অষ্টাদশ অধ্যায় – হিন্দু সম্প্রদায়ের খাবার
ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের খাদ্য অভ্যাস, খাদ্য উপাদান ও রন্ধন প্রক্রিয়ার সাথে ঢাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের খাদ্য অভ্যাসে পার্থক্য রয়েছে। ধর্মীয় ও সংস্কারগত কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের খাবারের বিশেষত্ব ঢাকার অন্য খাবার থেকে ভিন্নতা দেখা যায়। ভারতে প্রথম তুর্ক, মোগল রন্ধন এবং পরবর্তীতে পর্তুগিজ, চাইনিজ ও ব্রিটিশদের খাবারের প্রভাব অল্প বিস্তর হলেও তাদের খাদ্যে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। ধর্মীয় গোত্রগত কারণে খাবারে আমিষ আর নিরামিষ ব্যবহারের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। সংস্কার ও বিশ্বাসের কারণে গরুর মাংস পরিহার করলেও মাছ, পাঠার মাংস ব্যবহার তারা করে থাকেন। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের সময় ব্যতিক্রম হিন্দু সমাজে অনেকেই মুরগি ও মুরগির ডিম খাওয়ার প্রয়োজনে তারা হাঁস ও হাঁসের ডিমকে বেছে নিতেন। ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ে পূর্বে তরকারিতে পেঁয়াজ ব্যবহার করতেন না। পরিবর্তিত অবস্থায় বর্তমানে তাদের মধ্যে পেঁয়াজ ব্যবহারের অভ্যাস দেখা যায়। তবে পুজোর প্রসাদ রান্নায় পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয় না। তাদের খাবারে হিং, কালো জিরা, পাঁচফোড়ন, সরিষা, তেজপাতা, ধনিয়া, পোস্তদানা ইত্যাদির ব্যবহার বেশি করা হয়। ঢাকার হিন্দু মধ্যবিত্তরা ভর্তার চেয়ে ভাজা পোড়া বেশি খেতেন। সকাল বা প্রাতরাশে পটল, বেগুন, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি ও ডালের বড়া ভাজা হতো। পরিবারের বয়স্ক ও শিশুরা ভর্তা ভাজির চাইতে দুধ কলা দিয়ে ভাত খেতে অতি পছন্দ করতেন। সম্ভ্রান্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে সকালে লুচি পরোটা, পাঁচমিশালি সবজি, ভাজি, দইসহ মিষ্টান্ন খাবার খেতে দেখা যেত। হিন্দু সমাজে বিধবাসহ কারো কারো খাবারে বাচবিচার ছিল। বিধবারা আতপ চালের ভাত ও নিরামিষ খেতেন। নিরামিষের মধ্যে লাবরা, মোচার ঘণ্ট, মোচার ভাজা, কুমড়ো বড়ি, ভর্তা ইত্যাদি ছিল। তবে নিরামিষ রান্নায় বৈচিত্র্য ছিল অনেক। ষোড়শ শতাব্দীর কাব্যে অন্তঃসত্ত্বা নারীর সাত মাস সময়ে সামাজিক অনুষ্ঠান বা স্বাদ ভক্ষণ উপলক্ষে কয়েকটি নিরামিষের কথা জানা যায় যেমন— পাকা চালতার ঝোল, গিমা শাক, বোয়ালি রান্না, লতা শাক, পুই ডগা, হেলেঞ্চা, কলমি, মুখি কচু আর ফুলবড়ি দিয়ে মরিচের ঝোল, মুলা বেগুনের উরুম্বের ফল দিয়ে রান্না। হিন্দু উৎসবে সাদা আঁশযুক্ত মাছ ব্রাহ্মণকে দেয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। প্রধান খাবার ভাত, লুচি, পরোটা, পাপড় আর ডাল অন্যতম ব্যবহার যোগ্য, তার মধ্যে মশুর, মুগ, খেসারি। সবজি ধরনের মধ্যে কুমড়া, লাউ, ঝিঙে, কলার মোচা, কলার থোর, করল্লা, নিম, কাঁচা কাঁঠাল, বেগুন, আলু, পটল, সজনে, কাঁচ কলা ইত্যাদি অন্যতম। আমিষ বলতে মেটে (ছাগলের কলিজা), পাঠা, কাঁকড়া, কচ্ছপ, বিভিন্ন রকমের মাছ যেমন- বোয়াল, ভেটকি, কৈ, রুই, ইলিশ, চিংড়িসহ নানা পদের ছোট বড় মাছ। খাবারে নারিকেলের ব্যবহারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঢাকার নানা পদের চাটনি তেঁতুল মিশ্রিত বিভিন্ন ফলের টক বা খাট্টা তাদের ঘরেই শ্রেষ্ঠভাবে তৈরি হতো। আর মিষ্টান্ন ১৯ দশকের শেষে ঢাকার দুধ, ছানা, মাঠার ব্যবহারে সমগ্র বাংলায় হিন্দু সম্প্রদায়ে বিরাট ভূমিকা ছিল। এ সম্পর্কে সৈয়দ আলী আহসান তার ষাট বছর আগে ঢাকা গ্রন্থে ঢাকার হিন্দু ও মুসলিম ময়রা দোকানে মিষ্টি সম্পর্কে মনোজ্ঞ বর্ণনা দিয়েছেন।
“ঢাকার জনজীবনে খাদ্য-খাদক সম্পর্কে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনটা খুবই প্রবল ছিল। হিন্দুদের বাড়ির রান্না ছিল একরকম আর মুসলমান বাড়ির রান্না ছিল অন্যরকম। গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে বিচার করলে আমরা দেখতে পাই যে হিন্দুরা যে ধরনের খাবার খেতে অভ্যস্ত ছিল মুসলমানেরা সেই ধরনের খাবার খেত না। শুধুমাত্র ময়রার দোকানের মিষ্টি ছাড়া। ময়রার দোকানের মিষ্টিতে ছিল হিন্দু মুসলমানের সমান অধিকার।”
কালের পরিক্রমায় ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের খাবারেও প্রবেশ করেছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির খাবার। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে ও তাদের খাদ্য সংস্কৃতি বজায় রেখেই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন খাবার অভ্যাস। সামাজিক ও বৈবাহিক অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে যুক্ত করেছেন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নানান খাবার।
মাঝারি ঘনত্বের ঝাল মসলা জাতীয় খাবার। সবজি, ডাল, ডিম ভিন্ন প্রধান উপকরণ। ধোঁকার ডালনা, ছানার ডালনা, ডিমের ডালনা, ইচরের ডালনা, ডুমুরের ডালনা, ফুলকপি ডালনাসহ আরও অনেক পদের ডালনা তৈরি হয়ে থাকে। ধোঁকার ডালনায় মুসরের ডালের বড়ার ঝোল নিরামিষ খাবারে মাছের ঝোলকে প্রতিস্থাপন করে। ডালকে সারারাত ভিজিয়ে সেই ডালের তৈরি বড়া বিভিন্ন মসলায় ঘি দিয়ে তৈরি হয় ধোঁকার ডালনা। মধ্যাহ্নভোজের জনপ্রিয় খাবার।
ঘণ্ট একটু শুকনো নরম, রসালো মাছে প্রধান। দুপুরে বা রাতের খাবারের জনপ্রিয় ও সবার পছন্দনীয় ভাত প্রধান একটি খাবার। সাধারণভাবে বিভিন্ন মাছের মাথার সাথে ডাল মিশ্রণে তৈরি হয় মুড়োঘণ্ট। মুড়োঘণ্ট যার বিবর্তিত নাম মুড়িঘণ্ট। এছাড়াও বিভিন্ন সবজি কপি, সবুজ মটর, আলু, কলার মোচা, লাউ যোগেও ঘণ্ট রান্না করা হয়। মশলা হিসেবে পাঁচফোড়ন, আদা, রসুন, জিরা, পেঁয়াজসহ অন্যান্য মসলা দিয়ে রান্না হয়। কেউ কেউ ডালের বড়ি ব্যবহার করেন। মাছের মধ্যে রুই মাছের মাথা, বোয়াল, মৃগেল, কাতলা, ভেটকি মাছের ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে। ঘণ্ট রুচিভেদে লাউয়ের ঘণ্ট, কচু শাকের ঘণ্ট, ইলিশ মাছের ঘণ্ট, থোর মুড়ি ঘণ্ট ইত্যাদি ঘণ্ট তৈরি হয়ে থাকে। ঘরোয়া নিমন্ত্রণ বা অতিথি আপ্যায়নে ঘণ্ট ছাড়া খাবার পরিবেশন অপূর্ণই থেকে যায়।
চচ্চড়ি মাছ ও সবজি প্রধান খাবার। ১৮ শতকের মাঝামাঝি বাংলা খাবারে চচ্চড়ি মোটেও জনপ্রিয় খাবার ছিল না। কোলকাতার চাইনিজ রন্ধন প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করে চচ্চড়ি রান্নার ধরন চাইনিজ চপসি যা সবজি ও মাছের বিশেষ প্রক্রিয়া থেকে বাঙালি খাবারে প্রবেশ করেছে। উৎস যাই হোক না কেন হালকা ও শুকনো মাখা মাখা মসলার সুস্বাদু চচ্চড়ি বাঙালি হিন্দু সমাজে সাধারণ ও পছন্দনিয় খাবার। চচ্চড়িতে একটু বেশি তেল, পেঁয়াজ ও মসলার প্রয়োজন হয়। মাছের মধ্যে ছোট মাছ, সবজির মধ্যে সিম, আলু সবজির বীজসহ যে কোনো সবজির ব্যবহারে তৈরি হয় চচ্চড়ি। ডালের চচ্চড়ি কাঁঠালের বিচির চচ্চড়ি, কাচকি, টেংড়া, ভুতুম মাছের চচ্চড়ি, সজনে ফুলের চচ্চড়ি, ডাটার চচ্চড়ি, পাঠা চচ্চড়ি, শুঁটকি-বেগুন-আলুর চচ্চড়ি, মেটে (ছাগলের কলিজা) চচ্চড়ি, কাঁচা আম ও আমড়ার চচ্চড়িসহ নানা পদের চচ্চড়ি ভাত উপযোগী খাবার।
পাতায় তৈরি হয় পাতুরি। কলাপাতায় মোড়ানো মাছে ভাপে রান্না করা একটি বিশেষ খাবার। ইলিশ, ভেটকি, কৈ, চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছের টুকরো সরিষা বাটা, হলুদ, কাঁচা মরিচ, সরিষার তেলের মিশ্রণে কলাপাতায় মুড়ে সুতো দিয়ে বেধে কড়াই বা তাওয়ায় ভাপে তৈরি হয় পাতুরি। মাছের টুকরোর সাথে মসলার মিশ্রণে অনেকে নারিকেল কুচি ব্যবহার করে থাকেন তার স্বাদ পছন্দ অনুযায়ী। বিভিন্ন আচার, উৎসব, অনুষ্ঠানে পাতুরি ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পছন্দনীয় খাবার। কলাপাতার পরিবর্তে অনেকে লাউ পাতা পাতুরি তৈরিতে ব্যবহার করে থাকেন।
তেতো বা তিত জাতীয় খাবার। বাঙালি প্রবাদ আছে, “আগে তেতো পরে মিঠা”। খাবারের শুরুতে তেতো খাবারের চলটি এখান থেকে এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। খাবারে শুক্তোর ব্যবহার মুখের স্বাদ বদলে রুচিকর এবং ঔষুধিগুণ হিসেবে বিবেচিত হয়। শুক্তো তৈরির প্রধান উপকরণ করল্লা এবং ক্ষেত্র বিশেষে নিম পাতা। সাথে বেগুন, আলু, সজনে, কুমড়ো, কাঁচ কলা, কুমড়া, ডাল ইত্যাদি ব্যবহারে ভিন্নতায় তৈরি হয় শুক্তো। খাবার পরিবেশনে হিন্দু সংস্কৃতিতে সনাতনি প্রথা হিসেবে প্রচলিত রয়েছে শুক্তা, শুক্তানি, শুকা বা শুক্তোর ব্যবহার। রন্ধনশৈলী খুবই সাধারণ কিন্তু হিন্দু বাড়িতে গরম কালে দুপুরের খাবারে অতি পরিচিত পদ শুক্তো। কম মসলার সহজ পাচ্য ও রুচি বর্ধক একটি খাবার।
মোগল রান্নায় জনপ্রিয় দম রন্ধন পদ্ধতি থেকে আসা শব্দটি বাংলার দম ও রন্ধন প্রক্রিয়াটা এখান থেকে খাবার আলুর দম। বলা হয় ব্রিটিশ আমলে বাঙালি সেনাদের ভাতের আলস্য দূর করার জন্য সেনা ছাউনিতে প্রতিদিন রান্নায় আলু খাওয়ানোর আদেশ দেন সেনাপতিরা। কিন্তু আলু খেয়ে ভেতো বাঙালিরা প্রাণ তুষ্ট হতো না। শুরু হয় আলুর সহজ ও বিকল্প রন্ধন প্রক্রিয়া খাবার উপযোগী করার। বের হয়ে আসে আলুর ব্যবহারে বিচিত্র পদের খাবার। খাবারগুলো বাঙালি রান্না ঘরে প্রবেশ করলেও পরিবর্তন করতে পারেনি ভাত প্রধান খাদ্য অভ্যাস। আলুর দম, আলুর পোস্ত সবই বাঙালির রসুই ঘরে জনপ্রিয় ও তাদের নিজস্ব বিবর্তিত রূপ। রুটি, লুচি প্রধান খাবার হলেও ভাতের সাথেও আলুর দম ও আলুর পোস্ত খেতে দেখা যায়। আলু ছোট হলে আস্ত আর বড় হলে দুই টুকরো করে তেল বা ঘিয়ে কসিয়ে, হলুদ, মরিচ, মেথি, ধনে, আদা, তেজপাতা প্রয়োজনে টমেটো দিয়ে দমে রান্না করলে হয় ঝাল ও মুখরোচক স্বাদের আলুর দম। মাছ বা মাংস যাদের অরুচি তাদের খাবারে নিয়ে আসতে পারে ভিন্নতা। ঢাকার ৫০ দশকে হিন্দু হোটেল ও রেস্তোরাঁয় আলুর দম ও লুচি খাবারের প্রচলন ছিল। শহরের সব শ্রেণির মানুষই অংশীদার ছিলেন এই খাবারের।
শীত, নবান্ন, পূজা পার্বনে হিন্দু সম্প্রদায়ে পিঠা পুলি তৈরি একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ। মজাদার ও বৈচিত্র্যময় স্বাদের নারিকেলের নাড়ু, ভাপা চালের পিঠা, গুড়ের পিঠা, চন্দ্রপুলি তেলের পিঠাসহ অসংখ্য পদের পিঠা তাদের ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ তৈরি করত। তিল, কাউন, মুড়ির ও চিড়ার মোয়া এত প্রকারভেদ যা ছিল সম্পূর্ণই লোকজ। এবং হিন্দু রমণীকুলের নিজস্ব ও সৃজনশীলতার পরিচায়ক।
এছাড়াও দৈনন্দিন খাবারে ছানার কালিয়া, রুই কালিয়া, ভাপা ইলিশ, চিংড়ি মালাইকারি, তপসে মাছ ভাজা, কুমড়ার ছক্কা, কাঁচ কলার কোফতা, কসা মাংস ইত্যাদি তাদের খাবারে দেখা যেত। হিন্দুদের জামাই ষষ্ঠিতে মূলত শাশুড়িরা ষষ্ঠি দেবীর পূজা করে মেয়েসহ মেয়ে জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় ভুঁড়িভোজের আয়োজন করেন। ভোজনের অন্যতম পদ ইলিশ মাছ। অন্যান্য জামাই আদরণীয় খাবারের পাশাপাশি ইলিশ পাতুরি, সর্ষে ইলিশ, ভাজা ইলিশের মধ্যে যে কোনো একটি পদের পরিবেশনার প্রথা দেখা যায়। সর্বপরি ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের খাবারে সনাতনি বাংলার আদি খাবারগুলোকে তারা মনে প্রাণে লালন করেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন