চোদ্দো

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

অর্চনার সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষ হতেই দময়ন্তী নিচু গলায় বলল, —আমি কি কিছু বলতে পারি নিবেদিতাদি?

ডায়াসে পাশাপাশি পাঁচখানা চেয়ার। নিবেদিতা বসেছেন মধ্যমণি হয়ে। সুহাসিনীর বার্ষিক সাধারণসভা প্রায় সমাপ্তির মুখে, একটু আগে চুকে গেছে নির্বাচনপর্ব। এখনও নিবেদিতার বুকে টাইফুন, তবে বাইরে তিনি অচঞ্চল। মাথা নেড়ে বললেন, —হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। বলো।

একদম ধারের চেয়ারটি ছেড়ে সপ্রতিভ ভঙ্গিতে উঠল দময়ন্তী। টুকরো হাসি উপহার দিল স্টেজে উপবিষ্ট দীপালি আর সুপ্রিয়াকে। স্টেজের টেবিলে হাইব্রিড রজনীগন্ধার ঝাড়, মাইক্রোফোন অভিমুখে যাওয়ার সময়ে মহার্ঘ ক্রেপসিল্ক শাড়ির আঁচলের ছোঁয়ায় ফুলদানিটা উলটে যাচ্ছিল, ধরে স্বস্থানে বসিয়ে দিয়েছে। আঁচল কোমরে পেঁচিয়ে গলা ঝাড়ল একটু। তারপর রিনরিনে গলায় বক্তৃতা শুরু করেছে, —আমার আগে আমাদের সুহাসিনীর সম্পাদিকা অর্চনাদি যা বলে গেলেন, তারপর আমার আর কিছুই বলার নেই। তবু নতুন কর্মসমিতিতে কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হওয়ার পর আপনাদের দুটো-একটা কথা বলার লোভ আমি সামলাতে পারছি না। আমরা সবাই মিলে এই সুহাসিনীতে মিলেছি কীসের জন্যে? গরিব দুঃখী অনাথা অবহেলিতা অত্যাচারিতা মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে চাই আমরা। তাদের কষ্টের বোঝা কিছুটা লাঘব করতে চাই। পূর্বতন কর্মসমিতি যে ভাবে ঐকান্তিক নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজ করে গেছেন, তার কোনও তুলনা নেই। নতুন কর্মসমিতিও সেই নিষ্ঠার ধারাটিকে বজায় রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করবে। ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে আপনারা ধরিয়ে দেবেন এবং আশা করব আপনারা সকলেই আমাদের পাশে থাকবেন। আমাদের পাশে মানে সুহাসিনীর পাশে। সুহাসিনীতে আমরা নতুন রক্ত আনতে চাই। সুহাসিনীর কাজে আমরা আরও গতি আনতে চাই। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুহাসিনীকে আমরা আরও বড় করতে চাই। আপনাদের সকলের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া এই কাজ সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় আশার কথা, আমাদের সভানেত্রী, আমাদের সবার প্রিয় শ্রদ্ধেয়া নিবেদিতাদি আমাদের মাথার ওপর আছেন। নিবেদিতাদি সুহাসিনীর প্রাণ। নিবেদিতাদি ছাড়া সুহাসিনী অচল। ইদানীং কিছু কিছু পারিবারিক সমস্যায় তিনি যথেষ্ট বিব্রত আছেন বটে, তবু তিনি প্রবল ভাবেই আমাদের মধ্যে আছেন। অত্যাচারিতা মেয়েদের কথা তাঁর মতো করে আর কে ভাবতে পারবে? তাঁর মতো একজন সমাজসচেতন মহীয়সী মহিলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা…

গায়ে যেন জলবিছুটি লাগছিল নিবেদিতার। কুটকুট করছে সর্বাঙ্গ, জলে যাচ্ছে গা। তাঁকে নির্মম ভাবে হারিয়ে দিয়েও তৃপ্তি হয়নি, এখনও চিমটি কাটা কথা বলে যাচ্ছে ওই মেয়ে! তাঁর পারিবারিক সমস্যা নিয়ে সহানুভূতি দেখাচ্ছে, অথচ ঘুরে ঘুরে ওই মেয়েই সর্বত্র রাষ্ট্র করে বেড়িয়েছে তাঁর পরিবারের কেচ্ছা! দুঃখী মেয়েদের জন্য নিবেদিতাদির চোখ দিয়ে টসটস জল পড়ে, আর ওদিকে বাড়িতে নিজের ছেলের বউকেই তিনি প্রোটেকশন দিতে পারেন না। শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ করেই তাঁকে জব্দ করে ফেলল! পুরো প্যানেলটাই হেরে গেল নিবেদিতার! সংবিধান পালটাতে পারলে তাঁকেও হয়তো সুহাসিনী থেকে ছুড়ে ফেলে দিত ওই মেয়ে। আর থেকেই বা তিনি এখন কী করবেন? দময়ন্তীরা তো ইচ্ছে মতন কাজ করবে, কত তিনি বাধা দেবেন?

এখনও দময়ন্তী থামেনি। তার স্বর উঠছে, নামছে। আবেগঘন গলায় বলল, —আমাদের বৃদ্ধাশ্রমের কাজ আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবই। আশা করছি দু’বছর পর কর্মসমিতির পরবর্তী নির্বাচনের ঢের আগেই আমরা বৃদ্ধাশ্রমের কাজ সম্পূর্ণ করতে পারব। এ প্রসঙ্গে একটা খবর উল্লেখ না করে পারছি না। আপনারা হয়তো অনেকে জানেনও, তবু বলি, বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য নিবেদিতাদি সম্প্রতি এক লাখ এক টাকা দান করেছেন। আসুন, আমরা করতালি দিয়ে নিবেদিতাদিকে সকলে অভিনন্দন জানাই…

ওফ্, নিবেদিতা কেন যে বধির হয়ে যাচ্ছেন না! হাততালি নয়, যেন কানের পরদায় উচ্চিংড়ে লাফাচ্ছে! সোনাদার পিছনে লেগে থেকে থেকে, কত ঝামেলা হুজ্জোত করে বাড়িটা বেচা হল, তার থেকে পুরো এক লাখ দিয়েও এখন ঠুঁটো হয়ে বসে থাকতে হবে নিবেদিতাকে?

মিটিং ভাঙল প্রায় চারটেয়। সাধারণ সদস্যরা উঠে পড়েছে চেয়ার ছেড়ে, ছোট ছোট জটলায় গুলতানি চলছে। এই ধরনের সভা অনুষ্ঠানে সকলের সঙ্গে সকলের দেখা হয়ে যায়, তাই পরিবেশটাই বেশ আনন্দঘন। টুং টাং হাসি নেচে বেড়াচ্ছে সুহাসিনীর হলে।

মঞ্চ থেকে নামার আগে নিবেদিতা সোমশংকরের ছবিটার দিকে তাকালেন। টাটকা জুঁইয়ের গোড়ে মালা ঝুলছে। ফুলের বেষ্টনীতে বাবার হাসিমুখ। ঠাঁট্টার মতো লাগছিল হাসিটাকে। বাবাও কি নিবেদিতার পরাজয়ে খুশি ?

সুহাসিনীর একতলার ঘরগুলো আজ ফাঁকা। বার্ষিক সাধারণসভা উপলক্ষে মেয়েদের আজ ছুটি। দোতলায় গানবাজনার রিহার্সাল চলছে, আওয়াজ ভেসে আসছিল। মহালয়ার দিন একটা জলসা মতন হবে। শারদোৎসব। মেয়েরাই করবে। সময় আর বেশি নেই। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিবেদিতার মনে হল একবার ওপরে ঘূরে আসেন। মেয়েরা তাঁকে দেখলে উৎসাহ পাবে। কতক্ষণ আর দঙ্গলের মাঝে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন?

তবু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন নিবেদিতা। কে কী ভাবে! এমনিতেই তো প্রতিটি চোখ আজ কেমন অন্য রকম ঠেকছে! হয়তো মনের ভুল, হয়তো এখনও তাঁর শ্রদ্ধার আসনটা টলেনি, তবু একটা কাঁটা যেন ফুটছেই। নীরবে বেরিয়ে এলেন একসময়ে। পায়ে পায়ে হাঁটছেন। অন্য মনে। কখন যেন রান্নাঘরের দিকটায়।

রেখা তাঁকে দেখেই বেরিয়ে এসেছে, —কী গো নিবিদি, সব সাঙ্গ হল?

নিবেদিতা মনে মনে বললেন, সাঙ্গই বটে।

মুখে বললেন, —এত তাড়াতাড়ি কী? এখন কত গপ্প হবে, আড্ডা হবে…

—আমার মাছের চপটা আজ কেমন হয়েছিল?

—খুব ভাল। খুব প্রশংসা হয়েছে। পুরি আলুরদমও চমৎকার।

—বেশি করে টোমাটো দিয়ে সোয়াদ এনেছি।

—হ্যাঁগো, দীপ্তি কোথায়? দেখছি না?

—এই তো ছিল।… বোধহয় রিহাস্যালের ওখানে গেছে।

—ওকে বলে দিয়ো আলপনাটা আজ খুব সুন্দর হয়েছিল।

—তুমি তো সবই সুন্দর দেখো নিবিদি। তোমার কাছে তো সবই ভাল। আমরা সবাই ভাল। বলেই রেখা কানের কাছে মুখ এনেছে। প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, —নিবিদি, এসব কী শুনছি গো?

—কী?

—সবাই বলাবলি করছে তুমি নাকি হেরে গেছ?

নিবেদিতা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। এই প্রথম কেউ তাঁকে সরাসরি কথাটা বলল! তাও সখীরা নয়, সঙ্গীরা নয়, বলল কিনা এই রেখা? কৃত্রিমতার পালিশ নেই বলেই বুঝি সত্যিটা এ ভাবে উচ্চারণ করতে পারল।

জোর করে হাসলেন নিবেদিতা। বললেন, —দূর হার জিত আবার কী? আমরা সবাই মিলে কাজ করি, একদল আসবে, একদল যাবে, এটাই তো নিয়ম। ওরা নতুন, ওরা অনেক ছোটাছুটি করে কাজ করতে পারবে, কীসে তোমাদের আরও ভাল হয় ভাববে…। তা ছাড়া আমি তো থাকছিই।

—ও। তুমি আছ? কৃষ্ণা আমায় যা ভয় দেখিয়ে দিয়েছিল।

—ভয় পেলে চলবে কেন? আমারও তো বয়স হচ্ছে, একসময়ে না একসময়ে বিশ্রাম তো নিতেই হবে।

—হ্যাঁ, আমাদের তো এবার ধীরে ধীরে যাওয়ার পালা। সময় হয়ে এল। রেখার মুখে ছায়া পড়ল। নিবেদিতাকে দেখতে দেখতে বলল, —সত্যি তোমার চেহারাটা হঠাৎ খুব ভেঙে গেছে গো।

—মানছ? বুড়ো তা হলে হয়েছি?

—না গো নিবিদি, বুড়ো নয়, অন্য রকম। রেখা ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল, —তোমার বউটা তা হলে আর ফিরল না?

—বনিবনা যখন হচ্ছে না, পৃথক হয়ে যাওয়াই তো ভাল। নিবেদিতাকে নিস্পৃহ দেখাল।

—মেয়েটা খাসা ছিল গো…

রেখার যেন আরও কিছু বলার ছিল, কিন্তু চুপ করে গেছে সহসা। নিবেদিতাও আর কথা বাড়ালেন না, মাথা নাড়তে নাড়তে সরে গেলেন। শরণ্যার ওপর রাগটা আবার ফিরে আসছিল। ওই মেয়েটার জন্যই তো আজ হারতে হল নিবেদিতাকে। অথচ ওই মেয়েকেই তিনি কিনা সুহাসিনীতে তাঁর উত্তরসূরী ভেবে রেখেছিলেন! একটু ট্যাক্টফুল হতে পারল না মেয়েটা? সামলে রাখতে পারল না খ্যাপা ছেলেটাকে? উলটে কী অসভ্য ব্যবহার! গয়নাগুলো ওই মিচকে কাকাটাকে দিয়ে ফেরত পাঠাল, সঙ্গে চিরকুট—ওজন মেপে দেখে নেবেন! আশীর্বাদের গিনিটাও পাঠালাম, বুঝে নেবেন! হাতের লেখাটা শরণ্যারই। নিবেদিতা চেনেন। আশ্চর্য, তাঁকেও শত্ৰু ঠাওরাল শরণ্যা? ছেলের যাতে বিপদ না হয় সেইটুকুই তো তিনি শুধু দেখেছেন! ছেলেকে ঘাড় ধরে মা হাজতে ভরলে তোর কি খুব পুলক হত? তুই নিজে মা হলে পারতিস? কত আশা নিয়ে তোকে ঘরের বউ করে এনেছিলাম, কী প্রতিদানটা দিলি তুই?

অর্চনা আর দময়ন্তী গল্প করতে করতে এদিকেই আসছে। নিবেদিতাকে দেখে হাঁটার গতি বেড়ে গেল যেন। সেক্রেটারি আর ট্রেজারারে মাখো মাখো জুটি তৈরি হয়েছে তো!

সামনে এসে দময়ন্তী আহ্লাদি সুরে বলল, —আপনাকেই খুঁজছিলাম নিবেদিতাদি।

—হঠাৎ?

—আপনার একটা অ্যাপ্রুভাল দরকার ছিল।

—কীসের?

—স্বাগতাদি আর কাকলিদিকে অ্যাডভাইসারি বডিতে নিতে চাই। আপনার কি অমত আছে?

কী বিচ্ছু মেয়ে! স্বাগতা কাকলি তাঁর প্যানেলে ছিল, দময়ন্তী এখন তাদেরও গিলতে চায়! এবং সিদ্ধান্তটাও নিয়েই ফেলেছে। নিবেদিতার এখন পাঁচন না খেয়ে উপায় কী!

তবু নিবেদিতা চোখ টেরচা করলেন, —ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, ওঁরা তো খুব রাজি। একটু দোনামোনা করছেন… আপনি কী বলেন না বলেন…

নিবেদিতা শ্বাস গোপন রেখে বললেন, —ওমা, ওরা রাজি থাকলে আমার কীসের আপত্তি?

—অনুমতি দিচ্ছেন তা হলে?

—নিশ্চয়ই। সবাই দলাদলি ভুলে কাজ করবে এটাই তো কাম্য।

—বটেই তো। আমরা সবাই এক। আমরা সবাই সুহাসিনীর জন্য, বলুন?

—হুঁ।

অর্চনা পাশ থেকে বললেন, —কয়েকটা দরকারি সইটই করার ছিল নিবেদিতাদি। আজ করবেন?

—আজ থাক। কাল হবে। আজ একটু বাড়িতে কাজ…

কিছুই ইচ্ছে করছে না। কিচ্ছু ভাল লাগছে না। জীবনে এই প্রথম নিবেদিতার এক পলও তিষ্ঠোতে মন চাইছিল না সহাসিনীতে।

গেটের ভেতরে গাড়ির লাট লেগে গেছে। সুহাসিনীর বেশিরভাগ সদস্যই গাড়ির অধিকারিনী, ভেতরে জায়গা না পেয়ে অনেকেই এদিক ওদিক গলিতে রেখেছেন নিজস্ব যান। নিবেদিতা অবশ্য সকাল সকালই এসেছিলেন, তাঁর অ্যাম্বাসাডার অপেক্ষা করছে অন্দরেই।

নিবেদিতা গিয়ে দেখলেন সুরেন গাড়িতে ঘুমোচ্ছ। প্রমীলাকুলের কর্মকাণ্ডে সে কোনও দিনই তেমন উৎসাহী নয়। চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠল। আড়মোড়া ভাঙছে।

সিটে বসে নিবেদিতা জিজ্ঞেস করলেন, —খেয়েছ?

—বাইরে থেকে ভাত খেয়ে এসেছি।

—কেন, পুরি আলুরদম খেলে না?

—দুপুরে পোষায় না। অম্বল হয়। সুরেন স্টার্ট দিল, —সোজা বাড়ি?

নিবেদিতা, —না। অন্য কোথাও চলল।… গঙ্গার ধারে।

যৎপরোনাস্তি অবাক হয়েছে সুরেন। ঘুরে একবার দেখে নিল মালকিনকে। গেটের বাইরে এসেই বলল, —তেল নিতে হবে কিন্তু।

—কালই তো ভরলাম তেল!

—তারপর তো কত জায়গায় গেলেন। নিউআলিপুর টালিগঞ্জ যাদবপুর…

ক’দিন ধরেই চরকি খাচ্ছেন নিবেদিতা। সদস্যদের বাড়ি বাড়ি। টেলিফোনের চেয়ে সামনে গিয়ে বোঝাতে সুবিধে হয় বেশি। কী লাভ হল?

অপ্রসন্ন স্বরে নিবেদিতা বললেন, —একদম নেই?

—শুধু গঙ্গার পাড়ে গেলে কুলিয়ে যেতে পারে।

—তা হলে চলো।

সুরেনের চোখ গাড়ির আয়নায়, —মারুতিটা কেনার কী হল মাসিমা ?

নিবেদিতা জবাব দিলেন না।

—কিনলে কিন্তু ওই মারুতিটাই… সেদিন যেটা গ্যারেজে দেখলেন।

এবারও সাড়াশব্দ নেই।

—বুঝছেন তো কোনটা বলছি? ছাই রং… ডাক্তার নিজে চালাত…।

—তুমি চুপচাপ চালাবে? নিবেদিতা হঠাৎই ঝেঁঝে উঠেছেন, —খালি বকবক! খালি বকবক!

ধমক খেয়ে থমকেছে সুরেন। মুখে কুলুপ আঁটল, অবতল আয়নায় পড়তে চাইছে মালকিনের মুখ। নিবেদিতা হেলান দিয়েছেন সিটে। চোখ বুজছেন, চোখ খুলছেন। দৃষ্টি কখনও ঊর্দ্ধপানে, কখনও বা নেমে আসে মাটিতে।

শরৎ এসে গেল। বিকেলের নীল আকাশে সাদা সাদা ছোপ। সরে সরে যাচ্ছে সাদারা। দ্রুত। পরশু বিশ্বকর্মা পুজো, আকাশে ঘুড়ির মেলা। শহর জুড়ে বাঁশের খাঁচা। এবার পুজো আগে, সামনের সপ্তাহে মহালয়া, শুরু হয়ে গেছে বড় বড় প্যান্ডেল বাঁধার কাজও। বাতাসে ভাসছে হালকা ছুটির আমেজ। দোকানপাটে থিকথিকে ভিড়, উপচোননা মানুষে থমকে থমকে যাচ্ছে যানবাহন।

জাজেসঘাটের পাশটিতে এসে গাড়ি দাঁড় করালেন নিবেদিতা। ছোটবেলায় এক এক দিন বায়না চাপত, দুপুরে গাড়ি পাঠিয়ে দিতেন সোমশংকর, কোর্ট ছুটি হওয়ার আগেই নিবেদিতা চলে আসতেন বাবার কাছে। এই ঘাটটা খুব পছন্দ ছিল সোমশংকরের, মেয়েকে নিয়ে এখানেই হাওয়া খেতে আসতেন ছুটির পর। দেখাতেন জাহাজ-নৌকো-স্টিমার-বয়া, জোয়ার ভাঁটার আশ্চর্য লীলা।

সেই স্মৃতি কি টেনে আনল নিবেদিতাকে? হয়তো।

ঘাটে সিমেন্টের বেঞ্চি, বসলেন নিবেদিতা। লাল সূর্য ডুবছে, ওপারে বাড়িঘরের সিল্যুয়েট। হাওয়া বইছে, কখনও স্নিগ্ধ, কখনও হুহু। বাতাসের ঝাপটায় চুল উড়ছে নিবেদিতার। শেষে দময়ন্তীর কাছে হেরে গেলেন তিনি? সেই সেদিনের মেয়েটা? সুহাসিনীই যদি চলে যায়, তবে নিবেদিতার আর রইলটা কী? এখন থেকে দময়ন্তীদের প্রতিটি কাজে অসুবিধের সৃষ্টি করলে কেমন হয়? প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর তো ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা আছেই, প্রতি পদে দুর্লঙ্ঘ্য পাঁচিল হয়ে দাঁড়াতে পারেন। অতিষ্ঠ করে তুলবেন দময়ন্তীদের?

গঙ্গার গেরুয়া জলে ভাঁটির টান। খড়কুটো কচুরিপানা নিয়ে স্রোত চলেছে সাগরের পানে। মাঝে মাঝে আটকে যায় ঘূর্ণিপাকে, আবার এগোয়। মাঝগঙ্গায় জল কাটছে লঞ্চ, ঢেউ এসে ঠেকছে পাড়ে। দুলছে।

এই তো জীবন। এই ঘূর্ণিপাক। এই স্রোতে ভেসে চলা। এই ঢেউয়ের ওঠাপড়া।

সূর্য অস্ত গেল। ক্ষণিকের জন্য লাল আভা লেগেছিল জলে, এখন জল মলিন ক্রমশ। রাগটাও যেন থিতোচ্ছে একটু একটু করে। রাগ, না ঈর্ষা? তাঁর অধিকারে ভাগ বসাচ্ছে বলেই কি তিনি দময়ন্তীকে সহ্য করতে পারছেন না? সুহাসিনী কবজায় থাকবে না বলে তিনি সুহাসিনীর ক্ষতির চিন্তাও করতে পারলেন? দময়ন্তীরাও তো সুহাসিনীর ভালই চায়, তাদের মত করে। নিবেদিতার তাতে আঁতে লাগে কেন? বাবা গড়েছিলেন বলেই কি সুহাসিনী তাঁর একলার? কেন তিনি সুহাসিনীর মেয়েগুলোর কথাও ভুলে গেলেন?

কোনটা তাঁর কাছে বড় ছিল তবে? সমাজসেবা, না ক্ষমতা? সুহাসিনী, না সুহাসিনীর দখলদারি? অসহায় মেয়েদের কল্যাণচিন্তা কি তবে শুধুই আত্মবিনোদন ছিল? নেশা? কেউ ছোটে রেসের মাঠে, কেউ মদে মাতাল হয়… সে রকমই কি? তলিয়ে দেখলে দময়ন্তীর কী দোষ পাওয়া যাবে? খারাপ আচরণ করেছে কখনও? নিবেদিতাকে অসম্মান করেছে? তাঁর পরিবারের কোনও ঘটনা চাউর হয়ে গেলে দময়ন্তীর তা গোপন রাখার কী দায়? তিনি নিজে দময়ন্তীর জায়গায় থাকলে কী করতেন? শরণার ওপর কুপিত হওয়া তো আরও অর্থহীন। তিনি সুহাসিনীর একচ্ছত্র অধিপতি থাকবেন বলে শরণ্যাকেও একটা নষ্ট হয়ে যাওয়া সম্পর্ক টিঁকিয়ে রাখতে হবে? তাঁর গরিমা বজায় রাখতে আদৌ গড়ে না ওঠা সম্পর্কটাকে বয়ে বেড়াবে শরণ্যা —দাবিটা কি অযৌক্তিক নয়?

এই নদীর সামনেই বুঝি নিজেকে দেখা যায়। চেনা যায়। এই নদীর সামনেই বুঝি স্বীকার করা যায় নিজের ফাঁকিটাকে।

অন্ধকারে শব্দ শোনা যায় ক্ষীণ। স্রোতের শব্দ? কোথায় বাজছে? কানে, না হৃদয়ে? কীসের জন্য নিবেদিতা ছুটেছেন এতদিন? রেখা বলছিল, সময় হয়ে এল…। কী পড়ে থাকল পিছনে? সুহাসিনীতে একখানা ছবি, কিংবা পাথরের গায়ে একখানা নাম, ব্যস? একসময়ে মনে হত তিনি গড্ডলিকার মানুষ নন, বিশাল একটা কিছু নিয়ে আছেন তিনি। কী অসার ভাবনা! মানুষ যদি ভাবে সে মহৎ কিছু করছে, তা হলে কিছুই কি তার করা হয় আদৌ? এ তো শুধু আত্মতৃপ্তির খেলায় মাতা। মহত্ত্বের মালা গলায় পরে বুঁদ হয়ে থাকা।

বিনিময়ে জুটল কী? আপনজনেরা কী দিল?

নিবেদিতার বুকটা টনটন করে উঠল। সুনন্দ আর ফিরবে না। বন্ধুর বাড়ি ছেড়ে কোথায় যেন পেয়িংগেস্ট আছে এখন। একটা নাকি ছোটমোট চাকরিও জুটিয়েছে। নীলাচল যায় তার কাছে। একবারও নাকি নিবেদিতার কথা জিজ্ঞেসও করে না সুনন্দ। আর অনিন্দ্য ফাঁকা ঘরে বসে একা একা মদ খায়। একটি কথা বলে না মা’র সঙ্গে। নিবেদিতা ঘরে পা রাখলে খুনে চোখে তাকায়।

রেখা বলছিল, সময় হয়ে এল…!

যাওয়ার সময়ে কী নিয়ে যাবেন নিবেদিতা? কোন সুখটা? কোন তৃপ্তিটা ? কোন দম্ভটা? কোন মহত্ত্বটা?

আর একটু ভাগ করে দেওয়া যেত না কি নিজেকে ? সংসারে আর সুহাসিনীতে?

ঠুলি পরা চোখে একবগ্গা ছুটে নিবেদিতা এ কোথায় এসে পৌঁছোলেন? ফার্ন রোড আর সুহাসিনীর মাঝে মেঘলা বুকে পেন্ডুলামের মতো দুলে চলাই কি তবে তাঁর নিয়তি এখন?

চোখ খুলে তাকালেও কেউ কি আর পাশে এসে দাঁড়াবে?

নদীর জলে চিকচিক করছে আলো। ভাঙা চাঁদ কাঁপছে। প্রচণ্ড জোরে আওয়াজ তুলে হর্ন বাজাল একটা খুদে জাহাজ।

রেখা বলছিল, সময় হয়ে এল…!

ফেরার পথে গোটা রাস্তাটাই চোখ বুজে রইলেন নিবেদিতা। বাড়ি ঢোকার মুখে নীচের ভাড়াটের সঙ্গে দেখা, কী যেন একটা সমস্যার কথা বললেন ভদ্রলোক, নিবেদিতা শুনতে পেলেন না। রেলিং ধরে ধরে ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি ভাঙছেন।

ল্যান্ডিংয়ে এসে থামলেন। ম্যাজেনাইন ফ্লোরের ঘরে সেই চিরপুরাতন ছবি। চেয়ারে আর্য। টেবিলল্যাম্প জ্বলছে। চতুর্দিকে বই কাগজ কলম। টেবিলের কোণে সোনালি পানীয়। আর্য লিখে চলেছেন।

চৌকাঠ টপকে একবার কি ওই গুহায় ঢুকতে পারেন না নিবেদিতা?

আর্যর কলম থেমেছে আচমকাই। নিবেদিতার পায়ের শব্দ কি শুনলেন আর্য? ঘাড় ঘোরাচ্ছেন না কেন একবারও ?

নিবেদিতা সরে এলেন। উঠছেন আবার। আরও শ্রান্ত পায়ে। সময়ের চাকা কি উলটো দিকে ঘোরানো যায়!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%