এগারো

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

অনেকদিন পর ফুলিয়া থেকে তাঁতি এসেছে। চেনা লোক। বছরে বার দু’-তিন আসে নিবেদিতার কাছে। বিশেষ করে জুলাই আগস্ট মাসটা রাজেনের বাঁধা সময়। পুজোর আগে এই সময়টাতেই নতুন নতুন ডিজাইন বেরোনো শুরু হয়। নিজের জন্য বাছাই করা দু’-চারখানা শাড়ি রাখেন নিবেদিতা। তবে রাজেনের মূল লক্ষ্য থাকে সুহাসিনী। পুজোর সময়ে সুহাসিনীর মেয়েরা শাড়ি পায়। কম দামি হলেও এক লপ্তে অনেকগুলো কাপড় বিক্রি হয় রাজেনের। নিবেদিতাই সুহাসিনীর ব্যবসাটা ধরিয়ে দিয়েছেন, রাজেনের কাছে তাই নিবেদিতার খুব খাতির।

অনিন্দ্যর বিয়ের আগেও এসেছিল রাজেন। নমস্কারি শাড়ি, একে তাকে দেওয়ার শাড়ি সবই প্রায় রাজেনের কাছ থেকে রেখেছিলেন নিবেদিতা। তাঁর ধারণা তিনি রাজেনের কাছে কম ঠকেন।

গাঁটরি খুলে ড্রয়িংরুমের কার্পেটে বসেছে রাজেন। খুলে খুলে দেখাচ্ছে শাড়ি। একখানা কাঁচা হলুদের ওপর সিলভার জরি বার করে বলল, —বউদিরে ডাকেন মাসিমা। বউদির জন্য এখানা এস্পেশাল বানায়ে আনছিলাম। কম্পুটারের ডিজাইন।

নিবেদিতা সোফায় পা গুটিয়ে বসেছেন। হেসে বললেন, —সে তো এখন নেই। বাপেরবাড়ি গেছে।

—রংখানা কেমন খুলছে?

—মন্দ নয়। তবে তোমার ওই সিলভার জরি আমার ভাল লাগে না।

—এটাই তো এখন ফেশান মাসিমা। গোল্ডেন পুরাতন হয়ে গেছে। নতুন বউদির জন্য রাখেন। খুব মানাবে।

—তুমি তো তাকে দেখোইনি। নিবেদিতা হেসে ফেললেন, —রাখো। পাশে রাখো। ওই মাখন রংটা বার করো তো। হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই ঢাকাইটা।

শাড়ি দেখার ফাঁকে ফাঁকে গল্প চলছে রাজেনের সঙ্গে। বছর তিনেক আগে একবার ফুলিয়া গিয়েছিলেন নিবেদিতা, এই রাজেনের আমন্ত্রণেই। ঘুরে ঘুরে দেখেছেন তাঁতঘর। রঙিন সুতোর টানাপোড়েনে নক্‌শা বোনা। রাজেনের বাড়ির মেয়ে বউদের সঙ্গেও তখন আলাপ হয়েছিল। এখনও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সকলের কথা মনে আছে। নাম ধরে ধরে নিবেদিতা প্রত্যেকের খবর নিচ্ছিলেন। গত বছর বন্যায় তাঁতিদের খুব ক্ষতি হয়েছিল। মেরামতির কাজ পুরোপুরি হল কিনা, লোকসান সামাল দেওয়া গেছে কিনা, সব শুনছিলেন মন দিয়ে।

নীলাচল চা এনেছে। পরশুই দেশ থেকে ফিরেছে নীলাচল। এবার অবশ্য বেশি দিন ছুটি দেননি নিবেদিতা। মাত্র সাতদিন। তবে অঘ্রানে সে আবার যাবে। বিয়ের ঠিক হচ্ছে।

লাজুক লাজুক মুখে নীলাচল বলল, —আমার জন্যও একটা ভাল শাড়ি রাখুন মা।

নিবেদিতা হাসতে হাসতে বললেন, —তোর এখন কী? তোর বউয়ের শাড়ি তো পরে কিনব।

—আপনি তো বেনারসি দেবেন।… আমি একটা-দুটো নিজে কিনব না?

শুধু শাড়ি নয়, নীলাচলের বউকে একটা গয়নাও দিতে হবে। নিবেদিতা কথা দিয়েছেন। নিজের একজোড়া দুলটুল নয় পালিশ করে দিয়ে দেবেন। ওয়ার্ড্রোবে পড়ে থাকা সাদা বেনারসিটাও কি চালান করে দেওয়া যায় না? যাহ্, তা কী করে হয়? নতুন বউকে সাদা শাড়ি?

নীলাচল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হুকুম ছুড়ছে, —মাকে দেখান না, তিন-চারটে বেছে দেবেন। আমি দাম দিয়ে দেব।

—বুঝেছি। তোর অনেক টাকা হয়েছে।

শাড়ি কেনাবেচার পর্ব চলল আরও খানিকক্ষণ। রাজেন উঠল প্রায় এগারোটায়। আজ রবিবার, নিবেদিতার বিশেষ তাড়া নেই, ধীরেসুস্থে শাড়ি গোছাচ্ছেন ওয়ার্ড্রোবে। শরণ্যার জন্য রাখা শাড়িখানা আলাদা করে হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন আর একবার। রংটা সত্যিই খুব উজ্জ্বল। শরণ্যাকে মানাবে।

এবার নিবেদিতা স্নানে যাবেন। এমনি দিনে তাড়াহুড়ো করে বেরোতে হয়, ছুটির দিনের স্নান তাঁর কাছে একটা বিলাস। অনেকটা সময় নিয়ে চুলে শ্যাম্পু করবেন, জলে সুগন্ধ ছড়িয়ে শুয়ে থাকবেন বাথটবে। রবিবারের স্নানের এই সময়টুকুতেই তিনি সোমশংকরের মেয়ে হয়ে যান।

আজ সাপ্তাহিক শৌখিনতায় বাধা পড়ল। বাথরুমে ঢুকতে যাবেন, হঠাৎ জ্যোতিশংকর আর স্বরূপা হাজির। জ্যোতিশংকরের সঙ্গে নিবেদিতার সম্পর্কটা এখনও বেশ নরমে গরমে চলছে। কয়েকদিন আগেও টেলিফোনে যথেষ্ঠ বরফ ছোড়াছুড়ি হয়েছে।

তবে জ্যোতিশংকর আজ বাড়িতে অতিথি। সোমশংকরের মেয়ের অতিথি অভ্যাগতদের প্রতি সৌজন্যবোধ অতি প্রবল। বাবার কাছ থেকে শেখা। দারুণ আন্তরিক ভাবে নিবেদিতা বললেন, —আরে, তোমরা হঠাৎ? কী সৌভাগ্য!

জ্যোতিশংকরও সোমশংকরের ভাইপো। একই গোত্রের শিক্ষা তাঁরও রক্তে আছে। তাঁরও মুখে অমায়িক হাসি, —তোর বউদির এক কাকা মারা গেছেন। আজ শ্রাদ্ধ। পূর্ণদাস রোডে। ভাবলাম শ্রাদ্ধবাড়ি ঢোকার আগে তোর বাড়ি একবার ঘুরে যাই।

—খুব ভাল করেছ। ক’দ্দিন পর এলে। বলেই মুখটা করুণ করে নিবেদিতা স্বরূপার দিকে ফিরেছেন, —তোমার কোন কাকা গো?

—বড়কাকা। সেই যে, যিনি জার্মানিতে ছিলেন।

—ও। খুব ভুগছিলেন বুঝি?

—বয়স হয়েছিল। জ্যোতিশংকর বললেন, —পঁচানব্বই।

—না গো। প্রায় সাতানব্বই। স্বরূপা বলে উঠলেন, —অসম্ভব ফিট ছিলেন। চাকরের সঙ্গে রোজ সকালবেলা লেকে যেতেন। আমরা তো ভেবেছিলাম একশোই পূর্ণ করবেন। হল না।

সম্পূর্ণ অচেনা সেই কাকাটিকে নিয়ে পরিমিত কৌতূহল দেখালেন নিবেদিতা। বললেন, —কী খাবে বলো? শরবত? না চা কফি?

—শরবতই বল। জ্যোতিশংকর সোফায় ছড়িয়ে বসেছেন, —তোর সঙ্গে আমার একটা কথাও আছে।

নিবেদিতা জানেন জ্যোতিশংকর অকারণে আসার বান্দা নন। বললেন, —বলো।

স্বরূপা তাড়াতাড়ি বললেন, —তোমরা ততক্ষণ কথা সেরে নাও। আমি বরং আর্যদার সঙ্গে দেখা করে আসি।

স্বরূপা চলে গেলেন ম্যাজেনাইন ফ্লোরে। নীলাচলকে শরবত বানাতে বলে এসে বসলেন নিবেদিতা। বললেন, —মিনু তে এসে গেছে।

—তুই খবর পেয়েছিস?

—হ্যাঁ এসেই মিনু ফোন করেছিল।… তুমি তা হলে এবার রেজিষ্ট্রির ডেটটা ফাইনাল করে ফ্যালো।

—সেই কথাই তো বলতে আসা। লাখোটিয়া তো এখন আবার একটু বেগড়বাই করছে।

—কেন? ওর সঙ্গে তো কথা হয়েই আছে!

—ও একটু টাইম চাইছে। গড়িয়ায় একটা হাউজিং কমপ্লেক্স করেছে, সেখানে নাকি করপোরেশানের সঙ্গে ওর কী সব ঝামেলা চলছে। জলের কানেকশান পাচ্ছে না, কাউকে তাই পজেশানও দিতে পারছে না। বলছিল প্রচুর টাকা নাকি আটকে গেছে।

—ওসব গল্প শুনে আমাদের লাভ নেই। লাখোটিয়ার সঙ্গে যা এগ্রিমেন্ট আছে, তাতে আমরা রেজিষ্ট্রির দিন ঠিক করলে সে টাকা দিতে বাধ্য।

—আহা, লাখোটিয়া তো সে কথা অস্বীকার করছে না। শুধু আরও মাসখানেক সময়…

—তা কী করে হয়? আমরা কেন ওয়েট করব? সে মারবে দাঁও, তারপরও সবকিছু তার ইচ্ছে মতো হবে…

—আমিও লাখোটিয়ার ওপর কাল খুব চেঁচামিচি করেছি।

—জানি না কী করেছ। পুরো ব্যাপারটা তোমার ওপর ছেড়ে দিয়েছি, এখন তুমি যা বলবে তাই মানতে হবে।

—তুই বার বার আমার দিকে আঙুল তুলিস কেন বল তো খুকু? আমি তো সব সময়ে তোর সুবিধেই দেখার চেষ্টা করছি। মিনুর তো আসার কথা ছিল পুজোর মুখে মুখে, আমিই তো ওকে তোর কথা বলে আগে আগে আনালাম।

—তাই কি? মিনু যে বলল ভিসার টাইম শেষ হয়ে গিয়েছিল? আর নাকি এক্সটেনশান পায়নি?

—ও। তা হবে। জ্যোতিশংকর যেন সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন, —তা তুই এখন কী করতে চাস?

—তুমিই বলো।

—এক কাজ কর না, লাখোটিয়াকে ছেড়ে দিই। তোর এত জানাশুনো, তুই একটা অন্য প্রোমোটার দ্যাখ। অবশ্য তাকেও অন্তত লাখোটিয়ার প্রাইসটা দিতে হবে।

—বাহ সোনাদা, উলটো কোর্টে বল ঠেলে দিচ্ছ? ভাল করেই জানো এসব নেগোসিয়েশান হুট বললেই হয় না।

—তা হলে একটু ধৈর্য ধর। এক-দেড় মাসে কী এমন পৃথিবী উলটে যাবে?

পৃথিবী নয়, সুহাসিনী তো উলটে যেতে পারে। অ্যানুয়াল জেনারেল মিটিংয়ের জন্য এখন থেকেই উঠে পড়ে লেগেছে দময়ন্তীরা। একদিন দীপালির বাড়িতে নাকি একটা গ্যাদারিং-ও হয়ে গেছে। এবার এক্সিকিউটিভ বডির খোলনলচেটা ওদের বদলে দেওয়ার প্ল্যান। নিবেদিতা টের পাচ্ছেন। অর্চনাকে হয়তো সরাবে না, অর্চনার বরের উঁচুমহলে দহরমমহরম… তা ছাড়া অর্চনা ওদেরই তালে তাল দেয়। বাকি ভাইটাল পোস্টগুলোতে ওরা…

নিবেদিতা মনে মনে হিসেব কষলেন। সামনের মাসের শেষেও টাকাটা হাতে এলে হপ্তা দুয়েক টাইম থাকে। চোদ্দো-পনেরো দিনের ক্যাম্পেনে হাওয়া ঘোরাতে পারবেন না?

চোখ সরু হল নিবেদিতার, —ঝেড়ে কাশো তো সোনাদা। এক মাস? না দেড় মাস?

—লাখোটিয়া বলছে এক। আমি ধরছি দেড়।

—যদি লাখোটিয়া কথা না রাখে? লাস্ট মোমেন্টে ডোবায় ?

—আমি তো ওপেন অফার দিলাম। তুই পারলে অন্য পোমোটার ফিট কর।

ওফ, খেলোয়াড় বটে। ভেতরে ভেতরে চিড়বিড় করে উঠলেন নিবেদিতা। তবে ঠোঁটের হাসিটি নিবল না। নীলাচলের রেখে যাওয়া শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিলেন খুড়তুতো দাদাটিকে। কমলা পানীয়ে চুমুক দিচ্ছেন জ্যোতিশংকর, নির্বিকার মুখে।

স্বরূপা ফিরেছেন। কৌতূহলী মুখে বললেন, —অনিন্দ্য, সুনন্দ কাউকে দেখছি না কেন? বাড়ি নেই?

—ছুটির দিন তো। কথাটা আলগা ভাবে ভাসিয়ে দিলেন নিবেদিতা, — বেরিয়েছে সবাই যে যার মতো।

—দ্যাখো কাণ্ড, কী সব উলটোপালটা কথা রটে!

—কী রটেছে?

—সুনন্দ নাকি রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে…

—কে বলল?

—কে যেন বলছিল। ননীদি, না শ্যামাদা…

এসব সংবাদ কি হাওয়ায় ওড়ে? কত সতর্ক ভাবে কেলেঙ্কারিটা গোপন রেখেছেন নিবেদিতা, সেই ছড়িয়ে গেল আত্মীয়মহলে?

উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে নিবেদিতা বললেন, —তুৎ, বাজে কথা। সুনন্দ গেছে এক বন্ধুর বাড়িতে। হাওড়ায়। ওদের ক্যাসেট বেরোবে তো, এখন দিনরাত ওখানে রিহার্সাল চলছে।

জ্যোতিশংকর গ্লাস শেষ করে পাশে রাখলেন, —তবে যে তুই বললি ছুটির দিন বলে এধার ওধার বেরিয়েছে?

—ওমা, তাই বললাম নাকি? নিবেদিতা রাজনীতিকদের মতো হাসলেন,— আমি অনিন্দ্যর কথা বলছিলাম।

—ও। তাই বল।… হ্যাঁ রে, সুনন্দদের দলটার যে কী নাম?

—কী যেন একটা। উদাসী ব্যান্ড, না কী যেন।

—খাসা নাম! তোর উদাসী ছেলের উদাসী ব্যান্ড!

হুঁহ, উদাসী ছেলে! হাড়ে সেয়ানা। এই তো সেদিন হাতচিঠি দিয়ে পাঠিয়েছিল বন্ধুকে, ছেলেটা এসে সুনন্দর জামাপ্যান্ট নিয়ে গেল। এখনও তেজে মটমট করছে ছেলে। থাক গিয়ে যেখানে খুশি, দেখি বন্ধুরা ক’দ্দিন খাওয়ায়! পেটে টান পড়লে তো ফিরতেই হবে।

মনে মনে ভাবলেন বটে নিবেদিতা, তবে চিন্তাটায় তেমন জোর পেলেন না। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। ছেলে দুটো তাঁর একটুও মাথা নোয়াতে শেখেনি।

ভেতরটা একটু খচখচও করছিল নিবেদিতার। নির্জলা মিথ্যেটা বলে দিলেন বটে, ধরা পড়ে যাননি তো? কিছু বিশ্বাস নেই, আর্যর কাছেই হয়তো সুনন্দ-সমাচার শুনে এসেছে স্বরূপা, নিবেদিতার সঙ্গে একটু খেলে নিল, বাড়ি গিয়ে স্বামী-স্ত্রী হয়তো তুমুল হাসাহাসি করবে।

সুনন্দটা যে কেন এমন বেকায়দায় ফেলল?

জ্যোতিশংকরদের উপস্থিতি আর মোটেই পছন্দ হচ্ছিল না নিবেদিতার। কাজের কাজ কিছু করে না, বাড়ি এসে ঘোঁট পাকায়। মাঝখান থেকে নিবেদিতার স্নানটা মাথায় উঠল। নিবেদিতা ইচ্ছে করেই দেওয়ালঘড়ির দিকে তাকালেন, যদি ইঙ্গিতটা বোঝে।

জ্যোতিশংকরও কবজি উলটোচ্ছেন। স্বরূপাকে বললেন, —এবার তো উঠতে হয় গো। তা তোমার কী বলার ছিল বললে না খুকুকে?

—হ্যাঁ কথাটা বলব কিনা ভাবছিলাম। স্বরূপা নড়েচড়ে বসেছেন, কণা হঠাৎ পরশুদিন আমার কাছে এসেছিল।

—কোন কণা?

—শরণ্যার মাসি। একগাদা কথা শুনিয়ে গেল আমাকে। আমার একদম ভাল লাগল না।

—কী বলেছে?

—শরণ্যার বাবা-মার নাকি তোমাদের ওপর খুব গ্রিভান্স। শরণ্যার মিসক্যারেজের জন্য ওরা তোমাদেরই দায়ী করছে।

—আমাদের? নিবেদিতা অবাক, —কেন?

—তোমরা মানে… মেইনলি অনিন্দ্যকেই।

—স্ট্রেঞ্জ! অনিন্দ্য কী করবে? অ্যাক্সিডেন্ট হয় না?

—সে আমি কী করে বলব ভাই? তোমাদের ইন্টারনাল ব্যাপার… ওরা বলছে, জানিয়ে দিয়ে গেলাম। কণা আমাকেও তো খুব অ্যাকিউজ করে গেল। আমি নাকি অনেক কিছু চেপে গেছি, অনিন্দ্যর নেচারের কথা আগে ওদের বলিনি, শুনলে হয়তো ওরা আদৌ এ বিয়েতে এগোত না…

—অনিন্দ্যর নেচার? মানে?

স্বরূপা ঠোঁট উলটোলেন। ভঙ্গিটা এমন, সে আমি আর মুখে কী বলব!

মাথা দুলিয়ে বললেন, —যাক গে, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এবার কিন্তু তুমি ট্যাক্টফুলি ব্যাপারটা সামলে দাও। তোমারও তো সমাজে একটা মানসম্মানের ব্যাপার আছে। সর্বত্র গিয়ে যদি এ রকম কুৎসা করে বেড়ায়…!

স্বরূপা-জ্যোতিশংকর চলে যাওয়ার পর নিবেদিতা গুম হয়ে বসে রইলেন। ভাবছেন। স্বরূপার কথা শুনে এখন কেন যেন মনে হচ্ছে অনিন্দ্য কিছু একটা গণ্ডগোল বোধহয় করেছে। নইলে ছেলে এত গুমসুম মেরে থাকে কেন? নীলাচলের ওপর হাঁকডাক নেই, গজগজ নেই, মার মুখোমুখি হলে ক্যাটোস ক্যাটোস ঝগড়াও নেই…! বাড়িতেও নাকি থাকে না সারাদিন। নীলাচল বলছিল মদের মাত্রাও নাকি বেড়েছে। নিবেদিতা ভাবছিলেন ছেলে বুঝি মনোকষ্টে আছে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছেন…। নার্সিংহোমেও অনিন্দ্য সেদিন কেমন চোরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল না?

ক্ষীণ ভাবে একটা ছবি মনে পড়ল নিবেদিতার। দু’মাসের সুনন্দকে শুইয়ে রেখে নিবেদিতা বাথরুমে ঢুকেছেন, হঠাৎ নির্মলার আর্ত চিৎকার, ওরে বাবা রে, কী খুনে ছেলে রে, বাচ্চাটাকে মেরে ফেলল রে…! কী হয়েছে? না পাঁচ বছরের অনিন্দ্য ভায়ের বুকে চড়ে বসে খিমচোচ্ছে ভাইকে! হিংসে। তার প্রতি মনোযোগে ঘাটতি পড়েছে বলে।

সাম্প্রতিক ছবিটাও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল নিবেদিতার কাছে। নীলাচলের কাছে শুনেছেন বাথরুম সেদিন ভীষণ পিছল হয়ে ছিল! অনিন্দ্যই কি তবে ইচ্ছে করে সাবানজল…?

নিজের অনাগত বাচ্চাকেও হিংসে করতে শুরু করেছিল অনিন্দ্য?

বিশ্বাস করতে মন চায় না। তবে সব মায়ের হৃদয়েই, গান্ধারী না থাক, একজন ধৃতরাষ্ট্র তো থাকেই। নিবেদিতার মতো মহিলাও তার ব্যতিক্রম নন। ক্রমশ নিবেদিতার মনে হতে থাকল তার ছেলের নামে মিথ্যে অভিযোগও তো আনা হতে পারে। সাবানজল যদি অনিন্দ্য ফেলেও থাকে, শরণ্যা খেয়াল করেনি কেন? পেটের বাচ্চাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তো তারই! আহা রে, অনিন্দ্যটার কী চেহারা হয়েছে! রুক্ষ্ম চুল, চোখমুখ বসে গেছে, গাল চুপসে এতটুকু। অন্যায় যদি কিছু করেও থাকে, মনে মনে পুড়ছেও তো ছেলেটা!

নাহ, একটা কিছু করা দরকার। শরণ্যা এ বাড়িতে না ফিরলে আজেবাজে কথা রটতেই থাকবে। আত্মীয়স্বজনদের তো গুনে নুন দিতে নেই, তারাও ঘোঁট পাকাবে নানান রকম৷ আড়ালে যথেচ্ছ নিন্দামন্দ করবে অনিন্দ্যর। এবং নিবেদিতারও। তা করুক, নিবেদিতা কেয়ার করেন না। আড়ালে তো রাজার মাকেও লোকে ডাইনি বলে। কিন্তু এক কান থেকে পাঁচ কান, পাঁচ কান থেকে সাত কান চললে তো মুশকিল। সুহাসিনী অবধি গুজবটা পৌঁছে গেলে নিবেদিতা মুখ দেখাবেন কী করে?

সাতপাঁচ ভেবে কর্ডলেসটা হাতে নিলেন নিবেদিতা। মানিকতলার নম্বর টিপলেন টক টক।

মহাশ্বেতা ফোন ধরেছেন, —হ্যালো?

—আমি নিবেদিতাদি বলছি।

—ও।…বলুন?

—কেমন আছ তোমরা?

—চলছে একরকম। আপনি ভাল ?

মহাশ্বেতার স্বরটা বেশ আড়ষ্ট ঠেকল নিবেদিতার। জোর করে উচ্ছ্বসিত হলেন, —আর বোলো না। কাজের চাপে দম বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। তোমাদের একটা ফোন পর্যন্ত করে উঠতে পারছি না।

—ও।

—এই তো সকাল থেকে যতবার ভাবি, বাধা পড়ে যায়। দুম করে আমার তাঁতি এসে গেল। ওর কাছ থেকে প্রতি বছর সুহাসিনীর মেয়েদের জন্য শাড়ি রাখি তো। আজ শরণ্যার জন্যও একটা রাখলাম। ও কাঁচা হলুদ রং ভালবাসে তো?

—আপনার ছেলের বউয়ের পছন্দ অপছন্দ আপনারও তো জানা উচিত নিবেদিতাদি। নয় কি? বুবলিকে তো আমরা আপনার জিম্মাতেই দিয়েছিলাম।

নিবেদিতা ঠোক্কর খেলেন। নরম করে বললেও মহাশ্বেতার সুরটি বক্র।

তবু নিবেদিতা আপোষের স্বরেই বললেন, —না না, আমিও জানি। ওকে তো ইয়েলো পরতেও দেখেছি…। শরণ্যা কোথায়? দাও তো একটু, ওর সঙ্গে কথা বলি।

কয়েক সেকেন্ড ও প্রান্তে শব্দ নেই। তারপর ফের স্বর বেজেছে, —বুবলি এখন শুয়ে আছে। ঘুমোচ্ছে।

—এখনও উইকনেস কাটল না?

—না, এখন সুস্থই। কাজে জয়েন করে গেছে। এমনিই ঘুমোচ্ছে।

—বাহ, ভাল খবর। কাজকর্মে থাকলে মনটাও তাড়াতাড়ি চাঙা হয়ে যাবে।

—হুঁ।

—তা কবে গাড়ি পাঠাব? শরণ্যা আসছে কবে?

—বুবলি এখন যাবে না নিবেদিতাদি।

—সে কী? কী হল? ও তো এখন…?

নিবেদিতার প্রশ্ন শেষ হল না, হঠাৎই এক পুরুষকণ্ঠ ঠিকরে এসেছে রিসিভারে। নবেন্দুর কর্কশ স্বর ঝনঝন করে উঠল, —আমার মেয়ে আর আপনাদের বাড়ি কোনও দিনই যাবে না। শুনতে পেয়েছেন? শি হেট্‌স টু গো দেয়ার।

নিবেদিতা পলকের জন্য বিমূঢ়। গলা দিয়ে বেরিয়ে গেল, —কিন্তু কেন?

—সেকথা আবার মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করছেন? যান, আপনার শয়তান ছেলেটাকে গিয়ে প্রশ্ন করুন। সে তো আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। হি ইজ আ মার্ডারার। খুনি।

আঘাতের তীব্রতা সহ্য করতে নিবেদিতার মতো পোড় খাওয়া মানুষেরও সময় লেগে গেল। খানিকটা আত্মরক্ষার সুরে বলে উঠলেন, —আপনি কী বলছেন কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না। এত উত্তেজিত হয়ে গেলেন কেন? যদি ভুলভ্রান্তি কিছু ঘটেই থাকে, সেটা তো শুধরেও নেওয়া যায়। উই ক্যান সিট অ্যান্ড টক। আফটার অল আমরা ভদ্রলোক…

—কায়দা মারা কথা বলবেন না। নবেন্দুর গলা আছড়ে পড়ল,— আপনাদের ভদ্র চেহারা দেখা হয়ে গেছে। নিজেদের মুখটা আয়নায় দেখুন।… হুঁহ, ঘরে একটা ক্রিমিনাল পুষে সমাজসেবা হচ্ছে!

আর কত সহ্য হয়? নিবেদিতারও গলা চড়ে গেল, —আপনি কিন্তু লিমিট ক্রস করে যাচ্ছেন নবেন্দুবাবু। আপনি এ ভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন না।

—গায়ে বিঁধছে, অ্যাঁ? শুনুন, আপনার কপাল ভাল আমরা থানাপুলিশ করিনি। আপনার ওই ছেলেকে হাজতে পোরা উচিত ছিল। আপনিও বেঁচে গেলেন, কোমরে দড়ি পড়ল না। এখনও যদি ভাল চান, ছেলেকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখান। অ্যান্ড ডোন্ট ট্রাই টু ডিসটার্ব মাই ডটার এগেন। ছেলেকেও বলে দেবেন, যদি আর কোনও ভাবে বুবলিকে উত্যক্ত করার চেষ্টা করে, আমি ওকে জুতোপেটা করব।

নিবেদিতার কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছিল। অপমানে জ্বলছে সর্ব শরীর। সোমশংকরের মেয়েকে এ ভাবে চড় মারল একটা পেটি মিডল্‌ক্লাস লোক? কী স্পর্ধা!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%