সাত

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

লান্‌চে যাবে বলে উঠি উঠি করছিল অনিন্দ্য, পুট করে এক চিঠি এসে হাজির। চিঠি নয়, কর্তৃপক্ষের হুকুমনামা। দুর্গাপুরে ফ্লাইওভার তৈরির কাজ শুরু করছে কোম্পানি, অবিলম্বে অনিন্দ্যকে সেখানে জয়েন করতে হবে। থাকতে হবে সাইটে, দেখাশুনো করতে হবে কাজকর্মের। দুর্গাপুরে জয়েন করার সময়সীমাও নির্ধারিত করে দিয়েছে কোম্পানি। দোসরা মে।

চিঠিখানা হাতে নিয়ে অনিন্দ্য একটুক্ষণ থম বসে রইল। প্রাথমিক অভিঘাতটা সামলাল। তার চারপাশে অহরহ চক্রান্তের জাল বোনা হচ্ছে এ তো সে জানেই। বিশ্বসংসারে কে না তাকে কোণঠাসা করে রাখতে চায়! কিছুদিন ধরেই অফিসে কানাকানি চলছিল সদর দপ্তরে একটা রিসাফল্‌ হবে। কোপটা তার ঘাড়েই পড়ল তা হলে?

উঠে সোজা চিফ ইঞ্জিনিয়ারের ঘরে গেল অনিন্দ্য। বাদল ভৌমিকের চেম্বার ফাঁকা নেই আজ, এক সাপ্লায়ার বসে। মুখচেনা। বেলিলিয়াস রোডের জি এম ফাউন্ড্রির মালিক। ঘুরনচেয়ারে হেলান দিয়ে তাকে কী সব বোঝাচ্ছেন বিবি।

অনিন্দ্যকে দেখেই থামলেন বি বি,—কিছু বলবে মুখার্জি?

খামসুদ্ধ অর্ডারটা টেবিলে ছুড়ে দিল অনিন্দ্য,—এটা কী?

বি বি খামটার দিকে তাকালেনই না। ঠান্ডা গলায় বললেন, —বোসো। আগে মিস্টার কেজরিওয়ালকে ছেড়ে দিই।

এই হিম হিম গলাই তো ষড়যন্ত্রের সংকেত! অনিন্দ্য বসে মুঠো পাকাতে শুরু করল। ভ্রূক্ষেপহীন স্বরে কেজরিওয়ালকে ধমকে চলেছেন বি বি। নমুনা মাফিক মাল পাঠায়নি জি এম ফাউন্ড্রি, তাদের একটা গোটা কন্‌সাইনমেন্ট বি বি বাতিল করেছেন, কী কী ত্রুটি ছিল চাঁছাছোলা ভাষায় শুনিয়ে চলেছেন। শাসালেনও। পরের বার কোয়ালাটি ফল করলে জি এম ফাউন্ড্রিকে কোম্পানি ব্ল্যাকলিস্টেড করবে।

অনিন্দ্য ধৈর্য হারাচ্ছিল। শব্দ করে চেয়ারটা টেবিলের কাছে টানল। ঘড়ি দেখছে ঘন ঘন, যেন এক্ষুনি তার প্লেনট্রেন কিছু ছেড়ে যাবে।

কেজরিওয়াল শুকনো মুখে বেরিয়ে যেতেই অনিন্দ্য হাঁই হাঁই করে উঠল,—আমাকে এ রকম একটা চিঠি দেওয়ার অর্থ কী?

বি বি-র শান্ত মুখচোখ আচমকাই শক্ত হয়ে গেছে। গলা ভারী করে বললেন,—অর্ডারের ল্যাংগুয়েজটা কি আন্‌ক্লিয়ার ?

—আমি জানতে চাইছি কেন আমাকেই দুর্গাপুর পাঠানো হচ্ছে?

—স্ট্রেঞ্জ! তুমি কি কৈফিয়ত চাইছ নাকি? অফিস ডেকোরাম জানো না ? তোমার লাস্ট কাজটা ভাল লেগেছিল বলে আমি তোমাকে রেকমেন্ড করলাম, আর তুমি আমাকেই এসে তড়পাচ্ছ?

ও, বি বি-ই তা হলে নাটের গুরু? খচড়ামিটা বি বি-ই করেছে?

সিদ্ধান্ত মনে মনে নেওয়াই ছিল, দুম করে অনিন্দ্য বলে দিল,—আমি দুর্গাপুর যাচ্ছি না।

—কেন জানতে পারি?

—আমি আপনাকে জবাব দিতে বাধ্য নই। অনিন্দ্যর মুখ বেঁকে গেল, —আমি চাকরি থেকে রিজাইন করছি। ফ্রম দিস ভেরি মোমেন্ট।

—তুমি…..তুমি…..! বি বি হতভম্ভ, —ভেবে বলছ?

—পাওনাগন্ডটা রেডি রাখবেন। মাসপয়লায় এসে নিয়ে যাব। আমারও ডেটলাইন দিয়ে গেলাম। ওই দোসরা মে।

বলেই আর বসল না অনিন্দ্য। বাদল ভৌমিকের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখখানা উপেক্ষা করে চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। খসখস করে লিখল পদত্যাগপত্র, ড্রয়ার খুলে খাম বার করে ভরল সদর্পে। নিজের দু’-একটা ব্যক্তিগত জিনিস রাখা থাকে ড্রয়ারে। সানগ্লাস, রুমাল, পেন, চাবি, টুকিটাকি কিছু ড্রয়িং অ্যাপারেটাস। ব্রিফকেসে সব পুরে ডাকল বেয়ারাকে, বাদল ভৌমিকের ঘরে পাঠিয়ে দিল খামখানা। আঃ, নিশ্চিন্ত। আরও একটা ওভার শেষ হল।

অফিসের বাইরে এসে অনিন্দ্য বুক ভরে শ্বাস টানল একটা। তাকে জব্দ করতে চেয়েছিল বি বি, মুখের ওপর জব্বর উত্তরটা দেওয়া গেছে। হাহ্, অনিন্দ্যকে প্যাঁচে ফেলতে চাস? এখন বোঝ কার সঙ্গে তুই লড়তে এসেছিলি!

বৈশাখের সূর্য চাঁদি ফাটাচ্ছে। চৈত্রের শেষে পর পর বেশ কয়েকদিন কালবৈশাখী এসেছিল, ঝড়বৃষ্টির পর একটু ঠান্ডা হয়েছিল প্রকৃতি। গত কয়েকদিনে আকাশ থেকে মেঘ যেন উবে গেছে, রোজই থার্মোমিটারের পারা চড়ছে ওপরে। বাতাস একটা আছে বটে, সেও ভারী শুকনো। ঘাম কম হচ্ছে, কিন্তু পুড়ে যাচ্ছে চামড়া।

সানগ্লাস চোখে ব্রিফকেস হাতে দুলে দুলে হাঁটছিল অনিন্দ্য। রোদ্দুর মাড়িয়ে। কোনও তাড়া নেই, কোনও লক্ষ্য নেই, এ ভারী সুখের সময়। থিয়েটার রোডের মুখে এসে দাঁড়াল একটু। সামনে একটা রেস্টুরেন্ট দারুন বিরিয়ানি বানায়, ঢুকে এক প্লেট খেয়ে নেবে কি?

দোকানে ঢুকে মনের সুখে বিরিয়ানি সাঁটাচ্ছে অনিন্দ্য, হঠাৎ পাশ থেকে ডাক,—আরে, অনিন্দ্য না ?

জিন্‌স-টিশার্ট পরা পাশের টেবিলের চাঁপ-পরোটা ভোক্তাকে চিনতে অনিন্দ্যর সময় লাগল দু’এক সেকেন্ড। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যচমেট। যুধাজিৎ।

কলেজে কারুর সঙ্গেই তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না অনিন্দ্যর। সে কারুর সঙ্গে মিশলে তো! পাশটাশ করার পর সহপাঠীদের এক-আধ জনের সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়। যুধাজিতের সঙ্গে এই প্রথম।

যুধাজিৎ চোখ নাচিয়ে বলল,—কী খবর? কেমন আছ?

অন্যদিন হলে অনিন্দ্য এড়ানোর ভঙ্গিতে উত্তর দিত, কিন্তু আজ তার মেজাজ শরিফ। কাঁধ নাচিয়ে বলল,—ও ফাইন।…. তোমার কী খবর?

—আমি তো এখন এল্ এ-তে। আই মিন লসএঞ্জেলেস। এম-বি-এতে চান্স পেয়েছিলাম, জামশেদপুরে গিয়ে পড়লাম…..জানো তো ওখানে একটা ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউট আছে……

—জ্যাভেরিয়ান?

—ইয়া। ওখান থেকে ম্যানেজমেন্ট করে ব্যাংগালোরে জব পেয়েছিলাম। ওরা একটা প্রোজেক্টে আমায় ঘানায় পাঠিয়েছিল। সেখানেই এক মাল্টিন্যাশনাল ডেকে নিল। অ্যান্ড দেন আই ফ্লু ফর আলাবামা। তারপর এখন ওদেরই একটা কাজে মাস ছয়েক হল এল্‌-এ তে আছি।

—ও।

অনিন্দ্যর গুলিয়ে যাচ্ছিল। শিবপুর থেকে জামশেদপুর ব্যাংগালোর ঘানা আলাবামা লসএঞ্জেলেস…..মাত্র তিরিশ বছর বয়সে অনেকটা দুনিয়া তো চরে ফেলেছে যুধাজিৎ! অথচ জয়েন্টে যুধাজিতের পজিশন অনিন্দ্যর চেয়ে নীচে ছিল, অনিন্দ্যর স্পষ্ট মনে আছে। এও তো এক ধরনের চক্রান্ত! কেন যধাজিৎরাই এই সব সুযোগগুলো পায়? কেউ যাবে লসএঞ্জেলেস, আর কারুর কপালে দুর্গাপুর?

যুক্তিগুলো যে আদৌ ঠিক নয়, তার যে পরিশ্রমেই অনীহা, এই সামান্য সত্যটুকুও সুস্থ মাথায় বিশ্লেষণ করে দেখার ক্ষমতা নেই অনিন্দ্যর। একা থেকে থেকে তার মধ্যে এক ধরনের পরশ্রীকাতরতাও জন্ম নিয়েছে। কমপ্লেক্সও।

যুধাজিৎ হাসছে,—তোমায় আগে খেয়াল করিনি, তা হলে তো এক টেবিলেই বসতে পারতাম। যাব? বলেই সম্মতির অপেক্ষায় না থেকে প্লেট তুলে নিয়ে এসে বসল সামনে। হাসি চওড়া করে বলল,—পুরনো ব্যাচমেটদের দেখলে যা আনন্দ হয়! আশিস কোথায় আছে জানো?

—নাহ্‌।

—শুভঙ্কর ? …..ও তো এম-ই করছিল?

—বলতে পারব না ঠিক।

—তুমি কী করছ?

অনিন্দ্য একটা ঢোঁক গিলল। গলা ঝেড়ে নিয়ে বলল,—আমিও তো এখন বাইরে।

—তাই নাকি? কোথায়?

—ইয়োকোহামা। আই মিন জাপান। এখানে একটা কন্সট্রাকশান কোম্পানিতে কাজ করছিলাম, তাদের সঙ্গে এক জাপানি মাল্টিন্যাশনালের কোলাবরেশান হল…..তার পরই আমি ওদের ওখানে…..। কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পেরে অনিন্দ্য বেশ আত্মপ্রসাদ অনুভব করল। মাটনের শেষ টুকরোটা মুখে পুরে বলল,—তুমি কি এখন ছুটিতে?

—ওই আর কি। বোনের বিয়ে অ্যাটেন্ড করতে এসেছিলাম, এক ঢিলে দুটো পাখি মেরে দিচ্ছি। চোখ টিপল যুধাজিৎ,—বাবা-মা লম্বা লিস্ট করে রেখেছিল, ঝপাঝপ মেয়ে দেখে যাচ্ছি। পছন্দ হয়ে গেলে ডিসেম্বরে এসে বিয়েটা সেরে ফেলব।…..হোয়াট অ্যাবাউট ইউ? তুমি বিয়ে করেছ?

—ও শিয়োর। অনিন্দ্য যুধাজিতের ভঙ্গিতেই উত্তর দিল,—ইনফ্যাক্ট, বউকে নিয়ে যেতেই তো এবার আমার ক্যালে আসা।

—ভেরি গুড। বিদেশে কি একা একা থাকা পোয়? ইউ নিড সামওয়ান এল্‌স।

আরও খানিকক্ষণ খাজুরা চালাল যুধাজিৎ। অনর্গল প্রশ্ন হানছে অনিন্দ্যর জাপানবাস নিয়ে। কত মাইনে পায় অনিন্দ্য, কী রকম জায়গায় থাকে, গাড়ি কিনেছে কিনা, কোন মডেলের গাড়ি, কী কী অ্যাটাচমেন্ট আছে গাড়িতে, জাপানে ওয়ার্ককালচার এখন কেমন, হেন তেন। অনিন্দ্য মনের ভাবই বেশিক্ষণ গোপন রাখতে পারে না, কাঁহাতক সে গুল মারে!

যুধাজিতের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল অনিন্দ্য। ক্ষণিকের জন্য মনে হল, মিথ্যেগুলো ধরা পড়ে যায়নি তো? জাপানে চাকরি করে, অথচ কলকাতার রাস্তায় ব্রিফকেস হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েও তো তোতলাচ্ছিল মাঝে মাঝে, নির্ঘাত সন্দেহ হয়েছে যুধাজিতের। ধুস্, অনিন্দ্যর তাতে বয়েই গেল। সেও তো ধরে নিতে পারে যুধাজিৎ তাপ্পি মারছিল। লসএঞ্জেলেস থাকে, এদিকে থিয়েটার রোডের একটা থার্ড গ্রেড রেস্টুরেন্টে বসে পরোটা চিবোচ্ছে, এ’ও কি বিশ্বাসযোগ্য? সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কেউ লসএঞ্জেলেসে গেছে…..গত দশ বছরে শোনেনি অনিন্দ্য! একেই কি বলে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি?

বাসস্টপে দাঁড়িয়ে অনিন্দ্য নিজের মনে হেসে নিল একটুক্ষণ। সময় কেটেছে খানিকটা, কিন্তু এবার সে করবেটা কী? শরণ্যা কি বাড়ি ফিরেছে এখন ? না এলেও পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটার মধ্যে এসে যাবে নিশ্চয়ই। ততক্ষণ ঘরে কম্পিউটার খুলে বসাই যায়। অনেকদিন চ্যাট রুমে ঢোকা হয়নি, দেখতে দেখতে দু’-তিন ঘণ্টা কেটে যাবে।

ইন্টারনেটে চ্যাট করা কিছুদিন আগেও নেশার মতো ছিল অনিন্দ্যর। সে কখনও ভয়েস চ্যাট করে না, একটা বড়সড় চ্যাট রুমে অজস্র মানুষ অক্ষরের আঁচড়ে ভাব জমাচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে—সেদিকে তাকিয়ে থাকতেই ভারী ভাল লাগে তার। মনে হয় একটা ভিড়ে মিশে আছে একা হয়ে। তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু সে নজর রাখছে সবার ওপর। ক্বচিৎ কখনও একটা-দুটো বাক্য টাইপ করে দেয় কোথাও কোথাও, এন্‌টার মেরে উৎসুক চোখে দেখে কেউ তার কথার জবাব দিল কিনা। যদি কেউ দৃষ্টি ফেরায়, সঙ্গে সঙ্গে অনিন্দ্য নীরব।

শরণ্যার জন্য আজকাল আর অনিন্দ্যর চ্যাটে বসা হয় না। শরণ্যার অপছন্দ বলে নয়, শরণ্যা খেলাটার মজা পেয়ে গেছে বলেই পিছিয়ে এসেছে অনিন্দ্য। এত সহজে শরণ্যা চ্যাট রুমে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলে। ইচ্ছে মতো এক-আধ জনকে ডেকে নেয় ব্যক্তিগত আলাপে, অচেনা বন্ধুর সঙ্গে অক্ষরমিতালির নেশায় মেতে ওঠে—অসহ্য লাগে অনিন্দ্যর। পাশে অনিন্দ্য থাকতে কেন শরণ্যা অন্য কারুর সঙ্গে মজে যাবে? ধুস্ শালা, তার চেয়ে বরং খেলাটাই বন্ধ থাক।

এখন শরণ্যা বাড়ি নেই। সম্ভবত। ইন্টারনেট খুলে এখন অনিন্দ্য মাঠে নেমে পড়তেই পারে। নাকি শরণ্যার অফিসে চলে যাবে? হঠাৎ গিয়ে চমকে দেবে শরণ্যাকে? বলবে, তোমাকে নিতে এলাম?

দ্বিতীয় বাসনাটাই অনিন্দ্যর বেশি মনে ধরল। একটু আগে প্রায় এ রকমই একটা কথা সে বলেছিল না যুধাজিৎকে?

শুভ্র ঘাড় গুঁজে একটা জার্নাল গিলছিল। তর্জনী আর মধ্যমার ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। মাঝে মাঝেই তার আঙুল দুটো উঠে আসছে ঠোঁটে, নীলচে ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে চেতনার ছোট্ট ঘরখানা। ঘাড় না তুলেই সিগারেটের শেষটুকু অ্যাশট্রেতে চাপল, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধরিয়ে ফেলেছে পরবর্তী সিগারেট। ধূমপান ছাড়া শুভ্র পড়াশুনোয় মনঃসংযোগই করতে পারে না।

তামাকের ধোঁয়ায় কষ্ট হচ্ছিল শরণ্যার। খুকখুক কাশছে। লেখা থামিয়ে কটমট চোখে শুভ্রকে দেখল,—এটা কিন্তু একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।

শুভ্র যেন ঠিক শুনতে পেল না। বলল,—উঁ ? কিছু বলছিস ?

—বলছি সারা দিনে ক’প্যাকেট হল? প্যাসিভ স্মোকিংয়ে এবার আমার লাভ্‌স যে ফুটো হয়ে যাবে।

শুভ্র এক হাত জিভ কাটল,—ওহো, সরি সরি। আমি একদম খেয়াল করিনি।

—সরি বললেই বুঝি দোষ কেটে যায় ?

—নাকখত দেব? কান মুলব? যা বলবি তাই করতে রাজি।

শরণ্যার হাসি পেয়ে গেল। এ ক’দিন ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করার সুবাদে বুঝে গেছে শুভ্রর ওপর সিরিয়াসলি রাগ করা কঠিন। সর্বক্ষণ ফাজলামি করে গেলেও শুভ্রর মধ্যে একটা অন্য ধরনের তন্ময়তাও আছে। পড়াশুনোর সময়ে শুভ্র যেন একদম অন্য মানুষ। কী বলছে, কী করছে কোনও হুঁশ নেই। এই যে এতবার করে সরি সরি বলছে অথচ হাতে সিগারেটটি জ্বলছেই এখনও।

শরণ্যা গলাটাকে ইচ্ছে করে ভারী করল,—শাস্তি তো পরে হবে। আগে অন্তত হাতেরটা তো নেবা।

—দেখেছ কাণ্ড! শুভ্র ফের জিভ কাটল। অ্যাশট্রে উপচে পড়ছে পোড়া টুকরোয়, চেপে চেপে হাতের সিগারেটখানা গুঁজে দিল ছাইদানে। মুচকি হেসে বলল,—আমার দু’গালে ঠাস ঠাস করে চড় মারা উচিত। এতগুলো শিয়োর শট কেঁচে গেল, তাও এখনও শিক্ষা হল না!

শরণ্যা ভ্রূকুটি করল,—মানে?

—সবই তো জানিস। কেন লজ্জা দিস? কোন মেয়ে কীসে পটে সেটা পরে জানলেও চলে। আগে জানা দরকার সে কী কী ডিসলাইক করে। স্রেফ এইটুকুনি পারলাম না বলেই না আজ আমার এই দুর্গতি।

—ফের ভাট বকছিস?

—আমার কেসহিষ্ট্রিগুলো জেনেও আমার ওপর তোর করুণা হয় না? দেবলীনা চলে গেল, মধুরিমা কেটে গেল, সুদক্ষিণা উড়ে গেল, সবই তো এই সিগারেটের ধোঁয়ায়।

শরণ্যাকেও কি দেবলীনা টেবলীনাদের পঙ্‌ক্তিতে ফেলছে শুভ্র? উহুঁ, ছেলেটার মুখচ্ছবি তো তা বলে না। শুভ্র যে শরণ্যার প্রতি কোনও অশোভন ইঙ্গিত করছে না এ বুঝি হলফ করে বলা যায়

শরণ্যা চোখ পাকাল,—অ্যাই, তোর ব্যর্থপ্রেমের ডাব্বাটা বন্ধ কর তো। আর এখন থেকে ঘরে নো সিগারেট। নেশা চাপলে বাইরে চলে যাবে। সোজা রাস্তায় ।

—যো হুকুম ম্যাডাম। আই প্রমিস।

—এই নিয়ে ছ’ বার প্রমিস হল।

—আই প্রমিস টু ব্রেক দেম। চার্চিলের উক্তিটা আউড়ে দিল শুভ্র। হ্যা হ্যা করে হাসছে,—প্রতিজ্ঞা না ভাঙলে প্রতিজ্ঞার মূল্য কী বল?

একটু রঙ্গরসিকতা করেই কাজে মনোযোগী হয়েছে শুভ্র। জার্নালের যে প্রবন্ধটা পড়ছিল এতক্ষণ, সেটা প্রাঞ্জল ভাষায় বোঝাচ্ছে শরণ্যাকে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, বিশেষত ভারতে, লিঙ্গ পক্ষপাতের কারণ সম্পর্কে বেশ কিছু নতুন চিন্তাভাবনা আছে লেখাটায়। শরণ্যা মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছিল। মাঝে মাঝেই একটা শারীরিক অস্বস্তি এসে ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে মগজটাকে, গাগুলোনো ভাবটা ফিরে আসছে আবার।

শুভ্র কথা বলতে বলতে থেমে গেল,—তোর কি শরীর খারাপ লাগছে?

শরণ্যা আড়ষ্ট ভাবে মাথা নাড়ল,—তেমন কিছু নয়। বল।

—উহুঁ, মুখচোখ তো ভাল নয়। গরমে কষ্ট হচ্ছে? ঘাড়ে মাথায় জল ছিটিয়ে আসবি?

—না না, ঠিক আছি।

—নাহ্, বিয়ে থা হয়েও তুই সাবালিকা হলি না। আমরা কি আর ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট আছি? উই আর কলিগ্‌স নাউ, একসঙ্গে একটা কাজ করছি। তোর কোনও সমস্যা হলে আমায় বলবি, আমার কোনও প্রবলেম হলে আই উইল আস্‌ক ফর এ সাজেশান ফ্রম ইউ। পরশু আমার মাথার যন্ত্রণা হচ্ছিল, আমি তোর কাছ থেকে স্যারিডন চেয়ে নিইনি?

—আহা, বলছি তো তেমন কিছু নয়। শরণ্যা অপ্রতিভ ভাবটা কাটাতে এদিক ওদিক তাকাল, —জলের জগটা কোথায় গেল রে?

—তেষ্টা পেয়েছে? জল খাবি? বললেই তো হয়। শুভ্র ব্যস্ত ভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে,—এক সেকেন্ড। নিয়ে আসছি। মিস্টার কামুক সেই যে কখন ঠান্ডা জল ভরে আনছি বলে নিয়ে গেল….

শরীরের অস্বাচ্ছন্দ্যটা ভুলে হেসে ফেলল শরণ্যা। ধীমানবাবুর একটা নামকরণ করেছে বটে শুভ্র। প্রথম দিন ধীমান ঘোষের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার সময়ে পি-এস-বি বলেছিলেন, মিট ধীমান, ইনিই এখানকার সব। সেক্রেটারি কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার কাম অ্যাকাউন্ট্যান্ট কাম ক্যাশিয়ার কাম লিয়াজঁ অফিসার কাম ক্লার্ক কাম টাইপিস্ট….। শুভ্র কানে কানে বলেছিল, ইয়েস, হি ইজ ফুল অফ কাম। মিস্টার কামুক। বেচারা ধীমানবাবু!

চেতনার অফিস একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে। খুদে খুদে দু’খানা ঘর, মাঝারি সাইজের হল, রান্নাঘর বাথরুম ব্যালকনি মিলিয়ে জোর সাড়ে ছ’শো স্কোয়্যার ফিট। একটা ঘরে কাজ চলছে প্রোজেক্টের, অন্যটা চেতনার কর্তাব্যক্তিদের। অফিসটা হলঘরে। সেখানেই দেয়াল আলমারিতে বই আর ফাইল। মাঝে মাঝে চেয়ার ভাড়া করে এনে হলে সেমিনারও হয় চেতনার। দেশি বিদেশি অনেক জ্ঞানীগুণীজন আসেন তখন, প্রধানত আর্থসামাজিক সমস্যা নিয়েই মত বিনিময় করেন তাঁরা। ধীমানকে যে নামেই ডাকা হোক, ধীমানই চেতনার মূল সংগঠক।

রোগাসোগা নিরীহ চেহারার চশমা পরা ধীমান সারাদিন ব্যস্ত থাকে কম্পিউটার আর টেলিফোনে, তার টেবিল থেকে জলের জয় নিয়ে এল শুভ্র। সঙ্গে একটা সুসংবাদও। শুভ্র আর শরণ্যার রেমিউনারেশান বিল রেডি, কাল ফার্স্ট আওয়ারেই চেক মিলে যাবে। তবে এটা গত মাসের টাকা। প্রথমবার বলে পেতে দেরি হল, সামনের মাস থেকে প্রথম সপ্তাহেই পৌঁছে যাবে।

শরণ্যার মুখে হাসি ফুটে উঠল,—কত পাচ্ছি রে?

—তোর আঠেরো দিনের টাকা, আমার পঁচিশ দিনের। এবার ক্যালকুলেটারে ফেলে দে। …..আমার তো মনে হয়, চার-সাড়ে চার মতন হবে….না না, প্রায় পাঁচ হাজার।

শরণ্যা চোখ টিপল, —নট ব্যাড, অ্যাঁ?

—হুম। নেইমামার চেয়ে তো কানামামা ভাল। অ্যাটলিস্ট মা তো খানিকটা রিলিভড হবে।

শুভ্রর পারিবারিক অবস্থার কথা শরণ্যা এখন জানে মোটামুটি। বাবা নেই শুভ্রর। মারা গেছেন শুভ্রর এম-এ ফাইনালের ঠিক আগে আগে। ব্রেন ক্যানসার। বেশিদিন আর চাকরি ছিল না শুভ্রর বাবার, অফিস থেকে যা প্রাপ্য হত তার প্রায় সবটাই চলে গিয়েছিল তাঁর চিকিৎসায়। ভাঁড়ার শূন্য বলে ইদানীং বড় টেনশানে থাকেন শুভ্রর মা। পড়াশুনো শেষ করেও ছেলে চাকরি পাচ্ছে না, তাই নিয়েও তাঁর দুশ্চিন্তা কম নয়। শুধু কয়েকটা টিউশ্যনি করত শুভ্র, তাতে আর কীই বা হয়! যাক, এতদিনে শুভ্রর কাঠবেকার দশা তো কাটল।

শরণ্যা মাথা নেড়ে বলল,—কিন্তু প্রোজেক্টের কাজ তো টেম্পোরারি রে। আজ বাদে কাল শেষ হবে। তার পর?

—দাঁড়া, সবে তো শুরু হল। এখনই শেষের চিন্তা?

—তবু কী করবি না করবি তার তো একটা প্ল্যান ছকবি।

—কী কী করব না ঠিক করে ফেলেছি। কলেজে পড়াব না, রিসার্চ করবনা…. মে বি আইল্‌ বি সিটিং ফর আই-ই-এস্….. অর্‌ এনি শর্ট অফ জব…..

কথার মাঝেই কলিংবেলের শব্দ। মুহূর্ত পরেই ধীমান চেঁচিয়ে ডাকছে,— শরণ্যা, আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন।

অবাক হল শরণ্যা। দরজায় গিয়ে আরও অবাক। অনিন্দ্য!

অনিন্দ্য উঁকি দিচ্ছে ভেতরে,—এই তোমাদের অফিস?

—হ্যাঁ। শরণ্যা মাথা নাড়ল,—তুমি হঠাৎ?

—সারপ্রাইজ দিতে এলাম।… চেয়ার টেবিল লোকজন কিছু দেখছি না তো?

—আমাদের খুব ছোট্ট ব্যাপার। অত কিছু না হলেও চলে। শরণ্যা টানল অনিন্দ্যকে, —এসো না, ভেতরে এসো।

চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক দেখছে অনিন্দ্য। শরণ্যা ধীমানের সঙ্গে অনিন্দ্যর আলাপ করিয়ে দিল। তারপর নিয়ে এসেছে ছোট ঘরটায়, —এই দ্যাখো, এই হচ্ছে শুভ্র। শুভ্র দাশগুপ্ত। আমার কলিগ।

শুভ্র উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াল, —আপনার পরিচয় দিতে হবে না। আপনি নিশ্চয়ই দেবাদিদেব মহাদেব? আই মিন মিস্টার শরণ্যা?

রসিকতাটা বুঝল না অনিন্দ্য। বলল, —না, আমি অনিন্দ্য মুখার্জি। শরণ্যা আমার ওয়াইফ।

—আমিও তো তাই বলছি। মহাদেব তো শরণ্যা অ্যালিয়াস মাদুর্গার হাজব্যান্ড

—ও ।

—দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? বসুন। প্লিজ।

—নো থ্যাংকস। বলেই অনিন্দ্য শরণ্যার দিকে ফিরেছে, —চলো, আজ একসঙ্গে বাড়ি ফিরব।

—এক্ষুনি? শরণ্যা অপ্রস্তুত, —দাঁড়াও তা হলে। কম্পিউটারে কয়েকটা ডাটা দিয়েছি, সেভ করে নিই।

—কতক্ষণ লাগবে?

শুভ্র পাশ থেকে বলে উঠল, —বসুন না একটু। চা-টা খান। ইউ আর আওয়ার অনারড গেস্ট।

—নো থ্যাংকস।…শরণ্যা, তুমি তাড়াতাড়ি সারো।

শরণ্যা কম্পিউটারের মাউসে আঙুল রাখল। কি-বোর্ড টিপছে, মাউস নাড়ছে, কাজ করছে দ্রুত। শুভ্র আলাপ জমানোর চেষ্টা করছে অনিন্দ্যর সঙ্গে, হুঁ হুাঁ করে দায়সারা গোছের উত্তর দিচ্ছে অনিন্দ্য। শরণ্যার বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। শুভ্রর গল্প খুব একটা করেনি অনিন্দ্যর কাছে, মনে মনে অনিন্দ্য কিছু ভেবে নিচ্ছে না তো? শুভ্রই বা কী ভাবছে অনিন্দ্যকে? রামগরুড়? হুঁকোমুখো?

শুভ্র বুদ্ধিমান ছেলে। বুঝে নিয়েছে অনিন্দ্য মোটেই মিশুকে নয়। মানে মানে কেটে পড়ল ঘর থেকে। সম্ভবত সিগারেট খেতে গেল, ব্যালকনিতে।

শরণ্যাও কম্পিউটার অফ করে বেরিয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি। অনিন্দ্যর পাশে পাশে হাঁটছে। অনিন্দ্যকে চুপচাপ দেখে নিজেই কথা শুরু করল,—তুমি আজ অফিস থেকে এত আগে বেরিয়ে পড়েছ যে?

অনিন্দ্য টেরচা চোখে তাকাল, —তোমার কলিগটা খুব বাচাল তো?

শুভ্র তো চিরকালের ফাজিল, বলতে গিয়েও সামলে নিল শরণ্যা। আগে থেকেই সে শুভ্রকে চেনে, বলার কী দরকার!

গলায় মেকি বিরক্তির প্রলেপ মাখিয়ে শরণ্যা বলল, —হ্যাঁ, বড্ড বকে। মাথা ধরিয়ে দেয়।

—তুমি ওর সঙ্গে কাজ করো কী করে?

—পৃথিবীতে কত কিসিমেরই তো মানুষ থাকে, একটু মানিয়ে গুনিয়ে নিতে হয় আর কি।

জবাবটায় অনিন্দ্য বেজায় খুশি।বলল, —একটা ট্যাক্সি ধরি?

—তা হলে তো ভালই হয়। আমার শরীরটা আজ ঠিক নেই।

—কেন?

—বলছি না ক’দিন ধরে, বমি বমি লাগছে, মাথা ঘুরছে…

অনিন্দ্য ভাল করে শুনলই না। পাশ দিয়ে একটা হলুদকালো যাচ্ছিল, দৌড়ে গিয়ে পাকড়েছে ড্রাইভারকে। ডাকল, —অ্যাই, চলে এসো।

ট্যাক্সিতে বসে ঘাড় পিছনে এলিয়ে দিল শরণ্যা। চোখ বুজেছে। বেশ কিছুদিন ধরে যে আলোড়নটা উঠছে শরীরে, তার কারণ এখন শরণ্যার কাছে মোটামুটি পরিষ্কার। মাসের দু’ তারিখে পিরিয়ড হওয়ার কথা ছিল, চব্বিশ তারিখ হয়ে গেল…। নির্ঘাত আসছে কেউ। আসছে। ভাবতে কেমন লাগছে। শরণ্যার? সে কি চিন্তিত? উদ্‌বিগ্ন ? নাকি আহ্লাদিত? মা হওয়ার অনুভূতি এখনও সে ভাবে জাগেনি ভেতরে; শুধু একটা অস্বস্তি…। এমনটাই কি হয় প্রথম প্রথম? তারপর ধীরে ধীরে গোটা বুকে ছেয়ে যায় সেই অচেনা প্রাণ? খবরটা বাবা-মাকেও জানানো হয়নি। কেমন যেন লজ্জা লজ্জা করে। এমনটাও কি হয়?

জ্যামে ঠোক্কর খেতে খেতে এগোচ্ছে ট্যাক্সি। ত্রিকোণ পার্কের কাছে এসে একদম দাঁড়িয়ে গেল। নট নড়ন চড়ন। সামনে বাস মিনিবাস ট্যাক্সি প্রাইভেটকারে জট পাকিয়ে গেছে, ফাঁক দিয়ে ইঁদুরের মতো গলে গলে যাচ্ছে অটো আর দ্বিচক্রযান।

অনিন্দ্য বিরস মুখে বলল, —ধুস্‌, এইটুকু পথ হাঁটলেই হত।

শরণ্যা সাড়া দিল না।

অনিন্দ্য ঠেলল, —অ্যাই, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?

শরণ্যা চোখ খুলল, —না তো।

—তোমায় একটা খবর দেওয়ার ছিল। আজ চাকরিটা ছেড়ে দিলাম।

শরণ্যা ঝাঁকুনি খেয়ে সোজা হল, —যাহ!

—ইয়েস। পোষাচ্ছিল না। দোজ বাগারস ভেবে নিয়েছিল অনিন্দ্য মুখার্জি ওদের কেনা গোলাম, দিয়েছি আজ মুখের উপর রেজিগনেশান ছুড়ে।

শরণ্যা হাঁ। খানিক পরে কথা ফুটল, —এখন কী হবে?

—কী আবার হবে? অন্য একটা চাকরি খুঁজব।

—কিন্তু…

—অত ভাবছ কেন? আরে বাবা, আমি তো টাকা ওড়াই না, ব্যাংকে আছে কিছু। অনিন্দ্য আলগা ভাবে হাত চড়িয়ে দিল শরণার কাঁধে। গদগদ মুখে বলল, —তা ছাড়া আমার বউয়ের তো এখন একটা ইন্‌কাম আছে, না কি?

অনিন্দ্যর এমন মনোভাবে শরণ্যার তো গর্বিত হওয়া উচিত। ক’টা বর হুট করে বেকার হয়ে গিয়েও বউয়ের রোজগার আছে বলে এমন প্রফুল্ল থাকতে পারে? এতটুকু কমপ্লেক্স আসছে না অনিন্দ্যর, এটা নিশ্চয়ই একটা বড় গুণ। আর শরণ্যা তো এখন অনিন্দ্যর গুণগুলোকেই খুঁজছে।

তবু মনটা খচখচ করছে। সামান্য ইতস্তত করে শরণ্যা বলেই ফেলল, —কিন্তু আমার টাকা তো এখন একটু আনসার্টেন হয়ে যাবে।

—কেন?

—রেগুলার কি যেতে পারব বেশিদিন? চেতনা হয়তো তখন…

—কেন যেতে পারবে না?

—আহা, বুঝছ না? শরণ্যা মুখ টিপে হাসল,—বললাম যে গা গুলোচ্ছে, মুখে রুচি নেই, মাথা ঘুরছে…

—তো?

—সত্যিই তুমি বুঝতে পারছ না? মেয়েদের কখন এসব হয় জানো না?

—কখন হয়?

—ওরে আমার বোকারাম হাঁদারাম…। শরণ্যা খিলখিল হেসে উঠল। ট্যাক্সিড্রাইভারের কান বাঁচিয়ে ফিসফিস করে বলল, —আমি প্রেগ্‌ন্যান্ট, বুঝেছেন স্যার? তুমি বাবা হতে চলেছ।

অনিন্দ্য যেন মুহূর্তের জন্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। পরক্ষণে তার মুখ থেকে যেন রক্ত শুষে নিয়েছে কেউ।

শরণ্যা বিস্মিত মুখে বলল, —কী হল? তুমি খুশি হওনি?

অনিন্দ্য বিড়বিড় করে বলল, —কী করে হল?

—নেকু। জানো না কী ভাবে হয়?

—তুমি প্রিকশান নাওনি?

—নেওয়া হয়নি। একদিক থেকে তো ভালই হয়েছে। মা বলে, কম বয়েসেই এসব ঝামেলা ঝঞ্ঝাট চুকে যাওয়া ভাল।

অনিন্দ্য গুম হয়ে গেল। সারাটা পথ টুঁ শব্দটি নেই। বাড়ি এসেও মুখ কালো করে শুয়ে আছে বিছানায়। শরণ্যার শত ডাকাডাকিতেও উঠে চা জলখাবার ছুঁল না। রাতের খাবারও না।

অনিন্দ্যর অদ্ভুত আচরণের মাথামুন্ডু খুঁজে পাচ্ছিল না শরণ্যা। চাকরি ছেড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সন্তান-আগমনের সংবাদ পেয়ে অনিন্দ্য কি খুব বেশি বিচলিত হয়ে পড়ল? হয়তো ভাবছে দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো চাকরি ছাড়াটা তার মূর্খামি হয়ে গেছে! নাকি অনিন্দ্য এখন বাচ্চা চায় না ? এখন চায় না, নাকি কোনও দিনই চায় না? বাবা-মার ছেঁড়া ছেঁড়া সম্পর্কের মাঝে পড়ে ছোটবেলাটা বড় যন্ত্রণায় কেটেছে অনিন্দ্যর। এ কি তারই কোনও বিকৃত প্রতিক্রিয়া? হতেই পারে। অনিন্দ্যদের বাড়ির সবাইই তো একটু অদ্ভুত ধরনের।

শরণ্যা আর বেশি খোঁচাখুঁচি করল না। নিজের কাজ নিয়ে বসল কিছুক্ষণ, তারপর শুয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি। ক্লান্ত লাগছিল।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। রাতবাতির মৃদু আলোয় শরণ্যা দেখল অনিন্দ্য পায়চারি করছে ঘরে। মাঝে মাঝে এসে বসছে খাটে, উঠছে, আবার হাঁটছে।

শরণ্যার চোখ বড় বড়, —একী? তুমি শোওনি?

শরণ্যার গলা পেয়ে ঝট করে ঘুরেছে অনিন্দ্য। দু’-এক সেকেন্ড। হঠাৎই ঝাঁপিয়ে এসেছে বিছানায়। শরণ্যার মুখের ওপর ঝুঁকে বলল,—শোনো, অ্যারবশন করে বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দাও।

—যাহ্। শরণ্যা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না, —কেন করব অমন কাজ? আমাদের প্রথম বাচ্চা…! অসম্ভব। তা হয় না।

—কেন হয় না? কেন হয় না? অনিন্দ্যর মুখচোখ হিংস্র সহসা। ক্রুর গলায় বলল, —আমাদের মাঝখানে আর কেউ আসবে না। কেউ না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%