দশম অধ্যায় – ঢাকার পিঠা

দশম অধ্যায় – ঢাকার পিঠা

ঢাকার আরেকটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন হলো পিঠা। এদেশে বহু আগে থেকেই নানা প্রকার উপাদেয় পিঠার প্রচলন থাকলেও ঢাকার পিঠার বৈচিত্র্যে পার্থক্য রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর আগে থেকেই ঢাকায় সকালের নাস্তা হিসেবে পিঠার উপস্থিতি লক্ষ করা যেত। ঢাকার একটা নিয়ম ছিল নাস্তা সাধারণত বাড়িতে তৈরি হতো না। যা হতো শুধু বয়স্কদের জন্য নাস্তা তৈরি হতো। সকালের নাস্তায় পিঠা ওয়ালীদের যোগান দেওয়া পিঠাই ছিল শহরের মূল পিঠার উৎস। শহরে তেলের পিঠার প্রচলন ছিল না। সকালে গোজা পিঠা (পুলি), চুই, চিতুয়া, দুধ চিতুয়া (চিতই), ভাপা, ডাল রুটি আর পাটিসাপটা নিয়ে আসত পিঠা ওয়ালীরা। ঢাকায় বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের আগমনে তাদের কাছ থেকে পাওয়া ভিন্ন ভিন্ন প্রকার পিঠা ও তৈরি পদ্ধতি ঢাকাবাসী আস্তে আস্তে রপ্ত করে নেয়। শীতের সময় সব ঘরেই ২/১ দিন পরপর পিঠা তৈরি করা হতো। ঢাকার পিঠাগুলোর মধ্যে দুধকুলি, চুই পিঠা, ওসানাগুজা, সেকা গুজা, আন্ডাপোয়া, হাতাইন্না পিঠা, ভাপা, পাটিসাপটা। পিঠায় চালের গুঁড়া, নারিকেল, গুড়, দুধ মালাই, ক্ষিরসা, পেস্তা বাদাম, কিসমিস দেওয়া হতো। ঢাকার বিভিন্ন উৎসবাদিতে পিঠা ছাড়া অনুষ্ঠানই সম্পন্ন হয় না। উৎসবে বহুল ব্যবহৃত পিঠাগুলো হলো ছানার মালপোয়া পিঠা, ছিটা পিঠা, হাত বড়া, থাউক্কা বড়া, গুলগুলা, খেজুর পিঠা, ঝাল পাটিসাপটা, কাটা সেমাই পিঠা, গড়গড়া পিঠা, হাত কুলিসহ অসংখ পিঠা অনুষ্ঠান ও উৎসবাদিতে তৈরি হয়ে থাকে। সময়ের ক্রমবর্ধমান ধারায় আরও কিছু পিঠা ঢাকার পিঠা খাবারে যোগ হয়েছে। তিলের পিঠা, বিবিখানা পিঠা, কলা পিঠা, ছাচের পিঠা, মুঠি পিঠা (নোনতা ও মিষ্টি), সাবু (সাগু) পিঠা, কুনি পিঠা, মুগের কুলি, চন্দ্র পুলি, মুগ পাকন, তালের পিঠা, ডাল বড়া আর জামাই খেদাইন্না পিঠাসহ বাহারি নামের সব পিঠা। বর্তমান সময়ে পিঠা খাওয়ার অভ্যাস ঢাকাবাসীর মধ্যে শীতকাল আর উৎসব প্রধান দিনগুলোতে দেখা যায়। রাস্তার ধারেও বিভিন্ন পিঠা বিক্রির দোকান তৈরি হলেও পাশ্চাত্যের ফাস্টফুড খাবার সংস্কৃতির প্রভাবের সাথে ভালোভাবেই টিকে আছে পিঠা। ফাস্টফুড খাবার সংস্কৃতি শহরবাসীর মাঝে পড়লেও পুষ্টিগুণ, স্বাদ বিচারে পিঠাপুলি, ঢাকার নাস্তায় আজও জনপ্রিয়।

ঢাকার পিঠা ওয়ালী

২০ শতকে ঢাকার পিঠা ওয়ালীদের রাজত্ব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে সবার ঘরে ঘরে সকালের নাস্তায় পিঠার সওগাত তারা পৌঁছে দিত। কত রকমের পিঠা- চিতই, দুধ চিতই, ডাল রুটি, চুই, গজা আরও কত কী। সাধারণত যে সব মহিলা বিধবা বা স্বামী চলে গেছেন দূর দেশে তারা পিঠা ব্যবসা করতেন। আবার কারও ঘরের ছেলের বউ ঘরে পিঠা তৈরি করতেন আর একজনের স্মৃতি কথায় দেখা এক বুড়ি পিঠা ওয়ালী তার ছোট নাতনিকে নিয়ে পিঠা বিক্রি করতে আসত। খুব ভোরে পিঠা বানিয়ে বাড়িতে বাড়িতে দিয়ে যেতেন। সকালে খাবারের ধুম পড়ে যেত। পিঠাগুলো তারা খুব অল্প দামেই বিক্রি করতেন। ছিল না চাহিদার বিপরীতে অধিক মুনাফার নেশা। তারা তাদের সুখ দুঃখের কথা বলত মা, দাদি আর মহল্লার অন্য মহিলাদের সঙ্গে। তাদের জীবন যুদ্ধের মাঝেও ছিল সরলতা আর মানুষকে আপন করে নেবার চেষ্টা। শহরের সব শ্রেণির মাঝে তারা প্রভাব রেখে যেতেন। ঢাকার পিঠা ওয়ালীদের কাছে ছিল ভূতের গল্পের ভাণ্ডার। খুব ভোরে তারা ভূতের আবির্ভাব দেখতেন। বাড়িতে এসে জোরে জোরে শ্বাস নিতেন এবং একটু জিরিয়ে তারা ভূতের গল্পের ডালা খুলে ধরতেন। পিঠা বিক্রির সাথে সাথে বাড়ির ছেলে মেয়ে ও মহিলারা সেই গল্প উপভোগ করতেন। তারা গান জানতেন। গল্পের ছলে পিঠা বিক্রি তাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল। ঢাকাবাসী সাঈদ আহমেদ তার স্মৃতি কথায় ঢাকার পিঠা ওয়ালীদের ভূতের গল্পের বর্ণনা দিয়েছেন।

“এক পিঠা ওয়ালী ছিল ফকির চাঁনের মা। ফকির চাঁনের টেইলার ছিল। মদ খেয়ে লুত হয়ে থাকত। ওর মা দাইগিরিও করত। বাচ্চা প্রসব করাত। আমাদের লায়ন সিনেমার গলিতে তাদের বাড়ি। সে খুব চমৎকার পিঠা বানাত। একদিন সুবেহ সাদিকের সময় মোয়াজ্জিন আজান দিচ্ছে। ফকির চাঁনের মা বাইরে বের হলো প্রকৃতির ডাকে। এমন সময় এক লোক এসে বলল, “চল আমাকে পিঠা খাওয়াবি”। লোকটা আগে আর সে পিছে পিছে। যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। পথ আর ফুরোয় না। মাঠ প্রান্তর ছাড়িয়ে ফুলবাড়িয়া পেরিয়ে গিয়ে রাস্তা পড়ল কোম্পানিবাগে। এতক্ষণ পর লোকটার মুখে কথা ফুটল। মাঠের মাঝখানে একটা ঘর দেখিয়ে বলল, ঐ ঘরে যাও সব সরঞ্জাম আছে পিটা বানাও। ঘরে আতর আর লোবানের তীব্র সুগন্ধ। মহিলা বুঝে গেলেন এটা জিনের আস্তানা। বিনা বাক্য ব্যয়ে আল্লাহ রসুলের নাম নিতে নিতে সে হরেক রকম পিঠা তৈরি করল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিন ভদ্র লোককে বলল, পিঠা তৈরি শেষ। সে তার হাতে কতগুলো সোনার আশরাফী গুজে দিয়ে যাবার পথ বাতলে দিল। তিন দিন আর পিঠা ওয়ালীর দেখা নাই। আমরা পথ চেয়ে বসে থাকি। চতুর্থ দিন সে এল। এসে বলল, সেদিনের সেই জিনের গল্প। ভয়ে তিন দিন জ্বরে শয্যাশায়ী ছিল, আজ সেরেছে”।

একথা অনস্বীকার্য যে, ঢাকার পিঠা ওয়ালীরা ঢাকার মানুষদের সকালের নাস্তার স্বাদ বদল ও নিত্য নতুন নাস্তার সংযোজনে আর সাহেবি পাউরুটি আর চা পানের অভ্যাসের কারণে আস্তে আস্তে ঢাকা থেকে একেবারে হারিয়ে গেছেন।

ভাপা পিঠা

ভাপ বা বাষ্প দিয়ে এ পিঠা তৈরি করা হয়। এর জন্য এর নাম ভাপা পিঠা। মোগল আমলে তৈরি হতো শাহি ভাপা পিঠা। উপকরণ ও তৈরি পদ্ধতির দিক থেকে বর্তমান সময়ের ভাপা পিঠার চেয়ে ভিন্নতর ছিল। সুগন্ধি চালের গুঁড়া, জাফরান, পেস্তা, মালাই দিয়ে তৈরি হতো শাহি ভাপা পিঠা। ভাপা পিঠায় সাধারণভাবে গুড়, নারিকেলের ব্যবহার থাকলেও চালের গুঁড়ির সাথে পনির, মালাই, মোরব্বা, বাদামের ব্যবহারে ঢাকার ভাপা পিঠায় বৈচিত্র্য দেখা যেত। তবে পিঠাগুলো স্বাদ ও আকৃতি বর্তমান ভাপা থেকে ভিন্নতর ছিল।

পাটিসাপটা

ঢাকাই লোকদের অন্যতম একটি পছন্দের পিঠা পাটিসাপটা। এর একটি অন্যতম প্রধান কারণ ঢাকার অধিবাসীদের মালাই প্রিয়তা। বাদশাহি পাটিসাপটা তৈরিতে প্রয়োজন সুগন্ধিযুক্ত পোলাও চালের গুঁড়া যা সূক্ষ্ম বুননের কাপড় দিয়ে চালা এবং গুঁড়ার সাথে দুধ, ডিম, মিহি চিনি পরিমাণ মতো মিশিয়ে গোলা করে ঘি দিয়ে তাওয়ায় চেলে পাটির আকৃতি করে নেয়া। তারপর এর ভিতর আগে থেকে ভিজিয়ে রাখা জাফরান ও খাঁটি মালাই এর সাথে পেস্তা বাদাম, কিসমিস, মধু জ্বাল দিয়ে ঘন করে পুর হিসেবে ব্যবহার করলে তৈরি হতো বাদশাহি পাটিসাপটা। বর্তমানে চালের গুঁড়ির সাথে গুড় বা চিনি মিশিয়ে পুর হিসেবে মালাই, নারিকেল, ক্ষিরসা দিয়ে পাটিসাপটা তৈরি করা হয়ে থাকে। ঢাকায় কোরবানি ঈদের সময় মাংসের ঝুরি দিয়ে চালের গুঁড়ার সাথে লবণ ডিম মিশিয়ে ঝাল পাটিসাপটা তৈরি হতে দেখা যায়।

চুই পিঠা

চুই পিঠায় গরম দুধে মিহি চালের গুঁড়া ও ময়দা মিশ্রণে কাই তৈরি করা হয়। তারপর হাতের তর্জনি ও বৃদ্ধাঙুলের নৈপুণ্যতার সাথে বড় বড় চালের আকৃতিতে পরিণত করা হয়। ঢাকার রমনিরা এই পিঠা রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতেন। চুই পিঠা মিষ্টি বা ঝাল দুইভাবেই রান্না করা যায়। মিষ্টি চুইয়ের জন্য দুধ, নারিকেল ও গুড়ের শিরা বা রসে মধ্যে জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় মিষ্টি চুই। যা অধিক সমাদৃত হিসেবে এখানে তৈরি হয়।

চিতই পিঠা

বাংলাদেশের সব অঞ্চলে বহুল প্রচলিত ধনী দরিদ্র সবার প্রিয় ও অতি পরিচিত পিঠা চিতই। চালের গুঁড়া লবণ পানির মিশ্রিত গোলা ছাচে ঢেলে ঢাকনি দিয়ে ছাচটি ঢেকে কয়েক মিনিটে তৈরি হয় চিতই পিঠা। চিতই পিঠার বড় গুণ সবকিছুর সাথেই এ পিঠা খাওয়া যায়। বুটের ডাল, গরু বা খাসির কলিজা ভুনা, কোরবানির সময় মাংসের কোরমা বিভিন্ন ভর্তা (পিঁয়াজ, ধনে পাতা, সরিষা) দিয়ে ঢাকায় চিতই পিঠা খেতে দেখা যায়। এক সময়ে ইলিশ মাছের টুকরা দিয়েও চিতই পিঠা তৈরি হতো। ঢাকাবাসীর আরেকটি পছন্দনীয় পিঠা দুধ চিতই বা ভিগা পিঠা। দুটোই তৈরির জন্যই চিতই পিঠা প্রয়োজন। দুধ চিতই দুধ ও খেজুরের গুড় একসাথে জ্বাল দিয়ে এর মাঝে এলাচ বা দারুচিনির গুঁড়া দিতে হয়। এই মিশ্রিত রস বা শিরা গরম থাকতে বানানো চিতই পিঠা এর মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ রসে ডুবিয়ে পিঠা ফুলতে দেওয়া হয়। ঠান্ডা হলে দুধ চিতই খাওয়া স্বাদে উত্তম হয়। অপরদিকে ভিগা পিঠায় গুড়, পানি, নারিকেলে মিশ্রিত শিরায় তৈরি করা গরম পিঠা শিরায় ভিজিয়ে একসাথে চুলোয় জ্বাল দেওয়া হয়। ঠান্ডা হলে তাকে দুধে ভিজিয়ে একরাত রাখা হয়। পরিবেশনের সময় পেস্তা বাদাম কুচি, মালাই, জাফরান ব্যবহার করা হতো। রন্ধন পদ্ধতির সামান্য ব্যতিক্রম থাকলেও দুধ চিতই ও ভিগা পিঠা আসলে একই জাতীয় পিঠা।

ছিট পিঠা

বাড়িতে নতুন জামাইয়ের আগমন উপলক্ষে এবং ঢাকার শিকার প্রিয় লোকদের শিকারলব্ধ পাখির মাংসের সাথে ছিট পিঠা খেতে দেখা যায়। পাতলা ও জালিকাকৃত ছিট পিঠা তৈরিতে সুগন্ধি পোলাও এর চালের মিহি গুঁড়া সাথে লবণ পানি মিশিয়ে মসৃণ ও পাতলা গোলা তৈরি করতে হয়। তারপর তাওয়াতে ঘি মাখিয়ে পরিমাণ মতো গোলা হাতে ছিটিয়ে ছিটিয়ে তৈরি হয় ছিট পিঠা। হাতে ছিটিয়ে করা হয় বলে এর নাম ছিট পিঠা।

গড়গড়া পিঠা

ঢাকায় এক সময়ে পারিবারিক অনুষ্ঠানে গড়গড়া পিঠা তৈরির আয়োজন হতো। পরিবারে নবজাতক শিশুটি যখন দাঁড়াতে শিখে এবং হাঁটার চেষ্টা করে তখন তার সাবলীলভাবে হাঁটাচলার কামনায় গড়গড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। শিশুর মাথায় নতুন কুলা রেখে তার উপর তৈরি পিঠা ঢালা হয়। এই পিঠা গড়িয়ে মাটিতে পড়ে বলে এর নাম গড়গড়া পিঠা। আকৃতিতে ছোট ছোট মার্বেলের মতো পুলি পিঠার অনুরূপ। চালের গুঁড়ার সাথে ঘি, চিনি, কলা, নারিকেল, মিষ্টির টুকরোসহ নানা উপাদান মিশিয়ে ভাপে সিদ্ধ করে গড়গড়া পিঠা তৈরি করা হতো। এই অনুষ্ঠান ও গড়গড়া পিঠা তৈরির রেওয়াজ বা প্রথা ঢাকার সমাজ জীবনে এখন নাই বললেই চলে।

মালপোয়া পিঠা

ঢাকার বিয়ের অনুষ্ঠান ও নতুন জামাইয়ের আপ্যায়নে আরেক পিঠা মালপোয়া। একটা পিঠা একপোয়া ওজন বা বড় আকারের কারণে এর নাম মালপোয়া। চালের গুঁড়ার সাথে সুজি, ডিম, ময়দা, দুধ একসাথে গোলাতে হয়। গরম ঘিতে গোলা পোয়া পরিমাণ বাদামি রঙে ভেজে উঠাতে হয়। তারপর চিনির শিরায় ভিজিয়ে তৈরি হয় মালপোলা। চালের গুঁড়ার সাথে ছানা মিশ্রণ করলে তৈরি হয় উন্নতমানের ছানার মালপোয়া।

হাতবড়া পিঠা

তেলে ভাজা পাকওয়ান বা তালের পিঠার আরেক নাম হাতবড়া। উপকরণ হিসেবে চালের গুঁড়া, ময়দা, নারিকেল, গুড় ব্যবহার হলেও পিঠাটি গরম তেল বা ঘিয়ে ছাড়ার সময় হাতের কৌশলে হাঁসের আকৃতি দিয়ে ছাড়া হয়। যার জন্য দীর্ঘ দিনের অভ্যাস ও কৌশল থাকা প্রয়োজন। হাতের এই নৈপুণ্যের কারণে একে হাতবড়া বলা হয়। ঢাকায় ভাদ্র মাসে এই পিঠা বেশি খেতে দেখা যায়।

থাউক্কা বড়া পিঠা

ঢাকার বিয়ে শাদির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল থাউক্কা বড়া। পিঠাটি পোয়া বা মালপোয়া অনুরূপ হলেও ওজনে ছিল প্রতিটি এক কেজির বেশি। ঢাকাই রেওয়াজ হলো পিঠাটি কনে বাড়ির লোকজন নিজ হাতে তৈরি করবে যা জামাই বাড়িতে দুই প্রস্থে পিঠা পাঠানো হতো। প্রথমবার বিয়ের পরদিন সকালে পাটিসাপটাসহ অন্যান্য পিঠার সাথে থাউক্কা বড়া একটি বড় ডালায় করে নিয়ে যেতে হতো। পরবর্তীতে জামাইকে শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ জানাতে পুনরায় পিঠার ডালা পাঠাতে হতো। প্রথমবার একশো পিঠা পাঠানো হলে দ্বিতীয় বার দ্বিগুণ পিঠা পাঠানোর রেওয়াজ বিবাহ অনুষ্ঠানে পালন করা হতো।

গুলগুলা পিঠা

স্বাধীনতা পরবর্তী ঢাকার বিভিন্ন অলি-গলিতে প্রায়ই বিক্রি করতে দেখা যেত গুলগুলা নামের পিঠা। ঢাকাই লোকদের বিকালের নাস্তায় এই গুলগুলা পিঠা খেতে দেখা যেত। আটা ও চালের গুঁড়া সমপরিমাণ নারিকেল, গুড়, পানি দিয়ে মিশিয়ে ছোট ছোট গোলাকৃতিতে ডুবোতেলে ভেজে বিক্রি করা হতো। হালকা নাস্তা হিসেবে চায়ের সাথে অনেককেই গুলগুলা পিঠা খেতে দেখা যেত।

খেজুর পিঠা

নামে খেজুর পিঠা হলেও খেজুর বা খেজুরের গুড়ের কোনো ব্যবহার নেই এই পিঠায়। তৈরি প্রক্রিয়ায় ছুড়ি দিয়ে বরফির মতো খেজুর পিঠা কাটা হলেও আগে ব্যবহার হতো খেজুরের কাঁটা সে কারণে এইরূপ নামকরণ আজও প্রচলিত রয়ে গেছে। ঢাকার বিভিন্ন মেলা উৎসব উপলক্ষে এই পিঠা খুব জনপ্রিয় ছিল। খেজুর পিঠা তৈরির জন্য পানিতে ভিজানো সিদ্ধ চাল, ময়দা, চিনি, ঘি একত্রে মিশিয়ে শিল পাটায় গুঁড়ো করে মণ্ড আকারে তৈরি করা হয়। এরপর কলাপাতা বা বর্তমানে কাঠের পিঁড়িতে মোটা পুরু (বিস্কুটের ন্যায়) করে বরফি আকারে কাঁটা দিয়ে কাটতে হয়। তারপর তাতে পোস্ত দানা উপরে ছিটিয়ে ডুবো তেলে খেজুরের রং (গাঢ় বাদামি) না আসা পর্যন্ত ভেজে পরিবেশনের জন্য তৈরি হয় খেজুর পিঠা।

গুজা পিঠা

বিকেলের নাস্তায় আরেক পিঠা গুজা পিঠা বেশ জনপ্রিয়। তাওয়ায় সেঁকা গুজা পিঠা চালের গুঁড়ার সাথে ময়দা ও দুধ মিশিয়ে খামির তৈরি হয়। পরে এর মাঝে পুর হিসেবে নারিকেল, গুড়, মালাই, বাদাম, কিসমিস দিয়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতির করে ভাঁজ তৈরি হয়। গুজা পিঠা ঢাকায় পুলি পিঠার বিপরীতে প্রচলিত ছিল।

উৎসব অনুষ্ঠানের পিঠা

উৎসব প্রিয় ঢাকার লোকজন তাদের বিভিন্ন সামাজিক ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে পিঠা তৈরি করার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। বর্তমান পুরান ঢাকায় সর্বজনীন উৎসব “শাকরাইন”। হিন্দু মুসলিম সব পরিবারেই ধুমধামের সাথে সারাদিন ঘুড়ি উড়ানোসহ গান বাজনা ও আতশবাজি পোড়ানোতে ব্যস্ত থাকেন। বাড়ি ঘরে মহিলারা ব্যতিব্যস্ত থাকতেন মুখরোচক খাবার আর পিঠা তৈরিতে। এ উপলক্ষে তারা ভিগা পিঠা, ছিট পিঠা, হাতবড়া পিঠাসহ নানান পিঠা তৈরি করতে দেখা যেত। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, ঢাকার নানান ধর্মের মানুষদের মোগল আমল থেকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান লক্ষ করা যেত। এরই ধারাবাহিকতায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণের সময় যে সব পিঠা করা হতো তা ঢাকাবাসী এক সাথেই উপভোগ করতেন। দুর্গা পূজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মীপূজাসহ বিভিন্ন পূজায় ঢাকার হিন্দু বাড়িতে পিঠা পুলি তৈরির ধুম দেখা যেত। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বড়দিনে ইয়োরোপীয় ধাঁচের কেক এর পাশাপাশি বড় আকৃতির ভাপা, পুলি, পোয়া, পাটিসাপটা নানান পিঠা তারা তৈরি করতেন। ঢাকার আরেকটি সামাজিক অনুষ্ঠান “সাতোশা”। বিয়ের পর মেয়ে যখন প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হয় তখন মেয়ের বাড়ির লোকজন এই উৎসবটির আয়োজন করেন। উৎসবটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উৎযাপিত হয়। এই সময়ে পুরি পাকন, কাটা সেমাই পিঠা, হাত পুলিসহ বাহারি সব পিঠা উৎসবে পরিবেশন করার রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে।

ঢাকার বর্তমান কর্মব্যস্তময় জীবন ও সময়ের কারণে ঢাকার রাস্তার ধারে ও বিভিন্ন দোকানে নানা স্বাদের পিঠা তৈরি হয়। যা ঢাকাবাসীকে পিঠার ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও ঘরে তৈরি পিঠার কদর এখনও কমে যায়নি। যুগের ক্রমবর্ধমান ধারায় অনেক পিঠা ঢাকা থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার যুক্ত হয়েছে ঢাকার বাইরের এবং বিদেশ থেকে আসা নানা ধরনের পিঠা। পুষ্টিগুণের দিক থেকে এখানকার এইসব পিঠা নিঃসন্দেহে অনেক উপরে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায় – বাদশাহি ও নবাবি খাদ্য বিলাস
২.
দ্বিতীয় অধ্যায় – ঢাকার রুটি
৩.
তৃতীয় অধ্যায় – ঢাকার কাবাব
৪.
চতুর্থ অধ্যায় – ঢাকার পোলাও ও বিরিয়ানি
৫.
পঞ্চম অধ্যায় – মাংসের মসলাদার খাবার
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায় – বাংলা খাবার
৭.
সপ্তম অধ্যায় – নাস্তা জাতীয় খাবার
৮.
অষ্টম অধ্যায় – ঢাকার পানীয়
৯.
নবম অধ্যায় – ঢাকার মিষ্টান্ন
১০.
দশম অধ্যায় – ঢাকার পিঠা
১১.
একাদশ অধ্যায় – ঢাকার বিশেষ খাবার
১২.
দ্বাদশ অধ্যায় – খাদ্য পরিবেশন
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায় – ঢাকায় রমজানে সেহরি ও ইফতার
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায় – ধর্মীয় উৎসবের খাবার
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায় – পান-হুক্কা-চা
১৬.
ষষ্ঠদশ অধ্যায় – ঢাকার ক্যাটারিং, ডেকোরেটর ব্যবস্থা ও বাবুর্চিরা
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায় – ঢাকার নিরাপদ পানির ব্যবস্থাপনা
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায় – হিন্দু সম্প্রদায়ের খাবার
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায় – ঢাকার বিয়ের খাবার
২০.
বিংশ অধ্যায় – ৪০ দশক পরবর্তী ঢাকার জনপ্রিয় খাবার ও পর্যালোচনা
২১.
২১. পরিশিষ্ট

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%