল?
১৯৬৬ সালে আবার একটি কমিশন এই হত্যার তদন্তে নামে। ১০১ জন মানুষের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ৪০৭ খানা দলিল পেশ করা হয়। তদন্তে কখনোই
সঙ্ঘ নেতৃত্বের সাথে গডসের কোনও প্রকার যোগসূত্র প্রমাণিত হয়নি। সঙ্ঘকে চিরকালের মতো এই দোষ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। সঙ্ঘ নিয়ে প্রচুর বইপত্র লেখা হয়েছে। তার অনেকগুলো যেমন সঙ্ঘের বিচারধারাকে প্রচার করে, সঙ্ঘের হয়ে কথা বলে, তেমনি সঙ্ঘের বিরুদ্ধে লেখা বইয়ের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সঙ্ঘ-বিরোধী এমন একজন বিখ্যাত লেখক হলে এ জি নূরানি। ভদ্রলোক কট্টর সঙ্ঘ-বিরোধী হলেও বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, গান্ধী-হত্যায় সঙ্ঘের কোনও ভূমিকাই ছিল না। একটাই যোগ ছিল, গডসে একজন প্রাক্তন সঙ্ঘী এবং সঙ্ঘের বিচারধারায় বিশ্বাসী ছিল।
কিন্তু প্রাক্তন সঙ্ঘী কেন? তবে কি গান্ধীজিকে হত্যা করার সময় নাথুরাম সঙ্ঘ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন