সুচিত্রা ভট্টাচার্য
সমিতির অফিসঘরে বসে ছোট্ট একটা মিটিং সেরে নিচ্ছিলেন নিবেদিতা। অর্চনার সঙ্গে। সম্প্রতি একটি সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। সুহাসিনী ওয়েলফেয়ার সোসাইটির মেয়েরা নিয়মিত জ্যাম জেলি আচার বানায়, দু’-চারটে খুচরো বিক্রি ছাড়া তার প্রায় সবটাই কিনে নেয় মাঝারি নামজাদা এক আচার কোম্পানি, নিজেদের লেবেল লাগিয়ে তারা বেচে বাজারে। মাস তিনেক হল তাদের বেশ কিছু বিল বাকি পড়েছে, সুহাসিনীকে তারা ঠিকঠাক পেমেন্ট দিচ্ছে না।
অর্চনা বললেন, —এ ভাবে তো আর পারা যায় না নিবেদিতাদি। পর পর দুটো রিমাইন্ডার দিলাম, নো রেসপন্স। টেলিফোন করছি, বলছে বাজার ডাউন, একটু ধৈর্য ধরুন। কী করা যায় বলন তো?
নিবেদিতার কপালে ভাঁজ, —কত ডিউ আছে?
—এক্জ্যাক্ট ফিগারটা দেখে বলতে হবে। তবু ধরুন…দিনে মোটামুটি একশো বোতল সাপ্লাই যায়…জ্যাম জেলি বোতল পিছু আড়াই টাকা, আচারে দুই, সসে দেড়…আমাদের তো জ্যাম জেলি বেশি…। অর্চনা মনে মনে হিসেব কষলেন, —উনিশ-কুড়ি হাজার টাকা তো হবেই। অথচ প্রত্যেক উইকে ওদের পেমেন্ট দেওয়ার কথা ছিল। ভাগ্যিস ওদের ফাস্ট প্রোপোজালটায় রাজি হইনি।
—কাঁচা মাল কেনার ব্যাপারটা?
—হ্যাঁ। কাঁচা মাল আমরা কিনলে কী অবস্থাটা হত বলুন তো? সুহাসিনী লাটে উঠে যেত এত দিনে।
—হুম্। নিবেদিতাকে চিন্তিত দেখাল, —আমি একবার গিয়ে কথা বলে দেখব?
—তা হলে তো ভালই হয়। আপনি গিয়ে দাঁড়ালে তার একটা ওয়েটেজ আছে। আপনি যে ভাবে জোরের সঙ্গে কথা বলেন…
—কথা অনেকেই জোরের সঙ্গে বলতে পারে অর্চনা। কিন্তু দেখা দরকার তাতে সুহাসিনীর কাজ হয়, না অকাজ হয়।
নিবেদিতা ইচ্ছে করেই অর্চনাকে ঠেস দিলেন একটু। ইদানীং দময়ন্তী পাইনকে বড় বেশি মাথায় তুলছে অর্চনারা। সেদিনের একটা মেয়ে, সবে বছর দুয়েক হল সুহাসিনীর সদস্য হয়েছে, এর মধ্যেই গলা ফুলিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে সমিতির মিটিংয়ে। কাজকর্মে উৎসাহ দেখে নিবেদিতা অবশ্য নিজেই তাকে নিয়ে এসেছিলেন এক্জিকিউটিভ বডিতে। সম্প্রতি দুটো বড় বড় সংস্থা থেকে মোটা ডোনেশানও জোগাড় করে এনেছে দময়ন্তী। অবশ্যই নিজের ক্ষমতায় নয়, বরের প্রতিপত্তির সুবাদে। প্রখ্যাত শল্যচিকিৎসক ধূর্জটি পাইনের নাম এ শহরে কে না জানে। কিন্তু টাকা আনছে বলে কর্মসমিতির সভায় উদ্ভট উদ্ভট প্রস্তাব রাখার অধিকার জন্মে যাবে? গত মিটিংয়ে কী অবলীলায় বলে দিল, সেলাইটেলাই তুলে ওঘরে কম্পিউটার বসিয়ে দিন! এখন কম্পিউটারের যুগ, মেয়েগুলো চড়চড় করে ওপরে উঠে যাবে! তা কম্পিউটার কেনা হোক না, নিবেদিতার তাতে কীসের আপত্তি! তা বলে সেলাই ডিপার্টমেন্ট তুলে দেওয়ার মতো অবাস্তব কথা বলে কোন বুদ্ধিতে? পোশাকআশাক বানিয়ে মেয়েগুলো দুটো পয়সা রোজগার করে, সুহাসিনীর ফান্ডেও যৎসামান্য আসে, তার জায়গায় কম্পিউটার কোন সুরাহাটা করবে? আশ্চর্য, অমন একটা হাস্যকর কথা শুনেও অর্চনারা কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না! এরা এত কেন তেল মারবে দময়ন্তীকে?
অর্চনা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। নিবেদিতার ইঙ্গিত বুঝেছেন। খানিকটা তোষামোদের সুরে বললেন, — আপনার সঙ্গে কার তুলনা নিবেদিতাদি? আপনি আছেন বলেই না সুহাসিনী আছে।
—তা কেন, আমি না থাকলেও সুহাসিনী থাকবে। নিবেদিতা ঈষৎ অপ্রসন্ন গলায় বললেন, — তুমি তো জানো, কী ভাবে শুরু হয়েছিল সুহাসিনী। মাত্র ছ’জন মেম্বার ছিলাম আমরা। বাবা প্রেসিডেন্ট, সঙ্গে আমি ঝটিকাদি বাসন্তী শুভ্রা আর আমার ছোটপিসি। আমি ছাড়া বাকিরা এখন কোথায়? ঝটিকাদি তো মারাই গেলেন। ছোটপিসির কথাও বাদ দাও, তার আর শরীর চলে না। কিন্তু শুভ্রা আর বাসন্তী? শুভ্রা তাও চাঁদাটা নিয়মিত দেয়, অ্যানুয়াল মিটিংটাও অ্যাটেন্ড করে, বাসন্তী তো সুহাসিনীর রাস্তাই ভুলে গেছে। সুহাসিনী কি তাই বলে থমকে গেছে? এখন সুহাসিনীর বিরাশি জন মেম্বার। আমি না থাকলেও এতগুলো সদস্য তো থাকবে।
অর্চনা কথা বাড়ালেন না। চুপ করে আছেন।
—হ্যাঁ, যে কথা হচ্ছিল। নিবেদিতা প্রসঙ্গে ফিরলেন, —সে আমি নয় পায়োনিয়ার ফুড প্রোডাক্টসে যাব একবার, ওদের সেনগুপ্তর সঙ্গে কথাও বলব। তবে সঙ্গে সঙ্গে অন্য ভাবনাও তত করে রাখা ভাল।
—কী রকম?
—আমরা গোন্ডেন ফুড প্রোডাক্টসের সঙ্গে কনট্যাক্ট করতে পারি। গোল্ডেন তো আগে আমাদের মাল পছন্দই করেছিল। রেট একটু কম ছিল, এই যা। তা ওরা যদি ক্যাশ টার্মে রাজি থাকে… নেইমামার চেয়ে তো কানামামা ভাল।
—কিন্তু নিবেদিতাদি… অৰ্চনা গলা ঝাড়লেন, —ব্যাপারটা তো আগে কমিটি মিটিংয়ে পাস করাতে হবে।
—আহা, তুমি আগে যোগাযোগটা তো করো। ওভার ফোন কথা বলে দ্যাখো ওরা এখনও ইন্টারেস্টেড কি না। তারপর নয় ফরমাল প্রোপোজাল আনা যাবে।
রেখা চা নিয়ে ঢুকেছে। বছর ষাটেক বয়স, বেঁটেখাটো থপথপে চেহারা। যে চার জন মেয়ে নিয়ে সুহাসিনী ওয়েলফেয়ার সোসাইটি শুরু হয়েছিল, রেখা তাদেরই এক জন। বর্ধমানের কোন গ্রামে যেন বিয়ে হয়েছিল, বর সাংঘাতিক পেটাত, বাপের বাড়িও ফিরিয়ে নিতে চাইছিল না, সুহাসিনীতে ঠাঁই পেয়ে রেখা বেঁচে গিয়েছিল। সুখের না হোক, স্বস্তির নীড় তো বটে। তা সেই নীড়ে পঁয়ত্রিশ বছর বাস করতে করতে রেখা এখন নীড়েরই অংশ বনে গেছে। দারুণ আচার বানায়, ফাস্ট ক্লাস বড়ি দিতে পারে, সেলাইফোঁড়াইয়ের হাতও মন্দ নয়। ইদানীং রান্নাঘরের দায়িত্বে আছে। সুহাসিনীতে এখন আশ্রিতের সংখ্যা তিয়াত্তর, এতগুলো মেয়ের খাওয়াদাওয়ার ঝক্কিটা রেখাই সামলায়। পুরনো বাসিন্দা বলে নিবেদিতার সঙ্গে এক ধরনের সখ্যও আছে রেখার।
দু’ কাপ চা টেবিলে রেখে একগাল হেসে রেখা বলল, —তোমার বউমার তো দেখি খুব উৎসাহ নিবিদি। ঘুরে ঘুরে সকলের কাজ দেখে বেড়াচ্ছে। এই বাটিকের ঘরে ঢুকছে, এই বেতের কাজ… কৃষ্ণাকে বলছিল, আমায় একটু জ্যাম জেলি তৈরি শিখিয়ে দেবেন?
শরণ্যার কথা এতক্ষণ মাথাতেই ছিল না নিবেদিতার। মেয়েটা আজ এসেছে তাঁর সঙ্গে। আগেও এসেছিল একদিন। সুহাসিনীর কাজকর্ম দেখে শরণ্যা বেশ অনুপ্রাণিতই হচ্ছে মনে হয়। ভাল। তেমন হলে শরণাই তাঁর উত্তরসুরী হতে পারবে। আজ এখান থেকে শরণ্যাকে নিয়ে নিবেদিতা শোভাবাজার যাবেন একবার। কাকিমার শরীর খারাপ, অনিন্দ্যর বিয়েতে আসতে পারেননি, বার বার বউ দেখতে চাইছেন। নিবেদিতারও বাড়ি বিক্রির ব্যাপারটা বুঝে আসা দরকার। আজ এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যাবে।
মৃদু হেসে নিবেদিতা বললেন, —আমার বউমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে রেখা?
—পছন্দ কী গো, সোনার টুকরো মেয়ে। কী মিষ্টি ব্যবহার, আহা। রেখা মাথা দোলাচ্ছে, —তোমার বাড়ি তো আলো হয়ে গেছে নিবিদি।
অর্চনা হাসতে হাসতে বললেন, —কিন্তু তুমি যে সুহাসিনীকে অন্ধকার করে দিচ্ছ গো!
—কেন?
—একটু আগে কী বাঁধাকপি রাঁধছিলে, দুর্গন্ধে তো ওয়াক উঠে আসার জোগাড়।
—জগন্নাথ বাঁধাকপি আনছে কেন? রেখা ঝনঝন করে উঠল, —এই সময়ের বাঁধাকপি থেকে কি গোলাপের বাস বেরোবে? গোরুতেও এখন আর কপি খায় না।
রেখা এ ভাবেই কথা বলে। দাপটের সঙ্গে। নিবেদিতা হেসে বললেন, — বুঝেছি। জগন্নাথকে একটু বকে দিতে হবে।— যাও, এবার আমার বউমাকে ডেকে দাও। বেরোব।
রেখা চলে যাওয়ার পর অর্চনার সঙ্গে বসে আরও কয়েকটা টুকটাক দরকারি কাজ সেরে নিলেন নিবেদিতা। মার্চ মাস পড়ে গেল, সরকারি অ্যালট্মেন্টের টাকা এখনও এসে পৌঁছোল না। প্রতি বছরই দেরি করে, এবার যেন একটু বেশি বিলম্ব করছে। শুক্রবারের মিটিংয়ে ফান্ড থেকে কিছু টাকা তোলার প্রস্তাব রাখতে বললেন অর্চনাকে। দারোয়ান, টাইপিস্ট, একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট কাম ক্লার্ক, দু’জন সেলাই দিদিমণি, ঝাড়ুদার টাড়ুদার মিলিয়ে সুহাসিনীতে জনা বারো কর্মচারী, তাদের মাইনের চেক সই করলেন। মাস ছয়েক হল বয়স্ক শিক্ষা প্রকল্পে গভর্নমেন্ট কিছু টাকা দিয়েছে, সন্ধেবেলা সুহাসিনীতে ক্লাসও হচ্ছে নিয়মিত, দশ-বারো জন গরিবঘরের স্থানীয় বউঝি আসছে পড়তে, তাদের নিয়েও আলোচনা হল খানিক।
তার মধ্যেই শরণ্যা উপস্থিত। নিবেদিতার পাশে বসতে বসতে বলল, —একটি মেয়ে কী অসাধারণ কাঁথাস্টিচের কাজ করছে মামণি! আমার তো চোখের পলক পড়ছিল না!
নিবেদিতা জিজ্ঞেস করলেন, —কে? দীপ্তি?
—ওর নাম দীপ্তি বুঝি? ফরসা মতন? ভীষণ রোগা?
—হ্যাঁ। দীপ্তির সুন্দর আর্টিস্টিক সেন্স আছে। চমৎকার আলপনাও দেয়। নিজেই মাথা খাটিয়ে নতুন নতুন ড্রয়িং করে শাড়িতে। ওর তৈরি শাড়ির ভাল ডিমান্ড।
—ইস, কী ব্যাড লাক, না? এত গুণী হয়েও এখানে পড়ে আছে।
অর্চনা বললেন, —না শরণ্যা। ও যে দশায় ছিল তার তুলনায় সুহাসিনী তো স্বর্গ। তুমি জানো ওর হিষ্ট্রি?
—না তো৷ কী?
—শি ইজ আ রেপ ভিক্টিম। প্রেমিক আর তার দুই বন্ধু মিলে মেয়েটাকে ধর্ষণ করেছিল। কোর্টে অবশ্য তাদের সেন্টেন্স হয়, কিন্তু দীপ্তির বাবা-মা আর মেয়েকে ফেরত নিতে রাজি হয়নি। দীপ্তি থাকলে তার বোনদের নাকি বিয়ে হবে না। শি ওয়াজ সেন্ট হিয়ার বাই দি সোশাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট।
শরণ্যা শিউরে উঠল, —ও মা, কী সাংঘাতিক!
নিবেদিতার মুখে বিষন্ন হাসি, —সুহাসিনীর কোনও মেয়েরই পাস্ট খুব মধুর নয় শরণা। এদের সঙ্গে মিশলে বুঝতে পারবে তুমি যতটা খারাপ কল্পনা করতে পারো, পৃথিবী তার চেয়ে অনেক বেশি কুৎসিত।
অর্চনা বললেন,—থাক নিবেদিতাদি, মেয়েটাকে আর ভয় দেখাবেন না। নতুন বিয়ে, এখন একটা স্বপ্নের জগতে আছে…
খুব স্বপ্নের জগতে আছে কি? নিবেদিতার তো মনে হয় না। অনিন্দ্য যা অবুঝ! এর মধ্যেই তো বোধহয় একটা গণ্ডগোল বাধিয়ে বসেছিল। ক’টা দিন বাপেরবাড়ি থাকবে বলে গেল মেয়েটা, একদিন পরেই বাপ-মা এসে পৌঁছে দিয়ে গেল মেয়েকে। নবেন্দু-মহাশ্বেতার মুখ দেখে মনে হল তারা বেশ ক্ষুন্ন। অনিন্দ্য কি মানিকতলায় গিয়ে ঝামেলা পাকিয়ে এসেছিল? হতেই পারে। যা উদ্ধত! শরণ্যারও মুখে ক’দিন হাসি ছিল না। ভেতরের ব্যাপার জানার উপায় নেই। শরণ্যাকে জিজ্ঞেস করেও সদুত্তর পাননি নিবেদিতা। আর অনিন্দ্য ? তাকে কে প্রশ্ন করতে যাবে। হয়তো মুখের ওপর বলে দেবে, নিজের চরকায় তেল দাও!
নিবেদিতা শরণ্যাকে বললেন, —তুমি তা হলে বসে অর্চনামাসির সঙ্গে গল্প করো, আমি চট করে একটা চক্কর দিয়ে আসি।
সুহাসিনীতে এসে প্রতি দিন একটা করে রাউন্ড মারা নিবেদিতার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। প্রত্যেকটি ঘরে উঁকি দেবেন এখন, মেয়েদের সঙ্গে দুটো-চারটে কথা বলবেন। সুহাসিনী তো এখন আর ছোট নেই, সময় লাগবে।
সুহাসিনীর পুরনো বাড়িটায় একতলা-দোতলা মিলিয়ে দশখানা ঘর। প্রথম প্রথম বাড়িটা খাঁ খাঁ করত, এখন আর একটা বাড়িতে কুলোয় না, পিছনের ফাঁকা জমিটায় সরকারি অনুদান আর এদিক-ওদিক থেকে কুড়িয়েবাড়িয়ে আরও একটা দোতলা বাড়ি বানানো হয়েছে। দু’ বাড়িরই একতলায় কর্মযজ্ঞ চলে, দোতলায় মেয়েদের বাস।
নিবেদিতা ভেতরের হল মতন জায়গাটায় এসে দাঁড়ালেন ক্ষণকাল। সুহাসিনীর বার্ষিক মিটিংটিটিংগুলো এখানেই হয়। ছোট্ট স্টেজ মতোও করা আছে। মাঝে মাঝে গানবাজনা নাটকটাটক করে মেয়েরা। আশ্রিত বলে জীবনটা একেবারে শুকনো কাটবে, এ নিবেদিতার অভিপ্রেত নয়।
স্টেজের পিছনেই দেওয়ালে পাশাপাশি দু’খানা ফোটো। নিবেদিতার বাবা সোমশংকর মুখার্জি, আর ঠাকুমা করুণা। স্যুট-টাই পরা সোমশংকরের মুখে টুকরো হাসি ঝুলছে, আটপৌরে ঢঙে শাড়ি পরা করুণার চোখে আলগা বিষাদের প্রলেপ।
একজন প্রতিষ্ঠাতা। অন্যজন প্রেরণা।
করুণার মনে সারা জীবন একটা ক্ষত ছিল তাঁর মা সুহাসিনীকে নিয়ে। সুহাসিনীর জীবনটা ছিল ভারী কষ্টের। করুণার বাবার দুই বিয়ে, সুহাসিনী তাঁর প্রথম পক্ষ। কাকবন্ধ্যা সুহাসিনী স্বামীকে পুত্র উপহার দিতে পারেননি বলে কাঁটা হয়ে থাকতেন সব সময়ে, শ্বশুরবাড়িতে লাঞ্ছনা গঞ্জনা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। তবু তিনি সেখানে টিকতে পারেননি শেষপর্যন্ত। একদিন এক অতি তুচ্ছ কারণে সুহাসিনীকে ত্যাগ করেছিলেন তাঁর স্বামী। ত্যাগ নয়, গলাধাক্কা। এক বস্ত্রে রাতারাতি স্বামীর ঘর ছাড়তে হয়েছিল সুহাসিনীকে। তো অপরাধটা কী ? না মেয়ের ধুম জ্বর, এক্ষুনি ডাক্তারবদ্যি না করলেই নয়, আর্জিটা জানাতে সুহাসিনী মরিয়া হয়ে ঢুকে পড়েছিলেন স্বামীর বৈঠকখানার আড্ডায়, এবং তখন তাঁর মাথায় ঘোমটা ছিল না! ব্যস, ওই অজুহাতেই পত্রপাঠ নির্বাসন। বাপেরবাড়িতেও জীবনের বাকি দিনগুলো আশ্রিতের মতো কেটেছিল সুহাসিনীর। একটাই সৌভাগ্য, বেশিদিন বাঁচেননি তিনি। করুণার বিয়ের পর পরই সুহাসিনী গত হন। যক্ষ্মায়। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে।
সুহাসিনীর গল্প বলতে গিয়ে শেষ বয়সেও চোখে জল এসে যেত করুণার। ছেলেমেয়ে নাতিনাতনি সবাইকে তিনি বলতেন, মেয়েমানুষের জীবন বড় কষ্টের রে। নেহাত আমার কপাল ভাল, দেখতে শুনতে মন্দ ছিলাম না, তাই এমন ঘর-বর জুটে গেছে। নইলে আমারও যে কী গতি হত কে জানে! সংসারে দুঃখী মেয়েদের কথা পারলে একটু ভাব তোরা। ভগবানের দয়ায় তোদের তো অনেক আছে, তাদের জন্য কিছু অন্তত কর।
মাতৃভক্ত সোমশংকরকে নাড়া দিত আর্তিটা। গেঁথে গিয়েছিল নিবেদিতার হৃদয়েও। করুণা যখন মারা যান, নিবেদিতা তখন এম-এ পড়ছেন। দুঃস্থ মেয়েদের জন্য কোনও একটা প্রতিষ্ঠান গড়ার চিন্তা তখন থেকেই তাঁর মনে দানা বাঁধে।
সুযোগও এসে গেল। আকস্মিক ভাবে। সোমশংকরের এক মক্কেল ঘরবাড়ি বেচে দিয়ে পাকাপাকি ভাবে দিল্লি চলে যাচ্ছিলেন, তাঁর কাছ থেকে প্রায় জলের দরে হাজরা রোডের বাড়িটা কিনে নিলেন সোমশংকর। প্রতিষ্ঠিত হল সুহাসিনী ওয়েলফেয়ার সোসাইটি।
করুণা মারা যাওয়ার ঠিক ছাব্বিশ মাস পর। করুণার জন্মদিনের দিন।
পঁয়ত্রিশটা বছর কেটে গেল তার পরে, নিবেদিতার এখনও মনে হয় এই তো সেদিন!
দেখতে দেখতে সুহাসিনীও আজ অনেক বড় হয়েছে। কী ভাবে যে নিবেদিতা তিলে তিলে গড়েছেন সুহাসিনীকে। সোমশংকর ছিলেন হাইকোর্টের নামী ব্যারিস্টার, ইচ্ছে থাকলেও তাঁর সময় কোথায়, প্রথম থেকেই তাই কাজকর্মের মুখ্য দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন নিবেদিতা। কোনও দিকে তাকাননি, অষ্টপ্রহর শুধু সুহাসিনী সুহাসিনী সুহাসিনী। নিরাশ্রয় মেয়েদের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করা, কাজ-চলা গোছের লেখাপড়া শেখানো, পাশে পাশে নানান ধরনের হাতের কাজের ট্রেনিং, ঘুরে ঘুরে সমিতির জন্য অর্থসংগ্রহ, গভর্নমেন্টের কাছে গ্র্যান্টের জন্য দরবার— এক নিবেদিতাই তখন একশো নিবেদিতা। সকাল থেকে রাত চরকি খাচ্ছেন। মাঝে বিয়ে হল, ছেলেপুলে হল, তবু কোনও দিন সুহাসিনীর কাজে ঢিল দেননি। আয়ার কাছে বাচ্চা রেখে চলে এসেছেন হাজরা রোডে, ছেলেদের অসুখবিসুখেও কাজে ভাটা পড়েনি।
সুহাসিনী নিবেদিতার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। সুহাসিনী ছাড়া নিবেদিতার আর আছেটা কী?
অফিসঘরে ফিরে নিবেদিতা দেখলেন মঞ্জুলিকা আর জয়শ্রী এসেছেন। সুহাসিনীর সদস্যদের অনেকেই প্রভাব প্রতিপত্তিশালী ঘরের মহিলা, হাতের কাজকর্ম সেরে রোজই এ রকম কেউ-না-কেউ হাজিরা দেন দুপুরের দিকে। কাজটাজ দেখেন, গল্পগাছা হয়, সুহাসিনীতে বানানো জিনিসপত্রের জন্য খদ্দেরও আনেন মাঝেমধ্যে। মিছিমিছি অলস সময় না কাটিয়ে সমাজের জন্য কিছু অন্তত করার চেষ্টা করেন এঁরা। সুহাসিনীর মতো প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাশ্রম কারুর কারুর সামাজিক মর্যাদাও বাড়ায়।
মঞ্জুলিকাদের সঙ্গে দু-চারটে কথা বলে শরণ্যাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন নিবেদিতা। আকাশে অল্প অল্প মেঘ। সূর্য আর মেঘে লুকোচুরি চলছে। ফাল্গুনের রোদ্দুর চড়া নয় তেমন, বাতাসেও বেশ মিঠে মিঠে ভাব। তবু একটা গুমোটও আছে। সম্ভবত ওই মেঘের জন্যই।
শম্বুক গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে সুরেন। কলকাতায় ইদানীং গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে খুব, দুপুরবেলাতেও যত্রতত্র যানজট। নিবেদিতা ঘন ঘন ঘড়ি দেখছিলেন। দক্ষিণ থেকে উত্তরে পৌঁছোতে কত সময় লাগবে কে জানে!
হঠাৎ শরণ্যা বলল,—মামণি, আপনারা শুনলাম বৃদ্ধাশ্রম করছেন?
নিবেদিতা ফিরে তাকালেন, —কে বলল? মঞ্জুলিকা?
—অর্চনামাসি বলছিলেন। জমিও নাকি দেখা হয়ে গেছে? বেহালায়?
—প্রপার বেহালা নয়, এক্সটেন্ডেড বেহালা। শীলপাড়া চেনো? শীলপাড়া ক্রস করে। জোকা আর শীলপাড়ার মাঝামাঝি।
—কবে শুরু হবে?
—দাঁড়াও, জমিটা আগে হাতে আসুক।…তবে ওল্ডহোমটা স্টার্ট করার একটা টার্গেট ডেট রেখেছি। সামনের বছরের পরের বছর ইন্টারন্যাশনাল বৃদ্ধদিবসে হোম ওপেন করে দেব। এর মধ্যে যে করে হোক কাজ শেষ করতেই হবে।
—তার মানে আপনার খুব পরিশ্রম যাবে?
—পরিশ্রম না করলে কি ফল পাওয়া যায় শরণ্যা? অমানুষিক খাটুনি খাটতে হবে। অনেক টাকার ব্যাপার। সব মিলিয়ে প্রায় পঁচিশ-তিরিশ লাখ টাকার প্রোজেক্ট। জমিতেই তো প্রায় ছ’লাখ পড়ছে। তারপর ফান্ড রেজ করা, আর্কিটেক্টদের ধরে একটা সুন্দর প্ল্যান বানানো, এখানে ছোটাছুটি, ওখানে ছোটাছুটি, রেগুলার দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে বাড়ি তৈরির তদারকি…
—গভর্নমেন্ট টাকা দেবে না?
—কিছু হয়তো দেবে। তবে মেজর পোরশান বাইরে থেকেই তুলতে হবে।
—কিন্তু মামণি, এত ধকল আপনি নিতে পারবেন? এদিকে তো আপনার সুহাসিনীও আছে, সেখানেও তো সময় দিতে হবে।
আপনার সুহাসিনী শব্দবন্ধটা নিবেদিতাকে ভারী তৃপ্তি দেয়। মনে হয় পঁয়ত্রিশ বছরের শ্রম সার্থক। প্রীত মুখে বললেন, —পারতেই হবে। গরিব মেয়েদের নিয়ে কিছু কাজ তো করলাম, এবার মিডল্ক্লাসদের কথাও একটু ভাবি। মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে বাবা-মাকে শেষ বয়সে যে কী দুর্দশায় পড়তে হয়। তোমার বাবা-কাকারা নয় তোমার ঠাকুমাকে মাথায় করে রেখেছেন, কিন্তু বেশিরভাগ বাড়িতেই তো…
বলতে বলতে নিবেদিতা থমকে গেলেন। শরণার পরিবারের উল্লেখ শরণাকে আহত করল না তো? প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, —তোমার সেই রিসার্চে জয়েন করার কী হল?
—স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে না। বাইরে গেছেন। নেক্সট্ উইকে ফিরবেন।
—ও। ডক্টরেটের পর তোমার কী করার ইচ্ছে?
—দেখি। এখনও কিছু ভাবিনি সে ভাবে।
—ও।
নিবেদিতা আর কথা খুঁজে পেলেন না। একবার ভাবলেন অনিন্দ্যর কথা তুলবেন কিনা। পারলেন না। বাধল। শরণ্যার সঙ্গে আর্যরও বেশ ভাব হয়েছে। একমাত্র শরণ্যার সঙ্গেই বাক্যালাপ চলে আর্যর, লক্ষ করেছেন নিবেদিতা। পরশু কী নিয়ে যেন আলোচনাও হচ্ছিল দু’জনের, সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ে কানে এসেছিল। পড়াশুনো নিয়ে কথা হচ্ছিল কি? কিন্তু দু’জনের সাবজেক্ট তো এক নয়। একজন প্রাচীন ইতিহাস, অন্যজন অর্থনীতি। জিজ্ঞেস করবেন শরণাকে? থাক। আর্য কী বলেন, কী ভাবেন তা নিয়ে কবেই বা মাথা ঘামিয়েছেন নিবেদিতা!
শোভাবাজার পৌঁছোতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। এক বৃদ্ধ দোতলা বাড়ির গাড়িবারান্দায় এসে থামল সুরেন।
নামতে নামতে শরণ্যা বলল, —বাহ্, দারুণ তো। এ রকম পুরনো আমলের বাড়ি আমার ভীষণ ভাল লাগে।
নিবেদিতা বললেন, —বাড়িটাকে দেখতে যত থুরথুরে লাগে, তত বুড়ো কিন্তু নয়। লেট থারটিজে তৈরি। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার লাগার আগের বছরে। আমার ঠাকুরদা বানিয়েছিলেন। বাগবাজারের পৈতৃক ভিটে ছেড়ে এসে। মেনটেনেন্স নেই তো, তাই এই হাল। দ্যাখো, কার্নিশে বটগাছ গজিয়ে গেছে। আমার বাবা এই বাড়িতেই বড় হয়েছেন।
বাড়িটার একতলা অস্বাভাবিক রকমের ঠান্ডা। শীত শীত করে। চওড়া খানিকটা প্যাসেজের পরে ডানদিকে সিঁড়ি উঠে গেছে। ঘটাং ঘটাং শব্দ হচ্ছে একতলায়। প্রেস চলছে।
দোতলায় উঠতে উঠতে শরণ্যা জিজ্ঞেস করল, —আপনাদের বাগবাজারের বাড়িটার এখন কী অবস্থা?
—ভেঙেচুরে গেছে, তবে আছে এখনও। সে তো প্রায় রাজপ্রাসাদের মতো। পাঁচ পুরুষের বনেদি বাড়ি, অজস্র শরিক, এখনও মানুষে গিজগিজ করে। তোমার বউভাতের দিন তো সবাই এসেছিল, দ্যাখোনি?
কথা আর এগোল না। সিঁড়ির মুখে স্বরূপা। নিবেদিতারই সমবয়সি। লম্বা ছিপছিপে চেহারা। মুখে বয়সের ছাপ পড়লেও দেখে বোঝা যায় যৌবনে বহু তরুণের হৃদয় বিদীর্ণ করেছেন।
স্বরূপার মুখে ছদ্ম কোপ, —এতদিনে তা হলে তোমাদের আসার সময় হল?
নিবেদিতা হেসে বললেন, —সত্যি, কিছুতেই আর সময় হচ্ছিল না। জানোই তো কী ভাবে ফেঁসে থাকি।
—আমাকে বলে কী হবে, মাকে গিয়ে বোঝাও।
শরণ্যা প্রণাম করল স্বরূপাকে, —ভাল আছেন তো মামিমা?
—থাক থাক। সুখে থাকো। স্বরূপা শরণ্যার চিবুক ছুঁলেন, —তোমার মাসি… কণার সঙ্গে টেলিফোনে কথা হচ্ছিল। কণা বলছিল তোমার বাবা-মা নাকি এখনও তোমার শোকে মুহ্যমান। দুঃখ ভুলতে তাঁরা নাকি কেদারবদরি বেড়াতে যাচ্ছেন!
শরণ্যা হাসি হাসি মুখে বলল, —এখন তো নয়, যাবে সেই মে মাসে। বাবার এখন তো জোর ইয়ারএন্ডিং চলবে। সেই এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
শরণ্যা কথা বলছে স্বরূপার সঙ্গে। নিবেদিতা সামনে বড় ঘরটায় ঢুকলেন। ঘর জুড়ে সাবেকি আসবাব। মাঝখানে পাতা পালঙ্কে আধশোওয়া হয়ে আছেন শেফালি, পরনে ধবধবে সাদা থান। আশি ছুঁই ছুঁই শেফালির, চুল আর কাপড় দুটোই এক রংয়ের।
নিবেদিতাকে দেখেই শেফালি হাউমাউ করে উঠলেন। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে তাঁকে শান্ত করলেন নিবেদিতা। বউ দেখালেন।
সুন্দর একটা আনন্দের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। চলছে কথার পরে কথা। নিবেদিতার খুড়তুতো দাদা জ্যোতিশংকরও উঠে এসেছেন ঘুম থেকে, যোগ দিয়েছেন আড্ডায়। জ্যোতিশংকর আর স্বরূপার ছেলেমেয়ে দু’জনেই কলকাতার বাইরে থাকে, স্বরূপা তাদের ছবি দেখালেন শরণ্যাকে, শেফালি শোনালেন তাঁর তিন মেয়ের নাতিনাতনির গল্প।
বাড়ি বিক্রির প্রসঙ্গে আসার জন্য নিবেদিতা ছটফট করছিলেন। স্বরূপা জলখাবারের আয়োজন করতে চলে যাওয়ার পর পাড়লেন কথাটা। বললেন, —তা হলে সইসাবুদগুলো কবে হচ্ছে সোনাদা?
জ্যোতিশংকর এতক্ষণ হালকা মুডে ছিলেন, হঠাৎই টান টান। চিন্তিত মুখে বললেন, —সবই তো রেডি হয়ে গিয়েছিল রে খুকু। এদিকে যে আবার একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
—সে কী? কী হল?
—মিনু তো এখন কানাডা থেকে আসতে পারবে না। সে তো এখন মনট্রিলে আরও ক’মাস আটকে গেল।
মিনু মানে নিবেদিতার বড়পিসির মেজ মেয়ে। শোভাবাজারের এই বাড়িই এখন চার তরফের। সোমশঙ্কররা দুই ভাই, দুই বোন। বড়পিসি মারা গেছেন, তাঁর উত্তরাধিকারী এখন তাঁর তিন মেয়ে। এক মেয়ের সই বাকি থাকলেও এ বাড়ি এখন বেচা যাবে না, নিবেদিতা জানেন। বউয়ের বাচ্চা হবে বলে মিনুকে তার বড় ছেলে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রেখেছে এখন।
নিবেদিতা ভুরু কুঁচকে বললেন, —এ তো ভারী অন্যায় কথা। মিনু তা হলে কাউকে একটা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়ে দিক।
—সে তো দিয়েই গেছে। নইলে আমি লাখোটিয়ার সঙ্গে এগ্রিমেন্ট করলাম কী করে। কিন্তু বিক্রির সময়ে সকলকেই তো প্রেজেন্ট থাকতে হবে।
—তার মানে আবার পিছোল?
—কী আর করা। অ্যাদ্দিন যখন ধৈর্য ধরলাম…
নিবেদিতা তেতো হাসলেন, —তোমার তো ধৈর্য ধরতে অসুবিধে নেই সোনাদা। বাড়ি ছ’ মাস পরে বেচলেও যা, বিশ বছর পরে বেচলেও তাই। লস যা হওয়ার তা তো আমাদেরই।
কথার অন্তর্নিহিত অর্থটা ধরতে পেরেছেন জ্যোতিশংকর। তিনি এ বাড়ির পুরো দোতলাটা জুড়ে আছেন, প্রোমোটার নিলে তিনি পাবেন একটি ফ্ল্যাট, বাকিরা নগদ টাকা। কোনও দিনই এ বাড়ি বিক্রির ব্যাপারে তাই জ্যোতিশঙ্করের তেমন চাড় ছিল না। নিবেদিতার ইঙ্গিতটা সেদিকেও।
ঈষৎ ম্রিয়মান গলায় জ্যোতিশঙ্কর বললেন, —দ্যাখ খুকু, চার ভাগের বাড়ি আমি একা ভোগ করছি ঠিকই, তবে দেখভালও তো করছি। এই তো একতলার সিলিংয়ের চাঙর ভেঙে পড়ছিল, পুরো সারাতে হল…
—কিন্তু খরচা কি তোমার নিজের পকেট থেকে করতে হয়েছে সোনাদা? নিবেদিতা বলব না বলব না করে বলেই ফেললেন, —প্রেস থেকে যে ভাড়াটা পাও, আমরা তো কোনও দিন তার ভাগ চাইনি। আমিও না, মিনু চিনুরাও না, ছোটপিসিরাও না। কী, ঠিক বলছি?
শেফালি হঠাৎ বলে উঠলেন, —সে আর কত পায় রে খুকু? প্রেস তো বসেছে সেই তোর কাকার সময় থেকে। তখনকার দুশো টাকা ভাড়া এখন বেড়ে বেড়ে সাড়ে চারশো। ওই টাকা তো বাড়ির ট্যাক্সেই বেরিয়ে যায়।
—কিন্তু কাকিমা, ভাড়াটের জন্যই তো দামটাও কমে গেছে। পাঁচ কাঠা তিন ছটাক সাতাশ স্কোয়্যার ফিট জমি, বাড়ি বাদ দিয়ে শুধু জমিরই তো এখানে বিশ লাখ টাকা দাম হওয়া উচিত ছিল।
জ্যোতিশঙ্কর বললেন, —সেটা অবশ্য ঠিক। ওই হারামজাদাদের জন্যই দাম পুরোপুরি তোলা গেল না।
নিবেদিতা মনে মনে বললেন, জ্ঞানপাপী! লাখখাটিয়া সাকুল্যে দাম দিয়েছে উনিশ লাখ, নিবেদিতার ভাগে পাঁচ লাখও পুরো জুটবে না। এদিকে সোনাদা নিজেদের জন্য একটি হাজার স্কোয়ার ফিট ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে নিয়েছে। ক্যাশ নেবে না বটে, তবে এই এলাকায় ওই ফ্ল্যাটের দাম দশ লাখের বেশি বই কম হবে কি? মুখে যাই বলুক, ক্ষীরটা সোনাদা একাই খেল।
শোভাবাজারের বাড়ি থেকে বেরোনোর পরও ভেতরটা বিস্বাদ হয়ে রইল নিবেদিতার। টাকাটা এখন হাতে আসা খুব জরুরি ছিল। আর্য তো শুধু সংসারের কাঁচা বাজারের খরচাটুকু টানেন, আর ইলেকট্রিক টেলিফোনের বিলটা। বাকি সবই তো নিবেদিতার কাঁধে। বাড়িতে কাজের লোক আছে, ড্রাইভার আছে, গাড়ির তেল আছে, মাসকাবারি, এটা সেটা…। নিজের হাতখরচও তো আছে কিছু। এর মধ্যে বাড়িভাড়া থেকে আসে মাত্র চার হাজার, বেশির ভাগটা বাবার রেখে যাওয়া অর্থের সুদেই চলে। তা সেই সঞ্চয়েও তো কবেই হাত পড়ে গেছে। সুরেন বলছিল মেকানিক নাকি সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে গাড়ি টিপটপ করতে গেলে অন্তত তিরিশ হাজার পড়বে। তার চেয়ে নাকি নতুন কিনে নেওয়া ঢের লাভজনক। একটা নতুন গাড়ির ইচ্ছে তো নিবেদিতারও আছে, কিন্তু সেও তো প্রায় আড়াই লাখের ধাক্কা। ছ’ মাসের মধ্যে গাড়ি যদি পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়ে, তা হলেই তো চিত্তির। ভল্টে কিছু শেয়ারের কাগজ রাখা আছে, ছেড়ে দেবেন এখন? বাজার এখন খুব ডাল, ভাল দামও তো পাবেন না। নাহ্, সঞ্চয়ের ভাণ্ডার খালি করাটা উচিত হবে না। কখন কী বিপদ আসে কেউ বলতে পারে!
গাড়ি পার্ক স্ট্রিট পেরিয়ে গেছে। বাইরে শেষ বিকেলের মলিন আলো। নিবেদিতা সিটে মাথা রেখে বসে আছেন চোখ বুজে। হিসেব কষছেন। হিসেব মেলাচ্ছেন।
শরণ্যা পাশ থেকে ডাকল, —মামণি?
—উঁ ?
—শরীর খারাপ লাগছে?
—না তো।
—কী ভাবছেন এত?
—কিছু না। নিবেদিতা সোজা হলেন। ঠোঁটে আবছা হাসি ফুটিয়ে বললেন, বৃদ্ধাশ্রমের চিন্তাটাই ঘুরছে মাথায়। কী ভাবে যে কী করব…!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন