অভীক মুখোপাধ্যায়
যদি ধধক উঠে জল, থল, অম্বর, জড় চেতন তো ক্যায়সা বিস্ময়!
হিন্দু তন-মন, হিন্দু জীবন, রগ – রগ হিন্দু মেরা পরিচয়!
–অটলবিহারী বাজপেয়ী
.
অযোধ্যা। আজকের নয়। আজ থেকে ৪৯৬ বছর পিছিয়ে যান, বন্ধু। তখনো সেখানে শ্রীরামজন্মভূমির আরাধনাস্থলে উড়ছে গৈরিক পতাকা। পীঠস্থানের অধীশ্বর সিদ্ধ মহাত্মা বাবা শ্যামানন্দ। বাবার কাছে হিন্দু-মুসলিমের ভেদ ছিল না। দলে-দলে ভক্তরা আসত দেশ-বিদেশ থেকে। একদিন এক হযরত কজল আব্বাস মুসা আশিকান নামের ফকির এসে বাবার পায়ে পড়ল, বলল— সিদ্ধি চাই। বাবা শ্যামানন্দের নরম মন। তিনি ফকিরকে শিষ্যত্ব দিলেন। সিদ্ধ ফকির হয়ে ওঠার অল্পদিনের মধ্যেই এলাকাতে মুসা আশিকানের সিদ্ধির চর্চা হতে লাগল।
কিছুদিন পরে এল আরেক ফকির— নাম তাঁর জালাল শাহ। যোগক্রিয়া শেখার ইচ্ছে। কিন্তু ভারী কট্টর নিজের ধর্মের প্রতি। জালাল শাহ কিন্তু রামজন্মভূমির স্থানমাহাত্ম্যটা আসার পরে টের পেল। এবং তখন থেকেই তার মনে হতে লাগল, এই জায়গাটাকে যদি বদলে নিজের সাধের করে ফেলা যায় তো কেমন হয়।
এরই মধ্যে আরেক যুবা ফকির এল অযোধ্যায়। তার হাবভাব কিন্তু ফকিরি নয়। চলাফেরায় ঔদ্ধত্য। উগ্র চাহনি। দুচোখে জয়ের নেশা। সে ভারতবর্ষ জয় করতে এসেছে। অতীব বুদ্ধিমান সেই যুবক যুদ্ধের আগে খোঁজখবর নিয়ে দেখবে বলেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখছে— ঠিক কীভাবে আক্রমণ করলে সহজে জয় আসবে। যুবকের নাম বাবর। স্বাভাবিক ভাবেই ফকিরবেশী বাবরকে আশ্রয় দিল মুসা আশিকান ও জালাল শাহ। বাবর তাদের কাছে দোয়া চাইল, তারা বলল–জিতলে পরে এই রামজন্মভূমিতেই মসজিদ চাই। বাবর না করেনি।
বাবরের মতো যুদ্ধনীতিক সম্ভবত মোগল বংশ আর পায়নি। তার আক্রমণের সামনে হার মানল ইব্রাহিম লোদি। হার মানলেন রানা সঙ্গ। বাবর দিল্লি সহ উত্তর পশ্চিম ভারতের দখল নিল। তারপর আবার গেল অযোধ্যায়। দুই ফকিরকে দেওয়া কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল বাবরকে।
নিজের সেনাপতি মির বাঁকি তাশখন্দিকে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে বাবর দিল্লির দিকে কুচ করল। হাওয়া তখন বারুদের গন্ধ। খবর পেলেন বাবা শ্যামানন্দ। তিনি প্রতিমা সরযূর জলে বিসর্জিত করে দিব্য বিগ্রহ নিয়ে চললেন আজকের উত্তরাখণ্ডের পানে। মন্দিরের পূজারীরা মন্দিরের দ্বার আগলে দাঁড়ালেন— আমাদের মৃতদেহের উপর দিয়ে মন্দিরে ঢুকতে হবে। সেই কাজই করল বর্বর বাহিনী। কিংবদন্তী বলে, পূজারীদের কেটে খণ্ড খণ্ড করে কুকুর দিয়ে খাওয়ানো হয়েছিল। বাবরের বাহিনী কামান থেকে গোলা দেগে মন্দিরকে ধূলিস্যাৎ করে দিল। সেখানেই দাঁড় করানো হবে মসজিদ।
শ্রীরাম মন্দিরের ধ্বংস হওয়ার কাহিনী দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ফৈজাবাদের কাছেই ভিটি রাজ্যের মহারাজা মহতাব সিং সেইসময়ে সেনা নিয়ে তীর্থে চলেছিলেন। তিনি এই সংবাদ শুনে বললেন— ‘আমার রাজ্যের কাছেই এক মহান তীর্থ নষ্ট হয়ে গেল, আর আমি অন্যত্র তীর্থে গিয়ে কী করব?’ সেনা নিয়ে লড়তে চললেন মহতাব। অঞ্জনা কে বাগ নামক বাগানে ছাউনি ফেলা হল। রাতারাতি রামভক্ত ক্ষত্রিয়ের দল একত্রিত হয়ে গেল। ধর্মযুদ্ধ হতে চলেছিল।
সূর্যের প্রথম আলো মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভীষণ যুদ্ধ শুরু হল। মির বাঁকির সেনাদল সংখ্যায় ভারী, কিন্তু মহতাবের নেতৃত্বে রামভক্তরা ক্ষুধার্ত বাঘের মতোই আক্রমণ চালিয়েছিল। আগামী পনেরো দিন চলেছিল এই যুদ্ধ। পানিপতের প্রথম যুদ্ধের মতোই কামানের ব্যবহার এবারেও ফারাক গড়ে দিল। প্রতিপক্ষকে তছনছ করে দিল মির বাঁকি। বলা হয়, মহতাবের বাহিনীতে একজনও বাঁচেনি। মহতাব সিং, হসবরের রাজা রণবিজয় সিং, মকরহির রাজা সংগ্রাম সিং প্রত্যেকেই নিহত হয়েছিলেন। আর মোগলদের সেনা সংখ্যাও তলানিতে এসে ঠেকেছিল। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ কানিংহামের লখনউ গেজেটিয়ারে তিনি এই ইতিহাস লিখে গেছেন। এই সংঘর্ষে মূলত ক্ষত্রিয়রা থাকলেও এক ব্রাহ্মণ পরশুরামের মতোই সংহারকর্তা হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন দেবীদিন পাণ্ডে। অযোধ্যার পাশেই সূর্য কুণ্ডের কাছে সনেথু গ্রামের নিবাসী দেবীদিন নাকি মির বাঁকিকে প্রায় নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিলেন। ইতিহাস দেবীদিনকে মনে রাখেনি। বা ইচ্ছে করেই তাঁকে ভুলিয়ে দিয়েছে ইতিহাসের লেখকরা। কোনোভাবেই দেবীদিনকে কাবু করা যাচ্ছিল না। শেষে একটা ইটের আঘাতে (খুলি ফেটে গিয়েছিল বলে জানা যায়) দেবীদিনকে ভয়ানক আহত করে দেয় মির বাঁকির এক সৈনিক। রক্তাক্ত দেবীদিন মাথার পাগড়ি খুলে সেই দিয়ে ফেট্টি বেঁধে লড়তে থাকেন। এক সময়ে তিনি হাতির পিঠে বসে- থাকা মির বাঁকিকে আক্রমণ করেন, বাঁকি হাওদায় লুকিয়ে পড়লেও দেবীদিনের হাতে প্রাণ হারায় বাঁকির হাতির মাহুত। সেই সময়েই বাঁকি দেবীদিনকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ওটাই শেষ আঘাত, আর প্রয়োজন পড়েনি। দেবীদিনের নিথর দেহের সাক্ষী হয়ে থাকে অযোধ্যার মাটি। দেবীদিন সাতশো মোগল সৈন্যের সংহার করেছিলেন।
এবার ছিল মসজিদ নির্মাণের পালা। বলা হয় নিহতদের রক্ত দিয়ে ইট বানিয়ে ভিত দিয়েছিল বাহিনী। কিন্তু যতবার দেওয়াল তৈরি করা হচ্ছিল, ততবার তা ভেঙে পড়ছিল। একদিন, দুদিন, তিনদিন রোজই এক ঘটনা। সারাদিন কাজ করে দাঁড় করানো পাঁচিল সন্ধেবেলায় পরে যেত। মির বাঁকি ভাবল, কোনো রামভক্ত এই কাজ লুকিয়ে লুকিয়ে করছে। দেওয়ালের বহু আগেই পাহারা বসিয়ে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না। কিন্তু দেওয়াল সেই ভেঙেই পড়তে লাগল। দুই ফকির এসব দেখে হতাশ হয়ে পড়ল। মির বাঁকি অবশেষে বাবরকে খবর দিল। বাবর শুনে বলে পাঠালেন, হচ্ছে না যখন বন্ধ করে দিলেই হয়। আমাদের কাজ ছিল দখল করা, সেটা তো হয়েই গেছে। দুই ফকির বলল, তামাম হিন্দোস্তানে যদি নিজের বুনিয়াদ কায়েম করতে হয়, তাহলে এখানে মসজিদ বানিয়ে সেই কাজটা শুরু করতে হবে। আপনি নিজে আসুন, এসে কাজ দেখুন— জালাল শাহ চিঠি লিখল। বাবর নিজে অযোধ্যা গেল। কাজ আবার চালু হল, কিন্তু যে কে সেই ব্যাপার। দেওয়াল আর দাঁড়ায় না। এসময় কেউ বলল, রামচন্দ্রের ভক্ত হনুমানজি চিরঞ্জীবী, তিনি এখানেই বিরাজ করেন। যতক্ষণ তিনি আছেন, ততক্ষণ এখানে অন্য কোনো ধর্মের স্থাপত্য দাঁড়াবে না। মসজিদ রক্ষা করতে চাইলে তার স্থাপত্যে কিছু রদবদল করতেই হবে। স্থাপত্যের মিনার সরিয়ে ফেলা হল। সদর দরজায় একটা চন্দন কাঠের খুঁটি লাগানো হল। স্থাপত্যের মাঝবরাবর দুটি গোলাকার চিহ্নের মধ্যে ফার্সি ভাষায় শ্রী সীতাপাক স্থান লেখা হল। উত্তরের দিকে কৌশল্যা দেবীর ছটপূজার জায়গাটাতে যে গর্ত করা হয়েছিল, সেটাকে আবার বুজিয়ে দেওয়া হল। মন্দিরের চারদিকে পরিক্রমার যে পথ, তা আবার পূর্ববৎ করে দেওয়া হল। প্রতিদিন রামভক্তদের ভজন পূজনের জন্য আংশিক ছাড় দিয়ে দিল বাবর। মুসলিমরা প্রতি শুক্রবার নমাজ পড়ার ফরমান পেলেন।
রামমন্দিরের জন্য এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধ। সেই শুরু। তবে বাবর বুঝতে পেরেছিল ভূমিকম্পের শেষ এখানেই নয়, তাই ফরমান জারি করে বাইরে থেকে রামভক্তদের অযোধ্যা যাওয়াটাই বন্ধ করে দিল দক্ষ পাদশাহ।
এরপরেও যুদ্ধ হয়েছে। হসবরের মহারাজা রণবিজয় সিং-এর বিধবা পত্নী মহারানি জয়রাজ কুমারী নিজের তিন হাজার প্রমীলা বাহিনী নিয়ে লড়াই করবেন বলে ঠিক করেন। গেরিলা যুদ্ধ চালাতে শুরু করে রানির সেনা। রানির গুরু ছিলেন স্বামী মহেশ্বরানন্দ নামে এক সন্ন্যাসী। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে রামভক্তদের একত্রিত করছিলেন।
বাবরের সময়ে এবং তার পরে হুমায়ুনের কালেও জয়রাজ কুমারীর নারীদল গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে মোগলদের বাহিনীতে প্রবল ক্ষতি করে দিয়েছিল। এভাবে লড়তে লড়তে একবার অযোধ্যা দখল করে ফেলেন জয়রাজ কুমারী। কিন্তু আবার হামলা করে মোগলরা। অযোধ্যা দখলের মাত্র তিনদিনের মাথায় আবার তা চলে যায় মোগলদের হাতে।
আকবরের সময়ে রানির বাহিনী অন্তত কুড়িবার আক্রমণ করেছে অযোধ্যা দখলের জন্য। অন্তিমবারে দখল হয় অযোধ্যা। এইবারে মসজিদের বাইরের প্রাচীরের চার দেওয়াল ভেঙে সেখানে একটি চবুতরা স্থাপিত হয়। ভগবান রামের প্রতিমা স্থাপন করে ফেলে রানির বাহিনী। কিন্তু যুদ্ধে রানি নিহত হন। আকবর, জাহাঙ্গীর তথা শাহজাহানের সময়ে আর এই চবুতরা বা প্রতিমায় হাত পড়েনি।
শাহজাহানের পর আওরেংজেব। বাবর ছিল দক্ষতম যুদ্ধনীতিক, আর ইনি মোগলদের মধ্যে দক্ষতম রাজনীতিক। মসনদে বসেই ঠিক বুঝে নিল যে তার বিরুদ্ধে যত মাথা তোলার ব্যাপার হচ্ছে, সেগুলো হচ্ছে বিভিন্ন মঠ-মন্দির থেকেই। রামজন্মভূমিও তারই মধ্যে পড়ছে। নিজের সিপাহসালার জাঁবাজ খানকে পাঠাল। সঙ্গে সুবিশাল বাহিনী। ঠিক সেইসময়ে অযোধ্যায় জানকী ঘাটে অবস্থান করছিলেন ছত্রপতি শিবাজী রাজের পূজনীয় গুরুজি রামদাসের শিষ্য বৈষ্ণব দাস। তাঁর সঙ্গে দশ হাজার চিমটাধারী সাধু ছিল। আওরেংজেব বাহিনী পাঠিয়েছে এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই সাধুর দল তৈরি হয়ে গেল। আবার ধর্মযুদ্ধ হল। আমাদের পাঠ্যবইতে বিদেশের মাটির ক্রুসেডের কথা থাকলেও এসব নিয়ে কোনো শব্দ ব্যয় করা হয় না। কিন্তু এই ভীষণ যুদ্ধের আঁচ ছিল প্রবল। উর্বশী কুণ্ডে সাত দিন যুদ্ধ চলল। অবিশ্বাস্য হলেও সেদিন আওরেংজেবের সেনাদল হার মানে
গরম তেলে জল পড়ার মতোই চিড়বিড়িয়ে উঠেছিলেন আওরেংজেব। সামান্য ক’টা সাধুকে মারতে পারল না? আগের সেনাপতিকে সরিয়ে নতুন মুখ আনা হল। সৈয়দ হাসান আলি। অনেক বেশি সংখ্যক সৈন্য পাঠাল পাদশাহ। তার গর্জন ছিল— রামজন্মভূমি আমার চাই!
ভারতে তখন আগুনের মতো খবর ছড়াচ্ছে। এই কথা শিখ গুরু গুরু গোবিন্দ সিং-এর কানে পৌঁছাল। তিনি ফৈজাবাদের সহাদতগঞ্জে এসে গেলেন। সঙ্গে বিশাল বাহিনী। সে এক ভীষণ যুদ্ধ বাঁধল। সৈয়দ হাসান নিহত হল। একটি মোগল সৈন্যও জীবন নিয়ে ফিরতে পারেনি।
আওরেংজেব এই পরাজয় সহজে মানতে পারছিল না, কিন্তু সে আর সাহস করে আগামী চারবছর অযোধ্যার দিকে হাত বাড়ায়নি। তবে ভেতরে ভেতরে আগুনটা জ্বলছিল ঠিকই। চার বছর পরে আবার আক্রমণ হল। এবং এবারে মসজিদের দখল নিল মোগলদের বাহিনী। মন্দিরের প্রতিমা এবারেও কোনো গুপ্ত স্থানে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে চবুতরা নষ্ট করে দিল সৈন্যরা।
মোগলদের শেষ দিকটাতে এক নবাব শহাদত আলি খানের সময়ে রাম জন্মভূমি পুনরুদ্ধারের জন্যে আমেঠির রাজা গুরু সিং যুদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু জয় আসেনি।
তবে রামভক্তেরা হার মানলেন না। আক্রমণের পরে আক্রমণ চলল। নাসিরুদ্দিন হায়দারের সময়ে মোট তিনবার আঘাত হানা হয়। রাজা দেবী বক্স সিং-এর নেতৃত্বে আরও কয়েকজন রাজা যুদ্ধে নামেন। এই জুদ্ধটাই রামজন্মভূমির ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম যুদ্ধ ছিল। সাতদিনের লড়াই শেষে মোগলরা পিছু হটে। রামজন্মভূমির দখল নিয়ে রামভক্তরা শর দিয়ে অস্থায়ী ছাউনির মতো মন্দির বানায়। পরের দিকে রামলাল্লা যেমন তাঁবুতে থাকতেন, অনেকটা তেমনই। নবাব এই অস্থায়ী ছাউনিতে হাত লাগানোর সাহস করেনি। কিন্তু রামচন্দ্রের বনবাস তো সবে শুরু হল। ঘরে ফেরা যে তখনো বাকি।
.
চোদ্দ বছরের বনবাসে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল শ্রীরামকে, কিন্তু অযোধ্যার রামলাল্লার বনবাস যে শেষ হওয়ার ছিল না। আর তাই মাঝেমধ্যেই ভীষণ যুদ্ধ বাঁধছিল। অগুণতি লড়াইয়ে কখনো রামভক্তেরা দখল নিচ্ছিল, কখনো তাদের প্রতিপক্ষ। ব্রিটিশ শাসনে ব্যাপারটা একটা ছন্দে চলতে থাকে। তবে তার মধ্যেও ঊনিশ-বিশ যে হয়নি এমনটা বললে মিথ্যাচার হয়। নির্মোহী আখড়া— একটি বৈষ্ণব সম্প্রদায়। এই আখড়ার সদস্যরা নিজেদের রামজন্মভূমির সংরক্ষক বলে মানেন এবং দাবি করেন। তাঁরা ১৮৫৩ সালে সশস্ত্র অবস্থায় মসজিদের দখল নেয়। প্রায় একপ্রকারের অভ্যুত্থানই ছিল। তাঁদের সরানো গেলেও এর জের চলে টানা দুবছর। ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িক হিংসার দিকে এগোয়। মসজিদের প্রাঙ্গনে আবার একটা পাঁচিল ওঠে। হিন্দু মুসলিম উভয়পক্ষের প্রার্থনার পৃথক ব্যবস্থা করা হয়।
১৮৫৮ সালের ৩০শে নভেম্বর এক বিরল ঘটনার সাক্ষী হয় অযোধ্যাভূমি। পঁচিশ জন নিহাং শিখ বাবরি মসজিদের দখল নিয়ে নেন। এই নিয়ে আওয়াধের পুলিশ বিভাগে একটি এফআইআর পর্যন্ত দাখিল করা হয়। এবং অযোধ্যা মামলায় এটাই ছিল প্রথম এফআইআর।
এফআইআর-এ স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে নিহাং শিখেরা মসজিদের মধ্যে ঢুকে যজ্ঞা, অর্চনাদি রীতিনীতি পালন করেন। যজ্ঞ শেষ হলে পরে মসজিদের ভেতরের দেওয়ালে কাঠকয়লা দিয়ে লেখা হয় ‘রাম! রাম!’
১৮৫৩ সালে নির্মোহীদের মসজিদ দখলের পর ব্রিটিশরা নিয়ম করে দিয়েছিল যে, মসজিদের বাইরে শ্রীরামচন্দ্রের জন্মস্থান বলে চিহ্নিত জায়গাটিতে হিন্দুরা প্রবেশ তথা প্রার্থনা করতে পারবেন।
মুসলিমরা মসজিদে প্রার্থনা জানাবেন। কিন্তু নিহাংদের মসজিদ দখলের পর থেকে হিন্দুরা মসজিদেও ঢুকে প্রার্থনা করতে শুরু করে দিল।
নিহাং শিখ… নিহাং শিখ করছি বটে, কিন্তু কারা এই নিহাং শিখ?
গুরু গোবিন্দ সিং-এর ছোট ছেলে ফতেহ সিং-এর সঙ্গে নিহাং শিখদের একটা সূত্র পাওয়া যায়। একটা গল্প খুব প্রচলিত আছে। ফতেহ সিং তাঁর দাদাদের সঙ্গে যুদ্ধবিদ্যা অভ্যাস করার বায়না ধরেছিলেন। বড়রা বললেন— ‘তুমি তো খুবই ছোট।’ ফতেহ সিং তখন ঘরে ফিরে এসে মাথায় একহাত উঁচু একটা পাগড়ি বাঁধলেন। গায়ে চাপালেন নীল কুর্তা। হাতে নিলেন চক্রম, কৃপাণ, বর্শা। বাইরে বেরিয়ে এসে দাদাদের বললেন— ‘আর আমাকে ছোট দেখাচ্ছে না, আশা করি। ‘ গুরু গোবিন্দ সিং ফতেহকে দেখে বলেছিলেন— ‘আজ তোমার এই যোদ্ধা বেশ থেকে নিহাং শিখদের জন্ম হল!’
‘নিহাং’ মানে ‘অমর কুমীর’। ভাবার মতো বিষয় যে জাতি কুমীরের মতো শক্তিশালী জীবের মতো লড়াই করার ক্ষমতা পোষণ করে এবং নিজেদের শৃঙ্খলাকে দীর্ঘ বলে দাবি করে অমরত্বের সঙ্গে তুলনা করে, তাঁদের ক্ষমতা কতখানি হতে পারে। পরে সরগড়াহির যুদ্ধ নিয়ে বলিউডে একাধিক সিনেমা এসেছে। সেখানে মাথায় সুবিশাল পাগড়ি বাঁধা যে শিখ সমূহকে লড়াই করতে দেখা গেছে, তাঁরাই হলেন নিহাং শিখ। চক্রম, খণ্ড, করুদ, কৃপাণ, তির এই পঞ্চ শস্ত্র নিহাংদের জীবনের অঙ্গ। কোমরের ডানদিকে ঝুলবে দুটো তলোয়ার, বাম দিকে একটি ‘কাটার’ বা ছোরা। সঙ্গে বাঘনখ। ত্রিশূলমুখ। পিঠে বাঁধা থাকে মোষের চামড়া দিয়ে তৈরি একটা ঢাল। এছাড়াও নানাবিধ অস্ত্র। একজন নিহাং একশো জনের সঙ্গে লড়তে সক্ষম এমনই তাঁদের প্রশিক্ষণ।
বাবরি মামলার রায়দানকালে নিহাংদের এই ঘটনাটা দারুণ রকমের গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। মসজিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মসজিদের মূল স্থাপত্যের ভেতরে ঢুকে প্রার্থনা করার সম্পূর্ণ অধিকারটা চিরকালই মুসলিম পক্ষের ছিল। কিন্তু নিহাংদের এই ঘটনা প্রমাণ করে দেয় যে, হিন্দুরা কেবল মসজিদ প্রাঙ্গনে রামলাল্লার জন্মস্থানে প্রার্থনা করারই অধিকারী ছিলেন এমনটা নয়, মসজিদের মধ্যে ঢুকেও প্রার্থনা করা হয়েছে। মসজিদে কখনো কোনো হিন্দু প্রবেশ করেনি এই যুক্তি এক্ষেত্রে নস্যাৎ হয়ে যায়।
১৮৮৩ সালে হিন্দুদের পক্ষ থেকে একটি মঞ্চ নির্মাণ করে অযোধ্যায় মন্দির তৈরি করার দাবি উঠতে থাকে। ১৮৮৫ সাল। এবারে মামলা গড়াল কোর্টে। মহন্ত রঘুবর দাসের নেতৃত্বে পিটিশন জমা করা হয় ফৈজাবাদের সাব- জাজের কাছে। কিন্তু ধাক্কা খায় মামলা। বলে দেওয়া হয়, অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এর নিদান দেওয়া এখন সম্ভব নয়। যে অবস্থায় আছে, সেভাবেই সব চলবে। মসজিদ প্রথমবারের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ হয় ১৯৩৪ সালে। একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মসজিদের একটি গম্বুজে এবং মসজিদের বহিঃপ্রাচীরে ক্ষতি হয়েছিল। তবে ব্রিটিশ প্রশাসন তার মেরামতি করে দেয়।
যুদ্ধে এবং প্রেমে নাকি সব চলে- ছল বল কৌশল স-ব কিছু। রামজন্মভূমি নিয়ে অযোধ্যায় যুদ্ধ চলে এসেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এবারে একটু অন্য পথে ভাবলেন রামভক্তেরা। শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির নিয়ে যখন এত কথা আসছে, তখন তো শ্রীরামকেই অযোধ্যায় অবতীর্ণ হতে হয়।
পক্ষ-বিপক্ষ সকলেই যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেন যে রামচন্দ্র একজন ইতিহাস-পুরুষ। তিনি একদা ছিলেন। বাবরি মসজিদের জায়গাতেই তাঁর জন্ম হয়েছিল। তাহলেও কি তাঁদের কেউ এই কথাটা মানতে পারবেন যে আজকের রামলাল্লার বিগ্রহখানি ভোজবাজির মতো হাওয়া থেকেই জন্ম নিয়েছিল বাবরি মসজিদের গর্ভে?
আসলে রাজনীতিতে ভালো বা মন্দ বলে কিছু হয় না। যা কিছু হয়, তা হল উপযুক্ত। আইন কানুন দেখিয়ে যখন কিছুই করা সম্ভব হচ্ছিল না, তখন হিন্দুত্বের মঠাধীশেরা শতরঞ্জের এই দানে ঘোড়ার আড়াই চাল দেবেন বলে ঠিক করলেন।
পরে এই জমিতে রামমন্দিরের নির্মাণ শুরু হবে। মন্দিরের ভুমিপূজার দিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী উপস্থিত থাকবেন, আর থাকবেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয় যোগী আদিত্যনাথ। যোগী আদিত্যনাথের উপস্থিতি কিন্তু কেবলমাত্র একজন মুখ্যমন্ত্রী রূপে নয়, তাঁর উপস্থিতির এক আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তিনি গুরু গোরখনাথের নাথ সম্প্রদায়ের পক্ষকে পেশ করেছেন রামরাজার দরবারে। নাথ যোগীদের সঙ্গে রামজন্মভূমির আন্দোলনটা একেবারে ওতপ্রত ভাবেই জড়িয়ে। এর জন্য ফিরে যেতে হবে আরেকটু আগে, আমরা যেখানে গল্পটা ছেড়ে এসেছিলাম। যোগী আদিত্যনাথের আগে নাথগুরু ছিলেন গুরু অবৈদ্যনাথ। এবং তাঁর গুরু ছিলেন গুরু দিগ্বিজয় নাথ। এই দিগ্বিজয় নাথকে ছাড়া স্বাধীনতা পরবর্তী রামজন্মভূমি আন্দোলনের এই রূপ, এই গতি, এই ফলাফল কার্যত অসম্ভব ছিল।
১৯৩৫ সালে দিগ্বিজয় নাথের গোরখমঠের মহন্ত রূপে স্বীকৃতি লাভের পর থেকেই গোরখনাথের মঠ-মন্দির দক্ষিণপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকতে থাকে। বছর দুয়েকের মধ্যেই শ্রী দিগ্বিজয় নাথ হিন্দু মহাসভায় যোগ দিলেন। ধর্ম আর রাজনীতি কোনো কালেই আলাদা ছিল না এই ভারতের বুকে, এবারে তা অনুঘটক পেয়ে গেল দিগ্বিজয় নাথের রূপে। রামজন্মভূমি নিয়ে উঠেপড়ে লাগলেন এই মহন্ত
যারা রামজন্মভূমির বিপক্ষে, তাঁরা দলিল দেন যে গান্ধীজির হত্যার পর থেকেই উগ্র হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা রামমন্দির নিয়ে ষড়যন্ত্র বোনা আরম্ভ করেছিল। তাঁদের বক্তব্য মেনে নিলে সেই ষড়যন্ত্রের অঙ্গ স্বরূপ দিগ্বিজয় নাথ বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে এক রাজার শরণাপন্ন হন।
কোন রাজা?
অযোধ্যার নিকটস্থ বলরামপুরের রাজা পাটেশ্বরী প্রসাদ সিং।
রাজা রামজন্মভূমির পক্ষে ছিলেন। তাঁর দ্বারা আয়োজিত একটি যজ্ঞে দিগ্বিজয় নাথ আরেক সন্ত করপাত্রী মহারাজকে নিয়ে নিজের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর উপস্থিতিতে রাজার সঙ্গে মোলাকাত করেন। রাজা রামজন্মভূমি আন্দোলনকে গতিশীল করে তুলতে আর্থিক সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দেন।
এরপরের ঘটনা লৌকিক অলৌকিকের মিশেলে যে কোনো থ্রিলার নভেলকে হার মানিয়ে দিতে পারে। সালটা ১৯৪৯। পৌষ মাসের হাড় কাঁপানো রাত। ইংরেজি ক্যালেণ্ডারে তারিখ বলছে, ২২শে ডিসেম্বর। মাঝরাত। উত্তুরে হাওয়া দাঁত ফোটাচ্ছে ক্রমশঃ। ধ্বপ করে একটা শব্দ হতেই বাবরি মসজিদের মুয়াজ্জিন মুহম্মদ ইসমাইলের ঘুম ভেঙে গেল। ইসমাইল মসজিদের মধ্যেই ঘুমোন। বাইরের রামচবুতরার পূজারীদের সঙ্গে তাঁর বেশ সদ্ভাব। রামভক্তদের সমাগম হয় ভালোই, তাই কলাটা, মূলোটা বেশ ভালো পরিমাণেই জমা পড়ে রামজির চরণে। এদিকে মসজিদের আয় উপায় তেমন কিছু নয়। লোকজন কম আসে। মাঝেমধ্যে পকেটে টান পড়ে, কিন্তু পেট তো চালাতে হবে। ইসমাইল সাহেবের অবশ্য চিন্তার কোনো কারণ নেই। রামচবুতরার পূজারীরা তাঁকে খাবারদাবার দেন। হিন্দু-মুসলিম বৈরীতা মন্দির-মসজিদ চত্বরের বাইরে, ভেতরে শুধুই উপাসক।
ধ্বপ— আবার একবার শব্দ হল। এবারে ইসমাইল সাহেব নিজের বিছানায় উঠে বসলেন। জ্বীন কফিলের ভয় তাঁর নেই। মসজিদের পাক মাটিতে ওসব আসার দুঃসাহস করবে না। মাথার ওপরে গম্বুজের দিকে একবার তাকালেন। মধ্যযুগ শেষ হতে-না-হতেই গড়ে ওঠা এই মসজিদের মধ্যে না-জানি কতকালের বাতাস জমে আছে। হাওয়াই কথা বলছে বোধ হয়। একা মানুষ ভয় পায়— এসব বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এমন সময় আবার একটা ভোঁতা শব্দ তাঁর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিল।
.
কনকনে শীতেও ঘেমে উঠেছে মুয়েজ্জিনের কপাল। ইসমাইল সাহেবের মন বলছে, অশরীরী কোনো কিছুর অস্তিত্ব নয়, বরং জাগতিক কোনো বিপদ আসছে। চৌত্রিশ সালের দাঙ্গা দেখেছেন মোয়েজ্জিন ইসমাইল সাহেব। উন্মত্ত কিছু লোক মসজিদের গম্বুজটা ভাঙতে লেগেছিল। একটা বড় গর্ত হয়ে যায়। পরে ইংরেজরা সেটা সারাই করিয়ে দেয়। পনেরো বছর আগের সেই ভয়টা আবার হানা দিয়েছে মনে। অন্ধকারের দিকে বাচ্চা ছেলেরা যেভাবে ভয়ার্ত চোখে তাকায়, ঠিক সেভাবেই আওয়াজের উৎস খুঁজতে চেয়ে পহেলি বোঝার চেষ্টা করছেন তিনি। উঠে এগিয়ে গেলেন। পরনে লম্বা কুর্তা আর লুঙ্গি। ইসমাইল সাহেবের চেহারাটা ছোটখাটো হলেও বেশ গাঁট্টাগোট্টা। আচমকাই অন্ধকারে কিছুর সঙ্গে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগল। ইসমাইলের মনে হয়েছিল কিছু নয়, কারো সঙ্গে। লম্বা চওড়া ভাগোয়াধারী এক ব্যক্তিকে নাকি তিনি দেখেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি ধাতব দেববিগ্রহ। ব্যাপারটা এতক্ষণে মাথায় এসে গেছে। ওইদিন থেকেই মসজিদের বাইরে রামচবুতরায় শুরু হয়েছে ন’দিন ব্যাপী রামচরিতমানস পাঠ— নবপাঠ। বসেছে কীর্তনের আসর। সেই কীর্তনিয়া এবং বৈরাগীরাই মসজিদে ঢুকে পড়েছে, দেবতার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে রামজন্মভূমির দাবি ফলাবে বলে।
ইসমাইল সাহেব ওই ব্যক্তির হাত থেকে বিগ্রহ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে প্রচণ্ড মারধোর করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় যাহোক করে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি ছুটতে থাকেন। এভাবে প্রায় দু ঘণ্টা পথ চলার পরে গিয়ে পৌঁছান ঘোসিয়ানা মুসলিমদের গ্রামে। সেখানে গ্রামবাসীরা তাঁর সেবা করেন। খাবার আর শীতবস্ত্রের জোগান দেওয়া হয়। এই ঘটনার পরে ইসমাইল সাহেব আর কখনো বাবরি-মুখো হননি।
লোকমুখে অযোধ্যাকে কেন্দ্র করে রামভক্ত এবং ঐস্লামিক শাসকদের মধ্যেকার সংঘর্ষের ইতিহাস গোটা উত্তরপ্রদেশে আজও ছড়িয়ে রয়েছে। শোনা যায়, এখনো পর্যন্ত ৮০টিরও বেশি সংঘর্ষ হয়েছে। তবে সম্ভবত ১৯৪৯ সালের ২২শে ডিসেম্বরের মতো কূটনৈতিক সংঘর্ষের নজির বাবরির ইতিহাসে না এর আগে কেউ দেখেছে, না এর পরে। ২৩ তারিখ ভোর তিনটে নাগাদ হইচই পড়ে গেল। কারা যেন খবর ছড়িয়ে দিল— বালক রামলাল্লা স্বয়ং বিরাজমান হয়েছেন রামজন্মভূমিতে।
এক সাধু অভিরাম দাস নিজের সঙ্গীদের নিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে গাইতে শুরু করলেন ‘ভয়ে প্রকট নিরালা দীন দয়ালা…’। ঈশ্বর নিজের বাল-রূপে আবির্ভূত হয়েছেন মসজিদের মধ্যে। রামজি ফিরে এসেছেন বনবাস শেষে। তিনি রামলাল্লা রূপে ফিরেছেন। রামলাল্লা বিরাজমান!
এবার অভিরাম দাস বাবাজ্বিকে একটু চিনে নেওয়া যাক। এঁকে হয়তো আমরা ভুলে গেছি, কিন্তু ইতিহাস ভোলেনি। অভিরাম দাস কারো কাছে ‘রামজন্মভূমি উদ্ধারক’। কেউ বলে, বিহার থেকে অযোধ্যায় আসা একটা বেকার ছেলে, যার মুখে সবসময় খিস্তিখেউড় চলত, সে ওই রাতে রামলাল্লার মূর্তি মসজিদের মধ্যে রেখে এসে জননায়ক হয়ে গেল— মুহম্মদ ইসমাইল নাকি ২২শে ডিসেম্বরের মধ্যরাতে মসজিদে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে অভিরাম দাসকেই দেখেছিল। অমন লম্বা চওড়া চেহারা আর কারো ছিল না।
সে যাই হোক, আমার কাজ লিখে চলা— বিহঙ্গের দৃষ্টি দিয়ে দেখতে দেখতে সবকিছু নথিবদ্ধ করা। পাঠক নিজের নিজের কোণ খুঁজে নেবেন এর মধ্যে।
সবই তো হল, এবার বলটা চলে গেল প্রশাসনের কোর্টে। ভারত সরকার এবং তার আধিকারিকদের ভূমিকা কী ছিল?
রামজন্মভূমি-বাবরি মসজিদ নিয়ে তরজা তো কারো অবিদিত নয়। সরকারি পাহারার ব্যবস্থা প্রথম থেকেই করা ছিল। শিফটে ডিউটি চেঞ্জের ব্যবস্থা। রাতে যে দুজন পাহারা দিতেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হিন্দু, অন্যজন মুসলিম। অভিযোগ তোলা হয় যে হিন্দু পাহারাদার নিজের ডিউটিতে কাউকে বা কাদেরকে মসজিদের ভেতরে ঢুকতে দিয়েছিল, তাই রামলাল্লার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। মসজিদের ভেতরের দেওয়ালে খোদাইগুলোকে অনুপ্রবেশকারীরা ঘষে ঘষে তুলে দিয়ে গেরুয়া-হলুদ রং দিয়ে লিখে দিয়েছিল রামসীতার নাম। আর যিনি মুসলিম পাহারাদার তাঁর বক্তব্য কী ছিল?
ভদ্রলোকের নাম আবুল বরকত। যেহেতু মূল ঘটনাবলী তাঁর ডিউটি পিরিয়ডে ঘটেছিল, তাই তাঁর দেওয়া জবানবন্দির একটা বড় ভূমিকা ছিল তো বটেই। তিনি কী বলেছিলেন?
আবুল বরকত লিখিত ভাবে বিবৃতি দিয়েছিলেন—
‘আমার নাম আবুল বরকত। শ্রীরামজন্মভূমি (বাবরি মসজিদ)তে আমাকে ডিউটিতে নিয়োগ করা হয়েছে, যবে থেকে এই ডিউটি দেওয়া হয়েছে তবে থেকেই আমি নিয়মিত ভাবে রিপোর্ট করে গেছি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত হিন্দুরা কোনো ধরণের অনৈতিক কাজ করেননি। ২২-২৩ শে ডিসেম্বর, ১৯৪৯-এ ভোররাত ২টো নাগাদ যখন আমার ডিউটি চলছিল, তখন বাবরি মসজিদের মাথায় চাঁদের আলোর মতো একটা আলোর ছটা ছেয়ে যায়। আমি নিবিড় মনোযোগ দিয়ে সেদিকেই তাকিয়ে ছিলাম, আলোটা আস্তে আস্তে সোনালি হয়ে গেল। মসজিদ আলোয় আলো হয়ে উঠল। আলোর কুয়াশা যেমন হয়। দেখলাম, একটা চার- পাঁচ বছরের বাচ্চা ছেলেকে, কী সুন্দর দেখতে তাকে! হৃষ্টপুষ্ট দেহ, কোঁচকানো চুল। জীবনেও অত সুন্দর শিশুর মুখ দেখিনি আমি। দেখতে দেখতে ঘোর লেগে গেল। জ্ঞান হারালাম। যখন সম্বিৎ ফিরল, তখন দেখলাম মসজিদের সদর দরজার তালা ভেঙে অনেক হিন্দু ভক্ত ঢুকে গেছে। ভিড় উপচে পড়ছে। সবাই গান গাইছে— ভয়ে প্রকট নিরালা দীন দয়ালা…। মসজিদের ভেতরে রূপোর সিংহাসনে বিরাজ করছে একটি দেবমূর্তি। আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার ঊর্ধ্বতন আধিকারিককে রিপোর্ট করি। এর বাইরে আমার আর কিচ্ছু বলার নেই।’
আর আধিকারিকদের ভূমিকা?
তার আগে পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে চাই শক্তি সিং-এর নাম। খেয়াল করেছেন কিনা জানি না শ্রীরামজন্মভূমির ভূমিপূজার আসরে অভ্যাগত হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বদের একজন ছিলেন শক্তি সিং। ইনি ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি হওয়া ছাড়াও এঁর আরো একটি পরিচয় রয়েছে। ইনি ১৯৪৯ সালে ফৈজাবাদের সিটি ম্যাজিস্ট্রেট গুরুদত্ত সিং-এর পৌত্র।
ডিসেম্বর মাসের রামলাল্লা প্রকটের এই ঘটনার আগে এই গুরুদত্ত সিং-এর সঙ্গে দেখা করেই অভিরাম দাস বলেছিলেন— ‘আমি বার বার স্বপ্ন দেখি ওই বাবরি মসজিদের মূল গম্বুজের নীচে শ্রীরাম আবির্ভূত হয়েছেন।’
অভিরাম দাসের স্বপ্নে বাবরি মসজিদের মধ্যে রামচন্দ্রের আবির্ভাব হওয়ার কথা শুনে সিটি ম্যাজিস্ট্রেট শ্রী গুরুদত্ত সিং বলেছিলেন— ‘আরে ভাই, তুমি এই স্বপ্ন আজ দেখছ? আমি তো কবে থেকেই এই স্বপ্নটাই দেখে আসছি।’
অযোধ্যার এক সাধু এবং এক প্রশাসক বাবরি মসজিদের গর্ভে শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাবের স্বপ্ন দেখছিলেন। হয়তো বিধাতাই দুজনকে এক করে দিয়েছিলেন। আজ রাজনীতির চক্করে পড়ে লোকে অভিরাম দাস বাবাজির নাম ভুলে গেছে, গুরুদত্ত সিংকে ভুলে গেছে। মনে নেই কে কে নায়ারের নামটাও।
ওহ, কে কে নায়ারকে নিয়ে তো বলাই হয়নি। তাই না?
কে কে মুহম্মদের নামটা পুরাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এবং তার সূত্র বাইরে আনার জন্যে বারে বারে উঠেছে অযোধ্যার ক্ষেত্রে, কিন্তু প্রায় বিস্মৃত হয়ে গেছেন আরেক মালায়ালি কে কে নায়ার। জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ নায়ার সাহেব ছিলেন তৎকালীন (১৯৪৯) ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। বাবরির গর্ভে রামলাল্লার প্রকট হওয়ার আগে নাকি গুরুদত্ত সিং সাহেবের বাড়ি রাম ভবনে একটা মিটিং বসেছিল। উপস্থিত ছিলেন কে কে নায়ার, সুপারিনটেণ্ডেণ্ট অব পুলিশ শ্রী কৃপাল সিং, বিচারক ঠাকুর শ্রী বীর সিং। জেলার তাবড় সব রথী-মহারথীর সেই সান্ধ্য আসরে হয়তো রামচন্দ্রের আবির্ভাবের স্বপ্নটাই আলোচনা করেছিলেন ধর্মপ্রাণ গুরুদত্ত সিং।
কে কে নায়ার নিজেও ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। হিন্দু মহাসভার প্রতি একটা সফট কর্নার ছিলও। যে রাতে রামলাল্লা আবির্ভূত হন, সেইদিন নায়ার সাহেব ছুটিতে ছিলেন। তবে তিনি হেডকোয়ার্টার (ফৈজাবাদ) লিভ করেননি। তাই ২২/২৩শে ডিসেম্বরের ওই ঘটনার খবর যখন গুরুদত্ত সিং পান, তখন তা কে কে নায়ারকে দেওয়াটাও অত্যাবশ্যকীয় ছিল।
সাইকেলে চড়ে এক মেসেঞ্জার খবর নিয়ে গেল কে কে নায়ারের কাছে– বাবরির মধ্যে রামলাল্লার মূর্তি প্রকট হয়েছে। হিন্দুরা বাইরে যজ্ঞ করছে, নাম সংকীর্তন আরম্ভ করেছে। পুলিশ কনস্টেবল ডেপ্লয় করা হলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। পুলিশকে শুধুমাত্র হাওয়াতে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হলেও পুলিশ জনগণের উপরে গুলি চালিয়েছে। একজনের পেটে আর একজনের পায়ের বুড়ো আঙুলে গুলি লেগেছে।
কে কে নায়ার ভোর চারটে নাগাদ পৌঁছান। কিন্তু তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে খবরটা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থকে দেন সকাল সাড়ে দশটায়। পন্থ সাহেব প্রধানমন্ত্রী নেহরুজির সঙ্গে কথা বলেন। নেহরুজির নির্দেশ ছিল মূর্তি সরিয়ে ফেলতে হবে। সাম্প্রদায়িক সমস্যা দেখা দিতে পারে। পন্থ সাহেব সেই কথাই বলেন আধিকারিকদের। কে কে নায়ার আদেশ পালন করাতে কোনো আগ্রহ দেখাননি। নেহরুজির পক্ষ থেকে আবার টেলিগ্রাম আসে। এবারে কে কে নায়ার অফিসিয়াল নোট দিয়ে লেখেন— ‘বিফোর রিমুভিং দ্য আইডলস, আই শুড বি রিমুভড…’। তবে কে কে নায়ারকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়নি।
মূর্তি স্বস্থানেই রয়ে যায়। আদালতের এক বিচারকের অনুমতিক্রমে হিন্দু পূণ্যার্থীরা মূর্তির কাছে গিয়ে প্রার্থনা করতে থাকেন। কিন্তু মূর্তির কাছে যাওয়া যেত না, মূর্তি থাকত তালাবন্ধ গেটের ওপারে। এরপর আরম্ভ হয় হিন্দু ও মুসলিম উভয়পক্ষের পিটিশন দাখিলের কোর্ট যুদ্ধ।
অযোধ্যা যখন জ্বলন্ত ইস্যু, তখন একজন প্রাক্তন কংগ্রেসী দৌ দয়াল খান্না নতুন দাবি তুললেন। প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের জন্মস্থান অযোধ্যা, শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি মথুরা ও কাশীতে ভগবান শিবের মন্দির ভেঙে তৈরি হওয়া মসজিদের জমি পুনরুদ্ধার করতে হবে। সঙ্ঘ ও বিহিপ দেখল মোক্ষম সুযোগ। উপরিউক্ত তিনটি স্থানের মধ্যে রামমন্দির ইস্যুকে বেছে নিয়ে তাঁরা এগোলেন। প্রভু রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ এবং ভগবান শিবের মধ্যে রামজন্মভূমিকে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল হিন্দু জনমানসে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। তুলসিদাস মোগল আমলে ‘রামচরিতমানস’ লিখেছিলেন। রামজন্মভূমির পুনরুদ্ধারের সুযোগে মোগল আমলের বৈষম্যের কথা সবার সামনে এনে ফেলা যাবে।
১৯৮৩ সালে বিহিপ উত্তর প্রদেশের মুজফফরনগরে ‘হিন্দু সম্মেলন’ করল। তুলসিদাস সেজে নিজের বক্তব্য রাখলেন দৌ দয়াল খান্না।
বিহিপ হিন্দু একতার জন্য সারা দেশ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা তুলেছিল। তারপর আরম্ভ হল ‘একাত্মতা যাত্রা’। গঙ্গার জল পাত্রে ভরে ট্রাকে তুলে দেশের প্রতিটি কোনায় পৌঁছে দেওয়া শুরু হল। সারা দেশে প্রায় ৮৫,০০০ কিলোমিটার ব্যাপী এই যাত্রা চলেছিল। রামজন্মভূমির পুনরুদ্ধারের জন্য করা এটাই প্রথম যাত্রা ছিল। এই যাত্রাই পরে অনেককে পথ দেখাবে। একাত্মতা যাত্রা এতটাই ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয় যে, ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে যাত্রার কালে উপস্থিত থাকবেন বলেছিলেন। শেষ মুহূর্তে অবশ্য তিনি এসে হাজির হননি বা হতে পারেননি। কিন্তু এটুকু জোর দিয়ে বলা চলে যে, একাত্মতা যাত্রার মাধ্যমে দেশের মানচিত্রে বিহিপ নিজের শক্তিশালী উপস্থিতি প্রমাণ করে দিয়েছিল।
১৯৮৪ সালে আরএসএস বিহিপ-এর একটি যুব শাখা আরম্ভ করল। নাম দেওয়া হল ‘বজরং দল’। তাঁদের নেতৃত্বে সেপ্টেম্বর মাসে আরও একটি যাত্রা বেরোলো। রাম-জানকী যাত্রা। বিহারের সীতামঢ়ি থেকে শুরু করে লখনউ, অযোধ্যা হয়ে দিল্লি পৌঁছাল ৩০শে অক্টোবর। যাত্রা সফল হয়েছিল। সাড়া মিলছিল বেশ ভালো। কিন্তু এর রাজনৈতিক লাভ মেলার আগেই এক মহীরুহের পতনে ভারত কেঁপে উঠল। ৩১শে অক্টোবর, ১৯৮৪, ভারতের প্রধানমন্ত্ৰী শ্ৰীমতি ইন্দিরা গান্ধী নিজের শিখ দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন