সুচিত্রা ভট্টাচার্য
পার্থসারথি আজ দুপুরে এসেছিলেন চেতনায়। ছিলেন অনেকক্ষণ। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন কাজের অগ্রগতি। প্রশ্ন করছিলেন ঘন ঘন, জেরার ভঙ্গিতে। তবে কাজকর্মের খতিয়ান দেখে তিনি সন্তুষ্ট না বিরক্ত তা পরিষ্কার বোঝা গেল না। আবার তাঁর ডাক এসেছে আমেরিকা থেকে। বেশ কয়েকটা সিমপোসিয়ামে যোগ দিতে হবে, ভিজিটিং প্রফেসার হিসেবে কিছু ক্লাসও নেবেন এদিক সেদিক। এ মাসের শেষে তিনি পাড়ি দিচ্ছেন ও দেশে, ফিরতে ফিরতে সেই ক্রিসমাস। ইতিমধ্যে শুভ্র আর শরণ্যা কী কাজ করবে তার একটা খসড়াও বানালেন বসে বসে। আরও একজনকে প্রোজেক্টের কাজে নিয়োগ করছেন পার্থসারথি। তাঁরই ছাত্র, তবে এখন এক কলেজের অধ্যাপক। তাঁর কাজের পরিধিটাও শরণ্যাদের বুঝিয়ে দিলেন। শরণ্যাকে ই-মেল করতে বললেন নিয়মিত, মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করে যাওয়ার উপদেশ দিলেন। শুভ্রকে বললেন কাজে এতটুকু অসুবিধে হলে কোথায় কখন কার সঙ্গে দেখা করতে হবে। আরও একটা নির্দেশ। এতদিন যা হয়েছে, চটপট তার একটা সিনপ্সিস বানিয়ে দাও। সাতদিনের মধ্যে। ডিটেলেও নয়, আবার খুব শর্টেও নয়, যেন চোখ বুলোলেই গোটা ছবিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। আমেরিকায় ইউনেস্কোর দপ্তরে যাবেন তিনি, সংক্ষিপ্তসারটা অবশ্যই সেখানে জমা করা দরকার।
প্রায় ছ’টা নাগাদ বিদায় নিলেন পার্থসারথি। শুভ্র আর শরণ্যা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এতক্ষণ যেন নিঃশ্বাস ফেলা যাচ্ছিল না। শুভ্র তো টেবিল ধরে ওঠবোস করে নিল একটু, সামনে হেলে পিছনে হেলে কোমর ছাড়াচ্ছে।
শরণ্যা ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিল। বলল, —স্যার আর একজনকে গুঁজে দিলেন কেন বল তো?
—বুঝলি না, খোঁচড় ফিট করে দিয়ে গেলেন। ও তোমাদের এই কাজ দেখবে, ওই ডাটা কমপাইল করবে, ওই রিপোর্ট প্রসেস করবে… এসব কথার তো একটাই মানে। একটা ওয়াচডগ বসে গেল।
—চিনিস ভদ্রলোককে? কী যেন নাম বললেন… জয়ন্ত সিনহা না কে…?
—বিলক্ষণ চিনি। ডিপার্টমেন্টে তো ভদ্রলোকের খুব যাতায়াত। দেখিসনি? মোটা মতন কালো মতন, হাতে সবসময়ে ইয়া বড় ফোলিও ব্যাগ…? দেখে মনে হয় বিছানাপত্র পুরে নিয়ে ঘুরছে…! হি ইজ আ মাদুরে।
—মাদুরে, মানে?
—বুঝলি না? মাস্টারদের মধ্যে প্রাইভেট টিউশন যারা করে, তাদের দুটো টাইপ আছে। একটা ভাদুবে, আর একটা হল মাদুরে। যারা ধর টাকার দরকার পড়ল বলে কিছুদিন প্রাইভেট পড়াল, তারপর ছেড়ে দিল, তারা হচ্ছে ভাদুরে টাইপ। সিজনাল। আর একদল আছে যারা সারা বছর ধরে সকাল সন্ধে…। জয়ন্ত সিনহা পড়ায় সেন্ট্রাল ক্যালকাটার একটা কলেজে, তবে ওর মাদুর ছড়ানো আছে সেই সুন্দরবন পর্যন্ত। দুটো-চারটে বাঘও নাকি পড়তে আসে। এখন টিউশনি নিয়ে হুড়কো চলছে তো, তাই ওদিকটা কমিয়ে এদিকে ধান্দা করছে।
—যাহ। কোত্থেকে এসব খবর পাস বল তো?
কাঁধ ঝাঁকাল শুভ্র। উত্তর না দিয়ে বলল, —চ চ। আমার আবার বাড়ি গিয়ে মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
সন্ধে এখনও তেমন গাঢ় হয়নি। স্ট্রিট লাইট জ্বলে গেছে, দিনশেষের মিহি আলোকে ঢেকে দিয়েছে নিয়নবাতি। আকাশে মেঘ আছে থোকা থোকা। ভারী ভারী। বৃষ্টি ক’দিন হচ্ছে না, সারাদিনই একটা চিটপিটে গরম। বাতাস প্রায় নেইই। ঘাম যেন শুকোতেই চায় না।
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মা’র কথাই বলছিল শুভ্র, —মার পেটের পেইনটা কিছুতেই যাচ্ছে না, বুঝলি?
—ডাক্তার কী বলছে?
—ডাক্তাররা তো কিছু বলে না। করে। কিংবা বলতে পারিস করায়। একের পর এক টেস্ট করিয়েই চলেছে। ব্লাড স্টুল ইউরিন এক্সরে আলট্রাসোনো বেরিয়াম…। আজ সাড়ে আটটায় স্পেশালিস্টের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। দেখি, তিনি আবার কী কী লিস্ট ধরান।
—এনডোস্কোপি হয়েছে?
—নাহ। বললে করাব। আমি তো লাস্ট ডাক্তারকে স্ক্যানের কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি বললেন এক্ষুনি দরকার নেই। কী বিচ্ছিরি লাগে বল তো, কিচ্ছু মুখে তুলতে চায় না। ঠান্ডা দুধ খেলেও নাকি পেটে ব্যথা হয়। তাও তো আমি জোরজার করে ইনটেক করাচ্ছি। গলা ভাত, নয় খিচুড়ি… লিকুইড নিক, সেমিসলিড নিক…
শরণ্যা কিছু শুনছিল, কিছু শুনছিল না। তার চোখ ঘুরছে এদিক ওদিক। নাহ, নেই। সেদিনের ডোজটায় কাজ হল তা হলে?
বিচ্ছিরি ধরণের উৎপাত শুরু করেছিল অনিন্দ্য। বাড়িতে ফোন করে কলকে না পেয়ে শেযে অফিসে ফোন। কী নাকি কথা আছে বলতে চায়! শোনার এতটুকু প্রবৃত্তি হয়নি শরণ্যার, ঘটাং করে টেলিফোন নামিয়ে রেখেছিল। এক ঘণ্টার মধ্যেই অফিসে হাজির। ভেতরে ঢুকতেই দেয়নি শরণ্যা, দরজা থেকেই তাড়িয়ে দিয়েছিল। তাতেও কি নিস্তার আছে? ক’দিন পর থেকেই শুরু হল নতুন উপদ্রব। শরণ্যার অফিসের আশেপাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনও দিন দেশপ্রিয় পার্কের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে, কখনও পানের দোকানে, কখনও বাসস্টপে। শরণ্যা তার অস্তিত্বকে আমলই দিতে চায়নি, অনিন্দ্যকে দেখিয়ে দেখিয়ে বেশি উচ্ছল হয়ে গল্প করত শুভ্রর সঙ্গে। একটু অস্বচ্ছন্দও লাগত, ওই ছেলেটার দৃষ্টি যেন গায়ে লেগে থাকত বিষ্ঠার মতো।
দুম করে গত শুক্রবার শরণ্যা মুখোমুখি হয়েছিল মূর্তিমান উপদ্রবের। কাঁহাতক আর এই নিঃশব্দ অত্যাচার সহ্য করা যায়? শুভ্র বার বার বলেছিল, ইগনোর কর ইগনোর কর! কদ্দিন আর টেনাসিটি থাকবে, অ্যাঁ? ধরে নে না, অফিসের বাইরে একটা বিনি মাইনের চৌকিদার পেয়ে গেছিস!
শুভ্রর উপদেশ অগ্রাহ্য করে গটমট চলে গেল শরণ্যা, —তোমার মতলবটা কী বলো তো? তুমি কি আমায় কিছুতেই মুক্তি দেবে না?
অনিন্দ্য বুঝি আশা করেনি শরণ্যা এগিয়ে আসবে। থতমত খেয়ে টান টান। গালভরতি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কোটরে ঢোকা দুটো চোখ জ্বলছে যেন। ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, —আমি তোমাকে কয়েকটা কথা বলতে চাই।
—কতবার তোমায় বলব, তোমার কোনও কথা আমার শোনার ইচ্ছে নেই? সব শেষ হয়ে গেছে। ফিনিশড। বুঝেছ?
—কিন্তু আমি যে বলতে চাই।
—আমি শুনব না।
—কেন শুনবে না? কেন শুনবে না তুমি? অনিন্দ্যর স্বর হঠাৎই বদলে গেল। মুখ বিকৃত করে বলল, —বুঝেছি। খুব মস্তিতে আছ এখন, অ্যাঁ?
—কী-ই? শরণ্যার চোখে আগুন, —লজ্জা করল না নোংরা কথা বলতে?
—গায়ে লাগল বুঝি? অনিন্দ্যও হিসহিস করছে, —এতই যখন আমায় অপছন্দ, তখন ভালবাসার ন্যাকামোটা করেছিলে কেন?
—আমি ন্যাকামো করেছি? তোমার সঙ্গে?
—করোনি? বলোনি, অনি, আমি তোমার? তুমি আমার সব? দার্জিলিংয়ের ম্যালে তোমায় একা রেখে চলে এসেছিলাম বলে কাঁদোনি তুমি?
পথচলতি লোকজন ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে। তাদের টেরাবেঁকা দৃষ্টি যেন বিঁধছিল শরণ্যাকে। বুঝতে পারছিল না, অনিন্দ্য কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে? নাকি পাগলের অভিনয় করছে? মন ভিজিয়ে খাঁচায় পুরে ফেলার এও কি এক কৌশল?
রুক্ষ থেকে রূঢ় হল শরণ্যা। চাপা অথচ তীক্ষ গলায় বলল, — রাস্তায় সিন্ ক্রিয়েট কোরো না। আমি যদি চেঁচিয়ে এখন লোক জড়ো করি, তোমার কী হবে আন্দাজ করতে পারো? ফের যদি তোমায় এই চৌহদ্দিতে দেখি, আমি পুলিশে রিপোর্ট করব।
—পুলিশ দেখাচ্ছ? পুলিশ? অনিন্দ্য যেন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। রাগে গরগর করছে, হাতের মুঠো পাকাচ্ছে, পা ঠুকছে ফুটপাতে, —আমিও দেখে নেব। আমিও দেখে নেব।
—যা খুশি করো। জাহান্নমে যাও।
বলেই ঘুরে উলটো মুখে হাঁটা। শেষ কয়েক পা প্রায় দৌড়েই শুভ্রর কাছে। ঝট করে ঘুরে দেখল একবার। না, অনিন্দ্য আর নেই।
সেই থেকেই আর নেই। বিদেয় হয়েছে আপদটা। তবু যে কেন অফিস থেকে বেরিয়েই শরণ্যার চোখ দুটো একবার চারদিকে ঘুরবেই?
শরণ্যার ক্ষণিক অন্যমনস্কতা নজরে পড়েছে শুভ্রর। মা’র গল্প থামিয়ে টেরচা চোখে তাকাল, —কী রে, খুব হতাশ হলি মনে হচ্ছে?
—যাহ্। হাড় জুড়িয়েছে আমার।
—বেচারাকে মনটা জুড়োনোর স্কোপটা দিলি না ? বলে ফেললে অনিন্দ্যও মুক্তি পেত, তোরও রোজ রোজ চোখের ব্যায়াম হত না।
—ফাজিল কোথাকার। হেসে ফেলল শরণ্যা। পায়ে পায়ে এগোচ্ছে বাসস্টপের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে বলল, —ওর বলার আর ছিলটা কী? হয় বলতো, আমি নিরপরাধ, আমায় তুমি ভুল বুঝো না! নয়তো, আমি ভুল করেছি, আমায় তুমি ক্ষমা করে দাও!
—তাই নয় শুনে নিতিস৷ কান তো ক্ষয়ে যেত না।
—শুনে কী লাভ? আমি তো ছেলেটাকে চিনে গেছি।
—মানুষকে কি আদৌ চেনা যায়?
—অনিন্দ্যকে যায়। একটা আদ্যন্ত ক্রুকেড ছেলে। সবসময়ে ব্রুড করছে, কারুর ওপর সন্তুষ্ট নয়, চাকরি টিঁকিয়ে রাখতে পারে না, অফিসে কথায় কথায় ঝগড়া বাধায়, মা-বাবার সম্পর্কেও যা মুখে আসে তাই বলে… মিনিমাম ফিলিংটা পর্যন্ত নেই। ভাব তুই সিচুয়েশানটা! বাচ্চা হবে তুই চাস না, ঠিক আছে চাস না। কিন্তু সংসার করতে গেলে কিছু তো তোকে মেনে নিতেই হবে। আদার হাফেরও তো ইচ্ছে অনিচ্ছে বলে একটা ব্যাপার আছে। উদ্ভট বায়না জুড়লে চলবে কেন? অনিন্দ্যর প্রবলেম, সে কিছু মানতেই শেখেনি। শরণ্যা মাথা ঝাঁকাল, —সব চেয়ে বড় কথা, সেদিন সন্ধেবেলায় কী সাংঘাতিক অ্যাক্টিংটা করল! দিব্যি হাসিখুশি, দেখে মনে হয় কী নর্মাল, অথচ ভেতরে ভেতরে প্ল্যান ভেঁজে চলেছে!
—কুল কুল। শুভ্র একটা সিগারেট ধরাল। লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, —দ্যাখ শরণ্যা, আমি বলছি না অনিন্দ্য মুখার্জি একটা ভাল মানুষ। আমি এও বলছি না অনিন্দ্যকে তুই ক্ষমা করে দে। বোঝাই যায় সে অ্যাবনর্মাল। একটু নয়, ভাল মতোই। কিন্তু সে তো সব সময়ে অ্যাবনর্মাল থাকত না। থাকত কি? বল?
—কী বলতে চাইছিস? শরণ্যা ঝটিতি ঘুরেছে।
—এমন তো হতেই পারে, ওই দিন সে অ্যাক্টিং করেনি। ওটা তোর মনের ভুল।
—মানে?
—তুই তো নিজেই বলেছিস, অনিন্দ্য হয়তো কিছু করবে এই ভয়ে তুই কাঁটা হয়ে থাকতিস। ঠিক কি না?
—বটেই তো। আমার প্রেগনেন্সিটা ও আদৌ মেনে নিতে পারেনি।
—কেন পারেনি?
—ওভার পোজেসিভ।
—রাইট। অন্তত তোর ব্যাপারে ও খুব বেশি সেন্সেটিভ ছিল। সে ইচ্ছে করে, ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান ভেঁজে তোর কোনও ক্ষতি করে দেবে…
—আমার ক্ষতি তো করতে চায়নি। ও বাচ্চাটাকে মারতে চেয়েছিল।
—তাতে তোরও তো বিপদ হতে পারত। সব জেনে বুঝে ও সাবানজল ছড়িয়ে রেখেছে, তোকে ফেলে দেবে বলে…
এ ধন্দটা তো শরণ্যার মনেও আছে। সেদিন শরণ্যা যখন আছাড় খেয়ে পড়ল, অনিন্দ্য তো দৌড়ে এসেছিল, পাঁজাকোলা করে মেঝে থেকে তুলেছিল শরণ্যাকে। নার্সিংহোমে যাওয়ার পথেও সারাক্ষণ শরণ্যার হাত চেপে ধরে ছিল। তবু সেদিন অনিন্দ্যর সেই অস্বাভাবিক রকমের স্বাভাবিক আচরণ, হঠাৎ বাচ্চাটার সম্পর্কে জানার কৌতূহল, তারপরই তোয়ালেটা রেখে আসতে বলা—এগুলো কী প্রমাণ করে? সব চেয়ে বড় কথা, অপরাধ যদি সে নাই করে থাকে, তবে পরদিন নবেন্দু যখন শরণ্যাকে নার্সিংহোম থেকে মানিকতলায় নিয়ে চলে এল, অনিন্দ্য একবারও আপত্তি করল না কেন? পরদিনই বা মানিকতলায় ছুটে যায়নি কেন? কেন চোরের মতো খালি ফোন করত?
তবু একটা সংশয় যেন থেকেই যায়। কীটের মতো কুটকুট কামড়ায়। যদি দুয়ে দুয়ে চার না হয়? মানুষ তো।
ওই কীটটাই কি ভালবাসা?
শরণ্যা জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাল। বুঝি ওই কীটটাকেই সরাচ্ছে মস্তিষ্ক থেকে। তেতো গলায় বলল, —ও সব পারে। ওর কোনও হিউম্যান ইমোশানই নেই। সেন্সই নেই। ওর ছিল শুধু কিছু অ্যানিম্যাল ইন্সটিংক্ট। ব্যস।
—তার জন্য তুই অনিন্দ্যকে পুরোপুরি দায়ী করতে পারিস না। শুভ্রকে তর্কে পেয়ে গেছে। হাত নেড়ে নেড়ে বলল, —বাবা মা হ্যাড ফেল্ড টু পারফর্ম দেয়ার ডিউটিজ। তাঁরা ছেলেকে সোশালাইজ করতে পারেননি। মে বি তাঁদের সময় ছিল না, মে বি তাঁদের সে বোধটাই ছিল না…
—মানতে পারলাম না। অনিন্দ্যর ছোট ভাইটা তা হলে অন্য রকম হল কী করে?
—খুব অন্য রকম হয়েছে কি? ডিমান্ড মেটেনি বলে সেও তো বাড়ি ছেড়ে ভাগলবা। দু’জনের ডিগ্রির তফাত থাকতে পারে, তবে দু’জনেই একই জাতের চিড়িয়া। বড় জন মিশতে পারে না বলে তার একরকম চেহারা, ছোটজন বাইরের পরিবেশে মেশে বলে তার আর একরকম চেহারা।
—কিন্তু ওই রকম একটা ফ্যামিলিতে পড়ে আমি সাফার করব কেন?
—তোকে তো পড়ে থাকতে বলিনি। শুভ্র হো হো করে হেসে উঠল, —তুই তো জেনেবুঝেই পড়ে ছিলি।
—না রে, আমি চেষ্টা করছিলাম। যদি ওকে নর্মাল করা যায়। হল না।
—বাজে কথা বলিস না। তুই অনিন্দ্য মুখার্জির প্রেমেও পড়েছিলি।
এর চেয়ে বড় সত্যি যে আর কিছু নেই এ তো শরণ্যাও জানে। কিন্তু এখন সে মনেপ্রাণে অনিন্দ্যকে ঘৃণা করে, এটাও তো সত্যি। তবে প্রেম আর ঘৃণা, দুটোই যে সমান অন্ধ এই সত্যিটুকুই শুধু শরণ্যা জানে না।
মুখ বেঁকিয়ে শরণ্যা বলল, —ভালবাসা না ছাই। জাস্ট দেখে সিম্প্যাথি হত…
—ভুলে যা, ভুলে যা। সিম্প্যাথিটুকুও ভুলে যা। নইলে আরও সাফার করবি।
শরণ্যা ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল। আলতো মাথা নেড়ে বলল, —হুঁ। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।
—আর বেলতলায় যাবি?
—মাথা খারাপ!
—বেলগাছ যদি প্রমিজ করে তোর মাথায় বেল ফেলবে না, তাও না? বলে জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরোটা টোকা মেরে ফেলে দিল শুভ্র। শরণ্যার মাথায় ছোট্ট চাঁটি মেরে বলল, —যা, বাড়ি যা। আমাকেও যেতে দে। গিয়েই তো এখন মা আর ডাক্তারের চার চক্ষুর মিলন ঘটাতে হবে।
বাসে বসে শুভ্রর কথাগুলোই ভাবছিল শরণ্যা। ছেলেটা ফাজলামি ইয়ার্কি করে বটে, তবে সুন্দর যুক্তি দিয়ে কথাও সাজাতে পারে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে কেন যে শুভ্রর সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা ছিল ? কাছাকাছি না এলে কোনও মানুষকেই ঠিক ঠিক চেনা যায় না। শুভ্র বলছিল, মানুষকে নাকি আদৌ চেনা যায় না। সত্যিই কি তাই? শরণ্যার তো মনে হয় শুভ্রর মধ্যে একটা সংবেদনশীল হৃদয় আছে। তার বিপন্নতাটাকে শুভ্র অনুভব করতে পারে। শরণ্যার ধারণাটা কি ভুল? আলগা আলগা সহৃদয়তা দেখায় শুভ্র? হঠাৎ বেলতলার প্রসঙ্গটা তুলল কেন? নিছক ঠাট্টা? না ভেবেচিন্তেই বলল? তুৎ, ঠাট্টাই।
মৃদু টোকাটা তবু সামান্য উদাস করে দিল শরণ্যাকে। তাকিয়ে আছে জানলার বাইরে। দেখছে আলোময় শহর, প্রায়ান্ধকার কবরখানা, ট্রামগুমটি, রেলস্টেশন। আবার কিছুই যেন দেখছে না। যেন ঘষাকাচের ওপারে আবছা হয়ে যাচ্ছে সব। শরণ্যার চোখে কি বাষ্প জমছে? কেন যে থেকে থেকে কান্না পায়?
বাড়ি ফিরে শরণ্যা দেখল ফ্ল্যাট সরগরম। কাকা-কাকিমা এসেছেন। সঙ্গে ঝিমলিও। জোর গুলতানি চলছে ড্রয়িংরুমে।
মেয়েকে দেখেই নবেন্দু বলে উঠলেন, —এই তো, বুবলি এসে গেছে। …বুবলি, তোর কাকিমা একটা জব্বর হিট করেছে রে।
শরণ্যা চটি ছাড়তে ছাড়তে বিস্মিত মুখে বলল, —কাকে?
—দ্যাট লেডি। নিবেদিতা মুখার্জি।
—কাকিমা তাকে পেল কোথায় ?
অঞ্জলি চোখ নাচিয়ে বললেন, —সে এক কাণ্ড।…তুই অর্চনা বলে কাউকে চিনিস? ওই সেই সুহাসিনীর?
—অর্চনা মৈত্র ? মানে অৰ্চনামাসি?
মহাশ্বেতা বলে উঠলেন —আর যাকে তাকে মাসি বলতে হবে না।
শরণ্যা মার দিকে একটু ভ্রূকুটি করল। তারপর অঞ্জলির দিকে ফিরে বলল, —তুমি অর্চনামাসিকে চেনো নাকি?
—কাল আলাপ হল। বড়দির নাতির অন্নপ্রাশন ছিল, সেখানে এসেছিল মহিলা। বড়দির বউয়ের পিসি না মাসি কী যেন হয়।
—ওমা, তাই নাকি?
—বাবাহ্, কী তার সাজ! বাচ্চার অন্নপ্রাশনে এসেছে হিরের সেট পরে! বড়লোকের গিন্নি বলে সবাই খুব তেল মারছিল। তিনি আবার নাকি অনুষ্ঠান বাড়িতে খান না কিছু! অত সুন্দর ভাপা ইলিশমাছ হয়েছিল… সবাই এত করে বলল, মুখেই তুলল না!
—তুমি কিন্তু কর্ডলাইনে চলে গেছ। দিব্যেন্দু পাশ থেকে বললেন, —আসল গল্পটা শোনাও বুবলিকে।
—হ্যাঁ। …বড়দি আলাপ করিয়ে দিল আমার সঙ্গে। তখনই শুনি উনি নাকি সুহাসিনী ওয়েলফেয়ার সোসাইটির একজন হোমরাচোমরা। সুহাসিনী নামটা শুনেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি নিবেদিতা মুখার্জিকে নিশ্চয়ই চেনেন? …ব্যস্, তারপরই সঙ্গে সঙ্গে আমি যা বলার সব বলে দিয়েছি।
—কী বলেছ?
—নিবেদিতা কী, নিবেদিতার ছেলেটি কী, সব। তোর সঙ্গে কে কী ব্যবহার করেছে সমস্ত খুলে বলেছি।
—কিন্তু মামণি তো আমার সঙ্গে কোনও খারাপ ব্যবহার করেননি!
—থাক, আর মামণি মামণি করে আদিখ্যেতা করতে হবে না। মহাশ্বেতা বললেন, —ওই মহিলা মামণি ডাকের যোগ্য নয়।
— তুমিই কিন্তু ওঁর বেশি ভক্ত ছিলে মা।
—ভণ্ড চিনতে পারিনি।
শরণ্যা কথাটা যেন পুরো মানতে পারল না। অনিন্দ্যর মা হিসেবে নিবেদিতার ওপর তার আর বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই, কিন্তু নিবেদিতার অন্য পরিচয়টাকে সে অস্বীকার করে কী ভাবে? সমাজসেবা বা সুহাসিনীর কাজে নিবেদিতা তো সত্যিই আন্তরিক। সেখানে অন্তত তাঁর কোনও ফাঁকি নেই।
শরণ্যা অবশ্য প্রতিবাদে গেল না। তার শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে মা-বাবার স্নায়ু এখন সর্বদাই টান টান। ও বাড়ির কারুর সামান্যতম প্রশংসাও এখন নিষিদ্ধ। এমনকী নীলাচলেরও। তাও তো ভাগ্যিস অনিন্দ্যর ওই হানা দেওয়ার খবরটা কেউ জানে না। যদি একবার কানে যেত, নবেন্দু বোধহয় গিয়ে অনিন্দ্যর ঘাড়টাই মটকে দিতেন।
নবেন্দু নড়ে বসেছেন। বললেন, —যাক গে, হ্যাং দ্যাট লেডি। …আমাদের যা কথা হচ্ছিল…
অন্য কথায় দিব্যেন্দু ভুলেই গিয়েছিলেন প্রায়। বললেন, —কী নিয়ে কথা হচ্ছিল বলো তো?
—লইয়ার নিয়ে। নবেন্দু মনে করিয়ে দিলেন, —তুই তা হলে কাল-পরশুই গিয়ে তোর কে চেনা উকিল আছে তার সঙ্গে কথা বল। ফ্যাক্টটা স্টেট্ কর। তারপর বল, উই ওয়ান্ট ইমিডিয়েট রিলিফ ফ্রম দোজ বাগারস।
অন্নপূর্ণা এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, —হ্যাঁ হ্যাঁ, কাটান ছেঁড়ান হয়ে যাক। আমরা মনে করব আমাদের বুবলির বিয়েই হয়নি। ধরে নেব, মাঝের ক’টা মাস মিথ্যে ছিল। দুঃস্বপ্ন।
মহাশ্বেতা দিব্যেন্দুকে জিজ্ঞেস করলেন, —বুবলিকেও কি যেতে হবে তোমার সঙ্গে?
—দেখি। প্রথমদিন তো একলাই কথা বলে আসি।
—ছেলে আর মা দুটোকেই কিন্তু কোর্টে নাস্তানাবুদ করতে হবে।
দিব্যেন্দু হেলান দিয়েছেন চেয়ারে। চশমা খুলে কাচ মুছছেন। ঈষৎ চিন্তিত মুখে বললেন, —কিন্তু দাদা, বুবলির কথাটাও তো আমাদের ভাবতে হবে। কোর্ট, কাঠগড়া, কাদা ছোড়াছুড়ি…
—ওরা কী কাদা ছুড়বে? আমরা ওদের মুখে পাঁক লেপে দেব।
—স্টিল… জানোই তো, কোর্ট মানে সত্যি বা ন্যায় প্রতিষ্ঠার জায়গা নয়। কে কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনল, সাক্ষীসাবুদ দাঁড় করিয়ে কে কতটুকু এস্ট্যাবলিশ করতে পারল, ব্যস। ওরাও কি এমনি এমনি ছেড়ে দেবে? নিজেদের ডিফেন্ড করতে বুবলির নামেও কত আজেবাজে কথা বলবে তার ঠিক কী! হয়তো চরিত্র তুলেই কিছু একটা বলে দিল। বানিয়ে বানিয়ে বলতে তো আর ট্যাক্স লাগে না।
—হুঁহ্, বললেই হল? প্রমাণ করতে হবে।
—করবে না প্রমাণ। পারবে না। কিন্তু বুবলির গায়ে নোংরাটা তো লাগল।
—হুম। এটা একটা ভাববার মতো কথা বটে। নবেন্দু একটু থিতোলেন। চোখের কোণ দিয়ে তাকালেন শরণ্যার দিকে, —কী রে বুবলি, তুই কী বলিস?
শরণ্যা মাথা নিচু করে ওড়নার খুঁট পাকাচ্ছিল। তাকে ঘিরে বাড়িতে এত তুলকালাম চলছে ভাবলেও তার অস্বস্তি হয়। অস্ফুটে বলল, —সুতোটা তো ছিঁড়ে ফেলাই ভাল। তবে যতটা পিসফুলি হয়।
দিব্যেন্দু বললেন, —আমি কি লইয়ারকে মিউচুয়াল সেপারেশানের কথা বলব?
পলকের জন্য অনিন্দ্যর কথা মনে পড়ল শরণ্যার। ফুঁসছে! দেখে নেব! বলল, —ওরা কি মিউচুয়ালে রাজি হবে?
—আমাদের লইয়ার ওদের কনট্যাক্ট করুক। বাজিয়ে দেখুক। চিঠি পাঠাক। ছ’মাসের মধ্যে ব্যাপারটা তা হলে মিটে যায়।
—দেখ তবে। মামলা করার রাস্তা তো খোলা রইলই।
শরণ্যা উঠে পড়েছিল। ঘামে প্যাচপ্যাচ করছে শরীর, এবার স্নান করতে হবে। ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, —এসব কিছু করার আগে আমার কয়েকটা জিনিস কিন্তু ও বাড়ি থেকে আনিয়ে নেওয়া দরকার বাবা।
—কী বল তো? তোর জামাকাপড়?
—হ্যাঁ। সে তো আছেই। তা ছাড়া… আমার প্রোজেক্টের সব কাগজপত্র যে ওখানে পড়ে। এদিকে স্যার এক সপ্তাহের মধ্যে গোটা কাজের সিনপ্সিস করে দিতে বলছেন।
নবেন্দু বললেন, —আমি যাব? গিয়ে নিয়ে আসব?
মহাশ্বেতা বললেন, —না না, তোমার গিয়ে কাজ নেই। যা মাথাগরম মানুষ! ওরা হয়তো ওখানে কিছু বলল, উত্তরে তুমি একটা বললে, শেষে হয়তো লাঠালাঠি লেগে যাবে। আর ওই খুনেটার সামনে তুমি তো মোটেই যাবে না।
দিব্যেন্দু বললেন, —বুবলি, তুই একটা কাজ কর। কী কী আনতে হবে তার একটা লিস্ট বানিয়ে দে। আমি আর ঝিমলি নয় গিয়ে এই রোববার…
ঝিমলি সোফায় বসে রিমোট হাতে টিভিতে হিন্দি সিরিয়াল দেখছিল। ভলিয়্যুমটা একদম কমিয়ে দিয়ে। ঘাড় ফিরিয়ে বলল, —হ্যাঁ হ্যাঁ চলো। সরেজমিনে সিচুয়েশনটা একবার দেখে আসি।
অঞ্জলি বললেন, —ওখানে গেলে একবার মিউচয়ালের কথাটাও পেড়ে দেখতে পারো। নিবেদিতা দেবীরও তো কেচ্ছার ভয় আছে, রাজি হয়ে যেতেও পারেন।
আলোচনা চলছে। শরণ্যা নিজের ঘরে এল। আশ্চর্য, এই মুহূর্তে হঠাৎ একটা মানুষের মুখই মনে পড়ছে তার। যার কথা কেউ তোলে না। যাকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না কেউ। না নবেন্দু-মহাশ্বেতা, না নিবেদিতা-অনিন্দ্য।
আর্য। মুখার্জিবাড়ির গৃহকর্তা!
মানুষটা একদিন ফোন করেছিলেন শরণ্যাকে। একদিনই। অফিসে। বেশি কথা বলার তো অভ্যেস নেই, শুধু বলেছিলেন, —ভাল থেকো।
কেমন আছেন শ্বশুরমশাই? ওই চক্রব্যূহে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন