এক

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

ধীরেসুস্থে তৈরি হচ্ছিলেন নিবেদিতা। বিকেল সাড়ে চারটেয় সুহাসিনী ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সাপ্তাহিক মিটিং আছে আজ। তাঁদের এই ফার্ন রোডের বাড়ি থেকে হাজরায় সমিতির অফিস গাড়িতে মিনিট পনেরোর পথ, তবু নিবেদিতা চারটের মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে চান। ছেলের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন বলে পর পর দুটো মিটিংয়ে তাঁর থাকা হয়নি, আজ নিবেদিতার একটু আগে আগেই যাওয়া উচিত।

হালকা প্রসাধন সেরে নিবেদিতা ওয়ার্ড্রোব খুললেন। সার সার হ্যাঙার। শাড়ি ঝুলছে। সুতি সিল্‌ক তসর সিফন…। গয়নাগাঁটির ব্যাপারে নিবেদিতার তেমন একটা আকর্ষণ নেই, কিন্তু শাড়ি সংগ্রহে চিরকালই তাঁর প্রবল ঝোঁক। নানান রাজ্যের বাছাই বাছাই শাড়িতে তাঁর ওয়ার্ড্রোবটি ঠাসা। কাঞ্জিভরম পটোলা গাদোয়াল নারায়ণপেট বোম্কাই ইক্‌কৎ কট্কি মাদুরাই সম্বলপুরী, কী আছে আর কী নেই। বোলপুরের কাঁথাস্টিচ, ফুলিয়ার তাঁত, বিষ্ণুপুরের বালুচরী, আর খোদ বাংলাদেশের জামদানির সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তবে চড়া রং কোনওকালেই ভালবাসেন না নিবেদিতা, এখন বয়স বাড়ার পর রংয়ের ব্যাপারে তো আরও খুঁতখুঁতে হয়ে গেছেন। সাদা জমি, নইলে ঘিয়ে অথবা ছাই ছাই, বড় জোর স্টিল গ্রে, ব্যস।

ঠেলে ঠেলে একের পর এক হ্যাঙার সরাচ্ছেন নিবেদিতা। কোনটা পরবেন আজ? গুর্জরি স্টিচ? নাকি হালকা দেখে কোনও সিল্‌ক? হলুদপাড়ের জলডুরে টাঙাইলই বা মন্দ কি। অনিন্দ্যর শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠানো নমস্কারিটা এখনও হ্যাঙারে ওঠেনি, পড়ে আছে ওয়ার্ড্রোবর তাকে। শাড়িখানার দিকে তাকিয়ে নিবেদিতা নাক কুঁচকোলেন একটু। সাদা বেনারসি, খোলে বুটিটুটিও নেই, কিন্তু পাড় টকটকে লাল। এত লাল পাড় নিবেদিতা জন্মে পরেননি, বিয়ের পর পরও না। এমন ষাঁড়-খেপানো রং তাঁর ঘোরতর অপছন্দ। শরণ্যা বলছিল তার মা নাকি নিজে পছন্দ করে কিনেছেন এই শাড়ি। নিবেদিতারই দুর্ভাগ্য, শাড়িখানা এখানেই শুয়ে থাকবে অনন্তশয্যায়।

ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত চওড়া মেরুনপাড় সাউথ-কটনখানা হ্যাঙার থেকে নামালেন নিবেদিতা। সঙ্গে মেরুন-বর্ডার লম্বাহাতা ক্রিম-কালার ব্লাউজ। ঘরোয়া পোশাক দ্রুত পালটে নিজেকে বিন্যস্ত করলেন দক্ষিণী সুতির আভিজাত্যে। নিবেদিতার বয়স এখন আটান্ন, কিন্তু এখনও তাঁর ফিগারটি চমৎকার। গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের তুলনায় তিনি অনেকটাই দীর্ঘ, অতি সাধারণ শাড়িও একটা আলাদা মাত্রা পায় তাঁর অঙ্গে। মুখশ্রী তেমন আহামরি নয় বটে, তবে গায়ের রংটি রীতিমতো ফরসা, সিঁথিবিহীন কাঁচাপাকা ঘন কেশ টেনে বেঁধে চওড়া কপালে একটা বড় টিপ লাগালে তাকে প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী মনে হয়। এই ব্যক্তিত্বটাই নিবেদিতার আভরণ।

বেশভুষার পালা শেষ। টেবিল থেকে চশমা পেন আর একখানা ছোট্ট রাইটিং প্যাড তুলে নিয়ে সুদৃশ্য ঝোলাব্যাগটিতে পুরলেন নিবেদিতা। তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলেন একটু। ডিসেম্বরের শুরু, কলকাতায় এখনও শীত আসেনি, তবে পরশু থেকে অল্প অল্প উত্তুরে হাওয়া বইছে। শিরশিরে। শুকনো শুকনো। এই সময়টায় পুট করে ঠান্ডা লেগে যায়, সঙ্গে গায়ে দেওয়ার কিছু একটা নেবেন কি? দিন কুড়ি পর সুহাসিনীতে যাচ্ছেন, ফিরতে দেরি হতেই পারে।

গুজরাটি চাদরখানা বার করে নিবেদিতা আলমারি লাগাচ্ছেন, দরজায় রিনরিনে স্বর, —মামণি, আসব?

শরণ্যা। এ বাড়িতে পা রাখার পর থেকে নিবেদিতাকে মামণি বলে ডাকছে মেয়েটা। সম্বোধনটা কানে লাগে নিবেদিতার। তাঁর দুই ছেলে তাঁকে মা বলেই ডাকে, পুত্রবধূ কেন যে হঠাৎ মামণি ডাকটা আমদানি করল? কেউ শিখিয়ে দিয়েছে? নাকি শাশুড়িকে মা বলে সম্বোধন করতে অস্বস্তি হয়?

নিবেদিতা গলা ঝাড়লেন— এসো, ভেতরে এসো।

পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকল শরণা। পরনে পেঁয়াজবরণ আনকোরা তাঁত। ফুলে ফুলে রয়েছে শাড়িটা, খানিক এলোমেলোও। দেখেই বোঝা যায় শাড়ি পরার অভ্যেস নেই। রেশম রেশম একটাল চুল পিঠে ছড়ানো, সিঁথি জুড়ে ডগডগে সিঁদুর, গলায় মফ্চেন, হাতে চুড়ি বালার সঙ্গে লাল লাল শাঁখা, সোনায় বাঁধানো লোহা। নতুনবউ-নতুনবউ গন্ধ এখনও লেগে আছে শরণ্যার সর্বাঙ্গে।

পুতুলসাজ পুত্রবধূকে ঝলক দেখলেন নিবেদিতা। এগারো দিন মাত্র বিয়ে হয়েছে, মেয়েটা স্বাভাবিক ভাবেই এখনও বেশ জড়সড়।

নিবেদিতা হাসলেন নরম করে, —কিছু বলবে?

শরণ্যার চোখ বড় বড়, —আপনি বেরিয়ে যাচ্ছেন মামণি?

—হ্যাঁ। সমিতির অফিসে যাচ্ছি। নিবেদিতা ঘাড় নাড়লেন, —তোমাদের ট্রেন যেন ক’টায়?

—সওয়া সাতটা। আপনার ছেলে বলছিল ছ’টা নাগাদ বাড়ি থেকে স্টার্ট করবে।… আপনি কি এসে যাবেন তার মধ্যে?

—না শরণ্যা। এগজিকিউটিভ বডির মিটিং আছে আজ। আমার দেরি হবে।

—ও

মেয়েটার কি একটু খারাপ লাগল? মুখটা মিইয়ে গেল যেন? কী আশা করছিল শরণ্যা? ছেলে ছেলের বউ হানিমুনে যাচ্ছে বলে নিবেদিতা কাজকর্ম ফেলে ছুটে আসবেন? নিবেদিতা কর্মী মানুষ, এ ধরনের কোনও জোলো সেন্টিমেন্টকে প্রশ্রয় দেওয়া তাঁর ধাতে নেই, তা সত্ত্বেও নতুন বউ যেন মনে কষ্ট না পায় তার জন্য গলা আরও কোমল করে বললেন, —আমি তোমাদের সঙ্গে দেখা করেই বেরোতাম। …যাও, দু’জনে ভাল করে ঘুরে এসো। এ সময়ে ঠান্ডার জায়গায় যাচ্ছ। বেশি করে গরম জামাকাপড় নিয়েছ তো?

শরণ্যা ঢক করে ঘাড় নাড়ল।

—তোমাদের গোছগাছ সব কমপ্লিট?

—মোটামুটি।

—শাড়িকাড়ি বেশি নিয়ো না, সালোয়ার কামিজে অনেক ফ্রি থাকবো।

লজ্জা লজ্জা মুখে শরণ্যা বলল, —আপনার ছেলেও তাই বলছিল।

মেয়েটা খালি ‘আপনার ছেলে আপনার ছেলে’ করে কেন? শাশুড়ির সামনে বরের নাম উচ্চারণ করতে সংকোচ? আজকালকার মেয়েদের মধ্যে তো এ রকম সাবেকিপনা থাকা ঠিক নয়। এম-এ পাশ, শিক্ষিত মেয়ে, সে কেন এমন প্রিমিটিভ ভাষায় কথা বলবে!

যাক গে, মরুক গে, এ নিয়ে নিবেদিতার কীসের মাথাব্যথা। নিবেদিতা যেমনটি চাইবেন পুত্রবধূকেও অক্ষরে অক্ষরে তেমনটি হতে হবে, এমন ধারণায় নিবেদিতার বিশ্বাস নেই। পুত্রবধূর ওপর নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়াটাও তাঁর রুচিতে বাধে।

ঝোলাব্যাগের চেন আটকাতে আটকাতে নিবেদিতা প্রশ্ন করলেন, —তুমি যেন কী একটা বলতে এসেছিলে?

শরণ্যা বুঝি ভুলেই গিয়েছিল। অপ্রস্তুত মুখে বলল, —ও হ্যাঁ। …আপনার ছেলে চা খেতে চাইছিল। আমি ভাবলাম আপনাকেও একবার জিজ্ঞেস করে যাই।

নিবেদিতা ঘড়ি দেখলেন, —তা খেলে মন্দ হয় না। এখনও হাতে মিনিট পনেরো সময় আছে।

—আমি দু’ মিনিটে করে আনছি।

—তুমি কেন? নীলাচল কোথায়?

—নীলাচলকে আপনার ছেলে কোথায় যেন পাঠাল।

—ও। সাবধানে গ্যাস জ্বেলো।

শরণ্যা হেসে ফেলল, —আমার অভ্যেস আছে মামণি।

ঝুমঝুম গয়নার আওয়াজ মিলিয়ে যাওয়ার পর প্রশস্ত ড্রয়িংহলে এসে বসলেন নিবেদিতা। ভারী সোফাটায়। তিরিশ বছর আগে কেনা নামী দোকানের দামি সোফার আয়ু প্রায় শেষ, বসতেই ককিয়ে উঠেছে সোফার স্প্রিং। নিবেদিতার কপালে ভাঁজ পড়ল। এত আওয়াজ হচ্ছে কেন? অনিন্দ্যর বিয়ের হুজুগে সোফার ওপর যথেষ্ট অত্যাচার গেছে, এবার আর না সারালেই নয়। কিন্তু এসব জিনিসের খোলনলচে পুরো বদলাতে যাওয়াও তো অনেক টাকার ধাক্কা। অনিন্দ্যর বিয়েতে জলের মতো খরচা হয়ে গেল। ছেলের বিয়ে বলেই বোধহয় আর্যর হাত থেকে তাও কিছু টাকা গলেছিল, নিবেদিতার সোফাসেটের জন্য সে হাত কি উপুড় হবে? নিবেদিতার চাওয়ার দরকারটাই বা কী। শোভাবাজারের বাড়িটা বিক্রি হল বলে, নিজের ভাগটুকু হাতে এলে ঘরদোরের টুকিটাকি কাজগুলো নিজেই করে নিতে পারবেন নিবেদিতা। বিয়ে উপলক্ষে শুধু দোতলার ঘরেরই তো কলি ফেরানো হল, নীচে ভাড়াটের ঘরগুলো এখনও রং করা বাকি। সুরেন বলছিল গাড়িটাকেও এবার বসাতে হবে, ইঞ্জিনের হাল ভাল নয়।

ভাবনার মাঝেই সামনে অনিন্দ্য। হন্তদন্ত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ক্যাবিনেটের ড্রয়ারে কী যেন খুঁজছে। পেল না, মাথা ঝাঁকাচ্ছে অস্থির ভাবে। সশব্দে ড্রয়ার বন্ধ করে এপাশে এল। নিচু হয়ে সেন্টারটেবিলের তলার কাগজপত্র ঘাঁটছে। হঠাৎ সোজা হয়ে বলল, —সরো তো একটু।

—কী খুঁজছ?

—এখানে কোথায় যেন একটা খাম রেখেছিলাম।

—কী রকম খাম?

—ব্রাউন কালারের।

—খুব দরকারি?

—নইলে খুঁজছি কেন। অনিন্দ্যর মুখ গোমড়া, —ওর মধ্যে ট্রেনের টিকিট আছে।

—আশ্চর্য, ট্রেনের টিকিট যেখানে সেখানে ফেলে রেখেছ?

—নো লেকচার। পরনে শর্টস টিশার্ট, ফরসা ফরসা চেহারার অনিন্দ্যর গোলগাল কমনীয় মুখে রুক্ষ ভাব, —বলছি তো এখানেই ছিল। তোমার কি নড়ে বসতে অসুবিধে আছে?

—এ ভাবে কথা বলছ কেন? ভদ্র ভাবে বলো।

—কিচ্ছু খারাপ ভাবে বলা হয়নি। হটো, সোফার খাঁজগুলো দেখে নিই।

নিবেদিতা নড়লেন না। অপ্রসন্ন গলায় বললেন, —এখানে কোনও খামটাম নেই। তুমি নিজের ঘরে গিয়ে দ্যাখো।

—তোমার কি সরে বসতে মানে লাগছে?

—অদ্ভুত কথা! মানে লাগার কী আছে?

—বলা যায় না। অনিন্দ্য ঠোঁট বেঁকাল, —ক’দিন ধরে বংশগরিমা নিয়ে যা মটমট করছ। সবার কাছে গিয়ে আমি অমুক বাড়ির মেয়ে, আমার এই ছিল, আমার ওই আছে…

—আহ্ অনিন্দ্য, বিহেভ ইয়োরসেল্‌ফ। বাড়িতে একটা নতুন মেয়ে এসেছে।

—তো?

—নিজের রূপটা কি এখনই তাকে না দেখালে নয়?

জবাবে অনিন্দ্য ফের কী একটা বলতে যাচ্ছিল, টেলিফোন বেজে উঠেছে। বিরক্ত চোখে দূরভাষ যন্ত্রটার দিকে একবার তাকাল অনিন্দ্য, তারপর গটমট ঢুকে গেল ঘরে।

নিবেদিতার চোখেও অসন্তোষ। ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেকে দেখতে দেখতে রিসিভার কানে চাপলেন, —হ্যালো?

—নমস্কার দিদি। আমি নবেন্দু বলছিলাম। শরণ্যার বাবা।

—ও, নমস্কার নমস্কার। নিবেদিতার গলা পলকে মসৃণ, —বলুন কী খবর?

—বুবলিরা…আই মিন শরণ্যারা তো আজ চলল?

—হ্যাঁ, এই তো ছ’টা নাগাদ রওনা দেবে।

—ছ’টা? সর্বনাশ। ও প্রান্তে নবেন্দু যেন প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, — মিনিমাম দেড়-দু’ঘণ্টা হাতে নিয়ে বেরোনো উচিত। পিক্ অফিস আওয়ারে যাবে, কোথায় জ্যামে ফেঁসে যায় তার ঠিক আছে!

—না না, পৌঁছে যাবে। ওদের তো অফিসপাড়া দিয়ে যেতে হচ্ছে না, ট্রেন তো ওদের শেয়ালদা থেকে।

—ওই রুটটা তো আরও খারাপ। বেকবাগান মল্লিকবাজার মৌলালি কোন ঘাটে যে আটকে যায়…আজ আবার কাগজে দেখছিলাম কাদের যেন একটা মিছিলও আছে।।

নিবেদিতা উদ্‌বেগটাকে আমল দিলেন না। হাসতে হাসতে বললেন, —মেয়ে জামাইয়ের হানিমুন-যাত্রা নিয়ে আপনি দেখি খুব টেনশানে আছেন?

—আমার আর কী টেনশান। নবেন্দু হেসে ফেললেন, —আসল টেনশান পাবলিক তো বুবলির মা। কাল থেকে দুশ্চিন্তা করে যাচ্ছে। দু’জনেই ছেলেমানুষ…একা একা বেড়াতে যাচ্ছে…

—দু’জনে একা একা কী করে হয় ভাই?

—তবু…বয়সটা কম তো।

একেই বলে মধ্যবিত্ত আহ্লাদিপনা। দুটো প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ের বিয়ে হয়েছে, তারা যাচ্ছে মধুযামিনী যাপন করতে, বাপ-মা এখনও তাদের জন্য পা ছড়িয়ে বসে ভাববে কেন? বাঙালি অভিভাবকরা কেন যে তাদের ছেলেমেয়েদের বড় হতে দিতে চায় না? চব্বিশ বছরের মেয়েকে কচি খুকিটি ভেবে কী তৃপ্তি পায় তারা?

এমনিতে অবশ্য শরণার বাবা-মাকে বেশ লেগেছে নিবেদিতার। দু’জনেই যথেষ্ট শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিশীল। বিনয়ের অভাব নেই, আবার আচারআচরণে অনাবশ্যক কুণ্ঠা বা জড়তাও নেই। নবেন্দু চাকরি করেন ব্যাঙ্কে, মহাশ্বেতা একটি সরকারি সংস্থার খুদে অফিসার। এমন একটি পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়তে তিনি নিজেই যথেষ্ট আগ্রহী হয়েছিলেন। শুধু এই অকারণ আদিখ্যেতাগুলো যদি না থাকত শরণ্যার বাবা-মা’র।

নিবেদিতা গলায় খানিকটা ব্যক্তিত্ব এনে বললেন, —মিছিমিছি দুশ্চিন্তা করবেন না। ওরা ঠিক নিজেদেরটা নিজেরা সামলে নেবে।

—আপনার আশীর্বাদ থাকলে নিশ্চয়ই পারবে দিদি।

—বুঝলাম। নিবেদিতা হাসলেন, —তা আপনাদের কি এখনও ছুটি চলছে?

—বুবলি-অনিন্দ্যকে আজ ট্রেনে তুলে দিয়ে তবে ছুটি শেষ। সোমবার থেকে দু’জনেই অফিস জয়েন করব।

—গুড। …শরণ্যাকে ডেকে দেব?

—আছে সামনাসামনি?

চা করছে বলতে গিয়েও সামলে নিলেন নিবেদিতা। বললেন, —ধরুন। ডাকছি।

রান্নাঘর অবধি যেতে হল না, চায়ের ট্রে হাতে এসে পড়েছে শরণ্যা। ফোন ধরতে বলে তার হাত থেকে ট্রেখানা নিয়ে নিলেন নিবেদিতা। ঢুকেছেন ছেলের ঘরে।

খাটের ওপর পোশাক উপচে পড়া দু’খানা স্যুটকেস হাঁ হয়ে পড়ে। একখানা স্যুটকেসের পকেটে কী সব যেন রাখছিল অনিন্দ্য। মার পায়ের শব্দ পেয়ে ঘাড় যোরাল।

নিবেদিতা বললেন, —তোমার চা।

—রেখে যাও।

—টিকিট পেলে?

উত্তর নেই।

—সাবধানে যেও।

—হুঁ

—আমি সমিতির অফিসে গিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর হ্যাঁ, তোমার শ্বশুর শাশুড়িও সম্ভবত যাচ্ছেন স্টেশনে। ওঁদের মানিকতলায় নামিয়ে দিয়ে সুরেনকে সোজা হাজরায় চলে আসতে বোলো।

—তুমিই তো সুরেনকে বলে দিতে পারো।

কথা না বাড়িয়ে নিজের চা হাতে নিবেদিতা বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। শরণ্যা নিবিষ্ট মনে ফোনে কথা বলছে, একটু নিচু গলায়। কী কথা হচ্ছে না হচ্ছে শোনার কৌতূহল অনুভব করলেন না নিবেদিতা, এলেন ঘরের প্রান্তে, ডাইনিং টেবিলে। উষ্ণ পানীয়টুকু শেষ করে পায়ে পায়ে এগোচ্ছেন সিঁড়ির দিকে।

শরণ্যা ফোন রেখে দৌড়ে এল। টিপ করে প্রণাম করল একটা, —দার্জিলিং পৌঁছেই আমরা ফোন করে দেব মামণি।

—অসুবিধে না হলে কোরো। ভুলে গেলেও আমি কিছু মাইন্ড করব না। স্মিত মুখে নিবেদিতা আলগা হাত ছোঁয়ালেন শরণ্যার মাথায়, —আসি তা হলে?

—আচ্ছা।

সিঁড়ির ল্যান্ডিং পর্যন্ত নেমে নিবেদিতা দাঁড়ালেন একটু। চোখ ম্যাজেনাইন ফ্লোরের ঘরখানায়। পরিচিত দৃশ্য। বই-বোঝাই নিচু সিলিংয়ের ঘরখানার এক কোণে ইজিচেয়ারে বসে আছেন আর্য, মুখের সামনে যথারীতি একখানা ভারী কেতাব। পাশে কফির ফ্লাস্ক, পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে চুমুক দেবেন বলে বানিয়ে রেখে গেছে নীলাচল। কফি পানের মেয়াদ অবশ্য বিকেল পর্যন্ত, তারপর আর্যর অন্য পানীয় চাই। দিনের আলো নিবে যাওয়ার পর আর্য কোনও নরম পানীয় স্পর্শ করেন না।

আর্যকে ডাকলেন না নিবেদিতা। কোন দিনই বা ডাকেন! স্বেচ্ছাবন্দি ওই গুহামানবের দরজায় কবেই বা থামেন! আজ তাও খানিকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মানুষটার দিকে। উঁহু, মানুষটাকে নয়, যেন একটা ছবি দেখছিলেন নিবেদিতা। পশ্চিমের বিষণ্ণ আলো জানলার গ্রিল ভেদ করে এসে জাফরি কেটেছে আৰ্যর গায়ে, বুঝি বা আলোছায়া-মাখা সেই নকশাগুলোই টানছিল নিবেদিতাকে। চতুর্দিকে ছড়ানো বই, বুকসেল্‌ফ, আরামকেদারা, টেবিল, স্ট্যান্ডফ্যান, কাগজ, কলম, ডেটক্যালেন্ডার, পেপারওয়েট আর ওই আলোর জাফরিমাখা আর্য—সব মিলেমিশে রচিত হয়েছে এক ইমপ্রেশনিস্ট পেন্টিং। ঘরের ভেতরটা আশ্চর্য রকমের নিশ্চল, বাইরেও বোধহয় বাতাস নেই, আলোটুকুও কাঁপছে না, ঠিক যেন স্টিল লাইফ। বইয়ে ডুবে থাকা আর্যও যেন ওই স্থবির জীবনের অংশমাত্র, ওই ছবির বাইরে আর্যর যেন পৃথক কোনও অস্তিত্বই নেই।

ছবিটাকে অবশ্য বেশিক্ষণ চোখের পাতায় ধরে রাখলেন না নিবেদিতা। নীচে এসে দেখলেন সুরেন গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করে ফেলেছে, অপেক্ষা করছে রাস্তায়। সিগারেট টানছিল সুরেন, নিবেদিতাকে দেখামাত্র ফেলে দিল, চটপট গিয়ে বসল স্টিয়ারিংয়ে। বলল, —গাড়িতে কিন্তু তেল নিতে হবে মাসিমা।

পিছনের সিটে বসে নিবেদিতা দরজা বন্ধ করছিলেন। ভুরু কুঁচকে বললেন, —সেকী? এই তো পরশু দিন না তার আগের দিন পাঁচ লিটার ভরলাম।

—ওইটুকু তেলে পুরনো অ্যাম্বাসাডর কতটুকু যায় মাসিমা? এ গাড়ি তো এখন রাক্ষসের মতো তেল খাচ্ছে।

—কিন্তু গাড়ি তো তেমন বেরোয়নি!

—বা রে, বড়দা বউদি অষ্টমঙ্গলা করতে গেলেন না? মানিকতলা যাতায়াতেই তো…

—এক্ষুনি লাগবে?

—হাজরা গিয়ে নিলেও হবে। রিজার্ভে তো একটু আছে।

—চলো তা হলে।

পাড়াটা পুরনো। রাস্তাঘাট তেমন চওড়া নয়, বাঁকও আছে ঘন ঘন। সুরেনের একটু সাঁইসুঁই করে গাড়ি চালানোর প্রবণতা আছে, কিন্তু এখন সে একদমই গতি তুলছে না। নিবেদিতার কাছে সে কাজ করছে মোটে বছর খানেক, তবে এর মধ্যেই সে নিবেদিতার মেজাজমর্জি বেশ চিনে গেছে। তার শৃঙ্খলাপরায়ণ মালকিন গাড়িতে থাকলে সে কখনওই বেপরোয়া চালায় না।

নিবেদিতা টুকটাক কথা বলছিলেন সুরেনের সঙ্গে। বছর তিরিশ-বত্রিশের সুরেন বউবাচ্চা নিয়ে কাছেই থাকে, কসবায়। সম্প্রতি বাড়িঅলার সঙ্গে তার কিছু সমস্যা চলছে, নিবেদিতা শুনছিলেন সুরেনের সমস্যার কথা। মন দিয়ে। এটা তাঁর স্বভাব। গরিব অসহায় মানুষদের বিপন্নতার কাহিনী তাঁকে ব্যথিত করে।

সুরেনের দেড় বছরের ছেলেটার পেটের অসুখ সারছে না বলে নিবেদিতা রীতিমতো উদ্‌বিগ্ন, —কী করছ কী? ভাল করে ডাক্তার দেখাচ্ছ না কেন?

—দেখাচ্ছি তো মাসিমা।

—তোমার ওই হোমিওপ্যাথিতে আর হবে না, এবার অ্যালোপ্যাথি করো। অ্যান্টিবায়োটিকের একটা কোর্স করলে ঠিক হয়ে যাবে।

—কী অ্যান্টি ব্যাটি?

—সে ডাক্তার জানে। তোমাদের কসবায় ভাল ডাক্তার নেই?

—চ্যাটার্জি ডাক্তার আছে। হেব্‌বি ভিড় হয়। একশো টাকা ফিজ্।

নিবেদিতা বুঝে গেলেন আসল সমস্যা ওই ফিজে। সুরেনকে তিনি মাইনে দেন বাইশশো, তবে এ ছাড়াও সুরেনের কিছু উপরি রোজগার আছে। রবিবার তো বটেই, অন্য দিনও ফঁক পেলেই ট্যাক্সি চালায় সুরেন। অবশ্য তা সত্ত্বেও একশো টাকাটা ওর পক্ষে একটু বেশিই।

দু’-এক সেকেন্ড চিন্তা করে নিবেদিতা বললেন, —ঠিক আছে, সমিতির অফিসে গিয়ে তুমি আমায় একটু মনে করিয়ে দিয়ো, আমি বাবুয়াকে একটা চিঠি লিখে দেব। বাবুয়াকে চেনো তো? ওই যে লম্বা মতন, ক্রিকেট খেলে, আমার কাছে আসে মাঝে মাঝে। বাবুয়া একটা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। সেই যে ভবানীপুরে… আমি নবমীর দিন গেলাম… ওখানে গেলে বিনা পয়সায় তোমার ছেলেকে…

—মাসিমা ! সুরেন হঠাৎ নিবেদিতাকে থামিয়ে দিল, —ওই দেখুন, ছোড়দা!

নিবেদিতা থতমত খেয়ে সামনে তাকালেন। গড়িয়াহাট মোড় পার হয়ে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির সিগনালে আটকেছে গাড়ি, বাকি দু’ দিক দিয়ে মুহূর্মুহূ ছুটছে যানবাহন, তারই মাঝে চোখে পড়ল সুনন্দকে। চলন্ত গাড়িঘোড়াকে উপেক্ষা করে অলস মেজাজে রাস্তা পার হচ্ছে। একটা মিনিবাস প্রায় ঘাড়ে উঠে পড়ছিল সুনন্দর। নিবেদিতার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। ট্রাফিক সারজেন্ট ধমকে উঠল বিশ্রী ভাবে, ভ্রূক্ষেপ না করে সুনন্দ চলে গেছে ওপারে। ভিড়ে মিশে গেল।

সুরেন বলল, —কাণ্ড দেখলেন মাসিমা ?

—হুঁ।

—এক্ষুনি ফিনিস হয়ে যাচ্ছিল। সুরেন দু’ হাত কপালে ঠেকাল, —জোর বেঁচেছে।

হৃৎপিণ্ড এখনও ধকধক করছে নিবেদিতার। বড় করে একটা শ্বাস টেনে বললেন, —হুঁ।।

—ছোড়দাটা সত্যি কেমন যেন আছে…আলাভোলা… কেমন কেমন… না মাসিমা?

—হুঁ।

—রাস্তায় চলতে চলতেও কী এত ভাবে? ব্যান্ডপার্টির কথা?

তাঁর দুই ছেলের কে যে কখন কোন জগতে থাকে তা যদি জানতেন নিবেদিতা! দু’জন তো দু’ পদের। এক জনের সারাক্ষণ চোয়াল শক্ত। হয় মুখে কুলুপ আঁটা, নয় তো যে কোনও কথাকে বেঁকিয়ে চুরিয়ে হুল ফুটিয়ে চলেছে। মা তোর কোন শত্রু যে মার সঙ্গে অমন ব্যবহারটা করিস? অদ্ভুত ছেলে, সারাটা জীবন হস্টেলে হস্টেলে থাকল, অথচ তেমন কোনও বন্ধু নেই! যতক্ষণ বাড়ি থাকে, দরজা বন্ধ। কী যে ছাই করে নিজের মনে! বিয়ের পরেও এমন হাবভাব, যেন বিয়ে করে নিবেদিতাকে ধন্য করে দিয়েছে! আর ছোটটি তো আর এক কিসিমের। তার বন্ধুর সংখ্যা তত বোধহয় লেখাজোখা নেই। বাড়ির লোককে তিনি তো মানুষ বলেই গণ্য করেন না। কখন আসে, কখন যায়, কোথায় থাকে, তার কোনও ঠিকঠিকানা আছে? জিজ্ঞেস করলে জবাব পর্যন্ত দেয় না, সিগারেট ধরিয়ে ফস ফস ধোঁয়া ছাড়ে মুখের ওপর। ইদানীং তো কোন একটা গানের দলে ভিড়েছে। নীলাচল বলছিল প্রায়ই নাকি দলবল জুটিয়ে চিলেকোঠার ঘরে মহড়া চলে তাদের। এক-দু’ দিন নিবেদিতাও মালুম পেয়েছেন। উত্তন্ড বাজনা বাজিয়ে কী তারস্বরে যে চেঁচায়! সুরেন বোধহয় ওটাকেই ব্যান্ডপার্টি বলছে।

সিগনাল সবুজ হয়েছে, বাঁয়ে ঘুরে হাজরা রোডে ঢুকে পড়েছে গাড়ি। নিবেদিতা অন্যমনস্ক মুখে ভাবছিলেন কেন তাঁর দুই ছেলের একজনও স্বাভাবিক হল না! দু’জনেরই লেখাপড়ায় বেশ মাথা ছিল। অনিন্দ্য তো রীতিমতো ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করেছিল হায়ার সেকেন্ডারিতে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখন চাকরিও তো মন্দ করছে না। আশ্চর্য চরিত্র, চাকরি করছে, অথচ একটা ফুটো পয়সা ঠেকায় না সংসারে! নারীসঙ্গের অভাবেই কি মেজাজটা বিগড়েছিল অনিন্দ্য? বিয়ের পর কি শান্ত হবে? হয়তো। সুনন্দই বা কী? বি-কমে তো মোটামুটি ভালই করেছিল, কিন্তু কেন যে আর পড়ল না? চাকরিটাকরিরও তো চেষ্টা করে না। অথচ তার টাকা চাই। আজ একশো, কাল পাঁচশো, পরশু দু’শো…। না পেলে ওই আলাভোলা ছেলে যে কী মূর্তি ধারণ করে, বাইরের লোক তো তা জানে না।

সুহাসিনী ওয়েলফেয়ার সোসাইটি এসে গেছে। সুরেন হর্ন বাজাতেই মেটে রংয়ের প্রকাণ্ড গেট খুলে দিল জগন্নাথ। সমিতির দ্বাররক্ষী। সামনে সামান্য সবুজ, মাঝখান দিয়ে খোয়া বাঁধানো রাস্তা চলে গেছে গাড়িবারান্দায়।

নিবেদিতা গাড়ি থেকে নামলেন। গোটা চারেক সিঁড়ি টপকে প্রবেশ করলেন নিজের ঠাকুমার মা’র নামাঙ্কিত সেবা প্রতিষ্ঠানে।

প্যাসেজ দিয়ে ঢুকেই প্রথম ঘরটি সমিতির অফিস। কমিটির মেম্বাররা বেশ কয়েকজন এসে গেছেন। স্বাগতা মঞ্জুলিকা কাকলি জয়শ্রী। জোর গুলতানি চলছে অফিসঘরে।

নিবেদিতাকে দেখে মুহূর্তের জন্য কলতান থেমে গেল। নিবেদিতার বাবা সোমশঙ্কর এই সুহাসিনী ওয়েলফেয়ার সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা, সেই সূত্রে নিবেদিতা এখানকার আজীবন প্রেসিডেন্ট। সমিতিতে তাঁর একটা আলাদা মর্যাদা আছে, সদস্যরা তাঁকে বেশ সমীহই করে। অল্পস্বল্প ঠাট্টাইয়ার্কিও চলে বটে, তবে নিবেদিতার সম্ভ্রম বাঁচিয়ে।

স্বাগতা উঠে দাঁড়িয়ে লঘু স্বরে বললেন, —ওয়েলকাম নিউ মাদার-ইন-ল, ওয়েলকাম।

মঞ্জুলিকা বলে উঠলেন, —উফ্ নিবেদিতাদি, কত দিন পর আপনি এলেন বলুন তো! আপনাকে ছাড়া সব যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল।

সমিতির সেক্রেটারি অর্চনা মৈত্র কাজ করছেন টেবিলে বসে। বয়স বছর পঞ্চাশ, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, মুখমণ্ডলে বেশ একটা দৃপ্ত ভাব আছে।

অর্চনার ঠোঁটেও স্মিত আহ্বান। কলম বন্ধ করে প্রশ্ন ছুড়লেন, —সংসার এখন কেমন লাগছে নিবেদিতাদি? হাউ ইজ লাইফ?

ক্ষণপূর্বের দীর্ঘশ্বাস মুছে ফেলেছেন নিবেদিতা। এই বাড়িটায় ঢুকলেই তাঁর মন অন্য রকম হয়ে যায়। ছেলে স্বামী সংসার সব যেন তখন পলকে বহুদূর। আজ বলে নয়, চিরকালই।

নিবেদিতা দু’ গাল ছড়িয়ে হাসলেন, —খুব ভাল লাগছে। এক্সেলেন্ট। …এই, আর সবাই গেল কোথায় ? চলো চলো। কাজকর্ম শুরু করে দিই।

অধ্যায় ১ / ১৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%