সেই ফুলের দল – ২

অভীক মুখোপাধ্যায়

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক আসলে এক অদ্ভুত জাগরণের দশক। হিন্দুত্বের নবজাগরণ ঘটছিল। ভারতীয় মুসলমানেরা ঐসলামিক ভূমির সন্ধান করছিলেন। ইসলামের নামে মুসলিম লীগ ভোট পাচ্ছিল। একত্রীকরণ হচ্ছিল ভোটের। কিন্তু হিন্দু মহাসভা একত্রিত হিন্দু ভোট পাচ্ছিল না। সেই জনমতে ভাগ বসাচ্ছিল কংগ্রেস। নির্বাচনী গণতন্ত্রে আসলে হিন্দুত্বের মডেল খাপ খাচ্ছিল না। সম্ভবত হিন্দু ধর্ম বাদে অন্য কোনও ধর্মে সেকুলারিজমের অস্তিত্ব নেই, সেকুলারিজমের প্রতি সহনশীলতাও নেই। অপরদিকে ইসলামে একজন অ-মুসলিমকে প্রতিনিধিত্ব করতে দেওয়ার অবকাশ রাখা হয়নি। এবং ইসলামে ইসলামিক স্টেটের ধারণা ও খুব সুস্পষ্ট। মুসলিম লীগ ইসলামের এই বিন্দুগুলোকেই জনমত সংগ্রহের ক্ষেত্রে কাজে লাগাচ্ছিল।

শ্রী সাভারকর বুঝেছিলেন যে হিন্দুত্বের গ্রাফটাকে ঊর্দ্ধমুখী করতে না- পারলে আগামীদিনে রাজনৈতিক হিন্দুর অস্তিত্ব সঙ্কট ঘটবে। সূচক সত্যিই উঠছিল, খুব ধীরে ধীরে হলেও উঠছিল। ওইসময়ে শ্রী সাভারকরের হিন্দুত্ব কৈশোর থেকে যৌবনে পা রাখছিল। প্রায় একইসঙ্গে যুবক হয়ে উঠছিলেন দুই কিশোর— অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আডবানি। ওহ, এঁদের জন্মপরিচয় তো দেওয়াই হয়নি। দু-চারটে কথা যে না বললেই নয়। আমরা চলে যাব সোজা গ্বালিয়র-এ। মধ্যপ্রদেশের  গ্বালিয়র। তবে তখন অবশ্য মধ্যপ্রদেশ না বলে ‘সেন্ট্রাল প্রভিন্সেস অ্যান্ড বেরার’ বলা হতো।

গ্বালিয়র। সেখানকার আকাশছোঁয়া দুর্গ রাজপরিবারের পরিচয় বহন করে। সিন্ধিয়া রাজবংশের অধীনে  গ্বালিয়র সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশরা যে পাঁচটি রাজ্যকে ‘ইক্কিশ তোপ কি সলামি’র জন্য গণ্য করত, তাদের মধ্যে একটি ছিল সিন্ধিয়াদের খালিয়র। গ্বালিয়র, সিন্ধিয়া রাজা ইত্যাদি শব্দগুলো কিন্তু শুধুমাত্র অলঙ্কার হিসেবে বলার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে না। এই কাহিনী যত এগোবে, ততই খুলবে মরাঠা মাহাত্ম্য। সেই সময়ের  গ্বালিয়র মানে ৬৫,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার রাজত্ব। সেখানে তখন লাখ-লাখ মানুষের বসবাস। মোগল আমলের ধ্বংসাবশেষের বুক কুঁদে মরাঠারা বের করে এনেছে নতুন জীবন। অষ্টাদশ শতকে মরাঠা সেনাপতি রাণোজি সিন্ধিয়ার হাতে আসে শ্বালিয়র। উত্থান- পতনের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় একদা সিন্ধিয়াদের রাজা ব্রিটিশদের পক্ষ নেন। একটা হিন্দি কবিতাই আছে, ‘অংরেজোঁ কে মিত্র সিন্ধিয়া নে, ছোড়ি রাজধানী থি… খুব লড়ি মর্দানি উয়ো তো ঝাঁসি ওয়ালি রানি থি…’। কবিতাটা ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পৃষ্ঠভূমিতে লেখা হয়েছিল। শিক্ষায়-দীক্ষায় উন্নত সিন্ধিয়া রাজারা শিল্পে উৎসাহ দিয়েছেন, পথ তৈরি করেছেন, সেচের খাল কাটিয়েছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। নিয়মকানুন মেনে যদি বলি তবে খালিয়রের শেষ মহারাজা ছিলেন জীবাজিরাও রাও। তাঁর স্ত্রী বিজয়ারাজে সিন্ধিয়া। বিজয়ারাজে সারা ভারত জুড়েই রাজমাতা নামে অধিক পরিচিত। তিনি আমাদের লেখার অনেকটা জুড়ে থাকবেন। আপাতত আমরা  গ্বালিয়রের রাজপরিবারের কথা ছেড়ে ইউনাইটেড প্রভিন্সের বটেশ্বর থেকে আগত বাজপেয়ী পরিবারটির দিকে মনোনিবেশ করব।

১৯২৪ সালের ২৫শে ডিসেম্বর। গ্বালিয়রের কৃষ্ণাদেবী আর কৃষ্ণবিহারী বাজপেয়ীর ঘরে অটলবিহারীর জন্ম হল। বাজপেয়ী পরিবার— কান্যকুব্জ্য বাউন। গাঙ্গেয় অববাহিকার জলহাওয়াতে অভ্যস্ত। অটলবিহারীর ঠাকুরদামশাই শ্যামলাল বাজপেয়ী বটেশ্বর থেকে  গ্বালিয়রে গিয়েছিলেন। সিন্ধিয়া রাজাদের প্রিন্সলি স্টেটের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মানো এই ছেলে যে একসময় মহারাজাদের থেকেও বড় কীর্তিমান হবে সে কথা কি তখন কেউ জানত? যাক, সেসব পরের কথা। আমরা অটলবিহারীকে ছোট থেকে বড় হতে দেখব। অটল বিহারির সামনে দুটো বিকল্প ছিল। ঠেট উত্তরপ্রদেশীয় বোলচাল নাকি মরাঠা-রাজার সংস্কৃতি, কোনটা যে বাজপেয়ীরা আপন করে নেবেন তা ছিল লাখ টাকার প্রশ্ন। আর সম্ভবত এই মিশ্র সংস্কৃতিই অটলবিহারীর মধ্যে এক ভারতবর্ষের জন্ম দিল। আর জন্মদিনটাও কি সমাপতনের দেখুন। হিন্দুত্বের প্রতিভূ হয়ে ওঠা মানুষটার জন্মদিনেই ক্রিসমাস ক্যারল শোনা যায়, চার্চের বেল বাজে। যেন নিয়তি তাঁকে জন্ম থেকেই ফিবছর মনে করিয়ে দিত, তোমায় ভারতাত্মার আধ্যাত্মিক সহাবস্থানের কথা ভুললে চলবে না। ভুললে চলবে না যে সকল ভারতবাসী তোমার ভাই।

কৃষ্ণবিহারী বাজপেয়ীর সংসারে অন্যান্য ছয় ভাইবোনের সঙ্গে বড় হচ্ছিলেন অটল। শিন্ডে কি ছাবনি এলাকায় কমল সিং কা বাগ-এর কাছে সংকীর্ণ গলির মধ্যে একটা ছোট দ্বিতল ভবন।  গ্বালিয়রের মহারাজের আনুকূল্যে স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করছিল কিশোর অটলবিহারী। বাবা-ই স্কুলের হেডমাস্টার। পড়ার মাধ্যম ছিল হিন্দি। এমনিতে যিনি যে স্কুলের শিক্ষক, সেই স্কুলে তাঁর ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করলে ব্যাপারটা পিতা / মাতা এবং সন্তান উভয়ের ক্ষেত্রেই বেশ চাপের হয়ে দাঁড়ায়। অটলবিহারীর ক্ষেত্রে কিন্তু তা ঘটেনি। ঠাকুরদা শ্যামলাল সংস্কৃতের বিশারদ ছিলেন। নিয়মিত নাতি-নাতনিদের তুলসিদাসের রামচরিত মানস থেকে প্রশ্ন ধরতেন। আগেই লিখলাম যে, বাজপেয়ী পরিবারের আদি বাড়ি বটেশ্বরে ছিল। বটেশ্বরকে বলা হয় ‘ব্রজ কি কাশী’। যমুনা তীরের বটেশ্বর নাথ শিবের নাম অনুসরণে গ্রামের এই নাম হয়েছে। বলা হয়, যখন শিব ঠাকুর কৈলাসে থাকেন না, তখন তিনি বটেশ্বরে এসে বটবৃক্ষের নীচে বসে সাধনা করেন। এখানে নদীর ধারে সার দিয়ে ১০১টি মন্দির আছে। সন্ধ্যা হলেই আরতির আলো জ্বলে ওঠে ঘাটে, শঙ্খনাদে আবহ ভরে ওঠে।

অটলবিহারীর বাবা কবিতা লিখতেন। বেশ পরিচিতিও তৈরি হয়েছিল। অটল বাবাকে অনুকরণ করতেন, অনুসরণ করতেন। কৃষ্ণবিহারীর ভাষণ দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। কী হিন্দিতে, কী ইংরেজিতে, তিনি অনর্গল কথা বলতে পারতেন! পরবর্তীতে সেই গুণ পুত্র অটলবিহারীর মধ্যেও এসে যায়, ভারতবাসী সেই গুণের সাক্ষীও রয়েছে। অটলবিহারী নিজেও বলেছেন, ‘আমি যা সুযোগ পেয়েছি, আমার বাবা তাঁর সিকিভাগ সুযোগও পাননি। আমি তাঁর পকেট এডিশন মাত্ৰ।’

অটলবিহারীর মা কৃষ্ণাদেবী চাইতেন তাঁর ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে উঠুক। অন্যান্য ছেলেমেয়েরা তবু একরকমের ছিল, কিন্তু ছোট ছেলে ‘অটল্লা’কে নিয়ে তাঁর সবসময় চিন্তা হতো। দিনরাত গুলি খেলায় মেতে থাকতেন ছোট অটলবিহারী। নইলে চলে যেতেন নয়াবাজারের বাহাদুরা সুইটস-এ, সেখানে সেরা লাড্ডু মিলত

বাপ-পিতেমোর অন্ন জোগায় যজমানে। ঘরের আবহে সংস্কৃত স্তোত্র ভাসে। এহেন গেরস্থালি থেকে বেরিয়ে আসা যুবক অটলবিহারী ফটাফট ইংরেজি- বলা ছেলেপুলেদের দেখে মনে-মনে সমীহ করলেও বাইরে কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করতেন।

বাবা কৃষ্ণবিহারীর ব্রাহ্মণবুদ্ধি তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে একজন বাঁধাধরা অন্নদাতা চাই। ভালো কথায় পৃষ্ঠপোষক। তিনি সিন্ধিয়া-রাজার অধীনে শিক্ষক হয়ে গেলেন। চাইতেন ছেলে অটলবিহারী বড় হয়ে সরকারি চাকরি করুক। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। তাই হয়তো ছেলের বয়েস খাতায়-কলমে দুবছর কমিয়ে দিলেন। একটু বেশিদিন চাকরি করতে পারবে তাহলে। অদৃষ্ট তখন হেসেছিল নিশ্চয়ই। কে জানত যে এই ছেলে বড় হয়ে ভারতের হর্তাকর্তাবিধাতা হয়ে যাবে?

বিধাতা নিশ্চয়ই হেসেছিলেন। এবং অনেক ভেবেচিন্তে বছর তিনেক পরে অটলবিহারীর জন্যে এক জুড়িদারের জন্ম দিয়েছিলেন থালিয়রের ১১২৮ কিলোমিটার পশ্চিমে, করাচিতে। করাচি মানে সিন্ধ প্রভিন্স। সেখানে তখন ছড়ি ঘোরাচ্ছে লালমুখো সাহেবের দল। সেখানে একটা খিচুড়ি সংস্কৃতির উদার আবহে খেলে বেড়াচ্ছিল ছোট্ট লালকৃষ্ণ লালকৃষ্ণ আডবানি। হিন্দু মুসলিম শিখ ইসাই কত জাতি, কত ধৰ্ম। শুধু কি তা-ই? মুসলিমদেরই কত প্রভেদ? সিন্ধি মুসলমান, শিয়া সুন্নির ভেদাভেদ, পাঠান। পার্সিরাও ছিল। মূলগত দিক থেকে তৎকালীন করাচি এবং বোম্বেতে কোনও ফারাক ছিল না।

আডবানিরা আমিল সিন্ধি। হিন্দুই। ‘আমিল’ কথাটা এসেছে পার্সি থেকে মানে দাঁড়ায় ‘প্রশাসক’। আগে ওদিকে মুসলিম শাসকগণ নিজেদের কর আদায় করার জন্যে আমিল নিয়োগ করতেন। বংশানুক্রমিক পদ ছিল। কাজের ভিত্তিতেই আমিল সিন্ধি ব্যাপারটা দাঁড়ায়। বেশ ধনী পরিবারের সন্তান হওয়ায় লালকৃষ্ণ আদবানির ছোটবেলাটাও ছিল অন্যরকমের। করাচিতে তখন কারো বাড়িতে ভিক্টোরিয়া গাড়ি থাকাটা বেশ আভিজাত্যের বিষয় ছিল। আডবানি পরিবারের এমন একখানা গাড়ি ছিল তখন। বাবা কিষিণচন্দের ব্যবসা। ওদিকে ঠাকুরদা আবার সংস্কৃতে পণ্ডিত ছিলেন। পলাণ্ডুর খোসার মতোই মাল্টিলেয়ারড কালচার।

৬০-৭০ বছর পরের ভারত একটা রোল রিভার্সাল দেখবে। এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান আর এক ধনী সিন্ধির পুত্র বন্ধু হবে। গোঁড়ামির হাওয়াজল মেখে বড় হওয়া বাজপেয়ী হয়ে উঠবেন সমাজবাদী ধারার দক্ষিণপন্থী, আর উদারনৈতিক আডবানি পরিবারের ছেলে লালকৃষ্ণ হয়ে উঠবেন প্রখর হিন্দুত্বের পোস্টার বয়। খাঁটি দেশজ চরিত্রের অটলবিহারী আর অ্যাংলিসাইজড আডবানি একে অপরের স্থান অদলবদল করে নেবেন। কংগ্রেসের ছাতার তলায় না-এসেও দুই মহাচরিত্র তৈরি করবে এক মহাছত্র। ছত্রের ছায়ায় পদ্ম জন্ম নেবে।

ওদিকে সিন্ধি কিশোর লালকৃষ্ণর ওপরেও তাঁর বাবার ছায়া পড়ছিল। ব্যবসার কাজে মগ্ন মানুষটার সাদাসিদে জীবনযাপন স্থায়ী ছাপ ফেলে যাবে পুত্রের জীবনে। বহু দশক পরে যে স্থিতপ্রজ্ঞ, নীরব, নম্র লালকৃষ্ণ আডবানিকে ভারতবাসী দেখবে, সেই লালকৃষ্ণ আসলে তাঁর পিতা কিষিচন্দের মিনি সংস্করণ।

অটল বড় হচ্ছিলেন গ্রামীণ পরিবেশ আর মফঃস্বলের জলহাওয়াতে। বাবার ছায়ায় কবিতা তাঁর রক্তে প্রবেশ করছিল। অটলবিহারীর পিতা কৃষ্ণবিহারী খাড়িবোলি আর ব্রজভাষায় কবিতা লিখতেন। তাঁর লেখা একটি কবিতা ‘ঈশ্বর প্রার্থনা’ রাজ্যের বহু বিদ্যালয়েই গাওয়া হতো। পিতার সঙ্গে কিশোর অটলবিহারী নিয়মিত বিভিন্ন কবি সম্মেলনে যেতেন। তখন কবিতা মানে অশ্লীলতা কিংবা দ্ব্যর্থ ভাষায় মজার খোরাক ছিল না। ছন্দ, লালিত্য, অলঙ্কার সব মিলিয়ে একটা প্রবল সাহিত্য ছিল কাব্য। ছোটবেলায় অটল পিতার হাতের কড়ে আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে বিদ্যালয়ে যেতেন, মুখে কবিতা পাঠ করতেন। ভুল বললে কৃষ্ণবিহারী ছেলেকে থামিয়ে তাঁর ভুল শুধরে দিতেন। এভাবে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে একদিন অটলবিহারী ও কবিতা নামক সাহিত্যধারার তীরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। লিখে ফেললেন তাজমহল নিয়ে একটি কবিতা—

ইয়ে তাজ মহল, ইয়ে তাজ মহল,
যমুনা কি রোতি ধার বিকল,
কল কল, ছল ছল, জব রোয়া হিন্দুস্তান সকল;
তব বন পায়া তাজ মহল।
ইয়ে তাজ মহল, ইয়ে তাজ মহল।

অটলবিহারীর বিদ্যালয় জীবন কেটেছে  গ্বালিয়রের সরস্বতী শিশু মন্দিরে, উজ্জ্বয়নীর অ্যাংলো ভার্নাকুলার মিডল স্কুলে এবং  গ্বালিয়রের গোরখি মহাবিদ্যালয়ে। স্কুল রেকর্ড বলছে, তাঁর রোল ছিল ১০১। কৃষ্ণবিহারী অটলবিহারীর শিক্ষকদের বলে রেখেছিলেন, তাঁর ওপরে যেন কড়া দৃষ্টি রাখা হয়। ছেলের ওপরে অনেক আশা ছিল তাঁর। ভারতবাসী যে বাগ্মী অটলবিহারীকে চিনেছে, তার পিছনে একটা অদ্ভুত ঘটনা রয়েছে যা না বললেই নয়। একবার হল কি, একটি বিতর্ক সভায় বালক অটলবিহারী বলতে উঠলেন। বিষয় ছিল ‘ভারতে ব্রিটিশ কর্তৃক পাতা রেলওয়ে লাইনের উন্নয়ন’। দমভ’রে মুখস্থ করেছিলেন অটল। বলতে উঠে ভেবলে গেলেন। মুখে কথা সরে না। একটু একটু করে যা বললেন, তা শুনে উপস্থিত অন্যান্য ছাত্ররা হই দিতে শুরু করে দিল। লেজেগোবরে হয়ে সেদিন মাঝপথেই নিজের বক্তব্য থামিয়ে দিতে হয়েছিল কিশোর অটলকে। এবং সেদিন তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আর কখনও কোনও ভাষণ মুখস্থ করবেন না। যা মনে আসবে তা-ই বলবেন। এখন নিশ্চয়ই মনে হবে যে, সেদিন ওভাবে আটকে গিয়ে শাপে বরই হয়েছিল। তাঁর যখন তেরো বছর বয়েস, তখন তিনি আর্য সমাজের কিশোর দল ‘আর্য কুমার সভা’র সদস্য হলেন। প্রত্যেক সপ্তাহে সৎসঙ্গ হতো। তিনি যেতেন। ১৯৪৪ সালে সেখানকার জেনারেল সেক্রেটারিও হলেন। হয়তো নেতৃত্ব প্রদানের স্বাভাবিক ক্ষমতা তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আর্য সমাজের ছাপ তাঁর মনেও পড়ছিল। ধর্মীয় গোঁড়ামিকে প্রশ্ন করার একটা সহজাত ক্ষমতা জন্মাচ্ছিল তাঁর মধ্যে।

আডবানির বেড়ে ওঠার সময়ে আশপাশের হালহকিকত ছিল কসমোপলিটান। লালকৃষ্ণ সেইন্ট প্যাট্রিক্সে পড়তেন। ক্যাথলিক স্কুল। বিদ্যালয়ের আপ্তবাক্য ছিলঃ Per Aspera Ad Astra-পরিশ্রমের মাধ্যমে তারাদের স্পর্শ করতে হবে। সবদিক দিয়ে একেবারে কলোনিয়াল শিক্ষার ছাঁচে জমে উঠছিল লালকৃষ্ণর তরল মন। ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা এ ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থার ঘোর বিরোধ করেন। মেকলে সাহেবের প্রণীত আইনের দ্বারা এই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন হওয়ার পরে ভারতের প্রাচীন শিক্ষা পদ্ধতির সমূহ ক্ষতি হওয়ার কথা বলে তাঁরা বিলাপ করেন। মেকলে চেয়েছিলেন ভারতীয়দের মধ্যেই এমন একটা শ্রেণী জন্ম নেবে, যাদের দেহে ভারতীয় রক্ত থাকলেও শিরায়-ধমনীতে বইবে ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থা। যারা ব্রিটিশদের এই শিক্ষা পদ্ধতি মেনে পড়াশোনা করত, তাদের বলা হতো ‘মেকলেপুত্র’। এটা একধরণের অপশব্দের পর্যায়ে পড়ে। এখনও ভারতের গোবলয়ে এর ব্যবহার করা হয়। ভারী মজার কথা হল একটা সময়ে এমনই এক তথাকথিত মেকলেপুত্র রাজনৈতিক হিন্দুত্বের পোস্টার বয় হয়ে দাঁড়াবেন। তিনি নেতা হবেন। নায়ক হবেন। প্রতিনায়ক হবেন। একদা মন্ত্রীও হবেন। স্কুলের স্মৃতি, সিন্ধের স্মৃতি তাঁকে হাতছানি দেবে বারে বারে। একবার পাকিস্তানের এক রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে মিটিং করতে বসে স্মৃতিচারণায় আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়বেন আডবানি। চোখে জল এসে যাবে স্কুলের প্রেয়ারের কথা বলতে-বলতে ‘For he’s a jolly good fellow’। তবে তাঁর আবেগ সম্মান পাবে না। কারণ যার কাছে তিনি স্মৃতিচারণা করছেন, সেই ব্যক্তি কোনও ভারতীয়র আবেগের সম্মান রাখেননি। তিনি আপাদমস্তক যুদ্ধবাজ। ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধ লড়েছেন। আর রত থেকেছেন নিরবিচ্ছিন্ন ষড়যন্ত্রে। তিনি পারভেজ মুশারফ। তিনি আগুন দিয়ে সীমান্ত আঁকতে পছন্দ করতেন।

আডবানি যখন মেকলিজমের রঙে রঙিন হয়ে উঠছিলেন, তখন অটল কলেজে প্রবেশ করছেন। ১৯৪১ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজে ভরতি হলেন অটলবিহারী। সতেরো বছরের দুর্দান্ত তরুণ ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে কবিতা লিখতেন, আর তাঁর মন বাঁধা পড়ে থাকত সামনের সারির তরুণীর শাড়ির আঁচলে। সুবেশা, সুন্দরী এক রাজকুমারীর হৃদয়মন্দিরের রাজপুত্তুর হওয়ার রাঙা স্বপ্ন দেখতেন অটলবিহারী।

শুধু উপমা দিয়ে গালভরা একটা শব্দ ‘রাজকুমারী’ ব্যবহার করলাম এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। ওই সুন্দরী তরুণীর ডাকনাম ছিল বিবি, আর ভালোনাম ছিল রাজকুমারী। রাজকুমারী হাকসর। হাকসর, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের গ্রামনামজনিত পদবী। হাকসরদের সঙ্গে বাঙালি কায়স্থদের একটা মিল পাওয়া যায়। এঁরা সভাসদ, আমলা রূপে বিরাট প্রভাবশালী হন। মোগল আমলে ফার্সি এবং ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি বলতে পারার অসামান্য দক্ষতার জন্যে ভারতীয় আফসারান বা আমলা রূপে হাকসরদের নিযুক্তির একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস মেলে।  গ্বালিয়রের রাজার প্রশাসনিক কাজকম্মে হাকসরদের বিরাট ভূমিকা ছিল। অটলবিহারীর বাবা শিক্ষক ছিলেন, আর রাজকুমারীর বাবা ছিলেন শিক্ষা দফতরের প্রশাসক। আমরা এই সূত্রে একবার স্মরণ করে নেব আরেক কাশ্মীর-কন্যাকে, ইন্দিরা গান্ধীকে। ইন্দিরার মা কমলা কৌলদের পরিবারের সঙ্গে রাজকুমারীদের পরিবারের লতায়পাতায় একটা আত্মীয়তার সুতো পাওয়া যায়।

সেই সময়ে রাজকুমারী আর অটলবিহারীর মধ্যে প্রেম কতখানি গাঢ় হয়েছিল তা বলা মুশকিল। রাজকুমারীর নিজের মন্তব্য ছিল, ‘আমাদের একে অপরকে ভালো লাগত। তবে ওটাকে প্রেম বলা চলে না। আমি জানতাম যে, আমাদের পরিবার থেকে আমাদের সম্পর্ককে মেনে নেবে না, তাই আমিই আর এগোইনি। তবে যা কিছু ছিল, তা একেবারে নিখাদ নির্মল।’ এটা রাজকুমারী হাকসরের বক্তব্য, কিন্তু একটু সামাজিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই একই বক্তব্যের বিশ্লেষণ করলে কিছু কথা মেলে। অটলবিহারীরা রাজকুমারীদের মতোই ব্রাহ্মণ ছিলেন, কিন্তু কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ ছিলেন না। কাশ্মীরি পণ্ডিতরা নিজেদের কূলগোত্রের ক্ষেত্রে ভয়ানক রক্ষণশীল। রাজকুমারীদের অর্থনৈতিক অবস্থার সামনে অটলবিহারীরা নিতান্ত নগণ্য ছিলেন। কী ছিল তরুণ অটলবিহারীর পকেটে? কিছু কবিতা মাত্র। কবিতা লিখিয়ে বা পড়িয়ে প্রেম হতে পারে, সংসার চলতে পারে না। একজন স্বামী হিসেবে নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ কি দিতে পারতেন অটলবিহারী? কালের গর্ভে অবশ্য এসব প্রশ্ন একটা সময়ে তলিয়ে যাবে। সেদিন কি রাজকুমারী কিংবা তাঁর পরিবার ভাবতে পেরেছিলেন যে কবিতা লিখতে বসা ওই হাত একদিন প্রধানমন্ত্রীর হাত হয়ে দাঁড়াবে? স্বয়ং অটলবিহারীই কি ভেবেছিলেন? রাজকুমারীর প্রতি অটলবিহারীর প্রেম পোস্টকার্ড পিকচার হয়েই রয়ে গিয়েছিল, ফটোফ্রেম হয়ে উঠতে পারেনি।

.

অটলবিহারীর জীবনে প্রেম সফল হয়নি, তবে বিধাতা তাঁর জন্যে অন্য কিছু লিখছিলেন। ভারতভাগ্যের ললাটলিপিতেও তখন একটু অন্য ধরণের কিছু লেখার কাজ চলছিল। ১৯৩৯ সালে ব্রিটেন বলল, নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা হবে। ভারত যেহেতু ব্রিটিশ কলোনি ছিল, সেহেতু ভারতীয় ব্রিটিশ বাহিনীর সেনাদের সেই যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা শুরু হল। এই বাহিনী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছিল। সম্ভবত বিশ্বের বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী সঙ্গে নিয়ে লড়ছিল ব্রিটিশরা। গান্ধীজি জার্মান ফ্যাসিস্টদের বিরোধ করছিলেন, কিন্তু যেহেতু ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কাছে ভারতীয় সৈন্যদের দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ব্যবহার করা নিয়ে কোনও অনুমতি নেয়নি, তাই তিনি রুষ্ট হচ্ছিলেন। রুষ্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছুও ছিল না। ১৯৩৭ সালে যে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল, সেখানে কংগ্রেস ভালো ফল করে, বেশ কয়েকটি রাজ্যে কংগ্রেস সরকার গঠন করেছিল। এবার ব্রিটিশ স্বেচ্ছাচারিতার বিরোধিতা করে কংগ্রেসের সদস্যরা সেই সমস্ত প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগ করলেন। গান্ধীজি বললেন, ভারতীয় সৈন্যরা যুদ্ধে যাবে, কিন্তু তার আগে সরকারকে আশ্বাস দিতে হবে যে এই সহযোগিতার পরিবর্তে যুদ্ধের পরে ব্রিটিশরা ভারতকে স্বাধীন করে দেবে। সরকার এধরণের আশ্বাস দিতে রাজী হল না। গান্ধীজি বললেন, ‘ভারত ছোড়ো!’ সাল ছিল ১৯৪২।

কংগ্রেসের এসব পদক্ষেপ দেখে ব্রিটিশ বাহাদুর কংগ্রেসিদের গ্রেফতার করতে শুরু করল। মুসলিম লীগ কিন্তু সরকারের বিরোধ করেনি। এবং বিরোধ করেনি শ্রী সাভারকরের হিন্দু মহাসভাও। রাজনীতির এই এক মজা; কে, কখন, কাকে সমর্থন করে বসে তার হিসেব শুধু ইতিহাসের কাছেই থাকে।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের দাপটে আসমুদ্রহিমাচল তখন উত্তাল। অটলবিহারী গিয়েছেন বটেশ্বরে। সেখানে তাঁদের বাপ-পিতেমোর ভিটে। একদিন ভাইকে নিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে তিনি হাটে গিয়ে দেখলেন লোকনৃত্য হচ্ছে। চোখ টানল। থমকে গেলেন দেখার জন্যে। হঠাৎ কোথা থেকে তিনজন যুবক এসে হইচই করে নাচ থামিয়ে দিল। তারা বলতে শুরু করল, ৯ই আগস্ট বোম্বেতে গান্ধীজি ভারত ছাড়ো’র ডাক দিয়েছেন। সকলকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়তে হবে। উত্তেজক ভাষণ শুনতে-শুনতে আচমকাই উপস্থিত জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তারা দুটো ফরেস্ট আউটপোস্ট ভাঙচুর করে। পুলিশ আসে। সকলকে ধরে নিয়ে যায়। ধৃত ব্যক্তিদের মধ্যে অটলবিহারী এবং তাঁর ভাই প্রেম বাজপেয়ীও ছিলেন। পরে একটি উর্দু মুচলেকাতে সাক্ষর করিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তাতে লেখা ছিল যে, তাঁরা কোনও প্রকার সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করেননি বা নষ্ট করতে কাউকে সাহায্যও করেননি।

এই একটি মুচলেকা অটলবিহারীকে আজীবন তাড়া করে বেড়াবে। তাঁর মৃত্যুর পরেও প্রতিপক্ষ তাঁর দিকে আঙুল তুলে বলবে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হল অটলবিহারী বাজপেয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামী হলেন কবে? তিনি নিজে তো একথা কখনও বলেননি। তবুও তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা হয় আবার প্রশ্নকারীরাই তার উত্তর দিতে থাকে। দলাদলির রাজনীতিতে একজন ব্যক্তি কত প্রকাণ্ড ছায়াময় হয়ে উঠতে পারলে তাঁর চরিত্রহননের এমন চেষ্টা করা হতে পারে সেটাও ভাবার বিষয়। অবশ্য অটলবিহারীর অটলবিহারী হয়ে ওঠার জন্যে লেগেছিল যোগ্য সঙ্গত। সেই জুড়িদার তখন অলক্ষ্যে বড় হচ্ছিল। আর বড় হয়ে উঠছিল ডক্টরজির স্বপ্নের সঙ্ঘ, যেখানে এই দুই মহাচরিত্রের সাক্ষাৎ ঘটতে চলেছিল।

১৯৩০-১৯৪০। এই সময়ে সঙ্ঘ বিস্তার লাভ করছিল অ-মরাঠিভাষী অঞ্চলগুলোতেও। স্বয়ংসেবকের সংখ্যা তখন প্রায় ৬০,০০০। সঙ্ঘের কাজে নারায়ণরাও তারতে  গ্বালিয়রে গেলেন। সেখানেই তরুণ অটলবিহারী বাজপেয়ীকে দেখে তাঁর মনে ধরে যায়। বাজপেয়ী সঙ্ঘের সঙ্গে জুড়ে গেলেন। নিজের বাপ- ঠাকুরদার বটেশ্বরের বসতবাড়িতে, মানে ইউনাইটেড প্রভিন্সে থাকলে তিনি অত অল্প বয়েসে সঙ্ঘের সাথে যুক্ত হতেন বলে মনে হয় না। গ্বালিয়রের মরাঠা রাজত্ব, হিন্দু রাজা এইসবই সঙ্ঘের বিস্তারের জন্যে উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলেছিল বলেই বাজপেয়ী সঙ্ঘ পর্যন্ত কিংবা সঙ্ঘ বাজপেয়ী অবধি পৌঁছে গিয়েছিল।

অটল একা সঙ্ঘে যাননি। সঙ্গে ভাইকেও নিয়ে গিয়েছিলেন। গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হিসেবে কিছু ব্রাহ্মণ্য শুচিবাই ছিলই। অটলবিহারী গায়ে যজ্ঞোপবীত নিয়ে সঙ্ঘে প্রবেশ করলেও সেখানে সামাজিক সাম্যবাদ দেখে তিনি দারুণভাবে প্রভাবিত হন। সেদিনই পৈতে ত্যাগ করেন। অটলবিহারীর ভাই প্রাথমিকভাবে স্বপাক রন্ধন করে খেতে শুরু করলেও মাত্র একদিনের মধ্যেই সেসব বিধিনিষেধ ছেড়েছুড়ে তিনি সবার জন্যে রাঁধা খাবার একই পঙক্তিতে খেতে শুরু করলেন।

সঙ্ঘ সাংস্কৃতিক হিন্দুদের এক করছিল। এখন প্রশ্ন হল আদৌ করতে পারছিল কি? সময় ছাড়া এর সঠিক উত্তর কে দেবে? তবে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্ঘ শাখা থেকে অনেক দূরে সিন্ধ প্রদেশে বসে থাকা এক কিশোরকে সঙ্ঘ একদিন হঠাৎ করেই এক সুতোয় গেঁথে ফেলল। কিশোরের নাম আগেও বলেছি— লালকৃষ্ণ আডবানি। সে তখন সবে স্কুলের পাঠ শেষ করেছে। ১৯৪২ সালে দাঁড়িয়ে তার বয়েস চোদ্দ বছর। আডবানি তখন হায়দ্রাবাদে ছুটি কাটাচ্ছে। এই হায়দ্রাবাদ কিন্তু ভারতের দক্ষিণের হায়দ্রাবাদ নয়, এ হল পশ্চিমের সিন্ধ প্রদেশের হায়দ্রাবাদ। একদিন বন্ধুর সঙ্গে টেনিস খেলছে এমন সময় বন্ধুটি বলে উঠল, ‘লালকৃষ্ণ, আমি চললুম।’ লালকৃষ্ণ বিরক্ত হল, ‘চললুম মানে? খেলার মাঝে, এভাবে?’ ‘ভাই, কদিন হল আরএসএস করছি। শাখায় যেতে দেরি হলে চলবে না। ওরা সময়ের ব্যাপারে খুব কড়া।’ এই কথোপকথন আডবানিকে দারুণ ভাবে প্রভাবিত করে। কী এমন জায়গা যেখানে খেলা ছেড়ে যেতে হবে? কিছুদিনের মধ্যেই আডবানি আরএসএস-এ যোগদান করলেন। টেনিস খেলার মাধ্যমে আরএসএস-এ যোগ দেওয়ার ঘটনাটা সত্যিই অদ্ভুত। আরও একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটাবে এই টেনিস। এর প্রায় বছর পাঁচেক পরে উত্তর ভারতের হিন্দু হার্টল্যান্ডে এমনই টেনিস খেলার মধ্যে দিয়ে পরিচয় ঘটবে এক মহন্ত এবং এক আই সি এস আধিকারিকের। জন্মসূত্রে বিহারী মহন্ত দিগ্বিজয় নাথ আর দক্ষিণী এক নায়ার সাহেবের সেই আলাপ একদিন শ্রীরামজন্মভূমিতে প্রতিষ্ঠা করে দেবে রামলাল্লাকে। সেই রামলাল্লাই হয়ে উঠবেন প্রৌঢ় বয়সের আডবানিজির ‘রামলাল্লা বিরাজমান’। আডবানির হুঙ্কারে অযোধ্যা কম্পিত হবে, ‘রামলাল্লা হম আয়েঙ্গে, মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে!’

যাক গে, সে যা হবার পরে হবে। ওগুলোকেও সময়ের হাতেই ছেড়ে দিয়ে এগোই। বাজপেয়ী হিন্দিতে চোস্ত, মরাঠি জানতেন। আডবানি ইংরেজি আর সিন্ধির বাইরে কিচ্ছু বলতে পারতেন না। তাঁর হিন্দি পড়া, লেখা, কথা বলা শুরু হয় ১৯৪৭ সালের পর থেকে। তবে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইচ্ছে আডবানিকে সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত রাখছিল। কঠোর নিয়মানুবর্তীতা মেনে চলতেন তিনি। অন্যদিকে সঙ্ঘের শাখার ক্ষেত্রে বাজপেয়ী ভয়ানক ঢিলেঢালা গোছের। কিন্তু বাজপেয়ীর হিন্দিতে অসামান্য দক্ষতা তাঁর সব দোষ ঢেকে দিত।

সঙ্ঘের ইউনিট হল শাখা। শাখার মডেল হল আখড়া। সমস্ত কসরতে পুষ্ট করে তোলা হয় দেহকে। মস্তিষ্কের বিকাশের জন্যে চলে বিদ্যার মন্থন, যা মূলত ইতিহাসকে ঘিরে থাকে। আসছি সে কথায়। সঙ্ঘের সদস্যদের বলা হয় স্বয়ংসেবক। প্রত্যেকেই পুরুষ। স্কুলছাত্র থেকে আরম্ভ করে গৃহী মানুষ যে কেউ সঙ্ঘের স্বয়ংসেবক হতে পারেন। একটি শাখায় ৫০-১০০ স্বয়ংসেবক থাকতে পারে। সাদা শার্ট, খাকি হাফপ্যান্ট, আর মাথায় কালো টুপি এই হল সঙ্ঘের ড্রেসকোড। হাতে লাঠি নিয়ে দেহানুশীলন চলে। কবাডি খেলা হয় টিম গেম শেখানোর জন্যে।

এ তো গেল পেশির সঞ্চালনের কসরত। এবার মস্তিষ্কের সঞ্চালনার দিকটা দেখে নেওয়া যাক। সঙ্ঘ আসলে ভারতের ইতিহাস নিয়ে নিজস্ব একটা দৃষ্টিকোণ রাখে। যেটাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করতে পারেন না তাবড় তাবড় ইতিহাসবিদেরাও। এবং ইতিহাসের সেই নিজস্ব ন্যারেটিভ দিয়েই দেশব্যাপী বিভিন্ন শাখায় সঙ্ঘ নিজের স্বয়ংসেবকদের জোড়ে। যেভাবে একে অন্যের থেকে হাজার কিলোমিটার দূরবর্তী শাখায় বসেও অটলবিহারী আর আডবানি পরস্পরের সঙ্গে জুড়ছিলেন। তাঁরা উভয়েই এক নতুন এবং বলা ভালো হিন্দু-ইতিহাসের সম্মুখীন হচ্ছিলেন তখন। সেই ইতিহাস চিৎকার করে বলছিল, ভারতবর্ষ বিদেশিদের আক্রমণের জন্যে হারেনি, হেরেছে হিন্দু একতার অভাবের জন্যে। রাজা শিবাজীর অস্মিতা নিয়ে বলা হতো, মরাঠা সাম্রাজ্যের পতনের কারণ বলা হতো, আহমেদ শাহ আবদালির গল্প শোনানো হতো, ১৭৬১ সালের পানিপতের তৃতীয় যুদ্ধ নিয়ে বলা হতো। বলা হতো, এই যুদ্ধে না-হারলে ভারতের বুকে মরাঠা সাম্রাজ্য কায়েম হতো। মরাঠারা যদি জাঠ আর রাজপুতদের সাহায্য ঠিকভাবে পেত তবে এক অন্য ভারতকে দেখা যেত।

ইতিহাসের এই ন্যারেটিভ উদারচিত্ত নিয়ে বড় হতে থাকা আডবানির মনকে শঙ্কাকুল করে তোলে। মুসলিম আক্রমণকারীদের নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন উঠতে থাকে। সঙ্ঘে যাওয়া আসা শুরুর পরপরই তিনি রাজস্থানে ঘুরতে গিয়েছিলেন। চিতোরের দুর্গেও যান। সেখানে হাজার-হাজার হিন্দু দেবদেবীর মাথাকাটা মূর্তি দেখে আডবানির কিশোর হৃদয় ব্যথায় ভরে ওঠে। তিনি ইতিহাসের মধ্যে ডুবে যেতে থাকেন। পড়তেই থাকেন। শিবাজী মহারাজকে নিয়ে পাঁচখানা বই শেষ করে ফেলেন একটানা পড়ে। এরপর তিনি পড়তে শুরু করলেন কানহাইয়ালাল মানিকলাল মুন্সির লেখা ‘জয় সোমনাথ’। সোমনাথ মন্দিরে গজনীর মামুদের আক্রমণের কথা পড়তে-পড়তে বিভোর হয়ে গেলেন আডবানি। ছত্রে ছত্রে লেখা ছিল হিন্দু অনৈক্যর কাহিনি। এই বই তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করে ফেলে যে পরবর্তীকালে যখন তিনি রামরথযাত্রায় বেরোলেন, তখন তাঁর যাত্রা আরম্ভ হয়েছিল গুজরাটের সোমনাথ থেকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%