৮ নভেম্বর ১৯২৩, মিউনিখ

রোহণ কুদ্দুস

সন্ধ্যা আটটা। মিউনিখের সিটি সেন্টার থেকে প্রায় এক মাইল দক্ষিণে বারগারভয়কেলা নামক বিয়ার বারের সামনে এসে দাঁড়াল একটা লাল বেঞ্জ। তার দরজা খুলে নেমে এলেন হিটলার। পেছনে নাজি পার্টির মুখপত্র ‘ভলক্‌সাবো উবাখতা’র সম্পাদক আলফ্রেড রোজেনবার্গ। এরকম বিয়ার বার তখন রাজনৈতিক সমাবেশের জন্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অফুরান খাদ্য, পানীয় দিয়ে দলের বশংবদ সমর্থকদের খুশি করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের একজোট করে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ইন্ধন জোগানো। কিন্তু সেই রাতের ভিড় সাধারণ দিনের থেকে অনেক বেশি। অথচ বিজ্ঞাপন মাত্র একটা সংবাদপত্রেই প্রকাশ পেয়েছিল। আর শেষ মুহূর্তে পাঠানো গোটা পঞ্চাশ আমন্ত্রণপত্র। কিন্তু শেষ পৌনে এক ঘণ্টা জনতাকে সামলাতে পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে। হিটলার ভিড় ঠেলে এগোতে থাকলেন— “যেতে দিন। আমি অতিথি মাত্র। আপনাদের সঙ্গে নিতে পারব না।” রীতিমত কসরত করে রোজেনবার্গকে নিয়ে হিটলার বিয়ার বারের ব্যাঙ্কোয়েট হলে ঢুকে পড়লেন। সিগারেট আর চুরুটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন একটা প্রায়ান্ধকার ঘর। একদিকে মিউজিক ব্যান্ডের অক্লান্ত বাজনা। বিয়ার মাগ হাতে টেবলে টেবলে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওয়েট্রেসরা। বাতাস মাংসের স্টেক আর রোস্টের সুরভিতে মাতোয়ারা।

হলের মধ্যে একত্রিত হয়েছেন রাজনীতিক, কূটনীতিক, সাংবাদিক, ব্যাঙ্কার, ব্যবসায়ী, স্যুট আর সামরিক পোশাকে সুদর্শন পুরুষ, ইভনিং ড্রেস এবং গয়নায় সজ্জিত সুন্দরী। ক্লোকরুমে একের পর এক জায়গা পাচ্ছে মিলিটারি কোট, টপ হ্যাট, ফার কোট। মিউনিখের অভিজাত সমাজের একটা বড় অংশ এসেছেন সেই সান্ধ্য-অনুষ্ঠানে। কিন্তু যাঁর জন্যে এত আয়োজন, সেই মানুষটি তখনও এসে পৌঁছননি। সেদিনের মূল বক্তা বাভেরিয়ার জেনারেল স্টেট কমিশনার গুস্তভ রিটার ফন কার এসে পৌঁছলেন আধঘণ্টা দেরিতে। তাঁর সঙ্গে বাভেরিয়ার সর্বোচ্চ সামরিক নেতা জেনারেল অটো হারমান ফন লসো। পুলিসের সাহায্যে ভিড়ের মধ্যে রাস্তা করে দুজনে হলের শেষপ্রান্তে মঞ্চে পৌঁছলেন। অনুষ্ঠানের সংগঠক বক্তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে ভূমিকা পর্ব শেষ করতে কার বক্তৃতা দিতে উঠলেন। বলা ভালো, তাঁর লিখে আনা বয়ান পড়তে শুরু করলেন। মার্ক্সবাদের উত্থান এবং এর প্রভাব থেকে বাঁচতে মিউনিখের কী কী করা উচিত— এই ছিল বক্তব্যের প্রতিপাদ্য। হিটলার এবং রোজেনবার্গ তাঁদের পরিকল্পনামাফিক কিছু নাজি সমর্থকদের নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

হিটলার হঠাৎ বলে উঠলেন— “কার কী বলার চেষ্টা করছে আসলে? কারোর মাথায় আদৌ ঢুকছে?”

এমন সময় বেশ কিছু সাংবাদিককে নিয়ে ব্যাঙ্কোয়েট হলে হাজির হলেন হিটলারের বিশ্বস্ত অনুচর আর্নস্ট হানফ্‌স্‌ট্যাঙ্গল। ছ-ফুট উচ্চতার এই মানুষটাকে তাঁর বন্ধুবান্ধবরা ডাকতেন ‘পুৎসি’ নামে। জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করলে ‘কচি’ বলা যায়। তা এই পুৎসি বিয়ার এনে তাঁর বন্ধুদের সামনে ধরলেন— “যেভাবে দাঁড়িয়ে আছ, তাতে যে কেউ বুঝে যাবে তোমাদের মতিগতি ভালো নয়।” তারপর নিজের মাগে একটা চুমুক দিয়ে বললেন— “মিউনিখের এই ব্যাপারটা বেশ মজার। একটা বিয়ার মাগে নাক ডুবিয়ে দাও। কেউ ভুলেও তোমার দিকে তাকাবে না।” দলের মধ্যে মৃদু হাসির গুঞ্জন উঠল।

কিছুদূরে একটা ফাঁকা কারখানার সামনে সে রাতের নাটকের অন্য প্রস্তুতি চলছিল। বছর ছাব্বিশের এক তরুণ রাইফেল, মেশিনগান, গুলির ম্যাগাজিন হাতে হাতে তুলে দিচ্ছেন তাঁর সতীর্থদের। নাম জোসেফ ব্যারাসটল্ড, স্টোসটপ-হিটলার বাহিনীর প্রধান। নাজি বাহিনীর নির্বাচিত কিছু সাহসী এবং অনুগত সদস্য নিয়ে মাত্র মাস ছয়েক আগেই এস এস হিটলার গড়ে তোলা হয়েছে হিটলারের সুরক্ষার প্রয়োজনে। রাস্তায় বা বিয়ার হলের মতো বদ্ধ জায়গায় মারপিটের জন্যে এরা বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

ব্যারাসটল্ডের পাশেই দাঁড়িয়ে তিরিশ বছরের যুবক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘পুওর লে মেরিত’-এ ভূষিত পাইলট হেরমান গ্যোরিং। অমিতসাহসী এই পাইলট বিশ্বযুদ্ধে সাতাশটা প্লেন ধ্বংস করেছেন বলে গর্ব করতেন। যুদ্ধের পর ডেনমার্ক হয়ে সুইডেনে যান। প্রথমে স্টান্ট পাইলট, তারপরে চার্টার প্লেনের পাইলট হিসাবে কাজ করতেন। এমনকী ফকার প্লেন কোম্পানির সেলস্‌ বিভাগেও কাজ করেছেন। বছরখানেক আগে নাজি পার্টিতে যোগ দেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দলের একজন উল্লেখযোগ্য কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন। গ্যোরিং তখনও একজন সুপুরুষ যুদ্ধনায়ক। মরফিনে ডুবে থাকা পৃথুল গ্যোরিংকে আমরা পাব কিছু পরে। যাই হোক, গ্যোরিং চারমাসের মধ্যেই ‘স্টুরমাবটাইলং’ বা এস এ-র প্রধান হয়ে ওঠেন। ১৯২০-র শুরুর দিকে এস এ-এর জন্ম হয়েছিল নাজি পার্টির সুরক্ষা বাহিনী হিসাবে। বিয়ার হলগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে প্রয়োজনে বিপক্ষকে শায়েস্তা করতে, আবার কখনও দলের কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া এদের প্রাথমিক কর্তব্য। যে কোনও সামরিক সংগঠনের মতোই কোম্পানি, ব্যাটেলিয়ন এবং রেজিমেন্টে বিভক্ত এই আধাসামরিক সংগঠনের নাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম সেরা এক জার্মান কমান্ডো বাহিনী থেকে নেওয়া। তখনও এদের পরনে ধূসর জামা, বাম হাতে নাজিদের কুখ্যাত স্বস্তিকা চিহ্ন আঁটা ব্যান্ড। এস এ বাহিনীর খাকি পোশাক এসেছে আরও কিছু পরে, সম্ভবত পূর্ব আফ্রিকায় জার্মানির ঔপনিবেশিক বাহিনীর উদ্বৃত্ত সামরিক পোশাক থেকে।

এস এস হিটলার আর এস এ বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সেই রাতের পরিকল্পনা নিয়ে শেষ মুহূর্তের আলোচনা চলছে ব্যারাসটল্ড এবং গ্যোরিং-এর মধ্যে। এমন সময় সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে এসে একজন জানাল বিয়ার হলের সামনে থেকে সমস্ত লোকজন পুলিশ সরিয়ে দিয়েছে। সামান্য কয়েকজন অফিসার রয়েছে কেবল।

কিছুক্ষণ পরেই চারটে ট্রাক এসে থামল বিয়ার হলের সামনে। প্রথমে নেমে এল এস এস হিটলার বাহিনী। হাতে তাদের টমি গান এবং বেয়নেট। প্রথমেই পুলিশ অফিসারদের সরিয়ে নিয়ে গেল তারা। অন্যদিকে গ্যোরিং শ-খানেক এস এ সদস্য নিয়ে প্রবেশ করলেন হলের মধ্যে। আটটা পঁচিশের মধ্যেই যাতায়াতের সমস্ত দরজা, টেলিফোন লাইন কব্জা করল তারা। জানালা ঢেকে দিয়ে সার বেঁধে দাঁড়াল মূল হলের দেওয়াল বরাবর। স্বস্তিকা আঁকা ব্যানার ঝুলল একদিকে। একটা অলিন্দে বসানো হল ভারী একটা মেশিনগান।

হিটলার ততক্ষণে নিজের ভারী ট্রেঞ্চ কোট খুলে ফেলেছেন। পরনে হালকা কালো কোট। বুকে আঁটা যুদ্ধে পাওয়া দুটো আয়রন ক্রশ। বিয়ার মাগ থেকে শেষ চুমুক নিয়ে সেটা আছড়ে ফেললেন মেঝেতে। হাতে উঠে এসেছে তাঁর ব্রাউনিং পিস্তল। সেটা কড়িকাঠের দিকে তাক করে তাকালেন মঞ্চের দিকে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দেহরক্ষী উলরিখ গ্রাফকে বললেন, “পেছনে নজর রাখো। কেউ যেন গুলি করে না বসে।” উলরিখের বয়স পঁয়তাল্লিশ, পেশায় কসাই, আগে বক্সিং করত, হাট্টাকাট্টা চেহারা। বিয়ার বার আর খোলা রাস্তায় লড়াই করা দলের নেতার জন্যে উপযুক্ত দেহরক্ষীই বটে।

বক্তা গুস্তভ ফন কার হঠাৎ দেখলেন কয়েকজন মানুষ টেবল চেয়ার উলটে, খাবারের প্লেট ছুঁড়ে ফেলে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছে। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন কমিউনিস্টরা ঝামেলা পাকাতে এসেছে। কিন্তু হঠাৎ চোখে পড়ল তাদের ঝকঝকে হেলমেট, হাতে লাল স্বস্তিকা, উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র। উপস্থিত সবাই ধরেই নিয়েছেন আরেকটা রাজনৈতিক হত্যা প্রত্যক্ষ করতে চলেছেন। আস্তে আস্তে হট্টগোলে পরিণত হতে শুরু করেছে দর্শকদের আর্তনাদ। মঞ্চের একেবারে সামনে এসে একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে হিটলার চেঁচিয়ে কিছু বললেন। কিন্তু সবার সম্মিলিত চিৎকারে তা ঢাকা পড়ে গেল। হিটলারের দেহরক্ষী ছাদ লক্ষ্য করে গুলি চালালেন। আওয়াজ তবু কমল না। এবার গর্জে উঠল হিটলারের হাতের ব্রাউনিং।

চারিদিকের উচ্চগ্রাম শব্দ ততক্ষণে গুঞ্জনে পরিণত হয়েছে। চেয়ার থেকে নেমে মঞ্চে উঠে এলেন হিটলার। এক পুলিশ অফিসার পথ আটকালেন তাঁর। হিটলার পিস্তলের নল নেমে এল সেই অফিসারের কপালে। সামনেই বসে আছেন বাভেরিয়ান পুলিশের প্রধান কর্নেল হান্স রিটার ফন সেইসার। তিনি ইশারায় হিটলারকে যেতে দিতে বললেন।

“বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে।” হিটলার কর্কশ স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন। পুরো ব্যাঙ্কোয়েট হল নিশ্চুপ।

“আমার ছ-শ সশস্ত্র সেনা এই বিয়ার হল ঘিরে ফেলেছে। কেউ বেরোনোর চেষ্টা করবেন না। বার্লিন এবং বাভেরিয়ার সরকার ক্ষমতাচ্যূত। সেনা ছাউনি, পুলিশের সদর দপ্তর এখন আমাদের কব্জায়।”

বস্তুত পুরোটাই নির্জলা মিথ্যা। কিন্তু হিটলার আশা করছেন খুব শীঘ্রই তাঁর পরিকল্পনামাফিক এমনটাই হবে। দরদর করে ঘেমে চলেছেন তিনি। উত্তেজনায় তাঁর শরীর কাঁপছে থরথর করে। এবার তিনি ঘুরলেন বাভেরিয়ার তিন শক্তিশালী মানুষের দিকে— জেনারেল স্টেট কমিশনার গুস্তভ ফন কার, সেনাপ্রধান জেনারেল অটো ফন লসো এবং পুলিশ প্রধান কর্নেল হান্স ফন সেইসার।

“আপনারা আমার সঙ্গে আসুন। পাশের ওই ঘরটাতে। দশ মিনিটের ব্যাপার।”

অনেকগুলো বন্দুকের নলের সামনে নিরুপায় তিনজন হিটলারকে অনুসরণ করে ধীরে ধীরে ব্যাঙ্কোয়েট হল থেকে বেরিয়ে গেলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন আমরা দেখেছি জার্মান অর্থনীতির অবস্থা। যুদ্ধের পরে অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। জার্মান অর্থনীতি নিদারুণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। সত্যি বলতে কী, ‘নিদারুণ’ কেন, কোনও বিশেষণই এই সংকটকে যথার্থভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। যুদ্ধের ঠিক আগে ৪.২ জার্মান মার্ক এক আমেরিকান ডলারের সমান ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ১৯১৮-র ডিসেম্বরে সেটা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেল। প্রতি ডলারে মার্ক-এর মূল্যমান এসে দাঁড়াল ৮-এ। ১৯২৩-এর জানুয়ারিতে জার্মানি যখন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণে অপারগ হয়ে পড়ল, ডলারের অনুপাতে মার্ক গিয়ে পৌঁছল ১৮,০০০-এ। অনাদায়ী অর্থ উশুল করতে ফ্রান্স এসে দখল করল রূঢ় শিল্পাঞ্চল। দেশের আশি শতাংশ কয়লা, লৌহ আকরিক খনি আর ইস্পাত কারখানা হাতছাড়া হল জার্মানির। জার্মান শ্রমিকরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র-সমর্থিত ধর্মঘট ডাকল। এইসবের মাঝে অর্থের যোগান বজায় রাখতে বার্লিন হাজার দুয়েক প্রেসে দিনরাত নোট ছাপতে শুরু করল। ফলত অবস্থা করুণতর হয়ে দাঁড়াল। জুলাই নাগাদ এক ডলারের সাপেক্ষে জার্মান মার্ক গিয়ে দাঁড়াল সাড়ে তিন লক্ষে। মাসখানেকের মধ্যেই সেটা হল দশ লক্ষ। আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিক পড়ছেন, ওয়ান আমেরিকান ডলার ইজ ইকুয়াল টু ওয়ান মিলিয়ন জার্মান মার্ক। তারপর বিলিয়ন, হান্ড্রেড বিলিয়ন ইত্যাদি সংখ্যা পেরিয়ে ১৯২৩-এর ডিসেম্বরে এক ডলারের দাম হল ৬.৭ ট্রিলিয়ন মার্ক। আধুনিক অর্থনীতিতে অতিমুদ্রাস্ফীতির বিরল কয়েকটা বিপর্যয়ের বোধ হয় এটাই প্রথম উদাহরণ।

হিটলারের বিয়ার হল অভিযানের সপ্তা দুয়েক আগে, মানে অক্টোবরের শেষদিকে একখণ্ড পাঁউরুটির দাম ছিল মোটামুটি ৩২ বিলিয়ন মার্ক। এই চরম শৈত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জার্মানরা কারেন্সি নোট দিয়ে খাবারদাবার কেনার চেষ্টা না করে সেগুলো চুল্লিতে পুড়িয়ে উষ্ণতা খুঁজে নিতে চাইছিল। এমন দুর্দিনে আপামর জনগণ এক নায়কের সন্ধানে। মুশকিল আসান মন্ত্র নিয়ে আসবেই এক ভরসার জন। হিটলার জনতার সেই পরম অপেক্ষার অভীষ্ট মসিহা হয়ে উঠতে চাইলেন। অর্থনীতির এই ভয়াবহ অবস্থা রাতারাতি শুধরোবার কোনও উপায় হিটলারের জানা ছিল না। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল স্থির। দিনের পর দিন এই অর্থনৈতিক সংকটের জন্যে তিনি দায়ী করে যেতে থাকলেন ইহুদি পুঁজিবাদীদের। মানুষ যা শুনতে চাইছে, সাজিয়ে গুছিয়ে তাদের সামনে সেটাই পেশ করলে ভক্স পপুলি ধন্য-ধন্য করবে, স্বাভাবিক। ১৯২২-এ নাজিদের সদস্য সংখ্যা ২২ হাজার থেকে গিয়ে দাঁড়াল ৫৫ হাজারে। ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদার, ছাত্র, কারিগর, কৃষক— নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি।

সমর্থকরা হিটলারকে ফুয়েরার হিসাবে তখন থেকেই মেনে নিয়েছিল। ইতালির ফ্যাসিস্টদের নকল করে নাজিরা ডান হাত সামনে বাড়িয়ে ধরে কুখ্যাত নাজি স্যালুটও শুরু করেছে— “হেইল হিটলার।” তাদের হাতে বাঁধা কাপড়ের পটিতে স্বস্তিকা চিহ্ন। আর্যদের জাতিগত বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসাবে বেছে নেওয়া এই চিহ্ন তাদের দলীয় পতাকাতেও। হিটলারের দল তখন একটা বিপ্লবের প্রত্যাশায় টগবগ করে ফুটছে। তাদের লক্ষ্য নভেম্বরের অপরাধীরা, যারা বার্লিনে বসে সরকার চালাচ্ছে। তাদের শত্রু ইহুদি, কমিউনিস্ট এবং দক্ষিণপন্থী দলগুলোও। অপেক্ষা শুধু একটা সুযোগের।

১৯২৩-এর শুরুতে ফরাসিরা রূঢ় শিল্পাঞ্চলের দখল নেওয়ায় সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বটে। কিন্তু ২৭ জানুয়ারি দলীয় সভায় হিটলার ব্যতিক্রমী মেজাজে নিজের দলের লোকজনকে শান্ত করে আরও বড় পরিকল্পনার দিকে পা বাড়ান। ১৯২৩-এর ফেব্রুয়ারিতে আর্নস্ট রমের নেতৃত্বে নাজিদের এস এ আধাসামরিক বাহিনীতে পরিণত হল। বিয়ার হলে মারদাঙ্গা ছাড়াও রাস্তায় নেমে ইহুদিদের উত্যক্ত করা, তাদের দোকান ভাঙচুর করার মতো ঘটনা এস এ বাহিনীর নিত্যনৈমিত্তিক কাজে পরিণত হয়েছিল। ১ মে আরও একবার সুযোগ আসে অভ্যুত্থানের, কিন্তু হিটলার এবারও সংযমের পরিচয় দেন। তিনি জানতেন সুশৃঙ্খল বাভেরিয়ান পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে তাঁর দল এঁটে উঠতে পারবে না। যদিও নাজিরা মোটেও দুর্বল ছিল না। এস এ বাহিনী বার্লিনকে প্রায় হাতের মুঠোতে রেখেছিল। বার্লিন দখলে তাদের অস্ত্র বা সামরিক ক্ষমতার অভাব ছিল না। জানুয়ারিতে হিটলার না ঠেকালে তারা সেটা প্রায় করেই ফেলেছিল। মে মাসে রমের নেতৃত্বে মিউনিখের সেনা ছাউনি থেকে তারা অস্ত্রশস্ত্রও লুঠ করেছিল। কিন্তু সরকারি চাপে হিটলার আরও একবার নতি স্বীকার করে সেইসব অস্ত্র ফিরিয়ে দেন। একই বছরে এভাবে দু-দুবার পিছিয়ে আসার ফলে দলের মধ্যেই হিটলারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। ওদিকে বাভেরিয়ার সরকারও মিউনিখের এই জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ করতে সাহস করছিল না। কারণ হিটলারের আক্রমণের তির বার্লিনের সরকারের থেকে যে কোনও মুহূর্তে তাদের দিকেও ঘুরে যেতে পারে। ফলে দু-পক্ষই নিরাপদ দূরত্ব রেখে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যত অবনতির দিকে এগোচ্ছিল, জনরোষের ওপর হিটলারের নিয়ন্ত্রণ ততটাই দৃঢ় হচ্ছিল। সরকারের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন সময়ের অপেক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

১৯২৩-এর সেপ্টেম্বরে বাভেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী আইগেন ফন কিনিলিং সামরিক অবস্থা ঘোষণা করে গুস্তভ ফন কারকে স্টেট কমিশনার হিসাবে নিযুক্ত করেন। তাঁর হাতে স্বৈরশাসন তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল ‘হিটলার আন্দোলন’ দমন করা। কার সঙ্গে পেলেন সেনাপ্রধান লসো এবং পুলিশপ্রধান সেইসারকে। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এই তিনজন পরামর্শ করে ২৬ সেপ্টেম্বর জরুরি অবস্থা জারি করলেন। পুরো অক্টোবর কোনোরকম রাজনৈতিক সমাবেশ করা যাবে না।

নাজিদের সদর দপ্তরে অজস্র চিঠি আসতে শুরু করল। জনসাধারণ মুক্তির উপায় হিসাবে বেছে নিয়েছে হিটলারকে। ৩০ অক্টোবর এক বক্তৃতায় হিটলার আশা দিলেন, খুব শীঘ্রই বার্লিনের মার্ক্সবাদী আর ইহুদিদের ওই সরকারের পতন ঘটবে। কার বাঁকা হাসলেন। মিউনিখের চুনোপুঁটিরা বার্লিন দখলের স্বপ্ন দেখছে! দেশ শাসন করতে চাইছে এই স্বস্তিকাধারীরা!

হিটলার প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে থাকলেন। মিউনিখের প্রাক্তন পুলিশ প্রধান আর্নস্ট পোনারের সঙ্গে হাত মেলালেন। পোনার চূড়ান্ত ইহুদি-বিদ্বেষী। পুলিশের শীর্ষের থাকাকালীন ১৯১৯-এ বাভেরিয়ার সমস্ত ইহুদিকে বিতাড়িত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। হিটলার কথা দিলেন, বিদ্রোহ সফল হলে তিনি বাভেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসাবে ক্ষমতায় আসবেন।

অভ্যুত্থানের তারিখ স্থির হল ১০ নভেম্বর। দুটো কারণ। এক, সপ্তাহের শেষে শনিবার রাতে পুলিশবাহিনী সংখ্যায় কম থাকবে। তারা সক্রিয় হয়ে ওঠার আগেই নাজিরা তাদের পরিকল্পনায় অনেক দূর এগিয়ে যাবে। দুই, দশ তারিখ সমস্ত কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলে পরদিন সকালে, অর্থাৎ ১১ নভেম্বর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধবিরতির ওই তারিখে মিউনিখ দখল করে বার্লিন অভিযানের ঘোষণায় নভেম্বরের ওই বিশ্বাসঘাতকদের যথাযথ বার্তা পৌঁছে দেওয়া যাবে।

কিন্তু হঠাৎ খবর এল ৮ নভেম্বর কার, লসো এবং সেইসার সভা করতে চলেছেন। কানাঘুষো চলছিল, কার নিজেই ক্ষমতা দখলের উদ্যোগ করছেন। সেক্ষেত্রে হিটলারের আগেই তিনি যদি বার্লিন দখলের সূচনা বা স্বাধীন বাভেরিয়ার ঘোষণা করেন, তাহলে নাজিদের সমস্ত পরিকল্পনা মাঠে মারা যাবে। ফলে তড়িঘড়ি তারিখ বদলে হিটলার ৮ নভেম্বর কারের ওই সভাকে নিশানা করলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%