দ্বিতীয় অধ্যায় – ঢাকার রুটি
মোগলপূর্ব যুগে ঢাকার তিন বেলার প্রধান খাবারই ছিল ভাত। মোগল বাংলায় সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকায় আসেন মোগল দরবারি খাবারের ঐতিহ্য নিয়ে। দরবারি ব্যক্তিদের সাথে আসা বাবুর্চি তাদের খাদ্য প্রস্তুত তালিকায় দেখা যেত রুটির উপস্থিতি। নান বা তন্দুরি ছাড়াও তাদের সময়ে ঢাকার খাদ্য অভ্যাসে যুক্ত হয় শিরমাল আর বাকরখানি। উচ্চবিত্ত আর ঢাকায় আগত উত্তর ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যেই রুটি খাবারের প্রচলন ছিল। গমের আটা, ময়দার ব্যবহার তারা করতেন সিদ্ধ হস্তভাবেই। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সকাল ও রাতে রুটি খাবার অভ্যাস গড়ে উঠলেও দুপুরে তারা ভাতই গ্রহণ করতেন। সাধারণের মাঝে সকালে রুটি খাবার অভ্যাস গড়ে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে। ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ, শহর কেন্দ্রিক জনসংখ্যার চাপ ঢাকার জনজীবনকে কঠিন আর্থিক অনটন ও খাদ্য অভাবের সম্মুখীন করে। এছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে গম আসার ফলে স্থানীয়ভাবে আটার প্রচলন বেড়ে যায়। স্বল্প আয়ে চলার জীবনযাত্রার খাবারের তালিকায় আসে পরিবর্তন। যোগ হয় রুটি। ব্রিটিশ আমলে ঢাকার খাদ্য অভ্যাসে প্রবেশ করে পাউরুটি। আর সাধারণের ঘরে ঘরে তৈরি হতে থাকে আটার রুটি, চাপাতি, পরোটা। এই সময়ে ঢাকায় গড়ে উঠতে থাকে বাহারী নামের সব রুটির দোকান। নানে ফাতির, নানে তাফতান, নানে যানযাবিল (আদা), রুমালি রুটি, গাওজবান, গাওদিদাহ, রউগনি শিরমাল, টাপু ইত্যাদি নামের রুটিগুলো সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে গেলেও এখনও টিকে রয়েছে নান বা তন্দুরি রুটি আর ঢাকার বিখ্যাত বাকরখানি।
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ও বিখ্যাত রুটি বাকরখানি। ঢাকার বাকরখানি ভারতের মোগল সমকালীন কোনো শহরের সাথে সম্পর্ক ছিল না। অবশ্য এর একটা নমুনা পাঞ্জাবের অমৃত শহরের কাশ্মিরি নান বিক্রেতাদের কাছে পাওয়া যায়। ঢাকায় বাকরখানির আগমন ভারতের কাশ্মিরিদের মাধ্যমে মোগল আমলে প্রবেশ করে। অনেক আগে থেকেই তারা ঢাকায় বসবাস করে আসছিলেন। কাশ্মিরিটোলা এলাকায় ছিল তাদের বাস। যদিও বর্তমানে নামটি আছে সেখানে কোনো কাশ্মিরি লোকজন নেই। ঢাকা ছাড়া ভারতের কাশ্মির, লাখনৌ আর পাকিস্তানে বাকরখানি রুটির প্রচলন রয়েছে। কাশ্মিরের বাকরখানি ঢাকার অনুরূপ নয়। লাখনৌতে বাকরখানি রুটিকে তারা শিরমাল বলে এবং সেটারও তৈরির প্রক্রিয়া ভিন্ন। যদিও বাকরখানি তাদের খাবারের প্রধান বা অন্যতম রুটি ছিল না। ঢাকার তৈরি বাকরখানি তৎকালীন সময়ে তৈরি হওয়া রুটির স্বাদ, মান ও বৈচিত্র্যের কারণে অন্য যে কোনো রুটির সমতুল্য ছিল না। এর প্রসিদ্ধি এতই ছিল যে সমগ্র বাংলায় এখান থেকে উপঢৌকন হিসেবে এই রুটি পাঠানো হতো। প্রকৃত বাকখানি রুটি খাঁটি ঘি, দুধ, ময়দা, মাওয়ার খামিরে তৈরি হলেও এর সাথে যোগ হয়ে তৈরি হতো ভিন্ন ভিন্ন মাংসের, পনিরের, চিনির, ছানার, নারিকেল খাস্তা বাকরখানি (নরম) যা অন্য কোথাও হতো না। সুখা রুটি ও নিম সুখা নামেই ঢাকায় বাকখানি অধিক পরিচিত ছিল। আকারে ছোট গোল হলেও ডিম্বাকৃতির ন্যায় লম্বা গাওজবান নামের আরেক পদের বাকরখানি ঢাকায় পাওয়া যেত। ১৯ দশকের শেষ দিকে ঢাকার খাজা মির্জা আজম, যিনি নবাব পরিবারের একজন সদস্য ছিলেন, তার সূত্রে জানা যায়, তিনি শ্রীনগর থেকে বাকরখানি বানিয়ে নিয়ে আসেন। তখন জানা যায় এটি ছিল খাস শ্রীনগরের কাশ্মিরিদের তৈরি। এবং মোগল আমলেই কাশ্মিরিদের সঙ্গে ঢাকায় আসে। কাশ্মিরিরা এই রুটির চল এখানে আনলেও এখানকার কারিগরেরা বাকরখানিকে বৈচিত্র্য দান এবং ঢাকার নিজস্বতা তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন।
বাকরখানি নামকরণের ইতিহাস নিয়ে নানা মত ও লোক প্রচলিত গল্প প্রচলিত রয়েছে। তার মাঝে বহুল প্রচলিত আগা বাকের ও খনি বেগমের প্রেম কাহিনি উল্লেখযোগ্য। আগা মোহাম্মদ বাকের খান ১৮ শতকের মধ্যভাগে বাংলার নবাবি আমলে সিরাজ উদ দৌলার সেনাপতি এবং বহু আলোচ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তি। তার প্রেয়সী ছিলেন আরামবাগের নর্তকি খনি বেগম। তাদের প্রেমের একটা তৃতীয় কোনও ছিল। কোতয়াল জয়নুল খা’ খনি বেগমকে নিয়ে পালিয়ে যান দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গের ভাটি অঞ্চলের এক গভীর অরণ্যে। পিছু ধাওয়া করে বাকের পৌঁছেন সেখানে। কিন্তু বিয়োগান্তর ঘটনায় খুন হন খনি বেগম। বাকের প্রেয়সী হারানোর শোকে রাজ্য ও নবাবি মসনদের সকল আকর্ষণ পরিত্যাগ করে সে অঞ্চলে রয়ে যান। পরবর্তীতে আগা বাকের নিজেদের প্রেম অমর করে রাখার জন্য সৃষ্টি করে বাকরখানি রুটি। ১৯১৮ সালের বাকেরগঞ্জ জেলা গেজিটিয়ারে জানা যায় ১৭৪১ থেকে ১৭৫৪ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত আগা বাকের বরিশাল জেলার বুর্জখ উমেদপুর ও সলিমাবাদ পরগনা দুটির জমিদার ছিলেন। প্রথম পরগনায় নিজ নামে একটি সুপ্রসিদ্ধ গঞ্জ প্রতিষ্ঠা করেন যা ব্রিটিশ আমলে বাকেরগঞ্জ নামে প্রতিষ্ঠা পায়। বিশাল জমিদারি লাভ করলেও তিনি ঢাকা থাকতেন কিনা সঠিক অনুমান করা কঠিন। যদিও ১৭৫০ সালে তিনি চট্টগ্রামের ফৌজদার নিযুক্ত হন। ধারণা করা হয় ঢাকায় থেকেই তিনি প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। কেননা তার পুত্র আগা সাদেকের নামে ঢাকা আগা সাদেক রোড (দেউরি) এবং আগা সাদেক ময়দান (বাংলাদেশ মাঠ) ছিল আগা সাদেকের বাসগৃহ। প্রেম কাহিনির বাকরখানির গল্পটা এই পর্যন্তই জানা যায়। তবে সেটা ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে কাশ্মির, লাখনৌ ও পাকিস্তানে যাত্রা করল কী করে এর সদুত্তর এই কাহিনিতে মিলবে না কেননা এই রুটিকে কাশ্মিরিরা বাকরখানি নামেই চেনেন এবং নিঃসন্দেহে কাশ্মিরি রুটি ওয়ালারা তুর্ক, আফগান, পাঠানদের কাছ থেকেই শিখেছে। তবে বাকরখানি জাতীয় রুটি মধ্য এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ও আফগানিস্তানেও তৈরি হয়ে থাকে।
ঢাকার বাকরখানির আরেকটি ব্যবহার ভিগা রুটি। ঢাকাই লোকদের প্রিয় খাবার। গরম দুধে চিনি, মালাইসহ আস্ত রুটি ভিজিয়ে সকালে বা রাতে খাবার শেষে যুব ও বৃদ্ধরা খেয়ে থাকেন। হাকিম হাবিবুর রহমান তার স্মৃতি কথায় বলেন,
“সেই সময়ে ঢাকায় এক ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করলেন যিনি সুন্দর বাকরখানি তৈরি করে একটি পরিষ্কার পাতিলায় দুধ ও চিনির শিরায় ভিজিয়ে ভোরে গরম করে নিয়ে আসত এবং মহল্লায় মহল্লায় গেজায়ে লতিফ (সুস্বাদু খাবার) বলে ডাক দিত। লোকেরা সখ করে ক্রয় করতেন। কিন্তু তার দেখাদেখি অন্য সব লোকেরাও তার এই ব্যবসার অনুকরণ করা শুরু করে দিল। জিনিসের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা বিদায় গ্রহণ করল এবং অবশেষে এই সুস্বাদু খাবার গিজায়ে কাশিব (মলিন খাবার) এ রূপান্তরিত হলো”।
১৯ শতকের শেষ দিকে ঢাকায় এক বিশেষ ধরনের বাকরখানি তৈরির চল শুরু হয়েছিল। কিন্তু তা বেশিদিন স্থানি হয়নি। অর্থাৎ রুটির প্রতি পরদ বা ভাঁজে ঘি ও ময়দার গুঁড়ার স্থানে মোহনভোগ বা সুজির হালুয়া লাগানো হতো। তাতে রুটির ওজন অনেক ভারী হতো সম্ভবত সে জন্যই তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
এই পেশায় নিয়োজিত শিষ্যরা ময়দার ওজন করে লই বানিয়ে রুটি বানানো কারির কাছে পৌঁছে দেয়। রুটি বানানো কারি কাঠের তক্তার উপর বেলন ছাড়া সে লইকে টেনে তক্তার শেষ পর্যন্ত বাড়িয়ে নেন। তারপর ঘি লাগিয়ে ময়দার গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়ে ভাঁজ করতে থাকেন। প্রত্যেক ভাঁজেই এভাবে ঘি ও ময়দার ক্রিয়া চলতে থাকে। লই শ’ পঞ্চাশেক তৈরি হয়ে গেলে তক্তার উপরে অনেক পরিমাণ রুটি তৈরি করা হয়। এবং কাঠ কয়লার তন্দুরে রুটি দেওয়ার পূর্বে আবার ঘিয়ের ছিটা দেওয়া হয়। তন্দুরের মাঝে রুটির উপর কমপক্ষে দু’বার দুধের ছিটা দেওয়া হয়। এটাই আসল বাকরখানি তৈরির রহস্য। ব্রিটিশ আমলের শেষ ভাগে ঢাকার অর্থনৈতিক জীবনের টানা পোড়েনের প্রভাব বাকরখানিকে গ্রাস করে। ঘি এর বদলে তেল, পরবর্তী পাকিস্তান আমালে ডালডা আর দুধের জায়গায় গুড় মিশ্রিত পানি বাকরখানির শবযাত্রা শুরু হয়। তবে চাইলে বিশেষ ব্যবস্থায় বাকরখানি সহজলভ্য হতে পারে এবং হচ্ছেও।
ঢাকার বাকরখানির জনপ্রিয়তার আরেক কারণ এর ব্যবহার উপযোগিতা। সকালে প্রাথমিক নাস্তায় চায়ের সাথে কিংবা পনির, কোফতা, মাংসের যে কোনো খাবারের সাথে বাকরখানি প্রচলিত। শুধু তাই নয় মিষ্টির ক্ষীর, ফিরনির সাথেও বাকখানির ব্যবহার নেহায়েত কম নয়। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং এককালে ভ্রমণ পিপাসু ও শিকার প্রিয় লোকদের প্রধান খাবারের অনুষঙ্গ হিসেবে বাকরখানি ছাড়া বিকল্প পথ ছিল না।
বাকরখানির দোকান বলতে তখন চকবাজার, লালবাগ, সূত্রাপুরসহ বিভিন্ন অলিগলিতে খুব ভোরে রুটি বানানোর আয়োজন শুরু হতো। বর্তমানে পুরান ঢাকার লালবাগ, নাজিমুদ্দিন রোড, নাজিরাবাজার, নারিন্দাসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে বাকরখানির দোকান দেখা যায়। তবে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর জিঞ্জিরার পাড়ে বরিশুর এলাকার বাকরখানির বেশ নাম ডাক রয়েছে। বর্তমান ঢাকার এই রুটির কারিগরেরা সকলেই সিলেট অঞ্চলের অধিবাসী। যদিও সিলেট অঞ্চলে এর প্রচলন বা জনপ্রিয়তা নাই বললেই চলে। বাকরখানি নামের মতো এটাও এক রহস্য। অনুসন্ধানে তেমন কোনো সূত্র যোগের ধারণা মেলে না। নানান মত ও গল্পের সন্নিবেশ ধারণা থাকলেও একটি ধারণা অনুমান করা যায়। সিলেট সুলতানি আমল থেকেই তুর্কি, আফগান, পাঠান, সুন্নি মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল। এমনকি শেষ পাঠান বীর ওসমান খানের সকল সহযোগী এখানে মোগলদের সাথে যুদ্ধে হেরে গিয়ে জনসাধারণের মাঝে মিশে যায়। হয়তোবা বেকার সিলেটি পাঠান সৈন্যরা স্বেচ্ছায় মোগলদের রুটি তৈরি পেশা গ্রহণ করা নতুবা মোগলরা আটককৃত সিলেটি পাঠান সৈন্যদের বাধ্য করে রুটির শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে। সেই থেকেই সিলেটি রুটি শ্রমিকদের আবির্ভাব। ইতিহাস যাই বলুক এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
ঐতিহ্য হয়ে পুরান ঢাকার অনেক খাবারের মাঝে এখনও টিকে আছে বাকরখানি। কমে গেছে সকালের নাস্তায়, মাংস, চা কিংবা মিষ্টির সঙ্গে এই খাবারের প্রচলন। কমছে তৈরি ও বিক্রিও। ভাঙা দোকান আর পুরনো কাঠ কয়লার চুলায় আদি না হোক বর্তমান বাজারের সামঞ্জস্যপূর্ণ উপকরণে তবুও টিকে আছে ঢাকার বিখ্যাত বাকরখানি।
ফারসি শির অর্থ দুধ আর মাল অর্থ মিশ্রণ, মালিশ বা দলা এই হলো শিরমাল। হালকা মিষ্টি, দুধ, ঘি আর জাফরানে তৈরি শিরমাল মোগলদের সময়কার রুটি। ঢাকার মোগল সুবেদারদের হাত ধরেই প্রবেশ। ঢাকার সবচেয়ে প্রচলিত ও জনপ্রিয় শিরমাল অভিজাত পরিবারগুলোতে বাড়িতে তন্দুর বসিয়ে দক্ষ বাবুর্চিদের দিয়ে অনুষ্ঠানাদিতে তৈরি করতে দেখা যেত। মোগলরা সুজি দিয়েই শিরমাল তৈরি করতেন। তবে সাধারণভাবে শিরমাল রুটি ময়দায় তৈরি হতো। ফরমায়েশ দিয়ে সুজি তৈরির শিরমালও বানানো যেত। শিরমাল তৈরির প্রক্রিয়াটা অনেকটা এই রকম। কিছু ময়দার সঙ্গে মাওয়া মেশানো হয় তারপর কিছু সময় পর ঘিয়ের সাথে আরও কিছু ময়দা মিশিয়ে শক্ত হাতে ভালোভাবে মেশানো হয়। এরপর দুধ জাফরান দিয়ে ঐ ময়দা আবার মেশানো হয়। শিরমালে পানির প্রবেশাধিকার ছিল না। ময়দার এই খামির তৈরি হলে পছন্দমত এগুলো গোল বা ডিম্বাকৃতির রূপ দান করে রুটির উপরে গোল রুটিতে পাঁচটা আর ডিম্বাকৃতিতে তিনটা ফালি বা দাগ দেওয়া হতো। এরপর ঐ রুটিগুলো গরম চাঁদর দিয়ে ঢেকে রেখে দিতে হয় কমপক্ষে তিন ঘণ্টা। এই রুটিতে কোনো ভাঁজ বা পরদ থাকে না। তন্দুরে দেবার পরে আবার রুটির উপর দুধের ছিটা দেওয়া হয় যাতে রুটির রং সুন্দর লাল হয়ে যায়। দুই শিকের সাহায্যে খুব সতর্কতার সাথে আলতো করে তন্দুর থেকে রুটি বের করে আনা হয়। এটাই হলো আসল শিরমাল। ঢাকায় এর নাম রওগনি শিরমাল। লম্বাকৃতির শিরমালকে বলা হতো গাওজবান অর্থাৎ গাও- গরু আর জবান-জিহ্বা। গরুর জিহ্বার মতো লম্বা। আরেক ধরনের রুটি ছিল গোল যার নাম গাওদিদাহ অর্থ গাও-গরু আর দিদাহ-চোখ, গরুর চোখের মতো রুটি। এই রুটিকে অনেকে টাপু নামেও ডাকত। রুটির মাঝখানে একটু ফোলা ধরনের গাওদিদাহ শিরমাল সকালেই বাজারে পাওয়া যেত। মূলত এই রুটি অসুস্থ বা বাচ্চাদের খাবারের জন্য ব্যবহার করা হতো। এজন্য রুটির খামিরে ঘি মোটেই ব্যবহার হতো না। প্রকৃতপক্ষে শিরমাল বিকেলেই বেশি তৈরি হতো কেননা লোকেরা রাতে দুধ অথবা কোরমার সাথে শিরমালই খেতে পছন্দ করতেন। রুচির ভিন্নতার জন্য কিছু লোক নরম বা মোলায়েম, কিছু লোক শক্ত রুটি পছন্দ করতেন। এজন্য বাজারে শুকনো, আধা শুকনো ও নরম বা মোলায়েম শিরমাল পাওয়া যেত। ভ্রমণকারীরা ভ্রমণের সাথে শক্ত শিরমাল নিতেন কেননা তা দীর্ঘদিন ভালো অবস্থায় থাকত। এছাড়াও শিরমালের খামিরে পনিরের ব্যবহার বিশেষভাবে শিরমাল রুটির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। ২০ শতকের শুরু থেকে শিরমালে দুধের পরিবর্তে পানির ব্যবহার শুরু হয়েছিল যে কারণে রওগনি শিরমাল তার আসল স্বাদের মহিমা হারাতে থাকে। উত্তর ভারতের নবাবি শহর আগ্রা ও লাখনৌ, হায়দ্রাবাদে শিরমাল তৈরি এখনও দেখা গেলেও ঢাকাতে যা সম্পূর্ণই বিলুপ্ত খাবার। ওজন তৈরি প্রক্রিয়া, উপকরণ মূল্যমান বেশি হওয়ার কারণে বাগদাদি বা পাউরুটির প্রচলনের প্রভাবে শিরমাল রুটি ঢাকাবাসীর খাদ্য তালিকা থেকে দূরে চলে গেছে। আশার কথা ঢাকার ২/১ টি বেকারি শবে বরাত উপলক্ষে শিরমাল রুটি এখনও তৈরি করে পুরনো রুটির খাবারে সংস্কার ধরে রেখেছেন।
সকাল অথবা বিকেলের নাস্তায় পরোটা ঢাকার একটি প্রচলিত খাবার। সকালে ঘি বা তেলেভাজা পরোটা আর বিকালে কিমা বা মোগলাই পরোটা। নাস্তার সঙ্গে যদি পরোটা আর কাবাব ঢাকাই মুসলমানদের দেয়া হয় তবে তাদের আর অন্য কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। সাধারণভাবে এই পরোটা ময়দার অনেক ভাঁজে যুক্ত, মচমচে এবং খেতে সুস্বাদু হয়। সব বাড়িতে কমবেশি পরোটা তৈরি হলেও ঢাকার দোকানগুলোতে বিশেষ বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা হতো। টানা পরোটা, মোহালি পরোটা, খাস্তা পরোটা আর রিলের পরোটা সহ নানা পরোটা। পরোটার সাথে সবজি, ডাল, মাংসের ভুনা নাস্তার তালিকায় দেখা যায়। বিশ শতকের প্রথমদিকে উত্তর ভারতের কারিগরেরা ঢাকায় দোকান খুলে পরোটা, কাবাবের ব্যবসা শুরু করেন। ঢাকায় রিলের পরোটা মিষ্টান্নের দোকানে পাওয়া যেত। আকারে ছোট, সু-স্বাদু এই পরোটা সুতার রিলের গুটি দিয়ে চেপে চেপে ভাজা হতো। যার কারণে এই নামকরণ। ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের খুব প্রিয় ছিল এই পরোটা। তাঁরা নিরামিষ, বুন্দিয়া সহযোগে খেতে এই দোকানগুলোতে ভিড় করতেন। মুসলমানরাও রুচি বদলাবার জন্য কখনো কখনো বুন্দিয়া সহযোগে খেতেন। ঢাকায় অবশ্য নবাবের রসুইখানায় মোগলাই পরোটা, কিসমিস, বাদাম, পনিরের পরোটার সুনাম ছিল। অভিজাত পরিবারগুলোতে বিকালের নাস্তায় কিমা পরোটা তৈরি করতেন। যা এখন বাজারে প্রাপ্ত কিমা পরোটা না বলে সুজি পরোটা বলাই উত্তম।
রুটি সংস্কৃত রোটিকা শব্দ থেকে রুটির উৎপত্তি। রুটি ও চাপাতি একই সমর্থক অর্থে ব্যবহার হয়। আটা বা ময়দা লবণ পানির মিশ্রিত লেচি বা গোলা বেলনের সাহায্যে বেলে সরাসরি তাওয়ায় তৈরি রুটি প্রত্যেক ঘরে সাধারণ জিনিস। তবে চাপাতি রুটির জন্য একই মিশ্রিত আটা বা ময়দা কয়েক ঘণ্টা রেখে নরম ও ভালো করে হাতে চেপে চেপে মাখানো হয়। হালকা বেলুনের সাহায্যে চ্যাপ্টা করে হাতের চাপরে পিটিয়ে তাওয়ায় সেঁকা হয়। সেঁকা রুটি গরম উনুনের আগুনে ধরে রুটিকে ফোলানো হয়। তৈরি হয় চাপাতি রুটি। আকার হিসেবে গোল ৬-৭ ইঞ্চি হয়ে থাকে। বিংশ দশকের ষাট দশক পর্যন্ত ঢাকার বিহারি মোহাজির ক্রেতাদের সকালে ও রাতে চাপাতি খেতে দেখা যেত। ঢাকা ঠাটারিবাজারে ছিল পালোয়ানের দোকান। রুটি বা চাপাতির সাথে বিক্রি করত সবজি ও গরুর মাংসের কালিয়া যা খাবার জন্য সকাল-সন্ধ্যা লোকজনের ভিড় লেগে থাকত। ঢাকার চাপাতি রুটির প্রচলন সম্বন্ধে হেকিম হাবিবুর রহমান তার স্মৃতির কথায় বলেছেন,
“১৯০৪ সালে মির্জা ফকির মোহাম্মাদ ভারতের বানারস থেকে আব্দুল হক নামে একজন কারিগর ঢাকায় নিয়ে আসেন। কিছুদিন তার ওখানে থাকার পর চাকরি পরিত্যাগ করে চকবাজারে নিজেই চাপাতি আর কাবাবের দোকান খুলে বসেন। এটাই ছিল এখানে চাপাতির শুরু। যা এখন সব মহল্লা গলিতে দেখা যেতে শুরু করেছে”।
ঢাকার আরেক ধরনের রুটি প্রচলিত ছিল যাকে রুমালি রুটি বলা হতো। রুমালের মতো পাতলা আকারে বিশাল অন্য রুটি থেকে দামে বেশি। অভিজাত শ্রেণির মাঝে বেশি প্রচলন ছিল। পরিবেশন করা হতো রুমালের ভাঁজের মতো করে। শোনা যায় মোগল বাদশাহরা তৈলাক্ত খাবার খেয়ে উঠে হাত মুছতেন রুমালের মতো পাতলা এই রুটিগুলোতে। এই রুটি তৈরির জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। কারিগরেরা বেলা রুটিকে দুই হাতে পিটিয়ে বড় গোল রুটির আকৃতি দান করেন। সেঁকার জন্য ব্যবহার হয় আগুনের উল্টানো লোহার কড়াই। ঢাকায় এখন নেই রুটির সেই কারিগর। সাথে হারিয়ে গেছে চাপাতি আর রুমালের রুটি। ঢাকার বাড়িতে মহরম, শবে বরাত ও কোরবানির ঈদের চালের রুটি খাবার রেওয়াজ দেখা যায়। এছাড়াও অনেক বাড়িতে আটা বা ময়দার পরিবর্তে বিভিন্ন ডাল দিয়ে মজাদার রুটি তৈরি হতো।
ফারসি শব্দ নান অর্থ রুটি। তুর্ক, আফগান, ইরানিদের প্রধান খাবার নান রুটি। অনেকে একে ইসলামি রুটি বলে থাকেন। বিভিন্ন আকারে খামির দিয়ে তৈরি হয় রুটি। যা তন্দুরে সেঁকে হয় তন্দুর রুটি বা নান রুটি। নান রুটি সাধারণ রুটি হলেও রুটিতে বৈচিত্র্যময় শস্যদানা, খাদ্য উপাদান ব্যবহারে খাদ্য হিসেবে রুটির স্বাদ ভিন্নতা এবং বিভিন্ন জাতীর তৈরি নান রুটিতে তাদের নিজস্ব রুচির পরিচয় পাওয়া যায়। ঢাকায় সুলতানি আমলে এই রুটি এখানে প্রথম আগত তুর্কি, আফগান বংশোদ্ভূতদের দ্বারা প্রচলিত হয়। মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও মোগল আমলেই এর প্রসার ও সাধারণের খাদ্য অভ্যাসে যুক্ত হয়। ঢাকার মোগল সেনা শিবিরে এক ধরনের নান রুটি তৈরি হতো। যাকে বলা হতো নানে তাফতান। তাফতানে দুধ, দই, ডিম, জাফরান, দারুচিনি গুঁড়া আর উপরে সাদা তিল ব্যবহার হতো। যা শিরমালের মতোই। আবার ঢাকার আফগান কাশ্মিরিদের ওখানেও দেখা যেত পেশওয়ারি নান ও কাশ্মিরি নান। স্থানীয় আফগান ও পেশওয়ারিরা ছাড়া ঢাকাবাসী এই সাদা রুটি বেশির ভাগ সময় ক্রয় করতেন না। ২০ শতকের গোড়ার দিকে ঢাকায় নেহারি খাবার চল শুরু হয়। নেহারির সাথে নান রুটি খাওয়া ঢাকায় নান রুটির প্রচলন সাধারণের মাঝে আবার শুরু হয়। কুলচা নানেরই আরেক রূপ ঢাকায় জনপ্রিয় ছিল। আকারে ছোট ঢাকার কুলচায় দুধ, সুজি, কালো জিরা ব্যবহারে তৈরি হতো। উত্তম নান রুটির জন্য দুধ, ঘি বা মাখন অন্যান্য শস্য দানার প্রয়োজন হলেও রুটি তৈরির সময় খামিরের মিশ্রণটা জরুরি। সময় ও দক্ষ হাতেই তৈরি হতে পারে সুস্বাদু ও হজম উপাদেয় নান রুটি বা তন্দুর রুটি।
১৯ শতকের শেষের দিকে ঢাকায় ব্রিটিশদের হাত ধরে পরিচিত হয় স্থানীয় ভাষায় নান পাউ অর্থাৎ পাউরুটি। ঢাকার তৎকালীন শিক্ষিত, ভদ্র ও প্রশাসনিক কাজে ঢাকায় অবস্থানরত মানুষেরা নাস্তায় মাখন, ডিম পোচ আর সাথে থাকত পাউরুটি। ঢাকার শিরমাল ও বাকরখানি রুটি হিসেবে তাদের অনেকেরই হজমের সমস্যা হতো। আবার পরহেজগার ধার্মিক লোকেরা মনে করতেন পাউরুটি তাড়ির খামি থেকে বানানো হতো। যে কারণে তারা এটি ছুঁয়েও দেখতেন না। তবে হালকা খাবার হিসেবে বাড়ির অসুস্থ বৃদ্ধ এবং শিশুরা এটা খেত। ব্রিটিশ সূত্রে প্রাপ্ত পাউরুটি পরবর্তীতে শ্রেণি মর্যাদার নিদর্শক হিসেবে দেখা যায় ঢাকার সমাজে। ঢাকায় শবে বরাত উপলক্ষে শাবরাতি রুটি প্রচলন ছিল যা শিরমাল রুটির খামির দিয়ে তৈরি হতো। আকারে খুব বড় এক হাত ব্যাস পরিমাণের রুটির উপরে সরু হালকা কাঁটা দিয়ে কেটে কালো জিরা ছিটিয়ে প্রস্তুত হতো। তবে ওজনে ছিল এক সের বা তারও বেশি। ঢাকার বাজারে ২০ শতকের ৩০ দশকে বাগদাদি রুটির চল শুরু হয়। ১ ইঞ্চি পুরু গোল গোল পাউরুটি ওজনে হালকা এবং দামে সস্তা ছিল। ঢাকার লোকেরা এর পরিবর্তে বাগদাদি রুটি ক্রয় করতে শুরু করেন। এই রুটি শবে বরাতে বিভিন্ন বন্ধু বান্ধব, প্রতিবেশীদের বাড়িতে হালুয়ার সাথে পাঠানো হতো। এই বাগদাদি রুটির আরেকটি ব্যবহার দেখা যেত ঢাকার নিম্ন শ্রেণির মহিলাদের মাঝে। তারা এই রুটিকে ভেঙে রশিতে গেঁথে শুকাত এবং রমজান মাসে ক্ষীর বানিয়ে তবারক হিসেবে খেতেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন