একাদশ অধ্যায় – ঢাকার বিশেষ খাবার
পনির শব্দের উৎপত্তি পারসিয়ান। ছানা প্রধান ঢাকা পনিরের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। নামে ঢাকা পনির হলেও এই পনির ঢাকায় তৈরি হয় না। তার আগে আমরা জেনে নেই পনিরের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত। পনিরের উৎপত্তিস্থল নিয়ে নানান বিতর্ক থাকলেও প্রাচীন ভারতের আয়ুর্বেদ সা-কাণ্ড সাংস্কৃত বই এ খ্রিষ্টপূর্ব (৭৫- ৩০০) কুশান-সাতাভাহারা সাম্রাজ্যের সময়ও জমাটবাঁধা দুধের খাবারের ব্যবহার ছিল বলে জানা যায়। এছাড়াও ভারতীয় দুগ্ধ গবেষণা ইনস্টিটিউট মাধ্যম বিশ্বাস করে ভারতে পনির আফগান ও ইরানি আমদানিকারক ও ভ্রমণকারীদের দ্বারা এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। তবে কারণ যেটাই হোক ঢাকার পনিরের ১৭ শতকে পর্তুগিজরা এই পদ্ধতির সংযোজন ও প্রভাব সৃষ্টি করে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ১৬ শতকে ডেনমার্কে পনির অর্থ হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস জানা যায়। পনির তৈরিতে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া যে কোনো পশুর দুধই ব্যবহৃত হতে পারে। সুইডেন মূলত এলক হরিণ প্রজাতের প্রাণীর দুধ থেকে পনির উৎপাদন করে। ঢাকা পনিরের বিশেষত্ব মহিষের দুধের জন্য। এছাড়াও পনির তৈরিতে খাদ্য জাতীয় এসিড যেমন- লেবুর রস, ভিনেগার, সাইট্রিক এসিড বা টক পানি (দই) ব্যবহার করা হয়।
ঢাকা পনিরের তৈরি ও বাজারজাতকরণের জন্য মোগল আমল থেকে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম বিখ্যাত। ধারণা করা যায় ৩০০-৩৫০ বছর আগে এখানে পনির উৎপন্ন হতো। অষ্টগ্রামের হাওর এলাকায় একসময় প্রচুর ঘাস ও ঘাস আবৃত অনেক জমি অনাবাদি থাকত। অষ্টগ্রাম তো বটেই, আশপাশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, নরসিংদি প্রভৃতি অঞ্চল থেকে প্রচুর গরু-মহিষের পাল এ লোভনীয় ঘাস আবৃত চারণ ভূমিতে নিয়ে আসা হতো। এই ঘাসের মধ্যে স্থানীয় ভাষায় “চাইল্যাঘাস” অত্যন্ত প্রোটিন সমৃদ্ধ যা দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য খুব সহায়ক ছিল। সে সময় মহিষের এত দুধ হতো যা বাজারে বিক্রি করেও প্রচুর দুধ যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধার কারণে নষ্ট করে বা ফেলে দিতে হতো। এ উদ্বৃত্ত দুধে পায়েস, সন্দেশ, বরফি, আমৃতিসহ নানা জাতের পুষ্টিকর দুগ্ধজাত খাদ্য তৈরি করে বিভিন্ন বাজার-বন্দরগুলোতে সরবরাহ করা হতো। তার পরেও বিপুল পরিমাণ দুধ উদ্ধৃত্তই থেকে যেত। যখন এ অঞ্চলে দুধের মহাসমারোহ ঠিক সেই সময় শুরু হয় ঈশা-খাঁ-মানসিংহের যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মোগল সেনারা এসে অষ্টগ্রামে কাস্তলে ছাউনি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে অষ্টগ্রামের হাবিলিবাড়ি, ইটনার দেওয়ান বাড়ি, বাজিতপুরের ভাগলপুর, করিমগঞ্জের জঙ্গলবাড়িতে মোগল বংশধরদেরও বসতি গড়ে ওঠে। জনশ্রুত আছে যে, জনৈক মোঘল সদস্য বড় হাওরে গিয়ে দুধের সমারোহ দেখে বেশ উদ্বেলিত হন এবং নিজে স্থানীয়দের সঙ্গে দুগ্ধজাত খাদ্য তৈরি করতে শুরু করেন। হঠাৎ একদিন তিনি নিজের অজান্তেই কাঁচা দুধের ছানা দিয়ে অত্যন্ত সু-স্বাদু পুষ্টিকর খাদ্য তৈরি করে ফেলেন। এরই নাম দেয়া হয় মোগল বংশীয় জনৈক দেওয়ান পনির খাঁ’র নামানুসারে।
তবে ঢাকায় শুধু নয় এই অষ্টগ্রামের পনির দ্বিতীয় মোগল সম্রাটের শাহি দরবার স্থান করে নেয়। পরবর্তীতে ভারতের ব্রিটিশ রাজ পরিবার লর্ডদের নাস্তায় পনির বিশেষ উপাদান হিসেবে অপরিহার্য হয়ে ওঠে
পনির তৈরি খুব কঠিন কাজ নয়। একটি বড় মাটির গামলায় কাঁচা দুধ সংরক্ষণ করে তাতে “মেওয়া” (টকপানি) সাথে একটি পদার্থ মেশালেই দুধ ছানা হয়ে যায়। সেই ছানা বাঁশের ছোট খাঁচি বা খাঁচার পাত্রে লবণ মিশিয়ে জমাট করে রাখতে হয়। শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছানাটি পনিরে পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে পদ্ধতি ও সময়ের একটা বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। এক একটি বাঁশের খাঁচায় ১ থেকে সোয়া কেজি ওজনের পনির তৈরি করা হয়ে থাকে।
জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনে অধিক খাদ্য ফলাতে গিয়ে সকল পতিত জমি বা গো- চারণভূমিও এখন চাষাবাদের আওতায় চলে এসেছে। ফলে একদিকে গবাদি পশুর খাদ্য সংকট, যান্ত্রিক চাষাবাদের কারণে গবাদি পশুপালনের প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ায়, কালের আবর্তে অষ্টগ্রামের সেই পনির এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।
উন্নতমানের পনিরের জন্য মহিষের দুধের পনিরের বিশেষ খ্যতি আর চাহিদা ছিল। দিনে দিনে মহিষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়ায় ঢাকার বাজারে গরুর দুধের তৈরি পনিরই বর্তমানে পাওয়া যায়। যদিও গরুর দুধের পনির হয় এটা অনেকে এক সময় কল্পনাও করতে পারতেন না। ঢাকা পনির এখন দক্ষিণাঞ্চলের ফরিদপুর, শরীয়তপুর, উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকা যেখানে গো-চারণভূমি ও চরাঞ্চল রয়েছে সেখান থেকে পনির ঢাকায় আসে। ঢাকাসহ সমগ্র দেশ ও বিদেশে ঢাকা পনিরের খ্যাতি ও সুনাম তাদের রসনায় যোগ হয়েছে।
পনির ঢাকাই অধিবাসীদের খাদ্যে ও নাস্তার অতি পছন্দনীয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে অত্যাবশকীয় অনুষঙ্গ। কাবাব, বাকরখানি, চা, রেজালা, সমুসা, পনিরযুক্ত বিভিন্ন রান্না, অনুষ্ঠান ও আপ্যায়নে পনির ঢাকাই খাদ্যের ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে।
ঢাকাই লোকদের ঋতু ভিত্তিক খাদ্য হিসেবে নুনিয়া গোশত্ বেশ জনপ্রিয়। এটি একটি বিশেষ ধরনের খাবার। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বৈশাখে এক ধরনের শাক ঢাকার বুড়িগঙ্গার চর অঞ্চলে পাওয়া যেত। যাকে নুনিয়া শাক বা নুইন্না শাক নামে বাজারে বিক্রি হতো। গরু বা খাসির মাংসের সাথে মসলা যোগে অনেকটা কোর্মা রান্নার প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় নুনিয়া গোশত্। সাধারণত এক কেজি মাংসের সাথে এক কেজি নুনিয়া শাক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বর্তমানে কেরানিগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর এলাকায় নুনিয়া শাকের চাষ হতে দেখা যায়। ঢাকার মৌলভিবাজার নাজিরাবাজার এলাকায় এখনও এই শাক মৌসুমে বিক্রি হয়। নুনিয়া গোশত্ একান্তই ঢাকাবাসীর উদ্ভাবিত নিজস্ব খাবার।
ঢাকার বনেদি পরিবারের একটি জনপ্রিয় ফল। সিলেট অঞ্চলের হাওড় ও বিলে কাঁটাযুক্ত এই ফল পাওয়া যায়। দুধিয়া, পিঁয়াজু, ফুটা (শক্ত ও লাল) তিন রকমের মাখনা ফল ঢাকায় দেখা যায়। ঢাকাবাসীরা একসময়ে ভ্রমণের সময় এই মাখনা ফল সাথে করে নিয়ে যেতেন। ঢাকার মহিলাদের এবং নবাবি আমলে বেগমদের অতি প্রিয় একটি ফল। উপরের অংশে কাঁটা কাঁটা এই ফলটি এনে দোকানি উপরের কাঁটাগুলো ছাড়িয়ে ফেলেন। ভেতরে ছোট ছোট বিচির মতো হয় এই মাখনা ফল। সেটাকে দাঁত দিয়ে ভাঙলে ভেতরে সাদা অংশটুকু খাওয়া হতো। নতুন জামাই শ্বশুর বাড়ি গেলে বেলি ফুলের মালা ও মাখনা ফল নিয়ে যেতেন। বর্তমান ঢাকার চকবাজার, নাজিরাবাজার ছাড়াও অন্যান্য কিছু এলাকাতে সময় ভিত্তিতে বিক্রি হতে দেখা যায়। মাখনা ফল দিয়ে এক সময়ে ক্ষীর তৈরি হতে দেখা যেত। মাখনা ফল ঢাকাই লোকদের একান্তই নিজস্ব ফল। অন্য কোথাও মাখনা ফল খেতে দেখা যায় না।
ঢাকার একটি মুখরোচক খাবার। ঢাকা ছাড়া এই বড়ার প্রচলন অন্য কোথাও না থাকলেও পুরান ঢাকায় সারাবছর চকবাজারসহ কিছু এলাকায় মাষের বড়া বিক্রি হতে দেখা যায়। মাষকলাইয়ের ডালের তৈরি এই বড়া ঈদ মেলা, মহররম ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে তৈরি হয়ে থাকে।
মধ্যযুগে ঢাকার সমাজ জীবনে কানজির চালের ভাত নিম্নবিত্তের একটি বিশেষ খাবার। পানতা ভাত বা “আমানি” যাকে ঢাকাই ভাষায় পানি পানতা বলে। সাধারণের মাঝে প্রিয় খাবার ছিল। রাতের ভাতে পানি দিয়ে পানতা ভাত করে সকালে ইলিশ ভাজা, ভর্তা যোগে মাটির হাঁড়ি বা সানকিতে খেতে দেখা যেত। এছাড়াও প্রতিদিন রান্না করার জন্য ভাতের চাল ধোয়ার পর সেখান থেকে এক মুঠো কানজির চাল একটি পাত্রে পানিতে রাখা হতো। এভাবে চাল পচে হলদে আভাযুক্ত হলে এ চাল দিয়ে বানানো হতো কানজির বড়া। যা ছিল টক গন্ধ যুক্ত আদি অধিবাসীদের কাছে প্রিয় খাবার। কানজির চাল আর কানজির বড়া অনেক কাল আগেই ঢাকা থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
ঢাকার লোকদের একটি প্রিয় খাবার খাটুয়া। বিশেষ করে মহিলারা খুব পছন্দ করেন খাটুয়া। বাসি পোলাও ও মাংসের তরকারি এই সব একসাথে মিশিয়ে রসুন, শুকনা মরিচ, আমের আচার দিয়ে এই সুস্বাদু খাটুয়া রান্না করা হতো। বর্তমানে এই খাবারের প্রচলন কমে গেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন