আট

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

সরকারি দপ্তরটিতে আজ সাজো সাজো রব। দেশীয় এক কম্পিউটার কোম্পানি থেকে জনা তিনেক ঝকঝকে তরুণ এসেছে, যন্ত্রগণক বসাচ্ছে ডিরেক্টর-ডেপুটি ডিরেক্টরদের ঘরে। অত্যুৎসাহী কর্মচারীরা উঁকিঝুঁকি মেরে আসছে ঘন ঘন, বেসরকারি কর্মকাণ্ড দেখতে সরকারি কাজ আজ শিকেয়। উচ্চৈস্বরে আলাপচারিতা চলছে গোটা দপ্তরে। সর্বত্র একটিই আলোচ্য বিষয়— কম্পিউটার। যাক, অ্যাদ্দিনে তবে ঘুম ভাঙছে সরকারের! সরকারি অফিস আধুনিক হচ্ছে!

নিবেদিতা রীতিমতো অধৈর্য বোধ করছিলেন। বিশ মিনিটের ওপর ঠায় বসে আছেন, বড়বাবুর টিকিটি নেই। সেই যে তিনি আসছি বলে সেঁধিয়ে গেলেন ডেপুটি ডিরেক্টরের ঘরে…! কতক্ষণ আর তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করবেন নিবেদিতা?

এমনিতেই নিবেদিতার মনটা আজ বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। পরশু থেকে বাড়ি ফিরছে না সুনন্দ। পর পর দু’ রাত। এমন নয় যে সুনন্দ অতি সুবোধ বালক, প্রতিদিন সে নির্দিষ্ট সময়ে গৃহ হইতে নির্গত হয় এবং যথাসময়ে প্রত্যাগমন করে। সে তো মাঝে মাঝেই ফেরে না। হয় কোনও বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটায়, নয় ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ উড়ে যায় কলকাতার বাইরে। ক’দিন আগেই তো গানের দল নিয়ে শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি ঘুরে এল। তবে সর্বদাই যাওয়ার আগে একটা অন্তত খবর ছুঁইয়ে যায়। এবার যাওয়াটা অন্য রকম। মেজাজ দেখিয়ে বাবু এবার বিলকুল হাওয়া। পরশুর আগের দিন হুট করে দশ হাজার টাকা চেয়ে বসল নিবেদিতার কাছে। ভীষণ দরকার। দিতেই হবে। আশ্চর্য, অত টাকা কোত্থেকে দেবেন নিবেদিতা? দেবেনই বা কেন? পঁচিশ বছরের ধাড়ি ছেলে, এখনও বাপ-মার হোটেলে বসে খাচ্ছিস আর প্রাণের সুখে খঞ্জনী বাজিয়ে বেড়াচ্ছিস…! অপ্রিয় সত্যি শুনে উলটো আক্রমণ, তুমি কার পয়সায় ড্রেস মেরে বেড়াও? ক’টা পয়সা রোজগার করেছ জীবনে? উফ্ কী সব মুখের ভাষা! কোত্থেকে যে নিবেদিতার ছেলেরা এত খারাপ করে কথা বলতে শিখল? কেন জন্মেছিলি তোরা? কেন আঁতুড়েই মরে যাসনি? ।

চিন্তায় ছেদ পড়ল। বড়বাবু ফিরেছেন। এক খালি-গা কিশোর কেটলি হাতে টেবিলে টেবিলে চা দিচ্ছে, হয়তো বা তার টানেই। চেয়ারে বসে কাপে চুমুক দিয়ে অপ্রসন্ন গলায় বললেন, —এখনও বসে আছেন ?

নিবেদিতার গলাতেও বিরক্তি ফুটল, —আপনিই তো বলে গেলেন ওয়েট করতে।

—কিন্তু আজ তো কোনও কাজ হবে না।

—কেন?

—দেখছেন না, সবাই কেমন বিজি? কম্পিউটার বসছে।

কম্পিউটার বসার সঙ্গে কাজ বন্ধ হওয়ার কী সম্পর্ক মাথায় ঢুকল না নিবেদিতার। তবে ফস করে কোনও মন্তব্যও করলেন না। বড়বাবু লোকটিকে দরকারে অদরকারে কাজে লাগে। তিনি চটে গেলে সুহাসিনী অসুবিধেয় পড়তে পারে। কোথায় পুট করে কী নোট দিয়ে দেবেন, সুহাসিনীর টাকাটাই হয়তো আটকে গেল। আগের ডিরেক্টরের কাছে সোজাসুজি গিয়ে কথা বলতেন নিবেদিতা, বর্তমান যিনি আছেন তিনি বিশেষ আমল দিতে চান না, এই বড়বাবুর কাছেই ঠেলে দেন।

কোষ্ঠকাঠিন্যের রুগির মতো মুখঅলা বছর পঞ্চান্নর বড়বাবুকে আলগা জরিপ করে নিলেন নিবেদিতা। নরম গলাতেই বললেন, —আমার ছোট্ট কাজ। রুটিন জব। অ্যানুয়াল গ্রান্টের অ্যাপ্লিকেশান আর এস্টিমেটটা খালি জমা করব।

—অ। তা দিয়ে দিন রিসিভিংয়ে।

—কিন্তু আপনার সঙ্গেও যে একটু কথা ছিল।

—বলুন। চটপট।

—লাস্ট ইয়ার আমাদের গ্রান্ট একটু কম স্যাংশান হয়েছে…মানে তার আগের বছরের থেকে হাজার পঁচিশেক বাড়াতে বলেছিলাম…ডিরেক্টর সাহেব আমায় কথাও দিয়েছিলেন হয়ে যাবে, কিন্তু…

—আমরা আর পেরে উঠছি না, বুঝলেন। চারদিকে এখন শুধু সমাজসেবার হিড়িক, ব্যাঙের ছাতার মতো অরগ্যানাইজেশান গজিয়ে উঠছে। সকলেরই বিরাট বিরাট বুলি, হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা…। কত দেব, অ্যাঁ?।

বড়বাবুর কথার ভঙ্গিটি যথেষ্ট অমার্জিত। মনে হয় যেন নিজের মাসমাইনে থেকে পুজোর চাঁদা দিচ্ছেন! নিবেদিতা তবু রাগলেন না। ঠান্ডা মাথাতেই বললেন, —আমাদের অরগ্যানাইজেশান তো ভুঁইফোড় নয়। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে চলছে। তা ছাড়া লাস্ট ইয়ার যিনি ইন্সপেকশানে গেছিলেন, তিনি কিন্তু টাকা বাড়ানোর ফেভারেই নোট দিয়েছিলেন।

—নোট দিলেই তো হবে না, আমাদের অনেক হিসেবপত্র করে চলতে হয়। আপনাদের নাম কুড়োনোর দৌলতে আমাদের যে দেউলিয়া হওয়ার দশা। বড়বাবুর মুখে বাঁকা হাসি, —আপনারা আর একটা কী যেন শুরু করতে চলেছেন না?

—হ্যাঁ। বৃদ্ধাশ্রম।

—তার জন্যও তো গ্রান্টের অ্যাপ্লিকেশান করেছেন?

—হুঁ।

—প্রাইভেট ডোনেশানের ওপরই বেশি নজর দিন, বুঝলেন। আমাদের ওপর আর বেশি ভরসা করবেন না।

—আমরা যত দূর সম্ভব তাই করি। বৃদ্ধাশ্রমের জমি আমরা ডোনেশানের টাকাতেই কিনেছি। বাড়ি করার খরচ তত হিউজ, তাই গভর্নমেন্টের কাছে পারশিয়াল হেলপ চেয়েছি একটা। তাও এক্ষুনি নয়। প্ল্যান স্যাংশান হওয়ার পর আমরা নিজেরাই কাজ শুরু করব। আমাদের অগ্রগতি দেখে গভর্নমেন্ট যেটুকু দেওয়া উচিত মনে করবে আমরা সেটুকুতেই কাজ চালিয়ে নেব। সরকারকে ফতুর করা সুহাসিনীর মটো নয়।

শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে উচ্চারিত নিবেদিতার কথাগুলো এতক্ষণে যেন থমকে দিয়েছে বড়বাবুকে। ঈষৎ অপ্রস্তুত গলায় ভদ্রলোক বললেন, —না না, আপনারা তো ভাল কাজই করেন। তবে বোঝেনই তো, ফিনান্স এখন খুব ঝামেলা করছে। দু’ পয়সার জন্য দু’ হাজার ফ্যাকড়া তোলে।

—আমি জানি। তবে আপনারা যদি স্পেশালি আমাদের কেসটা রেকমেন্ড করেন, সুহাসিনীর একটু সুবিধে হয়। নিবেদিতার স্বর আরও ঋজু হল, —ব্যাপারটা কী জানেন? একটা ওয়েলফেয়ার স্টেটে রাষ্ট্রের যে কাজগুলো করা উচিত, আমরা সেই কাজগুলোই করি। আর সেই জন্যই আমরা মনে করি আমাদের জন্য অর্থ ঢালাটা রাষ্ট্রের অপচয় নয়।

বড়বাবু কথাটা যেন ঠিক বুঝলেন না। কিংবা হয়তো বোঝার তাগিদ অনুভব করলেন না। বুঝি বা ভাবলেন মহিলা গায়ে পড়ে তাঁকে কথা শোনাচ্ছেন, জ্ঞান দিচ্ছেন অনর্থক।

নিবেদিতার বাড়িয়ে দেওয়া কাগজগুলো পচা ইঁদুর ধরার ভঙ্গিতে হাতে নিলেন বড়বাবু। তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, —ঠিক আছে, শুনলাম তো সব। দেখি কী করতে পারি।

—আমি কি সামনের মাসে এসে জেনে যাব?

—আসতে পারেন। তবে অ্যালটমেন্ট পেতে পেতে জুলাই। বড়বাবু চোখ সরু করলেন, —এবার যেন কত বাড়াতে বলেছেন?

—ওই পঁচিশ হাজারই৷ মানে যেটা পাইনি…

—ইউটিলাইজেশান সার্টিফিকেট দেওয়া আছে ?

—সব আছে। ওই তো অ্যাপ্লিকেশানটা তুলুন, ওর ঠিক নীচেই…

—দেখে নেব’খন। ধরে করে ইন্সপেকশানটা আগে করিয়ে নিন। ওই রিপোর্টটাও লাগবে।

নিবেদিতার মেজাজটা তেতো হয়ে গেল। কী বাদশাহি চালের কথাবার্তা! সরকারি পরিদর্শন তো রুটিন কাজ, তার জন্য নিবেদিতার ধরা করা করতে হবে কেন? অথচ করতে হয়, এটাই দস্তুর। দয়া করে তিনি পদধূলি দেবেন, খোশগল্প করে পছন্দ মতো বড়িটা আচারটা নিয়ে চলে যাবেন, ধন্য হবে সুহাসিনী! সরকারি প্রতিনিধির তো মাসে অন্তত একটা মিটিংয়ে উপস্থিত থাকার কথা, সমিতির পক্ষ থেকে তাঁকে নিয়ম করে চিঠিও পাঠানো হয়, কিন্তু ঠিকঠাক তাঁর দর্শন মেলে কি? সারা বছরে একবারই তিনি আবির্ভূত হন। সেই বার্ষিক সাধারণ সভায়। এমন সব সরকারি কর্মচারীদের ওপর নির্ভর করে তবেই না নিবেদিতাদের সমাজসেবার ব্রত উদ্‌যাপন! দপ্তরের এক নগণ্য কর্মচারীও বুঝিয়ে দেয় নিবেদিতা তার দয়ার পাত্র। ভাল লাগে ?

ধীর পায়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন নিবেদিতা। লিফ্‌ট খারাপ, নামতে হল সিঁড়ি বেয়ে। বড্ড গরম আজ, এইটুকুতেই নিবেদিতা ঘেমে নেয়ে একসা। গাড়িতে বসেও রেহাই নেই, সিটটিট আগুন হয়ে আছে তাপে। জৈষ্ঠ্যের সূর্য নিষ্ঠুর তেজে ঝলসাচ্ছে শহরটাকে। খোলা জানলা দিয়ে ঝাপটা আসছে লু।

নিবেদিতার তেষ্টা পাচ্ছিল। অন্যমনস্ক হাত ঘোরাফেরা করল সিটে। ইস, ভুল হয়ে গেছে, জলের বোতলটা আজ নেওয়া হয়নি। সুরেনের কাছে নিশ্চয়ই জল আছে। চাইবেন? ড্রাইভারের জল খেতে নিবেদিতার কোনও অসুবিধে নেই, কিন্তু সুরেন অস্বস্তিতে পড়ে যাবে না তো?

সামান্য ইতস্তত করে চেয়েই ফেললেন, —তোমার জলের বোতলটা একটু দাও তো।

গরমে সুরেনও বেশ কাহিল। শার্টের কলার ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে পিঠের ওপর, বাঁ হাতের তোয়ালে-রুমালে ঘন ঘন মুখ মুছছে। স্টিয়ারিং থেকে অল্প ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, —আমার জল কি খেতে পারবেন? হেববি গরম হয়ে আছে।

—দাও একটু। গলা ভিজিয়ে নিই। সুহাসিনীতে গিয়ে নয় একটা বোতল কিনে নেব ঠান্ডা জলের। এখন পথে আর দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না।

লাল শালুতে মোড়া নিজের বোতলখানা সন্তর্পণে বাড়িয়ে দিল সুরেন৷ দু’ ঢোক খেয়ে বোতলটা পাশেই রাখলেন নিবেদিতা। ফস করে প্রশ্ন করলেন, —তোমাদের পাড়ায় সুনন্দর এক বন্ধু থাকে না? ঝাঁকড়া চুল? ফরসা মতন?

সুরেনের চোখ পলকে রেয়ারভিউ মিররে। বুঝি বা পড়ে নিতে চাইল প্রশ্নটাকে। আয়নায় চোখ রেখেই বলল, —ছোড়দা ওখানে যায়নি মাসিমা।

—কী করে জানলে?

—কাল সন্ধেবেলা ছেলেটার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বললাম ছোড়দা বাড়ি ফেরেনি, শুনে কাঁধ উলটে চলে গেল।

কী সব বন্ধুবান্ধব! বন্ধু বাড়ি ফেরেনি জেনেও ভ্রূক্ষেপ নেই? নাকি এটাই এখনকার ধারা ? যে যার তালে ঘোরে, সঙ্গে থাকার সময়টুকু ছাড়া কেউ কারওর খোঁজ রাখে না!

বেজার মুখে নিবেদিতা বললেন, —ছোড়দার আর কোনও বন্ধুটন্ধুকে চেনো?

—পথেঘাটে অনেককেই তো দেখি ছোড়দার সঙ্গে। কিন্তু তাদের বাড়িটাড়ি তো…

—হুম।

নিবেদিতা আর কিছু প্রশ্ন করলেন না। ক্ষণিকের জন্য মনে হল মা হিসেবে সুনন্দর গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর আর একটু বেশি অবহিত থাকা উচিত ছিল। হয়তো তিনি বৃথাই দুশ্চিন্তা করছেন, সুনন্দ হয়তো গানের দলের সঙ্গে কোথাও প্রোগ্রাম করতে গেছে। মাকে জব্দ করার জন্যই বলে যায়নি। সুনন্দটা বরাবরই খামখেয়ালি। রগচটা। তার পক্ষে সবই সম্ভব।

পুরনো স্মৃতি আবছা দোলা দিয়ে গেল নিবেদিতাকে। স্কুল থেকে মাঝে মাঝেই রাত করে বাড়ি ফিরত সুনন্দ। নির্মলার বাড়ি চলে যেত ছেলে। নির্মলা, মানে সুনন্দর ছোটবেলার আয়া। সাত-আট বছর বয়স পর্যন্ত সুনন্দর দেখাশুনোর ভার ছিল ওই নির্মলার হাতেই। ক্লাস এইট-নাইনে পড়ার সময়েও নির্মলার বাড়ি গিয়ে নাকি সটান শুয়ে পড়ত ছেলে, আর উঠতেই চাইত না। নির্মলাই এসে গল্প করেছে। একদিন সুনন্দ হুল ফোটানোর মতো করে শুনিয়েও দিয়েছিল, নির্মলাকে তার নাকি অনেক বেশি মা মা মনে হয়।

একটা তপ্ত শ্বাস পড়ল নিবেদিতার। বাইরের উষ্ণতর বাতাসে মিশে গেল নিঃশ্বাসটা। তাঁর ছেলেরা বুঝল না আর পাঁচটা নেটিপেটি সংসার করা মহিলাদের সঙ্গে তাদের মাকে এক করে দেখা ঠিক নয়। নিবেদিতা আলাদা। ঘরগেরস্থালি ছেলেপুলে মানুষ করার বাইরেও এই বিশাল পৃথিবীতে মানুষের আরও অনেক কাজ থাকে। অনেক বড় কাজ। নিবেদিতা সেই বৃহত্তর কাজে উৎসর্গ করেছেন নিজেকে। তিনি খেলেও বেড়াচ্ছেন না, ফুর্তিও করছেন না। মানুষের কথাই ভাবছেন, মানুষের জন্য কাজ করছেন। দৈনন্দিন সংসারের তুচ্ছতায় ডুবে যাননি বলে কেন তাঁর ওপর অভিমান করবে তাঁর আপনজনেরা? তাও তো নয় নয় করে সংসারের অনেক চিন্তাই তিনি করেছেন। সুনন্দকেই তো বার বার তিনি চার্টার্ড পড়ার জন্য বলেছিলেন, সে যদি বিদঘুটে গানের জগতে ঢুকে সুখ পায় নিবেদিতা কী করবেন? ধুস্, যে চুলোয় গেছে যাক। নিবেদিতা আর ভাবতে পারছেন না। কোথাও কি এতটুকু শান্তি নেই? এক এক ছেলে এক এক চিজ। অনিন্দ্যর বিয়ে দিয়ে ভাবলেন এবার হয়তো ছেলের মাথা ঠান্ডা হবে, শান্ত ভাবে ঘরসংসার করবে। কোথায় কী? চাকরিবাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি এখন শুয়ে শুয়ে ঠ্যাং নাচাচ্ছেন! কী মিষ্টি একটা বউ এল ঘরে। কথায় কথায় চোটপাট করে তার ওপর! মেয়েটার বাচ্চাকাচ্চা হবে, কোথায় তার একটু যত্নআত্তি করবি, দরকার হলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবি, কোনও দায়িত্ব নেওয়ারই দায় নেই! ছেলে যেন বাপেরও এক কাঠি বাড়া। আর্যও এত নিষ্ঠুর ছিল না, বাচ্চা হওয়ার আগে নিবেদিতার খেয়ালটুকু অন্তত রাখত। বেচারা শরণ্যা সারাক্ষণ এখন মুখ শুকনো করে ঘুরছে। মাকে ছেড়ে কেন যে এখন বউয়ের ওপর মেজাজ করা শুরু হল অনিন্দ্যর? চাকরি নেই বলে ?

শরণ্যার মুখ মনে পড়তেই নিবেদিতার হৃদয়টা দ্রব হয়ে এল। বাড়িতে একমাত্র শরণ্যাই যা সম্মান করে নিবেদিতাকে, চেষ্টা করে বোঝার। মেয়েটার মনটাও ভাল। প্রোজেক্টের কাজে কী-ই বা আহামরি পায়, অথচ প্রথম মাসের টাকা থেকে বাড়ির সকলের জন্য কিছু-না-কিছু নিয়ে এসেছিল। শাশুড়ির জন্য তাঁত কলাক্ষেত্ৰম, শ্বশুরের জন্য পাঞ্জাবি…। মধ্যবিত্ত মনোভাব, তবু বেশ লেগেছিল নিবেদিতার। এ মাসে তো আর এক কাণ্ড, জোর করে দু’ হাজার টাকা গুঁজে দিল নিবেদিতার হাতে, নরম করে বলল, আপনার ছেলের তো এখন কাজকর্ম নেই মামণি, ধরুন আমি ওর হয়েই এই টাকাটা…। বেচারা জানেও না তার স্বামীটি কস্মিনকালে সংসারে ফুটো পয়সাটি ঠেকায় না। কিংবা হয়তো জেনেও না জানার ভান করে টাকা দিল যাতে পরিবারে তার বেকার বরের সম্মানটা থাকে। রোজগার থাকলে টাকা না দিয়েও হাতের গুলি ফোলানো যায়, কিন্তু চাকরিবাকরি না থাকলে সেটা তো হয় না। শরণ্যা নিশ্চয়ই এই সত্যিটা বোঝে। মেয়েটার এই আত্মমর্যাদাবোধ যদি নিবেদিতার একটা ছেলের মধ্যেও থাকত।

গলাটা আবার শুকিয়ে গেছে। বোতলের ছিপি খুলে ফের একটু কণ্ঠনালী ভেজালেন নিবেদিতা। সুহাসিনীর গেটে পৌঁছোনো পর্যন্ত চোখ বুজে হেলান দিয়ে রইলেন সিটে। নেমে অফিসঘরে ঢোকার আগে থমকালেন সামান্য। ভেতরে দময়ন্তীর গলা পাওয়া যাচ্ছে না?

একা দময়ন্তী নয়, আরও কয়েকজন এসেছে আজ। অর্চনার টেবিল ঘিরে রীতিমতো চাঁদের হাট। দময়ন্তীই একা বকে যাচ্ছে, বাকিরা সবাই মুগ্ধ শ্রোতা।

নিবেদিতাকে দেখেই দময়ন্তী বলে উঠল, —এসে গেছেন নিবেদিতাদি? আপনার জন্য আমরা কতক্ষণ ধরে ওয়েট করছি।

রুমালে ঘাড় গলা মুছতে মুছতে অর্চনার পাশের চেয়ারটিতে বসলেন নিবেদিতা, —কেন, আমায় কী দরকার পড়ল?

—বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে আমি একটা প্রস্তাব রাখছিলাম। রিগার্ডিং ফান্ড তোলা।

—কী প্রস্তাব?

—লোকের দরজায় দরজায় আর কত হাত পাতব?

—হাত পাতাই তো আমাদের কাজ ভাই। নিবেদিতা মৃদু হাসলেন, —আমার ভাণ্ডার আছে ভরে, তোমা সবাকার ঘরে ঘরে।

—এটা ওল্ড কনসেপ্ট নিবেদিতাদি। সমাজসেবার কাজটাও আজকাল প্রফেশনালি করতে হয়। আই মিন, কাউকে বেশি বিরক্ত না করে…বোঝেনই তো যারা টাকা দেয়, সবাই তো আর উচ্ছ্বসিত হয়ে দেয় না… ধরুন যদি একটা গ্যালা এন্টারটেনমেন্ট প্রোগ্রাম করা যায়… লোকেও এনজয় করল, এক লপ্তে সুহাসিনীর ফান্ডেও মোটা টাকা এসে গেল!

দীপালি বলে উঠল, —দময়ন্তীর আইডিয়াটা কিন্তু মন্দ নয় নিবেদিতাদি। বহু প্রতিষ্ঠানই তো আজকাল ফাংশান করে টাকা রেজ করছে।

নিবেদিতার ভুরুতে ভাঁজ পড়ল, —খুব লাভ হবে কি? ফাংশান তো আমরা করেছি কয়েকবার। নতুন বিল্ডিং তোলার আগে রবীন্দ্রসদনে গানের প্রোগ্রাম করলাম না? সুচিত্রা মিত্র এলেন, সুবিনয় রায় এলেন… আলটিমেটলি কত টাকা লাভ হল, বলো? দু’মাস ধরে টিকিট বিক্রি করলাম, খরচখরচা বাদ দিয়ে হাতে এল সাকুল্যে হাজার আঠেরো-উনিশ। ওই টাকায় তো বৃদ্ধাশ্রমের ভিতও হবে না।

—আমরা ও রকম ছোটখাটো ফাংশানের কথা ভাবছি না নিবেদিতাদি। বড় করে কিছু করার কথা বলছি।

—কী রকম?

—যদি মুম্বাই থেকে আর্টিস্ট এনে প্রোগ্রাম করি? বড় কোনও জায়গায়? যেমন ধরুন নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে?

—হিন্দি নাচগান? নিবেদিতা নাক কুঁচকোলেন, —বৃদ্ধাশ্রমের জন্যে?

—দোষের কী আছে? নাচ গান ইজ নাচ গান, তার আবার হিন্দি বাংলা কী? দময়ন্তী নড়েচড়ে বসল। এই গরমেও সিলকের শাড়ি পরেছে দময়ন্তী। বয়স তার চল্লিশ ছুঁই ছুঁই, দেখে অবশ্য আরও কম মনে হয়। মোমে মাজা মসৃণ ত্বক, তীক্ষ্ণ নাক, টানা টানা চোখ, তুলিতে আঁকা ভুরু— রূপসি দময়ন্তী ভিড়ের মাঝেও আলাদা করে চোখ টানে। নিজের রূপ সম্পর্কে সে যথেষ্ট সচেতনও। মরালীর মতো গ্রীবা হেলিয়ে দময়ন্তী বলল, —বাঙালি উন্নাসিকতাগুলো ছাড়ুন নিবেদিতাদি। মহৎ উদ্দেশ্যে যে কোনও ধরণের অনুষ্ঠানই আমরা করতে পারি।

দময়ন্তীর বাগভঙ্গিটা পছন্দ হল না নিবেদিতার। মতটাও মানতে পারলেন না পুরোপুরি। ক্যানসার হসপিটালের সাহায্যার্থে ক্যাবারে নাচ কি বিধেয় ? মহৎ উদ্দেশ্যের সঙ্গে কী রুচিবোধের কোনও সম্পর্কই নেই?

অর্চনা ফস করে মন্তব্য করলেন, —ফাংশনে সব রকমের গানই থাকতে পারে। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, হিন্দি গান… সব ধরনের দর্শকই এনজয় করবে।

দময়ন্তী বলল, —মুম্বাই আর্টিস্ট বলতে বাঙালি শিল্পীই থাকবে। কুমার রবীন, পল্লবী সেন…

সুপ্রিয়া বললেন, —কুমার রবীন তো নজরুলগীতিও ভাল গায়।

অর্চনা বললেন, —কুমার রবীনের তো দারুণ ক্রেজ এখন! তার তো রেটও অনেক।

—বললাম যে ওগুলো কোনও ফ্যাক্টরই নয়। দময়ন্তী গর্বিত মোরগের মতো নিবেদিতাকে দেখল এক ঝলক, —এগজিকিউটিভ কমিটি শুধু ব্যাপারটা অ্যাপ্রুভ করে আমার ওপর ছেড়ে দিক, কুমার রবীনকে আনার দায়িত্ব আমার। এই তো মাস তিনেক আগে আমার কর্তা কুমার রবীনের বাবার গল ব্লাডার অপারেশান করেছে। আপনারা কুমার রবীনের ফ্যান, আর কুমার রবীন আমার বরের ফ্যান। কলকাতায় এলে ফোন করবেই। ও একবার মুখ ফুটে বললে কুমার রবীন শত ব্যস্ততার মাঝেও এসে প্রোগ্রাম করে যাবে। আর সে এলে পল্লবী সেন তো কোনও ব্যাপারই নয়।

দীপালি বলল, —তা হলে তো আমাদের এখন থেকেই নেতাজি ইনডোরের জন্য চেষ্টা চালাতে হয়। নিশ্চয়ই শীতকালে হচ্ছে ফাংশানটা?

—হ্যাঁ, ডিসেম্বর জানুয়ারিই বেস্ট টাইম। ক্রাউড পাওয়া যায়। ওই সময়ে বৃদ্ধাশ্রমের কাজও শুরু হবে, হাতে টাকাও…

—টিকিট কত করে করা যায়?

—মিনিমাম একশো। অবশ্য অল্প কিছু পঞ্চাশ রাখলেও ভাল হয়।

সকলেই উৎসাহী মতামত দিয়ে চলেছে। নিবেদিতার মনে হল তিনি যেন ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছেন, তাঁর উপস্থিতি কেউ গ্রাহ্যের মধ্যেই আনছে না। যেন সবকিছুই স্থির হয়ে গেছে, তাঁর মতামত এখন নেহাতই মূল্যহীন। বৃদ্ধাশ্রমের জমির জন্য শেষের দিকে প্রায় লাখ দেড়েক টাকা কম পড়েছিল, ধূর্জটি পাইন টাকাটা দিয়ে দিয়েছিল, তাই কি ধরাকে সরা জ্ঞান করার অধিকার জন্মে গেছে দময়ন্তীর?

নিবেদিতা আর নীরব থাকতে পারলেন না। স্বভাববিরুদ্ধ ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলেন, —থামো, থামো। সুহাসিনীতে একটা কন্সটিটিউশান আছে। এখানে কাজকর্মের একটা ধারা আছে। এমন একটা করার আগে সমস্ত সদস্যের মতামত নেওয়া উচিত।

—আপনি কি অ্যানুয়াল জেনারেল মিটিংয়ের কথা বলছেন? ওখানে পাশ হয়ে যাবে।

—আগে হোক। তারপর নয় আলোচনা কোরো।

সবাই চুপ। ঘর অস্বাভাবিক রকমের থমথমে। কেউই যেন তাঁর বিরুদ্ধাচরণ পছন্দ করছে না। হঠাৎ স্বাগতা বলে উঠলেন, —নিবেদিতাদি কিন্তু ঠিকই বলেছেন। সুহাসিনীর ভাল কিছু হলে নিবেদিতাদিই তো সব থেকে খুশি হবেন। তবে ডেকোরামগুলোও তো মানতে হবে। কেউ একটা প্রস্তাব দিল, সঙ্গে সঙ্গে সবাই নাচতে শুরু করল…

সুপ্রিয়া বললেন, —জেনারেল মিটিং মানে কিন্তু সেপ্টেম্বর। তারপর ফাংশান অরগ্যানাইজ করা কিন্তু মুশকিল হবে।।

—হলে হবে। একটা ফাংশান না হলে বৃদ্ধাশ্রম বন্ধ হবে না।

—এ তো ব্যাগড়া দেওয়া পলিসি।

—ল্যাঙ্গুয়েজটা ঠিক করা দীপালি।

উত্তেজনা আর বেশি বাড়াবার আগে দময়ন্তীই দু’হাত তুলে থামাল। মুখে একটা স্বর্গীয় হাসি ফুটিয়ে বলল, —ও কে। ও কে। তিন-চার মাস পরেই নয় প্ল্যান হবে। একবার যখন করব বলে ঠিক করেছি, কিছু একটা তো করবই। যতই হোক এর সঙ্গে আমাদের বৃদ্ধাশ্রমের ইন্টারেস্ট জড়িত।

নিবেদিতার আর ভাল লাগছিল না। কেন যেন মনে হচ্ছে সুহাসিনীর ওপর তাঁর কর্তৃত্বের রাশ আলগা হয়ে আসছে ক্রমশ। এই কাকলি দীপালিরা একসময়ে কী অসম্ভব অনুগত ছিল তাঁর। অর্চনাকে তো তিনি প্রায় হাতে ধরে সেক্রেটারির চেয়ারে বসিয়েছেন। আজ তারাও কেন অন্য সুরে গায়?

নিবেদিতা কি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন না? পিছিয়ে পড়ছেন? সঙ্গীসাথীরা কি তাঁকে পুরনোপন্থি ভাবছে?

বাড়ি ফেরার পথেও সুহাসিনীর চিন্তাতেই ডুবে রইলেন নিবেদিতা। নাহ্, দময়ন্তীর কাছে হেরে যাওয়া চলবে না, নতুন করে জমি তৈরি করতে হবে সুহাসিনীতে। প্রত্যেকটি সদস্যের সঙ্গে তিনি নিজে যোগাযোগ করবেন। বোঝাবেন, দময়ন্তী সত্যিই সুহাসিনীর ভাল চায় না, ক্ষমতা গ্রাসই তার একমাত্র লক্ষ্য। কীসে সুহাসিনীর ভাল হতে পারে, কীসে বা মন্দ হওয়ার সম্ভাবনা তাও তিনি সমঝাবেন সবাইকে। দময়ন্তীকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার সুহাসিনী এখনও নিবেদিতারই।

ঘরে এসে শাড়ি বদলে একটুক্ষণ বিছানায় ঝুম হয়ে বসে রইলেন নিবেদিতা। সন্ধে নামছে। বাইরে আলো এখনও মরেনি পুরোপুরি, তবে অন্দরে আবছা আঁধার। নিবেদিতার মনেও দুলছে আলোছায়া। হিসেব কষছেন কাকে কাকে পুরো জপিয়ে ফেলেছে দময়ন্তী, কী ভাবে তাদের নতুন করে হাতে আনা যায়। কিছুটা টাকার জোর থাকলেও মেয়েটার সঙ্গে পাঞ্জা কষা সহজ হয়। কবে যে শোভাবাজারের বাড়িটা বিক্রি হবে? মিনু যদি এসে যায়, সেপ্টেম্বরে টাকাটা হাতে এসে যাবে। তেমন বুঝলে ওখান থেকেই লাখ খানেক সুহাসিনীতে ডোনেট করে সাধারণ সদস্যদের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করা যায়। জোর গলায় তখন বলতে পারেন, আসুন আমরা নিজেরাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ওল্ডহোমটা গড়ে তুলি, ওসব চটুল ধ্যাতাং ধ্যাতাং নাচাগানা করে সুহাসিনীর ঐতিহ্যে কালি ছেটানোর প্রয়োজন নেই।

কিন্তু মিনু ফিরছে তো। যদি ফের ঝুল দেয়? একবার সোনাদাকে কি ফোন করবেন নিবেদিতা? সেদিন মুখের ওপর নগ্ন সত্যিটা শুনিয়ে দেওয়ায় সোনাদা রীতিমতো চটিতং, আর যোগাযোগই করছে না। অবশ্য নিবেদিতার তাতে বয়েই গেল। তিনি করবেন কেজো ফোন, অন্যের মান অভিমান নিয়ে ভাবার তাঁর দায় নেই।

দরজায় ছায়া। পরদার ওপারে ভারী গলা, —আসব?

নিবেদিতা চমকে তাকালেন। হঠাৎ আর্য এ ঘরে?

নিরাবেগ গলায় নিবেদিতা ডাকলেন, —এসো।

ভেতরে ঢুকে টিউবলাইটটা জ্বালিয়েছেন আর্য। ফ্যাটফেটে আলোয় ঘরটা ভরে গেল। গলা ঝেড়ে আর্য বললেন, —একটা কথা ছিল।

—বলো।

—তোমার ছোট ছেলের সন্ধান কিছু পেলে ?

বুকটা ধক করে উঠল নিবেদিতার। ছি ছি, সুনন্দর কথা তিনি ভুলেই গেছিলেন! নিজের ওপর ক্ষোভটা উলটো ভাবে ফুটে বেরোল। হৃদয়ের গহনে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগটা ঠিকরে এল ব্যঙ্গ হয়ে, —তুমি তা হলে ছোট পুত্রের না ফেরার খবরও রাখো? স্ট্রেঞ্জ!

আর্য থমকালেন সামান্য। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, —কী করব, ইন্দ্রিয়গুলোকে তো অচল করতে পারিনি। কান আছে শুনতে পাই, চোখ আছে দেখতে পাই।

—তারপর ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকো, তাই তো ?

—উপায় কী? হাত-পা ছুড়লেই কি তোমার ছেলেদের নাগাল পাব ?

—তা হলে আর ভাবছ কেন? গর্তে ঢুকে বসে থাকো। মনের দুঃখে বোতল খোলা।

—তাই তো করি। আমার তো সবই সয়ে গেছে। নেহাত মেয়েটা বার বার এসে বলছে…

—কে মেয়েটা?

—শরণ্যা। এ বাড়ির ধারায় এখনও রপ্ত হতে পারেনি, তাই টেনশান করছে। বলছিল, মামণির সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল… দিনকাল বড় খারাপ… আমার কিন্তু ভাল ঠেকছে না বাবা।

মা-ছেলের কাজিয়াই যে সুনন্দর গৃহত্যাগের কারণ এ তো নিবেদিতাও জানেন। কিন্তু শরণ্যার মতো একটা নবাগত মেয়ে কেন এ ব্যাপারে নাক গলাবে? তাও আবার আলোচনা করছে কার সঙ্গে? না আর্যর সঙ্গে! এতে কি নিবেদিতার অহংয়ে লাগে না?

চড়াং করে মাথা গরম হয়ে গেল নিবেদিতার। বিকৃত স্বরে বলে ফেললেন, —দু’দিন এসেই এত দরদ ? আশ্চর্য!

—ও ভাবে বলছ কেন? সেও তো এখন বাড়ির একজন। ভাবনা তো তার হতেই পারে।

—বেশি আহ্লাদিপনা কোরো না তো৷ নিবেদিতা ফের ঝামরে উঠলেন, —শাশুড়ি দেওর নিয়ে ও মেয়ের এখন না ভাবলেও চলবে। নিজেরটা আগে নিজে সামলাক।

কথাটা কি একটু বেশি জোরে বললেন নিবেদিতা? পরদার ওপাশ থেকে একটা ছায়া সরে গেল না? শরণ্যা নয় তো? মেয়েটা কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল তবে?

নিবেদিতা স্থির হয়ে গেলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%