পঞ্চম অধ্যায় – মাংসের মসলাদার খাবার

পঞ্চম অধ্যায় – মাংসের মসলাদার খাবার

মাছ, মাংস, সবজি সব রান্নায় মসলা একটি প্রধান অনুসঙ্গ। মসলার তারতম্য ব্যবহারে তৈরি হয় খাবারের ভিন্ন স্বাদ, ঘ্রাণ ও রং রূপের বৈচিত্র্যতা। ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও সমাজ তাদের খাবারে প্রয়োগ করেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মসলা এবং সাথে অন্য জাতি ও দেশ থেকে প্রাপ্ত মসলাদি। ফলে তাদের খাদ্যে আসে বৈচিত্র্য ও নিজস্বতা। ঢাকাই লোকজনের মসলাদার খাবাই প্রিয়। যে কারণে তাদের খাদ্য প্রস্তুতে অধিক তেল, ঘি, মসলার উপস্থিতি দেখা যায়। তবে মসলা, তেল ও ঘি রকমফের করলে খাদ্য তার প্রকৃত স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য হারাতে পারে। সেজন্য ঢাকাই খাবারগুলো তাদের মধ্যে বংশানুক্রমিকভাবে খাদ্য অভ্যাসে গেঁথে গেছে।

ঢাকাসহ সমগ্র বাংলায় আদিকাল থেকে উৎপাদিত হতো হলুদ, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, সরিষা, মরিচ। যার ফলে দৈনন্দিন রান্নায় এ সকল মসলার ব্যবহার বহুকাল থেকে প্রচলিত ছিল। ১৪-১৬ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য ও কাব্যে বেশ কয়েকটি মসলার নাম পাওয়া যায়। এলাচ, লবঙ্গ, মেথি, হিং, জিরা। ভারত মহাসাগরে মালাক্কা, সুমাত্রা, জাভা দ্বীপ অঞ্চল ছিল মসলার জন্য প্রসিদ্ধ। পর্তুগিজ বণিকেরা ঢাকাসহ অন্যান্য বন্দরে নিয়ে আসতে থাকেন জিরা, জয়ফল, জয়ত্রী, তেজপাতা, জৈন, গোল মরিচ, মৌরি, দারুচিনি, মরিচ, ধনিয়াসহ নানা রকমের মসলা। চতুর্দশ শতাব্দী থেকে ঢাকায় দেখা যায়— মধ্য এশিয়া, আরব, পারস্য থেকে আসা সুফি দরবেশদের সাথে আরব বণিকদের। আরব বণিকেরা পূর্ব ভারতীয় মসলার সাথে আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। বঙ্গোপসাগর ও ঢাকার নদী বন্দরে এক সময়ে বিভিন্ন মসলা তারা নিয়ে সমগ্র ভারত মহাসাগর, আরব সাগর ও ভূমধ্যসাগরের পারে ব্যবসা করতেন। ভারতের কালিকোট বন্দর গোল মরিচ, সিংহলের দারুচিনি ও মরিচ, বাংলার আদা ও চিনি ছিল প্রধান মসলা। তুর্কিরা এই সব মসলার ব্যবহার ভালোই জানতেন। তাঁরা তাঁদের খাবারে মাংস পোলাও, মিষ্টান্নে এইসব মসলার সুচারু প্রয়োগ ঘটাতেন। পরবর্তীতে মোগলরা এই খাবারে যোগ করে পারস্যের স্বাদ ভিন্ন নিজস্ব ঘরানায় মোগলীয় খাবার আর জাফরান।

জাফরান বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলা হিসেবে পরিচিত। যার লোহিত স্বর্ণ বা গোল্ডেন স্পাইস হিসেবে সুনাম রয়েছে। খাবারের স্বাদ, ঘ্রাণ আর রং বাড়িয়ে তুলতে এর জুড়ি নেই। এখানে জাফরানের কাজ সীমাবদ্ধ নয়। এর রয়েছে অসাধারণ ঔষুধি গুণ। ধারণা করা হয় ২০০০ বছর আগে ইরানে জাফরান ব্যবহার শুরু হয়। ইরানের খোরাসান প্রদেশ জাফরানের জন্য বিখ্যাত। বছরে গড়ে ২০০-৩০০ টন জাফরান তারা উৎপাদন করেন। দক্ষিণ এশিয়ার ভারতের কাশ্মির জাফরানের বৃহৎ যোগানদাতা। এছাড়াও স্পেন, ইটালি, গ্রিসের জাফরান চাষ হয়ে থাকে। জাফরান হচ্ছে বেগুনি রঙের ৬ পাপড়ি বিশিষ্ট ফুলের পুংকেশর। মধ্য হেমন্তের মাত্র ২ সপ্তাহ সময় পাওয়া যায় এই ফসল ঘরে তুলতে। সকালে সূর্য ওঠার সময় ফুল ফোটে আর দিনের শেষে মলিন। বংশবিস্তার করতে পারে না মানুষের সাহায্য ছাড়া। এর ক্রোমগুলো এক বছরের বেশি বাঁচতে পারে না। এর মধ্যেই এই ক্রোমগুলোকে মাটিতে রোপণ করতে হয়। ফুল হাত দিয়েই সংগ্রহ করতে হয়। মেশিনের ব্যবহার করা যাবে না। আবার পরিস্ফুটিত হবার সাথে সাথে তা তুলতে হয়। ফুল তুলে কমলা রঙের গর্ভদণ্ড আলাদা করতে হয়। গর্ভদণ্ডগুলো রোদে শুকাতে হয় যার কারণে জাফরান তার ৮০ ভাগ ওজন হারায়। আর এটা গুঁড়া করে পাওয়া যায় কাঙ্ক্ষিত জাফরান। সবদেশের আবহাওয়া জাফরান চাষ উপযোগী নয়। প্রায় ৫ লক্ষ ফুল থেকে ৫০ গ্রাম জাফরান পাওয়া যায়। যে কারণে জাফরানের দাম বেশি। বর্তমানে এককেজি জাফরানের বাজার মূল্য ২১ লক্ষ টাকা। এ কারণে মনে হয় মোগল বাদশাহি সব খাবারে জাফরানের ব্যবহার সর্বাধিক। ধারাবাহিকভাবে ঢাকায় পোলাও, মাংস, মিষ্টান্নসহ বিভিন্ন খাবারে জাফরানের উপস্থিতি বেশি দেখা যেত। ২০ শতকের ৮০ দশকের পর থেকে ঢাকার বনেদি ও সামাজিক আনুষ্ঠানিক খাবারগুলোতে জাফরানের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মাত্রাতিরিক্ত রঙের ব্যবহার, দুষ্প্রাপ্যতা এবং তার মূল্য এর অন্যতম কারণ। দৈনন্দিন রান্নায় স্থানীয় পিঁয়াজ, হলুদ, আদা, মরিচ, রসুন, সরিষা ব্যবহার হলেও মাংস রান্নায় ঢাকায় দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচ, পোস্তদানা, জয়ফল, জয়ত্রি, জিরাসহ বিভিন্ন মসলা প্রয়োগে তৈরি করে ভিন্ন ভিন্ন মাংসের মসলাদার খাবার। সনাতনি পদ্ধতিতে ঢাকায় মসলা পাটা- পুতায় পিষে তৈরি করা হলেও হাল আমলের প্যাকেট বা মেশিনে তৈরি গুঁড়া মসলার ব্যবহারে খাবারের আগের স্বাদের বিলুপ্তি ঘটেছে। নগর ব্যস্ততা, প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে ঢাকার মানুষ গুঁড়া মসলায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। তবে অনেক পেশাদার বাবুর্চি এখনও উৎসব বা বিশেষ অনুষ্ঠানে খাবার প্রস্তুতে পাটা-পুতার ব্যবহারেই মসলা পিষে নেন। কেননা এই পেষা মসলা দিয়ে তৈরি খাবারের স্বাদ সমসময়েই আলাদা।

কোফতা

কোফতা পারসিয়ান শব্দ কোফতান থেকে কোফতা— অর্থ যা মিশ্রণ বা পেষাই করা মাংসের বল। সকল মুসলিম প্রধান দেশেই বিভিন্ন নামে কোফতা ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যের ব্যবহার রয়েছে। তবে ভারতসহ অনেক দেশেই মাছ, সবজির ব্যবহারে কোফতা তৈরি হয়ে থাকে। তুর্কি, মোগলদের দ্বারাই ভারতীয় উপমহাদেশে এই খাবারের প্রবেশ। ঢাকার বিখ্যাত “নারগিসি কোফতা” মোগলরা ব্রিটিশদের “নারগিসাস” কোফতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের খাবার যোগ করে। ঢাকায় তৈরি বিভিন্ন কোফতার মধ্যে কাঁচা মাংসের কোফতা, সিদ্ধ মাংসের কোফতা, বিরিনজি কোফতা (যার মধ্যে চাল, পনির এবং ফল-ফলাদি পুর হিসেবে ভরা হয়), কোফতায়ে কালিয়া, কোফতায়ে কোরমা অন্যতম। ডিম যোগে নারগিসি কোফতা ঢাকার উৎসব, অনুষ্ঠানে প্রচলিত কোফতা। মাংস হিসেবে গরুর মাংস ব্যবহার কোফতায় বেশি হলেও খাসির মাংসের কোফতাও তৈরি হয়ে থাকে। বিশেষ মাছের কোফতা (চিতল ও ফল্লি মাছ) ঢাকাবাসীর খাবারে দেখা যায় যা তাদের বিশেষ নৈপুণ্য এবং বাড়িতে অত্যন্ত ভালো মানের কোফতা তৈরি হয়। কোফতার কোরমা ঢাকার লোকের প্রিয় খাবার। যা তাদের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। ভাত, পোলাও, রুটি সব কিছুর সাথে কোফতা ভাজা বা কোফতার কোরমা ঢাকায় প্রচলিত রয়েছে।

কিমা

সম্ভবত গ্রিক শব্দ থেকে ধার করা। আসল অর্থ খণ্ড খণ্ড বা মিহি করে কাটা মাংস কিমাকে তুরস্কে “কায়েমা”, আরমেনীয় “গীয়াম”, আর উপমহাদেশে কিমা নামে পরিচিত। ঢাকায় কিমা দুইভাবে রান্না করা হয়। প্রধান মাংস গরু হলেও খাসি এবং বর্তমানকালে মুরগির মাংসের কিমার প্রচলন রয়েছে। কিমার প্রধান উপকরণ মিহি করে কাটা মাংস ঘি-মাখন, পিঁয়াজ, আদা, রসুন, মরিচ গরম মসলার সাথে সবুজ মটর দানা, আলু খণ্ড আর কিসমিস। কিমা রুটি প্রধান খাবার, ভাতের সাথে খাবার নয়। এছাড়াও সবজির পুর, সমুসার পুর হিসেবে কিমার ব্যবহার ঢাকায় প্রচলিত। পুরের জন্য কিমা একটু শুষ্ক ও ভাজা ভাজা করে তৈরি করা হয়। আর রুটির জন্য কিমা একটু রসালো হয়ে থাকে। মাংসকে কিমা করার জন্য ঢাকায় হাতে চালিত মেশিন পাওয়া যেত। বর্তমানে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত ব্লেন্ডার আবিষ্কারের ফলে ঘরে ঘরে হাতের কিমা মেশিন প্রচলন কমে গেছে। খাদ্যে কিমার ব্যবহরে উপমহাদেশসহ অন্যান্য দেশে বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা দেখা যায়। মানুষ তার রুচি ও পছন্দকে অঞ্চলভেদে ভিন্নতা দান করেন। ঢাকায় পটলের দোলমায়, করল্লার দোলমায়, সমুসা, আলুর চপ, পরোটা, পুরি, মোগলাই নাস্তায় ইত্যাদির মধ্যে কিমার ব্যবহার করে থাকেন।

কোর্মা

কোর্মা শব্দের তুর্কিতে “কাভুমা” আবার পার্সিয়ান “কোরমা”, উর্দুতে “ওরমা”। ঢাকা দেওয়া পাত্রে ধীরে ধীরে মাংস রান্না করার নামই কোর্মা। তুর্কি ভাষার মূল শব্দটির অর্থও তাই। উৎস যাই হোক ১৬ শতকে কোর্মা মোঘল রান্নায় প্রবেশ করে। তুর্কিরা রান্নায় লাল মরিচ ব্যবহার করে না। ব্যবহৃত হয় গোল মরিচ। এই জন্য সেসব শহর বা প্রদেশে কোর্মা ও কালিয়ার মাঝে শুধু হলুদ প্রয়োগ করা বা না করার পার্থক্য দেখা যায়। ঢাকায় কোর্মার প্রবেশ মোগল যুগেই তবে ঢাকার কোর্মাতে নতুনত্ব আনা হয়েছে। মোঘল যুগে পর্তুগিজ বণিকদের মরিচ আমদানি করার পর ঢাকার কোর্মায় কাঁচামরিচ দেওয়ার প্রচলন ঘটে। পরবর্তীতে টক দই যোগ করে কোর্মার সাদা রং ঠিক রেখে আরও পরে হলুদ যোগে তৈরি করে নতুন এক কোর্মা যাকে ঢাকায় “রেজালা” বলা হয়। কোর্মা বা রেজালায় মাংস হিসেবে মুরগির ব্যবহার থাকলেও বড় অনুষ্ঠান বা আপ্যায়নে খাসির কোর্মা বা রেজালা তৈরি করতে দেখা যায়। এ রান্নার মূল পদ্ধতি হলো প্রথমে জোরালো আঁচ, পরে পানি না দিয়ে বা খুব অল্প পানি দিয়ে অনেকক্ষণ হালকা আঁচে রান্না। শেষদিকে হাঁড়ির মুখ আটা দিয়ে বন্ধ করেও অনেকসময় কোর্মা রান্না করা হয়। পদ্ধতির কিছু হেরফের হতে পারে তবে এর স্বাদ ও ঘ্রাণ নির্ভর করে রান্নার পদ্ধতির উপরই। ভাত, পোলাও ও রুটির সাথে কোর্মা উপাদেয়। ঢাকার কোর্মায় বিশেষ মসলা ব্যবহারের কথা জানা যায়। কোর্মার মধ্যে বাদামে কোর্মা, মালাই কোর্মাসহ ঢাকায় বিশেষ বিশেষ বাড়িতে উন্নতমানের ও ভিন্ন স্বাদের কোর্মা রান্না হতে দেখা যেত। বাড়ির রোগীর খাবার হিসেবে ডিমের সাদা কোর্মা তৈরি করা হতো। ঢাকাই লোকজন খাসির কোর্মা বা রেজালা রান্নার পরদিন বাসি হলেই খেতে বেশি সুস্বাদু হয় বলে মনে করেন।

কালিয়া

আরবি শব্দ কালিয়া। যার অর্থ ভাজা বা পোড়া। কোর্মা ও কালিয়ার পার্থক্য নিয়ে নানা মতভেদ থাকলেও দুটোর ফারাক তেমন নেই। ঢাকার কালিয়ায় লাল মরিচের ব্যবহার বেশি। সাথে একসময় ঘি বা সরিষার তেলের ব্যবহার থাকলেও বর্তমানে সাধারণ তেলেই কালিয়া রান্না করতে দেখা যায়। ঢাকায় মোঘল আমলে আরবি কালিয়ার কথা জানা যায়। যা বাঁশের মোচা দিয়ে গরুর মাংসের কালিয়া তৈরি হতো। কালিয়া রান্নার প্রকারভেদে পার্থক্য থাকলেও ঢাকার বিখ্যাত গরুর কালিয়া। আলু যোগে তৈরি এই কালিয়া বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন—মিলাদ মাহফিল, মৃত্যুবার্ষিকী ইত্যাদিতে ঢাকায় রান্না হতে দেখা যায়।

জাহাজি কালিয়া

ঢাকার আরেক কালিয়ার নাম জাহাজি কালিয়া। পূর্বে পালের জাহাজ ছিল। যারা ভ্রমণ এবং হজে যেতেন এছাড়াও ইরাক, ইরানে ব্যবসায়ীদের গন্তব্য হিসেবে তাদের পৌঁছতে কয়েক মাস সময় লেগে যেত। নিজেদের সঙ্গে রুটি দিয়ে খাবার জন্য জাহাজি কালিয়া সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এই কালিয়ার বিশেষত্ব ছিল এই যে, এটি গরম করা ছাড়া কয়েকমাস ভালো থাকত। জাহাজি কালিয়া তৈরিতে ব্যবহৃত হতো জয়তুনের তেল। কেননা জয়তুনের তেলের পরিবর্তে ঘি বা অন্য কোনো তেল ব্যবহার করলে কালিয়ার স্থায়িত্ব কম হয়ে যেত। তবে এটা জরুরি ছিল যে, এতে হাত লাগানো যাবে না। এবং কাঠের চামচ ছাড়া অন্য কোনো চামচ ব্যবহার করা যায় না। এই কালিয়া চীনা বৈয়মে রান্নার পর সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হতো। প্রকৃত ভ্রমণকারীদের জন্যই উদ্ভাবিত হয়েছিল এই জাহাজি কালিয়া।

দোলমা

তুর্কি শব্দ দোলমা। তুর্কিরা এখনও এই শব্দ ব্যবহার করেন। ঢাকাই লোকেরা তুর্কিদের মতোই দোলমার মধ্যে মাংসের কিমা প্রয়োগ করে থাকে যা বেশির ভাগ পটল ও করল্লার দোলমাই এখানে রান্না হয়ে থাকে। সাধারণভাবে দোলমা তৈরি করে তার দোপেঁয়াজা করা হয়। এতে তার স্বাদ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। অন্যান্য সবজির মধ্যে টমেটো, দেশি বেগুন, খিরার দোলমা তৈরি হয়ে থাকে। মাংসের কিমাকে পুর হিসেবে দিয়ে সবজির উপর সূতার বাঁধনে ঘিয়ে ভাজা দোলমা তৈরি হয়।

শাবডেগ

শাবডেগ নাম ফারসি দুটি শব্দ দিয়ে গঠিত। শব অর্থ রাত আর ডেগ এর অর্থ হাঁড়ি। অর্থাৎ রাতের হাঁড়ি। ঢাকার মোঘল আমলে আরেকটি খাবার হলো শাবডেগ। শাবডেগ শালগম এবং খাসির মাংসের এক ধরনের সুস্বাদু কোরমা জাতীয় খাবার। রাতে রান্না করা হয় এর জন্য এর নাম শাবডেগ। ঢাকায় কয়েক প্রকার শাবডেগ তৈরি হয়ে থাকে। শালগমকে কেচা কেচা করে রান্না আর আস্ত কেচা ছাড়া। শাবডেগ তৈরিতে খাসির মাংসই ব্যবহৃত হয়। প্রাচীন প্রথা হিসেবে এক সের মাংসে চার টুকরা বটি দেওয়ার নিয়ম হলেও অনেকে আট থেকে দশ টুকরা বটি দিয়ে থাকেন। আস্ত শালগম বিশেষ মসলায় কোর্মার মতো তন্দুরে রান্না করা শাবডেগ স্বাদে ও সুগন্ধে অনুপম হয়। ঢাকার কাশ্মিরিরা বড়ি দিয়ে শাবডেগ তৈরি করতেন। যা ঢাকাই লোকদের বিশেষ পছন্দ ছিল না। আবার কিছু লোক কালিয়ার মসলা মিশিয়ে শাবডেগ তৈরি করতেন যাকে ঢাকাই লোকেরা শাবডেগের কালিয়া নামে ডাকেন। শাবডেগ ঢাকায় পৌষ-মাঘ মাসের শীতে রান্না করা হতো। কাঠ কয়লার আগুনে দম পদ্ধতিতে। মাঝে মাঝে হাঁড়িটি দোলানো হতো যাতে তলায় পুড়ে না যায়। রান্নার সময় বের হওয়া সুগন্ধি থেকে বোঝা যেত শাবডেগ রান্না হয়ে গেছে। ঢাকার শাবডেগ পছন্দকারীরা এবং আদর্শ শাবডেগ তৈরির রন্ধনকারী লয়প্রাপ্ত হয়ে গেছেন। ঢাকায় আসল শাবডেগের একটা বড়গুণ ছিল যে এটা চাল ও রুটি বিশেষত্ব শিরমাল দিয়ে খুব ভোরে খাবার উপযোগী ছিল। শাবডেগ বর্তমান ঢাকায় বিলুপ্ত খাদ্য তালিকাতে চলে গেছে।

শিশরাঙা

ঢাকার একটি আদি ও বর্তমানে বিলুপ্ত খাবার। ফারসিতে শশ বা শিশ অর্থ ছয়। রঙ্গা বা রাঙা অর্থ রঙিন। আর খাবারের অর্থে কমলা বা রঙিন ফলের সমারোহ। শিশ রাঙা ডিমের টক মিষ্টি জাতীয় মিশ্রিত খাবার। ফল হিসেবে কমলা, আনারসের ব্যবহার বেশি ছিল। এটা খাবার জন্য সাদা পোলাও এবং রুটি উপযোগী। তৈরির প্রক্রিয়াটা ছিল ঘিয়ে ভাজা ৬ বা ৮টা ডিম সিদ্ধ। ঘিয়ে পেঁয়াজ বেরেস্তা করে আদা, এলাচি, দারুচিনি দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়ার পর ভাজা ডিমের সাথে অল্প চিনি, কমলার খোসার কুচি বা আনারসের পেস্ট দিয়ে অল্প আঁচে রান্না করা হয়। এতে বাটা পেঁয়াজ, হলুদ, জিরা, ধনিয়া, অন্য কোনো মসলা দেয়া হতো না। খাবারের ভুনা ঘ্রাণ বের হলে কিসমিস দিয়ে চুলা থেকে নামিয়ে পরিবেশন করা হতো।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায় – বাদশাহি ও নবাবি খাদ্য বিলাস
২.
দ্বিতীয় অধ্যায় – ঢাকার রুটি
৩.
তৃতীয় অধ্যায় – ঢাকার কাবাব
৪.
চতুর্থ অধ্যায় – ঢাকার পোলাও ও বিরিয়ানি
৫.
পঞ্চম অধ্যায় – মাংসের মসলাদার খাবার
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায় – বাংলা খাবার
৭.
সপ্তম অধ্যায় – নাস্তা জাতীয় খাবার
৮.
অষ্টম অধ্যায় – ঢাকার পানীয়
৯.
নবম অধ্যায় – ঢাকার মিষ্টান্ন
১০.
দশম অধ্যায় – ঢাকার পিঠা
১১.
একাদশ অধ্যায় – ঢাকার বিশেষ খাবার
১২.
দ্বাদশ অধ্যায় – খাদ্য পরিবেশন
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায় – ঢাকায় রমজানে সেহরি ও ইফতার
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায় – ধর্মীয় উৎসবের খাবার
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায় – পান-হুক্কা-চা
১৬.
ষষ্ঠদশ অধ্যায় – ঢাকার ক্যাটারিং, ডেকোরেটর ব্যবস্থা ও বাবুর্চিরা
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায় – ঢাকার নিরাপদ পানির ব্যবস্থাপনা
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায় – হিন্দু সম্প্রদায়ের খাবার
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায় – ঢাকার বিয়ের খাবার
২০.
বিংশ অধ্যায় – ৪০ দশক পরবর্তী ঢাকার জনপ্রিয় খাবার ও পর্যালোচনা
২১.
২১. পরিশিষ্ট

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%