সুচিত্রা ভট্টাচার্য
চাপা গলায় নবেন্দু জিজ্ঞেস করলেন, —বুবলি কোথায়?
—ওই তো। ব্যালকনিতে।।
—কী করছে?
—বসে আছে চুপচাপ।
—আজ খাওয়াদাওয়া করেছে ঠিক মতো?
—মা তো বলছিলেন করেছে। এই তো একটু আগে দুধমুড়িও খেল।
—দুধমুড়ি কেন? একটু ভাল খাবারদাবার বানাতে পারছ না?
—খেলে তো বানাব। ওই একটু ভাতই যা জোর করে… দেখলে না, পরশু চাইনিজ ফ্রায়েড রাইস বানালাম… খেতে কী ভালই না বাসত… দু’ চামচ খেয়েই…
—হুম্। প্রবলেম।
চিন্তিত মুখে সোফায় বসলেন নবেন্দু। জুতো ছাড়ছেন। ঝুঁকে ফিতে খুলতে খুলতে শ্বাস ফেললেন একটা। পনেরো দিন হয়ে গেল, এখনও মেয়েটা কেমন হয়ে আছে। ভাল করে খায় না, নিজে থেকে দুটো কথা বলে না, কী ভীষণ আনমনা হয়ে থাকে সর্বক্ষণ। বাচ্চা নষ্ট হওয়ার ধাক্কাটা এখনও সামলে উঠতে পারল না। কবে যে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে?
মহাশ্বেতা সামনে দাঁড়িয়ে। দেখছিলেন স্বামীকে। জিজ্ঞেস করলেন, —তোমার আজ এত দেরি হল?
—আর বোলো না। কী বিচ্ছিরি একটা মিছিল বেরিয়েছিল। এস্প্ল্যানেড থেকে পার্ক স্ট্রিট গোটাটা জ্যাম। তুমি আটকাওনি?
—আমি তো এখন রোজই তাড়াতাড়িই চলে আসছি। তখন তো নর্মালই ছিল।… চা খাবে তো?
—করো।
চলে যেতে গিয়েও মহাশ্বেতা ঘুরে এলেন। প্রায় ফিসফিস করে বললেন,—আজও নাকি আবার ফোন করেছিল!
নবেন্দু সোজা হলেন, —কখন?
—দুপুরবেলা। মা ধরেছিলেন। বুবলি নাকি আজও কথা বলেনি।
—হুম্। প্রবলেম।
জুতোজোড়া সরিয়ে রেখে নবেন্দু হেলান দিলেন সোফায়। দু’ হাত ডানায় মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন। গলা নিচু রেখেই বললেন,—ব্যাপারখানা কী বলো তো? মেয়ে এমন জেদ ধরে আছে কেন?
—কী করে বুঝব বলো? বুবলি তো কিছু বলছেই না।
—জিজ্ঞেস করো। চাপ দিয়ো না। ভাল ভাবেই জানতে চাও। তুমি মা, তোমাকে হয়তো খুলে বলতে পারে।
—তোমারই তো মেয়ের সঙ্গে বেশি মনের প্রাণের কথা হত। তুমিই জিজ্ঞেস করতে পারো।
এ যেন একে অন্যের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া নয়, যেন দু’জন মানুষ থমকে আছেন, দু’জনেই শঙ্কিত যেন এমন কিছু তাঁদের শুনতে হবে যার জন্য তাঁরা প্রস্তুত নন।
নবেন্দু বললেন,—থাক। আর একটা-দুটো দিন যাক।
মহাশ্বেতা বললেন,—হ্যাঁ। সময় তো পালাচ্ছে না। বুবলি হয়তো নিজে থেকেই বলবে। খোঁচাখুঁচি করলে যদি হিতে বিপরীত হয় ?
কথাটা বলে দু’জনেই যেন একটু স্বস্তি অনুভব করলেন। যেন সময়ের আড়াল দিয়ে ভারমুক্ত হলেন খানিকটা।
মহাশ্বেতা রান্নাঘরে চলে গেলেন। ঘরে গিয়ে পোশাক বদলানোর আগে একবার ব্যালকনিতে উঁকি দিলেন নবেন্দু। গলা যথাসম্ভব সহজ রেখে বললেন,—কী রে, এখানে বসে কেন?
—এমনিই। রাস্তা দেখছি।
শরণ্যার স্বরও সহজ। তবু কেমন যেন কৃত্রিম ঠেকল নবেন্দুর কানে। যেন মেয়ের স্বর প্রবোধ দিতে চাইছে বাবাকে, বলছে সে ঠিক আছে।
নবেন্দু মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন,—অন্ধকারে বসে আছিস, মশা কামড়াচ্ছে না? বৃষ্টির পর তো খুব বেড়েছে মশা।
—হুঁউ।
—তো বসে বসে মশার কামড় খাচ্ছিস কেন? ভেতরে আয়। টিভি দেখ।
—দূৎ, টিভি আমার ভাল্লাগে না।
—তো বইটই পড়। ও রকম অন্ধকারে বসে থাকিস না।
বলে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলেন নবেন্দু। শরণ্যার সামান্য নড়াচড়া দেখে সরে এলেন ঘরে। পোশাক বদলে বাথরুম। আজ বৃষ্টি হয়নি বলে একটা ভ্যাপসা গরম আছে, তার ওপর বাসে দীর্ঘক্ষণ ঠায় বসে থাকা। ঘামে গা চিটপিট করছে, ঘাড়ে গলায় জল ছিটোলেন ভাল করে। আজকাল আর রোজ ফিরে স্নান করতে সাহস হয় না। শরীরটা যেন হঠাৎ কমজোরি হয়ে গেছে, অল্পেই ঠান্ডা লেগে যায়। বুবলিই যেন এই ক’মাসে বয়সটা বাড়িয়ে দিল।
বুবলির কী দোষ? বুবলি তো ছেলে পছন্দ করেনি। দায়ই হোক, আর ভুলই হোক, সে তো সবটাই নবেন্দু আর মহাশ্বেতার। মেয়ে খোলাখুলি না বললেও তাঁরা কি টের পান না বিয়েটা আদৌ সুখের হয়নি? দেবু রবিবার এসেছিল, একটা দামি কথা বলে গেল। দাদা, আমাদের মুশকিলটা কী জাননা? মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময়ে আমরা ভাল পাত্র খুঁজি, ভাল ছেলে খুঁজি না। বুবলির বেলায় তো পাত্রর গুণাগুণ বিচারেও ভুল হয়েছিল। শুধু পরিবারটা দেখেই নবেন্দুরা গলে গিয়েছিলেন। আহা, কী বনেদি বাড়ি, ছেলের বাবা কত পণ্ডিত, মা’র কত খ্যাতি, ফার্ন রোডে অত বড় একটা বাড়ি আছে, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, আর কী চাই! মহাশ্বেতা তো নিবেদিতাকে দেখেই গদগদ। নবেন্দু মুগ্ধ হয়েছিলেন পেডিগ্রি দেখে। এটা বোঝেননি, রেসের মাঠ আর ডগ্-শো ছাড়া অন্য কোথাও পেডিগ্রি ব্যাপারটা মূল্যহীন। একমাত্র অন্নপূর্ণাই যা একটু খুঁতখুঁত করেছিলেন। টাকাপয়সা যতই থাক, যে বাড়ির কর্তাই ঘরজামাই, সে বাড়ি কি খুব জুতের হবে রে! নবেন্দুর মা তাঁর পুরনো আমলের চোখটা দিয়েই দিব্যি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ফ্যামিলিটাকে। ফক্কা, এক্কেবারে ফক্কা পরিবার। সাত মাস ধরে বুবলিকে শুধু কাটাপোনা খাইয়ে রাখল! ভাবলে নবেন্দুর নিজের গালেই ঠাস ঠাস চড় কষাতে ইচ্ছে করে। সাতটা নয়, পাঁচটা নয়, একটা মাত্র মেয়েকে এ ভাবে জলে ভাসিয়ে দিলেন?
বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে কটমট চোখে তাকালেন নবেন্দু। তিনি একা কেন, দোষী তো মহাশ্বেতাও। একদিন তুলোধোনা করতে হবে মহাশ্বেতাকে। ওই নিবেদিতা দেবী নাকি সমাজসেবিকা! কথায় বলে চ্যারিটি বিগিন্স অ্যাট হোম, ঘরে তিনি কী গড়েছেন?
দুটি ছেলে দুটি স্যাম্পল্। একটি পাগল, একটি গোঁয়ার। গোঁয়ার তো কোন জাহান্নমে গিয়ে পড়ে আছে তার ঠিক নেই। তাতে অবশ্য নবেন্দুর কাঁচকলা। কিন্তু পাগলটি তো এই ক’মাসে নবেন্দুর হাড়ে ঘুন ধরিয়ে দিল। কী একলষেঁড়ে ছেলে! ভদ্রতা সভ্যতা বোধ নেই, সহবত জ্ঞান নেই, শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মান করতে জানে না…। শুধু বুবলির মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে সব হজম করে যাচ্ছেন নবেন্দু। বুবলির মতো একটা সেন্সেটিভ শান্ত মার্জিত মেয়ের পক্ষে ওই রকম একটা অসভ্য ছেলেকে সহ্য করা নিশ্চয়ই খুব সহজ হয়নি। এবং ওই ছেলে নিশ্চয়ই এমন আচরণ করেছে যার জন্য বুবলি তার গলার স্বর পর্যন্ত শুনতে চাইছে না।
কী হয়েছিল বুবলির সঙ্গে? ছোকরা কি সন্দেহপ্রবণ? বুবলির চাকরি করায় আপত্তি ছিল? নাকি নিজে চাকরি খুইয়ে খেঁকি কুকুর হয়ে গিয়েছিল? নিজের রোজগার নেই, বউ কাজ করছে, তাই নিয়ে খুঁচিয়েছে বুবলিকে? কী চাপা মেয়ে, বাবা-মার কাছে সব গোপন করেছে? হয়তো ওই ভয়ংকর দিনটাতেই দু’জনের মধ্যে তুমুল ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল! সাংঘাতিক অপমানজনক কিছু বলেছিল বুবলিকে! হয়তো মাথার ঠিক ছিল না বলেই বুবলি অসাবধানী হয়ে আছাড় খেয়েছিল বাথরুমে!
সবই সম্ভব। সব হতে পারে।
হে ঈশ্বর, তার চেয়ে বেশি যেন কিছু না হয়। অন্তত নবেন্দুকে যেন শুনতে না হয়। তা হলে হয়তো তিনি ওই ছেলেকে…
ক্রোধ ছাপিয়েও হঠাৎ একটা বিষণ্ণতা চারিয়ে গেল নবেন্দুর বুকে। আহা রে, বুবলির মতো মেয়ের কি একটা সুস্থ বিবাহিত জীবন প্রাপ্য ছিল না? বিয়ের বোধহয় আট মাসও পেরোয়নি, তার মধ্যেই বাচ্চা নষ্ট হওয়ার মতো আঘাতও বেচারিকে সইতে হল? ভগবান যে কার কপালে কী লিখে রাখেন!
উফ্, সেই রাতটা! মনে পড়লে এখনও নবেন্দুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। নিবেদিতার টেলিফোন পেয়ে সেদিন কী ভয় যে পেয়েছিলেন। মহাশ্বেতা আর অন্নপূর্ণারও নাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দশা। তিনজনেরই প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বুবলি বুঝি মরে গেল! বউকে আর মাকে জোর করে বাড়িতে রেখে নবেন্দু উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটেছিলেন নার্সিংহোমে। ওটিতে নিয়ে গিয়ে তখন ওয়াশ করা হচ্ছে শরণ্যাকে। বাইরে দাঁড়িয়ে ঠকঠক কাঁপছিলেন নবেন্দু। ও বাড়ির লোকজনও ছিল। নিবেদিতা আর্য নীলাচল… অনিন্দ্যও। তবু মনে হয় কেউ নেই পাশে। একদম একা। মাঝে মাঝে নিবেদিতা এসে নবেন্দুর হাতটা ধরছিলেন। বি স্টেডি! ডাক্তারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। শরণ্যার কোনও বিপদ নেই। তবু যতক্ষণ না ডাক্তার বেরিয়ে এসে আশ্বস্ত করলেন, নবেন্দু কি এতটুকু শান্ত হতে পেরেছিলেন? মাত্র আধ ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট তো সময়, অথচ মনে হচ্ছিল যেন হাজার ঘন্টা!
ওই রাতের ছবিটাই চোখে নিয়ে নবেন্দু বেরিয়ে এলেন বাথরুম থেকে। দেখলেন ডাইনিং টেবিলে চা ঢাকা রয়েছে, সঙ্গে বিস্কুট। ওপাশে মহাশ্বেতা কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন টেলিফোনে। টিভি বন্ধ, শরণ্যা আসেনি বসার জায়গায়। নিজের ঘরে গিয়ে আবার কি শুয়ে পড়ল? সারাক্ষণ দেওয়ালের দিকে ফিরে কী ভাবে? কী দেখে? শূন্যতা?
চা শেষ না হতেই পাশে মহাশ্বেতা। মুখ ঈষৎ ভাবিত,—আজ তো রাতে ডিমের ডালনা… মেয়েটার জন্য একটু স্টু বানিয়ে ফেলি? ফ্রিজে তো চিকেন রয়েছেই।
—সবজিটবজি আছে তো?
—আছে। বিন গাজর…
—করো।… কার সঙ্গে কথা বলছিলে?
—কণাদি। বুবলি এখন কেমন আছে জিজ্ঞেস করছিল।
নবেন্দুর কপাল কুঁচকে গেল, —উনি জানেন বুবলির কথা?
—জানে তো। আগেও তো ফোন করেছিল। বুবলি এখনও মনমরা হয়ে আছে শুনে দুঃখ করছিল খুব।
—এখন আর দুঃখ করে কী হবে? শুনিয়ে দিতে পারলে না, সম্বন্ধটা মোটেই ভাল দেননি? ছেলে মোটেই সুবিধের নয়?
—সে আমি মিষ্টি মিষ্টি করে আগের দিনই শুনিয়েছি।
—বলেছ, এমন ব্যবহার করেছে মেয়ে আর তার বরের সঙ্গে কথা বলতেও চায় না?
—ঘরের সব কথা সবাইকে বলার দরকার কী? তা ছাড়া সত্যি তো আমরা জানি না বুবলি অনিন্দ্যর মধ্যে কী হয়েছে। তবে বলেছি, ওই ছেলে নর্মাল নয়।
—বেশি বেশি করে বললে পারতে। নবেন্দু উঠে পড়লেন,—মাকে দেখছি না কেন? গাঙ্গুলিদের ফ্ল্যাটে গেছে নাকি?
—মা ঘরে। সন্ধে থেকেই বেশ চুপচাপ। কী যেন একটা হয়েছে!
—কী হল?
—বলতে পারব না। আমি নিজে মরছি নিজের জ্বালায়…
নবেন্দুর কপালে আবার ভাঁজ। চুপ করে কী যেন ভাবলেন একটু। তারপর গেছেন অন্নপূর্ণার ঘরে। ডাকলেন, —মা?
অন্নপূর্ণা চোখ ঢেকে শুয়েছিলেন। হাত সরালেন, —ও। তুই?
—সন্ধেবেলা শুয়ে কেন? হাঁটুর ব্যথা?
—না এমনিই।
—তুমি তো এমনি এমনি শুয়ে থাকার মানুষ নও মা। নবেন্দু পাশে গিয়ে বসলেন, —হয় তুমি এখন মেগায় বসবে, নয় গুটি গুটি পায়ে এ ফ্ল্যাট ও ফ্ল্যাট করবে।
—আমার ভাল্লাগছে না রে নবু।
—কেন? কী হল?
দু’ হাতে ভর দিয়ে চেপে চেপে উঠে বসলেন অন্নপূর্ণা। অপ্রসন্ন স্বরে বললেন, —আমার কিন্তু বুবলির ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না। ছেলেটা রোজ এত করে ফোন করে, বুবলি একটি বারের জন্য কথা বলে না!
—নিশ্চয়ই কারণ আছে। তুমি কি জানো সব?
—যে কারণই থাক, ছেলেটার বুবলির ওপর টানটা তো আছে। হ্যাঁ, সে একটু অন্য ধারার…তা বলে শুধু বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে বলে বরের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবে? তারও তো কত খারাপ লাগছে! ঝগড়াঝাঁটিও যদি হয়ে থাকে , তার সঙ্গে দুটো কথা বললে কী বুবলির মান ক্ষয়ে যাবে?
—ছাড়ো না মা। বুবলির ব্যাপার বুবলিকেই ভাবতে দাও। এমনিতেই মেয়েটা এত আপসেট হয়ে আছে…
—বুবলির কষ্ট কি আমার বাজছে না? কিন্তু তা বলে…আমি আজ বুবলিকে খুব বকেছি।
—ও। তাই এখন নিজেই মনখারাপ করে শুয়ে আছ? নবেন্দু মৃদু হাসলেন, —ওঠো, ওঠো। নাতনিকে ডেকে নিয়ে বসে টিভি দেখো। বাড়িটাকে শোকপুরী করে তুলো না।
অন্নপূর্ণার কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে বেরিয়ে এলেন নবেন্দু। ব্যালকনিতে এসে একটা সিগারেট ধরালেন। একবার দেখলেন প্যাকেটটাকে। দুটো আর পড়ে আছে। আজ এই দ্বিতীয় প্যাকেট। মাঝে সিগারেট খাওয়াটা একদম কমিয়ে দিয়েছিলেন, দিনে চার-পাঁচটার বেশি খেতেন না, আবার বেড়ে গেছে। এত ধরণের ভাবনাচিন্তা…কখন যে খাওয়া হয়ে যাচ্ছে সিগারেটগুলো! অন্নপূর্ণার কথাগুলো টোকা মারল মাথায়। একটু নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার চেষ্টা করলেন নবেন্দু। এই মুহূর্তে বাবা হিসেবে তাঁর কী চাওয়া উচিত? বুবলির বিয়েটা ভাল হয়নি, এ তো প্রায় প্রথম থেকেই বোঝা গেছে। তা সত্ত্বেও তো নবেন্দু-মহাশ্বেতা দু’জনেই চেয়েছেন মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে ঠিকঠাক থাকুক। অনিন্দ্য রাগ করে চলে গিয়েছিল বলে নিজেরা গিয়ে বুবলিকে পৌঁছে দিয়ে এসেছেন। বুক ভেঙে গেছে, তবু অনিন্দ্য চায় না বলে মেয়েকে নিজেদের কাছে এনে রাখার বাসনা নিয়ন্ত্রিত করেছেন। নিবেদিতা-আর্যর সম্পর্কেও তো মহৎ ধারণাগুলো ভেঙে গেছে অনেক আগেই, তবু গত রবিবার নিবেদিতা যখন শরণ্যাকে দেখতে এ বাড়িতে এলেন, তাঁকে তো যথেষ্ট আপ্যায়ন করলেন তাঁরা। কেন করলেন? একটা ভাবনাই তো ক্রিয়া করেছে, বাবা-মা হিসেবে তাঁরা এমন কিছু করবেন না যাতে বুবলির বিবাহিত জীবনে বিঘ্ন আসে। সেই ভাবনারই পরিপূরক হিসেবে এখন তাঁর কী কর্তব্য? বুবলিকে বোঝানো? অনিন্দ্যর সঙ্গে তেমন কোনও গন্ডগোল হয়ে থাকলে তার মিটমাট করে দেওয়া? অন্নপূর্ণা তো ঠিকই বলেছেন, নার্সিংহোমে সেদিন ওই ঢ্যাঁটা ছেলেটাও তো মুখ শুকনো করে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশে হেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। এক-আধটা তারা দেখা যায় আবছা ভাবে। সামান্য বাতাস বইছে এখন। হাওয়াটা তেমন গায়ে লাগছে না। নীচে এক প্রাণচঞ্চল শহর। বাস মিনিবাস প্রাইভেট কার ট্যাক্সি লরি টেম্পোর ভেঁপু শোনা যাচ্ছে ঘন ঘন। মানুষের কোলাহল রাগী মৌমাছিদের গুঞ্জন হয়ে ধেয়ে আসছে ওপরে। মাথার মধ্যে বিনবিন করছে।
সিগারেট নিবিয়ে পায়ে পায়ে মেয়ের ঘরে এলেন নবেন্দু। টিউবলাইট জ্বলছে। শরণ্যার বুকের ওপর খোলা পড়ে আছে একটা ম্যাগাজিন, চোখ আলোতে স্থির।
নবেন্দু কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকলেন, —বুবলি?
শরণ্যা ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছে। এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে। কিংবা ঠিক হাসি নয়, হাসির মতো কিছু। দু হাঁটু মুড়ে গুটিসুটি হয়ে বসল।
নবেন্দু অপলক দেখছিলেন মেয়েকে। সেই তাঁর ছোট্ট বুবলি, যে টলমল পায়ে হাঁটত, বাবার কোলে এলে আর কারুর কাছে যেতে চাইত না, কথায় কথায় অভিমান, বায়না আবদার... এই তো সেদিনও বিয়ের কথা যেদিন পাকা হয়ে গেল, হঠাৎ বাবার গলা জড়িয়ে ধরে ফোঁচ ফোঁচ করে কেঁদেছিল,…! মুখ তো একই আছে, অথচ ভেতরে ভেতরে কত ভূমিকম্প হয়ে গেছে মেয়েটার। সেই মেয়ে, কিন্তু এ যেন সে নয়। কত বড় বড় লাগে!
মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই আজকাল গলার কাছে কেন যে একটা ডেলা আটকে যায় ? নবেন্দু গলা ঝেড়ে নিয়ে বললেন, —তোকে বললাম একটু বসে টিভি দ্যাখ, সেই ঘরে এসে একা একা শুয়ে থাকলি?
—এই তো, এই ম্যাগাজিনটা পড়ছিলাম।
—কোথায়? ড্যাব ড্যাব করে তো নিয়ন গ্যাস জ্বলা দেখছিলি।
শরণ্যা ফের হাসল, — দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোসো না।
খাটে নয়, চেয়ার টেনে বসলেন নবেন্দু। বললেন, —শরীরে এখন একটু স্ট্রেংথ্ পাচ্ছিস?
—হ্যাঁ। ভালই তো আছি এখন। ভাবছিলাম সামনের সোমবার থেকে কাজে জয়েন করব।
—পারবি? এখান থেকে অতটা পথ…?
—পারতেই হবে। শুনলে না, শুভ্র কাল কী বলে গেল? পি-এস-বি খুব চিন্তায় পড়ে গেছেন। আমার ইরেগুলারিটি নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন।
শুভ্র ছেলেটিকে মন্দ লাগেনি নবেন্দুর। শুধু কাল নয়, আগেও একদিন এসেছিল। বুবলি নার্সিংহোম থেকে ফেরার পর পরই। মজার মজার কথা বলে সাংঘাতিক ভারী আবহাওয়াকেও লঘু করে দিতে পারে। কালই তো বলছিল ওর এক মামা নাকি বেজায় ঘুমোয়, ঘুমোতে ঘুমোতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে, সেই ক্লান্তি কাটাতে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। হাসতে হাসতে বুবলিকে বলছিল তুইও সে ভাবে দিন কাটাবি নাকি?
নবেন্দু মাথা দুলিয়ে বললেন, —তা শুভ্রই তো পি-এস-বিকে বলেছে সব?
—তা বলেছে। তবে আমার নিজেরও খারাপ লাগছে।
—দ্যাখ। যা ভাল বুঝিস। বললে, প্রথম দিন আমি তোর সঙ্গেও যেতে পারি।
মাঝে তো আরও তিন দিন আছে। চিন্তা করছ কেন, একদম ফিট হয়ে যাব।
সামান্য ইতস্তত করে নবেন্দু আসল কথায় ঢুকতে চাইলেন। বললেন, হ্যাঁ, এখান থেকেই যা যাতায়াতের অসুবিধে। ও বাড়ি থেকে তো কাছেই।
শরণ্যার মুখ সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাকাশে। মাথা নাড়ছে দু’ দিকে। অস্ফুটে বলল, —আমি আর ওখানে যাব না বাবা।
সে কী ? কেন? নবেন্দু মুখটা হাসি হাসি রাখতে চাইলেন।
শরণ্যা কোনও উত্তর দিল না। মাথা দুলিয়েই চলেছে।
নবেন্দু ফস করে আর একটা সিগারেট ধরালেন। মেয়ের চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করলেন, —তোর তো ও বাড়ি পছন্দই হয়েছিল। অবাধ স্বাধীনতা, কেউ গার্জেনি করার নেই…? নিবেদিতাদি আর্যবাবু সবাই তোকে কত ভালবাসেন…
—তোমরা কষ্ট পাবে বলে বলিনি বাবা। ও বাড়িতে কেউ কাউকে ভালবাসে না। নিজেকে ছাড়া। তোমাদের নিবেদিতাদি একটা কাঠের মানুষ। হৃদয় বলে কিচ্ছু নেই।
—অনিন্দ্য তো তোকে ভালবাসে।
শরণ্যা চুপ।
—তুই তো বলিস, তোকে ছাড়া সে থাকতে পারে না!
শরণ্যা এবারও চুপ।
নবেন্দু একটুক্ষণ নিরীক্ষণ করলেন মেয়েকে। প্রশ্নটা আজ করবেনই না ঠিক করেছিলেন, তবু করে ফেললেন। টেরচা চোখে বললেন, —সত্যি করে বল তো বুবলি, অনিন্দ্য কি তোর সঙ্গে কোনও মিস্বিহেভ করেছে?
এবারও রা নেই।
নবেন্দু সামান্য অসহিষ্ণু বোধ করলেন, —চুপ করে থাকলে চলবে কেন বুবলি? আমাদের তো বুঝতে হবে কী হয়েছে! মিসক্যারেজ হয়ে যাওয়াটা খুবই শকিং। কিন্তু অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্ট। একটা বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে তো কী হয়েছে? আবার হবে বাচ্চা।
—হবে না। হবে না। শরণ্যা হঠাৎ ডুকরে উঠল। দু’হাতে মুখ ঢেকে মাথা ঝাঁকাচ্ছে পাগলের মতো, —অনিন্দ্য কিছুতেই হতে দেবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন