সেই ফুলের দল – ২১

অভীক মুখোপাধ্যায়

২৪শে ডিসেম্বর ১৯৯৯। শীতকালে দিন ছোট, রাত বড়। অন্ধকারে একটু বেশিক্ষণ থাকার অভ্যেস থাকেই। সমস্যা হয় না। কিন্তু ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নাম্বার আইসি-৮১৪ এয়ারবাস এ থ্রি হান্ড্রেড-এর ১৭৯ জন যাত্রী এবং ১১জন ক্রু মেম্বারের জীবনে নেমে আসতে চলেছিল এমন এক ভয়ানক আঁধার, যা তাঁরা অতি বড় দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি।

বিকেল সাড়ে চারটের সময় নেপালের ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাইট টেক অফ করল। গন্তব্য ছিল দিল্লির আই জি আই এয়ারপোর্ট।

নেপাল ছেড়ে ওড়ার সময় হিমালয়ের কোলে সুসজ্জিত কাঠমান্ডু শহরের মিটমিটে আলোবাতিগুলোকে হাজার ফুট উচ্চতা থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল, কোনো আগ্নেয়গিরির মোহানামুখ থেকে দূরে-দূরে ছিটকে পড়া লাল-হলুদ লাভার বিন্দু।

প্লেনের ভেতরে বিমানবালার সুরেলা কণ্ঠের নির্দেশ মেনে যাত্রীরা নিজেদের সেফটি বেল্ট খুলে দিলেন। হিন্দি আর ইংরেজিতে বার বার ঘোষণা করা হচ্ছিল যে, কাঠমান্ডু থেকে নিউ দিল্লির এই আকাশ যাত্রার জন্য এক ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট সময়ে লাগবে। বিশ্বের একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র নেপাল থেকে সকলে ফিরছিলেন। মজার ব্যাপার হল নেপালকে ভারতবাসী যতটা পশুপতিনাথ মন্দিরের জন্য চেনে, ততটা কিন্তু নেপালের সুসংগঠিত ক্যাসিনো নেটওয়ার্কের জন্য চেনে না। নেপাল লো বাজেট জুয়াড়িদের মনপসন্দ জায়গা। ক্রিসমাসের ছুটি আর জুয়ার খেলা খেলার জন্য এখানে ভিড় জমে যায়।

যাত্রীরা প্রায় সকলেই ছুটি কাটিয়ে মনে আনন্দের আমেজ নিয়ে ফিরছিলেন। ক্রিসমাস থেকে থার্টি ফার্স্ট ডিসেম্বরটা এবার বাড়িতে কাটানোর পালা। খুব অল্প সময়ের ফ্লাইট ডিউরেশন। তাই প্লেন টেক অফ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানের ক্রু মেম্বাররা খাবারের ট্রে-গুলোকে সার্ভ করতে শুরু করে দিলেন।

ফ্লাইট আই সি ৮৪০ ভারতীয় বায়ুসীমায় প্রবেশ করল। চীফ ফ্লাইট পার্সর ককপিটে উপস্থিত ক্যাপ্টেন, কো-পাইলট, ফ্লাইট এঞ্জিনিয়ারকে খাবারদাবার সার্ভ করে বেরোচ্ছেন এমন সময়ে এক ব্যক্তি তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে ককপিটের ভেতরে নিয়ে গিয়ে ফেলল। বেঁটেখাটো লোকটার হাতে একটা রিভলবার তাঁর দিকে তাক করে ধরা রয়েছে। চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা। নাক-মুখ ঢাকা রয়েছে একটা লাল কাপড়ের টুকরো দিয়ে। লোকটা একটা গ্রে কালারের সাফারি স্যুট প’রে আছে।

অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় ককপিটে থাকা ক্যাপ্টেন, কো-পাইলট, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার প্রত্যেকেই একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনজনেই এয়ার ইন্ডিয়ার অভিজ্ঞতম সদস্যদের মধ্যে পড়েন। কাউকে কিছু বলতে হল না। তাঁরা বুঝে গেলেন যে প্লেন হাইজ্যাকড হয়েছে।

ককপিটে ঢোকার পরেই বন্দুকধারী ককপিটের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। ভেতরে থাকা ফ্লাইং পারসোনেলদের সবার দিকে বন্দুকের নলটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল— ‘কেউ কোনো রকম চালাকি করবি না। এই ফ্লাইটটাকে আমরা পাঁচজনে হাইজ্যাক করেছি। আমাদের কথামতো কাজ না-করলে আমরা এই গ্রেনেড চার্জ করে প্লেনটাকে উড়িয়ে দেব।’

ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার অভিজ্ঞ ব্যক্তি। মুহূর্তে অবস্থা আঁচ করে নিয়ে বন্দুকধারীকে শান্ত করার জন্য নিজের সিট অফার করে বললেন— ‘জনাব জনাব…আপ য়হাঁ বেয়ঠে অউর ইত্মিনান সে ফরমায়ে কি মসলা কেয়া হ্যাঁয়।’

‘বকোয়াস বন্ধ কর বে, অউর মেরে মুতাবিক হাওয়াই জাহাজ কো পশ্চিম কি ওর মোড় লে।’

‘পশ্চিম দিকে?’

‘হ্যাঁ।’

পশ্চিম— মানে পাকিস্তান আফগানিস্তান ইরাক। ক্যাপ্টেন ঠাণ্ডা মাথায়, শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন— ‘পশ্চিমে কোথায়?’

‘লাহোর! লাহোর চলনা হ্যাঁয়।’

.

গৃহমন্ত্রী আডবানিজি তখন নিজের অফিসে কাজ করছেন। ফোনে খবর এল, কাঠমান্ডু থেকে দিল্লি আসার পথে একটি ভারতীয় বিমানকে পাঁচজন জঙ্গী হাইজ্যাক করেছে। বিমানটি প্রাথমিকভাবে লাহোরে নামার অনুমতি চাইলেও পাকিস্তান অনুমতি দেয়নি। বলেছে, পাক বায়ুসীমায় অনুপ্রবেশ করলে মিসাইল দেগে উড়িয়ে দেব।

পাকিস্তানে নামতে না-পেরে সন্ধে সাতটা নাগাদ বিমানটি ভারতের অমৃতসর বিমানবন্দরে এসে নামল। জানা গেল অপহরণকারীর দল যাত্রীদের রেহাই করার বদলে মুক্তিপণ দাবি করছে। ছত্রিশজন সন্ত্রাসবাদীকে জেল থেকে ছাড়তে হবে, সঙ্গে দিতে হবে ২০০ মিলিয়ন ডলার।

.

ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী তখন এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে করে বিহার থেকে ফিরছেন। সঙ্গে রয়েছেন ইউনিয়ন সিভিল অ্যাভিয়েশন মিনিস্টার শ্রী শরদ যাদব। জনসভা ছিল। বেশ সফল হয়েছে। সামনেই বিহারের বিধানসভা নির্বাচন। জনসভায় ভিড় দেখে আগামী ভোটের সাফল্যের অঙ্ক আন্দাজ করে খোশমেজাজ বাজপেয়ীজি। প্রধানমন্ত্রী অনুমানও করতে পারেননি ঠিক একই সময়ে ভারতের আকাশে সামান্য দূরেই কী ঘটে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রী এই ব্যাপারে পুরোপুরি অন্ধকারেই ছিলেন। দিল্লির পালাম টেকনিক্যাল এরিয়াতে অবতরণ না করা পর্যন্ত তাঁকে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি বা যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী সংবাদ না-পেলেও দিল্লির মাটিতে মন্ত্রী আর মন্ত্রকের আধিকারিকেরা তখন তটস্থ। চাতক যেমন জলের জন্য আকাশের দিকে চেয়ে বসে থাকে, তাঁরাও তখন প্রধানমন্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছেন।

পরদিন ২৫শে ডিসেম্বর। অটলবিহারী বাজপেয়ীর জন্মদিন। বড়সড় পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। কেউ আঁচ করতে পারেননি যে অমন আনন্দের দিনটাকে মাটি করার জন্য ওঁত পেতে বসে রয়েছে একটা ন্যাশনাল ক্রাইসিস। এমন এক বিস্ফোরণ, যার তীব্রতায় কেঁপে উঠবে দেশের সংসদ, চিড় ধরবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও।

.

ব্রজেশ মিশ্রার কাছে যখন বিমান অপহরণের খবরটা এল, তখন তিনি দিল্লির সাউদ ব্লকে। ভদ্রলোক ক্যাবিনেট সেক্রেটারি প্রভাত কুমারের সঙ্গেই কথা বলছিলেন। প্রভাত কুমার এই সংবাদ পাওয়া মাত্রই ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ বা সি এম জি-এর ড্রিল ইনিশিয়েট করার নির্দেশ দিলেন। উচ্চ পর্যায়ের একটি জরুরি বৈঠক ডাকা হল। স্থান: রাজীব গান্ধী ভবনের কন্ট্রোল রুম। সময়:সন্ধে ঠিক ছ’টায়। ব্রজেশ মিশ্রা গেলেন অটলজিকে খবর দিতে, অটলজি তখন মাঝ আকাশে, আর আডবানিকে বৈঠকে রাখা হয়নি। বৈঠকের মাথা হিসেবে কাজ করছিলেন প্রভাত কুমার।

.

পালাম টেকনিক্যাল এরিয়াতে প্রধানমন্ত্রীর প্লেনের ল্যান্ডিং আর অমৃতসরের রাজা সাঁসি এয়ারপোর্টে এয়ার ইণ্ডিয়ার হাইজ্যাকড বিমানের অবতরণ প্রায় একই সময়ে ঘটল।

প্রধানমন্ত্রীর জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এক ভদ্রলোক। মাথাজোড়া টাক, ভরাট গলা, বিরল ব্যক্তিত্ব। তীক্ষ্ণ দুটি চোখ বুদ্ধির জানান দিয়ে যায়। মধ্যপ্রদেশের ব্রাহ্মণ। তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শ্রী ব্রজেশ মিশ্রা। অধীর আগ্রহ শব্দটির বদলে ব্যবহার করা উচিত উৎকণ্ঠা। এটাই হবে উপযুক্ত শব্দ। মিস্টার প্রাইম মিনিস্টারের ফ্লাইট ল্যান্ড করা মাত্রই তিনি সিঁড়ির মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন। অটলবিহারী বাজপেয়ীজি মাটিতে পা-রাখার আগেই তাঁকে খবরটা দিলেন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্রা। স্তম্ভিত হয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী— ‘কেয়া বোল রহে হ্যাঁয় আপ?’

অমৃতসরে প্লেন এসে নামার প্রধান কারণ ছিল রিফুয়েলিং। ভারত সরকার যথাসম্ভব দেরি করে একটা উপায় বের করতে চাইছিল। শিখ সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে লড়ে পোক্ত হয়ে ওঠে পঞ্জাব পুলিশের কম্যান্ডো দিয়ে অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্তও প্রায় পাকা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দিল্লি বলছিল, ‘No casualties to passengers.’

টালবাহানার পর বিমান টেক অফ করল। অমৃতসর ছাড়ার পরেও হাইজ্যাকাররা লাহোর লাহোর করছিল। কিন্তু পাকিস্তান আবার কখনোই সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয় না। তাই প্লেন গিয়েছিল দুবাইতে। জ্বালানি শেষ। ভারত সরকার দুবাইকে সব জানাল। একটি অল্প ব্যস্ত বিমানবন্দরের এক কোণায় বিমান দাঁড়িয়ে রইল।

দুবাইতে ভারত সমঝোতা করার সুযোগ পায়নি। আরব শেখরা অপারেশন চালানোর সম্মতি দেয়নি। সিএনএন বিমানের ছবি সরাসরি সম্প্রচার করার দায়িত্ব পেয়েছিল। সারা রাত ভারতের অসম্মানের ছবি তুলে ধরছিল বিশ্ববাসীর কাছে। একের তিন ভাগ যাত্রী আর একজন যাত্রীর মৃতদেহ নামিয়ে দিয়ে হাইজ্যাকাররা পেল জ্বালনি। ছাড়ো, দুবাই থেকে প্লেন ছাড়ো। এবার গন্তব্য আফগানিস্তানের কান্দাহার। তাই তো শুরুতেই আমি গান্ধারীর দেশ টেশ বলছিলাম।

কান্দাহারে তখন তালিবানিদের সরকার চলছে। কট্টর ঐসলামিক সংগঠন হিসেবে তালিবানিরা যে সন্ত্রাসবাদীদের মুখ শুঁকে ভালো বলবে এতে কোনও দ্বিমত ছিল না। তবে পাকিস্তান এই ঝামেলা থেকে যতই দূরে থাকতে চাক না কেন, ভারত সরকার খুব স্পষ্টভাবে বুঝে গিয়েছিল পাকিস্তান এজেন্সি আইএসআই হাইজ্যাকারদের নাচাচ্ছিল। কারগিলের বদলা নিচ্ছিল পাকিস্তান।

.

গুহা-কন্দরে ভরা আফগান ভূমি থেকে টিভি চ্যানেলের লাইভ সম্প্রচারে সারা বিশ্বে ভারতীয় বিমানটাকে বারংবার দেখাচ্ছিল। ভারত সরকার আর হাইজ্যাকারদের মধ্যে কথা চলছিল। এভাবে এক সপ্তাহ কাটল। স্বভাবতই প্লেনের যাত্রীদল, কেবিন ক্রু, তাঁদের আত্মীয় পরিজন এবং ভারত সরকারের কাছে এই ক’টা দিন নরকে কয়েকটি ঋতুর সমান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নেতারা দিশাহারা। মিডিয়া প্যানিকে তপ্ত আত্মীয়স্বজনরা (যাত্রীদের) বিদেশমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্সে ঢুকে পড়লেন। স্বপ্নে বাবরের সঙ্গে যুদ্ধ করা দলের সরকারকে পাগল করে তুলছিল কয়েকজন হাইজ্যাকার। যুদ্ধ টিভির ওপারে আর সীমাবদ্ধ ছিল না। ঘরের লোকেরাই বলছিল— ওরা যা চাইছে দিয়ে দাও।

সমঝোতা চলল। হাইজ্যাকাররা বলল, ছত্রিশ না হলে অন্তত তিরিশ জনকে মুক্তি দাও। ভারত সরকার সেটাকে টেনেটুনে তিনে এনে নামাল। এই তিনজনের মধ্যে পাকিস্তানের প্রকাণ্ড বিদ্বান মাসুদ আজহার এবং পাকিস্তানের বেসরকারি সৈন্যবাহিনী(হাসি পেলেও চেপে রাখুন)কে প্রশিক্ষণ প্রদানকারী উমর শেখকে ছাড়া হবে বলে ঠিক হল। দুজনের নাম হল। তৃতীয় জন? সে আবার আমাদের কাশ্মীরের ছেলে মুস্তাক আহমেদ জারগর। কাশ্মীরের একসময়ের মুখ্যমন্ত্রীর চিকিৎসক কন্যা রুবিয়া সইদের অপহরণ কাণ্ডে এই জারগরকে আগেও একবার মুক্তিপণ হিসেবে ছাড়া হয়েছিল। সে আবার ধরা পড়ে। কান্দাহারে মুক্তি পাওয়া তার নিয়তিতে লেখা ছিল।

৩১শে ডিসেম্বর ১৯৯৯ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে মিটিং বসল। ব্রজেশ মিশ্রা যখন বললেন হাইজ্যাকারদের দাবি মেনে নিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের ছেড়ে দেওয়া হবে, তখন কেউ অরাজি হননি। বিদেশমন্ত্রী জশবন্ত সিং সরকারের সিদ্ধান্ত শুনেই বলেছিলেন, ‘আমাকে এখুনি বেরোতে হবে।’

.

জশবন্ত সিং-এর কাছে কান্দাহার পর্ব অমৃতমন্থনের ঘটনার মতো হয়ে উঠেছিল। নতুন শতাব্দী তখন নববধূর মতো ঘুমে আচ্ছন্ন। জশবন্তের ঘরে এক নতুন অতিথির আগমন হয়েছে। নাতনির জন্ম হয়েছে। কম কথা! মিষ্টিমুখ করাতে তিনি যখন ব্যস্ত, তখন তিনি খবর পেলেন ভারতের বিমানকে অপহরণ করা হয়েছে।

ক্যাবিনেট মিটিং -এর সিদ্ধান্ত বিষের মতো ভাজপা এবং বাজপেয়ীর সরকারকে আজীবন তাড়া করে বেড়াবে। কিন্তু এই বিষ কাউকে না কাউকে ধারণ করতেই হতো। জশবন্ত নীলকণ্ঠ হয়ে গরল গলায় নিলেন। একসময় যিনি শক্তিমান ভারতীয় সেনার কম্যান্ডার ছিলেন, তিনিই হার মানা হার গলায় প’রলেন।

এত কিছু বলছি কেন? কারণ বড় অপ্রিয় কাজ ছিল এটা। আজীবন অপমানিত হওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পরে অনেক লৌহ পুরুষ এই সিদ্ধান্ত থেকে নিজের নাম সরিয়ে নিয়েছিলেন। অনেক মহীয়সী বলেছিলেন, আমি তো বলিনি। রাজস্থানের বীরই এগিয়ে এলেন। একসময় মন্ত্রী তালিকা থেকে যার নাম কেটে বাদ দেওয়া হয়েছিল, তিনি একজোড়া কোট, একটা গীতা, আর একটি রুদ্রাক্ষ নিয়ে কান্দাহারে চললেন।

তিন সন্ত্রাসবাদীকে সঙ্গে নিয়ে জশবন্ত কান্দাহারে গেলেন। ৩১শে ডিসেম্বর, অপহরণের সাত দিন পরে, ঘরের ছেলেমেয়েরা ঘরে ফিরলেন। সারা বিশ্ব দেখল ভারতের বিদেশমন্ত্রী বিমানের সিঁড়ির নীচে ততক্ষণ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ না শেষ প্যাসেঞ্জার সুরক্ষিত অবস্থায় ভারতের মাটিতে পা রাখছেন।

এরপর সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেকে অনেক কিছু বলেছিলেন। আডবানি বলেছিলেন, ‘we are a soft state’. কারো মত ছিল এই সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে হিন্দুরা যে দুর্বল তা আবারও প্রমাণিত হয়ে গেল। কেউ বলছিলেন, পাকিস্তান আর কাশ্মীর নিয়ে বাজপেয়ী বড় নরম। যত মুখ, তত কথা।

এই প্রসঙ্গে একটা মজার কথা বলি। জশবন্তের ছেলে মানবেন্দ্র একটি নিউজ আর্টিকেলে লিখেছিলেন তিনি ২০১৬-১৭ সালে একবার এনডি টিভির একটি ডিবেট দেখছিলেন। সঙ্গে তাঁর বাবাও বসে ছিলেন। ওই অভিশপ্ত বিমানের একজন মহিলা যাত্রী বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কথা শুনে মনে হচ্ছিল প্রবল প্রতাপী ভদ্রমহিলা। এবং তাঁর বক্তব্যের একটা বড় অংশ শুধু এই নিয়ে ছিল যে, সরকার কেন সন্ত্রাসবাদীদের ছেড়ে দিল। এটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি।

জশবন্ত মানবেন্দ্রকে বলেছিলেন— ‘ইয়ে লেডি উস জহাজ মে সবসে জাদা হিস্টিরিক্যাল থি। জব ম্যায় জহাজ পর পহুঁচা তো ইয়ে মেরে সিনে সে আকর লগ গয়ি অউর কঁহা, আপনে ইতনি দের কিউ লগা দি?’

*****

আম আদমি বা গঙ্গু তেলিদের কথা বলতে বলতে থেমে গিয়েছিলাম। আবার ফিরে আসি।

আডবানি ছিলেন দক্ষ সংগঠক। দলীয় কর্মীদের হাতের তালুর মতো চিনতেন। সরকারের কাজের সময়টুকু বাদ দিলে দিনের বাকীটা পার্টির হেডকোয়ার্টারে কাটাতে ভালোবাসতেন। অটলবিহারী ছিলেন ঠিক এর বিপরীত। তাঁর প্রিয় জায়গা ছিল সংসদের সেন্ট্রাল হল। সংসদ ভবনের (যখন বসে লিখছি, তখনও সেন্ট্রাল ভিস্তায় সংসদ ভবন স্থানান্তরিত হয়নি) সুউচ্চ গম্বুজের ঠিক নীচে, লোকসভা, রাজ্যসভা এবং রিডিং হলের মধ্যিখানে সেন্ট্রাল হল অবস্থিত। এমনিতে বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত না হলে এই সেন্ট্রাল হলই হল সাংসদদের আড্ডা দেওয়ার জায়গা। দলমতের উপরে উঠে নেতারা নিজেদের ভাব বিনিময় করেন, কূটকচালি করেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এখানে বসেই।

দলের হার্ড লাইনের বাইরে গিয়ে আম আদমির প্রতিনিধিরা সেন্ট্রাল হলে বসে যখন যে কথাটা বলেন, সেটা হয় মানুষের কথা, গঙ্গু তেলিদের কথা। বলা যেতে পারে যে, ‘সেন্ট্রাল হল’ হল ভারতবাসীকে দেখার জন্য একপ্রকারের জানালা। যেখান থেকে ঝাঁকি দিয়ে ভারতের মন পড়ে ফেলা যায়। অটলবিহারী সেন্ট্রাল হলের আড্ডা থেকে নতুন করে ভারতের মন পড়ার চেষ্টাই করছিলেন। এবং এখান থেকে ভারতকে দেখেই দুটো বিষয়ে তিনি বদল আনতে চলেছিলেন।

কী কী বিষয়ে?

১. ভারতের বিদেশনীতি এবং ২. ভারতের অর্থনীতি।

প্রথমে বিদেশনীতির কথায় আসি। অটলবিহারী বাজপেয়ী নেহরুর গুণমুগ্ধ ছিলেন। নেহরুভিয়ান বিদেশনীতি ছিল ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড ফরেইন পলিসি’। থার্ড ওয়ার্ল্ড বা তৃতীয় বিশ্ব বললে অনেকের চোখের সামনে হতদরিদ্র ভারতবাসী গোছের ছবি ভেসে ওঠে। একদম ভুল ধারণা। থার্ড ওয়ার্ল্ড মানে দারিদ্র নয়। তৃতীয় বিশ্বের কনসেপ্ট এসেছে অন্য কিছু থেকে। বলছি সে কথা।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর পণ্ডিত নেহরু দেখলেন বিশ্ব মোটামুটি দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে সোভিয়েত, আর অন্যদিকে আমেরিকা। শীতযুদ্ধের আসর জমেছে তখন। তিনি তখন বিশ্বের অন্যান্য কয়েকটি দেশকে সঙ্গে নিয়ে ভারসাম্য রক্ষাকারী তৃতীয় ফ্রন্ট তৈরি করলেন। এই ব্যাপারে আমি আমার ‘যুযুৎসু’ বইতে লিখেছি। তো হল কী, এ ধরণের বিদেশনীতিতে আমরা কারো সাতে-পাঁচে থাকব না বলে চলা হচ্ছিল। বাজপেয়ী পণ্ডিত নেহরুর এই নীতিকে কমবেশি মনে জায়গা দিয়েছিলেন।

নেহরু পরলোকে চলে গেলেন। উত্তরাধিকারী হিসেবে বেশি সময় জুড়ে রইলেন নেহরু-তনয়া ইন্দিরা। ইন্দিরা সোশ্যালিস্টদের দিকে ঝুঁকে থাকলেন। সেন্ট্রাল হলের হাওয়াতেও তখন সমাজবাদের গন্ধ। জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে বাজপেয়ী কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর এই ভাবধারাতেও প্রভাবিত হয়েছিলেন। এবং সে কারণেই ইন্দিরা গান্ধীকে হারিয়ে যখন জনতা সরকার আসে, বাজপেয়ী বিদেশমন্ত্রী হন, তখনও বিদেশনীতিতে বিশেষ কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। কারণ দল বদলে গেলেই বিদেশিনীতি পালটে যাবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দিয়ে রাখেনি।

এরপরে সবথেকে বড় বদল আনলেন নরসিমহা রাও। তাঁর অর্থনৈতিক উদারীকরণ ভারতে বিদেশের বিনিয়োগের জায়গা করে দিল। প্রাথমিকভাবে বাজপেয়ী এই উদারীকরণকে সেভাবে হজম করতে পারেননি। যখন ডক্টর মনমোহন সিং বাজেট পেশ করেন, তখন তাঁর সামনেই তিনি তীব্র আক্রমণ করেছিলেন। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, ডক্টর সিং নরসিমহা রাওয়ের কাছে গিয়ে এই নিয়ে নালিশ জানিয়ে পদত্যাগ করবেন বলেন। রাও সেকথা বাজপেয়ীকে জানালে বাজপেয়ী আবার মনমোহন সিংকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মান ভঙ্গ করেন। সেই বাজপেয়ীই বুঝতে পারছিলেন সোভিয়েত-পরবর্তী জমানাতে নরসিমহা রাওয়ের দেখানো পথই ভারতকে বিশ্বগুরু বানাতে পারবে। আমেরিকার কাছাকাছি যেতে পারাটাই এখন থেকে উন্নতির সূচক হয়ে দাঁড়াবে। মোদ্দা কথা সেন্ট্রাল হলের আবহাওয়া নেহরু, ইন্দিরা হয়ে নরসিমহা জমানার বিদেশিনীতি ও অর্থনীতির অনুকূলে কথা বলছিল।

সঙ্ঘ অবশ্য প্রথম থেকেই অর্থনৈতিক উদারীকরণের বিপক্ষে রায় দিয়েছে। তবুও অটলবিহারী সঙ্ঘ আর মার্কিন সঙ্গ এই দুইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়টিকে বেছে নেওয়াই বেশি পছন্দ করলেন। কেন বলুন তো?

কারণ মার্চ ২০০০ -এ ভারতে একজন মহা মাননীয় অতিথির আগমন ঘটল।

.

১৯শে মার্চ ১৯৯৯। ভারতে এলেন উইলিয়াম জেফারসন ক্লিনটন। বিশ্ববাসী এই ভদ্রলোককে ‘বিল ক্লিনটন’ নামেই চেনে। আজ্ঞে হ্যাঁ, অ্যামেরিকার রাষ্ট্রপতি ক্লিনটন।

আসার আগে হইহই রইরই কাণ্ড। ওদেশের সিক্রেট সার্ভিসের অফিসাররা এসে সুরক্ষার জোগাড়জান্তি দেখেছে অন্তত কয়েকশো বার। কম্যান্ডোরা এসে আগে থেকেই সংবেদনশীল জায়গাগুলোর মুয়ায়না করেছে। বুলেটপ্রুফ গাড়ি, হেলিকপ্টার, আর্মি ট্রাক, বম্ব স্কোয়াড, ডগ স্কোয়াড কী নেই!

ক্লিনটনের আগে শেষবার ভারতে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন জিম্মি কার্টার। কাকতালীয় কিনা জানি না, জিম্মি সাহেবকে এই অটলবিহারীই দিল্লি এয়ারপোর্টে প্লেনে তুলে দিয়ে আসতে গিয়েছিলেন, সে ১৯৭৮ সালের কথা, তখন অটলবিহারী জনতা সরকারের বিদেশমন্ত্রী।

আমেরিকানরা বানিয়া জাতি। ব্যবসা রক্তে মিশে আছে। মুনাফা না বুঝলে কোথাও যায় না, কারো সঙ্গে মেশে না। ভারতে কী দেখেছিলেন ক্লিনটন যে অ্যাতো লোকলশকর সহযোগে চলে এলেন?

সে কথা তিনি নিজেই বলেছেন— ‘India’s economy is one of the ten fastest growing in the world… There are now more television channels available in Mumbai than in most US cities.

ক্লিনটন সাহেব সেবারে হায়দ্রাবাদের সফটওয়্যার উদ্যোগ দেখতে গিয়েছিলেন।

বিল ক্লিনটন সংসদের সেন্ট্রাল হল-এ প্রায় ৩৫ মিনিটের একটি ভাষণ দেন। সুর স্পষ্ট ছিল, কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতা করতে তিনি আসেননি। বক্তৃতা শেষ হলে সাংসদরা ক্লিনটনকে ঘিরে ধরে ছবি তুলছিলেন, গল্প করছিলেন, পরিচয় আদানপ্রদান করছিলেন। যে সেন্ট্রাল হলকে নিজের হাতের তালুর মতো চিনতেন অটলবিহারী, সেই সেন্ট্রাল হলের বদলে যাওয়া মেজাজ বলে দিচ্ছিল, এটাই নতুন দুনিয়া।

কয়েকদিনের ভারত সফর শেষে আমেরিকায় ফেরার আগে ক্লিনটন কয়েক ঘণ্টার ঝটিকা সফরে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। আমাদের দেশে বিল সাহেবের সফর ঘিরে যে উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল, পাকিস্তানের বেলায় ছবি ছিল তার একদম উলটো। একটি ভিডিও রেকর্ডেড বার্তা ছাড়া পাকিস্তানের জন্য আর কিছুই ছিল না ক্লিনটনের পক্ষ থেকে। তাতেও বলা হল, ‘The answer to flawed democracy is not to end democracy, but to improve it.’

চিনের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার কারণে আমেরিকা ভারতীয় উপ মহাদ্বীপে চিনকে দেওয়ার জন্য যোগ্য একটা জবাব খুঁজছিল। সেই উত্তর তারা খুঁজে পেয়েছিল ভারতের মধ্যে। ভারতের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি তাই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।

আর বাজপেয়ী মার্কিন-ভারত মৈত্রীর এপারে দাঁড়িয়ে নিজের ভাগের দর্শন খুঁজছিলেন। মন বলছিল, ‘ভারত আবার জগত-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।’

শ্রেষ্ঠত্বের জন্য দক্ষতার প্রয়োজন হয়। তার জন্য বিশেষজ্ঞ লাগে। বাজপেয়ীর সরকারে বিশেষজ্ঞের ভূমিকায় এলেন ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের একজন কর্মী।

চোখা নাক, টানা চোখ। উদ্ধত হনু উন্নত বুদ্ধির পরিচয় দিচ্ছে। একটু বসা কণ্ঠস্বর। তিনি সেই সময়ের ইংরেজি মিডিয়াতে একের পর এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী লেখা যুক্তি সহকারে লিখেছেন, যা এক বিরল ব্যাপার। চিন্তাবিদ। তার্কিক। অর্থনীতিতে পিএইচডি। বিশ্ব ব্যাঙ্কে কাজ করেছেন। পরে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন। সমাজবাদ, মার্কসবাদ, বিচারপদ্ধতি, সংরক্ষণ ইত্যাদি নিয়ে তিনি যেসব বইপত্র লিখেছেন তা সঙ্ঘের লোকেরা পর্যন্ত রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি হলেন অরুণ শৌরি।

শৌরির নিজস্ব line of thinking ছিল অসামান্য। ভারতের পবিত্র রাজনীতিকদের মধ্যে পবিত্রতম ব্যক্তি বাবাসাহেব আম্বেদকরের সমালোচনা করতেও তিনি পিছপা হননি। যখন রামমন্দির নিয়ে আন্দোলন চলছে, তখন ভারতের হিন্দু মন্দিরগুলিকে নিয়ে তিনি কিছু অসাধারণ লেখা ধারাবাহিকভাবে লিখতে থাকেন, ছাপতে থাকেন। দক্ষিণপন্থীদের যুক্তিতে প্রাণবায়ু জুগিয়েছিল সেইসব কলাম। সেই থেকেই তিনি দক্ষিণপন্থীর রাজনীতিকদের নয়নের মণি।

বিরল প্রতিভা শৌরিকে বাজপেয়ী ‘৯৮ সালে ভাজপার পক্ষ থেকে রাজ্যসভায় টিকিট দিয়ে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। জুলাই ২০০০, শৌরিকে তিনি ‘নতুন’ একটি মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে দিলেন— Ministry for Disinvestment.

নেহরুর জমানায় তথা সোশ্যালিস্ট ভারতে ভারত সরকার বহু কোম্পানির মালিকানা নিয়ে রেখেছিল। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই কোম্পানিগুলির বেশিরভাগই বেসরকারি মালিকানার অধীনে উৎপাদন করে থাকে। অতীতে ভারত সরকার বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিং-এ প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে রেখেছিল। যত দিন যাচ্ছিল ব্যয়ভার বাড়ছিল, কিন্তু সেভাবে অর্থ ফেরত আসছিল না। বাজপেয়ী সরকারের এদিকে নজর পড়েছিল। ভর্তুকি দেওয়া যাবে না, এভাবে চললে করদাতাদের জীবন জেরবার হয়ে যাবে। ঠিক হল ২৭টি সরকার অধিগৃহীত সংস্থার শেয়ার বিক্রি করে দেবে ভারত সরকার। অঙ্কের হিসেব বলছিল, তার ফলে ৬৩,৫০০ কোটি টাকার মুনাফা হবে। অরুণ শৌরির নেতৃত্বে পঞ্চাশজন সরকারি আমলা দিনরাত এক করে খেটে এয়ার ইন্ডিয়া, মারুতি কার কোম্পানি ইত্যাদির শেয়ার বিক্রির সবরকম সম্ভাব্য প্রয়াস করতে শুরু করে দিলেন। বেসরকারিকরণের ক্ষেত্রে বাজপেয়ীর নীতি আগের যে কোনও প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় অনেক অনেক বেশি আগ্রাসী ছিল। আর শৌরি, তাঁর জন্য কী বলা হচ্ছিল? বলা হচ্ছিল, তিনি সমস্ত সরকারি চাকরিকে বেসরকারি করে সংরক্ষণের ভিত্তিতে চাকরি পাওয়া বন্ধ করে দিতে উঠে পড়ে লেগেছেন। আসলে হয়েছিল কি, নিজের সাংবাদিকতার দিনে তিনি একদা ভিপি সিং-কে সমর্থন করেছিলেন। পরে ভিপি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসেন। মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট লাগু করেন। তখন আবার সংরক্ষণের বিরুদ্ধে থাকা শৌরি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভিপির সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন ভুল ছিল।’ তাই সবাই মজা করছিল যে, শৌরি সংরক্ষণ তুলে দিতে সচেষ্ট।

অরুণ শৌরির এসব পদক্ষেপ দেখে মন্ত্রীসভার মধ্যেই আলোড়ন সৃষ্টি হয়। জর্জ ফার্নান্ডেজ, রাম নাইক, মুরলী মনোহর জোশি প্রত্যেকেই শৌরির কাজের বিরোধীতা করছিলেন। বিরোধ করলেন আডবানিও। যে আডবানি নরসিমহা রাও সরকারের উদারীকরণের সময় উদারীকরণের পক্ষে কথা বলেছিলেন, তিনিই বললেন, ‘হমারে হি মিনিস্টারস বিরোধ কর রহে হ্যাঁয়।’

শৌরি বারোটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নীকরণ দ্বারা ২৯,৯৯০ কোটি টাকা সরকারের ঘরে এনেছিলেন। তাঁর বিজয়রথ এসে থামল হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম ও ভারত পেট্রোলিয়ামের মতো লাভজনক সংস্থায় হাত পড়ার পরে। সংসদে বিরোধী পক্ষ এবং বাজপেয়ীর নিজের ক্যাবিনেট মন্ত্রীরাই বেঁকে বসলেন। সেন্ট্রাল হলের বিগড়োতে থাকা মেজাজ বুঝে বাজপেয়ী ক্ষান্ত হলেন। ২০০৩ সাল নাগাদ শৌরির রথ প্রায় থমকে দাঁড়াল।

.

বাজপেয়ীর শৌরি-পর্বে যে শুধু তাঁর ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা কিংবা বিরোধী পক্ষই চিৎকার চেঁচামিচি জুড়েছিলেন তা নয়। উষ্মার সুর শোনা যাচ্ছিল সঙ্ঘের পক্ষ থেকেও। অরুণ শৌরির দক্ষিণপন্থী যুক্তিতর্কের সমাবেশ দেখে সঙ্ঘ তাঁকে নিজেদের ঘরের লোক মনে করেছিল। কিন্তু বিলগ্নীকরণের সময়ে সেই ভুল ভেঙে যায়। শৌরি দক্ষিণপন্থার দিকে যতটা নত ছিলেন, ঠিক ততটাই নতজানু ছিলেন খোলা বাজারের দিকেও। আসলে এত প্রখর মেধার ব্যক্তিত্বরা সাধারণত নিজস্ব আদর্শ নিজেরাই তৈরি করেন, কেউ কেউ চলার পথে তাঁদের হামসফর মনে করলেও কিছুটা যাওয়ার পরে তাঁদের রাস্তা আলাদা হবেই, হতে বাধ্য

সঙ্ঘের তৎকালীন সরসঙ্ঘচালক কে এস সুদর্শনের কাছে বাজপেয়ীর অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর মতে প্রতিটা পদক্ষেপই ছিল শ্রমিক-বিরোধী, কৃষক-বিরোধী, এবং গরিব-বিরোধী। একবার বাজপেয়ী নিজের অর্থমন্ত্রী যসবন্ত সিনহা ও অরুণ শৌরিকে সুদর্শনকে বোঝানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন। সব শোনার পর সুদর্শনের সপাট প্রশ্ন ছিল, ‘আপনিই বলুন না, ফরেইন এক্সচেঞ্জ ডলারে কেন হয়? ভারতীয় মুদ্রায় হয় না কেন? এ থেকেই বোঝা যায় আপনাদের আত্মসম্মানের অভাব আছে।’ এর পর থেকে বাজপেয়ী আর সুদর্শনকে বোঝানোর জন্য কাউকে পাঠাননি। একবার অমন একটি প্রয়োজন উপস্থিত হলে পরে যখন তাঁর এক মন্ত্রী যাবেন বলেছিলেন, তিনি মানা করে বলেন, ‘গিয়ে কী হবে? উনি সর্বজ্ঞানী। সব জানেন। উনি আপনার কথা শুনবেন না।’

সঙ্ঘের ঘনিষ্ঠ বলে সুবিদিত আডবানি চেষ্টা করলেও হয়তো সঙ্ঘের স্বদেশী অর্থনীতির ফর্মুলা প্রস্তাবিত হলেও হতে পারত। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক আডবানির তেমন কোনও ইচ্ছা ছিল না। সুদর্শনও হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি দুটি অস্ত্রের প্রয়োগ করলেন। অস্ত্রগুলো আগে থেকেই তৃণীরে ছিল, ঝাড়পোঁছ করে বের করে আনলেন। ‘৯১ সালে নরসিমহা রাওয়ের অর্থনৈতিক উদারীকরণের বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ আবার ডানা মেলতে শুরু করল। নরসিমহা রাওকে যত না মঞ্চের আলোচনার মুখে পরতে হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি অটলবিহারীকে পড়তে হল। মঞ্চের পক্ষ থেকে বলা হল এটা ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম’। স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দত্তোপন্থ ঠেংড়ি। ইনিই আবার ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ-ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই দুটি সংগঠনের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে জোরদার বকতব্য পেশ করা হল। ঠেংড়ি বলেছিলেন, ‘ইয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কাম হ্যাঁয়।’ সঙ্ঘ পরিবারের কাউকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বলা যে কতটা অবমাননাকর তা সঙ্ঘের লোকজন ছাড়া কেউ হয়তো বুঝবেন না। এর প্রেক্ষিতে বাজপেয়ী সুদর্শনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, কারণ দর্শাতে বলেছিলেন।

ভাজপার রিমোট সঙ্ঘের হাতে থাকে বলে যারা চিৎকার করেন, তাঁদের বক্তব্যকে খণ্ডন করে দেয় অটল সুদর্শনের দ্বৈরথ। এবং এ থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, সঙ্ঘ কোনও সরকারি পুরস্কার, কোনও গাড়ি, কোনও বাংলো, কোনও উপহার, কোনও পদের কাছেই যে মাথা নোয়ায় না। অন্তত কে এস সুদর্শনের কার্যকালে তো নোয়ায়নি।

সঙ্ঘের কাছে সংস্কৃতি রক্ষাই বড়, হিন্দুর সংহতি রক্ষাই বড়। আর বাজপেয়ীর কাছে বড় হয়ে উঠছিল বিশ্বে ভারতকে সবার সঙ্গে কাঁধ কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলার দায়িত্ব।

.

তবে সব ক্ষেত্রে যে সঙ্ঘ বাজপেয়ীর বিরোধ করেছিল এমনও নয়। সড়ক তৈরির ক্ষেত্রে গৃহীত যোজনাকে সঙ্ঘ স্বাগত জানিয়েছিল। যারা সঙ্ঘের কাজ করেন, তাঁরা প্রচারের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত যাত্রা করে থাকেন। বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার বাসের সময়, ট্রেনের টাইমটেবল তাঁদের কণ্ঠস্থ। ভাজপার দলীয় কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ছিল। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তকে সড়কপথে জোড়ার পরিকল্পনায় দুই পক্ষ দ্বিমত হলেন না।

বিবিধে ভরা এই দেশে ব্রিটিশদের রেলপথ না এলে হয়তো জাতীয়তাবাদের নব পর্যায় আসতে আরও একটু বেশি সময় লেগে যেত। বাজপেয়ীর জাতীয়তাবাদের ধারণাও বলছিল, ভারত জোড়ো, ‘সড়ক কো সড়ক সে জোড়েঙ্গে’।

জন্ম নিল ‘সোনালি চতুৰ্ভুজ’ প্রকল্প। নিউ দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই এবং চেন্নাই এই চারটি শহর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হবে। চার কিংবা ছয় লেনের ঝাঁ চকচকে রাস্তা প্রত্যেক যাত্রীর সফরকে সহজতর করে তুলবে। ৫,৮০০ কিলোমিটার পথ তৈরি হবে। হলও, অনেকটাই হল। ১৯৯৬-১৯৯৭ সালে ভারতে পিচ রাস্তার দৈর্ঘ্য ছিল ৩৪,৮৪৯ কিমি। সেটাই 2002-২০০৩ সালের শেষে এসে দাঁড়াল ৫৮,১২৫ কিমিতে। ৬৭% বৃদ্ধি হল। ভারত বদলাচ্ছিল। ভারত নতুন রূপ নিচ্ছিল। মানুষ অটলবিহারীর একটি কবিতার লাইনের সঙ্গে তাঁর কাজের মিল খুঁজে পাচ্ছিল— ‘এক নয়া ভারত কা মন মে ইরাদা হ্যাঁয়।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%