সুচিত্রা ভট্টাচার্য
দুপুরবেলা একা ঘরে শুয়ে ছিল শরণ্যা। শরীর আজ বেশ খারাপ। নাক সুড়সুড, মাথা টিপ টিপ, জ্বর জ্বর ভাব। কাল চেতনা থেকে ফেরার পথে ঝড়বৃষ্টি নেমেছিল জোর, ছাতা খুলেও সামাল দেওয়া যায়নি। ট্রামরাস্তা থেকে এ-বাড়ি আর কতটুকু, তার মধ্যেই শরণ্যা ভিজেমিজে একসা। সকালে তো আজ ঘুম থেকে উঠতেই পারছিল না, মাথা যেন তখন ইটের মতো ভারী।
একটু আগে বেরোল অনিন্দ্য। সারা সকাল টেপরেকর্ডার নিয়ে খুটুর খুটুর করছিল। ভাল মতোই বিগড়েছে বোধহয়, সঙ্গে করে নিয়ে গেল সারাতে। ক’দিন ধরে খুব গান শোনার ঝোঁক চেপেছে অনিন্দ্যর। ঘরে থাকলেই ক্যাসেট বাজছে। ইংরিজি গান। পপ। তা শুনুক, নিমপাতা খাওয়া ভাবটা তো অনেক কেটেছে। মাঝে যা আরম্ভ করেছিল। বাচ্চা নষ্ট করো, বাচ্চা নষ্ট করো…। শরণ্যা প্রায় অতিষ্ঠ হওয়ার জোগাড়। কোনও কথাই অনিন্দ্য শুনতে রাজি নয়। সারাক্ষণ হয় হাউহাউ চেঁচাচ্ছে, নয় একেবারে স্পিকটি নট। রীতিমতো অত্যাচারও শুরু করেছিল। বিচ্ছিরি মাইগ্রেনে ছটফট করছে শরণ্যা, ক’হাত দূরেই গাঁক গাঁক টিভি চালিয়ে অনিন্দ্য হরর মুভি দেখছে। অতি কুৎসিত ছবি। বদখত কয়েকটা প্রাণী কিলবিল করছে পরদায়, সারাক্ষণ শুধু রক্ত আর রক্ত…। অনিন্দ্য ভাল মতোই জানে ও রকম ছবি দেখলে শরণার সর্বাঙ্গ গুলিয়ে ওঠে, তবু ওটাই সে চালাবে। তুমি আমার ইচ্ছেটা মানোনি, আমিও তোমার সুবিধে অসুবিধের পরোয়া করব না, এমন একটা ভাব। তাতে তুমি মরে যাও, হেজে যাও, পচে যাও, যা খুশি হোক। একেবারে যুক্তি-বুদ্ধিহীন শিশুদের মতো আচরণ। নিজের চাওয়াটুকুই শুধু জানে, না দিলে তোমায় জ্বালিয়ে মারবে— বাচ্চারাই তো এমন নিষ্ঠুর হয়, না কি? শরণ্যা যদি কখনও রাগ করে বলে তোমার সঙ্গে থাকব না, কালই মানিকতলা চলে যাব, তা হলেও বাবুর মুখ আষাঢ়ে মেঘের মতো কালো। শরণ্যা যতক্ষণ না বলবে, ঠিক আছে বাবা, যাব না, আই উইথড্র, ততক্ষণ বাবু অন্নজল ত্যাগ করে ভোম হয়ে বসে। এটাকে ছেলেমানুষি ছাড়া আর কী বলবে শরণ্যা?
জামাইষষ্ঠীর পরদিন থেকে ছবিটা যেন বদলেছে সামান্য। সেদিন ও বাড়িতে গিয়েও বিশেষ কথা বলছিল না অনিন্দ্য, বাবা-মা’ও যেন খানিকটা সিঁটিয়ে ছিল, হঠাৎ ঠাম্মাই জিজ্ঞেস করে বসল, —বুবলিকে তোমরা তা হলে এখানে কবে পাঠাচ্ছ বাবা?
অনিন্দ্য চোখ পিটপিট করল, —মানে?
—বা রে, প্রথম বাচ্চা তো বাপেরবাড়ি থেকেই হয়।
—ও ।
—পুজোর আগে আগেই তা হলে চলে আসুক বুবলি? তখন তো সাত মাস পুরে যাবে। তুমিও নয় তখন মাঝে মাঝে রাতে এসে থেকে যেও ভাই।
অনিন্দ্য জবাব দেয়নি, কেমন যেন ধন্দ মেরে গিয়েছিল।
সেদিন অনিন্দ্যর মুখখানা দেখে ভারী মায়া হয়েছিল শরণ্যার। ফেরার পথে নরম করে বুঝিয়েছিল, বাচ্চা হলে স্বামীর ওপর টান কমে না মেয়েদের, বরং ওই শিশুই এক নতুন বন্ধন গড়ে তোলে। আর মানিকতলায় গিয়ে থাকা? সে তো মাত্র ক’মাসের জন্য। তারপর তো শরণ্যা আবার অনিন্দ্যর অনিন্দ্যর অনিন্দ্যর।
কী বুঝল অনিন্দ্য কে জানে, সে রাত্রে গুম হয়ে থাকলেও পরদিন থেকে তার হাঁকডাক কমে গেল অনেকটা। ড্রিঙ্ক একটু বেশিই করছে, তবে অসভ্যতাটা আর নেই। সারাক্ষণ কী যেন একটা ভাবে। বোধহয় মনের সঙ্গে বোঝাপড়া চলছে। তা চলুক, শরণ্যা আর ঘাঁটায় না অনিন্দ্যকে। এর মধ্যে তো আবার আর একটা কাণ্ডও ঘটে গেল। মা’র সঙ্গে রাগারাগি করে ছোটভাই পাঁচ দিনের জন্য নো ট্রেস। ভয়ংকর না হলেও ক’টা দিনের জন্য একটা আবর্ত তো তৈরি হয়েছিল বাড়িতে। তালেগোলেই বোধহয় অনিন্দ্যর পাগলামিটা থিতিয়ে গেল আরও।
আর একটা সুলক্ষণ। শরণ্যার শরীরের খবর এখন অল্পস্বল্প রাখছে অনিন্দ্য। এই তো সকালেও নীলাচলকে বলছিল, বউদির চায়ে ভাল করে আদা দিয়ে দে, তোর বউদির আরাম লাগবে। বেরোনোর সময়েও জিজ্ঞেস করল শরণ্যার জন্য পেইন বাম কিনে আনবে কিনা।
এটুকুই কি কম? কচু কাটতে কাটতেই তো ডাকাত হয়।
বিটকেল উপমাটা মাথায় আসতেই হেসে ফেলল শরণ্যা। ডাকাতই তো। ডাকাতটা যা উদ্দাম হয়ে হামলায় এক একটা দিন!
শরণ্যা পাশ ফিরল। বিছানায় আধখোলা গল্পের বই। হাত বাড়িয়ে ফের টানল বাংলা উপন্যাসখানাকে। আধপাতাও পড়তে পারল না, চোখে লাগছে। পরদা ভেদ করে বেশ তো আলো আসছিল ঘরে, হঠাৎ কমে গেছে যেন? আকাশে মেঘ করল? আজও? হ্যাঁ, তাই তো! গুড়গুড় আওয়াজ হচ্ছে বাইরে। হঠাৎই শরণ্যার মনে পড়ে গেল ছাদে বেশ কয়েকটা কাপড়চোপড় মেলা আছে। দু’-তিনটে সালোয়ার কামিজ, নীল রংয়ের নাইটিটা, অনিন্দ্যর শার্ট প্যান্ট… । এ বাড়ির ওয়াশিংমেশিন সেমি অটোমেটিক, কাচার পরে ভিজে জামাকাপড় শুকোতে দিতে হয়। নীলাচল কি বৃষ্টি এলে নামাবে মনে করে? সে নিশ্চয়ই এখন বাড়িতে নেই। এ পাড়ার ঠাকুর-চাকররা দুপুরবেলা ফুটপাতে বসে জমিয়ে টোয়েন্টিনাইন খেলে। নীলাচলও তাসের পোকা। নাহ্, নিজেই গিয়ে তুলে আনা ভাল। শুকনো জামাকাপড় ফের ভিজলে বিশ্রী একটা গন্ধ হয়।
বিছানা ছেড়ে উঠল শরণ্যা। পা দুটো টলছে অল্প অল্প। মাথাটাও। দুপুরের দোতলা রোজকার মতোই নিঝুম। ছায়া মাখা। আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভাঙছে শরণ্যা। ছাদে এসে তার থেকে কাপড়জামা নামাচ্ছে এক এক করে।
সহসা চোখ চিলেকোঠায়। সঙ্গে সঙ্গে ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা। রংজ্বলা কাঠের দরজাটা হাট করে খোলা। মনে হয় যেন ভেতরে কেউ আছে।
সুনন্দ কি তালা লাগিয়ে যায়নি? শরণ্যা রোজই তো একবার করে ছাদে ওঠে, দরজা যে খোলা আছে নজরে পড়েনি তো! শিকল টানা থাকত কি?
পায়ে পায়ে ঘরটায় ঢুকল শরণ্যা। চাপা কৌতূহল নিয়ে। কোনওদিন ঢোকেনি ঘরটায়, আজই প্রথম। চিলেকোঠার তুলনায় ঘরটার আয়তন বেশ বড়ই। মেঝেয় তেমন ধুলো নেই, আজই বোধহয় ঝাঁট পড়েছে। আসবাব নেই বিশেষ। একটা শুধু সিংগলবেড খাট, একখানা পরিত্যক্ত সোফা, আর একটা নড়বড়ে টেবিল। নিজের ঘরের চেয়েও এই ঘরের নির্জনতাতেই থাকতে বেশি ভালবাসত সুনন্দ। বন্ধুবান্ধবদেরও নিয়ে আসত এখানেই। উধাও হয়ে যাওয়া ছেলেটা কি সত্যি সত্যিই গৃহত্যাগী হল?
সুনন্দর খোঁজ অবশ্য একটা পাওয়া গেছে। নীলাচলই ঘুরে ঘুরে তার সন্ধান এনেছে। হাওড়ার কোন এক তন্ময় নামের বন্ধুর বাড়িতে নাকি সে অধিষ্ঠান করছে এখন। অজ্ঞাতবাসের ঠিকানাটা জোগাড় করে তার কাছে গিয়েও ছিল নীলাচল, সে নাকি সটান জানিয়ে দিয়েছে ফার্ন রোডের বাড়িতে সে আর ফিরবে না।
আধভাঙা সোফাটার ওপর একটা ডায়েরি পড়ে আছে। ডায়েরিটা তুলতে গিয়েও শরণ্যা থমকাল একটু। অন্যের ডায়েরি কি পড়া উচিত? তুৎ, জানছেটা কে? যার ডায়েরি সে তো এখন গঙ্গার ওপারে।
পাতা উলটোচ্ছে শরণ্যা। তেমন কিছুই নেই, শুধু টাকার হিসেব, হিজিবিজি, কাটাকুটি…। মাঝে মাঝে এক একটা পাতায় উদ্ভট উদ্ভট সেন্টেন্স। দেঁতো হাসি বেতো ঘোড়া, রোল খায় থোড়া হোড়া! শ্মশানেই সব শেষ, শশা নেই সব শেষ! রাম আর আল্লাহ্, ভারী ভারী পাল্লা! সুনন্দটা ধাঁধাফাঁদা বানাত নাকি? পিছনের পাতায় আস্ত একটা গানও রয়েছে। তলায় তিন-চার ভাবে নাম সই করা। এস এম। কী বিটকেল গান রে বাবা! ইউরিয়া মুড়ি, অন্ধ্রের রুই/ সারের পালং, মার্কিনি কই/ ধন্য হউক ধন্য হউক ধন্য হউক হে ভগবান/ বাংরেজি ভাষা, ফাস্টফুড জাংক/ বিদেশে উড়ান, পাতাখেকো পাংক/ পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান…
শরণ্যা হাসতে গিয়েও হাসতে পারল না। যে ছেলের মধ্যে এত সুন্দর রসবোধ আছে সে অমন জঘন্য ভাষায় মা’র সঙ্গে ঝগড়া করে কী করে? মা’ই বা কেমন, কোনও ছেলের কাছ থেকে এতটুকু শ্রদ্ধা আদায় করতে পারেনি? নীলাচল বলছিল দশ হাজার টাকা দিয়ে নাকি একটা সেকেন্ডহ্যান্ড স্প্যানিশ গিটার কেনার ইচ্ছে হয়েছিল সুনন্দর। আশ্চর্য, এইটুকু বাসনার কথাও মাকে খুলে বলতে পারে না ছেলে? মা-বাবার সঙ্গে ছেলেদের কী অদ্ভূত সম্পর্ক! মা যেই শুনলেন ছেলে বেঁচেবর্তে আছে, ওমনি কেমন নিশ্চিন্ত। ফিরল তো ফিরল, না ফিরলে কী আর করা এমন একটা হাবভাব! বাবারই বা কী এমন ভাঙচুর হল? সেই মুখে কুলুপ, সেই চোখে মোটা বই! শুধু একটু যেন বেশি গোমড়া, ব্যস।
আর অনিন্দ্য ? সে তো কাঁধ ঝাঁকিয়ে অবলীলায় বলে দেয়, পোযায়নি তাই কেটে গেছে! ঝগড়া করেছে মা, ফেরাতে হলে মা ফেরাবে, আমি কেন নাক গলাতে যাব!
শরণ্যার সংশয় হয়, অনিন্দ্য-সুনন্দ এক মায়ের পেটের ভাই তো? যতই বাইরে বাইরে মানুষ হোক, ছোটভাইকে ঘিরে দাদার কি শৈশবের কোনও স্মৃতিই নেই? নাকি অনিন্দ্যর সেই তন্ত্ৰীটাই নেই, যা রক্তের টানে বেজে ওঠে? ভায়ে ভায়ে বিবাদ থাকলেও এই নির্লিপ্তিটাকে নয় চেনা যেত…
জামাকাপড় কাঁধে ঘরটা থেকে বেরিয়ে এল শরণ্যা। দক্ষিণের আকাশ ঘন হয়ে এসেছে। বিদ্যুৎ ঝিলিক মারছে হঠাৎ হঠাৎ। ঠান্ডা একটা বাতাস দৌড়ে এল। কাছেপিঠে নির্ঘাত কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। অনেক উঁচু থেকে দুটো চিল নেমে আসছে নীচে। এরকম সব মুহূর্তে মনটা যেন কেমন হু হু করে ওঠে। কান্না পায়। কেন যে পায়?
কোথায় যেন টেলিফোন বাজছে। দোতলায় নয় তো? নীচে ফোন তোলার কেউ নেই, শ্বশুরমশাই এখন কিছুতেই ওপরে উঠবেন না। শুভ্রর ফোন কি?
মনে হতেই ছুটল শরণ্যা। হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি ভাঙছে। ফ্রেঞ্চ লিভ নিয়েছে। আজ, শুভ্র ফোন করতেই পারে। শরীর বেগতিক বলে শরণ্যাকে খুব সাহায্য করছে শুভ্র। পি-এস-বি ক্যানিং ব্লকে সার্ভের কাজ অ্যালট করেছিলেন, শরণ্যা যেতে পারল না, শুভ্র একা একাই ঘুরে এসে কাজটা দু’জনের নামে ভাগ করে দেখিয়ে দিল। আজ শরণ্যারই ওকে একটা ফোন করে দেওয়া উচিত ছিল।
হাঁপাতে হাঁপাতে এসে রিসিভার তুলল শরণ্যা, —হ্যালো?
—কী রে, তুই আজ কাজে যাসনি কেন? শরীর খারাপ?
শুভ্র নয়। মা।
শরণ্যা দম নিয়ে থিতু করল নিজেকে। তারপর হালকা ভাবেই বলল, —তেমন কিছু নয়। এমনিই ইচ্ছে করছিল না।
—বললেই হবে? গলা তো ভারী ভারী লাগছে!
এই না হলে মা? ঠিক ধরে ফেলেছে। পলকের জন্য শরণ্যার মনে হল সে যখন ডাইনিংটেবিলে ভাত ঘাঁটছিল, শাশুড়ি বেরোতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ে তার সঙ্গে কথা বললেন। সন্ধেবেলা বাবুয়া বলে কে যেন আসবে শাশুড়ির কাছে, শরণ্যা যেন তাকে বসিয়ে রাখে। কই, একবারের জন্যও তো শাশুডির চোখে পড়ল না শরণ্যার শরীরটা ঠিক নেই? এটাই কি মার সঙ্গে শাশুড়ির তফাত? নাকি শরণ্যার শাশুড়িই এ রকম?
গলা ঝেড়ে শরণ্যা বলল, —তোমার টেনশান করার মতো কিছু হয়নি মা। জাস্ট একটু সর্দি…কাল এমন আলটপকা ভিজে গেলাম…
—তোমার এখন সাবধানে থাকা উচিত বুবলি। এমনিই এসময়ে শরীর নড়বড়ে থাকে।—
—আমি সাবধানেই থাকি মা। মিনিবাসে ওঠা ছেড়ে দিয়েছি, ট্রামে চেপে কাজে যাই, দুদ্দাড়িয়ে সিঁড়ি ভাঙি না। বলেই একটু মুচকি হাসল শরণ্যা,—তা হঠাৎ তোমার দুপুরে ফোন? তোমাদের টাইম তো রাত্তিরবেলা!
—দরকার আছে। তাই তো তোর অফিসে ফোন করেছিলাম। …শোন, আমি ডক্টর মন্দিরা সেনের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করছি। এই গোটা পিরিয়ডটা তুই ওঁর আন্ডারেই থাকবি। ডক্টর সেনের নিজের নার্সিংহোম আছে। চমৎকার অ্যারেঞ্জমেন্ট, ডেলিভারির সময়ে কোনও প্রবলেম হবে না। আরও সুবিধে, ওঁর হাজব্যান্ড চাইল্ড স্পেশালিস্ট। বুঝলি?
—হুঁ। বুঝলাম। ঘরের পয়সা ঘরেই থাকে।
—ফাজলামি করিস না। আজই ভাবছি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে যাব। কোন দিনটা তোর সুবিধে হবে? উনি নিজের নার্সিংহোমে বসেন সোম বুধ শুক্কুর সন্ধেবেলা।
—তা সেটা কদ্দূর?
—সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ আর বিডন স্ট্রিট ক্রসিংয়ে। মহাশ্বেতা একটু থেমে থেকে প্রায় স্বগতোক্তির মতো বললেন, —আমাদের ওখান থেকে জায়গাটা খুব দূর নয়।
—হুঁ।
মহাশ্বেতা আবার একটু থেমে থেকে বললেন, —অনিন্দ্যর সঙ্গে ভাল করে কথা বলে নিয়েছিস তো?
—কী নিয়ে?
—এই… তুই আমাদের কাছেই থাকবি…
দুর্ভাবনাটা এখনও ঘোচেনি। শরণ্যা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, কথা তো সেদিন হয়েই গেল। যা কাস্টম তাই হবে।
—দেখিস বাবা, অশান্তি যেন না হয়।
শরণ্যার বুকটা চিনচিন করে উঠল। তাকে নিয়ে বাবা-মার উদ্বেগটা কিছুতেই আর কমছে না। রোজ টেলিফোন করেও স্বস্তি নেই, প্রায় সপ্তাহেই দু’জনে ছুটে আসে ফার্ন রোডে। সরেজমিনে বুঝে নিতে চায় মেয়ের হাল।
জোর করে হেসে উঠল শরণ্যা,—তোমরা সারাক্ষণ এত টেনশান করো কেন বলো তো? অনিন্দ্য কোনও প্রবলেম করবে না।
মহাশ্বেতা চুপ।
শরণ্যা আর একটু গলা ওঠাল,—অনিন্দ্যকে নিয়ে তোমরা মিছিমিছি ভয় পাও মা। ও একটু অন্য রকম ঠিকই। ছোটবেলা থেকে ছাড়া ছাড়া ভাবে মানুষ হয়েছে, কারুর সঙ্গে তেমন মেশেনি… ওর এক্সপ্রেশানগুলোই একটু আলাদা ধরনের।
—হুঁ। ওপাশ থেকে তবু যেন ছোট্ট শ্বাস ভেসে এল,—অ্যাপয়েন্টমেন্টটা তা হলে করে ফেলি?
—করতে পারো। তবে…
—কী তবে?
—রেগুলার অদ্দূর গিয়ে গিয়ে দেখাতে হবে এখন? উনি কি এদিকে কোথাও বসেন না?
—বসেন বোধহয়। এলগিন রোড না কোথায় যেন। জেনে নিতে হবে।
—তো সেখানেই তো ভাল।
—ঠিক আছে, দেখছি। …ও হ্যাঁ, ভাল কথা। আমার ছাই কিছুতেই মাথায় থাকে না…
—কী?
—একদিনও তো গিয়ে নিবেদিতাদির সঙ্গে দেখা হচ্ছে না… তাঁর সঙ্গেও তো আলোচনা করা দরকার।
—কী ব্যাপারে?
—ওঁর যদি কোনও স্পেশাল ডাক্তারের ব্যাপারে ফ্যাসিনেশান থাকে…
শরণ্যার হাসি পেয়ে গেল। বাচ্চা হবে জানতে পারার পর শাশুড়ি এক দিনই বুঝি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ডাক্তার দেখিয়েছ? তারপর বোধহয় আর স্মরণেই নেই ঘটনাটা। নাহ্, ভুল হল। আরও এক-দু’বার প্রশ্ন করেছেন বটে। শরীর কেমন ? ঠিক আছ তো?
স্বর সহজ রেখে শরণ্যা বলল, —তুমি তোমার মতন অ্যারেঞ্জমেন্ট করো মা। মামণি কিছু মনে করবেন না।
—তবু একবার ওঁর মতামত তো নেওয়া উচিত।
—সে নয় ফোনে কথা বলে নিয়ো।
—ওঁকে তো যেতেও বলতে হবে।
—কোথায় ? ডাক্তারের কাছে? মামণির বোধহয় সময় হবে না মা।
—তা ঠিক। উনি যা ব্যস্ত মানুষ। …এমনি বাড়ির সব খবর ভাল?
—চলছে। অ্যাজ ইউজুয়াল।
—সুনন্দ?
—ওই। অ্যাজ ইউজুয়াল।
—ফোনটোনও করেনি?
—উঁহু।
—নিবেদিতাদি কী বলছেন?
—কিছুই না।
—নিবেদিতাদি নিজে একবার গিয়ে দাঁড়ালে বোধহয় ছেলের অভিমানটা চলে যেত।
হয়তো। কিন্তু তেমনটি কি ঘটবে? এ বাড়িতে সবাই-ই তো যে যার মান নিয়ে মটমট করছে। অভিমান এখানে শুকিয়ে পাথর হয়ে যায়।
মহাশ্বেতা ফের বললেন,—যাই বলিস, ছোটপুওুরটিও বেশ ট্যাঁটা আছেন। এত্ত কীসের তেজ? বাবা-মার মনে কষ্ট দিয়ে কী সুখ যে পায় এরা!
সুনন্দর প্রসঙ্গ আর ভাল লাগছিল না শরণ্যার। কচলে কচলে তেতো হয়ে যাচ্ছে যেন। তা ছাড়া সুনন্দকে নিয়ে সে রোজ আলোচনা করবেই বা কেন? কে সুনন্দ? নেহাত এ বাড়িতে শরণ্যার বিয়ে হয়েছে বলে আইন মোতাবেক একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ব্রাদার-ইন-ল। কিন্তু ব্রাদার-ইন-ল-টি সিস্টার-ইন-ল-কে কতটা পুঁছেছে? প্রথম মাইনে পেয়ে শরণ্যা অত সুন্দর একটা টিশার্ট কিনে আনল, খুলে একবার দেখল না পর্যন্ত! প্যাকেটখানা হাতে নিয়ে শুধু এক টুকরো শুকনো থ্যাংক্স্। দেওর-বউদির মধ্যে কত সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়, এ বাড়িতে সুনন্দ তার ভাল বন্ধু হতে পারত… কোনও দিন কাছেই ঘেঁসল না। শরণ্যা একটি আস্ত গাড়োল বলেই না ভেবেছিল এ বাড়ির বউ হিসেবে সুনন্দর জন্যে তার উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত? গাল বাড়িয়ে কেমন চড়খানা খেল? লাভ হল একটাই। নিবেদিতা দেবীর একটা অন্তত মনের কথা জানা গেল। অন্য একটা চেহারাও। বাইরে যতই মহৎ সাজুক, ভেতরে ভেতরে তিনিও একজন টিপিকাল শাশুড়ি। নইলে ওই রকম একটা মন্তব্য কেউ করে। ছি।
অবশ্য মাকে এসব মরে গেলেও বলবে না শরণ্যা। নাক টেনে বলল, —ছাড়ো তো ওর কথা। ফিরলে ফিরবে, না ফিরলে না ফিরবে।
কথাটা উচ্চারণ করেই শরণ্যা সচকিত। নিজের কানেই ঠং করে বেজেছে কথাটা। তার গায়েও কি তবে এ বাড়ির হাওয়া লেগে গেল? সঙ্গদোষ?
শরণ্যা আলগা ভাবে প্রসঙ্গ ঘোরাল,—মা, কাকাদের বাড়ির টেলিফোনটা খারাপ নাকি? সকালে কত বার ডায়াল করলাম, খালি রিং হয়ে যাচ্ছিল?
—না তো। তবে ওদের লাইন তো মাঝে মাঝেই প্রবলেম করে। আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল্, সারাক্ষণ রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছে…। কেন, কাকাকে তোর কী দরকার পড়ল?
—উঁহু, কাকাকে নয়। ঝিমলিকে। ওকে একট ঝাড়তাম।। বজ্জাত মেয়ে, গড়িয়াহাটে কলেজ করতে আসে, একদিন এখানে আসতে পারে না?
—তুই বাড়ি থাকলে তো যাবে।
—আমার অফিসটাও তো দূরে নয় মা। ইচ্ছে হলে ওখানেও..কদ্দিন ওর সঙ্গে দেখা হয় না। ওকে তুমি বোলো, আমি খুব রাগ করেছি।
—বলব। …হ্যাঁ রে, অনিন্দ্যর কাল একটা ইন্টারভিউ আছে না?
—হ্যাঁ।
—যাবে তো?
—বলছিল তো যাবে।
—এবার ওর একটা কিছু হওয়া দরকার। অনেকদিন তো হল…
—হুঁ।
শুধু মা-বাবা নয়, অনিন্দ্যর চাকরি নিয়ে শরণ্যাও যথেষ্ট ভাবিত এখন। কাল যেখানে ইন্টারভিউ, তারা শিলিগুড়ি অফিসের জন্য ইঞ্জিনিয়ার চাইছে। জেনেও অ্যাপ্লাই করেছে অনিন্দ্য। কলকাতা ছেড়ে নড়তে মনে মনে রাজি হয়েছে বোধহয়। বাইরে কোথাও চলে গেলে মন্দ হয় না। মা-বাবাকে ছেড়ে দূরে যেতে শরণ্যার একটু খারাপ লাগবে, তবে এ বাড়ির দমবন্ধ করা স্বাধীন পরিবেশটা থেকে তো মুক্তি। এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে অনিন্দ্যও হয়তো অনেক স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
—কী রে, চুপ করে গেলি কেন? কী ভাবছিস?
শরণ্যার চিন্তাটা ছিঁড়ে গেল। হেসে বলল,—আর কী, এবার রাখো। অফিসে কোনও কাজকর্ম নেই? এতক্ষণ কথা বলছ কী করে?
—আজ আমাদের অফিসে বেশ ছুটি ছুটি ভাব। আমাদের এক কলিগের ছেলে মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করেছে, খাওয়াদাওয়া হচ্ছে জোর। সাবির থেকে মাটন্ রেজালা আসছে, তন্দুরি রুটি…
—আছ ভাল। সাধে কি গভর্নমেন্টের এই দশা!
—পাকামো করিস না। প্রাইভেটরা কত কাজ করে জানা আছে। কথায় কথায় গণেশ উলটোয় কেন, অ্যাঁ?
—হুঁউ ?
—সাবধানে থাকিস। রাখছি।
মা’র সঙ্গে বকবক করে শরীর অনেকটা ঝরঝরে লাগছে। সোফার ওপর ফেলে রাখা জামাকাপড়গুলো তুলে নিয়ে শরণ্যা ঘরে ফিরল। নেমে গেছে বৃষ্টি। বড় বড় দানায়। হাওয়াও চলছে। যাক, মোক্ষম সময়ে ছাদে গিয়েছিল শরণ্যা।
জানলার পরদা সরিয়ে শরণ্যা বৃষ্টি দেখছিল। ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেছে চরাচর। বর্ষা তা হলে পুরো দমে এসে গেল ? নীলাচল বলছিল এসময়ে সে নাকি একবার করে দেশে যায়। দিন সাত-দশের জন্য। জমিজমা আছে দেশে, দাদা-ভাইদের সঙ্গে চাষের কাজে হাত লাগায়। নীলাচল নিজেও নিশ্চয়ই জমিটমি কিনছে দেশে? যা গোছানো ছেলে। নীলাচল চলে গেলে এ-বাড়ির বাবু বিবিদের কী হাল হয়? বদলি লোক দিয়ে যায় বটে নীলাচল, তবে সে কি আর নীলাচল হবে?
ছাঁট আসছে। ভিজে যাচ্ছে বিছানা। শরণ্যা জানলা বন্ধ করল। এইবার? এখন? উফ্, কাজে না বেরোলে দিনগুলো এত লম্বা হয়ে যায়। জামাকাপড়গুলো ইস্ত্রি করে ফেলবে? ইচ্ছে করছে না। বই? ভাল লাগছে না। এমনিই শুয়ে গড়াবে একটু ? উঁহু, গা ম্যাজম্যাজ ভাব বেড়ে যেতে পারে। বেশ কিছু ডাটা কম্পাইল করা আছে, বসবে কাগজকলম নিয়ে? স্ট্যাটিস্টিকাল অ্যানালিসিসের কাজ শুরু করে দিলে হয়। থাক, আজ আর ব্রেনকে ট্যাক্স করে লাভ নেই। আজ কাম্ বন্ধ, তো কাম বন্ধ। ইস, অনিন্দ্যটা ঘরে থাকলেও নয় সময় কাটত। কথা বলে। কথা না বলে। কখন যে অনিন্দ্য ফিরবে?
অনিন্দ্য ফিরল সন্ধের পর। বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। আকাশ তখন প্রায় নির্মেঘ। শরণ্যা তখন টিভি দেখছিল।
ওই সন্ধেটা বুঝি মৃত্যু পর্যন্ত স্মরণে থাকবে শরণ্যার।
অনিন্দ্যর হাতে ছিল চিকেন পকোড়ার প্যাকেট। এসেই চায়ের জন্য হুকুম ছুড়ল নীলাচলকে। হাসি হাসি মুখে শরণ্যাকে বলল, —গরম গরম খেয়ে নাও। তোমার এখন ঝাল ঝাল ভাল লাগবে বলে নিয়ে এলাম।
শরণ্যার অল্প অল্প খিদে পাচ্ছিল। তবু বলল, —বাইরের ভাজাভুজি খাব? আমার আজকাল যা অম্বল হচ্ছে!
—কিচ্ছু হবে না। খেয়ে ফ্যালো তো। অম্বল হলে ওষুধ আছে।
অনিন্দ্যর জোর করাটা ভাল লাগল শরণ্যার। পকোড়ায় সস মাখিয়ে চিবোচ্ছে। আলগা ভাবে জিজ্ঞেস করল, —তোমার টেপের কী হল? দিল না সারিয়ে আজ?
অনিন্দ্য পোশাক বদলাচ্ছিল। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল, —ভাল মেকানিকটা নেই। কাল আসবে। কাল সন্ধে নাগাদ পেয়ে যাব।
—তোমার ক্যাসেটরা তো আজ কাঁদবে তা হলে!
—হুঁম্।
টুকটাক আলাপচারিতা চলছিল। টেপরেকর্ডার নিয়ে। অনিন্দ্যর আগামী ইন্টারভিউ নিয়ে। টিভির পরদায় চলমান প্রোগ্রামটা নিয়ে। তার মধ্যেই চা শেষ করল অনিন্দ্য। কাপে চুমুক দিতে দিতে আয়নার সামনে চুল বাঁধতে বসল শরণ্যা। খানিকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলও নিজেকে। চোখের নীচে হালকা কালির ছোপ, গোটা মুখটা কেমন ফোলা ফোলা লাগে। রক্তশূন্যতা ?
আনমনে বলে ফেলল, —জানো, মা গাইনির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করছে।
—কার সঙ্গে?
—গাইনি। ডাক্তার। মন্দিরা সেন। নাম শুনেছ?
উঠে এসে পিছনে দাঁড়িয়েছিল অনিন্দ্য। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখে বলল, —হঠাৎ ডাক্তার? এখনই?
—বা রে, এখন থেকেই তো চেকআপ করাতে হয়। বাচ্চাটার টাইম টু টাইম কী পজিশান, গ্রোথ ঠিক মতো হচ্ছে কিনা…
—ও।
—তুমি যাবে সঙ্গে? এলগিন রোডে চেম্বার… বোধহয় এই শনিবারেই মা… অনিন্দ্য চুপ।
—চলো না। প্লিজ।
—দেখা যাক। শনিবার তো আসুক।
আরও একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অনিন্দ্য ঢুকে গেল বাথরুমে। গরমকালে মাঝেমধ্যে সে সন্ধেবেলা স্নান করে। তোয়ালেতে মাথা মুছতে মুছতে মিনিট কুড়ি পর বেরিয়ে এসেছে।
শরণ্যা রিমোট টিপে টিভির চ্যানেল পালটাচ্ছিল। ঠাট্টা করে বলল, —শীতকাতুরে ছেলের আজ হঠাৎ এত গরম লাগল যে?
সামান্য চোয়াল ফাঁক করে হাসল অনিন্দ্য। তারপর হঠাৎ এসে শরণ্যার কাঁধে হাত রেখেছে, —একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—হুঁউ।
—তোমার বাচ্চাটার নড়াচড়া টের পাও তুমি?
—তোমার নয়, বলো আমাদের। শরণ্যা হাত ছোঁয়াল অনিন্দ্যর হাতে।
—যা জিজ্ঞেস করছি বলো না। টের পাও?
শরণ্যার বেশ মজা লাগল। এত দিনে তা হলে বাবুর একটু একটু টান জন্মাচ্ছে?
ঠোঁট টিপে বলল, —এখনই কী? সবে তো তিন মাস।
—কিচ্ছু বোঝা যায় না? তোমার শরীরের মধ্যে একটা ক্রিচার…
—এখন ক্রিচারই থাকে। পাঁচ মাসের আগে মানুষের ফর্মে আসে না।
—মানে এখনও তা হলে মানুষ নয়?
—মানুষ কি এক ধাপে হয়? স্টেজ বাই স্টেজ। সেই এককোষী প্রাণী থেকে শুরু করে… এখন ইন্টারমিডিয়েট স্টেজে আছে।
অনিন্দ্য মাথা নাড়ছে আপন মনে। হঠাৎই শরণ্যার হাতে তোয়ালেটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, —এটা বাথরুমে রেখে দিয়ে এসো না, প্লিজ।
অনিন্দ্যর গালটা আলতো টিপে দিয়ে শরণ্যা বাথরুমে ঢুকল। মুহূর্ত পরেই তক্ষ্ণ এক আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বাড়িতে। বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গেছে শরণ্যা।
নীলাচল দৌড়ে এল। আর্য পর্যন্ত ছুটে এসেছেন ঘর থেকে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে স্নানঘর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন