সেই ফুলের দল – ১০

অভীক মুখোপাধ্যায়

জয়প্রকাশ নারায়ণ বলেছিলেন, যে যখন একনায়ক হয়ে উঠবে, তখন তার চাবুকটা প্রথমেই পড়বে সংখ্যালঘুদের পিঠে। আমাদের কাহিনি যেদিকে এগোবে, সেদিকে এই কথাটাকে মাথায় রাখবেন, বন্ধু। মিললেও মিলতে পারে।

দুজানা হাউজের কথা তো বললামই। জোর করে ধরে এনে মুসলমান পুরুষদের নির্বীজকরণ চলছিল। আর তার সামান্য দূরে, তুর্কমান গেটে, সেখানে কী হচ্ছিল? সেখানেও তখন সঞ্জয় গান্ধীর আরেক স্বপ্ন সাকার হয়ে ওঠার মুখে। সঞ্জয় চাইছিলেন পুরোনো দিল্লির সব বাড়িঘর ভেঙে একটা ঝাঁ চকচকে দিল্লি বানাবেন। প্রথম ঘা পড়ার কথা ছিল তুর্কমান গেটের কাছে ফৈজ-এ-ইলাহি মসজিদের আশপাশের এলাকায়। সেখানে বেশ কিছু মানুষ কালো কাপড়ের ফেট্টি কপালে বেঁধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। তাঁদের সামনে দাঁড়িয়েছিল দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথোরিটির বুলডোজার এবং জগমোহন। এই জগমোহনকেও আপনারা চেনেন। আমাদের গল্পের সময়কালে জগমোহন ছিলেন সঞ্জয় গান্ধীর খাস লোক। পরে ইনিই ডিডিএ-এর ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থেকে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের রাজ্যপালের পদ পর্যন্ত যাত্রা সম্পন্ন করেছিলেন।

যাই হোক, আমরা আবার বুলডোজারের জায়গায় ফিরে যাই। সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন সঞ্জয় গান্ধীর আরেক খাস মানুষ পুলিশকর্তা ভিণ্ডের। ভিণ্ডের সাহেব টিয়ার গ্যাস, গোলাগুলি নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপরে আক্রমণ করে দিলেন। ফায়ারিং হল। সরকারি হিসেবে ছ’জন মারা গেলেন। কিন্তু যে হারে গুলি চলেছিল তাতে সংখ্যাটা সত্যিই ছয় হলে বলতে হয় যে প্রায় কোনো ক্ষয়ক্ষতিই হয়নি। সেদিন নাকি মসজিদের প্রতিটা ইট রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। এলাকার প্রতিটা বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর করা হয়। মহিলাদের সাথে অসভ্যতা করার অভিযোগও শোনা গিয়েছিল।

১৩ থেকে ২৭ এপ্রিল টানা বুলডোজার চালিয়ে ১২০টি বাড়িকে ধ্বংস করে দেওয়া হল। ৭৬৬টি পরিবার গৃহহারা হয়ে গেল। ভাঙা হয়েছিল ১৯৯ খানা দোকান। মুসলমান বস্তির লোকজন সবাই গিয়ে জগমোহনকে অনুরোধ করলেন, যাতে থাকার মতো জায়গার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।

জগমোহন বলেছিলেন, ‘আমি একটা পাকিস্তান ভেঙে আরেকটা পাকিস্তান কখখনো তৈরি করব না।’

ওদিকে মে মাসে বোম্বাইতে জয়প্রকাশ নারায়ণ ঘোষণা করলেন, ‘আমরা ঠিক করেছি এমন একটা দল গঠন করা হবে যেখানে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ একত্রিত হয়ে এমারজেন্সির বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। যদি লোকতন্ত্র পুনর্বহাল হয়, তাহলে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোটেও লড়ব।’

কোনো এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, ‘কারো সঙ্গে কথা হয়েছে?’

‘হয়েছে। অশোক মেহতা, চৌধুরী চরণ সিং, পিলু মোদি, সুরেন্দ্র মোহনের সাথে হয়েছে।’

‘জনসঙ্ঘ কি আপনাদের সাথে আছে?’

‘যেই জনতার সঙ্গে থাকবে, সে-ই আমাদের সঙ্গে আসতে পারে।’ ‘নাম কী হবে দলের?’

‘এখনো ঠিক হয়নি। তবে যে পার্টিই হোক না কেন, তা হবে জনতার জন্য।’

এই খবর ছড়িয়ে পড়ল। খবরটা জেলে বন্দি সোশ্যালিস্ট দম্পতি মধু দন্ডবতে ও প্রমিলা দণ্ডবতেও পেলেন। এবং তাঁরা রীতিমতো প্রমাদ গুণলেন। জনসঙ্ঘ তাঁদের চোখে সাম্প্রদায়িক দল। তারা কীভাবে সোশ্যালিস্ট দলের সাথে খাপ খাইয়ে চলবে? তাহলে কি আদর্শের রাজনীতি তাকে তুলে রাখতে হবে এবার?

তা কেন? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে জনসঙ্ঘ সাম্প্রদায়িক ভাবনাচিন্তা রাখে, তাহলেও এমন উদাহরণ কিন্তু এর আগেও দেখা গেছে। স্বয়ং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীজি হিন্দু ধর্মের সাথে যুক্ত এবং গোরক্ষার সমর্থক হলেও সাম্প্রদায়িক ছিলেন না।

জয়প্রকাশ নারায়ণ ঠিক করেই ফেলেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীকে গদি থেকে না নামিয়ে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন না। তার জন্যে যে দলের সঙ্গেই হাত মেলাতে হবে মেলাবেন। বিরোধী দলগুলিকে এক সুতোয় গাঁথার কাজ চলছিল সুতো তাঁর হাতে ছিল।

.

শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী লোকসভা নির্বাচনের ঘোষণা করে দিলেন। তারিখটা ছিল ১৮ই জানুয়ারি, ১৯৭৭। এর আগেই এমারজেন্সির সময়ে গ্রেফতার করা সকল রাজনীতিককে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ২৩শে জানুয়ারি অর্থাৎ ভারতের গণতন্ত্র দিবসের ঠিক তিনদিন আগে অভূতপূর্ব একটি ঘটনা ঘটল। গণতন্ত্রকে রক্ষা করার ডাক দিয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল জনসঙ্ঘ, ভারতীয় লোকদল, স্বতন্ত্র পার্টি, সোশ্যালিস্ট পার্টি। জন্ম নিল নতুন একটি রাজনৈতিক দল জনতা পার্টি। ওই যে আগেই বলেছি, সব ফুলকে একই সুতোয় গেঁথে তৈরী হল মালা — সেই ফুলের দল — সুতোটা ছিলেন লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ, সবার সম্মাননীয় জেপি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী লোকসভা নির্বাচন কেন ঘোষণা করলেন? কেউ বলেন, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো নাকি তাঁকে বলেছিল, ভোটাভুটি হলে আপনি অনায়াসে জয়লাভ করবেন। এমারজেন্সির সময়ে দেশে সরকারি অফিসগুলোতে প্রচণ্ড কড়াকড়ি চলেছিল। অফিসে সকলে সময়ে ঢুকত- বেরোতো। সাধারণত সরকারি কর্মচারীদের ওপর যে কোনো রকমের চাপ সৃষ্টি হলে আমজনতা খুশি হয়ে থাকে। দেশের অর্থনীতির হাল ফিরছিল। তাই শ্রীমতি গান্ধী ভেবেছিলেন যে তিনি জনগণের ভোট পাবেন। তাছাড়া বিরোধীপক্ষ জন্ম নিলেও তারা দুর্বল। অন্যদিকে সেইসময়কার এক ফায়ারব্র্যান্ড মরাঠি রাজনেতা ইন্দিরা গান্ধীর এমারজেন্সিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তিনি হলেন বালাসাহেব ঠাকরে। শ্রীমতী গান্ধীর লক্ষ্য তখন ভোটে জিতে সঞ্জয় গান্ধীকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু সঞ্জয় আবার এমারজেন্সি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই ছিলেন। ডেমোক্রেসিতে বরাবরই শ্রী সঞ্জয়ের বিশেষ অনীহা ছিল।

তবে মূল কারণ সম্ভবত ছিল আন্তর্জাতিক চাপ। ইন্টারন্যাশন্যাল প্রেসারের কথাটা কোথাও কেউই বলেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমানে চাপ দিয়ে চলেছিল যাতে ভারতে এমারজেন্সি উঠে যায়। বিদেশের বড়-বড় খবরের কাগজগুলোতে তখন ইন্দিরা গান্ধীকে একনায়ক বলে তুলোধোনা করা হচ্ছিল।

২রা ফেব্রুয়ারি একটা বড়সড় ধাক্কা খেলেন শ্রীমতি গান্ধী। ইন্দিরা সরকারের অন্যতম মুখ তথা কৃষি ও সেচ মন্ত্রী বাবু শ্রী জগজীবন রাম জনতা পার্টিতে সামিল হয়ে গেলেন। ভদ্রলোকের বক্তব্য ছিল, পুরো এমারজেন্সি পিরিয়ডে তিনি নাকি কংগ্রেস দলে অত্যন্ত কুণ্ঠিত অবস্থাতে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। কংগ্রেস এখন আর কংগ্রেস নেই, তা কেবল একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যারা রাজনীতির খবর রাখেন, তাঁদের কাছে বাবু শ্রী জগজীবন রাম পরিচিত চরিত্র, আর যাদের কাছে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিতে হবে, তাঁদের উদ্দেশে বলি, আপনারা বছর কয়েক আগে এই জগজীবন রামেরই কন্যা শ্রীমতি মীরা কুমার লোকসভার স্পিকার পদে ছিলেন। যাই হোক, বাবু শ্রী জগজীবন রাম গোটা এমারজেন্সি পিরিয়ডে কিন্তু কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একটি বারও মুখ খোলেননি। জগজীবন রাম একা বেরোলেন না, সঙ্গে কিছু বিদ্রোহী নেতাও ছিলেন। সম্মিলিত ভাবে তাঁরা গঠন করলেন একটি ছোট দল— কংগ্রেস ফর ডেমোক্রেসি। জনতা পার্টিকে সমর্থন দিলেন বাইরে থেকে।

ওদিকে মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টিও জনতা পার্টির সঙ্গে জোটের ব্যাপারে সম্মত হয়ে গিয়েছিল। দিকে-দিকে বিরোধীরা একত্রিত হচ্ছিল। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে ইন্দিরা গান্ধীর পিসি শ্রীমতি বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত পর্যন্ত ইন্দিরার তীব্র বিরোধ করতে শুরু করলেন। প্রাথমিক ভাবে বাবু জগজীবন রামের সঙ্গে প্রেস কনফারেন্সে নিজের ইন্দিরা-বিরোধের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন তিনি, পড়ে অসংখ্য র্যালিতে, সভায় বক্তৃতাও দেন।

১৯৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচন হল। জনতা পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় লাভ করল। যে ইন্দিরা গান্ধী এতদিন জনমানসের নায়িকা ছিলেন, সেই ইন্দিরা গান্ধীর স্পটলাইট নিমেষে হারিয়ে গেল। জনতা পার্টির জোট ৫৪৫টি আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে জিতল। কংগ্রেসের ঝুলিতে এল ১৫৩টি সিট। ইন্দিরা গান্ধী হারলেন রাজ নারায়ণের কাছে। কংগ্রেস যেটুকু যা টিকে রইল, তা দক্ষিণ ভারতে। উত্তর একেবারে সাফ। জয়প্রকাশ নারায়ণের স্বপ্ন পূরণ হল।

স্বপ্ন পূর্ণ হল বটে, তা ছিল বিপ্লবের স্বপ্ন। বিপ্লব ঝরনার মতোই বহতা ধারা। তা অবিরাম। অস্থাবর। তাকে কে, কবে দানা বাঁধতে দেখেছে? নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হতেও তাই দেরি হল না। কোনো এক হিন্দিভাষী কবি জয়প্রকাশ নারায়ণের এই বিপ্লবকে খিচুড়ি বিপ্লব বলেছিলেন। সেটা অবশ্য বেশ পরের। আগে খিচুড়ির গল্পটা শোনা যাক। ক্ষমতায় আসতেই ঝামেলা লেগে গেল, কে হবে প্রধানমন্ত্রী। চৌধুরী চরণ সিং? বাবু শ্রী জগজীবন রাম? নাকি মোরারজি দেশাই? লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ কখনোই সত্তার পিয়াসী ছিলেন না। তাঁকে বলা হয়, দ্য বেস্ট প্রাইম মিনিস্টার দ্যাট ইন্ডিয়া নেভার হ্যাড। তবে তিনি সমাধান করতে এগিয়ে এলেন। মোরারজি দেশাইকে প্রধানমন্ত্রী, চরণ সিংকে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বাবু জগজীবন রামকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদের জন্য চয়ন করলেন।

এবার এল এমারজেন্সির হিসেব নেওয়ার পালা। সাজা দেওয়ার জন্য বসল জাস্টিস শাহ কমিশন। দুটো বছর কেটে গেল তদন্ত করতে আর ইন্দিরা গান্ধির থেকে বদলা নিতে। বদলা? কেমন ছিল তার রূপ? এমনকি তখন যা কিছু অস্বাভাবিক ঘটছিল, আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছিল, তাকেই বদলার সঙ্গে জুড়ে দেখার চেষ্টা চলছিল। সেই গল্পটাও শোনাব, বন্ধুরা।

.

১৯৭৭ সালের ৪ঠা জুন। সন্ধে সাতটা নাগাদ দিল্লির নাঙ্গলোই থানায় ডিউটি অফিসারের টেবিলের ফোনটা বেজে উঠল।

‘হ্যালো, নাঙ্গলোই থানা?’

‘হ্যাঁ, ডিউটি অফিসার বলছি। বলুন…’

‘স্যার, ম্যায় পঞ্জাব খোড় গাঁও সে বোল রহা হুঁ।’

‘তা বলুন না, কী ব্যাপার?’

‘এখানে খেতের ধারে একটা লাশ পাওয়া গেছে, স্যার।’

‘লাশ? কোথায়?’

‘মান সিং’স ফার্ম-এ।’

‘বডি আইডেন্টিফাই করা গেছে? আর আপনি কে বলছেন?’

ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে আর কোনো উত্তর আসে না। লাইনটা কেটে যায় বা কেটে দেওয়া হয়। পুলিশ কিছুক্ষণের মধ্যেই অকুস্থলে গিয়ে পৌঁছায়। একটা ডেডবডি মেলে। মৃত ব্যক্তি একজন শিখ। গমের খেতের ধারে লাশটাকে দেখতে পেল প্যাট্রোল টিম। অবাক করার মতো একটা জিনিস চোখে পড়ল— খুব যত্ন করে তিনটে খবরের কাগজ পেতে তার ওপরেই মরদেহটাকে শুইয়ে রেখে গেছে কেউ বা কারা।

ডেডবডির পাশেই পড়ে আছে একটা কার্টন। মৃত ব্যক্তির হাত দুটো দেহের দুদিকে সুন্দর ভাবে সাঁটানো রয়েছে। বডি দেখে মনে হল সম্ভবত গুলি লেগেই মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের টিম আশেপাশে কোথাও কোনো ফায়ার আর্মস খুঁজে পেল না। এবং অকুস্থলে ধ্বস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। খুনি সম্ভবত অন্য কোথাও খুন করে দেহটাকে তুলে এনে সাজিয়ে দিয়েছে। আবার এমনও হতে পারে যে, জীবনের রেসে হারতে-হারতে নিজেকে ট্র্যাক থেকে সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভদ্রলোক। তারপরেই বডিটাকে তুলে আনা হয়েছে এখানে, খেতের ধারে।

লাশের শনাক্তকরণ? তা-ও হয়ে গেল। ভদ্রলোক একজন প্রাক্তন সেনা আধিকারিক ছিলেন। এক্স লেফটেন্যান্ট কর্নেল টি এস আনন্দ। পরিবারের লোকেই এসে বডি আইডেনটিফাই করে গেল।

পুলিশ কিছু রুটিন এনকোয়ারি চালাল। পরিবারের লোকদের কাছে জানতে চাইল— ‘আপনি ওঁকে শেষ কবে দেখেছেন?

‘দু’দিন আগে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। গম কাটা চলছিল। সেই কাজই দেখতে এসেছিলেন।

‘শুধু গম কাটার কাজ দেখতে এসেছিলেন? আর কিছু নয় তো? ভালো করে ভেবে বলুন।’

‘না। আর কী কারণ থাকবে? তবে উনি খুব টেনশনে থাকতেন। আগে একবার কোমায় চলে গিয়েছিলেন। এগুলো নিশ্চয়ই সব শুনেইছেন।

‘না, এগুলো আমরা জানতাম না। আচ্ছা, দু’দিন আগে উনি বেরিয়েছিলেন, মাঝে আপনারা কোনো খোঁজ নেননি।

‘আজকেই দুপুরে আমরা ড্রাইভারকে পাঠাই। সে-ই খবরটা দেয়।’

‘ক’টা নাগাদ খবর পেলেন?’

‘বিকেল পাঁচটা।’

‘পুলিশে খবর দিলেন না কেন? আপনাদের ড্রাইভার কোথায়?’

‘পাশ থেকে একজন এগিয়ে এসে বললেন— আমিই ড্রাইভার।’

‘আপনার নাম?’

‘গুরুদেব সিং।’

‘পুলিশকে জানালেন না কেন?’

‘ম্যায় ডর গয়া থা, স্যার।’

‘ঠিক কী দেখেছিলেন?’

‘আমি ওঁর খবর নেওয়ার জন্য আসি। তখন উমেদ সিং আমাকে ওঁর লাশের কাছে নিয়ে যায়।’

‘উমেদ সিং কৌন হ্যাঁয়?

‘এখানকার কেয়ারটেকার।’

‘উনি কীভাবে খবর পেলেন?’

‘এখানে ম্যালেরিয়া পরীক্ষা করার জন্য শহর থেকে একটা মেডিকেল টিম এসেছে। গ্রামের ছেলেরা লাশ দেখে তাদের বলেছিল। সেখান থেকেই শোনে উমেদ সিং-এর ছেলে। আমি আসতেই সে আমাকে দেখায়…’

‘আচ্ছা। উমেদ সিহ ওঁকে জীবিত অবস্থায় শেষ কবে দেখেছিলেন?’

‘উনি দু’দিন আগে সেই যে এসেছিলেন, সেই থেকেই ওঁকে কেউ দেখেনি।’

‘আপাতত দেখে সুইসাইড বলেই মনে হচ্ছে, কিন্তু কোনো আর্মস পাওয়া যায়নি। আপনারা কেউ কোনো বন্দুক পেয়ে সরিয়ে রাখেননি তো?’

‘না না, স্যার। সে কী কথা! বন্দুক দেখলে কেউ হাত দেয় নাকি?’

‘ঠিক আছে। আপনার সব কথাই শুনলাম, কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে আপাতত আপনাকে কাস্টডিতে রাখা হবে।

‘কিন্তু স্যার…’

‘যা বলার নাহয় কাস্টডিতেই বলবেন।’

মৃত্যু হয়েছিল রিভলভারের গুলিতে। এনকোয়ারিতে জানা গেল, মৃত ব্যক্তির ব্যবসার দিকগুলো নিয়ে আগে থেকেই তদন্ত চলছিল। ভদ্রলোক বেশ মানসিক চাপে ছিলেন। প্রাথমিক ভাবে তদন্ত হত্যার দিকে ইঙ্গিত করলেও পরের দিকের থিওরিতে দাঁড় করানো গেল যে, মানসিক চাপে উনি রিভলভার চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ওই বছরেরই ৩০শে মার্চ শ্রী আনন্দ-কে একটি নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়েছিল। অসুস্থতার সঠিক কারণ না-জানা গেলেও মনে করা হচ্ছিল ডিপ্রেশনের জন্য অমনটা হয়েছিল। কেউ আবার বার্বিচুরেটস্-এর ওভারডোজ নিয়েও বলেছিলেন। তবে দুদিনের মধ্যেই শ্রী আনন্দ সুস্থ হয়ে ছাড়া পান। নার্সিং হোম কর্তৃপক্ষ অবস্থা ওঁর অসুস্থতার প্রকৃত কারণ জানিয়ে কখনও কোনো বিবৃতিই দেয়নি।

আর বন্দুক? বন্দুকটা হয়তো কোনো পরিচিত ব্যক্তি বা গ্রামের ছেলেপুলেতে তুলে লুকিয়ে ফেলেছে বা ফেলে দিয়েছে। তদন্তে উঠে আসে যে, শ্রী আনন্দ বিদেশ থেকে একটা পয়েন্ট থ্রি টু বোরের রিভলবার কিনেছিলেন। কিন্তু ওঁর আর্মস লাইসেন্সের তালিকায় সেই বন্দুকটার উল্লেখ মেলেনি। পুলিশ মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে খেতের আশেপাশে তল্লাশি চালালে কার্তুজের ফাঁকা খোল খুঁজে পায়।

এখন প্রশ্ন হল, যদি দু’দিন আগেই আত্মহত্যা করে থাকেন এবং লাশটা ওখানেই পড়ে থাকে, তাহলে তা অবিকৃত অবস্থায় রয়ে গেল কী করে? কিছু না- হোক কাক চিল কুকুর শেয়াল তো আছে রে, বাবা! তবে এমন নজিরও অবশ্য আছে, যেখানে টানা দিন দশেক লাশ খোলা জায়গায় পড়ে থাকলেও তা কোনো পশুপাখিতে ছুঁয়ে দেখেনি।

যা কিছু ঘটেছিল, তা আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও মোটেই সাধারণ ঘটনা ছিল না। মৃত ব্যক্তির পরিচয়ই তা চিৎকার করে বলছিল। সালটা খেয়াল করে দেখলেই বোঝা যায় যে, ভারতে এমারজেন্সির পর সদ্য জনতা পার্টির সরকার গঠিত হয়েছে। এমারজেন্সিতে কংগ্রেস যে ধরণের ধরপাকড় চালিয়েছিল, তার পালটা একটা স্রোত বইছিল। অনেকের নামে মোকদ্দমা আরম্ভ করা হয়েছিল। সাজা দেওয়া হচ্ছিল। কেউ বলছিল, এসব তো হওয়ারই ছিল। কেউ বলছিল, এগুলো সব পলিটিক্যাল বদলা। অনেকে আত্মহত্যা করছিলেন। কারো কারো মৃত্যু ঘটছিল অত্যন্ত সন্দিগ্ধ অবস্থায়। এবং সম্ভবত টি এস আনন্দ-এর মৃত্যুটাও এই শৃঙ্খলারই একটা পর্ব ছিল।

নাঙ্গলোই থানার ডিউটি অফিসারের কাছে ফোনটা আসার আগে কিন্তু দিল্লি পুলিশের আইজি সাহেব মিস্টার ভবানীমলের কাছে একটা ফোন আসে–দিল্লির বাইরে নাঙ্গলোই এলাকায় একটা খেতের ধারে আমার এক আত্মীয়ের বডি পাওয়া গেছে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন তো? ব্যাপারটা সুবিধের ঠেকছে না। আর ওদিকে লাশের পকেট থেকে একটা ছোট চিরকুটে পুলিশ একটা লেখা পেল— ‘সঞ্জয় অসম্ভব চাপে আছে।’

শ্রী আনন্দর প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল দেখার মতো। তবে সবটাই ছিল এমারজেন্সি সময়কাল পর্যন্ত। এমারজেন্সির পরে সরকারের রদবদল হতে আরম্ভ করতেই বদলাতে থাকে গ্রহ নক্ষত্রদের চালচলন। ওঁর একের পর এক কনসাইনমেন্ট বাতিল হতে থাকে। মৃত টি এস আনন্দ-এর আরেকটা পরিচয় ছিল যে, উনি ভারতে এমারজেন্সির সময়কালের সবথেকে শক্তিশালী ব্যক্তি সঞ্জয় গান্ধীর শ্বশুরমশাই ছিলেন।

১৯৭৭ সালের ৩রা অক্টোবর। সূর্যের আলো প্রায় নিভু-নিভু। ১২, উইলিঙডন ক্রেসেন্টে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর আবাসে সঞ্জয় গান্ধী নিজের স্ত্রী মানেকার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলছিলেন। দুটো সাদা রঙের অ্যাম্বাস্যাডর গাড়ি তাঁদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

একটা গাড়ির জানলার কাচ নামিয়ে এক ব্যক্তি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন— ‘ম্যাডাম ঘর পর হ্যাঁয়?’

‘হ্যাঁ, আছেন। কিন্তু আপনারা?’

‘সিবিআই।’

‘সিবিআই? কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না তো?’

‘আপনি আমাদের না-চিনলেও আমরা আপনাকে খুব ভালো করেই চিনি। ম্যাডামকে অ্যারেস্ট করতে এসেছি।’

‘পাগলের মতো কী বকছেন? শী ওয়াজ আওয়ার প্রাইম মিনিস্টার।

কথা শেষ করেই সঞ্জয় বাড়িতে ঢুকে যান। ভেতর থেকে একজন স্টাফ বেরিয়ে এসে সিবিআই আধিকারিকদের জানায়, ‘ম্যাডাম আসছেন। আপনারা এখানেই অপেক্ষা করুন।’

প্রায় একঘণ্টা পরে শ্রীমতি গান্ধীর মুখে দেখা যায়। দরজার পর্দা সামান্য সরিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেন— ‘ওয়ারেন্ট কোথায়? দেখান দেখি!’

সিবিআই কর্তা একটা কাগজ বাড়িয়ে দেন ম্যাডামের দিকে। ম্যাডাম চশমাটা পরে কাগজটা মন দিয়ে পড়তে থাকেন।

পড়া শেষ হলে বলেন— ‘আচ্ছা। আমি রেডি হয়েই আসছি।’

প্রায় দু ঘণ্টা কেটে যায়। ম্যাডাম বাইরে এলেন না। ওদিকে আবাসের বাইরে কিন্তু খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ভিড় জমছে। যুব কংগ্রেসের ছেলেপুলেরা জিগির দিতে শুরু করেছে— ‘ইন্দিরা গান্ধী কি জয়!’ এসে পৌঁছেছে বেশ কয়েকজন নামজাদা উকিল। কয়েকশো কংগ্রেস কর্মী ততক্ষণে ঘিরে ফেলেছে সি বি আই- এর গাড়ি দুটোকেও। সাংবাদিকরা যথানিয়মে এসে পড়েছে আবাসের বাইরে।

ওপরের যে বিবরণ দিলাম, তা আসলে একটি নিখুঁত রাজনৈতিক মঞ্চের বর্ণনা। মঞ্চ প্রস্তুত। এবার মুখ্য চরিত্রের অবতরণের পালা। শ্রীমতি গান্ধী এবার বেরিয়ে এলেন। দৃশ্যটাকে পারফেক্ট করার জন্য তিনি বললেন— ‘অ্যারেস্ট করলে হাতে হাতকড়া পরাতে হয়। নিন, পরান।’

‘না না এসবের কোনো প্রয়োজন নেই, ম্যাডাম। আমাদের কাছে এধরণের কোনো নির্দেশও নেই।’

‘যদি আমি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী না-হতাম? তাহলেও কি আপনি এই একই কাজ করতেন? আমি একজন সাধারণ মানুষ, আমার সঙ্গে একজন সাধারণ মানুষের মতো করেই আচরণ করুন।’

নাটক জমে উঠছিল। উত্তেজিত কংগ্রেস সমর্থকের দল চেঁচাচ্ছিল— ‘জনতা পার্টি হায় হায়!

ইন্দিরা গান্ধীর হাতে হাতকড়া পড়ল। ম্যাডাম গিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন। পেছনে সিবিআই- এর দ্বিতীয় গাড়িটা। তারও পেছনে আরেকটা গাড়ি— সেখানে বসেছেন সঞ্জয় আর মানেকা গান্ধী। উকিলদের গাড়ি সামনের গাড়িগুলোকে অনুসরণ করছে। সাংবাদিকদেরও তো খবরটা কভার করতে হবে। সেই গাড়িও পিছু নিয়েছে। আর জুড়ে গেল ইন্দিরা-সমর্থকদের গাড়ি। কে বলবে যে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? দেখলে মনে হচ্ছিল কোনো জনপ্রতিনিধির কনভয় বেরিয়েছে। যতই হোক, ইন্দিরা গান্ধী বলে কথা।

একটা রেল গেটের কাছে এসে ইন্দিরা গান্ধীর গাড়িটা আটকে যায়। ট্রেন যাচ্ছিল। পেছনের গাড়িতে থাকা লোকজন সবাই নেমে পড়ে। ইন্দিরা গান্ধীও নিজের গাড়ি থেকে নেমে আসেন। ম্যাডাম ওখানে দাঁড়িয়েই সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন— ‘আইনত আমাকে দিল্লির বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না। এটা একটা চক্রান্ত। একটা ষড়যন্ত্র। এদের বক্তব্য হল আমি নাকি এমারজেন্সির সময়ে যাচ্ছেতাই সব কাজ করেছি। যাচ্ছেতাই কাজ আমি করিনি, এরা যেটা করছে, সেটাকেই যাচ্ছেতাই কাজ বলে। একজন মহিলাকে, একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে, রাতারাতি হাতকড়া পরিয়ে এভাবে অজানা পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আপনারাই বলুন! সংবিধান আমি ভেঙেছিলাম নাকি এরা ভাঙছে?’

নিজের বক্তব্য শেষ করেই ম্যাডাম হাতের হাতকড়াটা দেখানোর জন্য শূন্যে মেলে ধরলেন। উপস্থিত সমর্থকদের গুঞ্জন ক্রমশ গর্জনে পরিণত হল। সিবিআই আধিকারিকেরা সেই হুঙ্কার দেখে ভীত হয়ে পড়লেন— এবার কী হবে? ইন্দিরা গান্ধীকে সামান্য এদিক ওদিকে ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সিবিআই। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলেন, জনতা পার্টির চালে এটা সবথেকে বড় ভুল ছিল— নাম দেওয়া চলে, অপারেশন ব্লাণ্ডার। ইন্দিরা রাজনৈতিক ফুটেজ এবং মাইলেজ দুটোই পেয়ে গিয়েছিলেন।

এই ঘটনার প্রায় একবছর পরে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ইন্দিরা গান্ধীকে তিহাড় জেলে পাঠানো হয়। ভারতের ইতিহাসে সেই প্রথমবার কোনো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর জেল হল। যেদিন ইন্দিরা গান্ধীর জেল হয়, তার ঠিক পরদিন একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। আর তা সরাসরি সম্পর্কিত হল ইন্দিরা গান্ধীর জেলযাত্রার সঙ্গে।

.

২০শে ডিসেম্বর, ১৯৭৮। আগেরদিনই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে গ্রেফতার করে তিহাড়ে পাঠানো হয়েছে। খবর এল কলকাতা থেকে দিল্লিগামী একটি বিমান লখনউ থেকে হাইজ্যাকড হয়ে গেছে। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ফোর ওয়ান জিরো তখন দুষ্কৃতকারীদের কবলে। বিমান যখন লখনউ থেকে দিল্লির পালামের অভিমুখে চলেছিল, তখন অন বোর্ড ১২৬ জন যাত্রীর মধ্যে দুজন উঠে এয়ারহোস্টেসদের পাশ কাটিয়ে ককপিটে পৌঁছে ঘোষণা করে, ‘আমরা এই বিমানটিকে অপহরণ করে পটনা নিয়ে যাচ্ছি।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য দ্বিতীয় ঘোষণায় বলা হয় প্লেনটাকে নিয়ে যাওয়া হবে বারাণসী।

যে দুই যুবক বিমানটিকে অপহরণ করেছিল, তারা ছিল কংগ্রেসের দুই যুবনেতা। নাম দেবেন্দ্রনাথ পাণ্ডে এবং ভোলানাথ পাণ্ডে। তাদের বক্তব্য ছিল, ইন্দিরা গান্ধীকে জেল থেকে ছেড়ে দিতে হবে এবং সঞ্জয় গান্ধীর ওপরে যতরকমের আরোপ আনা হয়েছে, সেগুলো থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিতে হবে।

প্লেন গিয়ে নামল বারাণসীতে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তখন রাম নরেশ যাদব। তিনি হাইজ্যাকারদের সাথে সরাসরি কথা বললেন। দুই অপহরণকারীই নিজেদের জেদে অনড় — দুটো ব্যাপারেই নিঃশর্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

ইতিমধ্যে ভোলানাথ পাণ্ডের বাবাকে বারাণসীতে আনা হল। তিনি দুইপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করে, ওয়ারলেসে কথা বললেন— ‘এসব নাটক বন্ধ করো। সারেণ্ডার করে দাও।’

ইন্দিরা গান্ধীর জয়ঘোষ করতে-করতে দুজনে আত্মসমর্পণ করল অবশেষে। যাত্রীদের সুরক্ষিত ভাবে বিমান থেকে নামিয়ে আনা হল। জানা গেল, দুই হাইজ্যাকার যেটাকে বোমা আর বন্দুক বলে চালাচ্ছিল, তা আসলে (যথাক্রমে ) ক্রিকেট বল এবং খেলনা পিস্তল।

দুই হাইজ্যাকারের দাবি তখন মানা হয়নি। কিন্তু এই দুজন ব্যক্তি পরবর্তী জীবনে কংগ্রেস থেকে ভোটে লড়েছে। জিতেছে। উচ্চপদে বসেওছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, প্লেন হাইজ্যাক করে অন্য কেউ চিরদিনের জন্য ভারত- বিরোধীর তকমা পেয়েছে, আর এরা জনপ্রতিনিধি হল কী করে? সেই হাইজ্যাকিং- এর কথাও তুলব। পরে কোথাও।

.

এরপর ঘটনার ঘনঘটা দেখল দিল্লির মাটি। রাজনীতি, দলবাজি, অন্তর্ঘাত, ইগোর লড়াই এইসবকিছুতে জর্জরিত হয়ে ১৯৭৯ সালের ১৫ই জুলাই জনতা পাৰ্টি ভেঙে গেল। শ্রী মোরারজি দেশাই ইস্তফা দিলেন। ভাঙা দলের মাথা হলেন চরণ সিং। কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য তিনি কার কাছে সাহায্য চাইলেন বলুন তো? ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। ইন্দিরার বলে বলীয়ান হয়ে ২৮শে জুলাই চরণ সিং প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ নিলেন। ১৯শে আগস্ট ইন্দিরা গান্ধী সেই সমর্থন তুলে নিলেন। সরকার পড়ে গেল। স্বপ্ন ভেঙে গেল। জয়প্রকাশ নারায়ণের স্বপ্ন। লক্ষ কোটি ভারতবাসীর স্বপ্ন— সিংহাসন খালি করো কি জনতা আতি হ্যাঁয়!

.

জয়প্রকাশ নারায়ণের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হলেও ভারতের বুকে কংগ্রেস দলের বিরুদ্ধে এই প্রথম কোনো শক্তির জন্ম হয়েছিল। ভারতবাসী বুঝে নিল এবং বুঝিয়ে দিল যে কংগ্রেসকেও হারানো সম্ভব। জনতা পার্টি তছনছ হয়ে গেছে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী আবার জনসংযোগে ব্যস্ত হয়েছেন। বিহারে দলিত হত্যার ঘটনায় মুখর হয়ে সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন। বন্যার জলও তাঁকে আটকাতে পারেনি। কাদাভূমি পার হয়েছেন হাতির পিঠে চড়ে। হাতির হাওদায় দাপাদাপি করা শ্রীমতি গান্ধীকে ভারতবাসী আবার ফিরিয়ে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর আসন।

তবে এই শক্তির পরিবর্তনের মধ্যেই কংগ্রেস বিরোধী একটি ধারা থেকে উদ্ভব হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টির। ‘পদ্ম’ তাদের প্রতীকচিহ্ন। ইংরেজিতে বলে ‘লোটাস’। হিন্দিতে ‘কমল’। এমন এক ফুল, যা পাঁকে ফোটে, কাদায় মেলে। গণতন্ত্রের আসরে সত্তায় আসীন শক্তিমান যখন স্বীয় শক্তির অপব্যবহার করে, তখন গণতন্ত্রে ভূমিতে পাঁক জন্মায়, আর তাতেই ফোটে পদ্মফুল।

হিন্দু (কোন ধর্মগ্রন্থে অবশ্য হিন্দুদের হিন্দু বলা আছে জানি না, সনাতন ধর্ম লিখলে সবথেকে বেশি ভালো হয়) পরম্পরা অনুসারে, পদ্মফুলের গল্পটা আরম্ভ হয়েছে সৃষ্টিরও আগে থেকে। পদ্ম আদি। পদ্ম অনাদি। এই পদ্মই শ্রী অনন্ত বিষ্ণুর নাভি থেকে জন্ম নিয়েছে, আবার এই পদ্মের ওপরেই উৎপত্তি হয়েছে ব্রহ্মার। রাজস্থানের পুষ্করে ব্রহ্মাজির মন্দির আছে। বলা হয়, সেখানে সরোবরে ফোটা কমলের ফুলে ব্রহ্মা বাস করেন।

বন্ধুরা হয়তো ভাবছেন যে এ আবার সুযোগ পেয়ে পুরাণের গল্পের ফুঁপি খুলে বসেছে। জ্ঞান দিচ্ছে। না রে, ভাই! আমি পুরাণের পদ্মের কাহিনি শোনাব না। এই পদ্ম আটের দশকের ভারতে ফোটা। ভারী অদ্ভুত এক সময়, যখন এক কমল ভারতে রাজত্ব করেছে, আরেক কমলের জন্মও হয়েছে। পাশাপাশি। আর এই দুই ‘কমল’ মিলে স্থির করেছে ভারতের ভবিষ্যতের রাজনীতির পথ।

একটি পদ্মের চালচিত্র আপনাদের চোখের সামনে রয়েছে। আজ এই টোয়েন্টি-টোয়েন্টির যুগে দাঁড়িয়ে আপনারা সেই ফুলের দলের সরকার দেখছেন। টানা দ্বিতীয়বার সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার। ১৯৮০ সালে যখন ভারতীয় জনতা পার্টির স্থাপনা হল, যখন পদ্মকেই তাঁদের প্রতীক রূপে বেছে নেওয়া হল, তখন কেউ ভাবেননি যে একটা সময়ে এই দলটিই বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হবে।

আটের দশকে এই পদ্মফুলের দলের পাশাপাশি আরেক পদ্মের উদয় হচ্ছিল, যা অবশ্য রাজনীতিতে একটি কাকতালীয় ব্যাপার মাত্র। পদ্মের কত নাম! তাঁর নামের মানেও পদ্ম হওয়া একটি অদ্ভুত সংযোগ। আসুন ভাই, একটু পেছনে ফিরে তাকাই। ১৯৪৪ সালের কথা। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রথম পুত্রের জন্ম হল। নাম রাখা হল— রাহুল। তখন পণ্ডিত নেহরু আহমেদনগরের জেলে। কমলা নেহরুর নামের সাথে মিলিয়ে এমন কোনো নাম রাখা হোক, যার মানে দাঁড়াবে কমল বা পদ্ম। তখন পদ্মের অনেক নামের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হল ‘রাজীব’। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক স্যাটায়ারিস্টের দল হয়তো বলবেন, পণ্ডিত নেহরুর দূরদর্শিতা ছিল, নইলে কি আর রাহুল নামটা পালটে রাজীব রাখেন? তবে যাই হোক, রাহুল নাম এই বংশে আবার ফিরে এসেছে। অবশ্য সেই রাহুল আজ পর্যন্ত রাজনেতা রাজীবকে স্পর্শ করতে পারেননি। শেক্সপিয়ার সাহেব বলে গেছেন, নামে কী আসে যায়? কিন্তু কিছু-না-কিছু তো হয় বটেই, নইলে কি আর লোকে নাম রাখত?

স্থান-কাল-পাত্র ইত্যাদির ভেদে নামের গূঢ় অর্থ বদলে যায়। যেমন ধরুন যা ভারত, তা-ই ইন্ডিয়া নয়। যেমন ধরুন যা আম আদমি, তা ম্যাঙ্গো পিপল নয়। যেমন ধরুন, যা লোটাস, তা পদ্মফুল নয়। আর যেমন রাহুল মানে রাজীব নয়। কিছু পার্থক্য, কিছু রহস্য তো আছেই। নিশ্চিত আছে।

এবার সেই গল্পের দিকেই এগোব। আস্তে-আস্তে। যেভাবে পদ্ম ফোটে। পাঁকে। আসুন, রাজনীতির পাঁকে নামি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%