রোহণ কুদ্দুস
২৩ অক্টোবর লিস্ট রেজিমেন্ট পৌঁছাল ফ্রান্সের লিলাতে। সেখানে তখন জার্মানদের নতুন সামরিক কার্যালয়। পুরো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যে ইতিউতি ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে কিছু মহিলা আর শিশু। তিনদিন বিশ্রামের পরে হিটলারের দলটি ২৭ অক্টোবর রওনা দিল ইপ্রার দিকে। সেখানে জার্মানদের সঙ্গে ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ আর বেলজিয়ানদের সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে ১৯ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে ইপ্রার প্রথম যুদ্ধ।
২ নভেম্বর পর্যন্ত জারি ছিল এই যুদ্ধ। জার্মানির দিকে প্রাণ হারিয়েছিল লক্ষাধিক সৈন্য। লিস্ট রেজিমেন্টের ৩৬০০ সৈন্যর মধ্যে অবশিষ্ট ৬১১ জন। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অজ্ঞাত পরিচয় শবদেহ, ছিন্নভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে অনভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবীরা যুদ্ধের প্রাথমিক পাঠ পেল। আর হিটলার?
গুটিকয় যে চিঠি তিনি তাঁর পরিচিতদের লিখেছিলেন, তার সব ক-টাতেই বর্ণনা আছে কী অপরিসীম সাহসের সঙ্গে হিটলার সামনে থেকে আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে লেখা চিঠিতে নিজের সাহসের বড়াই কমবেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যি করেই সামনে থেকে যুদ্ধ করলে হিটলারের বেঁচে থাকার কথা নয়। ইংরেজদের মেশিনগানের সামনে জীবনের পরোয়া না করে একের পর এক জার্মান সৈন্যদল ঢেউয়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঠিকই। কিন্তু হিটলার তাদের মধ্যে ছিলেন কি না সংশয় থেকে যায়। বিশেষ করে প্রথম ইপ্রার যুদ্ধের সময় লাঙ্গেমার্কের লড়াইয়ে হাজার হাজার জার্মান তরুণ প্রাণ দিয়েছে। লিস্ট রেজিমেন্ট তখন সেখানে ছিল না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে, নাজি প্রচারে এবং হিটলারের নিজের দাবিতেও ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পায় হিটলার নিজেই সেই লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফুয়েরার হয়ে ওঠেন ‘লাঙ্গেমার্কের নায়ক’।
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, হিটলার পদাতিক হিসাবে চারদিন দায়িত্বপালন করেছেন। ইপ্রার প্রথম যুদ্ধের পরে তাঁকে বার্তাবহ রানারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এদের কাজ ছিল হেডকোয়ার্টার থেকে নির্দেশ যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাটেলিয়নের কমান্ডারের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষত যুদ্ধের ফলে টেলিফোন বা টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে এই রানাররাই ছিল খবর আদানপ্রদানের মুখ্য মাধ্যম। যুদ্ধের মধ্যে ট্রেঞ্চে আটক সৈন্যদের থেকে এই কাজ অপেক্ষাকৃত সুখের হলেও, সহজ ছিল না মোটেও। পায়ে দৌড়ে বা বাইসাইকেলে চড়ে গোলাগুলির মধ্যে প্রাণ হাতে করে বার্তা পৌঁছে দেওয়া ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কখনও কখনও তাই দারুণ গুরুত্বপূর্ণ খবর পৌঁছে দিতে একই বার্তা নিয়ে একের পর এক ছ-জন বার্তাবাহককেও পাঠাতে দেখা গেছে, অন্তত একজনও যদি শেষমেশ বেঁচে থাকে।
এই বেঁচে থাকার ব্যাপারে হিটলার শুধু জার্মানির সর্বাধিনায়ক হিসাবেই নন, সাধারণ রানার হিসাবেও দারুণ ভাগ্যবান ছিলেন। হিটলারের রেজিমেন্টে দশজন রানার ছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই আর সবাই হয় নিহত নয় মারাত্মক জখম হয়ে সরে গেল। একা কুম্ভ হিটলার একের পর এক দুর্ঘটনা এড়িয়ে বার্তা পৌঁছে দিতে লাগলেন অভীষ্ট লক্ষ্যে। অস্ট্রিয়ার লিঞ্জ থেকে আসা হিটলারের নামই হয়ে গেল তাই ‘লাকি লিঞ্জার’। খুব অল্প সময়েই সতীর্থ ও ঊর্ধ্বতনদের প্রশংসা পেতে শুরু করলেন তিনি। এমনকী পরবর্তীকালেও, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাঁকে কাছ থেকে দেখা মিশেল শ্লেহুবার, হিটলারের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সাহসী ও কর্তব্যপরায়ণ হিসাবেই বর্ণনা করেছেন। আদতে যুদ্ধ ছিল হিটলারের জন্যে ছোটবেলার সেই খেলারই অংশ। পার্থক্য একটাই— এখানে সবকিছু সত্যি আর হিটলার নিজে পিতৃভূমি জার্মানির জন্যে কর্তব্যপালনে অংশ নিতে পেরেছেন। তাঁর জন্যে এই যুদ্ধে জার্মানির জয় সমস্ত স্বপ্ন সফল করবে— জার্মানির হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার, জাতিগত বিশুদ্ধতার প্রতিষ্ঠা। স্বভাবতই আর সব সৈন্যদের মতো যুদ্ধক্ষেত্রের কোনও অসুবিধাতেই হিটলারের কোনও অভিযোগ ছিল না।
১৯১৪-র ২ ডিসেম্বর রেজিমেন্টের কমান্ডার লেফটেনান্ট কলোনেল ফিলিপ এঞ্জেলহার্টের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে হিটলার আয়রন ক্রস (সেকেন্ড ক্লাস) পান। এই প্রসঙ্গে হিটলারের একটা অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতাও আছে। মিউনিখে যে আইনজীবী তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, সেই আর্নস্ট হেপকে লেখা একটা চিঠিতে পাওয়া যায়— “আয়রন ক্রস কারা পেতে পারে সেই সুপারিশের তালিকা বানাতে চারটে কোম্পানির কমান্ডার তাঁবুতে এলেন। তাঁদের জায়গা করে দিতে আমরা বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। পাঁচ মিনিটও হয়নি, একটা গোলা এসে পড়ল সেই তাঁবুতে। লেফটেনান্ট কলোনেল এঞ্জেলহার্ট দারুণ রকম জখম হয়েছেন। বাকিদের কেউ মারা গেছেন, কারোর অবস্থা আশঙ্কাজনক।” পরে এঞ্জেলহার্ট মারা যান। নিয়তির পরিহাস ছাড়া আর কী! তাঁর প্রাণ বাঁচানোর জন্যে হিটলারের নাম সুপারিশ করে প্রাণ হারালেন এঞ্জেলহার্ট। এবং যথারীতি সময়ের সামান্য হেরফেরে বহাল তবিয়তে বেঁচে রইলেন ‘লাকি লিঞ্জার’।
ইপ্রায় জার্মান আর ব্রিটিশদের ট্রেঞ্চের মধ্যে দূরত্ব ছিল মেরেকেটে ৫০ গজ। সে বছর ক্রিসমাস ইভে দু-দলের সৈন্য উৎসবের মেজাজে বেরিয়ে এল। এপার থেকে আওয়াজ এল— “মেরি ক্রিসমাস টমি।” ওদিক থেকে ব্রিটিশরা উত্তর দিল— “হ্যাপি ক্রিসমাস জেরি।” ব্যারিকেড পেরিয়ে এল একজন জার্মান সৈন্য। তারপর আর একজন। আরও একজন। স্তব্ধ হল ব্রিটিশদের বন্দুক। তারাও বেরিয়ে এল শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলাতে। শুরু হল ক্রিসমাসের সেই বিখ্যাত যুদ্ধবিরতি— প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম মানবিক কাহিনি। পানপাত্র বদলে গেল এ-হাত থেকে ও-হাত। সিগার আর চুরুট বিনিময় হল অকাতরে। ব্রিটিশের প্রেয়সীর ছবি নিয়ে ঠাট্টা শুরু করল জার্মান যুবক। জার্মানের স্ত্রীর ছবি দেখে চটুল রসিকতায় মাতল ইংরেজের পো। সেই রাতে অন্য সব জায়গায় তখনও যুদ্ধ জারি, ইপ্রার মাঠে ব্রিটিশ আর জার্মান সৈন্যরা গলা মিলিয়ে গাইছে ‘সাইলেন্ট নাইট’।
হিটলার যথারীতি এইসব ঘটনাক্রমে চরম বিরক্ত। যুদ্ধের মধ্যে আবার বিরতি কীসের? এসব কিছু কাপুরুষের লড়াই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অজুহাত। কাছেই একটা গ্রামের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জার্মান শিবির। ক্রিসমাস ট্রি-র নিচে আরও কয়েকজন সৈন্যর সঙ্গে বসে হিটলার দেখছেন কিছু দূরে পড়ে থাকা দুটো মৃতদেহ, তাদের শরীরে গজিয়ে ওঠা ঘাস।
১৯১৫-র শুরুর দিকেই অকারণ হত্যার পরিসংখ্যানে জার্মান, ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ— সব পক্ষের সৈন্যরাই হতোদ্যম হয়ে পড়ল। আর সকলে যখন সামান্য আঘাতের সুযোগ নিয়ে ছুটি নিয়ে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ খুঁজছে, হিটলার তখন তাঁর সতীর্থদের এই মনোভাবকে কাপুরুষোচিত আখ্যা দিয়ে নিজের সংকল্পে অটল। একই সঙ্গে জার্মানির জয়ে বিলম্বের জন্যে তিনি ঘরের শত্রুদের দায়ী করতে শুরু করলেন। ১৯১৫-র ৫ ফেব্রুয়ারি আর্নস্ট হেপকে লেখা এক চিঠিতে এই জার্মানির আভ্যন্তরীণ শত্রুদের উল্লেখ আছে। তবে এই শত্রুরা হিটলারের জন্যে কমিউনিস্ট এবং সোশালিস্ট। ইহুদিরা তখনও তাঁর শত্রুদের তালিকায় সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি। যাই হোক, ঘরোয়া এই শত্রুদের সৌজন্যে জার্মান সেনাবাহিনীর পিঠে ছুরি মারার এই তত্ত্বের শুরু এখানেই। পরে নাজি অপপ্রচারে এই অন্তর্ঘাতের কথা বারবার ঘুরেফিরে আসবে।
১৯১৫-র মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বিভিন্ন বিপজ্জনক অভিযান থেকে আশ্চর্যভাবে বেঁচে যেতে যেতে হিটলার বিশ্বাস করতে শুরু করেন তিনি নিয়তির বরপুত্র। দৈব নির্দেশে আশেপাশের অন্য সবার মৃত্যু ঘটলেও বারবার তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন। পরে আমরা দেখব, ফুয়েরার হিসাবেও হিটলার একই ভাবে বারবার আততায়ীদের লক্ষ্য থেকে বেঁচে ফিরেছেন।
সে বছর শীতের সঙ্গে এল বর্ষাও। পরিশ্রম এবং যুদ্ধের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে হিটলারের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ব্রংকাইটিসে আক্রান্ত হয়েও তিনি ছুটি নিতে রাজি নন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ছবিতে দেখা যায় হিটলারের শীর্ণ শরীর। রোগাটে গড়নের জন্যে বেশিই লম্বা যেন। বেশ পাকানো গোঁফ। তখনও সেই বিখ্যাত মাছিগোঁফ আসেনি। পরে ব্রিটিশদের মাস্টার্ড গ্যাস আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে গ্যাস মুখোশ পরার সুবিধার্থে ঊর্ধ্বতন অফিসারের নির্দেশে গোঁফ কেটে ছোট করতে হয়েছিল হিটলারকে।
“আমারও সময় আসবে। তোমরা দেখে নিও।” হিটলার দুহাতে মাথা চেপে ধরে টেবলের সামনে বসে। আশেপাশে উপস্থিত সেনারা হেসে উঠলে হঠাৎ করে লাফিয়ে ওঠেন তিনি— “এই যুদ্ধ যদি জার্মানি হারে, তাহলে কাউকে ছাড়ব না। আমাদের নেতারা আর ওইসব শত্রুরা…”
১৯১৬-র জুলাইয়ে লিস্ট রেজিমেন্টের জয় আসে ফ্রোমেলের যুদ্ধে। অস্ট্রেলিয়ান বাহিনীর অন্যতম ভয়াবহ পরাজয়। কিন্তু অক্টোবরে সোমের যুদ্ধে দশ দিনের মধ্যে লিস্ট রেজিমেন্টের নরকদর্শন ঘটে। ৩০০ মৃত, ৮৪৪ আহত, ৮৮ নিখোঁজ। হিটলার নিজে গুরুতর আহত হন। তাঁকে পাঠানো হয় বার্লিনের কাছেই ব্রানডেনবার্গের এক মিলিটারি হাসপাতালে। সেখানে যুদ্ধফেরত আহত সেনাদের হাজার অভিযোগ। কেউ কেউ সোৎসাহে দেখাচ্ছিল কীভাবে ইচ্ছাকৃত জখমের মাধ্যমে তারা যুদ্ধ থেকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে এসেছে। হিটলারের জন্যে এই পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠল। তাই কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি বার্লিনে রওনা দিলেন। সে বছরের শীত আর বৃষ্টিতে আলুর ফলন প্রায় অর্ধেক। অন্যান্য ফসলের অবস্থাও তথৈবচ। অন্যদিকে ব্রিটেনের অবরোধে বাইরে থেকেও খাদ্যের আমদানি বন্ধ। সৈন্যবাহিনীর খাদ্য জোগাতেই হিমশিম অবস্থা। কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি হতে শুরু করেছে খাদ্যদ্রব্য। রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধে সদ্যবিধবাদের মুখে তাদের স্বামীদের মৃত্যুর থেকে শিশুদের খিদের যন্ত্রণা বেশি উঠে আসছে। সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে তারা আইন হাতে তুলে নিতেও পিছপা নয়। সে বছর মহিলাদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর ১২২৪টি হামলার অভিযোগ ছিল। হাজারে হাজারে মানুষ মারা যাচ্ছে অপুষ্টিজনিত রোগে— স্কার্ভি, আন্ত্রিক, যক্ষ্মা।

সৈনিক হিটলার (ডান দিকে)। সূত্র - উইকিপিডিয়া
সৈনিক হিটলার (ডান দিকে)। সূত্র - উইকিপিডিয়া
বসন্ত এল। অন্যান্য বছরের তুলনায় গমের ফলন অর্ধেকেরও কম। খাদ্যশস্যের অভাব আর মূল্যবৃদ্ধিতে অরাজক অবস্থা। বার্লিনসহ সারা দেশের কারখানা শ্রমিকরা হরতালে সামিল হলেন। হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধের শেষ দেখতে চান। নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের এই দুর্দশা খুব কাছ থেকে দেখেও হিটলারের মনে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি জাগেনি। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যরা এর থেকে শতগুণ বেশি কষ্ট সহ্য করছে, তাই নাগরিকদের এই যুদ্ধবিরোধী ভীরুতা তাঁর কাছে অসহ্য।
বার্লিন থেকে মিউনিখে এসেও সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। দরিদ্রদের নৈতিক স্খলন, ধনীদের বিলাসিতা— সব মিলিয়ে যুদ্ধ নিয়ে তাদের নিরাসক্তি হিটলারকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলল। মিউনিখে এমনিতেই ইহুদি-বিরোধী হাওয়া বইছিল গত কয়েক বছর ধরে। যুদ্ধে সেটা আরও তীব্র হয়ে উঠল। যুদ্ধে সরাসরি যোগ না দিয়ে যুদ্ধের সময় খাদ্য মজুত করে লাভের টাকা ঘরে তোলার অভিযোগ উঠতে লাগল ইহুদিদের বিরুদ্ধে। ‘মাইন কাম্ফ’-এ হিটলার ওই সময়ের অবস্থা বর্ণনা করেছেন— “অফিস-কাছারিতে ইহুদি ভর্তি। প্রায় সবই কর্মীই ইহুদি বা সব ইহুদিই কর্মী।” যুদ্ধে ইহুদিদের বিরল প্রতিনিধিত্বর কথা উল্লেখ করে তিনি এরপর লিখেছেন, “অর্থনীতিতে অবস্থা আরও শোচনীয়। সেখানে ইহুদিরা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। মানুষের রক্ত চুষে খাচ্ছে তারা।”
যুদ্ধে ইহুদিদের যোগদান না করার দাবি সর্বৈব মিথ্যা ছিল। ১৯১৬-র এক রিপোর্টে দেখা যায় মিউনিখ থেকে পর্যাপ্ত সংখ্যায় ইহুদিরা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যুদ্ধশেষে দেখা যায় প্রায় ১২ হাজার ইহুদি পিতৃভূমির মর্যাদা রক্ষায় যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে। সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলেও ইহুদিদের যুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে হিটলার অবহিত ছিলেন তো বটেই। মনে রাখতে হবে, ‘মাইন কাম্ফ’ যখন লেখা হচ্ছে, হিটলার তখন আর সাধারণ সৈন্য নন, তিনি রাজনীতিক। তাই ইহুদি সম্পর্কে তাঁর এমন মতামত গভীরভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যুদ্ধ চলাকালীন হিটলারের লেখা চিঠি বা অন্য সৈন্যদের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তায় কখনও ইহুদিবিরোধী তেমন কোনও বক্তব্য শোনা যায়নি। তাই মিউনিখে এসে ইহুদিদের সম্পর্কে তাঁর এই পর্যবেক্ষণ, নেহাতই প্রক্ষিপ্ত।
১৯১৭-তে পাঁচমাসের বিরতির পরে হিটলার যোগ দেন তাঁর রেজিমেন্টে। সেখানে তখন করুণ অবস্থা। অধিকাংশ করিতকর্মা সৈন্যই প্রোমোশন পেয়ে চলে গেছে অপেক্ষাকৃত ভালো আর কোনও রেজিমেন্টে। যারা থেকে গেছে, তাদের মনোবল তলানিতে। যদিও নতুন দলনেতা মেজর অ্যানটন ফ্রেইহার ফন টুবিউফ ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে চলেছেন তাদের। হয়তো তার ফলেই ১৯১৭-র এপ্রিলে আরাসের যুদ্ধে লিস্ট রেজিমেন্ট ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইংরেজ বাহিনীর জন্যে অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এরপর ছোট একটা বিরতির পরে জুলাইয়ে হিটলারের বাহিনীকে পাঠানো হল ইপ্রায়। ইপ্রার তৃতীয় যুদ্ধে বার্তাবাহক হিসাবে হিটলারের বিশেষ কিছু করার ছিল না। মনে রাখতে হবে রাশিয়ায় তখন রুশ বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। ফলে জারের সৈন্যদল ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে, জার্মানির জন্যে পূর্ব সীমান্ত অপেক্ষাকৃত শান্ত। পশ্চিমের যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মান বাহিনীর আধিক্য ব্রিটিশ-ফ্রেঞ্চ-বেলজিয়ান বাহিনীর কাজ কঠিন করে তুলতে পারে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।
এমন সময় সেপ্টেম্বরের শেষদিকে হিটলার ছুটি নিলেন। যুদ্ধ থেকে প্রথমবারের জন্যে নিজে থেকে বিশ্রাম চাইলেন। সঙ্গে সতীর্থ সৈন্য আর্নস্ট স্মিড। দুজনে মিলে বেড়াতে লাগলেন— ব্রাসেলস্, কোলন, ড্রেসডেন, লেইপজিগ। এরপর হিটলার একা রওনা দিলেন বার্লিনে। রাজধানীতে যুদ্ধের মধ্যে দ্বিতীয়বার এসে এক হতোদ্যম শহরের দেখা পেলেন তিনি। ব্রিটিশ অবরোধে ইউরোপের এক ধনী রাষ্ট্র ততদিনে নতজানু হয়ে শেষের প্রহর গুনছে। বৈদেশিক বাণিজ্য ১৯১৩-র ৫.৯ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার থেকে ১৯১৭-তে এসে ঠেকেছে ৮০০ মিলিয়ন আমেরিকান ডলারে। কোষাগার দেউলিয়া। জনগণের করের টাকায় কোনও মতে ঋণের সুদটুকু ভরা যাচ্ছে। ১৯১৭-র শেষে এসে যুদ্ধের খরচ বার্ষিক ৫২ বিলিয়ন মার্ক। কর এবং অন্যান্য উৎস থেকে বার্ষিক আয় ৭.৮ বিলিয়ন মার্ক। ঘাটতি ৪৪ বিলিয়নের ওপর। সামান্য খাবারের জন্যে ভিখারির মতো মানুষ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাজারে হাজারে মানুষ মারা যাচ্ছে। যুদ্ধ শেষে সরকারি হিসাব অনুসারে অন্তত ৪ লক্ষ ২৪ হাজার মানুষ অনাহারে এবং অপুষ্টিজনিত রোগ থেকে মারা গেছে। কারও মতে সংখ্যাটা সাড়ে সাত লক্ষেরও বেশি। ১৯১৮-র ফ্লু-মহামারীতে মারা গেল আরও দেড় লক্ষ মানুষ।
প্রতি পরিবারেই স্বামী বা পুত্র যুদ্ধে। প্রাণে বেঁচে আছে কি না সে খবরটুকুও জানা নেই। বাচ্চা কাঁদছে খিদের জ্বালায়। লক্ষ লক্ষ জার্মান নাগরিক যে কোনও মুহূর্তে চরমপন্থী কোনও জননেতার সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তাদের ভবিষ্যত নেতা এবারও এই দুর্বল, খিদেয় কাতর জনতাকে অগ্রাহ্য করে নিজের ছুটি কাটানোয় মন দিলেন। মিউজিয়াম আর আর্ট গ্যালারিতে সময় কাটিয়ে বন্ধুদের পোস্টকার্ড পাঠিয়ে তিনি অক্টোবরের শেষের দিকে আবার ফিরে গেলেন তাঁর রেজিমেন্টে।
পূর্ব সীমান্ত থেকে তখন লক্ষাধিক সৈন্য যোগ দিচ্ছে পশ্চিমের যুদ্ধক্ষেত্রে। জার্মান সেনাধিনায়করা তখন উৎসাহে ফুটছেন। এতদিনে সমগ্র জার্মান বাহিনী একত্রিত করা গেছে। ১১ নভেম্বর ১৯১৭। লুডেনডর্ফ, হিনডেনবার্গ তাঁদের জেনারেলদের সঙ্গে মিটিং করে ঠিক করলেন ১৯১৮-র মার্চ থেকে শুরু হবে কাইজারস্লাখ্ত্ বা সম্রাটের যুদ্ধ। অন্য কথায়, জার্মানির শেষ লড়াই— সর্বশক্তি দিয়ে শত্রুদের দিকে অস্ত্র তুলে দাঁড়াও। প্রতিপক্ষের ১৫৬ ডিভিশন সৈন্যর বিরুদ্ধে জার্মানির ১৯২ ডিভিশন। ১৯১৪-র অক্টোবর থেকে এই প্রথম মিত্রশক্তি এক-পা পিছিয়ে থেকে লড়াই শুরু করবে। ব্রিটিশরা যদিও দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে। গুপ্তচররা খবর আনছে ফ্রেঞ্চ সৈন্যদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে গেছে। কিন্তু বেশ কয়েকটা খুঁটিনাটি ব্যাপার কেউ ধর্তব্যের মধ্যে আনল না। মিত্রশক্তির বিমান বা ট্যাঙ্ক সংখ্যায় অনেক বেশি। আমেরিকা বিপুল সৈন্য নিয়ে সদ্য যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। ফ্রান্স তাদের রিজার্ভ বাহিনী থেকে প্রচুর নতুন সৈন্য পাঠিয়েছে। ফলে বাইরে থেকে তাদের যতটা হতোদ্যম মনে হচ্ছে, আদপে তারা তা নয়। হয়তো এগুলো নজরে এসেওছিল জার্মান জেনারেলদের। কিন্তু তখন অন্য কোনও রাস্তাও তাঁদের জন্যে খোলা ছিল না। শেষ ক-বছরে লক্ষ লক্ষ জার্মান সেনানীর আত্মাহুতি কি ব্যর্থ হবে? দেশবাসীকে প্রতিদিন আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, জার্মানি যুদ্ধজয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। অতএব কাইজারস্লাখ্ত্।
হিটলার কানাঘুষোয় এই মরণকামড়ের খবর পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। এতদিনে! তিন বছরে এই প্রথম তাঁর প্রাণপ্রিয় জার্মান বাহিনী আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল। হিটলার পরে লিখেছেন— “তিন বছর শত্রুভূমির এই নরকে যুঝবার পরে জার্মান ট্রেঞ্চ আর ছাউনিতে স্বস্তির নিশ্বাস বয়ে গেল… পিতৃভূমির সঙ্গীতে আকাশবাতাস মুখরিত হয়ে উঠল… শেষবারের মতো ঈশ্বরের করুণা তাঁর অকৃতজ্ঞ সন্তানদের ওপর বর্ষিত হল।”
১৯১৮-র ২১ মার্চ শুরু হল জার্মানির শেষ লড়াই— অপারেশন মাইকেল। ফ্রান্সের ওপর দিয়ে লুডেনডর্ফের সাঁজোয়া বাহিনীর চাকা অপ্রতিহত এগিয়ে চলল। পিছু হটল ব্রিটিশবাহিনী। এপ্রিলের মধ্যেই পারি জার্মানদের হাতে যাওয়ার উপক্রম হল। শুরু হল লড়াইয়ের পরের ভাগ— অপারেশন জর্জেট। ব্রিটিশ ফিল্ড মার্শাল স্যর ডগলাস হেগ সৈন্যদের হারানো মনোবল ফিরিয়ে আনতে আবেগঘন এক বার্তা পাঠালেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ব্রিটিশরা এবার দ্বিগুণ উৎসাহে ঝাঁপাল। সঙ্গে যোগ দিল পাঁচ লক্ষ আমেরিকান সৈন্য। জার্মান বাহিনী আবার দারুণ প্রতিরোধের মুখে পড়ল। হিটলারের রেজিমেন্টে ব্যাপক হারে ক্ষয়ক্ষতি হল। কয়েক মাসের মধ্যে লিস্ট রেজিমেন্টের সৈন্যসংখ্যা এক-চতুর্থাংশ হয়ে গেল। যদিও হিটলার এবং অন্যান্য বার্তাবাহকদের সে অর্থে কোনও কাজ ছিল না। ১৯১৮-র বেশিরভাগ সময়টাই তাঁর রেজিমেন্টের হেডকোয়ার্টারে যুদ্ধ থেকে বেশ কিছুটা দূরেই কেটেছে। কিন্তু জুলাইয়ের শেষদিকে হিটলারেরও সুযোগ এল। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্যে ১৯১৮-র ৩১ জুলাই হিটলার দ্বিতীয়বার আয়রন ক্রস পেলেন। এবার ফার্স্ট ক্লাস। মজার ব্যাপার হল, হিটলারের জন্যে এই মেডেলের সুপারিশ করেছিলেন এক ইহুদি— ফার্স্ট লেফটেনান্ট হুগো গাটমান।
বার্তাবাহক রানারের পদমর্যাদায় একটা আয়রন ক্রসই সম্ভ্রম জাগানো, হিটলার পেয়েছিলেন দুটো। নিঃসন্দেহে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যথেষ্ট সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। সত্যি বলতে কী, হিটলার সেই ব্যতিক্রমী চরিত্রের মধ্যে পড়েন, যাঁরা যুদ্ধ, লড়াই, জয়— এসবের মধ্যে তৃপ্তি খুঁজে পান। কিন্তু সাধারণত নিজের এই দ্বিতীয় পদকটি, অর্থাৎ আয়রন ক্রম ফার্স্ট ক্লাস, হিটলার সচরাচর নাকি পরতেন না। এর কারণ হিসাবে অনেক পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘টেবল টক’-এ হিটলার বলেছিলেন, “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আমি তো দেখেছি কীভাবে আয়রন ক্রস ফার্স্ট ক্লাস দেওয়া হত, তাই আমি পরতাম না। আমাদের রেজিমেন্টেই এক ইহুদি ছিল, গাটমান, এক নম্বরের ভিতু। সেও পেয়েছিল একটা আয়রন ক্রস ফার্স্ট ক্লাস।” গাটমান সম্পর্কে হিটলারের এই মূল্যায়ন অসত্য তা বলাই বাহুল্য। পরে নাজি প্রোপাগান্ডায় ফুয়েরারের পদকপ্রাপ্তির পেছনে ইহুদির প্রভাব থাকার ব্যাপারটা বেমালুম চেপে দিতে গাটমানের নাম মুছে দেওয়া হয়। এমনকী পাঠ্যপুস্তকে হিটলার একক প্রচেষ্টায় শুধুমাত্র একটা পিস্তল নিয়ে কীভাবে অসংখ্য ব্রিটিশ সৈন্যকে বন্দি করেন, তার বিস্তারিত বিবরণ যুক্ত হয়। কিন্তু সত্যের এই অপলাপকে সরিয়ে রাখলেও এটা লক্ষ করার বিষয় ১৯১৮-তে দাঁড়িয়ে হিটলারের থেকে কিন্তু ইহুদিবিরোধী কিছু বক্তব্য কেউ শোনেননি। তিনি ততটাই ইহুদিবিরোধী ছিলেন, যতটা আর যে কোনও সাধারণ জার্মান সৈন্য। ১৯২৪-এ ‘মাইন কাম্ফ’ লেখার সময় হিটলারকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে নিজের ইহুদি-বিরোধিতাকে প্রবাদপ্রতিম করে তুলতে।
সেপ্টেম্বরের শেষে বাভেরিয়ান ব্যাটেলিয়ন আবার ফেরত গেল ইপ্রায়, পঞ্চম ইপ্রার যুদ্ধে। হিটলারের সতীর্থ বার্তাবাহক প্রাইভেট ইগনাজ ওয়েস্টানকার্চনারের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় হিটলারের শেষ অভিযানের কথা। ১৩ অক্টোবরের রাতে শত্রুপক্ষের গোলাগুলির শব্দ হঠাৎ করে ফিকে হয়ে গেল। তার বদলে গাঢ় হয়ে উঠল আঁশটে গন্ধ। ব্রিটিশরা ক্লোরিন গ্যাস নিয়ে আক্রমণ করেছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ল। জার্মান ট্রেঞ্চের মধ্যে গ্যাস মুখোশ পরে সবাই সেই বিষাক্ত বাতাসের মধ্যে চুপচাপ পড়ে রইল। হঠাৎ করেই কেউ ধৈর্য ধরতে না পেরে সেই সবুজ-সাদা ধোঁয়ার মধ্যে নিজের মুখোশটা খুলে ফেলে। টুঁটি টিপে ধরল দূষিত হাওয়া। কেশে, ককিয়ে, দমবন্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল সে। ভোর পর্যন্ত চলল গ্যাস নিয়ে এই আক্রমণ। ১৪ অক্টোবর সকালে হিটলার একটা খবর পৌঁছে দিতে গিয়ে ওই বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে গিয়ে পড়লেন। সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। পোল্যান্ড সীমান্তে পাসেভাকের একটা হাসপাতালে ভর্তি করা হল তাঁকে।
ওদিকে যুদ্ধে মিত্রশক্তির আক্রমণে পর্যুদস্ত জার্মানি মার্চে যেখান থেকে লড়াই শুরু করেছিল, সেখানেই ফিরে এল প্রায়। অধিকৃত সব অঞ্চলই হাতছাড়া হয়ে গেল। অক্টোবরের শেষদিকে ব্রিটিশ বাহিনী বেলজিয়ান উপকূল দখল করে জার্মানির ইউ-বোট ঘাঁটিও দখল করে নিল। ততদিনে শুধু ১৯১৮-র হিসাবেই ষোলো লক্ষেরও বেশি জার্মান সৈন্য মারা গেছে। মিত্রশক্তির হাতে বন্দি হয়েছে ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৭৭০ জন জার্মান সৈন্য। সংখ্যাটা আমেরিকান এবং ফ্রেঞ্চ বাহিনীর সম্মিলিত শক্তির সামান্য কম। যুদ্ধের অবশ্যসম্ভাবী পরিণতি দেখে নভেম্বরে জার্মানির কিয়েলে শুরু হল গৃহযুদ্ধ, যার আগুন অচিরেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল দেশে। হিনডেনবার্গ আর লুডেনডর্ফের পক্ষে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হচ্ছিল না। ১৯১৮-র ১১ নভেম্বর জার্মানি যুদ্ধবিরতি সাক্ষরে বাধ্য হল। তারিখটা ১১-১১-১৮। যাঁর থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত, সেই আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যা যে গাড়িতে হয়েছিল তার নাম্বার ছিল ‘এ ১১ ১১ ১৮’। কাকতালীয় সমাপতন!
যাই হোক, হিটলারের কাছে খবর পৌঁছাল পরদিন। জার্মান বাহিনী হেরে গেছে, আত্মসমর্পণ করেছে— এই মানসিক ধাক্কা সামলানো হিটলারের জন্যে দারুণ কঠিন ছিল। এই অসম্মান প্রাথমিকভাবে তাঁর চিন্তাভাবনাকে পঙ্গু করে দিল। জার্মানি হারতে পারে না। জার্মানি আত্মসমর্পণ করতে পারে না। পাসেভাকের হাসপাতালের সেই শয্যায় পিতৃভূমির অপমানে শোকবিহ্বল সেই লান্স করপোরেল তার পরে ‘মাইন কাম্ফ’-এ লিখেছেন— “সেইদিন থেকে আমার মায়ের কবরে দাঁড়িয়েও আমি কাঁদিনি… এই দীর্ঘ যুদ্ধে মৃত্যু যখন আমাদের অজস্র সঙ্গী-সাথিকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে, তখন ব্যক্তিগত অভিযোগ আমার পাপ মনে হয়— তারা কি আমার জার্মানির জন্যেই প্রাণ দেয়নি? ভয়াবহ সংগ্রামের শেষদিনগুলোতে ওই ভয়ংকর গ্যাস যখন আমাকেও আক্রমণ করল, আমার চোখ দুটো কুরে কুরে খেতে শুরু করল, তখন দৃষ্টিশক্তি হারানোর ভয়ের পাশাপাশি আমি মনোবলও হারিয়েছিলাম এক মুহূর্তের জন্যে, আমার বিবেক গর্জে উঠেছিল: হতভাগা নরাধম, যখন হাজার হাজার মানুষ তোর থেকে শতগুণ দুর্দশায়, তখন তুই কাঁদতে বসেছিস!”
যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকার নতুন মানে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি, জার্মানিকে হৃদয় দিয়ে সমর্থন করেছিলেন, ফলে এই পরাজয় তাঁর এযাবৎ অসফল জীবনে আরও একটা বড় ধাক্কা বইকি। ‘মাইন কাম্ফ’ অনুসারে হিটলার তখনই নাকি স্থির করেছিলেন তিনি রাজনীতিতে অংশ নেবেন। এক দৈবশক্তির নির্দেশ পেয়েছিলেন তিনি।
পাসেভাকের সেই মুহূর্ত হিটলার ঐশ্বরিক করে তুলতে চেয়েছেন বটে, কিন্তু এ সম্পর্কে চার্চিল দ্বিতীয় তাঁর বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস-এর প্রথম খণ্ড ‘দ্য গ্যাদারিং স্টর্ম’ বইতে যথাযথ একটা বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
দৃষ্টিহীন অসহায় অবস্থায় শয্যাশায়ী হিটলার নিজের ব্যক্তিগত ব্যর্থতার সঙ্গে জার্মানির বিপর্যয় মিশিয়ে দিচ্ছিলেন। পরাজয়ের ধাক্কা, আইন এবং প্রশাসনের অরাজক অবস্থা, ফরাসিদের জয়— এই সমস্ত যন্ত্রণা মিলেমিশে অসুস্থ হিটলারের জন্যে পরমাত্মার দৈবিক উপস্থিতি তৈরি করেছিল। জার্মানির পতন তাঁর স্বল্প অভিজ্ঞতায় ব্যাখ্যাতীত ছিল। ফলে তিনি আঁকড়ে ধরলেন বিষম কোনও বিশ্বাসঘাতকতার তত্ত্ব। ভিয়েনায় ইতিমধ্যেই তিনি উগ্র জার্মান জাতীয়তাবাদের সঙ্গে পরিচিত। অশুভ বৈদেশিক শত্রু ইহুদিদের সম্পর্কে তিনি আগেই শুনেছেন। দেশপ্রেমের নিষ্ফল রাগ যোগ হল ধনী আর সফলদের প্রতি তাঁর ঈর্ষার আগুনের সঙ্গে, জন্ম নিল অপরিমেয় ঘৃণা।
কিন্তু নাজি প্রোপাগান্ডা এবং ‘মাইন কাম্ফ’-এর ভাষ্য অনুসারে এটা ভাবলে ভুল হবে, সেই মুহূর্তে ইহুদি-বিরোধী এক ফুয়েরারের জন্ম হল। সে ব্যাপারটা ঘটেছে আরও সময় নিয়ে পরবর্তী অন্তত ৫ থেকে ৬ বছর ধরে। তবে প্রক্রিয়ার শুরুটা হল পাসেভাক থেকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন