সুচিত্রা ভট্টাচার্য
আর্য অন্যমনস্ক হাতে ভাত মাখছিলেন। অতি ধীর লয়ে। অনেকটা সিনেমার স্লো মোশানের মতো। দৃষ্টি নিবদ্ধ সংবাদপত্রের চতুর্থ পৃষ্ঠায়। দিন দশেক আগে টালিগঞ্জের ফুটপাত ধরে হাঁটছিল মা-ছেলে, খোলা ম্যানহোলে হঠাৎ পড়ে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে বাচ্চাটার। খবরের কাগজের প্রতিবেদন পাঠ করে জনসাধারণ অত্যন্ত ক্ষিপ্ত, তাদের চিঠিপত্রেই আজ ছেয়ে আছে পাতাটা। কারুর মতে পুরসভাই দায়ী, কেউ বা আঙুল তুলেছে সরকারি অপদার্থতার দিকে, কোনও কোনও চিঠিতে মুন্ডুপাত করা হয়েছে পুলিশের। নাগরিকদের মধ্যে ন্যূনতম সিভিক সেন্স গড়ে ওঠেনি বলেও আক্ষেপ করেছে অনেকে। অকালে একটা টাটকা ফুল ঝরে যাওয়ার বেদনায় চোখের জলও কম ঝরেনি।
সত্যি তো, এ কেমন দেশ? দিনের পর দিন ম্যানহোল খোলা পড়ে থাকে, পুরসভার ভ্রূক্ষেপ নেই। ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়ে যায়, পুলিশ মাথাই ঘামায় না। পথেঘাটে হাঁটাচলার মতো সামান্য একটা ব্যাপারেও মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারে না সরকার। আর নাগরিকদের তো কোনও রকম সিভিক সেন্স নেইই। চুরি না আটকাতে পারুক, গর্তে একটা পাথর চাপা দিতে পারেনি?
সব ঠিক। কিন্তু, মা’টির কথা কেউ লেখে না কেন? বাচ্চার হাত ধরে হাঁটার সময়ে মা কী করে এত বেখেয়াল হয়? কেমন মা? সামনে গর্ত আছে না ঢিবি, একবার তাকিয়ে দেখবে না? দোষটা তো মাকেও দেওয়া উচিত।
—বাবা, আপনাকে একটু মাছের ঝোল দেব?
চিন্তা ছিঁড়ে গেল। পাতের দিকে তাকালেন আর্য।।
শরণ্যা ফের জিজ্ঞেস করল,—দিই ঝোল? অল্প করে?
—উঁ, নাহ্, লাগবে না।
—বড্ড শুকনো শুকনো খাচ্ছেন যে?
—ঠিক আছে। আমি এ রকমই তো খাই।
শরণ্যার ওই যত্নটুকু ভাল লাগল আর্যর। মেয়েটা বেশ, কথাবার্তা ভারী মিষ্টি। মুখার্জিবাড়ির…উঁহু, মুখার্জি নয়, চ্যাটার্জিবাড়ির ধারায় পড়ে এখনও তাঁকে অশ্রদ্ধা করতে শেখেনি। বাবা-মা সুশিক্ষাই দিয়েছেন মেয়েটাকে। আর্যর ছোটখাটো সুখসুবিধেগুলোর ব্যাপারে এই প্রথম বুঝি কেউ নজর রাখছে। চা’টা কফিটা দিয়ে আসে ঘরে, খেতে ডাকে, একসঙ্গে খেতে বসে, অন্তত এই দুপুরবেলাটায়…আর্যর কাছে এই প্রাপ্তিটুকুও কম নয়।
মেয়েটা অন্তর থেকেই করে তো? না করলেই বা কী? করুণা করলেই বা কী যায় আসে? আর্য ভাল মতোই জানেন, তিনি এ-বাড়িতে করুণারই পাত্র। আজ বলে নয়, চিরটাকাল।
খবরের কাগজে মন ফেরানোর আগেই ফের শরণ্যার গলা শুনতে পেলেন আর্য,—আমি তো বাবা একদম শুকনো খেতে পারি না। ঝোল না হলে হয়? গলায় আটকে যাবে না? আমার মা তো বলে, বুবলির ভাত নদীতে ভাসে।
আর্যর শুনতে মজা লাগছিল। এমন ফুরফুরে সুরে এ-বাড়িতে তো কেউ কথা বলে না। কৌতুক করে বলতে ইচ্ছে হল, তাই বুঝি? আর তরকারিগুলো কি নৌকো হয়ে ঘুরে বেড়ায়?
শব্দই ফুটল না গলায়। এ-বাড়ির কারুর সঙ্গে খোলা মনে কথা বলতে গেলে কোত্থেকে যে একটা অবরোধ এসে দাঁড়ায়!
কিন্তু শরণ্যাকে কি ঠিক এ-বাড়ির কেউ বলা যায়? একদিক দিয়ে দেখতে গেলে তাঁর আর শরণ্যার তো মুখার্জিবাড়িতে একই স্ট্যাটাস। উঁহু, মুখার্জিবাড়ি নয়, চ্যাটার্জিবাড়ি। একজন সোমশংকর চ্যাটার্জির নাতির বউ, অন্যজন সোমশংকরের মেয়ের বর। দু’জনেই বহিরাগত। ওই সূত্র ধরেই তাঁরা কি পরস্পরের আর একটু ঘনিষ্ঠ হতে পারেন না? প্রবীণতর হিসেবে আর্যরই তো উদ্যোগটা নেওয়া উচিত।
অবশ্য ওই মেয়ে একাই একশো। একা একাই বকে যেতে পারে। সপ্তাহ দু’য়েক হল ইউনেস্কোর কী এক প্রকল্পে কাজ শুরু করেছে, রোজই ফেরার সময়ে একবার ঢুঁ মারে তাঁর ঘরে, গল্প শোনায় সেদিন কতটুকু কী হল। প্রশ্নও করে খুব। কালও প্রাচীন গ্রিসে মেয়েদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে কত কী জানতে চাইছিল। কৌতূহলের দাবি মেটাতে মেটাতে আর্য হিমশিম। সেই কতকাল আগে হারিয়ে যাওয়া অধ্যাপক হতে চাওয়া মানুষটাকে খুঁড়ে খুঁড়ে বার করতে হয়, মন্দ লাগে না আর্যর।
শরণ্যা বকবকম করেই চলেছে,—বাবা, আপনার কিন্তু অনেকটা ভাত পড়ে রইল। আপনি কিন্তু আজ খাচ্ছেন না।
স্নেহের ধমকটুকু উপভোগ করলেন আর্য। মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন,—খাচ্ছি তো। আমি তো আস্তে আস্তেই খাই।
—উঁহু। আপনি যেন কী একটা ভাবছেন? কাগজে কোনও ইন্টারেস্টিং খবর আছে নাকি?
পলকের জন্য আৰ্যর মনে হল চিঠিচাপাটিগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করেন শরণ্যার সঙ্গে। পরক্ষণে মন বদলালেন। যদি শরণ্যার সঙ্গে মতে না মেলে? বাচ্চাটার মৃত্যুর জন্য তিনি মাকেও অংশত দায়ী করতে চান, শরণ্যা বোধহয় এটা মানতে পারবে না। হয়তো একটা তর্ক শুরু হবে। তর্কে আর্যর তীব্র অনীহা।
আর্য বললেন,—তেমন কিছু নেই। বলেই খবরের কাগজখানা উলটে রাখলেন পাশে। জিজ্ঞেস করলেন, —তুমি আজ বেরোবে না?
—কাল একগাদা বই এনেছি। বেশ কয়েকখানা রেফারেন্সও। আজ কম্পিউটার থেকে রেফারেন্স ধরে ধরে ডাটা কম্পাইল করব। এক দিনে হবে না, দু-তিন দিন বাড়িতেই কাজ করতে হবে এখন।
—তোমরা নেপাল ভূটানের ডাটা পাচ্ছ কোত্থেকে? ওখানে কি সেনসাস হয় নিয়মিত?
—হ্যাঁ, হয় তো৷
—আর মায়নামার? ওদের তো নাকি কোনও কিছুই বাইরে আসে না!
—এখন আসছে। কয়েকটা বেশ ভাল ভাল স্টাডি রিপোর্টও আছে। এখনও অবশ্য জোগাড় হয়নি…
বলতে বলতে ঝুপ করে থেমে গেল শরণ্যা। মুখটা যেন কেমন করে বসে রইল একটুক্ষণ। তারপর আচমকাই মুখ চেপে দৌড়োল বড় বাথরুমটায়।
আর্য শব্দ পেলেন ওয়াক ওয়াক করে বমি করছে মেয়েটা। ঘাবড়ে গেলেন খুব। এই মুহূর্তে কী করা উচিত ভেবে পাচ্ছিলেন না। উঠে গিয়ে দেখবেন শরণ্যাকে? তিনি বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লে মেয়েটার অস্বস্তি হবে না তো?
মিনিট তিন-চার পর ঘাড়ে মাথায় জল দিয়ে বেরিয়ে এল শরণ্যা। সালোয়ার কামিজের ওড়নায় মুখ মুছছে।
আর্য উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,—কী হল হঠাৎ ?
অল্প অল্প হাঁপাচ্ছিল শরণ্যা। দম নিতে নিতে বলল,—গা’টা কেমন গুলিয়ে উঠল!
এ-বাড়ির সদস্য হওয়ার সুবাদে নিজের অজান্তেই ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার প্রবৃত্তিটা হারিয়ে ফেলেছেন আর্য। তবু কেন যেন আজ এখানেই থামতে পারলেন না। হয়তো এ বাড়ির কেউ সামনাসামনি নেই বলেই। হয়তো কন্যাপ্রতিম মেয়েটির ওপর কণামাত্র হলেও দুর্বলতা জন্মে গেছে আর্যর।
অভিভাবকের সুরে প্রশ্ন করলেন,—কেন? গা গুলোল কেন? হজমের গণ্ডগোল?
—তাই হবে।
—সকালে উলটোপালটা কিছু খেয়েছিলে?
—না তো। ওই সসেজ আর ব্রেড।
—নির্ঘাত তা হলে পেট গরম হয়েছে!… এখন কেমন ফিল্ করছ?
—বেটার।…একটু ভাল।
—বমি ভাবটা নেই তো আর ?
—কমে গেছে অনেকটা। মনে হয় খুব অম্বল হয়েছিল।
—ওষুধ খাবে কিছু? আমার ঘরে অ্যান্টাসিড আছে।
—একটু দেখি। তেমন বুঝলে নিয়ে আসব।
আর্য আর প্রশ্নে গেলেন না। টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লেন। ঈযৎ চিন্তিত মুখে বেসিনে মুখ ধুচ্ছেন। তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে চোখে পড়ল মেয়েটা ঘরে যায়নি, ডাইনিংটেবিলে বসে আছে ঝুম হয়ে। এখনও কি অসুস্থ বোধ করছে ?
পায়ে পায়ে শরণ্যার সামনে এলেন আর্য। নরম গলায় বললেন, —এখন আর পড়াশুনো নিয়ে বোসো না। রেস্ট নাও। শোও গিয়ে। যদি মনে হয় ফের শরীর খারাপ লাগছে আমায় ডাকবে। ডক্টর মিত্র দুপুরের পর থেকে বাড়িতেই থাকেন, আমি ওঁকে একটা ফোন করে নেব।
শরণ্যা বাধ্য মেয়ের মতো ঘাড় নাড়ল,—আচ্ছা।
কথাগুলো বলতে পেরে ভেতরে ভেতরে আর্য একটা অচেনা তৃপ্তি অনুভব করছিলেন। ঘরে গিয়েও খানিকক্ষণ রয়ে গেল রেশটা। কতকাল পর বুঝি কারুর জন্য একটু উদ্বিগ্ন হতে পারলেন।
টেবিলঘড়িতে একটা দশ। ইজিচেয়ারে শরীর ছেড়ে বসে আছেন আর্য। বিশ্রাম নিচ্ছেন। বড়সড় বেঁটে ঘরখানার দু’দিকে দুই দু’গুণে চারখানা জানলা। চারটে জানলা দিয়েই চৈত্রের শুকননা বাতাস ঢুকে পড়ছে হঠাৎ হঠাৎ। স্ট্যান্ডফ্যানের হাওয়ায় ধাক্কা খেয়ে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। বাতাসটা বেশ গরম। হলকার মতো লাগে। তবু উঠে জানলা বন্ধ করলেন না আর্য, চোখ রেখেছেন গরাদের ওপারে। বাড়িটা দক্ষিণমুখখা। আর্য কখনও রাস্তার দিকে মুখ করে বসেন না, তাঁর প্রিয় দিক পশ্চিম। এ-পাশে বাউন্ডারি ওয়ালের আগে এক ফালি সবুজ আছে, একটা-দুটো গাছ স্নিগ্ধ করে রেখেছে জায়গাটাকে। ঝাঁকড়া কামিনী গাছটায় কোত্থেকে আজ একটা পাখি ডাকছিল। পিকপিক পিকপিক। পাখিটার একটানা ডাক শুনতে শুনতে আর্য ক্রমশ ডুবে যাচ্ছিলেন তন্দ্রায়।
ঘুম ভাঙল নীলাচলের ডাকে,—বাবু…?
ধড়মড়িয়ে উঠলেন আর্য। চোখ রগড়ালেন।
নীলাচল দরজায়। বলল,—কখন কফি রেখে গেছি। আপনি এখনও ওঠেননি ?
—ক’টা বাজে?
—তিনটে। টেবিলঘড়ি নয়, নিজের সোনালি ডায়ালের রিস্টওয়াচখানা দেখল নীলাচল। বলল,—না না, তিনটে পাঁচ।
এতক্ষণ ঘুমিয়েছেন আর্য ? কোনওকালেই আর্যর দিবানিদ্রার অভ্যেস নেই। বড় জোর পাঁচ-দশ মিনিট চোখ বুজে থেকে ভাতের আমেজটা ছাড়িয়ে নেন। দুপুরে ঘুমোন না বলে এই চৌষট্টি বছর বয়সেও তাঁর শরীর যথেষ্ট ফিট। ঘরে বসে থেকেও। সকালে হাঁটার অভ্যেসটা সুগার প্রেসারকেও বশে রেখেছে। কিন্তু আজ কেন ঘুমিয়ে পড়লেন? আবছা ভাবে মনে পড়ল তন্দ্রাচ্ছন্ন হওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত একটা পাখির ডাক ভেসে আসছিল কানে। পাখিটাই কি তবে ঘুম পাড়িয়ে দিল?
অলস রোমান্টিক চিন্তায় সময় কাটানো আর্যর শোভা পায় না। পুরু লেন্সের চশমাখানা চোখে লাগিয়ে ইজিচেয়ার ছেড়ে স্টাডি-টেবিলে এলেন। ফ্লাস্ক খুলে কালো কফি ঢাললেন ঢাকনা-গ্লাসে।
চিনিবিহীন তেতো কফি ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে মগজকে। কাগজ গুছিয়ে কলম খুললেন। এক্ষুনি চিঠিটার মুসাবিদা করে ফেলবেন। লেখা শুরুর আগে আর একবার পড়ে নিলেন আজকের প্রকাশিত চিঠিগুলো। দাগ মারলেন কোন কোন চিঠিকে তিনি আক্রমণ করবেন।
সংবাদপত্রে পত্রাঘাত করা আর্যর নেশা। এ-বাড়ির লোকরা বলে বাতিক। নেশা না বাতিক কোন কথাটা তাঁর জন্য সুপ্রযোজ্য হবে আর্য নিজেও বোঝেন না। তবে বিশেষ এক ধরনের সংবাদ তাঁকে প্রণোদিত করে। পারিবারিক খুনখারাপি অথবা অস্বাভাবিক মৃত্যু। মাসখানেক আগে একটি মেয়ে তার মাকে হত্যা করেছিল। প্রেমিককে বিয়ে করায় বাধা দিচ্ছিল মা, ঠান্ডা মাথায় পথের কাঁটা উপড়ে ফেলে মেয়েটি। ঘটনাটি নিয়ে কলকাতার সমস্ত খবরের কাগজেই ক’দিন কী আলোড়ন। প্রায় সব চিঠিপত্রেরই ঘুরে ফিরে এক বয়ান। আজকালকার ছেলেমেয়েরা দারুণ উন্মার্গগামী হয়ে গেছে, তাদের এতটুকু সহ্যশক্তি নেই, গুরুজনদের মতামতকে তারা সম্মান দিতে জানে না, যা চায় তা পেলেই তারা দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে যায়, সিনেমা টিভির ভায়োলেন্স এদের আরও বিগড়ে দিচ্ছে, সব চেয়ে আপনজনকে যে সন্তান খুন করে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর্য ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন মেয়ের এ রকম মনোভাব গড়ে ওঠার পিছনে মায়েরও দায়িত্ব আছে। প্রকারান্তরে বলা যায় মা নিজের মৃত্যু নিজেই ডেকে এনেছেন। মা মেয়ের সম্পর্কে ফাঁক ছিল বলেই এমন কাজ করতে পেরেছে মেয়ে। যে সন্তান মাকে ভালবাসতে পারে না, তাকে দণ্ড না দিয়ে সমবেদনার চোখে দেখাটা বেশি জরুরি। অনেকেই তাঁর বক্তব্য মানতে পারেননি, প্রতিবাদ করে বেশ কয়েকটা চিঠিপত্রও বেরিয়েছিল। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থনও করেছিলেন এক-আধজন। এর আগেও এক কিশোর তার বাবা-মাকে নৃশংস ভাবে খুন করেছিল, সেবারও আর্য ঢেউয়ের বিপরীতে গিয়ে কলম ধরেছিলেন। এ রকম এক-দু’বার নয়, বার বার তিনি গড্ডলিকার বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর চাঁচাছোলা বক্তব্য ছাপতে রাজি হয় না খবরের কাগজ, তবু আর্য দমেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজ বা পরিবেশ নয়, ছেলেমেয়েদের মানসিক বিকৃতির মূল কারণ নিহিত থাকে তাদের পরিবারে।
কোত্থেকে এই ধারণা জন্মাল আর্যর? নিজের পরিবার? অনিন্দ্য বা সুনন্দ কাউকেই তাঁর স্বাভাবিক মনে হয় না! এক জনের মধ্যে শুধুই ঘৃণা, অন্য জন চরম উদাসীন। আর্য যদি নিজের মত নিজে মানেন, তা হলে তিনি নিজেও তো ছেলেদের অস্বাভাবিকতার জন্য দায়ী। হ্যাঁ, আর্য মনকে চোখ ঠারেন না। প্রতিটি চিঠিতে তিনি নিজেকেও চাবুক কষাতে চান। ভেতরটা তাঁর ক্ষতবিক্ষত হয়, যন্ত্রণাটা তিনি উপভোগ করেন। এ তাঁর একধরনের মর্ষকামিতা। স্ত্রীর ব্যক্তিত্বের চাপে চিরকাল নুয়ে থেকেছেন তিনি, অথচ একটা অক্ষম ক্ষোভ অহর্নিশি তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। অনুভূতিটা শুধু তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্ককেই শীতল করেনি, দুই ছেলের কাছে ঘেঁষতেও তিনি আগ্রহ হারিয়েছেন। মনে হয়েছে, ওরা আমার কে? দু’জনেই তো সোমশংকরের মেয়ের ছেলে! নিবেদিতার গা-ছাড়া মনোভাব যখন ছেলেদুটোকে বদলে দিচ্ছিল, আর্য তখনও এগোতে পারেননি। অনেক দেরি হয়ে গেছে যে তখন। ছেলেদের চোখে আর্য তখন প্রায় অস্তিত্বহীন। অথবা ক্লীবমাত্র। যাকে কোনও কোনও মুহূর্তে করুণা করা যায়, কিন্তু মানুষ বলে গণ্য করা যায় না।
নিজের এই বিপন্নতা বড় পীড়া দেয় আর্যকে। বুঝি ওই চিঠিগুলো লিখেই তিনি একটু মুক্তি পেতে চান। নিজেকে আঘাত দিয়ে রফা করতে চান মনের সঙ্গে।
আজ চিঠিটার মুসাবিদা ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না আর্যর। কখনও মনে হয় বড্ড বেশি কড়া হয়ে যাচ্ছে, কখনও বা যুক্তি খেই হারিয়ে ফেলছে। একবার কাটলেন, দু’বার কাটলেন, বার কয়েক কাটাকাটির পর বেশ খানিকটা অসহিষ্ণু হয়ে পড়লেন আর্য। ছেঁড়া কাগজ দলামোচড়া করে ঢোকাচ্ছেন ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে। কফি খেলেন দু’চুমুক। উঠে পায়চারি করছেন ঘরে। আর্য আর অনিন্দ্যর মুখ একই ছাঁচে ঢালা। ফরসা ফরসা মেয়েলি ধাঁচের মুখখানায় নানান রংয়ের অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে। মাথা ঝাঁকাচ্ছেন আর্য। আপন মনে বিড়বিড় করছেন। যেন চিঠির বক্তব্য গোছাতে গিয়ে লড়াই করছেন কারুর সঙ্গে।
টেবিলে পেলোপোনেশিয়ান ওয়ার বইটা পড়ে আছে। অনেককাল পর কাল রাত্রে আর্য উলটেপালটে দেখছিলেন বইখানা। অন্যমনস্ক ভাবে বইটা হাতে তুলেও সরিয়ে রাখলেন টেবিলের একধারে। ফের বসেছেন চিঠি নিয়ে। পৌনে পাঁচটা বাজে, লেখার জায়গাটায় আলো একটু কম কম লাগছে, টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে নিলেন আর্য। সাদা কাগজে শুরু করলেন—মাননীয় সম্পাদক মহাশয়…
তিন লাইন লিখতে-না-লিখতেই ভাবনা ছিঁড়ে ফরদাফাঁই। উৎকট বাজনার আওয়াজ। গোটা বাড়ি যেন কাঁপছে ঝনঝন। সুনন্দর সাঙ্গোপাঙ্গরা এসেছে ! কখন এল? তারা তো নিঃশব্দে সিঁড়ি ভাঙার পাত্র নয়! আর্য যখন ঘুমোচ্ছিলেন তখনই কি…? এতক্ষণ চুপচাপ ছিল? নাকি এইমাত্র উঠল, আর্য খেয়াল করেননি?
হঠাৎ হঠাৎ এক এক দিন এই অত্যাচারটা করে সুনন্দ। চলে প্রায় ঘণ্টা দু’ তিন। আর্যর তখন পাগল পাগল লাগে, মনে হয় বাড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান রাস্তায়।
বাজনার পরদা চড়ছে ক্রমশ। হঠাৎই শরণ্যার কথা মনে পড়ল আর্যর। মেয়েটার আজ শরীর খারাপ, নিশ্চয়ই বিশ্রাম নিচ্ছে। বেচারা এই উৎপাতে তো অতিষ্ঠ হয়ে যাবে। ওপরে গিয়ে বারণ করে আসবেন? ধমকাবেন সুনন্দকে? বলবেন, অন্যদের সুবিধে অসুবিধের কথা একটু ভাবতে শেখো?
একটা তেতো হাসি ফুটে উঠল আর্যর ঠোঁটে। তিনি জানেন তিনি কিছুই বলতে পারবেন মা। বসে বসে শুধু গুমরোনোটাই তাঁর নিয়তি।
দু’হাতে কান চেপে আরামকেদারায় এসে বসলেন আর্য। শেষ সূর্যের আলো পড়েছে কামিনী গাছের মাথায়, ডগার পাতাগুলো চিকচিক করছে আলোয়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আর্যর শরীর ক্রমে শিথিল হয়ে এল। বাজনার আওয়াজ অসহ্য, তবে যেন সয়ে আসছে কানে। চোখের সামনে থেকে একটা দিন মুছে যাচ্ছে। আরও একটা নিষ্ফলা দিন। একটা বিফল মানুষের আয়ু আরও কয়েক ঘণ্টা কমে গেল।
আর্যর দৃষ্টি আবছায়ায় স্থির। আবছায়া? না শুধুই ছায়া? ক্রমশ ছায়া যেন গাঢ় হচ্ছে। অন্ধকারে গাঢ়তর আঁধার হয়ে ফুটে উঠছে অতীত। সারাটা জীবন কী করলেন তিনি? এম-এ-তে অসাধারণ রেজাল্ট করার সুবাদে চাকরি পেলেন, অথচ প্রথম দিনই ক্লাসে গিয়ে পা কাঁপতে লাগল, বুক ধড়াস ধড়াস। ছাত্রছাত্রীদের সরল প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েও গলা শুকিয়ে কাঠ। গোড়ার দিকে ভেবেছিলেন এ বুঝি প্রাথমিক জড়তা, আস্তে আস্তে ধাতস্থ হয়ে যাবেন, কিন্তু হল কই? জানা বিষয়ও ক্লাসে গিয়ে ভুলে যান, লেকচার দিতে গিয়ে তোতলাতে শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু হল কলেজে, ক্লাসে ঢুকলে ছেলেমেয়েরা বিচিত্র আওয়াজ করে, করিডোরে টিটকিরি দেয়, স্টাফরুমেও তিনি সহকর্মীদের মজার খোরাক। প্রিন্সিপাল বারীন গুপ্ত একদিন ডেকে বললেন, কথা বলাটা যখন তোমার আসে না, তুমি নোট বানাতে শুরু করো। মরিয়া হয়ে আর্য রাত জেগে দিস্তে দিস্তে ইতিহাসের নোট বানালেন, তাতেও সমস্যা মিটল না। বোর্ডে লিখতে গেলে হাত কাঁপে, দেখে দেখে পড়তে গেলে গলা। শিক্ষকতার পেশাটা ছেড়েই দিলেন আর্য, মিউজিয়ামে চাকরিটা পেয়ে যেন বেঁচে গেলেন। এক কোণে ঘাড় গুঁজে নিজের কাজটি করে যাও, সামনে আর অনেক মুখ নেই, এই তো বেশ। টানা আঠাশটা বছর জাদুঘরে চাকরি করলেন আর্য, কোথাও এতটুকু ছাপ পড়ল না। প্রাচীন পাথরের মাঝে এক টুকরো জীবন্ত ফসিল হয়ে কাটিয়ে দিলেন দিব্যি। অফিসকলিগরা আড়ালে তাঁকে কী নামে ডাকতেন তাও তিনি জানেন। মিস্টার ডাম্ব। ডাম্বু। অফিসে কত অবিচারের শিকার হয়েছেন আর্য। প্রাপ্য প্রোমোশান পাননি, অকর্মণ্য হিসেবে তাঁকে দেগে দেওয়া হয়েছে, ছুড়ে ফেলা হয়েছে অপ্রয়োজনীয় বিভাগের ডাস্টবিনে। সহকর্মীদের দেওয়া নামের মর্যাদা রাখতেই বুঝি টুঁ শব্দটি করেননি।
বাড়িতেই বা কী পেয়েছেন? এক-আধ বার আহত কুকুরের মতো ফুঁসে ওঠা ছাড়া?
এ রকম একটা মানুষের জীবন থেকে একটা দিন খসে গেলেই বা কী?
তবু যে কেন এক অচেনা ভয় আঁচড় কাটে আর্যর বুকে? মৃত্যু কি আরও এক কদম এগিয়ে এল ?
আশ্চর্য, বেঁচে থাকা অর্থহীন জেনেও কেন যে মৃত্যুকে এত ভয়?
ইজিচেয়ার সামান্য নড়ে উঠল।
ঝাঁকুনি খেয়ে আর্য চমকে তাকালেন। নীলাচল।
অবাক চোখে নীলাচল দেখছে আর্যকে,—আপনার হল কী বাবু?এই ঝাঁপঝাঁইয়ের মাঝেও ফের ঘুমিয়ে পড়েছেন?
আর্য গোমড়া মুখে বললেন, —আমি জেগে আছি।
—সাড়া দিচ্ছেন না যে? কখন থেকে ডাকছি!
—কেন?
—আপনার ফোন।
আর্যর কপালে প্রশ্ন চিহ্ন।
—আপনাকেই খুঁজছে। হ্যান্ডসেটটা এনে দেব?
হ্যান্ডসেট থাকে সোমশংকরের মেয়ের ঘরে। আর্য বললেন,—থাক। আমি যাচ্ছি।
দোতলায় বাজনার দাপট আরও বেশি। কিছুই প্রায় শোনা যাচ্ছে না। এক কান চেপে রিসিভার অন্য কানে নিলেন আর্য,—হ্যালো…? কে বলছেন? জোরে বলুন।
—কে? …বড়দা? ক্ষীণ স্বর ভেসে এল,—আমি ভোম্বল।
—ও।…বল।
—তোমার বাড়িতে কোনও ফাংশান হচ্ছে নাকি?
—অ্যাঁ?… হ্যাঁ। একটু গানবাজনা…
—বেশ আছ।
ভোম্বলের স্বরে শ্লেষ। আর্যর গলা আরও ভারী হল, দরকারটা কী বল।
—তোমাকে একটা খবর দেওয়ার ছিল। মেজজামাইবাবু মারা গেছেন।
আবছা ভাবে মেজ বোনের বরের মুখটা মনে পড়ল আর্যর। আবছা ভাবেই। স্বরে বিশেষ আবেগ ফুটল না। বললেন,কবে?
—পরশু। রাত্তির সাড়ে এগারোটা নাগাদ।
—ও।…কী হয়েছিল?
—সেরিব্রাল অ্যাটাক। হাসপাতাল নার্সিহোম অব্দি নেওয়া যায়নি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই…
—ও।
—মেজদি খবরটা তোমায় দিতে বলল। পারলে একবার এসো।
টেলিফোন রেখে আনমনে ঘরে ফিরলেন আর্য। চেয়ারে বসে ছোট্ট একটা শাস ফেললেন। বুলুর বর মারা গেছে পরশু রাতে, খবরটা তাঁকে দেওয়া হল প্রায় দু’ দিন পর। ঠিকই তো আছে। ভাইবোনদের সঙ্গে আর্যর তো এখন এ রকমই সম্পর্ক। যোগাযোগ যেটুকুনি আছে, সেও তো প্রায় না থাকারই মতো। এক ডোম্বলই যা আসে ন’ মাসে-ছ’ মাসে। বাঁকা চোখে দেখে সোমশংকরের প্রাসাদটাকে, তবু আসে। বাকিদের সঙ্গে তো বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া দেখাই হয় না। বুলুরা তো অনিন্দ্যর বিয়েতেও আসেনি। তাঁকে যে আদৌ দুঃসংবাদটা জানানোর কথা বুলুর মনে পড়ল এই না ঢের।
আর্য জানেন তাঁর ওপর ভাইবোনদের একটা উগ্ৰ অভিমান আছে। থাকাটা অস্বাভাবিকও নয়। পরিবারের উজ্জ্বলতম রত্ন বলে যাকে মনে করা হত, সে যদি বড়লোকের ঘরজামাই হওয়ার টানে সবাইকে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়, তাকে কি বাড়ির লোক পুজো করে! অবশ্য বিয়ের পরও আর্য বাড়ি যেতেন নিয়মিত, অন্তত যতদিন বাবা-মা ছিলেন। বুলু-টুলুর বিয়েতে যেচে টাকাপয়সাও দিয়েছেন। তবে টের পেতেন তাঁকে আর কেউ ও বাড়ির মানুষ বলে মনে করে না। কতদিন আর একতরফা সম্পর্ক বয়ে বেড়ানোর দায় নেওয়া যায় ? আর্যও নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন ক্রমশ। ভেতরটা বিশ্রী ভাবে জ্বলত তখন। একসময়ে সেই জ্বালাপোড়াও মরে গেল, তার জায়গায় ভর করল এক অদ্ভুত নির্লিপ্তি। ইচ্ছে হলে খবর নিয়ো, না হলে নিয়ো না, এমন একটা মনোভাব। অনিন্দ্যর বিয়েতে বুলুরা এল না, বড়দিও না, তার জন্য কতটুকু আহত হয়েছেন আর্য ?
বুলুর বরের মৃত্যুসংবাদেও কি তিনি মুহ্যমান? উঁহু। শুধু খবরটা দেরি করে পাওয়ার জন্যই বুঝি খচখচ করছে মনটা। একান্তই অর্থহীন, তবু কেন যে করছে?
নীলাচলকে ডেকে ফ্রিজ থেকে সোডার বোতল আনালেন আর্য। বসলেন তরল পানীয় নিয়ে। নিত্য অভ্যাসে সুরা আর তেমন ক্রিয়া করে না মস্তিষ্কে, তবু যেন একটু শিথিল হয় স্নায়ু, শান্তি শান্তি আমেজ আসে একটা। এখন তিনি বই খুলবেন, অক্ষরের অরণ্যে ডুবে থাকবেন খানিকক্ষণ। অক্ষরের জঙ্গল ঝাপসা হওয়ার আগে খেতে উঠবেন ওপরে। নেমে এসে দেখবেন দেড় তলার ঘরে সিংগল বেড খাটখানায় শোয়ার আয়োজন সম্পূর্ণ করে রেখে গেছে নীলাচল। টেবিলে সাজানো আছে গ্লাস, জলের জগ। আর্য জল খাবেন একটু। বাথরুমেও যাবেন, তবে তক্ষুনি তক্ষুনি শোবেন না। ইজিচেয়ারে ছড়িয়ে দেবেন শরীর, ফিকে আঁধারের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসবে চোখ, স্ট্যান্ডফ্যানের মুখ বিছানা অভিমুখে ঘুরিয়ে ঈষৎ বেসামাল পায়ে আর্য গড়িয়ে পড়বেন বিছানায়।
আজ ছন্দপতন ঘটল। খাওয়ার পর নেমে এসে জলে চুমুক দিয়েছেন কি দেননি, ঘরে চেনা পায়ের শব্দ। সোমশংকরের মেয়ে।
আর্যর ভুরু কুঁচকে গেল। ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন,—কিছু বলবে?
নিবেদিতার পরনে নাইটি হাউসকোট। হাউসকোটের ফিতে টাইট করতে করতে বললেন,—তোমার সঙ্গে জরুরি কথা ছিল।
আর্য মনে মনে বললেন, জরুরি কথা ছাড়া কি আসো তুমি?
মুখে বললেন, —বলো।
—শুনেছ তো, আমাদের শোভাবাজারের বাড়ি এক্ষুনি বিক্রি হচ্ছে না?
আর্য মনে মনে বললেন,—আমায় বলবেটা কে? আর শুনেই বা কী করব?
মুখে বললেন, —এই শুনলাম।
—বাড়িটা বিক্রি না হয়ে খুব অসুবিধেয় পড়ে গেলাম। টাকার খুব দরকার ছিল।
আর্য মনে মনে বললেন, তো?
মুখে বললেন,—হুম্।
—তুমি আমায় কিছু ধার দাও। মাস ছয়েকের মধ্যে শোধ দিয়ে দেব।
দুটো আর্য মিশে গেল,—কত?
—এই লাখ দেড়েক মতো।
—এত টাকা! কেন?
—টাকা কীসের জন্য লাগে ? নিশ্চয়ই আমি ওড়াব না। নিবেদিতা ঝেঁঝে উঠলেন। বুঝি বা আর্যর কাছে হাত পাততে অস্বস্তিও ছিল, সেটাই যেন প্রকাশ পেল অন্য সুরে,—বাড়িটা দিন দিন ঝাঁঝরা হচ্ছে, নজরে পড়ে? শুধু রং করালেই কি কাজ শেষ হয়ে যায়? একতলাতে তো হাতই পড়েনি। ভাড়া দিতে এসে প্রতি মাসে মাথুর শুনিয়ে যাচ্ছে, এখানে চাপড়া খসে পড়ছে, ওখানে মেঝে ফেটে যাচ্ছে……। ওদের আমি কথা দিয়েছিলাম বাথরুমগুলো রেনোভেট করে দেব…..। গাড়িটারও তো ওই কন্ডিশন! দশ দিন গ্যারেজে কাজ হল, উনিশ হাজার টাকা খরচা করলাম, তার পরও রোজ বন্ধ হচ্ছে! চলে এ ভাবে? নতুন না হোক, একটা সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়িও তো কিনতে হয় এবার। উটপাখির মতো মুখ গুঁজে আছ থাকো, অন্তত ঝড়ের খবরগুলো তো রাখো।
আর্য বলতে পারতেন, আমার তো এত সব জানার কথা নয়। বাড়ি তোমার, ভাড়াটে তোমার, টাকাও তোমার ব্যাগেই ঢোকে। গাড়িটাও তুমিই চড়ো।
বলতে পারলেন না। তবে অপ্রসন্ন স্বর ফুটল গলায়,—বটেই তো। বটেই তো। সব খবর তো তুমি একাই রাখো।
—রাখিই তো।
—বাড়িতে একটা বাইরের মেয়েকে এনেছ, তার দিকে খেয়াল আছে?
—কেন? নিবেদিতা থমকালেন, —কী হয়েছে শরণ্যার?
—আমাকে উটপাখি বলার আগে নিজেকে আয়নায় দ্যাখো।… মেয়েটা আজ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বমি করছিল।
—কখন ?
—দুপুরবেলায়। আমি ওকে জোর করে বললাম, শুয়ে থাকো, রেস্ট নাও…
—সো কাইন্ড অফ ইউ। নিবেদিতার স্বরে বিদ্রুপ,—ছেলেদের খোঁজখবর তো কোনও দিন রাখলে না, তাও অন্তত ছেলের বউয়ের খবরটা রাখছ!
—তোমার ছেলেদের খবর রাখার আমি কে? তারা আমায় পোঁছে? আমি তো শুধু কলুর বলদ, তাদের জন্য শুধু ঘানিই টেনে যাচ্ছি। ভুলে যেয়ো না, ক’দিন আগেও তোমার ছেলের বিয়েতে আমি দেড় লাখ টাকা দিয়েছি।
—তোমার ছেলে তোমার ছেলে করছ কেন? ছেলে আমার একার? তার বিয়েতে খরচ করা তোমার কর্তব্য নয়?
আর্য ফের দু’ টুকরো হয়ে গেলেন। একটা আর্য গজগজ করতে লাগলেন, হ্যাঁ, আমার তো শুধু ওইটুকুই কর্তব্য। অধিকারবিহীন দায়িত্ব পালনটাই আমার কাজ। ছেলের জন্য মেয়ে দেখলে তুমি, পাকা কথা বললে তুমি, বিয়ের দিনও তুমি স্থির করলে….আশীর্বাদের আগে হঠাৎ মনে পড়ল ছেলের একটা বাবাও তো আছে! তাকে বরকর্তা সাজিয়ে বিয়ের মণ্ডপে বসিয়ে রাখলে তো মন্দ হয় না ! বউভাতের দিন যাত্রাদলের রাজার মতো ধরাচূড়ো পরিয়ে তাকে দিয়ে অতিথি-অভ্যাগতদের আপ্যায়নের কাজটাও তো চালিয়ে নেওয়া যায়! ছেলের বিয়ে নিয়ে একটা পরামর্শও তুমি করেছ আমার সঙ্গে?
মুখে বললেন,—ওই কর্তব্যটুকুই তো করছি সারা জীবন। তুমি আজীবন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়িয়েছ, আর আমি টাকা রোজগার করে এনে হাওয়ায় ঢেলেছি।
—থাক, লেকচার মেরো না। নিবেদিতার স্বর বেঁকে গেল,—ওটাও তোমার ঠিকঠাক আসে না।
পুরনো প্রসঙ্গ নিয়ে খোঁচা দিচ্ছেন নিবেদিতা। মাঝে মাঝেই দেন ঠেসটা। এখনও। স্মরণ করিয়ে দেন আর্য একজন ব্যর্থ অধ্যাপক।
অন্য দিন মিইয়ে যান আর্য। আজ ওই দুর্বল জায়গাটায় ঘা পড়তেই আর্যর চোয়াল শক্ত হল। বরফ স্বরে বললেন,—আমি টাকা দিতে পারব না। আমার পক্ষে আর সঞ্চয় ভাঙা সম্ভব নয়।
—দেবে না তুমি? দেবে না? নিবেদিতা যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। অপমানে মুখ কালো হয়ে গেছে। বললেন,—ধার…তাও দেবে না?
আর্য চুপ।
—ভেবেছ টাকা না দিয়ে আমায় জব্দ করবে? নিবেদিতা চোয়ালে চোয়াল ঘষলেন,—বুড়ো হলে, এখনও তোমার জ্বলুনি গেল না! আমার নাম, আমার খ্যাতি এখনও তোমায় পুড়িয়ে মারে, অ্যাঁ?
আর্য নীরব।
নিবেদিতা জ্বলন্ত চোখে দু’-এক সেকেন্ড দেখলেন আর্যকে। মেঝেয় পা ঠুকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়লেন দরজায়। ঘুরে বললেন,—কী দেখে যে তোমার মতো একটা অশ্বডিম্বকে আমি বিয়ে করেছিলাম! কেন এখনও এক ছাদের নীচে বাস করছ ঢং করে? চলে যেতে পারো না কোথাও? আমি মুক্তি পাই!
হৃদয়ের ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে আর্যর। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হল, বহুকাল আগেই তো বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। সব কিছু ছেড়ে। পারলাম কই? কোন সুতোর টানে আটকে গেছি তুমি বোঝো না?
আর্য কিছুই বলতে পারলেন না। এই না-পারাটাই তো তাঁর স্বভাব। না-পারাটাই তাঁর যন্ত্রণা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন