ষষ্ঠ অধ্যায় – বাংলা খাবার

ষষ্ঠ অধ্যায় – বাংলা খাবার

মোগল পূর্ব আমলে ঢাকা ছিল তাঁতি প্রধান শহর। ঢাকার মুসলিম তাঁতি বা জোলাদের খাদ্য অভ্যাস ছিল ভাত। যা শুধু খাওয়ার জন্যই নয়। তাদের তৈরি কাপড়ে মাড় দেওয়ার জন্য ব্যবহার হতো। হিন্দু তাঁতিদের বড় অংশ ছিল বৈষ্ণব ভক্ত। বৈষ্ণ মতে ডাল ভাত ছিল তাদের প্রিয় খাবার। ঢাকার ব্রহ্মচারীদের খাবার ছিল সবজি, দুধ আর আতপ চাল। পূর্ববঙ্গের আবহাওয়া, ভৌগোলিক পরিবেশ ও পরিবাহিত উর্বর জমি এজন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিল। মোগল যুগে বাংলার সির সুতি চালের মোগল দরবারে কদর ছিল। সপ্তদশ শতাব্দিতে ঢাকা মোগল প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার সুবাদে ঢাকায় মুসলিম সংস্কৃতি প্রভাবিত মোগলাই খাবার জাঁকজমকতা প্রবল হয়। মোগলাই ঐতিহ্যবাহী মাংস রুটি খাদ্য রীতি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনলেও সর্বসাধারণের মূল আহারের তালিকায় ভাত, মাছ, ডালই বিদ্যমান ছিল। দেশি রন্ধন প্রক্রিয়ায় নিজস্বতা বজায় রেখে বাঙালি খাবারে মোগলীয় অনুকরণে বিভিন্ন মসলা খাবার তৈরিতে ব্যবহার করে বাংলা খাবারের নতুন নতুন খাদ্যের উদ্ভাবন হয়। ঢাকাই লোকেরা খাবার দাবারের ব্যাপারে কোনো রূপ কার্পণ্য করতেন না। ধনী হোক বা গরিব খাবার ব্যাপারে কোনো আপস নেই। দুপুরে যে তরকারি দিয়ে খাওয়া হয় রাতে হতে হবে অন্যরকম তরকারী। কমপক্ষে ৫/৬ পদের খাবার উভয় বেলায় রান্না করার রেওয়াজ এবং ভোজন পটু ঢাকাই লোকদের খাদ্য অভ্যাস হিসেবে দেখা যায়।

ভাত ও ডাল

প্রাচীনকাল থেকে ঢাকার পলিবাহিত উর্বর জমিতে প্রচুর ধান উৎপাদিত হতো। স্থানীয় চাহিদার পরও বাংলা থেকে উদ্বৃত্ত ধান মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে রপ্তানি হতো। ঢাকায় কাউনের চাল বা চীনা কাউন নামে এক ধরনের বন্য ধানের ভাত গরিব জনসাধারণকে খেতে দেখা যেত। এছাড়াও গোবিন্দ ভোগ, দাদখানি, শালিধান, পোড়াবিন্নি, কাত্তিকসিন্নি, ঘৃতশাইল ধানের সুনাম ছিল। বল্লাল সেন তার দান সাগর গ্রন্থে বাংলার আঠারো প্রকার ধানের কথা উল্লেখ করেছেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতেও ঢাকার প্রধান খাদ্য ছিল ভাত। তখন সমাদৃত ছিল গোপালভোগ ও বাসমতি চাল। মোগল ব্রিটিশ আমলেও ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পরিবারগুলো খাদ্য তালিকায় রুটি থাকলেও স্থানীয়দের মাঝে ভাত ও মাছই ছিল প্রধান খাদ্য। তবে তারা শুধু দুপুরে ভাত খেতেন। সরু চাল বা বালাম চালের ভাতই ছিল তাদের প্রিয়। মধ্যবিত্ত পরিবারে থাকত মোটা চালের ভাত। ঢাকার মুসলিম পরিবারগুলো সাধারণভাবে চালের মাড় গলিয়ে রান্না করা ভাত গ্রহণ করে থাকেন। ৫০ বছর পূর্বেও লাল বিরুই, সাদা বিরুই, জামির, রাজপাল, বগা, ঝোলা, লতা, দিঘা, বোরোসহ বিভিন্ন চালের যে বৈচিত্র্য দেখা যেত তা এখন মিনিকেট ও নাজিরশালসহ অল্প কিছু চালেই সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। যা এক সময় চালের রঙ ও গন্ধের বিচারে প্রস্তুতকৃত ভাতই দৈনন্দিন জীবনে ঢাকাবাসী গ্রহণ করতেন।

পুষ্টিবিদদের মতে, ডাল মধ্যবিত্তের আমিষ, মাংসের পরিপূরক। জেমস টেইলর তাঁর গ্রন্থে বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মতোই ঢাকাতেও খেসারি, মসুর, কেওড়া, মটর, মুগসহ নানা প্রকার ডালের ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। ধারণা করা হয় পর্তুগিজদের আগমনে এ অঞ্চলে ডাল ও আলু খাওয়ার রীতি প্রচলিত হয়। ঢাকার লোকজন ভাতের সাথে পাতলা ডাল খেয়ে থাকলেও রুটির সাথে ঘন ডাল “ডাল মাখনি” খেয়ে থাকেন। বুটের ডালের গরুর মাংস, মুগ ডালের খিচুড়ি, ডাল লাউয়ের তরকারি, ডাল ভর্তা, সর্বাধিক জনপ্রিয়। ডাল শুধু প্রাত্যহিক খাবার হিসেবেই নয় ডাল ঢাকার নাস্তাজাতীয় খাবার ডালপুরি, খেতাপুরি, ঘুগনিসহ বিভিন্ন খাবারে ব্যবহার করতে দেখা যায়। এছাড়াও ডাল ব্যবহারে মুগডাল খাসি, ডাল কলিজা, ডাল ভুনা খাবার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মাছ

মাছে ভাতে বাঙালির সংস্কৃতির উত্তরসূরি ঢাকাবাসী। প্রাচীনকাল থেকে ঢাকার চারপাশে নদী নালা খাল বিলের অভাব ছিল না। ছিল মাছের প্রাচুর্য। নদী নালা খাল বিল থেকে পাওয়া যেত, পুঁটি, গইন্না, মেনি, বুইচ্চা, দারকিনা, চেউয়া, ফলি, পাবদা, চিতল, মলই, টাকি, শৈল, গজাল, রিঠা, বাঘারিয়া, রামকরাতি, কালিবাউস, মলা, পোয়া, ভুথুম, কাজলি, বজরি, মৃগেল, টাটকিনি, কাকলা আর চিংড়িসহ নানা ধরনের মাছ। মোগল আমলে বাহারি সব খাবারের প্রভাব থাকলেও ঢাকাবাসী মাছকে তাদের নিজস্ব রন্ধন পদ্ধতি ছাড়াও তৈরি করতেন মোগলীয় ঘরানায় বিভিন্ন মাছের খাবার পদ। ব্রিটিশ সিভিল সার্জন জেমস্ টেইলর তার দেখা ঢাকাকে নিয়ে “টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক অব ঢাকা” গ্রন্থে ১৯ শতকের প্রথম দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে মানুষেরা কী কী মাছ খেতেন তার একটা তালিকা লিখেছিলেন। তার মধ্যে চান্দা, মাগুর, শিং, খইলশা, কৈ, বোয়াল, টেংরা, বাতাসি, চিতল, কুচিয়া, ইলিশ, কাচকি আর তপসি মাছের নাম জানা যায়। তিনি মাছ সম্বন্ধে নানা তথ্য দেওয়ার ফাঁকে এটাও জানিয়েছেন যে শীতকালে এখানে পাওয়া যেত প্রচুর পরিমাণে পুটিমাছ। যা সিদ্ধ করে তেল স্থানীয় সাধারণ গরিব মুসলমানেরা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করতেন। এক টাকায় ১৫ সের তেল পাওয়া যেত। অতিরিক্ত উৎপাদিত তেল কোলকাতায় রপ্তানি হতো। ঢাকার লোকদের বিভিন্ন ধরনের মাছ খাবার অভ্যাস থাকলেও তাদের বড় মাছের প্রতি ঝোঁক বেশি ছিল। কারণ হিসেবে বলা যায় বড় মাছের তেল, চর্বির উপস্থিতি আর কম সময়ে ও অল্প শ্রমে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে মাছকে খাবার উপযোগী করা যায়। যা অন্যতম একটি কারণ। মাছের ভুনা ও দোপেঁয়াজা আর মাছের কোফতা ঢাকাবাসীর প্রিয় খাবার। ফলি মাছের কোফতা আর চিতল মাছের কোফতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০ শতকের ৬০ দশকে ঢাকার বাজারে ১ টাকা হালি ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। সব মাছ কম বেশি খেয়ে থাকলেও রুই, শৈল, ফলি, চিতল, চিংড়ি আর ইলিশ ঢাকাবাসীর বেশি পছন্দের। ইলিশের বাহারী রান্না, শৈল মাছের দোপেঁয়াজা, রুই মাছের কোরমা, চিংড়ির মালাইকারী তাদের খাবার পাতে দিলে অন্য কিছুর প্রয়োজন পড়ে না।

শাক-সবজি

মধ্য যুগে এ অঞ্চলে উৎপাদিত বিভিন্ন শাক-সবজির কথা আমরা কবি ভারত চন্দ্র গ্রন্থাবলি “অন্যদামঙ্গল” কাব্যে লক্ষ করি। এছাড়াও শাক-সবজির তালিকায় কবি মুকুন্দ রামের “চণ্ডি মঙ্গল” এ পলাকড়ি (পটল), নট্যা (নটে শাক), হিলিঞ্চা, কাঁঠাল বিচি, কাঁচকলা, মোচা, কুমড়ো, মান (মান কচু), বাথুয়া শাক, লাউ, নলিতা শাক (পাট), আম্র (কাঁচা আম বা আমের বোল), তেঁতুল, মরিচ ইত্যাদির কথা উল্লেখ পাই। ১৯ শতক থেকে শাক-সবজিতে যোগ হতে থাকে করল্লা, ঝিঙ্গে, তরই, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাকরোল, ডাটা, শালগম, হেলেঞ্চা, পালং, নিশিন্দা, কলমি, পুই, মুলা, গিমা শাকসহ আরও অনেক শাক-সবজি। অনেকের মতে পর্তুগিজদের হাত ধরে আসে আলু, লংকা, লাল মরিচ আর ইংরেজদের আনা টমেটো। ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চলে ছিল পর্তুগিজ মিশনারি ও ইয়োরোপীয়দের ফল ও সবজি বাগান। এখানে চাষ হতো শালগম, গাজর, বাঁধাকপি, ফুলকপিসহ নানান সবজি ও ফল। ঢাকার বিভিন্ন বাড়ি ঘরের উঠোনে লাগানো হতো পছন্দ মাফিক শাক সবজি। ঢাকায় ভাত-রুটির সাথে সবজি, ভাজি ছাড়াও শালগমের শাবডেগ, পটলের দোলমা, পালং শাক, নুনিয়া শাকের মাংস, কাঁচা কাঁঠালের তরকারি, কুমড়োর তরকারি, সজনে ডালনাসহ আরও অনেক রকম সবজি ব্যবহারে তরকারি রান্না করা হয়ে থাকে।

ভর্তা

প্রাকৃত বাংলা শব্দ ভরতা থেকে হিন্দিতে ভুরতা এবং বাংলায় ভর্তা। ঢাকার ভর্তা ঢাকার লোকজ খাদ্য। সব ধরনের ভর্তাই ভাতের সাথে খাওয়ার উপযোগী। কমবেশি সব বাসা বাড়িতেই পছন্দ অনুযায়ী ভর্তা তৈরি ও খাওয়া হয়ে থাকে। ঢাকার মাছ ভর্তাগুলোর মধ্যে টাকি ভর্তা, শৈল ভর্তা, চিংড়ি ভর্তা, ইলিশ ভর্তা, রুই ভর্তা। শাকের মধ্যে বথুয়া শাক। মাছের ডিম যেমন শিং, কৈ, ইলিশ, বোয়াল এর ডিম ভর্তা। সবজির মধ্যে দেশি বেগুন, টমেটো, বড় সিমের ভর্তা। বীজের ভর্তার মধ্যে গোল আলু, ডাল, সিমের বিচি, কাঁঠালের বিচি ঢাকাই পরিবারে জনপ্রিয়। এসময় কিছু শিকারপ্রিয় পরিবারকে শিকারলব্ধ বকের বুকের মাংসের ভর্তা খেতে দেখা যেত। ধনী থেকে দরিদ্র এবং মহিলা থেকে পুরুষ সবারই ভর্তা খাবার শখ রয়েছে।

নিচে মাছের কিছু রান্নার বর্ণনা দেওয়া হলো যা একান্তই ঢাকাই রান্না এবং বাড়িতে বাড়িতে বিশেষভাবে তৈরি হতো।

ফুলকপির কোর্মা

ফুলকপির কোর্মা ঢাকায় শীতকালীন রান্নার একটি পদ। কোর্মায় প্রয়োজনীয় মসলা, ঘি, রং ব্যবহার করে ফুলকপির সাথে মুরগির মাংস ব্যবহার করে তৈরি করা হয় ফুলকপির কোর্মা।

আন্ডাসিমি

শীতের বাজারে মটরশুঁটির আগমনে শুধু মটরশুঁটির ছিলানো দানার সাথে ঘি ও মসলা যোগে আন্ডাসিমি রান্না করা হয়। তার উপর ঘিয়ে ভাজা ডিম পোজ দিয়ে পরিবেশন করা হতো আন্ডাসিমি। ভাত ও রুটি উভয়ের সাথে উপাদেয় খাবার।

সজনে ডাটা সরিষা

গ্রীষ্মকালীন সজনে ডাটা বাজারে আসার সাথে সাথে ঢাকার রান্নাঘরে সজনে ডাটা সরিষা তৈরি হয়ে দুপুরে খাবারের টেবিলে যোগ হয়। বেশ শখ ও ঔষধিগুণে কথা বলে বাড়ির ছেলে বুড়োদের খাওয়ানো হতো সজনে ডাটা।

নারিকিলি মুরগির সুরুয়া

নারিকেলের দুধ দিয়ে তৈরি মুরগির সুরুয়া একটি প্রচলিত খাবার। তেল ও ঘি মিশ্রণে, টক দই, আদা, রসুন, পিঁয়াজ বাটা লবণ, গরম মসলা সহযোগে মুরগির মাংস রান্নার পর নারিকেলের দুধ প্রয়োগ করে তৈরি হয় নারিকিলি মুরগির সুরুয়া। ভিন্ন ভিন্নভাবে চিংড়ি ও খাসির মাংস ব্যবহার করেও নারিকিল সুরুয়া তৈরি করতে দেখা যেত। ভাত ও রুটির সাথে নারিকিলি সুরুয়া খাওয়া হয়।

ফল্লি ও চিতল মাছের কোফতা

মাছের কোফতা বলতেই ঢাকাই লোকজনের একটি প্রিয় খাবার ফল্লি ও চিতল মাছের কোফতা। ফল্লি বা চিতল মাছের কাঁটা বেছে পিঁয়াজ, আদা, রসুন বাটা, কাঁচা মরিচ, লবণ এবং পাউরুটি ভিজিয়ে পানি ঝরিয়ে সব একসাথে বেটে পছন্দনীয় গোল বল আকারে ঘিয়ে ভেজে কোফতা তৈরি করা হয়। এই কোফতা কোরমা আকারে রান্না করেও পরিবেশন করা হয়।

পীর বদল মাছের দোপেঁয়াজা

চেওয়া মাছকে ঢাকাই লোকজন পীর বদল মাছ নামে চেনেন। লাল চেওয়া মাছের দোপেঁয়োজা ঢাকার একটি প্রিয় খাবার।

কাঁটাগলা ইলিশ

ঢাকায় ইলিশ মাছের মৌসুমে অভিজাত পরিবারেগুলো কিছু নিজস্ব রন্ধন পদ্ধতি অনুসরণ করত। কাঁটাগলা ইলিশ মাছ রান্না সেই রকমই রান্না। ইলিশ মাছের পেটি, গাদা, মাথার অংশ পিঁয়াজ, আদা, কাঁচামরিচ, হলুদসহ সরিষার তেলে মাখিয়ে নির্দিষ্ট আচে হাঁড়িতে রেখে হাঁড়ির মুখ ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হয়। যাতে ভিতরের বাতাস যেন বের হতে না পারে। এ প্রক্রিয়ায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা রান্নার পর নামিয়ে কাঁটাগলা ইলিশ পরিবেশনের জন্য তৈরি হয়ে যায়। এখন প্রেশার কুকারে ঢাকায় বাড়িতে রান্না হয়। কিন্তু তখন লাকড়ির চুলায় গৃহিণীদের খুবই কষ্ট করে এই কাঁটাগলা ইলিশ রান্না করতে হতো। খাবারে কাঁটাসহ মাছটি খাবার উপযোগী হয়।

ইলিশ কাবাব

ঢাকায় দুইভাবে ইলিশের কাবাব তৈরি করা হয়ে থাকে। সাধারণভাবে আস্ত ইলিশ মাছকে কাবাবের মসলা ব্যবহারে সুস্বাদু ইলিশ কাবাব তৈরি করা হয় যা আস্ত ও কাটা বিহীন কয়লার আগুনে সেঁকে তৈরি হয় সম্পূর্ণ ইলিশ কাবাব। যাকে ইংরেজরা “স্মোকড হিলশা” নামে কদর করতেন। ইংরেজদের বাংলার মাছের স্বাদে আপত্তি থাকলেও আরেকটি কারণ ছিল মাছের কাঁটা। কিন্তু ইলিশের স্বাদ তাদেরকে বাধ্য করে কাঁটা মুক্ত “স্মোকড হিলশার” আবিষ্কারে। দম বা বাষ্পীয় পদ্ধতিতে রান্না করা ইলিশই যা ইংরেজদের স্বাদ গ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে পেরেছিল। আরেকটি পদ্ধতিতে অভিজাত পরিবারে ইলিশ কাবাব তৈরি হয়ে থাকে। ইলিশ মাছের মাথা ও লেজ বাদ দিয়ে মাঝ খানের পেটির অংশটা নেওয়া হয়। আস্ত অংশটা মাছের পিঠ বরাবর লম্বা করে কেটে দুভাগে ভাগ করে নেওয়া হয়। এরপর মাছে টকদই, লবণ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, শুকনা মরিচ বাটা, গরম মসলা সব মিলিয়ে মাছে কাঁটা দিয়ে কেচে ঘণ্টা খানিক রেখে দিতে হয়। কড়াইতে ঘি দিয়ে মাছের অংশটা রেঁধে পেঁয়াজের বেরেস্তা, কেওড়া রং ব্যবহার করে ভিন্ন স্বাদের ইলিশ কাবার তৈরি করা হয়। পরিবেশনের সময় কাবাবের উপর পেঁয়াজের বেরেস্তা কুচি, কাঁচামরিচ কুচি দিয়ে কাবাবের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হতো।

অন্যান্য খাবার

ঢাকার অন্যান্য খাবারের মধ্যে কমলার কৈ, আনারস ইলিশ, ঢাকাই ভাষায় গাছ বেগুনের মুরগির ঝোল, কাঁঠালের বিচির গরুর মাংস, নোনা ইলিশ, গজাল মাছের শুঁটকি খেতে দেখা যায়। এছাড়াও ফাল্গুন মাসে আমড়ার গাছের ফুল বাজারে কিনতে পাওয়া যেত। তা দিয়ে তৈরি কাচকি মাছের চড়চড়ি। চাল বেটে ছিট রুটির সাথে হাঁসের মাংস ঢাকার লোকদের বিশেষ প্রিয় খাবার। আচারের মধ্যে আমের কাশ্মিরি আচার, করল্লার আচার, কাঁচা মরিচের আচার, জলপাইয়ের আচার, আমড়ার আচার, আমড়াকে শুকিয়ে আমচুর, আওলাকা মোরব্বা (আমড়া) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায় – বাদশাহি ও নবাবি খাদ্য বিলাস
২.
দ্বিতীয় অধ্যায় – ঢাকার রুটি
৩.
তৃতীয় অধ্যায় – ঢাকার কাবাব
৪.
চতুর্থ অধ্যায় – ঢাকার পোলাও ও বিরিয়ানি
৫.
পঞ্চম অধ্যায় – মাংসের মসলাদার খাবার
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায় – বাংলা খাবার
৭.
সপ্তম অধ্যায় – নাস্তা জাতীয় খাবার
৮.
অষ্টম অধ্যায় – ঢাকার পানীয়
৯.
নবম অধ্যায় – ঢাকার মিষ্টান্ন
১০.
দশম অধ্যায় – ঢাকার পিঠা
১১.
একাদশ অধ্যায় – ঢাকার বিশেষ খাবার
১২.
দ্বাদশ অধ্যায় – খাদ্য পরিবেশন
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায় – ঢাকায় রমজানে সেহরি ও ইফতার
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায় – ধর্মীয় উৎসবের খাবার
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায় – পান-হুক্কা-চা
১৬.
ষষ্ঠদশ অধ্যায় – ঢাকার ক্যাটারিং, ডেকোরেটর ব্যবস্থা ও বাবুর্চিরা
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায় – ঢাকার নিরাপদ পানির ব্যবস্থাপনা
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায় – হিন্দু সম্প্রদায়ের খাবার
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায় – ঢাকার বিয়ের খাবার
২০.
বিংশ অধ্যায় – ৪০ দশক পরবর্তী ঢাকার জনপ্রিয় খাবার ও পর্যালোচনা
২১.
২১. পরিশিষ্ট

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%