সপ্তদশ অধ্যায় – ঢাকার নিরাপদ পানির ব্যবস্থাপনা
ঢাকা শহরে এখন যত সহজে খাবার পানি পাওয়া যায় একসময়ে পান যোগ্য পানির জন্য মহল্লা মহল্লায় যুদ্ধ করতে হতো। বাসা-বাড়িতে অনেকের পাতকুয়া থাকলেও সবাইকে খাল, পুকুর ও বুড়িগঙ্গা পানির উপর নির্ভর করতে হতো এবং নিজ উদ্যোগেই সেই পানি তারা জোগার করতেন। তখন অবশ্য নদীর পানি পান করার মতো পরিষ্কারই ছিল। পরিষ্কার হলেও সারাবছরই এই পানি পানের কারণে বছরে ২ বার কলেরাসহ নানা পানিবাহিত রোগে মহামারী দেখা দিত। ঢাকার সিভিল সার্জেন্ট জেমস টেইলার ১৮৩৯ সালে তার এক রিপোর্টে বলেন, ঢাকার স্থানীয় অবস্থাপনা ইয়োরোপীয় অধিবাসীরা অনেকদিন ধরে খাবার পানি হিসেবে শীতলক্ষা নদীর পানি ব্যবহার করতেন। সে সময় ঢাকার বিভিন্ন মহল্লা ও বাড়িতে কূপ থাকলেও বর্ষাকাল ছাড়া তা ব্যবহার উপযোগী থাকত না। কারণ ঢাকায় তখনো নির্দিষ্ট জায়গায় আবর্জনা ফেলার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বাড়ির আসে পাশেই দৈনিক ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে বছরের পর বছর সেগুলো জমা হয়ে পরিবেশকে দূষিতই করত না বরং বন্যার সময় এই সব আবর্জনা জমা হয়ে কূপগুলোতে গিয়ে পড়ত। এছাড়াও অনেক সময় আবর্জনা চুঁইয়ে চুঁইয়ে মাটির তলদেশ দিয়ে কূপগুলোকেও দূষিত করে ফেলত। আপদকালীন সেই সময়ে ধনী পানি আনতেন মেঘনা থেকে। জেমস টেইলরের বর্ণনার ৩০ বছর পর ঢাকার পানীয় জলের অবস্থা আরও খারাপে উপনীত হয়। ১৮৬৯ সালে ঢাকার সহকারী সিভিল সার্জেন্ট এক রিপোর্টে জানান, শহরের কুয়োর পানিও শুধু ভয়ানক দূষিত নয়, দূষিত খাল ও নদীর পানিও। এই পানি পানের ফলে ঢাকাবাসীকে সারাবছরই উদারাময়, প্লীহা ও শ্লীপদ জাতীয় রোগে ভুগতে হচ্ছে। তাই দেখা যায় ঢাকায় মোগল আমল থেকে ১৮৭৮ সালে চাঁদনি ঘাটে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য ওয়াটার ওয়ার্কস কার্যক্রম শুরুর আগ পর্যন্ত পরিষ্কার ও নিরাপদ পানির কোনো ব্যবস্থাই ঢাকায় গড়ে ওঠেনি। ঢাকা নগরীর ঘরে ঘরে পানি সরবরাহের সূচনা নবাব খাজা আব্দুল গণির বদন্যতায়। ঢাকা ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে বলা হয়েছে, কেসিএসআই উপাধি পেলেন আব্দুল গনি এই ঘটনায় এবং রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের আরোগ্য লাভের স্মারক হিসেবে তিনি ঢাকাবাসীর কল্যাণার্থে সরকারকে ৫০ হাজার টাকা দান করেন। এই টাকা কীভাবে ব্যয় হবে তা নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। সে আমলে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল না। তাই বিশুদ্ধ পানি সমস্যা সমাধানে হাতে নেওয়া হয় ওয়াটার ওয়ার্কস প্রকল্প। পানি সরবরাহের প্রথম দিকে ঢাকায় পানির ট্যাংকের সংখ্যা ছিল চারটি। আর প্রধান রাস্তাগুলোতে ছিল লোহার হাইড্রেন্ট। এই হাইড্রেন্টগুলোর সঙ্গে পানির মূল সরবরাহ লাইনের সংযোগ থাকত। যে সব ঢাকাবাসী বাড়িতে বসে পানি সেবা পেতে চাইতেন তাদের খরচ করতে হতো মাসে চার টাকা। ঢাকার ওয়াটার ওয়ার্কসের কারণে পানীয় জলের অবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছিল। পানিবাহিত রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছিল। তারপরও পানীয় জলের সমস্যার সমাধান হয়নি কারণ চাহিদার তুলনায় তখনো পানি সরবরাহরে পাইপ লাইন তেমনভাবে বিস্তৃতি লাভ করেনি। ঢাকা মিউনিসিপিলিটি প্রতিষ্ঠার পর বড় রাস্তার পাশে উঁচু কল থেকে পানি সংগ্রহ করে গরুর গাড়িতে করে সর্বসাধারণের জন্য বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহ করা হতো। ১৯৫৮ সালের পরে ঢাকার মহল্লা ও গলিতে একটি করে পানির কল ও সাথে সুয়ারেজ লাইন স্থাপন করা হয়। এছাড়াও মিউনিসিপিলিটি নাগরিক সেবা হিসেবে সুয়ারেজ ও রাস্তা পরিষ্কার করা এবং গরমের দিনে রাস্তায় পানি ছিটানোসহ সব ব্যবস্থাই করত। ১৯৬৩ সালে ঢাকা শহরে পানি সরবরাহ ও পয় নিষ্কাশনের জন্য একটি আলাদা সংস্থা হিসেবে ঢাকা ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা মহানগরে সর্ব সাধারণের জন্য নিরাপদ ও সুপেয় পানি সরবরাহ পয়-নিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজ মূলত তাদেরই করতে হয়।
ভিস্তি অর্থ মশক। চর্ম নির্মিত বৃহৎ পানি পাত্র বিশেষ। ভিস্তিওয়ালা হলো পানি বাহক যিনি পানি বহন করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পানি মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। কালো চামড়ায় বালিশের মতো মশক ভরে পানি তারা বাড়ি ও সরাইখানায় পৌঁছে দিতেন। ২০ শতকের প্রথম কয়েক দশক পর্যন্ত ভিস্তিদের এই ব্যবসা ঢাকায় প্রচলন ছিল। এক সময়ে যুদ্ধের সৈন্যরা ভিস্তিতে পানি রাখত। বৃটিস সৈন্যদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে ও দুর্গের মধ্যে খাবার পানির জন্য একমাত্র ভরসা ছিল ভিস্তি। মশক সাধারণত ছাগলের চামড়া দিয়ে তৈরি হতো। তবে এর জন্য মশক তৈরিতে লাগত বিশেষ দক্ষতা। ঢাকার টমটম ঘোড়ার গাড়ির পিছনে বাঁধা থাকবে পানি ভর্তি মশক।
মোগল আমলে ভারতবর্ষ জুড়েই পানি সরবরাহের জন্য আলাদা লোক বা পেশাজীবী ছিল যাদের ভিস্তিওয়ালাই বলা হতো। মোগল সম্রাট হুমায়ুনের এক ভিস্তিওয়ালাকে নিয়ে যা করেছিলেন সেরকম পাগলামি ইতিহাসে বিরল। হুমায়ুন নামায় জানা যায়, চৌসার যুদ্ধের সময় ২০ হাজার মোগল সৈন্য গঙ্গা নদীতে ডুবে যায়। হুমায়ুনের ঘোড়া নিহত হয় এবং তিনি নিজ জীবন বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সাঁতার না জানা এই বাদশাহকে এক ভিস্তিওয়ালা তার মশকের সাহায্যে নদীর জলে ডুবে মরা থেকে তাকে বাঁচান। কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই ভিস্তিওয়ালাকে যার নাম নিজাম (মতান্তরে সম্বল) কে দুই দিনের জন্য সত্যিকারভাবে সিংহাসনে বসিয়েছিলেন কারণ তিনি ভিস্তিওয়ালাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যদি দিল্লির সিংহাসন পান তবে তাকে যা চাইবে তাই দেওয়া হবে। ভিস্তি নিজাম সিংহাসনই চেয়ে বসেন। হুমায়ুন তার ওয়াদা রক্ষা করেন। ভিস্তি নিজাম দুদিনের মাথায় পুনরায় হুমায়ুনকে মুকুট পরিয়ে বিদায় নেন তাঁর মহানুভবতা ও চরিত্রের দৃঢ়তার কথা বলে। যদিও ইতিহাসে এর বিচিত্র ও ভিন্ন বিশেষণে ব্যাখ্যা অনেকেই দিয়েছেন।
১৮৭৮ সালে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগে ঢাকাবাসীর বড় ভরসা ছিল এই ভিস্তিওয়ালারা। তারা ঘরে ঘরে স্থানীয় পুকুর, পাতকুয়া এবং বুড়িগঙ্গা থেকে পানি এনে পৌঁছে দিতেন। বিনিময়ে সপ্তাহান্তে দেওয়া হতো পয়সা। ঢাকায় স্থানীয়ভাবে এদের বলা হয় সাক্কা। ঢাকার ভিস্তিদের ধর্মও গোত্রের তথ্য পাওয়া যায় না। সাক্কারা সারা শহর জুড়েই পানি সরবরাহ করত। নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় এদের বাস ছিল না বলেই অনুমিত হয়। তবে ঢাকায় বিভিন্ন পেশাজীবীদের অবস্থানের কারণে এলাকার নামকরণ যেমন-গোয়ালটুলি, শাখারিবাজার, আরমানিটোলা, টিকাটুলি, বকসিবাজার ইত্যাদি রয়েছে। তেমনি সাক্কাদের আবাসস্থল হিসেবে বর্তমান নাজিরা বাজারের সিক্কাটুলিকে তাদের এলাকা মনে করা হয়ে থাকে। সাক্কা থেকে সিক্কা স্মারক হিসেবে নামটা আজও রয়ে গেল।
ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায় ছিল পুকুর যাকে ঢাকাই ভাষায় তাউলা বলা হয়। গোসলের কাজেই পুরুষেরা যা ব্যবহার করতেন। বংশাল ও নবাববাড়ির ভিতরে গোলপুকুর যা এখনও রয়ে গেছে। বাড়ির মূল ফটকে রাখা হতো বড় বড় মাটির মটকা ভিস্তিওয়ালারা এই মটকাতে পানি ঢেলে দিয়ে যেতেন। অনেকে আবার বাড়ির অন্দর মহলেও বিভিন্ন মাটির কলস ও পিতলের পাত্রে পানি ধরে রাখতেন। ভিস্তিওয়ালাদের বেশভূষা ছিল ভিন্নতর। সেই সময়ের ভিস্তিদের সম্বন্ধে কবি শামসুর রাহমান তার স্মৃতির শহর বইয়ে বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে “রোজ মশক ভোরে দু বেলা পানি দিয়ে যেত আমাদের বাড়িতে ভিস্তি। কালো মশের পেটের মতো ফোলা মশক পিঠে বয়ে আনত। মশকের মুখ খুলে পানি ঢেলে দিত মাটি বা পিতলের কলসের ভিতরে। ওর থাবড়া নাক মিশমিশে কালো চাপ দাড়ি, মাথায় কিস্তি টুপি আর কোমরে জড়ানো পানি ভেজা গামছার কথা। একদিন আমাদের মাহুটুলির বাড়িতে এলো পানির কল আর সেই সাথেই বিদায় নিল ভিস্তি”।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন