তৃতীয় অধ্যায় – ঢাকার কাবাব

তৃতীয় অধ্যায় – ঢাকার কাবাব

“কিবাব” শব্দের উৎস আরবি। প্রাচীন আরবিতে যার উৎস। সেই প্রাচীন আরমি ভাষায় “কাবাব্বা” বা প্রাচীনতর অ্যাকখাডীয় ভাষায় “কাবাবু” শব্দেরও একই অর্থ। শব্দের পরিবর্তিত রূপ ফারসি কাবাব অর্থ ঝলসানো বা ভাজা। মানুষের আগুনের আবিষ্কার ও ব্যবহার এর আদিম রূপ পশুর মাংস পুড়িয়ে খাওয়া। ঝলসানো মাংসের বিবর্তিত রূপ আর সেই পোড়া মাংসকেই সূক্ষ্মতর রূপ দিয়েছে তুর্কি-ইরানি-ভারতীয় মোগল সভ্যতা। তবে কাবাবকে জনপ্রিয় করার মূলে অবশ্যই তুর্কিরা। ধারালো তলোয়ারে গাঁথা মাংস আগুনে পুড়িয়ে খেত তুর্কি সৈন্যরা। ক্রমে তলোয়ারের জায়গায় এল লোহার তার। শিকে গাঁথা কাবাবকে তুর্কিরা বলে শিশ কাবাব। যার অর্থ শিক কাবাব। পশ্চিম এশিয়ায় কাঠের জোগান কম ছিল। তাই সেখানে মাংস রান্না করার বদলে দ্রুত আগুনে ঝলসে নেওয়াটাই ছিল সুবিধাজনক। প্রথমদিকে লবণ ও বিশেষ কিছু গুল্ম দিয়ে ঝলসানো হতো মাংস। পরে নানা রকম মসলার ব্যবহার করে বাড়ানো হয়েছে কাবাবের স্বাদ ও বৈচিত্র্য। এ ব্যাপারে মোগলদের অবদানই সবচেয়ে বেশি। তারা কাবাবে আনলেন গোলাপজল, কেওড়া, কস্তুরি, শুকনো ফল, পোস্তসহ বিভিন্ন মসলা ও সুগন্ধি। শুরুতে খোলা জায়গায় কাঠের আগুনে তৈরি হতো কাবাব। পরে তন্দুর, কয়লার চুলা ও হাল আমলে গ্রিলের প্রচলন হয়।

১৪ শতকের পরিব্রাজক ইবনে বতুতা সুলতানি আমলে ভারতের দিল্লির শাহি বাবুর্চি খানায় কাবাব তৈরি হতে দেখেছেন। সকালের নাস্তা বা প্রাতরাশে রাজ কর্মচারী ও সম্পন্ন প্রজারা নান রুটির সাথে কাবাব পছন্দ করতেন। সুলতান ও মোগলদের রাজ দরবারে রাজকীয় অতিথি আপ্যায়নে অত্যাবশ্যকীয় এবং আভিজাত্যের প্রতীক রূপে বিভিন্ন কাবাবের ব্যবহার হতো।

কাবাব তৈরি একটি শিল্প। এজন্য বাবুর্চি বা রন্ধন শিল্পীর হাতে কাবাবের নতুন নতুন রূপ ধারণ করে। মোগল শাসনের শেষ ভাগে ভারতের লাখনৌ নবাবি সংস্কৃতি ও সুখাদ্যের শহর হিসেবে ছিল সুখ্যাতি। তাদের বাবুর্চিখানায় নিত্য নতুন যত কাবাব সময়ের সাথে সাথে বাবুর্চিরা আবিষ্কার করেন তা অন্য কোথাও সমসাময়িক সময়ে পাওয়া যেত না। পেষা মাংসের কাকোরি কাবাব, মাংসের চ্যাপ্টা টুকরো দিয়ে তৈরি চাপলি কাবাব, মুরগির পায়ের (রান) কলমি কাবাব, কিমা মাংসের গলৌটি কাবাব, শিকে জড়ানো পাতলা মাংসের চেলো কাবাব ও টুন্ডা কাবাব এবং এগুলো ছাড়াও বটি কাবাব, কাঠি কাবাব, রেশমি কাবাব, টিক্কা কাবাব, শামি কাবাব, টেংরি কাবাব, লাস্রোনি কাবাব, টিকেন মালাই কাবাব, হান্ডি কাবাব, বিভিন্ন মাছের কাবাব, চিংড়ির রামপুরি কাবাব যা এই তালিকায় শেষ হবার নয়।

কাবার তৈরি হয় দুভাবে। এক শিকের কাঠ কয়লা বা আধুনিককালে গ্রিলের আগুনে পুড়িয়ে। আরেকটি তাওয়া বা কড়াইতে রান্না করে। ঢাকার কাবাবের আগমন মোগলদের হাত ধরেই। ঢাকায় দুইভাবে কাবাব তৈরি হলেও স্বাদ বিচারে কাঠ কয়লায় ঝলসানো কাবাব উত্তম ও প্রাচীন পদ্ধতি। কোরিয়া থেকে ইউরোপ সর্বত্রই এখন পৃথিবীময় এই কাবাবের অবাধ বিচরণ। ঢাকাও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা তৈরি করেছে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যতা ও বৈচিত্র্যময় স্বাদের কিছু কাবাব। একটি পারসন্দের বা সূতি কাবাব আর অপরটি মোসাল্লাম।

পারসন্দের বা শিক কাবাব

ঢাকার ঐতিহ্যের মূল কাবার পারসন্দের বা শিক কাবাব একে “সুতি কাবাব” নামেও অনেকে ডাকেন। পুরান ঢাকার প্রবীণেরা এখনও সুতি বা সুতলি কাবাব ছাড়া কোনো কিছুকেই কাবাব বলে মনে করেন না। মোগলদের সঙ্গে আসা তাদের নিজস্ব বাবুর্চিরা মোগলদের পছন্দের রুটি ও কাবার তৈরি করতেন। সেই সময় বিখ্যাত ছিল “নান-তাফতান” নামের এক ধরনের নান রুটির সঙ্গে নানান পদের কাবাব। পারসান্দারে শিক কাবার যার অন্যতম প্রধান কাবাব। এক একটি শিকে পনেরো থেকে বিশ সের পরিমাণে মাংসের টুকরো দিয়ে তৈরি হতো শিক কাবাব। কালের বিবর্তনে তা সম্পূর্ণ কাবাবের গায়ে সূতার বাঁধুনির কারণে তা সুতি বা সুতলি কাবাব নামে পরিচিতি লাভ করে। এই কাবাবের বিশেষত্ব এই যে মাংস ঝলসানোতে সিদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ভঙ্গুরতা বা শুকনো হবে, প্যাঁচপ্যাচে ভাব থাকবে না। ভাঙা বা খোলার সময় চুর চুর হয়ে যাবে এবং আস্ত বের করা সম্ভব হয় না। শিকের ভারি কাবাব সূতো দিয়ে পেঁচানো থাকে— এই কাবাব আগে ঘরে তৈরি হলেও বানানোর জন্য বিশেষ কারিগরি দক্ষতা ও জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। ঢাকার রমজান ও কোরবানি ঈদের সময়ই এই শিক কাবার তৈরির প্রচলন বেশি দেখা যায়। এই কাবাব তৈরিতে মাংসের সাথে মসলা ও বেসন ভারসাম্যে মেশানো ছাড়া অন্য কিছুই দেওয়া হয় না। এই শিকে রুই, শোল ও চিংড়ি মাছেরও শিক তৈরি হতে দেখা যেত যা সংখ্যায় খুব কম ছিল।

মোরগ মোসাল্লাম

মোসাল্লাম বা সম্পূর্ণ কাবাব ঢাকায় সাধারণত দুই রকমের তৈরি হতো। এক শিকে বড় দাওয়াতের জন্য ২৫টি পর্যন্ত মোরগ স্যাঁকা হতো। যা বিশেষ কাবাবের বিশেষ ধরনের লোক যে এটা তৈরি করতে পারত। সম্পূর্ণ মোরগ প্রয়োজনীয় মসলা দেয়ার পর সিদ্ধ ডিম ভিতরে পুরে সুতা পেচিয়ে শিকে গেঁথে ঘি মেখে ও ফোঁটা ফোঁটা ঘি দিয়ে সরাসরি আগুনের শিখায় স্যাঁকা হয়। এই মোরগ মোসাল্লাম সত্যিকার অর্থে উন্নত ও সুস্বাদু কাবাব। দ্বিতীয় কাবাব যাকে মাসমান বলা হয় যা এখন হান্ডি কাবাবও বলা হয়ে থাকে। উভয়ের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। মাসমান বা হান্ডি যা কড়াইতে আগুনের আঁচে তৈরি করা হয়। ক্ষেত্র বিশেষে মুরগির ভিতরে ডিম এর সাথে সবজি (আলু, মটরশুঁটি, গাজর) প্রয়োগ করা হয়। তবে তা মাসমান কাবাব এবং বর্তমান ভগ্নাংশ বা বিবর্তিত রূপ এক মুরগির ৪ টুকরা মুরগির রোস্ট। উভয় কাবাবই স্বীয় অবস্থানে উৎকৃষ্টতম কাবাব এবং ঢাকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্যান্য দেশেও মোরগ মোসাল্লাম তৈরি বা পাকানো হয়। কিন্তু সুন্দর ও মজাদারভাবে যা এখানে তৈরি আর কোথাও এরকম প্রাচুর্য সহকারে রান্না হয় না।

টিকিয়া ও শামি কাবাব

টিকিয়া কাবাবকে অনেক ঢাকার লোকেরা পয়সা কাবাব নামেও ডাকেন। টিকিয়া ও শামি কাবাবকে অনেকে একই কাবাব মনে করেন কিন্তু স্বাদ, উপকরণ ও প্রক্রিয়াগত কারণে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা কাবাব। শামি কাবাব খাঁটি আরবীয় খাবার যদিও এর উৎস সিরিয়া। মোগল সাম্রাজ্যের মাঝামাঝি সময়ে অনেক সিরীয় রন্ধন শিল্পী ভারতে অভিবাসন করে। ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের থেকেই এই কাবাবের প্রচলন বলে মনে করা হয়। সাধারণভাবে মাংসের কিমা, ডাল, পার্থক্যগত মসলা একত্রে সিদ্ধ করে মাংসকে বেটে তার সাথে দারুচিনি, জিরা, কালো এলাচ, গোল মচির গুঁড়া, ডিম সহকারে একত্রে মিশিয়ে তারপর ছোট ছোট মাংসের ভাগ নিয়ে গোল ও চ্যাপ্টা করে হাতে তৈরি হয় টিকিয়া কাবাব। কাবাবের পুর হিসেবে কাচা পিঁয়াজ কুচি, পুদিনা পাতা, কাঁচা মরিচ টিকিয়ার মাঝে ব্যবহার করা হয়। ঠিক অনুরূপভাবে মাংসের কিমা, মসলা, ডাল সব একত্রে সিদ্ধ করে বেটে বাটা মাংসে ডিম মিশিয়ে ছোট ছোট গোলা ও চ্যাপ্টা আকৃতিতে তৈরি করা হয় শামি কাবাব। কাবাবের পুর হিসেবে পনির, পুদিনা, ভাজা পেঁয়াজের বেরেস্তা, কাঁচা মরিচ কুচি উভয়ই তেলে ভাজলে তৈরি হয় টিকিয়া ও শামি কাবাব। দুটো কাবাবই চা, পোলাও, রুটি, বাখরখানি, পরোটা দিয়ে খাওয়ার উপযুক্ত। আধুনিককালে রেফ্রিজেক্টরে দীর্ঘ সময়ে যা সংরক্ষণ করা যায়। সারা বছর ঢাকায় সবচেয়ে প্রচলিত ব্যবহারে সুবিধাজনক সুস্বাদু কাবাব বিবেচনায় প্রথম পছন্দ টিকিয়া ও শামি কাবাব।

জালি কাবাব

ঢাকার কাবাবের আরেক সংস্করণ জালি কাবাব। সাধারণভাবে বিশেষ অনুষ্ঠান বা উৎসবে জালি কাবাব তৈরি হয়ে থাকে। জালি কাবাবের মসলার ভিন্নতাসহ পাউরুটি ও বিস্কুটের গুঁড়া এবং ডিমের ব্যবহার হয়। প্রক্রিয়াটি মাংসের কিমার সাথে নিংড়ানো ভেজা পাউরুটি ও মসলা একত্রে মিশিয়ে ছোট ছোট গোলাকার, চ্যাপ্টা কাবাব তৈরির পর বিস্কুটের গুঁড়োর সাথে ফাটানো ডিমে ডুবিয়ে তেলে ভাজা হয়। তেলে ছাড়ার পর কাবাবের উপর আরও কিছু ডিম ছিটিয়ে দিতে হয়। জালি কাবাবের জন্য খাসির মাংস আদর্শ হিসেবে দেখা হয়। সুস্বাদু, নরম ও রসালো কাবাব হিসেবে জালি কাবাব ঢাকায় অনুষ্ঠানাদিতে জনপ্রিয়।

মাছের কাবাব

ঢাকায় শিকের তৈরি কাবাবের মধ্যে রুই, শোল ও চিংড়ি মাছের কাবাব তৈরি হতো। কিন্তু কয়েকটি পরিবারে ইলিশের মতো নাজুক ও নরম মাছের শিক কাবাব বাস্তবিকই অবাক করার মতো কিছু ঘরে তৈরি হতো যা এখন গল্পের মতো শোনায়। উৎকর্ষতা এমনই ছিল রুই বা শোল মাছের কাবাব এমন উত্তমভাবে তৈরি করা হতো যে মাংস ও মাছের কাবাবের পার্থক্য নির্ণয় করা দুষ্কর হয়ে পড়ত। পরিতাপের বিষয় ইলিশের স্মোক কাবাব ছাড়া ঢাকায় এই উৎকর্ষ পদ্ধতি নৈপুণ্য এমনভাবে লুপ্ত হয়েছে, না আছে এর গুণগ্রাহী আর না রয়েছে সেই প্রাচীন পরিবারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা।

অন্যান্য কাবাব

ঢাকার অন্যন্য কাবাবের মধ্যে নার্গিসি কাবাব, বটি কাবাব যা শিকে গরু, খাসি, মুরগির মাংসের ছোট বটির অনুরূপ জিনিস। তাস কাবাব যা উজবেকদের জনপ্রিয় কাবাব হলেও ঢাকায় আরমানীয়দের কাছ থেকে আসা। তেক্কা খাসির আস্ত রান তন্দুরে আগুনে সেঁকে তৈরি হয়। যা খুবই সুস্বাদু এবং প্রচলন এখন একেবারে নেই বলা চলে। আস্ত খাসির রোস্ট যা শিকে তৈরি হয়। উৎসব ও বিবাহ অনুষ্ঠানেই পরিবেশন হতে দেখা যায়।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায় – বাদশাহি ও নবাবি খাদ্য বিলাস
২.
দ্বিতীয় অধ্যায় – ঢাকার রুটি
৩.
তৃতীয় অধ্যায় – ঢাকার কাবাব
৪.
চতুর্থ অধ্যায় – ঢাকার পোলাও ও বিরিয়ানি
৫.
পঞ্চম অধ্যায় – মাংসের মসলাদার খাবার
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায় – বাংলা খাবার
৭.
সপ্তম অধ্যায় – নাস্তা জাতীয় খাবার
৮.
অষ্টম অধ্যায় – ঢাকার পানীয়
৯.
নবম অধ্যায় – ঢাকার মিষ্টান্ন
১০.
দশম অধ্যায় – ঢাকার পিঠা
১১.
একাদশ অধ্যায় – ঢাকার বিশেষ খাবার
১২.
দ্বাদশ অধ্যায় – খাদ্য পরিবেশন
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায় – ঢাকায় রমজানে সেহরি ও ইফতার
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায় – ধর্মীয় উৎসবের খাবার
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায় – পান-হুক্কা-চা
১৬.
ষষ্ঠদশ অধ্যায় – ঢাকার ক্যাটারিং, ডেকোরেটর ব্যবস্থা ও বাবুর্চিরা
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায় – ঢাকার নিরাপদ পানির ব্যবস্থাপনা
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায় – হিন্দু সম্প্রদায়ের খাবার
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায় – ঢাকার বিয়ের খাবার
২০.
বিংশ অধ্যায় – ৪০ দশক পরবর্তী ঢাকার জনপ্রিয় খাবার ও পর্যালোচনা
২১.
২১. পরিশিষ্ট

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%