মধ্যরাতের নাটক

রোহণ কুদ্দুস

কারের যুদ্ধমন্ত্রকে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনাই ছিল না। বিয়ার হল থেকে তিনি বাড়ি ফিরে পোশাক পরিবর্তন করে হাজির হলেন তাঁর বাসস্থানলাগোয়া অফিসে। সেখানে উপস্থিত তাঁর বেশ কিছু পরামর্শদাতা। প্রায় প্রত্যেকেই হিটলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক। কার তখনও মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি প্রথমে দোষারোপ করতে শুরু করলেন পুলিশকে। তারা এমন পরিস্থিতির জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। মজার কথা হল, কারই তাদের সংখ্যায় কম অফিসার মোতায়েন করতে বলেছিলেন। মিউনিখের মানুষের মাঝে তাঁর সুরক্ষা দরকার, পুলিশ বাড়িয়ে এই বার্তা তিনি দিতে চাননি। তাঁকে কেউ কেউ পরামর্শ দিলেন সংবিধান বাতিল করে নিজেকে ভাইসরয় বা সম্রাটের প্রতিনিধি হিসাবে সর্বময় শাসকের জায়গায় বসাতে। অজুহাত হিসাবে কমিউনিস্টরা তো রইলই। কার সেনাবাহিনী আর পুলিশের যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে হিটলারের সামনে দুটো রাস্তা খোলা থাকবে। হয় কারের অধীনে এই বিদ্রোহে যোগ দেওয়া, নাহলে সঙ্গীসাথি নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া। এককথায়, হিটলারের নিজের চালেই তাঁকে মাত করা।

কথাটা কারের মনে ধরল। কিন্তু পুলিশ আর সেনাবাহিনীর কথায় তাঁর মাথায় এল, অন্য দুই সাথির খোঁজ নেওয়া দরকার। লসো এবং সেইসার কোথায় আছেন, কী চাইছেন, সেটা জানা দরকার। তিনি ফোনের দিকে হাত বাড়াতেই বেজে উঠল সেটা। লসো বা সেইসার নন, কারের অন্যতম তিক্ত সমালোচক শিক্ষা-সংস্কৃতি মন্ত্রী ফ্রাঞ্জ ম্যাট। তিনি বিয়ার হলে সেদিন ছিলেন না, অন্যত্র কিছু অতিথির সঙ্গে ব্যস্ত ছিলেন। এখন লোকমুখে ঘটনার বিবরণ শুনে ফোন করেছেন।

কারের মুখে সংক্ষেপে সব শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, “হিটলার কী চায়?”

“বার্লিন অভিযান।”

“শুভেচ্ছা রইল।” ব্যঙ্গের সুরে ম্যাট বললেন।

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, কার হয় হিটলারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, নাহলে প্রতিরোধে পুরোপুরি অক্ষম। যাই হোক না কেন, বাকি মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রস্তাব দিলেন পরিস্থিতি অনুসারে অস্থায়ীভাবে ক্ষমতাকেন্দ্র মিউনিখ থেকে পঁচাত্তর মাইল উত্তরের রেগেনস্‌বার্গে সরিয়ে নিয়ে যেতে। তাতে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে আরও এক দাবিদার থাকবে বটে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এবং আরও তিন মন্ত্রীর গ্রেপ্তারের কথা বিবেচনা করলে এই ব্যবস্থা তাঁদের সুরক্ষার জন্যে জরুরি।

ওদিকে পুলিশের সদর দপ্তরে হিটলারকে রোখার জন্যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। সওয়া ন-টা নাগাদ বাভেরিয়া রাজ্য পুলিশের মেজর সিগমুন্ড ফ্রাইহার ফন ইমহফ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের একটা ক্লাস নিয়ে বাড়ি যাওয়ার তোড়জোড় করছিলেন। এমন সময় এক অফিসার ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে এসে তাঁকে বারগারভয়কেলার খবরটা দেন। ডক্টর ফ্রিক ততক্ষণে পুলিশের গতিবিধিতে নজর রাখতে শুরু করেছেন। তাঁর আনুগত্য কোথায় এবং কাদের প্রতি তা বুঝতে ইমহফের সময় লাগল না। তাই ফ্রিকের নজর এড়িয়ে তিনি একের পর এক টেলিফোন কল করতে শুরু করলেন। প্রথমেই মিউনিখের টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, টেলিগ্রাফ অফিস, সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসের দখল নেওয়ার জন্যে তিনি রাজ্য পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করলেন। এমনকী গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, ব্রিজও বাদ গেল না। ডক্টর ফ্রিকের সতর্ক নজরদারির মধ্যেই ইমহফ যোগাযোগ করলেন মিউনিখ সিটি গ্যারিসনের কমান্ডার মেজর জেনারেল জেকব রিটার ফন ড্যানারের সঙ্গে। ফন ড্যানারও নিজের সর্বশক্তি দিয়ে হিটলারকে আটকানোর চেষ্টা শুরু করলেন। তাঁর ঊর্ধ্বতন জেনারেল লসো সম্পর্কে খুব একটা উচ্চ ধারণা তিনি পোষণ করতেন না। রাজনীতির হাতছানি যেমন লসো এড়াতে পারেননি, তেমনই নাজিদের প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্বও ছিল বিরক্তিকর।

নিজের অফিসে পৌঁছে ড্যানার উপলব্ধি করলেন গ্যারিসন খুব সুরক্ষিত নয়। যুদ্ধমন্ত্রক ইতিমধ্যেই রমের নেতৃত্ব নাজিদের দখলে। অগ্‌স্‌বার্গ, ল্যান্ডস্‌বার্গ, রেগেনস্‌বার্গ, নুয়ার্নবার্গ— কাছাকাছি সব শহরে তিনি অতিরিক্ত সেনার জন্যে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠালেন। একইসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলেন হিটলারের সঙ্গে লড়তে নতুন কমান্ড সেন্টার গড়ে তুলতে হবে আর একটু দূরে— শহরের উত্তর-পশ্চিমাংশে নাইন্টিন্থ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট ব্যারাকের ভেতর। দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক অফিসারকে নির্দেশ দিলেন লসোর আদেশ না মানতে। জেনারেল লসো নাজিদের হাতে বন্দি। তাই এক এবং একমাত্র ড্যানারের আদেশই গ্রাহ্য সেই মুহূর্ত থেকে।

ম্যাক্স আমান, নাজি পার্টির বিজনেস ম্যানেজার, সিডলুনড্‌স্‌ উন্ড ল্যান্ডব্যাঙ্কে গিয়ে ব্যাঙ্কের যাবতীয় সম্পত্তি হিটলারের নবনির্মিত সরকারের নামে জবরদখল করলেন। আমান ঘাড়ে গর্দানে বেঁটে মানুষ। শরীরের সঙ্গে মিল রেখে মেজাজটাও তেমনই, কোনও নীতি-নৈতিকতার ধার ধারতেন না। মাঝে মাঝে নিজের এক্তিয়ার ছাড়িয়েও হিটলারের নাম নিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো কাজকর্ম করতেন। একবার নাজিদের একজন সদস্য অ্যাকাউন্টিং-এর খাতা দেখতে চাওয়াও তাকে ধরে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। আমান ওই ব্যাঙ্কেরই ওপরে চারতলায় থাকতেন। ফলে তাঁর কর্মপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত ব্যাঙ্কের কেউই তাঁকে বাধা দিলেন না। ব্যাঙ্কের অফিসটাই সদ্যোজাত সরকারের সদর দপ্তর হিসাবে বেছে নিলেন তিনি।

ব্যাঙ্কের একটা ঘর বেছে নেওয়া হল ফিনান্স ডিপার্টমেন্ট হিসাবে। দায়িত্ব নিলেন ডক্টর গডফ্রিড ফেডার। ইঞ্জিনিয়ার এবং বিল্ডিং কনট্রাক্টর এই মানুষটি নাজি পার্টির আদি সদস্যদের একজন। বস্তুত, হিটলার প্রথম যেদিন জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির মিটিং-এ গিয়েছিলেন, এই ফেডারই সেদিন বক্তব্য রেখেছিলেন। নতুন অর্থনীতি মন্ত্রকের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রথমেই দেশের সমস্ত ব্যাঙ্ক আকাউন্ট ফ্রিজ করার পরিকল্পনা করলেন। এতে নাকি ইহুদিদের সম্পত্তির বাজেয়াপ্ত করার একটা সুযোগ পাওয়া যাবে। অবশ্য ফেডার নিজের সেভিংস অ্যাকাউন্ট থেকে সেই বিকালেই সমস্ত টাকা তুলে নিয়েছিলেন।

অন্য একটা ঘর চিহ্নিত হল প্রোপাগান্ডা সেন্টার হিসাবে। দায়িত্ব পেলেন জুলিয়াস স্ট্রাইকার নামে এক স্কুল শিক্ষক। তিনি ‘দের স্টুরমার’ নামে একটা ইহুদিবিরোধী ট্যাবলয়েড চালান। তৃতীয় একটা ঘর আলাদা করে রাখা হল হেরমান এসারের জন্যে। হিটলারের নবগঠিত সরকার সম্পর্কিত খবরের কাগজের রিপোর্টাজ আর নাজিদের পোস্টারের দায়িত্ব তাঁর ওপর। সেই কাজে নাজিদের সদর দপ্তর থেকে দুজন টাইপিস্ট এসে হাজির হয়েছেন। পরদিন ভোরে রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়বে নাজিদের বিজয়োল্লাস। জার্মানির লজ্জার ইতিহাসের অবসান হতে চলেছে। নভেম্বরের অপরাধীদের বিচারের সময় আগত। রক্ত-লাল পোস্টারে ঘোষণা করা হবে— প্রিয় দেশবাসী, প্রেসিডেন্ট ফ্রেডরিখ এবার্ট এবং তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্যদের বন্দি করা আমাদের কর্তব্য, জীবিত অথবা মৃত।

ওদিকে আমান যখন অফিস গোছাচ্ছেন, তখন আর্নস্ট পোনার পুলিশের সদর দপ্তরে গিয়ে হাজির হয়েছেন ডক্টর উইলহেল্‌ম্‌ ফ্রিকের কাছে। ফ্রিককে নিয়ে তিনি হাজির হলেন নাজিদের হাতে বন্দি পুলিশ প্রেসিডেন্ট কার্ল ম্যানটেলের অফিসে।

“এই অফিস এখন তোমার। মিউনিখ পুলিশের নতুন প্রেসিডেন্ট তুমি।”

বিয়ার হলের সেই ঘরে যখন কারের সঙ্গে যখন হিটলারের দরাদরি হচ্ছিল, তখনই পোনার নতুন পুলিশ প্রেসিডেন্ট হিসাবে ফ্রিকের নিয়োগ চূড়ান্ত করে নিয়েছিলেন। ফ্রিকের সঙ্গে তাঁর সদ্ভাব পুলিশ প্রধান থাকার সময় থেকেই। ফ্রিকের কর্মক্ষমতার ওপর তাঁর দারুণ আস্থা।

পোনার এবং ফ্রিক এবার নতুন শাসনের ব্যাপারে মিউনিখের মানুষকে ওয়াকিফহাল করার জন্যে পরিকল্পনা শুরু করলেন। মিউনিখের প্রথম সারির সমস্ত সম্পাদক ও প্রকাশককে নিয়ে তাঁরা একটা প্রেস কনফারেন্স ডাকলেন সদর দপ্তরের লাইব্রেরিতে। সেই প্রেস কনফারেন্সে পোনার কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার করে দিলেন। সম্পাদক এবং সাংবাদিকরা যদি যথেষ্ট দেশপ্রেম দেখিয়ে দায়িত্ব সহকারে হিটলারের এই নতুন সরকারের গুণগান করেন, তাহলে খবর সেন্সর করার মতো অবাঞ্ছিত ব্যাপার বা অন্য কোনও সমস্যা হবে না। হিটলার দেশকে ১৯১৮-র দুঃসময় থেকে মুক্তি দিতে চলেছেন, এটা যেন পাঠকদের ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

এক সম্পাদক প্রশ্ন করলেন, কার বাভেরিয়ার যুবরাজের সম্মতি পেয়েছেন কি না। উত্তরটা ‘না’, তাই পোনার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন। আরেকজন জিজ্ঞাসা করলেন, কার একান্তভাবেই সম্রাটের ইচ্ছাধীন থেকে কাজ করতে আগ্রহী, অন্যদিকে হিটলার সমাজতন্ত্রের কথা বলেন। দুজনের মতের মিল কি আদৌ সম্ভব? এর মধ্যেই আরেকজন প্রশ্ন করলেন ইহুদিদের ওপর ক্রমবর্ধমান অত্যাচার নিয়ে। পোনার এবারও নিরুত্তর রইলেন।

সেই রাত মিউনিখের ইহুদি নাগরিকদের জন্যে একটা দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে।

শুরু হয়েছিল বারগারভয়কেলা থেকেই। হিটলার যখন গ্যোরিংকে নির্দেশ দেন উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে থেকে কমিউনিস্ট বা অন্য কোনও উপদ্রবকারীদের আলাদা করতে, তখন বিদেশী সাংবাদিকদের আটকে রাখা হয়। কে যেন মন্তব্য করল— “এরা সবকটা ইহুদি।” সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে কেউ প্রতিবাদ করে বললেন, “আমাদের যেতে দেওয়া হোক।” হিটলার নাকি তখন ধমকে উঠেছিলেন— “আমরা পাঁচ বছর অপেক্ষা করে আছি। তোমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই পারো।”

ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন টিপ্পনি কাটল— “এখানে মারার মতো একটাও ইহুদি নেই।”

বিয়ার হল থেকে নেতারা যুদ্ধমন্ত্রকের দিকে রওনা দিলে এস এ-র বেশ কিছু সদস্য সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল ইহুদিদের শায়েস্তা করতে।

প্রথম সংগঠিত আক্রমণটা হয়েছিল মিউনিখ পোস্ট-এর দপ্তরে। হিটলার এবং তাঁর দলের সমালোচনার কারণে ইহুদিদের সংবাদপত্র হিসাবে চিহ্নিত কাগজটাকে নাজিরা বলত ‘মিউনিখ পেস্ট’। কেউ কেউ আবার বলত বিষের কারখানা। জোসেফ বার্খটোল্ডের নেতৃত্বে সংবাদপত্রের বিজনেস ম্যানেজারকে বন্দুক দেখিয়ে অফিসের মূল ফাটক খোলানো হয়। তারপর চলতে থাকে অবাধ লুটতরাজ এবং ধ্বংসলীলা। ডেস্ক ভেঙে, ফাইল ক্যাবিনেট এবং বইয়ের আলমারি উলটে শুরু হয় দরকারি কাগজপত্র বের করে আনা। গ্রাহকদের ঠিকানা, অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি, বিজ্ঞাপনদাতাদের অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত তথ্য, কর্মচারীদের ব্যক্তিগত নথি— সব এক জায়গায় জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সৌভাগ্যবশত প্রেস মেশিনগুলোর কোনও ক্ষতি করা হয়নি, কারণ হিটলার কথা দিয়েছিলেন ওগুলো কামফবুন্ডের দলীয় মুখপত্রের কাজে লাগানো হবে। পাঁচ-ছটা টাইপরাইটার, প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন মার্ক হস্তগত করে আক্রমণকারীরা হানা দেয় সম্পাদকের বাড়ি।

সৌভাগ্যবশত বিপদ আঁচ করে সম্পাদক আরহার্ড আওয়ার সেই রাতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এক বন্ধুর বাড়ি। এস এ-র সদস্যরা অবশ্য তাঁর স্ত্রী এবং মেয়েকে হেনস্থা করে। তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আসবাবপত্র ঘেঁটে ছত্রখান করে খুঁজে পায় প্রেসিডেন্ট এবার্টের কিছু চিঠি। এছাড়া আর কোনও অস্ত্র বা মূল্যবান সামগ্রী না পেয়ে হতাশ নাজিরা ধরে নিয়ে যায় আওয়ারের এক জামাতা ডক্টর কার্ল লুবারকে।

এছাড়াও নানা জায়গায় পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই চলতে থাকে নানা আক্রমণ। ইহুদিদের বাড়ি থেকে টেনে বের করে এনে মারধোর করা বা বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, কাফে থেকে ধরে বিয়ার হলে নিয়ে গিয়ে পণবন্দি হিসাবে রাখার সঙ্গে সঙ্গেই শহরের নানা অংশ থেকে ইহুদিদের দোকান বা ব্যবসার জায়গায় গিয়ে লুঠতরাজের খবরও আসতে থাকে।

পুলিশের রিপোর্ট এই হিংসাত্মক কার্যকলাপের সামান্য কিছুই মাত্র নথিবদ্ধ করেছিল। নানা ভুল এবং তথ্যপ্রমাদে ঠাসা সেইসব রিপোর্টের মধ্যে একটা চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায়। হিটলার নাকি ধ্বংস এবং নাশকতার কারণে রেগে গিয়ে তাঁর দলের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের তিরষ্কার করেন এবং পরে কেউ কেউ বহিষ্কৃতও হন। কিন্তু এই তথ্যটি যিনি দিয়েছেন, সেই সার্জেন্ট মাথাউস হফমান নাজি সমর্থক ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, হিটলার তাঁর দলের কিছু সদস্যদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেছিলেন বটে। কিন্তু সেটা ইহুদিদের দুর্দশার কারণে বা প্রকাশ্যে নাজি পার্টির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্যে নয়; ওইসব সদস্য সেই রাতে ধ্বংসলীলা চালানোর সময় তাঁদের পার্টি ব্যাজ খুলে রেখেছিলেন।

ওই রাতে ঠিক কতজন ইহুদি আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় ওইদিন বারগারভয়কেলায় পণবন্দি ইহুদির সংখ্যা ছিল চব্বিশ থেকে চৌষট্টির মধ্যে।

রাজধানী বার্লিনে খবর পৌঁছাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ। চ্যান্সেলর গুস্তভ স্ট্রেসেমান অর্থমন্ত্রী হিয়ালমার এইচ জি শ্যাখ্‌টের সঙ্গে হোটেল কনটিনেন্টালে নৈশভোজ সারছিলেন। এমন সময় এক সহচর এসে তাঁকে জানালেন মিউনিখ থেকে হিটলার আর কয়েকজনের সঙ্গে মিলে অভ্যুত্থানের আয়োজন করেছেন। যুদ্ধোত্তর জার্মানিতে স্ট্রেসেমান সম্ভবত সেরা কূটনীতিক। মাত্র মাস দুয়েক আগেই দায়িত্ব নিয়ে প্রাণপণে তিনি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। চ্যান্সেলর স্ট্রেসেমান দ্রুত রাইখস্টাগের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। সেখানে অপেক্ষা করছেন প্রেসিডেন্ট এবার্ট। ১৯১৯-এর ফেব্রুয়ারিতে জার্মান প্রজাতন্ত্রের প্রথম নির্বাচন জিতে সরকার গঠন থেকেই শুরু হয়েছিল এবার্টের ওপর আক্রমণ— বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী দুই পক্ষই তাঁকে শেষ কয়েক বছর স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি।

প্রেসিডেন্ট এবং চ্যান্সেলর পরামর্শ করে প্রথমেই বাভেরিয়া থেকে আসা যে কোনও খবর সেনসরের ব্যবস্থা করলেন। অর্থনৈতিক লেনদেন বন্ধ করা হল। অবরোধ করা হল সড়কপথ, রেলপথ এবং যোগাযোগের সব মাধ্যম। কিন্তু দুজনেই জানতেন জার্মান সেনাবাহিনী এই অভ্যুত্থানের নিয়ন্তা হতে চলেছে। তারা সদ্যগঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ হয়ে তাকে রক্ষা করবে, নাকি জেনারেল লুডেনডর্ফের আজ্ঞাবহ হয়ে সরকারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করবে?

এবার্ট সরাসরি প্রশ্ন করলেন আর্মি কমান্ডের প্রধান কর্নেল জেনারেল হান্স ফন সিক্‌ত্‌কে। সাতান্ন বছর বয়সি সিক্‌ত্‌ রাশিয়া, তুরস্কসহ পূর্ব সীমান্তে বহু বিজয়ের সাক্ষী। হামবুর্গ, স্যাক্সনি এবং থুরিনজিয়াতে ইতিমধ্যেই তিনি কমিউনিস্টদের দমন করেছেন। কিন্তু দক্ষিণপন্থী এই জেনারেল এই বিদ্রোহের জন্যে কোন পক্ষ নেবেন? সিক্‌ত্‌ অল্প কথার মানুষ। বাম চোখে নিজের মনোকলটা ঠিক করে নিয়ে বললেন, “মিস্টার প্রেসিডেন্ট, জার্মান বাহিনী আমার কথাই শুনবে।”

কিন্তু আদৌ শুনবে কি? কেউই এ ব্যাপারে নিশ্চিত নন। সিক্‌ত্‌ই বা কী নির্দেশ দেবেন সেনাবাহিনীকে? কানাঘুষো শোনা যায় তিনি নিজেও ক্ষমতাদখলের পরিকল্পনা করছেন। তবুও প্রেসিডেন্ট এবার্ট সংবিধানের ধারা ৪৮-এর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারি করে সিক্‌তের হাতেই সমস্ত ক্ষমতার রাশ তুলে দিলেন। কারণ সেনাপ্রধান কী করবেন তার থেকেও বড় প্রশ্ন তখন হিটলার কী করবেন? ধরা যাক, তিনি মিউনিখ থেকে বার্লিন পৌঁছলেন এবং তাঁর বিদ্রোহ সফল হল। তিনি কি স্বাধীন বাভেরিয়ার দাবি করবেন? নাকি সরকার ভেঙে দিয়ে একনায়কতন্ত্র ঘোষণা করবেন? বা রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাও হতে পারে আবারও। হলে কোন রাজবংশ? কার এবং লুডেনডর্ফের পছন্দ এক্ষেত্রে ভিন্ন।

হিটলার কোনোভাবে সাফল্য পেলে ক্ষমতা দখলের থেকেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জার্মানির অবস্থা বড়ই সঙ্গিন হয়ে উঠবে। ফ্রান্স এই সুযোগে জার্মানির ওপর অর্থনৈতিক বোঝা চাপানো থেকে শুরু করে তার আরও অঞ্চল দখলের নতুন অজুহাত খুঁজে পাবে। সত্যি বলতে কী, জার্মানির ফরাসি রাষ্ট্রদূত ইতিমধ্যেই বার্তা পাঠিয়েছেন। যে বাভেরিয়ার কারণে চার বছর তাঁর দেশ রক্ত ঝরিয়েছে, সেই রাজ্য দখলের চেষ্টা করছে এমন এক মানুষ যে কথায় কথায় ভার্সাই চুক্তিকে অস্বীকার করে। ফ্রান্সের সঙ্গে ব্রিটেনও এই ঘটনায় উদ্বিগ্ন।

এবার্টের কপালে গভীর ভাঁজ পড়ল। এই বিদ্রোহ বিফল হলেও সহজে তাঁদের নিস্তার নেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%