তেরো

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

—দ্যাখ, আজ বাপটা এসেছে!

চাপা স্বর, তবু শুনতে পেলেন আর্য। তরল সিসের মতো যেন প্রবেশ করল কানে। এই বয়সে পৌঁছে ইন্দ্রিয়গুলো ক্রমশ ভোঁতা হওয়ার কথা। তাঁর ক্ষেত্রে কেন যে তীক্ষ্ণ হচ্ছে দিন দিন?

ঘাড় না ঘুরিয়েও স্বরের উৎসটিকে চিনতে পেরেছেন আর্য। শরণ্যার বাবা।

আর্য গুটিয়ে গেলেন ভেতরে ভেতরে। আজ এই রণক্ষেত্রে উপস্থিত থাকার তাঁর একটুও ইচ্ছে ছিল না, তবু নিবেদিতার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলেন কই! অনুরোধ, না নির্দেশ ? নাকি আদেশ? যাই হোক না কেন, আর্য তো মুখের ওপর না বলে দিতে পারতেন। ইদানীং অল্পস্বল্প না বলার জোরও তো এসেছে তাঁর। তাও পারলেন না। সেই অদৃশ্য সুতোটায় আবার টান পড়ল যে। কখনও কখনও বিবেকও এত অসহায় হয়ে পড়ে!

নিবেদিতাও কি একই দংশনে ভুগছেন এখন? বাইরে প্রকাশ নেই, তবে আর্য পরিষ্কার টের পান সোমশংকরের মেয়ে ভাঙছে। কী ভীষণ বিধ্বস্ত যে দেখায় আজকাল নিবেদিতাকে! শোক, তাপ, দুঃখ, হতাশা সবই বুঝি সইতে পারে মানুষ, কিন্তু অহংয়ে যদি ফাটল ধরে তা সহ্য করা বড় কঠিন। অস্তিত্বের ভিতটাই যে নড়ে যায়।

চেয়ার টেনে বসেছেন নবেন্দুরা। টেবিলের ওদিকটায়। বাবা-কাকার মধ্যিখানে শরণ্যা। এপাশে আর্য অনিন্দ্য নিবেদিতা। মাঝে একখানা চেয়ার ফাঁকা ছিল, সেখানে এসে বসলেন শ্যামল রায়। অনিন্দ্যর পক্ষের লইয়ার। বিভাজন রেখাটা স্পষ্ট হয়ে গেল। আর্যর চোখ চলে গেল শরণ্যার দিকে। নতমুখে বসেছে মেয়েটা। কাঁপছে যেন একটু একটু। আপন হতে এসেছিল, দুম করে কেমন পর হয়ে গেল!

দিব্যেন্দু কথা শুরু করলেন, —সরি বরুণদা, দেরি হয়ে গেল।

টেবিলের ওপারে ঘুরনচেয়ারে বরুণ সান্যাল। শরণ্যার পক্ষ। কবজি উলটে ঘড়ি দেখে বললেন, —না না, তোমরা রাইট টাইমেই এসেছ। ওঁরাই বরং একটু আর্লি…

শ্যামল হাসলেন, —আমাদের তো একটু আগে আগে আসতেই হয় দাদা। প্রতিপক্ষ বলে কথা। কোথায় জ্যামে ফেঁসেটেসে যাই…

—প্রতিপক্ষ আবার কী? আমরা তো সবাই আজ এক দলে। কথার প্যাঁচে বরুণও দড়। তাঁর বিত্তের প্রলেপ মাখা সৌম্য মুখে পেশাদার হাসি, —স্টার্ট করা যাক তা হলে?

কারুর মুখে শব্দ নেই। পাথরের মতো বসে আছেন নিবেদিতা। পাশে অনিন্দ্যর মুখও থমথমে। অন্যমনস্ক হওয়ার জন্যই বুঝি চোখ ঘুরছে দেওয়ালে দেওয়ালে। আইনের মোটা মোটা বই ঠাসা ওয়াল ক্যাবিনেটে। হোয়াটনটে জমে থাকা ব্রিফের স্তূপে। দরজার মাথায় সাজানো সিংহবাহিনীর ছবিতে।

আশ্চর্য ছেলে! সেদিনও নিবেদিতার সঙ্গে শির ফুলিয়ে ঝগড়া করছিল, —কেন ভয় পাব, অ্যাঁ? কে বলেছে আমি সাবানজল ফেলেছিলাম? প্রমাণ করো!

ভাঙে তবু মচকায় না। অবিকল মায়ের ধারা পেয়েছে ছেলেটা। সুনন্দটা বুঝি পালিয়ে বাঁচল। একটু হলেও সুনন্দর মধ্যে আর্য কী রয়েছেন কোথাও? কে জানে!

টেবিলে ফাইল তৈরি। বরুণ রিডিংগ্লাস পরে নিলেন। গলা খাকারি দিয়ে বললেন, —আমার ড্রাফটটাই পড়ি আগে? নাকি আপনি আগে রিড আউট করবেন?

—আপনারটাই চলুক। ব্রিফকেস থেকে শ্যামলও ফাইল বার করেছেন। চোখ বুলোত বুলোতে বললেন, —কোনও পয়েন্টে ডিফারেন্স হলে তখন শর্ট আউট করা যাবে।

ক্ষণিক নৈঃশব্দ্য।

নিবেদিতা সোজা হয়েছেন। নব্যেন্দুর চোয়াল শক্ত। অনিন্দ্য আঙুল মটকাচ্ছে। দিব্যেন্দুর ভুরুতে ভাঁজ। শরণ্যা কোলের ব্যাগটিকে দু’হাতে জাপটে ঝুঁকল।

আর্য চোখ বুজলেন। ধর্মক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসব :….। উকিলের চেম্বারকে কি পুণ্যভূমি বলা যায়? যুযুধান দু’পক্ষই প্রস্তুত, তিনি কি এই মুহূর্তে শিখণ্ডী ? শিখণ্ডীও তো যুদ্ধ করেছিল! তা হলে আজ এই কুরুক্ষেত্রে তাঁর কী ভূমিকা?

বরুণ পাঠ আরম্ভ করেছেন,— কোর্ট অফ দি সো অ্যান্ড সো। ম্যাট্রিমোনিয়াল স্যুট নাম্বার সো অ্যান্ড সো। পিটিশনার নাম্বার ওয়ান, শ্রীঅনিন্দ্য মুখার্জি, সান অফ শ্ৰীআর্য মুখার্জি, বাই ফেথ হিন্দু, রিসাইডিং অ্যাট সতেরোর তিন ফার্ন রোড, কলকাতা…।কী মিস্টার মুখার্জি, অ্যাড্রেসটা ঠিক আছে তো?

নিবেদিতাই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, —হুঁ।

—পিটিশনার নাম্বার টু, শ্রীমতী শরণ্যা মুখার্জি, ওয়াইফ অফ শ্ৰীঅনিন্দ্য মুখার্জি অ্যান্ড ডটার অফ সো অ্যান্ড সো, বাই ফেথ হিন্দু, রিসাইডিং অ্যাট সো অ্যান্ড সো। দিস ইজ অ্যান অ্যাপ্লিকেশান অফ ডিভোর্স আন্ডার মিউচুয়াল কনসেন্ট, সেকশান তেরোর বি, হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট, অ্যামেন্ডেড ঊনিশশো ছিয়াত্তর। বরুণ সামান্য দম নিয়ে গলা তুললেন, —এগুলো মিয়ার ফরম্যালিটি। লিখতে হয়। কার সঙ্গে কার আপোষে বিচ্ছেদ হচ্ছে, সেটাই জাস্ট…

আপোষে বিচ্ছেদ! কথাটা কানে লাগল আর্যর। অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতো শোনায় না?

শ্যামল বললেন, —আপনি ডাইরেক্ট পয়েন্টে চলে আসুন দাদা।

বরুণ বললেন, —হ্যাঁ। খসড়াটা মোটামুটি যা করেছি বলি। পিটিশনার নাম্বার ওয়ান আর পিটিশনার নাম্বার টু-র বিয়ে হয়েছিল গত বছর নভেম্বরের বাইশে। কারেক্ট?

—কারেক্ট।

—তারপর থেকে পিটিশনার নাম্বার টু পিটিশনার নাম্বার ওয়ানের বাড়িতে বাস করতেন। একত্রে দাম্পত্য জীবনযাপনের সূত্রে মার্চের মাঝামাঝি পিটিশনার নাম্বার টু প্রেগন্যান্ট হন। তারপর থেকেই দু’জনের মানসিক অমিল শুরু হয়।…

—অবজেকশান। ও ভাবে একটা পার্টিকিউলার টাইম ধরে মানসিক অমিলের কথা লিখছেন কেন? শ্যামলের আপত্তি শুরু হল, —জেনারেল একটা কমেন্ট করে দিন।

—কী রকম?

—বলতে পারেন বিয়ের পর থেকে স্বামী-স্ত্রীতে মনের মিল হচ্ছিল না।

—ক’মাস বিয়ে হয়েছে মশাই, অ্যাঁ? অমিল হতেও তো সময় লাগে। অবশ্য বিশেষ কোনও রিজন না থাকলে…

নিবেদিতা চোখ সরু করে শুনছিলেন। হঠাৎ গুমগুমে স্বরে বলে উঠেছেন, —রিজন দেওয়ার কোনও কথা ছিল না। বলা হয়েছিল, স্রেফ মেন্টাল অ্যাডজাস্টমেন্টের অভাব দেখালেই…

—তা হলেও একটা ইন্সিডেন্টের পর থেকেই তো…? কী নবেন্দুবাবু, আপনি কী বলেন?

নবেন্দু নয়, দিবেন্দুর জবাব, —দিন ঘুরিয়ে। মিস্টার রায় যে ভাবে বলছেন।

সঙ্গে সঙ্গে টুক করে নবেন্দুর একটা তির, —হ্যাঁ, মিস্টার রায়ের ক্লায়েন্টের মিহি চামড়ায় যখন লাগছে…!

নিবেদিতা কটমট তাকালেন। তবে চোখ ঘুরিয়েও নিলেন।

মাথা নিচু করে খস খস পেন চালাচ্ছেন বরুণ। শ্যামলের ঠোঁটে আত্মপ্রসাদের হাসি। আর্য মনে মনে একটু আশ্বস্ত হলেন। যাক, প্রথম শর নিক্ষেপটা সামলে গেছে তা হলে।

পড়ে চলেছেন বরুণ। নিরাবেগ স্বরে।

হঠাৎ অনিন্দ্য ফস করে উঠল, —মিস্টার সান্যাল, আপনি আগের পয়েন্টটা রিপিট করুন তো।

—কোনটা ভাই?

—ওই যে, প্রফেশানের ব্যাপারটা।

বরুণ খুঁজে খুঁজে পড়লেন ফের, —এইটা? দ্যাট দি পিটিশনার নাম্বার ওয়ান ইজ অ্যান ইঞ্জিনিয়ার, প্রেজেন্টলি আনএমপ্লয়েড, হোয়াইল দি পিটিশনার নাম্বার টু ইজ আ প্রোজেক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ইন আ ননগভর্নমেন্ট অরগানাইজেশান…?

—ইয়েস। আনএমপ্লয়েড লেখার কী দরকারটা ছিল?

নব্যেন্দুর চোখ বরুণে, কিন্তু লক্ষ অনিন্দ্য, —চাকরি নেই বলেই লেখা হয়েছে। ভুল তো কিছু না।

নিবেদিতার দৃষ্টিও বরুণে, —এটা কী কথা? আমার ছেলের আজ চাকরি নেই, কালই সে কোথাও জয়েন করতে পারে।

শ্যামল আবার মক্কেলদের হয়ে আপত্তি জুড়লেন, —আমার মনে হয় ওটা না লিখলেও চলে দাদা। তার চেয়ে শুধু বাই প্রফেশান ইঞ্জিনিয়ার বলাই তো যথেষ্ট।

শরণ্যা ফস করে বলে উঠল, হুঁহ্, বাই প্রফেশান ইঞ্জিনিয়ার! কোনও দিন চাকরি পাবে ও?

অনিন্দ্যর মুখ আজ নিখুঁত কামানো। তার ফরসা গাল সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে গেছে, —এগুলো কিন্তু ডিরোগেটারি কমেন্ট হচ্ছে!

শরণ্যা আবার বলল, —হুহ্।

আর্য ফের তাকিয়ে ফেললেন শরণ্যার দিকে। ওই মেয়েটি নিশ্চুপ থাকলেই কি ভাল হত না এখন? অবশ্য যুদ্ধে নেমে কে’ই বা নীতি মানে!

দিব্যেন্দু হাতের ইশারায় শান্ত করেছেন শরণ্যাকে। ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি। ভাবটা এমন পাঞ্চটা তো মেরেই দিলি, এবার চেপে যা! হাসির সরটুকু ঠোঁটে রেখেই বললেন,—বলছে যখন, মেনে নিন বরুণদা৷ বেকার তো, ইগোয় লাগছে।

—ও কে। ও কে। বাই প্রফেশানই করে দিলাম। বরুণ ঝুঁকলেন ফাইলে,— ওই লাইনগুলোও বদলে দিলাম সামান্য। শুনুন, কী লিখেছি… বিয়ের পর থেকেই শ্রীমতী শরণ্যা আর শ্রীমান অনিন্দ্যর মনের মিল হয়নি। দু’জনেই অশান্তিতে থাকতেন। আই মিন মেন্টাল ডিস্টার্বেন্স। গত জুন মাসের উনিশ তারিখে শ্রীমতী শরণ্যার একটি গর্ভপাত ঘটে, তার পরই দু’জনের মানসিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ রূপে বিপর্যন্ত হয়ে পড়ে। এবং শ্রীমতী শরণ্যা উনিশে জুন নার্সিংহোম থেকেই তাঁর পিত্রালয়ে ফিরে আসেন। উনিশে জুনের পর থেকে দু’জনে আর একত্রে বাস করেননি। ঠিক আছে তো?

—না। ঠিক নেই। আবার কেন একটা ইন্সিডেন্ট মেনশান করছেন?

—বা রে, কিছু তো একটা বলতে হবে। প্রেগনেন্সি বলা যাবে না, মিসক্যারেজ বলা যাবে না…। দিব্যেন্দু পিন ফোটালেন,—বিয়েটা বলা যাবে তো?

নিবেদিতা যেন শুনেও শুনলেন না। রাগত স্বরে বললেন,—মিস্টার রায়, আপনি না বলেছিলেন ওরা কোনও ঘটনারই উল্লেখ করবেন না? বার বার কেন এক কথা উঠছে?

—মিসক্যারেজটা থাকবেই।

—তা হলে রইল আপনাদের মিউচুয়াল, আমরা উঠছি। কেসই হোক। চলুক। দেখব ওই মেয়ে কী ভাবে ডিভোর্স পায়।

—তাতে কি সুবিধে হবে? কোর্টে কিন্তু মা-ছেলের কাপড় খুলে নেব।

—কী ফিল্‌দি ল্যাঙ্গুয়েজ! এই ফ্যামিলিতে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলাম? ছি।… মিস্টার সান্যাল, আইদার আপনি আপনার ক্লায়েন্টকে রেসট্রিক্ট করুন, নয় তো আমরা চললাম।

—আহাহা, উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন কেন? বসুন। বসুন। বরুণ ফিরেছেন দিব্যেন্দুর দিকে,—দেবু, শান্তিতে ড্রাফ্‌টটা ফাইনালাইজ করতে দাও। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, সেপারেশানের দরখাস্তে মিসক্যারেজ থাকলে কী আর এমন সান্ত্বনা হবে? লিভ ইট।… কী মিসেস মুখার্জি, তা হলে আপনারা সন্তুষ্ট তো?

নিবেদিতা গোঁজ।

—ডেট কিন্তু আমায় একটা দিতেই হবে। এটা এসেনশিয়াল।

—দিন। ওই উনিশ একুশ যা ইচ্ছে রাখুন।

আর্যর ভারী অবাক লাগছিল নিবেদিতাকে দেখে। এত অপমানের পরও উঠি চলি বলে বসে রইল! মুখে যাই বলুক, মনে মনে কী ভীষণ ভাবে আপোষে মীমাংসাটা চাইছে সোমশংকরের মেয়ে। পাঁচজনের চোখে ছোট হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে ভুগছে। নইলে নিবেদিতার মতো মহিলা প্রতিপক্ষ উকিলের চেম্বারে আসতে রাজি হয়? সোমশংকরের জুনিয়াররা অনেকেই এখন নামী আইনজ্ঞ, অথচ তাঁদের কারুর কাছে যায়নি নিবেদিতা। উকিলও লাগিয়েছে এক অতি সাধারণ। প্রায় অচেনা। যত চুপিসাড়ে ব্যাপারটা সেরে ফেলা যায়।

মনে মনে হাসলেন আর্য। বিষণ্ণ হাসি। লোকের চোখে তাকে কেমন দেখাবে তার বাইরে এখনও কিছু ভাবতে শিখল না নিবেদিতা। মায়াও হয়। দম্ভকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে কত কী যে হারাল জানতেও পারল না।

ড্রাফ্‌ট বদল হয়েছে। নিবেদিতার কথা মতোই। একবার পড়ে শুনিয়েও দিলেন বরুণ। এসেছেন প্রায় শেষ ধাপে। বললেন,—এবার লাস্ট পয়েন্টটাও বলে নিই? শ্রীমতী শরণ্যা শ্ৰীমান অনিন্দ্যর কাছে কোনও মেইনটেনেন্স বা অ্যালিমনি দাবি করছেন না। …কী দেবু, তাই তো বলেছিলে?

—আমাদের তরফ থেকে ঠিক আছে। আমাদের মেয়ে রোজগার করে। দিব্যেন্দুর গলা মাখনের ছুরি, —তবে শ্যামলবাবুকে জিজ্ঞেস করে নিন, ওঁর ক্লায়েন্ট আমাদের মেয়ের কাছ থেকে ভরণপোষণ চায় কিনা।

অনিন্দ্য চমকে তাকিয়েছে। একবার দিব্যেন্দুকে দেখল, একবার শরণ্যাকে। চোখ ফের লাল,—আমরা কি ফালতু কথা শুনব? না কাজটা শেষ হবে?

—বেশ বেশ। ড্রাফ্‌ট তা হলে ফাইনাল তো? টাইপে দিয়ে দিই? অবশ্য তাড়াহুড়োর কিছু নেই। অ্যাপ্লিকেশন জমা পড়বে তো সেই পুজোর পর…

—সে তো বটেই। বিয়ের একবছরের মধ্যে তো মিউচুয়াল সেপারেশনের প্রেয়ার করা যায় না।

—তার মানে এন্ড অফ নভেম্বর…

দুই উকিলে কেজো বাক্যালাপ চলছে নিরাবেগ স্বরে।

যাক, নিশ্চিন্ত। আর্য হেলান দিলেন চেয়ারে। তাল ঠোকাঠুকি হলেও মোটামুটি থেমেছে যুদ্ধটা। এবার যে যার ঘরে ফিরলেই হয়।

তখনই প্রবল বিস্ফোরণটা ঘটল।

নবেন্দু বুঝি বদলগুলো এখনও হজম করতে পারছিলেন না। হঠাৎই ফুঁসে উঠেছেন,—দাঁড়ান দাঁড়ান। ওদের আগে ইন রাইটিং দিতে বলুন ওরা এই ড্রাফটে এগ্রি করছে। সই করার আগে আবার যেন কোনও ফ্যাকড়া না ওঠে।

—আহা, উনি তো মেনেই নিয়েছেন।

—আপনি আপনার ক্লায়েন্টকে চেনেন না মিস্টার রায়। ওরা সব পারে। ওদের কোনও চোখের চামড়া নেই।

নিবেদিতা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলেন নবেন্দুকে। বরুণকে বললেন,— আমাদের কাজ তা হলে শেষ? আমরা যেতে পারি? আপনি শ্যামলবাবুর কাছে ফাইনাল ড্রাফট পাঠিয়ে দেবেন?

—পালাচ্ছেন ? কালা সাজার ভান করছেন?

নিবেদিতা নিরুত্তর।

—এত সহজে আমি আপনাদের ছাড়ছি না। নবেন্দুর আঙুল কাঁপছে ঠকঠক, —উত্তর দিন। কেন আপনি আমার ভাই আর ভাইঝিকে ইনসাল্ট করলেন সেদিন? কেন?

—আমি? নিবেদিতা আকাশ থেকে পড়লেন, তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, —আপনি কী বলছেন নিজেও জানেন না! আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

—আমার মাথা খারাপ? সেদিন আপনারা চামারের মতো আচরণ করেননি, বুবলির ক’টা ফাইল আর জামাকাপড় আনতে গিয়েছিল…জানেন জানেন, ওই নীচ মহিলা তার রসিদ লিখিয়ে নিয়েছে! আর ওই বাঁদর ছেলে ব্যাগ খুলে সার্চ করছিল কী কী নিল ওরা! আমরা কি চুরি করতে গেছি? চোর?

—ভালর জন্যই তো করেছি। পরে তো ওই নিয়েও ডিসপিউট হতে পারত।

—হুঁহু্‌, ডিসপিউট! আমার মেয়ের সর্বস্ব পড়ে আছে ওখানে…

—আছে তো পড়ে খাট বিছানা। নিয়ে যাবেন। তখনও লিস্ট বানিয়ে সই করিয়ে নেব।

—শুধু খাট বিছানা নেই, আছে আরও অনেক কিছু। আলমারি ওয়ার্ড্রোব ড্রেসিংটেবিল বুককেস…

—নিয়ে যাবেন সাত দিনের মধ্যে। নইলে টান মেরে রাস্তায় ফেলে দেব।

—সাত দিন নয় মা, তিন দিন। বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে ঘর সাফ না হলে আমি কিন্তু ওগুলো লাথি মেরে মেরে ভাঙব।

—ভাঙা ছাড়া আর কিছু শিখেছিস? শিক্ষা পেয়েছিস বাড়ি থেকে? পয়সা খরচ করে জীবনে কিনেছিস কিছু?

—বাবা, চুপ করো। ছোটলোকটার সঙ্গে কথা বোলো না।

—আপনাদের ওই রদ্দি মালগুলোর চেয়ে আমাদের অনেক বেশি দামি জিনিস আপনাদের গব্বায় আছে। বিয়েতে যে ভারী ভারী গয়নাগুলো দিয়েছি সেগুলো কোথায় শুনি ? কার লকারে ঢুকে আছে ওগুলো?

—ওই গয়নায় আমার মেয়ে পেচ্ছাপ করে। ছুড়ে ফেলে দিয়ে আসব।

—দেবেন। গুনে গেঁথে দেবেন।

—আমাদেরও গুনে গুনে প্রত্যেকটি জিনিস ফেরত চাই। যা যা দিয়েছি। চাদর বালিশ জামা কাপড় শাল সোয়েটার….। আপনার ছেলে হাতে যে ঘড়িটা পরে আছে, ওটাও তো আমাদের দেওয়া। ওই আংটিটাও তো আমাদের। গায়ের শার্টটাও এই জামাইষষ্ঠীতে দিয়েছি।

সম্পর্ক ভাঙার এ কী বীভৎস চেহারা! আর্য স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছিলেন। বাইরের দুটো লোক মুখ টিপে হাসছে, তাও কি কারুর খেয়াল নেই?

আর্য জীবনে বোধহয় এই প্রথম চিৎকার করে উঠলেন,—থামো, থামো। থামো এবার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%