তিন

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

সকালে ঘুম ভাঙতেই অনিন্দ্যর মনে পড়ে গেল শরণ্যা নেই। গতকাল বিকেলে বাপের বাড়ি চলে গেছে শরণ্যা। মানিকতলায় সে এখন থাকবে দিন দশেক।

অনিন্দ্যর মেজাজটা খাট্টা হয়ে গেল। বিয়ের পর এই দেড় মাসে শরণ্যা কিছু কিছু নতুন অভ্যেস গড়ে দিয়েছে, এখন ক’দিন প্রতিপদে সেই অভ্যেসগুলো হোঁচট খেতে থাকবে। সামান্য এক কাপ চায়ের জন্যও সেই আগের মতো ডাকাডাকি করতে হবে নীলাচলকে। কোনও মানে হয়?

উঠতে ইচ্ছে করছিল না অনিন্দ্যর। শুয়ে আছে প্রকাণ্ড বিছানার প্রান্তে, গায়ে বিদেশি কম্বল। এই তুলতুলে কম্বল, এই নরম গদি বসানো ইংলিশ খাট, বালিশ চাদর সবই শরণ্যার সঙ্গে এসেছে এ বাড়িতে। নিবেদিতা মুখ ফুটে কিছুই চাননি, বরং মানাই করেছেন, তবু প্রচুর দিয়েছেন শরণার বাবা-মা। চমৎকার একখানা ড্রেসিংটেবিল, মেয়ে-জামাইয়ের জন্য আলাদা আলাদা ওয়ার্ড্রোব, আলমারি, মেয়ে বই পড়তে ভালবাসে বলে বাহারি বুককেস…। নতুন আসবাবপত্রে পুরনো আমলের বিশাল ঘরখানার চেহারাই যেন বদলে গেছে। গন্ধও। বালিশে মুখ গুঁজেও অনিন্দ্য গন্ধটা টের পাচ্ছিল।

জানলার পরদা ভেদ করে আলো এসে পড়েছে ঘরে। হলদে আলোয় ভেসে যাচ্ছে পুবের ঘরখানা। শুয়ে থাকতে থাকতেই হাত বাড়িয়ে সাইডটেবিল থেকে রিস্টওয়াচখানা তুলল অনিন্দ্য। সাতটা পঁয়ত্রিশ। শরণ্যার ঘড়িটাও পড়ে আছে পাশে। সম্ভবত নিয়ে যেতে ভুলে গেছে শরণা। জোড় মিলিয়ে বানানো একই ডিজাইনের ঘড়ি। শরণ্যার ছোটমামার উপহার। দ্বিতীয় ঘড়িখানা তুলেও অনিন্দ্য সময় দেখল একবার। দু’ মিনিট এগিয়ে আছে শরণ্যা। আশ্চর্য, এত তাড়াতাড়ি কেন তফাত এসে গেল? মিলিয়ে এক করে দেবে? শরণ্যাকে পিছোবে? না নিজেরটা এগোবে? কিন্তু কোনটা ঠিক?

ধুস, যেমন আছে থাক। অফিসের দিন, বিছানায় শুয়ে আর দেয়ালা করা ঠিক হচ্ছে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গা থেকে কম্বলটাকে লাথি মেরে সরিয়ে অনিন্দ্য নামল বিছানা থেকে। ঢুকেছে লাগোয়া বাথরুমে। অনিন্দ্যর দাদামশাই সোমশংকর চ্যাটার্জি ছিলেন পাক্কা সাহেব, এ বাড়ি বানিয়েছিলেন সাহেবি কায়দায়, প্রতিটি শয়নকক্ষের সঙ্গেই বাথরুম আছে। স্নানাগারগুলোর চেহারাও তারিফ করার মতো। খাঁটি ইটালিয়ান মার্বেল বসানো। বাথটব শোভিত। এখন অবশ্য বাথটবটার ভগ্নপ্রায় দশা, দেখে অতিকায় গামলা মনে হয়। মেঝের মার্বেলও ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে। অনিন্দ্য অবশ্য ওসবের দিকে তাকায় না। বাথরুমের কাজটুকু মিটলেই তার যথেষ্ট।

ছরছর করে কমোডে পেচ্ছাপ করল অনিন্দ্য। তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করল পেচ্ছাপের রংটা। কাল একটু হলুদ হলুদ লেগেছিল, আজ মোটামুটি বর্ণহীন। নাহ্, শরীর ঠিকই আছে। নিশ্চিন্ত মনে কল খুলল বেসিনের। জানুয়ারির গোড়ায় এবার বেশ ভালই শীত পড়েছিল, ক’দিন হল ঠান্ডা কমেছে, তবে জলে এখনও বেশ কনকনে ভাব। হাত বাড়িয়ে গিজার অন করতেই ফের তিরিক্ষি মেজাজটা ফিরে এল অনিন্দ্যর। কাল নীলাচলকে বলেছিল গিজার চলছে না, কিন্তু এখনও সারানো হয়নি। নীলাচল আর কী করবে, এ বাড়িতে তো কর্ত্রীর ইচ্ছায় কর্ম! আচ্ছা, গিজার ইস্যুতে নিবেদিতা দেবীর সঙ্গে একটা ছোট্ট ফাটাফাটি করলে কেমন হয়? বাপের সম্পত্তি শুধু ভোগই করে যাবে, দরকারে অদরকারে দু’ পয়সা ঢালবে না? ওই তো ছিরির একটা রং করা হল, বাড়ির ফাটাফুটোগুলো পর্যন্ত ভাল করে সারাল না! শরণ্যা তো নেই, এ সময়ে দেবে নাকি একটা ঝাড়?

ভাবনাটায় অদ্ভুত রকমের তৃপ্তি আছে। টগবগ ফুটতে থাকল অনিন্দ্য, আবার মনটা যেন শান্তও হল অনেকটা। বাথরুম আগে বেশ অগোছালো থাকত, শরণ্যা সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে জিনিসপত্র, দরকারি সাজসরঞ্জাম হাতের কাছে পেতে আজকাল আর অসুবিধে হয় না। ঝটপট মুখ ধুয়ে দাড়ি কামিয়ে নিল অনিন্দ্য। গালে ঠান্ডা জল ছোঁয়ানোর সময় মনে পড়ে গেল গিজার খারাপ বলে শরণ্যা কাল রান্নাঘর থেকে জল গরম করে এনে রেখে দিয়েছিল বাথরুমে। নিজে থেকেই। অনিন্দ্যর ছোট ছোট আরামগুলোর কথাও কী নিখুঁত ভাবে স্মরণে রাখে শরণ্যা।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে অনিন্দ্য নতুন কাশ্মীরি শালখানা জড়িয়ে নিল গায়ে। এটাও বিয়েতে পাওয়া। তত্ত্বে এসেছিল। ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ার থেকে চিরুনি বার করে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে হঠাৎ নজরে পড়ল কম্পিউটারের আলো জ্বলছে। কাল রাত্তিরে চ্যাট রুমে থাকতে থাকতে ঘুম এসে গিয়েছিল, তাই বোধহয় অফ করা হয়নি। এহ্, পি.সি.-টা কিনতে গাঁট থেকে কড়কড়ে আটত্রিশ হাজার টাকা বেরিয়ে গেছে? এমন ভুলের কোনও ক্ষমা নেই!

কম্পিউটারের সুইচ অফ করছে অনিন্দ্য, দরজায় নীলাচল, —বড়দা, তুমি উঠে পরেছ?

অনিন্দ্য ঘাড় বেঁকাল, —কেন?

নীলাচল এ বাড়িতে এসেছিল বারো বছর বয়সে। বাড়ি মেদিনীপুরের দাঁতনে। নীলাচলের বাবা ত্রিভুবন কাজ করত সুহাসিনী ওয়েলফেয়ার সোসাইটিতে, বছর দশেক আগে সে তার ছোটছেলেকে নিবেদিতার কাছে দিয়েছিল। বেশ চালাক চতুর ছেলে নীলাচল, এ বাড়ির পরিবেশের সঙ্গে সে দারুণ সড়গড়ও হয়ে গেছে, রান্নাবান্না ছাড়া সমস্ত ধরনের কাজই করে সে৷ নীলাচলকেই মুখার্জিবাড়ির গিন্নি বলা যায়।

কুচকুচে কালো, গাঁট্টাগোট্টা চেহারা নীলাচল ঝকঝকে দাঁত বার করে হাসছে,

—বউদিমণি তোমায় আটটার মধ্যে ঘুম থেকে তুলে দিতে বলেছে।

—অ।

—এখানে চা দেব? না টেবিলে আসবে?

—অসুবিধে না হলে ঘরেই দিয়ে যা।

—আমার অসুবিধে কী? যে যা বলবে তাই হবে।

এ বাড়িতে বেড-টির চল নেই। থাকবে কী করে, কে কখন ঘুম থেকে ওঠে তার ঠিক আছে? আর্যর নিদ্রাভঙ্গ হয় ব্রাহ্ম মুহূর্তে, নিয়মিত মর্নিংওয়াকে বেরোন, পথেই কোথায় যেন চা খেয়ে নেন তিনি। নিবেদিতার ঘুম ভাঙার টাইম সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা, কোনও বিশেষ কাজ থাকলে ভোরে উঠেও বেরিয়ে যান, তাঁর বেড-টি খাওয়ার অভ্যেসটিই নেই। আর সুনন্দ কখন বিছানায় যায়, কখন বিছানা ছাড়ে, কখন সে চা খাবে, কখন নয়, সে খবর তো সুনন্দ ছাড়া কেউ জানে না। অনিন্দ্যও উঠত আটটার পরে, বেশির ভাগ দিনই অফিসের দেরি হয়ে যেত, চা খেত একেবারে বেরোনোর আগে, ব্রেকফাস্ট করার সময়ে।

শরণ্যা আসার পর ছবিটা বদলেছে। অন্তত অনিন্দ্যর ক্ষেত্রে। চায়ের কাপ পৌঁছে যাচ্ছে অনিন্দ্যর বিছানায়। এবং সেটা সাড়ে সাতটা বাজার আগেই। শরণ্যা নিজেও বেলা অবধি শুয়ে থাকতে পারে না, অনিন্দ্যকেও বেশিক্ষণ গড়াগড়ি খেতে দেয় না বিছানায়। ছুটির দিনেও না।

এও তো অভ্যেসের বদল। নীলাচল চা দিয়ে গেছে, কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিল অনিন্দ্য। আর কী কী পরিবর্তন ঘটেছে? আগে শার্টপ্যান্ট যেমন তেমন ভাবে ছড়ানো থাকত, যেটা হাতের সামনে পেল সেটাই গলিয়ে অনিন্দ্য ছুট লাগাচ্ছে, এখন কোন দিন কী পরবে শরণ্যাই ঠিক করে দেয়। খাওয়ার সময়ে পাশে কেউ দাঁড়িয়ে, এটাও কি পরিবর্তন নয়! অফিস থেকে ফিরে এতদিন অনিন্দ্যর কাজ ছিল সিডি চালিয়ে হরর মুভি দেখতে দেখতে একা একা মদ্যপান, নয়তো কম্পিউটারে চ্যাট রুম খুলে বসে থাকা। কিংবা স্রেফ শুয়ে থাকা টান টান। আর ছুটির দিনে তো শুধুই শুয়ে থাকা, অনন্ত শুয়ে থাকা। সেই সঙ্গে মনে মনে মাকড়সার জাল বুনে যাওয়া অবিরাম। জীবনে কী কী সে পায়নি, কোনটা কোনটা থেকে সে বঞ্চিত হয়েছে তার হিসেব কষতে কষতে বিষাক্ত লালা ঝরত হৃদয় থেকে, আঠালো জালে বন্দি হয়ে ছটফট করত অনিন্দ্য। এখন তো সন্ধে মানেই শরণ্যা। কত কী যে কানের কাছে বিনবিন করে যায় মেয়েটা। কী বলে আর কী না বলে। নিজের বাড়ির লোকদের কথা, কলেজ ইউনিভার্সিটির গল্প, বন্ধুদের উপাখ্যান…। শরণ্যা একটুক্ষণ চুপ করে থাকলে ইদানিং কেমন যেন অস্বস্তি হয় অনিন্দ্যর। এ তো রীতিমতো বড়সড় বদল। অনিন্দ্যকে আজকাল দু’ পেগের বেশি পান করতে দেয় না শরণ্যা, হাত থেকে গ্লাস কেড়ে নেয়। ক’দিন আগেও অনিন্দ্যর কাছে এ তো অচিন্ত্যনীয় ছিল।

সবচেয়ে বড় বদলটা বোধহয় এসেছে অনিন্দ্যর মনোজগতে। সে তো ছোট থেকেই একা। এই একাকিত্বকে সে তো নিয়তির মতোই মেনে নিয়েছিল। বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল খানিকটা জৈবিক কারণে। তার এক মামিমা, নিবেদিতার খুড়তুতো দাদার স্ত্রী স্বরূপা, হঠাৎই এনেছিলেন সম্বন্ধটা। শরণ্যার এক মাসি স্বরূপার ঘনিষ্ট বন্ধু, সেই সূত্রে। তা বিয়েটা ঘটে যাওয়ার পরও অনিন্দ্যর ধারণা ছিল শরীরটুকু ছাড়া আর কোনও রকম সম্পর্ক বোধহয় গড়ে উঠবে না মেয়েটার সঙ্গে। শরণ্যাকেও বেশ গায়ে পড়া মনে হত প্রথম প্রথম। কিন্তু দার্জিলিংয়ের একটা রাত তাকে যেন আমূল নাড়িয়ে দিল। সেদিন মাঝরাতে শরণ্যার কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অনিন্দ্যর। কী কাণ্ড, বিছানায় উপুড় হয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা! শুধু অনিন্দ্য তার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেনি বলে! শুধু অনিন্দ্য তাকে একা ফেলে চলে এসেছিল বলে!

কী অসম্ভব এক দৃশ্য।

একটা মেয়ে শুধু অনিন্দ্যর জন্য এত আকুল হতে পারে?

ওই মেয়ের চোখে অনিন্দ্য এত মূল্যবান?

পৃথিবীতে তা হলে এক জনও অন্তত আছে যে শুধুই অনিন্দ্যর কথা ভাববে এবার থেকে? শুধু অনিন্দ্যকেই ভালবাসবে? মনে করবে অনিন্দ্য ছাড়া তার অস্তিত্ব বৃথা?

মনের মধ্যে গড়ে-ওঠা এই রোমাঞ্চকর ভাবনাগুলোই অনিন্দ্যকে তোলপাড় করছে দিনরাত। ভাবনা নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। বিশ্বাস। অহরহ তার হৃদয়ের তন্ত্রীতে ঝংকার উঠছে— শরণ্যা আমার, শরণ্যা আমার, শরণ্যা আমার।

এই অনুভূতিতে যে কী তীব্র সুখ!

সুখটুকুকে গায়ে মেখে স্নানে গেল অনিন্দ্য। বেরিয়ে অফিসের জন্য তৈরি হল ঝটপট। তারপর সোজা খাওয়ার টেবিলে।

সাধারণত এ সময়ে ডাইনিংটেবিল ফাঁকাই থাকে। আজ পরিবারের দুই সদস্য আগেভাগে মজুত। সাবেকি আমলের বড়সড় ডাইনিংটেবিলের ঈশাণ কোণে আর্য, নৈঋত কোণে সুনন্দ। প্রাতরাশ চলছে। সুনন্দ এমন গপগপ করে খাচ্ছে যেন এক্ষুনি কেউ তার প্লেট থেকে খাবার কেড়ে নেবে। সম্ভবত তাড়া আছে। আর্যর মুখের সামনে খবরের কাগজ, ক্কচিৎ কখনও হাত নামছে প্লেটে। মুখ চলছে অতি ধীরে, যেন লোহা চিবোচ্ছেন। অবশ্যই তাড়া নেই।

অনিন্দ্য দখল করল অগ্নি কোণ। তার চেয়ার টানার শব্দ বোধহয় একটু জোরেই হয়েছিল, পলকের জন্য হাত থামল সুনন্দর, কাগজ থেকে উঠল আর্যর চোখ। পরক্ষণেই আবার যে যার নিজস্ব ছন্দে।

অনিন্দ্য গলা ওঠাল, —নীলাচল?

—আসছি। রান্নাঘর থেকে উত্তর উড়ে এল, —এক মিনিট।

অনিন্দ্য ঘড়ি দেখল। আটটা চল্লিশ। মিনিট পনেরোর মধ্যে রওনা দিতে পারলে সাড়ে ন’টায় অফিসে ঢুকে যাবে। শেয়ার ট্যাক্সিতে কতক্ষণ আর লাগবে থিয়েটার রোড। জোর বিশ মিনিট। আজ সপ্তাহের প্রথম দিন, আজ দেরি করাটা উচিত হবে না।

দু’হাতে চায়ের কাপপ্লেট ব্যালান্স করতে করতে রান্নাঘর থেকে ধেয়ে এল নীলাচল। টেবিলের দু’কোণে পেয়ালা পিরিচ নামিয়ে ঝড়ের বেগে অনিন্দ্যর সামনে,— তোমার টোস্ট রেডি। সীতাদি বাটার লাগাচ্ছে। সঙ্গে কী খাবে? হাফ বয়েল ? না ওয়াটার পোচ?

—দে যা হোক। জলদি কর।

—তোমায় দুটো করে কলা দিতে বলেছে বউদিমণি।

শরণ্যা কিছুই বলতে ভোলেনি। অনিন্দ্য টেবিলে টকটক করল, —দে। সঙ্গে আজ কফি দিস।

নীলাচল তির বেগে চলে গেল।

আর্য পুরো কাপ চা খান না, দু’-তিনটে চুমুক দিয়ে উঠে পড়েছেন। কয়েক পা গিয়েও দাঁড়ালেন। শীতল গলায় অনিন্দ্যকে জিজ্ঞেস করলেন, —তুমি কি নিউজ পেপারটা দেখবে?

অনিন্দ্য কাঁঝ ঝাঁকাল, —নো। থ্যাংকস্।

কাগজ হাতে আর্য ধীর পায়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখনই টেবিলের বায়ুকোণে যাঁর বসার কথা সেই নিবেদিতার আবির্ভাব। নিজের কোটর থেকে। পরনে সবুজ কটকিপাড় তসর, গায়ে তসর-রঙা শাল। পারফিউম ছড়িয়েছেন শরীরে, সবাসে ভরে গেছে হলঘর।

বায়ুর গতিতে আর্যকে পার হয়ে রান্নাঘরের দিকে গেলেন নিবেদিতা। ক্ষণপরেই শাড়িতে খসখস শব্দ বাজিয়ে ফিরেছেন। টেবিলের কাছে এসে একবার সুনন্দকে দেখলেন, একবার অনিন্দ্যকে।

কেজো গলায় অনিন্দ্যকে প্রশ্ন করলেন, —শরণ্যা কাল গেল কখন?

শৌখিন কৌতুহল! অনিন্দ্য দায়সারা ভাবে বলল, —গেছে কোনও এক সময়ে।

—তুমি পৌঁছে দিয়ে এসেছিলে তো?

অনিন্দ্য টেরছা ভাবে বলল, —জানাটা কি বিশেষ জরুরি?

—টেড়াবেঁকা কথা বলছ কেন? সোজা কথার সোজা জবাব হয় না?

—বাঁকা মানুষদের সোজা উত্তর দিতে নেই।

—সক্কালবেলা ফর নাথিং তুমি আমায় ইনসাল্ট করছ কেন?

—তুমিই বা আন্‌নেসেসারি প্রশ্ন করছ কেন?

—স্ট্রেঞ্জ! বাড়ির বউ কখন বাপেরবাড়ি গেল জিজ্ঞেস করাটা আন্‌নেসেসারি কোয়েশ্চেন?

—বাড়ির বউ নয়। আমার বউ। তুমি যখন তার যাওয়া আসার দায়িত্ব নাওনি, তখন সে কী ভাবে গেল, কখন গেল তা জানারও তোমার মরাল রাইট নেই।

—ও কে, ও কে, আয়াম সরি। সামান্য একটা প্রশ্নকে নিয়ে তুমি এত চটকাবে জানলে আমি কিছুই জিজ্ঞেস করতাম না। নিবেদিতা চাপা স্বরে ঝলসে উঠলেন— বিয়ে করেও তুমি শোধরালে না অনিন্দ্য। দিনকে দিন ক্রুকেড হচ্ছ।

—আমাকে সিধে করার জন্য বিয়ে দিয়েছিলে বুঝি?

—ওফ্, হরিবল্। তোমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মাথা ঠান্ডা রাখা খুব মুশকিল।

—কথা বলো কেন? কেটে পড়ো। যেখানে যাচ্ছ, যাও।

নিবেদিতা তবু নড়লেন না, ঘন ঘন কবজি উলটোচ্ছেন।

সুনন্দ নির্বিকার মুখে চা খাচ্ছিল। মুখভাব এমন, যেন দুটো ভিন্ন গ্রহের প্রাণী কথা বলছে তার সামনে, সে তাদের ভাষা বুঝছেও না, শুনছেও না। কাপ শেষ করে উঠে পড়ল, শিস দিতে দিতে ঢুকে গেল নিজস্ব গুহায়।

ঘাড় ঘুরিয়ে ছোট ছেলেকে দেখতে দেখতে নিবেদিতা গলা চড়ালেন—কী রে নীলাচল, কী হল কী? বললাম না, সুরেন গাড়ি বার করেছে কিনা দ্যাখ?

অনিন্দ্যকে খেতে দিয়েই ত্বরিত পায়ে নীচে গেল নীলাচল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার চিৎকার, —মা, গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না।

—ডিসগাস্টিং। নিবেদিতা গজগজ করে উঠলেন, —আজ এত কাজ… হাজরা ঘুরে এগারোটার মধ্যে বেহালা পৌঁছোতে হবে… আজই কিনা…।

টোস্ট চিবোতে চিবোতে অনিন্দ্য পুটুস মন্তব্য ছুড়ল, —গাড়ি যে চড়ে গাড়ির পেছনে তাকে কিছু খরচাও করতে হয়।

—আমি জানি। নিবেদিতা বিরক্ত মুখে তাকালেন, —তোমার নিজের সেই বোধটুকু আছে তো? বলেই হনহনিয়ে নেমে গেছেন একতলায়।

অনিন্দ্য চিড়বিড়িয়ে উঠল। কী ইঙ্গিত করে গেল মা? ইদানীং অনিন্দ্য মাঝে মাঝে গাড়িটা ব্যবহার করছে, তাই নিয়ে খোঁটা দিল কি? অনিন্দ্যর বাথরুমের গিজার অনিন্দ্যকেই সারিয়ে নিতে বলল না তো? নাকি সংসারে থাকতে গেলে টাকাপয়সা দিতে হয়, কায়দা করে সেই কথাটাই শুনিয়ে গেল?

ইল্লি রে, কেন দেবে টাকা? চায়ই বা কোন মুখে? লেখাপড়া শেখানোর খরচটুকু ছাড়া ছেলের প্রতি আর কোন কর্তব্যটা পালন করেছে? একজন তো সারা জীবন গর্তে ঢুকে বসে রইলেন, আর একজন উড়ছেন সর্বক্ষণ! সমাজসেবা! হাহ্। এতই যখন মহৎ সাজার নেশা, মা হওয়ার দরকারটা কী ছিল? ছেলেকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিব্যি হাত ধুয়ে বসে রইল, স্কুলে গিয়ে তাকে একবার দেখে আসার কারুর সময় হয় না! সব ছেলের বাবা-মা আসছে, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো খুশিতে ডগমগ, সারা সপ্তাহের খুঁটিনাটি তারা উগরে দিচ্ছে বাবা-মার কাছে, কোলের কাছে বসে সন্দেশ কমলালেবু খাচ্ছে, শুধু অনিন্দ্য একা দাঁড়িয়ে ফাঁকা করিডোরে। কাঁদতে পারছে না, পাছে বন্ধুরা খেপায়। আরও আছে। ছুটিতে বাড়ি এল অনিন্দ্য, কারুর তাকে সময় দেওয়ার সময় নেই, বাপ-মা দু’জনেই যে যার জগতে বিভোর। কখনও যদি একত্র হয়ও, দু’জনে কামড়াকামড়ি করে কুকুরের মতো। উহু, একজনই কামড়ায়, অন্য জন আর্তনাদ করে। কিছু ভোলনি অনিন্দ্য। সব মনে আছে। সব।

এখন সেই মা কী করে আশা করে ছেলে চাকরি করে তার হাতে টাকা এনে তুলে দেবে?

কিচ্ছু দেবে না অনিন্দ্য। কোনও দিন না। এক পয়সাও না।

নিমতেতো মেজাজে অনিন্দ্য বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। বাইরে একটা ঝকঝকে দিন। আকাশ নির্মেঘ, সূর্য তেমন প্রখর নয়, হাওয়াতেও ভারী নরম শীতলতা। এমন সুন্দর দিনটা, রাস্তাঘাট লোকজন যানবাহন সবই অনিন্দ্যর বিরস লাগছিল আজ।

অফিসে পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই ইন্টারকমে চিফ ইঞ্জিনিয়ারের ডাক, —মুখার্জি, একবার এসে তো।

কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অফিস। বিশাল নামজাদাও নয়, আবার একেবারে অখ্যাতও নয়। কাজকর্ম বেশির ভাগই হয় সাইটে সাইটে, অফিসে তাই লোকজনের সংখ্যা কম। জোর জনা চল্লিশ। থিয়েটার রোডের বহুতল বাড়ির পঞ্চম তলার অফিসটাকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে বাঙালি মালিকরা।

চিফ ইঞ্জিনিয়ারের ঘর ম্যানেজিং ডিরেক্টারের ঘরের পাশেই। প্রধান বাস্তুকার বাদলবরণ ভৌমিক ওরফে বি বি-র বয়স বছর পঞ্চাশ, গোলগাল চেহারা, মাথা জুড়ে টাক আছে। বি বি কোম্পানির একজন অংশীদারও বটে।

অনিন্দ্য যেতেই বি বি সহাস্য মুখে বললেন, —বোসো। মন দিয়ে কথাগুলো শোনো। লাস্ট উইকে রেলের একটা টেন্ডার বেরিয়েছিল। তিনটে ওভারব্রিজ কনস্ট্রাকশানের। উই লাইক টু বিড ফর দি অর্ডার।

অনিন্দ্য ঝিমোনো গলায় বলল, —রেলে অর্ডার আমরা পাব কি স্যার? মনে হয় না।

—তুমি সব সময়ে এত পেসিমিস্টিক কেন বলো তো? এক বার পাইনি, দু’বার পাইনি, থার্ড বার পেতেও পারি। বি বি গাল চওড়া করে হাসলেন। চোখ টিপে বললেন, —ইনফ্যাক্ট, আমরা গ্রিন সিগনালও পেয়েছি। বাট উই হ্যাভ টু প্রসিড ভেরি সুন। শুক্রবার টেন্ডার ভরার লাস্ট ডেট।

—ও।

—সুতরাং বুঝতে পারছ, উইদিন থ্রি ডেজ আমাদের প্ল্যানটা তৈরি করে ফেলতে হবে। ওয়েডনেজডে’ই আমরা এস্টিমেটে বসব।

অনিন্দ্য আবার বলল, —ও।

—তুমি আজকের মধ্যেই ইনিশিয়াল লে-আউটটা করে ফ্যালো। অসীম আর সুজিত তোমায় হেল্‌প করবে।

—এক দিনে কী করে হবে স্যার?

—কাম অন ইয়াং ম্যান। না হওয়ার কী আছে? একটা ওভারব্রিজেরই তো লে-আউট করবে, বাকি দুটো তো সিমিলার কেস। স্টেশনগুলোর ডিটেল ডাটা… আই মিন লেংথ, হাইট, কী চাইছে রেল, সবই আমাদের হাতে আছে। টেবিল থেকে ফাইল বাড়িয়ে দিলেন বি বি, —দ্যাখো খুলে। কাজটা মোটেই কঠিন নয়।

ফাইলে আলগা ভাবে চোখ বোলাল অনিন্দ্য। মাথা নেড়ে বলল, —বাট ইটস্ টাইম কনজিউমিং স্যার।

—টাইম দাও। খাটো। এই বয়সে সময় না দিলে কবে আর কাজ করবে ?

—এক দিনে হবে না স্যার।

—হবে না ইজ এ ডার্টি ওয়ার্ড মুখার্জি। বলতে নেই। প্লিজ গো অ্যান্ড ডু ইট। দরকার হলে লেট আওয়ার্স অব্দি থেকে করে দাও।

বি বি-র চেম্বার থেকে বেরিয়ে মেজাজ আরও বিগড়ে গেল অনিন্দ্যর। মতলটা কী বি বি-র? জানে কাজটা এক দিনে করা সম্ভব নয়, তবু কেন এমন জোরাজুরি করছে? অনিন্দ্যকে ফাঁদে ফেলার ধান্দা? হিউমিলিয়েট করতে চায়? তাড়ানোর প্ল্যান ভাঁজছে নাকি? হাহ্, অনিন্দ্য সে সুযোগ দিলে তো! কী এমন মাইনে দেয় যে রাত দশটা-এগারোটা অবধি কলুর বলদের মতো খাটবে সে? ছ’ বছরে অনিন্দ্য তিনটে চাকরি ছেড়েছে, তেমন হলে এই চার নম্বরটাকেও ছেঁড়া চটির মতো ফেলে দেবে। নয় বসে থাকবে দু’-চার মাস, তারপর একটা কিছু ঠিকই জুটে যাবে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের এখনও তত বুভুক্ষুর দশা হয়নি যে দাঁতে দাঁত চেপে এক চাকরিতেই পড়ে থাকতে হবে।

রাগটা মাথায় পুষে রেখেই টেবিলে এসে কাজে বসল অনিন্দ্য। দুই ড্রাফট্সম্যানকে সঙ্গে নিয়ে। ঘণ্টা পাঁচ-ছয় খেটেখুটে একটা ওভারব্রিজের মোটামুটি নকশা বানিয়েও ফেলল। এখনও নিখুঁত হয়নি, ঘসামাজা দরকার। কিন্তু শরীর আর চলছে না, ঝিমঝিম করছে মাথা।

অসীমকে বলল, —আজ এই পর্যন্ত থাক। কাল ফাস্ট আওয়ারে কমপ্লিট করে ফেলব। বেশিক্ষণ তো আর লাগবে না, কী বলেন?

অসীমের বয়স বছর চল্লিশ। সংসারী, সাবধানী মানুষ। সে নার্ভাস গলায় বলল, —কিন্তু বি বি যে আজকেই কাজটা…!

—সম্ভব নয়। আমি কি মেশিন?

সুজিতের বয়স কম। অনিন্দ্যরই সমবয়সি প্রায়। সে বলল, —আপনি তো বলছেন বাকি দুটোও এক টাইপ হবে। আমরা কি প্রথমটা দেখে দেখে এগোব? যতটা পারি?

সুজিত কি বি বি-র লোক? অনিন্দ্যকে বাজিয়ে দেখছে? অনিন্দ্যর সে রকমই সন্দেহ হল। ধুর, হলেই বা কী এসে যায়? কেউ সামান্যতম বেগড়বাই করলে সে তো চাকরিটা ছেড়েই দেবে।

অনিন্দ্য শ্রাগ্‌ করল, —পারলে করুন। আমি কাল এসে চেক করে নেব। বি বি খোঁজ করলে বলবেন মাথার যন্ত্রণা হচ্ছিল, চলে গেছে।

ঘড়ি ধরে ঠিক সাড়ে পাঁচটায় পথে নেমে পড়ল অনিন্দ্য। কোথায় যাওয়া যায় এখন? বাড়ি? ভালো লাগছে না। সিনেমা দেখতে ঢুকবে? একা একা সিনেমা দেখার অভ্যেস আছে অনিন্দ্যর। সত্যি বলতে কী, অজস্র অচেনা মানুষের ভিড়ে ওই একা হয়ে থাকাটা বেশ উপভোগই করে সে। এ যেন আমি সবাইকে দেখছি, অথচ আমাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না এমনই একটা খেলা। ধুৎ, সিনেমায় যেতেও ইচ্ছে করছে না আজ। ভেতরে ভেতরে অন্য একটা টান অনুভব করছে অনিন্দ্য। নিশির ডাকের মতো। সদ্য চেনা এক মাদকের আহ্বান বেজে উঠছে রক্তে। কিন্তু কালই তো শরণ্যাকে পৌঁছে দিতে গিয়েছিল, আজ আবার ওখানে ঢুঁ মারাটা কি ভাল দেখাবে?

রাস্তায় চরকি খেতে খেতে অনিন্দ্য শেষ পর্যন্ত ঝেড়ে ফেলল দ্বিধাটা। সে যাবে তার শরণ্যার কাছে, এতে এত ভাবাভাবির কী আছে?

শরণ্যাদের বাড়ি মানিকতলা মোড়ের কাছেই। চারতলা ফ্ল্যাট বাড়ি, নবেন্দুরা থাকেন তিনতলায়। অনিন্দ্য পৌঁছে দেখল নবেন্দু মহাশ্বেতা দু’জনেই ফিরে এসেছেন অফিস থেকে। অনিন্দ্যর আকস্মিক আগমনে তাঁরা যতটা না বিস্মিত, তার চেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত। কী করবেন, কী না করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। মহাশ্বেতা হুটোপুটি করে ঢুকে পড়লেন রান্নাঘরে, শরণ্যার ঠাকুমাও তাঁর হাতে হাত লাগাচ্ছেন। নবেন্দু ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়লেন, আজ রাত্রে জামাইকে না খাইয়ে ছাড়ছেন না।

অনিন্দ্যকে ঘিরে নবেন্দু-মহাশ্বেতার মাঝারি সাইজের ফ্ল্যাটখানা সহসা যেন খুশির ঝরনা।

শ্বশুরবাড়ির এই আন্তরিক আদর আপ্যায়ন অনিন্দ্যর বেশ লাগে। তার কাছে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। এখানে এলেই নিজেকে একজন কেউকেটা বলে মনে হয়। আবার একটু একটু অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে কখনও কখনও। মাঝে মাঝেই মনে হয় তাকে এত খাতিরযত্ন করাটা কি স্বাভাবিক হতে পারে? নিশ্চয়ই কৃত্রিমতাটাকে সুচারু ভাবে গোপন করে রাখেন শরণ্যার বাবা-মা! শরণ্যাকেও এ বাড়িতে যেন কেমন অন্য রকম লাগে। ফার্ন রোডের বাড়ির শরণ্যা আর মানিকতলার বাড়ির শরণ্যায় যেন আকাশ-পাতাল তফাত। এখানে শরণ্যার হাঁটাচলা হাসি কথা সবই যেন ভিন্ন প্রকৃতির।

সেই শরণ্যা এখন মুখ টিপে টিপে হাসছে। অনিন্দ্য শরণ্যাকে দেখছিল। দু’জনে বসে আছে সেই ঘরখানায়, যেটা ক’দিন আগেও শরণ্যার বেডরুম ছিল।

ঠোঁটের হাসি চোখে এনে শরণ্যা বলল, —কী দেখছ? হাঁ করে ?

—তোমায়। অনিন্দ্য গুমগুমে গলায় বলল, —দিব্যি মজাসে আছ। সারা দিনে একটা ফোন করারও সময় পেলে না?

—তোমার লাইন পাওয়া গেলে তো। দুপুরে অন্তত এক ঘণ্টা ট্রাই করেছি।

—বাজে কথা। ফার্ন রোড থেকে তো রোজ লাইন পাও, আর মানিকতলায় এসেই…! কী হয় তোমার, অ্যাঁ? এ বাড়িতে ঢুকেই আমায় ভুলে যাও?

শরণ্যা খিলখিল হেসে উঠল, —সেই ভেবে তুমি হালুম হুলুম করে চলে এলে?

হাসিটা অনিন্দ্যর মোটেই পছন্দ হল না। গোমড়া মুখে বলল, —না এলেই বুঝি খুশি হতে?

—ওমা, তাই বললাম নাকি? শরণ্যার হাসি আরও মদির, —আমারও তোমায় খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল। সত্যি। খুব মনকেমন করছিল।

—তা হলে চলো। অনিন্দ্য ঝপ করে বলল, —আর এখানে থাকতে হবে না।

—হুঁউ ?

—হুঁ নয়, হ্যাঁ। তুমি আজই আমার সঙ্গে ফিরবে। অ্যান্ড আই মিন ইট।

—যাহ্, তা হয় নাকি? শরণ্যা ফের হেসে ফেলল, —সবে কাল এলাম…

—তো? কাল এসেছ বলে আজ যাওয়া যায় না?

—এমা ছি। লোকে কী বলবে?

—আমি লোকফোক কেয়ার করি না। তুমি রেডি হয়ে নাও।

এতক্ষণে থমকেছে শরণ্যা। স্থির চোখে অনিন্দ্যকে দেখতে দেখতে বলল, —হঠাৎ ছেলেমানুষি শুরু করলে কেন? বললেই যাওয়া যায় নাকি?

—কেন যায় না?

—বা রে, বাবা-মা’র কাছে ক’টা দিন থাকব বলে এই প্রথম এলাম… বাবা-মা কী ভাববে? কষ্ট পাবে না?

অনিন্দ্য থমথমে মুখে বলল, —বাবা-মা কষ্ট পাবে বলে তুমি যাবে না?

—আমারও খারাপ লাগবে। শরণ্যার গলাটা আদুরে আদুরে হল, —আমার বুঝি বাবা-মার কাছে থাকতে ইচ্ছে করে না?

—যাবে না তা হলে? অনিন্দ্য ঝট করে উঠে দাঁড়িয়েছে, —থাকো তবে। যে ভাবে খুশি। যদ্দিন খুশি।

—অ্যাই অ্যাই, কী হল? কোথায় চললে? বোসো।

—কেন বসব? কীসের জন্য বসব?

বলেই অনিন্দ্য গটমট করে ড্রয়িং-ডাইনিং স্পেসে। সোফায় বসে জুতো পরছে।

শরণ্যা দৌড়ে এসেছে পিছন পিছন। চাপা গলায় বলল, —অ্যাই, কী সিন ক্রিয়েট করছ? তোমার জন্যে রান্নাবান্না হচ্ছে… কী ভাববে বলো তো সবাই!

অনিন্দ্য দরজা খুলতে খুলতে বলল, —বলে দিয়ে যা হোক কিছু। আমি তো তাদের কাছে আসিনি। আমি তোমার জন্য এসেছিলাম। তোমার কাছে। ও কে?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%