রোহণ কুদ্দুস
হিটলার যদিও দাবি করেছেন জার্মানির পরাজয়ের খবরে মর্মাহত হয়ে দেশোদ্ধারে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেবেন ঠিক করেছিলেন, বাস্তবে ঘটনাক্রম ছিল অন্য। ১৯১৮-র ২১ নভেম্বর হিটলার হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে প্রতিশোধের রাস্তা খুঁজতে যাননি। তিনি তখন এক আহত সৈনিক মাত্র। কোনও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নেই। অর্থ উপার্জনের কোনও রাস্তাও খোলা নেই সামনে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পড়ে আছে পনেরো মার্ক। ফলে তিনি সেনা দপ্তরে অনুরোধ করলেন তাঁকে চাকরিতে বহাল রাখার। এরপর আমরা হিটলারকে পরের দু-বছর রাশিয়ান যুদ্ধবন্দিদের শিবির পাহারা দিতে দেখব। কখনও তিনি মিউনিখের রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে টহল দিচ্ছেন বা সেনাবাহিনীর মধ্যে ট্রেনিং-এর সহায়তা করছেন।
জার্মানিতে তখন প্রকৃতপক্ষেই অরাজক অবস্থা। দেশের মানুষ সেনা আর সাধারণ নাগরিকে ভাগ হয়ে গেছে। রাজনীতিতে চরম বাম বনাম চরম ডান। দিনের আলোয় রাস্তা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দুষ্কৃতিরা। আর এই সবের সঙ্গেই জন্ম নিয়েছে এক তীব্র ইহুদি-বিরোধিতা। শিক্ষায়, অর্থে সমাজের ওপরতলায় তাদের অবস্থান তখন প্রকট। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সংকট ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। হিটলারের রাজনীতিতে প্রবেশের আগে একবার সামগ্রিক পরিস্থিতিতে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।
৩ নভেম্বর কিয়েলে জার্মান নৌ-সেনারা কিয়েল বন্দর শহরে বিদ্রোহ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতিতে বিক্ষুব্ধ সেনাদের এই প্রতিবাদ ছিল মূলত জার্মান সম্রাটের বিরুদ্ধে। গৃহযুদ্ধের আঁচ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। রাজনীতির ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে অবতীর্ণ হল দুটো দল। প্রথম দল ইনডিপেনডেন্ট সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (উনাভাঙিগা সোশিয়ালডেমোক্রাটিচে পারতাই ডয়েচল্যান্ডস্ বা USPD), যারা সোভিয়েত রাশিয়ার মতো পার্টিতন্ত্রভিত্তিক শাসনতন্ত্রের সমর্থক। অন্য দলটি সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা মেজরিটি সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (মেয়াহায়ের্ট সোশিয়ালডেমোক্রাটিচে পারতাই ডয়েচল্যান্ডস্ বা MSPD), যারা সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস রাখে। বস্তুত সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ১৯১২-র নির্বাচনে ৩৫% জাতীয় ভোট এবং রাইখস্টাগের ১১০টি আসন পেয়ে সেই সময় জার্মানির সবথেকে বড় রাজনৈতিক দল ছিল। ১৯১৪-তে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গারি যখন সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, তখন জার্মানির যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে এই দলের একটা অংশ বিরোধিতা করেছিলেন। সেই মুহূর্তে জাতীয়তার প্রশ্নে সবাই শেষ পর্যন্ত একমত হলেও ১৯১৭-তে যুদ্ধে বিপর্যস্ত সাধারণ জনজীবনকে সামনে রেখে আবার অসন্তোষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ফলে জন্ম নিল USPD, যারা যুদ্ধের বিরোধী। তাদের সমর্থনে রইল কয়েকশ কমিউনিস্ট সদস্য নিয়ে গড়ে ওঠা স্পার্টাসিস্ট লিগ। সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নতুন নাম হল মেজরিটি সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি।
গণ অসন্তোষ প্রশমিত করতে এবং সেনা অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নির্মূল করতে MSPD-র সর্বময় কর্তা ফ্রেডরিখ এবার্ট-এর মধ্যস্থতায় কায়জার দ্বিতীয় উইলহেল্ম্ সাময়িকভাবে সিংহাসন ছেড়ে নেদারল্যান্ডে নির্বাসনে যান। যদিও তাঁর আর কখনোই ফেরা হয়নি। জার্মানিতে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটল ৯ নভেম্বর। USPD ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় MSPD-র ডেপুটি চেয়ারম্যান ফিলিপ সাইডেমান ওইদিন বার্লিনের রাইখস্টাগে জার্মান প্রজাতন্ত্র গঠনের ঘোষণা করলেন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বার্লিনের সিটি প্যালেসে USPD-র কার্ল লিব্ক্নেস্ট স্পার্টাসিস্ট লিগের রোজা লুক্সেমবার্গের সঙ্গে মিলিতভাবে জার্মানিকে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করলেন। এবার্ট নিজেকে চ্যান্সেলার হিসাবে দেখতে ইচ্ছুক। ফলে ক্ষমতার এই নাটকীয় টানাপোড়েনে স্বভাবতই তিনি ক্ষুদ্ধ হলেন। আগ বাড়িয়ে সাইডেমানের ঘোষণাকে পাশে সরিয়ে দিয়ে তিনি বিবৃতি দিলেন— দেশের ভবিষ্যত স্থির হওয়া উচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। তাঁরা চাইলে আরও একজন সম্রাটকেও নিয়োগ করতে পারেন রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে।
ঘটনাচক্রে কাউনসিল অফ দ্য পিপলস্ ডেপুটিস নামে অস্থায়ী সরকার গঠিত হল। এবার্ট USPD-র হুগো হাসের সঙ্গে যুগ্মভাবে সেই সরকারের প্রধান হিসাবে শাসনভার গ্রহণ করলেন। ১১ নভেম্বর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলে এই কাউনসিল পাকাপাকিভাবে জার্মানির দায়িত্বে এল। USDP-র সঙ্গে ক্ষমতার বাঁটোয়ারায় এবার্ট স্বাভাবিকভাবেই খুশি ছিলেন না। ১৯১৯-এর ১৫ জানুয়ারি কার্ল লিব্ক্নেস্ট এবং রোজা লুক্সেমবার্গ সদ্যগঠিত আধাসামরিক বাহিনী ফ্রাইকোয়ার হাতে নিহত হলেন। মূলত বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্তন সৈন্যদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনী কমিউনিস্টদের দমনে এবার্টের হাতিয়ার হয়ে উঠল।
ওদিকে বাভেরিয়ার রাজা তৃতীয় লুডউইগও ৭ নভেম্বর সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া USDP-র কুর্ট আইজনার সমাজতান্ত্রিক বাভেরিয়ার প্রথম প্রিমিয়ার (প্রেসিডেন্ট-এর সমতুল্য পদ) হিসাবে নিযুক্ত হলেন। জন্মসূত্রে ইহুদি আইজনার ২৩ নভেম্বর এক মারাত্মক ভুল করলেন। তিনি পুরনো কিছু নথি দিয়ে প্রমাণ করে দিলেন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গারির সমর্থনে জার্মানির যুদ্ধে অংশগ্রহণ যুদ্ধোন্মাদ কয়েকজন সামরিক অফিসারের সঙ্গে শিল্পপতি, পুঁজিপতি, রাজনীতিক এবং রাজবংশের কিছু মানুষের আঁতাতে ঘটেছিল। স্বভাবতই দক্ষিণপন্থী জার্মান দেশপ্রেমিকরা, যারা জার্মানির যুদ্ধে অংশগ্রহণের উদগ্র সমর্থক, এই ব্যাপারটা সহজে মেনে নিতে পারল না। ১৯১৯-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি আইজনার এক জার্মান জাতীয়তাবাদীর হাতে খুন হলেন। কারণ— “আইজনার একজন বলশেভিস্ট এবং ইহুদি। সে আদৌ জার্মান নয়… বিশ্বাসঘাতক।” অচিরেই বাভেরিয়ার কমিউনিস্ট অধ্যুষিত সমাজতান্ত্রিক সরকারকেও সদ্য গড়ে ওঠা আধাসামরিক বাহিনী ফ্রাইকোয়ার সাহায্যে নির্মূল করে দেওয়া হল।

রোজা লুক্সেমবার্গ। সূত্র - উইকিপিডিয়া
রোজা লুক্সেমবার্গ। সূত্র - উইকিপিডিয়া
যাঁরা যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই হিনডেনবার্গ এবং লুডেনডর্ফ সাধারণ মানুষের অসন্তোষকে সামাল দিতে একটা তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন— জার্মানির অপ্রতিরোধ্য বাহিনী হেরেছে দেশেরই কিছু মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায়। তারাই জার্মান বাহিনীর পিঠে ছোরা গাঁথার কাজটা করেছে। বস্তুত পরাজয়ের কিছু মাস আগে পর্যন্তও প্রচার চালানো হচ্ছিল জার্মানি যুদ্ধ জিতছেই। অতএব অকস্মাৎ যুদ্ধ হারার এই মানসিক ধাক্কায় জার্মানির জনসাধারণ চোখের সামনেই দেখল কিছু মানুষ সত্যি করেই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। MSDP সুচারুভাবে USDP, স্পার্টাসিস্টসহ তাদের বিরোধী সমস্ত বামপন্থী এবং ক্যাথলিকদেরও দাগিয়ে দিল দেশের শত্রু হিসাবে। একটা বন্ধনীর মধ্যে এদের নাম দেওয়া হল ‘নভেম্বরের অপরাধী’ বা ‘নভেম্বর ক্রিমিনাল্স্’।
হিটলারের জন্যে যদিও নভেম্বর ক্রিমিনাল্স্-এর তালিকা ছিল দীর্ঘ। বামপন্থী, দক্ষিণপন্থী, ক্যাথলিক, পুঁজিপতি, এমনকী MSDP— সবাই তাতে সামিল। যুদ্ধবিরোধী কুর্ট আইজনার ও রোজা লুক্সেমবার্গ দুজনেই ইহুদি ছিলেন, তাই অনেক দক্ষিণপন্থীই ইহুদি আর কমিউনিস্টদের একই সারিতে দাঁড় করিয়ে ইহুদিদেরও নভেম্বর ক্রিমিনাল্স্ বলে চিহ্নিত করতে চাইছিলেন। কিন্তু হিটলার ইহুদিদের তখনও সেভাবে বিরোধী শক্তি হিসাবে দেখতে শুরু করেননি। তাঁর কাছে বরং এবার্ট বা সাইডেমান ছিলেন অনেক বেশি ঘৃণ্য, কারণ তাঁরা যুদ্ধবিরতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সত্যি বলতে কী, হিটলারের রাজনৈতিক চিন্তা সেই সময় যদি কোনও ‘বাদ’কে প্রাধান্য দিয়ে থাকে, তবে তা হল সুবিধাবাদ। ‘মাইন কাম্ফ’-এ একবারও তিনি উল্লেখ করেননি বটে, কিন্তু তিনি সামান্য হলেও বামপন্থীদের দিকে ঝুঁকেছিলেন। ১৯১৯-এ বিপ্লব ঘটাচ্ছে যে বামপন্থীরা, তাদের সমর্থনে ‘সোলজার্স কাউনসিল’-এর নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন হিটলার। যুদ্ধবিরোধী বামপন্থীদের পক্ষে তাঁর এই অবস্থান অবশ্য ক্ষণস্থায়ী ছিল। ১৯১৯-এর ৯ মে যখন বাভেরিয়ার বামপন্থীদের পতন হল, হিটলার দ্রুত শিবির বদলে বাম আন্দোলনবিরোধী চরম দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে হাত মেলালেন।
এই সময় তিনি জার্মান গোয়েন্দা দপ্তরের কর্মকর্তা কার্ল মায়ারের চোখে পড়েন। সোলজার্স কাউনসিল-এ হিটলারের যুদ্ধবিরোধী বামেদের তরফে বক্তৃতা এবং পরে তাঁর বামবিরোধী হয়ে যাওয়া— কোনোটাই নজর এড়ায়নি মায়ারের। তাঁর কাজ ছিল সেনাবাহিনী থেকে বাম সমর্থকদের উৎপাটন করা। হিটলারকে সেই কাজে লাগিয়ে দিলেন মায়ার। হিটলার তাঁর প্রভুর ইচ্ছে অনুসারে তাঁর পূর্বপরিচিত বামদরদীদের খুঁজে বের করার কাজটা খুব দক্ষতার সঙ্গে করতে শুরু করলেন।
হিটলারের কর্মতৎপরতায় খুশি হয়ে মায়ার তাঁকে আরও ‘শিক্ষিত’ করে তুলতে লেচফেল্ডের এক সেনাঘাঁটিতে চলতে থাকা ‘জাতীয় ভাবনা’-র ওপর একটা কর্মশালায় যুক্ত করে দিলেন। নামেই অর্থনীতি এবং পুঁজিবাদের ওপর লেকচার। মূল লক্ষ্য ছিল ইহুদি এবং শ্লাভদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচার করা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পতনে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে সম্যক মগজধোলাই চলতে লাগল।
হিটলার কিছুটা বুঝলেন, কিছুটা নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে নিলেন। তিনি বুঝলেন, ইহুদিরা বলশেভিক মতধারাকে প্রশ্রয় দেয় এবং তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বস্তুত, তারা সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে— শ্রমিক, স্টক মার্কেট, রাজনীতি। এবং তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য জার্মানির ক্ষতিসাধন করা। তারা রাষ্ট্রের শত্রু, জনগণের শত্রু। এসব হিটলার এই প্রথম শুনছেন, তা নয়। ভিয়েনা থাকাকালীনও এইসব মতধারার সংস্পর্শে তিনি এসেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতে দাঁড়িয়ে তাঁর কাছে এই সমস্ত বক্তব্য খুবই যুক্তিযুক্ত মনে হতে লাগল। এমনকী বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ক্ষুধার্ত শ্রমিকদের ধর্মঘট, যা জার্মানির পরাজয়ে সুনিশ্চিত ভূমিকা নিয়েছিল, সেখানেও হিটলার ইহুদিদের ষড়যন্ত্র দেখতে পেলেন।
ইহুদি পুঁজিপতি এবং কমিউনিস্টরা জার্মানির বিরুদ্ধে সুগভীর চক্রান্ত করছে। দেশপ্রেমিক হিসাবে হিটলার কী করে নিশ্চুপ থাকেন? বেশিদিন অপেক্ষা করতে হল না। ট্রেনিং-এর একটা পর্যায়ে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে গটফ্রিড ফেডার নামক এক ইঞ্জিনিয়ারের বক্তৃতা শুনতে গেলেন হিটলার। ইহুদিরা আন্তর্জাতিক পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে— এই ছিল সেই বক্তব্যের বিষয়। তাঁর বক্তৃতা শেষ হতেই মঞ্চে এলেন যুবক হিটলার। তাঁর জ্বালাময়ী ভাষা, অদম্য অভিব্যক্তি, আবেগমথিত আবেদন— উপস্থিত শ্রোতাদের মুগ্ধ করল। ইহুদিরা শুধুমাত্র বিশ্বব্যাপী পুঁজির রক্ষকই নয়, তারা বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের উত্থানের পেছনেও অন্যতম বড় কারণ বটে। নাজি ভাবাদর্শের মূল ভিত্তি এখানেই রচিত হয়ে গেল। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই হিটলার জনসমক্ষে বক্তৃতা শুরু করলেন। শীঘ্রই তিনি লেচফেল্ডের ছাব্বিশজন প্রশিক্ষকের একজন হয়ে উঠলেন। দেশের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে উঠল তাঁর বিষয়। বক্তা বা তাঁর বক্তৃতার বিষয় নয়, শ্রোতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করল তাঁর বক্তৃতার কৌশল। তিনি সহজেই ভয়, ঈর্ষা, ঘৃণা— এই সহজ আবেগগুলো শ্রোতাদের মধ্যে চারিয়ে দিতে পারতেন। হিটলার দেখলেন তাঁর শ্রোতার সংখ্যা আস্তে আস্তে বেড়ে চলেছে। ইহুদি বিরোধিতা দিয়ে খুব সহজেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ, যারা যুদ্ধের ফলে সবথেকে বেশি প্রভাবিত, তাদের বিরক্তি, রাগ, ঘৃণাকে একত্রিত করে হিটলার একটাই প্রতিপক্ষ খাড়া করলেন— ইহুদি। দেশের এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর ক্রমাগত দোষারোপে সমস্যার মূলে কারও দৃষ্টিই গেল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটেনের অবরোধের ফলে জার্মান অর্থনীতির অবক্ষয়ের ছবিটাও সবাই বেমালুম ভুলে গেল। কাউকে বলির পাঁঠা হিসাবে তুলে ধরে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সমস্ত ভয়, আতঙ্ক, ঘৃণা সেদিকে ঠেলে দেওয়াটা রাজনীতিতে খুব পুরনো কিন্তু প্রামাণ্য কার্যসিদ্ধির উপায়।
হিটলার খুব সাফল্যের সঙ্গেই রাজনীতিক হিসাবে তাঁর অবস্থান পাকা করে নিচ্ছিলেন। কিন্তু শুধুমাত্র বক্তৃতার নাটকীয়তার মাধ্যমেই শ্রোতাদের ভোলানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। প্রয়োজন ছিল এমন একটা ঘটনার যা অনুঘটকের মতো শ্রোতার কাছে তাঁর বক্তব্যের সারবত্তা প্রমাণ করবে। ভার্সাই সন্ধি সেই কাজটাই করল।

ভার্সাই সন্ধির আগে জার্মানি, German History in Documents and Images-এর সাইট থেকে নেওয়া। মানচিত্রটি এখানে রাখার আরও একটি উদ্দেশ্য এই যে, এর পর আমরা বাভেরিয়া-প্রুশিয়া, মিউনিখ-বার্লিন— এই দ্বন্দ্বগুলো আলোচনা করব। পাঠকের এদের পারস্পরিক অবস্থান জানাটাও জরুরি।
১৯১৯-এর ২৮ জুন শান্তিরক্ষার এই সন্ধিপত্র সমগ্র জার্মান অহং-এর জন্যে অসহনীয় হয়ে উঠল। মিত্রশক্তি এই যুদ্ধের সমস্ত দায় চাপিয়ে দিল জার্মানির ওপর। জার্মানির সমস্ত উপনিবেশ বাজেয়াপ্ত করা হল। সেনাবাহিনীতে সৈন্যসংখ্যা ধার্য করা হল এক লক্ষ। নৌবাহিনীতে ছত্রিশটা জাহাজ। বিমানবাহিনীর কোনও অস্তিত্ব রইল না। ফ্রান্সের দাবি অনুসারে জার্মানির সামরিক শক্তি পুরোপুরি ভেঙে সেওয়ার ব্যবস্থা করা হল। জার্মানির কিছু কিছু অঞ্চলেও হস্তক্ষেপ করা হল। পোল্যান্ড এবং চেকোশ্লোভাকিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল। ১৮৭১-এর ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে অধিকৃত আলজাস-লোরেন ফেরত গেল ফ্রান্সের কাছে। সিলেসিয়া এবং পোসেনের কিছু অংশ পেল পোল্যান্ড। এর সঙ্গেই যুক্ত হল ১৩২ বিলিয়ন মার্কের ক্ষতিপূরণ, যা সেই সময় প্রায় ৩০ বিলিয়ন আমেরিকান ডলারের সমতুল্য। সন্ধিপ্রস্তাবে জার্মানির কিছুই বলার রইল না। সাধারণ জার্মানের জন্যে তাঁদের রাষ্ট্র ফ্রান্স আর ব্রিটেনের ক্রীতদাসের সামিল হয়ে পড়ল। প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ জার্মান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের মধ্যে ২০ লক্ষ নিহত এবং ৪০ লক্ষ আহত। জনমানসে যে দগদগে ক্ষত তখনও রক্তাক্ত হয়ে উঠছে মাঝে মাঝেই, তাতে ভার্সাই সন্ধি নুনের ছিটে দিল। যুদ্ধের দায় নেওয়ার মতো অপমানকর শর্ত, সঙ্গে এমন চড়া ক্ষতিপূরণের বোঝা। রাষ্ট্র-রাজনীতির এমন তিক্ত পরিবেশ হিটলারের মতো রাজনৈতিক নেতার উত্থানের জন্যে আদর্শ হয়ে উঠল।
সৈনিক হিটলারের থেকে রাজনীতিক হিটলার আলাদা এক মানুষ। সৈনিক তাঁর কর্তব্যপালনের মাধ্যমে দেশের সেবা করতে চেয়েছিলেন। রাজনীতিকের সামনে সদ্য-আবিষ্কৃত উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ক্ষমতার প্রতি তাঁর লালসা অপরিসীম। তিনি কূটনীতির মাধ্যমে জনমানসে জায়গা করে নিতে চান। ফলে ভার্সাই সন্ধির জন্যেও ইহুদিদের দোষারোপ করার সাধারণ প্রবণতাকে তিনি কাজে লাগালেন। এতদিন হিটলারের ইহুদি-বিরোধিতা ছিল মৌখিক, ভার্সাই সন্ধির পরে ১৬ সেপ্টেম্বর তা এল লিখিত আকারে। অ্যাডল্ফ্ জেমলিচ নামক এক সৈন্য হিটলারের কাছে জানতে চান ইহুদিরা জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী কি না। হিটলারের জীবনীকার ফলকার উলরিচের মতে এর উত্তরে হিটলার যে দীর্ঘ চিঠিটি লিখেছিলেন, সেটা তাঁর জাতিবিদ্বেষের দীর্ঘ ইতিহাসের একটা উল্লেখযোগ্য দলিল হয়ে থাকবে। যুক্তিকে পাশে সরিয়ে রেখে আবেগের মাধ্যমে এই চিঠিতে হিটলার ইহুদিদের জার্মান রাষ্ট্রকে ধ্বংসের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। সেই সময় ইহুদিরা মোট জার্মান জনসংখ্যার এক শতাংশও নয়, অধিকাংশ ইহুদিই ধনী বা রাজনীতিতে জড়িত নয়, জার্মান ইহুদিরা তাদের জনসংখ্যার অনুপাতেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল— এই তথ্যগুলো সেই চিঠিতে স্বভাবতই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটা সত্যিই যে, ইহুদিরা সাধারণ জার্মানদের থেকে তুলনামূলকভাবে শিক্ষায় এগিয়ে ছিল বা স্বচ্ছল ছিল। কিন্তু এতে রাষ্ট্রের মাথাপিছু আয় বা সার্বিক উন্নতিতে তাদের অবদানকেই ইঙ্গিত করে।
এর মধ্যেই গোয়েন্দা দপ্তর থেকে নির্দেশ এল জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি নামে একটা নতুন রাজনৈতিক দলের ওপর নজর রাখতে। অ্যানটন ড্রেক্সলার নামে এক ভদ্রলোক, আদতে তালাচাবি বানান, রাজনৈতিক দল তৈরি করে খুব শীঘ্রই একটা মিটিং-এর উদ্যোগ নিয়েছেন। ১২ সেপ্টেম্বর হিটলার পর্যবেক্ষক হিসাবে জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির মিটিং-এ গেলেন। বেরনেকেরব্রু নামক এক পানশালার প্রায়ান্ধকার পরিবেশে জনা চল্লিশ মানুষ বসে পিতৃভূমির প্রতি অনুগত জার্মান শ্রমিকদের একটা সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুঁজিবাদের অবসান ঘটানোর এই আলোচনার মাঝেই হিটলার বুঝলেন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ সেই দলের অন্যতম আসক্তি। ফলে আলোচনার শেষভাগে পৌঁছে হিটলার নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে জার্মানির ভবিষ্যত নিয়ে শুরু করলেন বক্তৃতা। ড্রেক্সলার বুঝলেন এই মানুষটা তাঁর দলের পক্ষে সম্পদ হয়ে উঠবেন। ফলে মিটিং-এর শেষে তিনি হিটলারের হাতে গুঁজে দিলেন প্যামফ্লেট— ‘আমার রাজনৈতিক জাগরণ’। ড্রেক্সলারের এই ‘জাগরণ’-এর ভাবনায় হিটলার নিজের ভাবনা অনুরণিত হতে দেখলেন। জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্রের মিশেল, ডয়েচল্যান্ডের নামে শ্রমিকদের উত্থান— হিটলারের কাছে দারুণ আকর্ষণীয় মনে হল এই ভাবনা। সবথেকে বড় কথা, মার্ক্সবাদী বা বলশেভিকদের নির্দেশে নয়, পিতৃভূমি জার্মানির জন্যে জার্মান শ্রমিকদের আন্দোলন।
কয়েকদিনের মধ্যেই হিটলার জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য হয়ে গেলেন। ক্রমাঙ্ক ৫৫, আসলে ৫৫৫। সদস্য সংখ্যা এতই কম ছিল যে দলের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে ৫০০ থেকে শুরু হয়েছিল সদস্যক্রম। অবশ্য হিটলার যোগ দেওয়ার পরে বহু মানুষ এই দলে নাম লেখাতে শুরু করলেন। জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টিতে হিটলারের উত্থান দ্রুতগতিতে হতে থাকল। আমেরিকান ঐতিহাসিক রোনাল্ড ফেলপ্সের মতে প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হওয়ার ফলে বড় কোনও রাজনৈতিক দলে হিটলার এত সহজে সুযোগ পেতেন না। কিন্তু আনকোরা এই রাজনৈতিক দলে হিটলার নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছিলেন।
বিভিন্ন পানশালাতে হিটলারের বক্তৃতা শুনতে লোকে ভিড় করে আসত। ভার্সাই সন্ধির সমালোচনা, জার্মানির প্রতিশোধ, ইহুদি, কমিউনিস্ট— ঘুরেফিরে এই ছিল হিটলারের বক্তব্যের বিষয়। সম্ভবত তাঁর বক্তব্যের শক্তিশালী দিকও। বারংবার একই কথা বলে যাওয়ার মাধ্যমে শ্রোতাদের মধ্যে সবথেকে নির্বোধ মানুষটাও হিটলারের বক্তব্যের সারকথা মাথায় নিয়ে পানশালা ছাড়ত। হিটলার নিজের বক্তব্যের বারবার রিহার্সাল করে মঞ্চে আসতেন। তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত, উগ্র ভাষার ব্যবহার, নভেম্বর ক্রিমিনাল্স্দের ওপর প্রতিশোধস্পৃহা— সমস্তটাই ছিল পূর্বপরিকল্পিত অভিনয়।
ইহুদিদের প্রতি আক্রমণ ক্রমেই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠছিল হিটলারের বক্তব্যে। কারণ একাধিক প্রতিপক্ষের উল্লেখ না করে একমাত্র শত্রুকে চিহ্নিত করতে পারলে সমর্থকদের মধ্যে দ্বিধার কোনও জায়গা থাকে না। তাই ১৯১৯-এর ১৬ অক্টোবর প্রথম বক্তৃতায় হিটলার নভেম্বরের অপরাধীদের মধ্যে কমিউনিস্ট বা পার্লামেন্টের সদস্যদের আক্রমণ করছেন। তার পরে ১৩ নভেম্বরের বক্তৃতায় ভার্সাই সন্ধি মেনে নেওয়া রাজনীতিকদের দিকে আঙুল তুললেও ১০ ডিসেম্বর তিনি ইহুদিদের দেশের প্রধানতম শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করলেন। ১৬ জানুয়ারি ইহুদিদের জন্যে জার্মানির সীমান্ত অবরুদ্ধ করে দেওয়ার ডাক দিলেন। জার্মানি শুধুমাত্র জার্মানদের।
হিটলারের বক্তব্যের মধ্যে ক্ষুরধার যুক্তি ছিল না। উইট বা হিউমার নেহাতই মোটা দাগের। মেধার দিক থেকে বিসমার্ক-সহ জার্মানির অন্যান্য রাজনীতিকদের ঐতিহ্যের কাছাকাছিও পৌঁছয় না সেইসব বক্তৃতা। খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায় সব বক্তৃতার সারাংশ একই। সময়ের সঙ্গে আরও নিখুঁত হয়েছে বক্তার অধৈর্য অঙ্গভঙ্গি। সাধারণ সময় হলে জার্মান জনসমাজ এইসব বক্তৃতাকে ঠাট্টা ভেবে উড়িয়ে দিত। কিন্তু যুদ্ধে বিধ্বস্ত মানুষজন নিজেদের হিটলারের উচ্চতায় নামিয়ে এনেছিল। রাজনীতিক হিটলার সেই সময় জার্মান সমাজের হতাশার যথোপযুক্ত মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
১৯২০-তে হিটলার দলের প্রোপাগান্ডার দায়িত্ব পেলেন। দলের নাম পালটে তিনি রাখলেন ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি— নাতশেনাল সোশিয়ালিশ্ত্সে ডয়েচে আরবারতাই পারতাই বা সংক্ষেপে NSDAP, খুব শীঘ্রই যার কুখ্যাতি হবে ‘নাজি পার্টি’ হিসাবে। এদিক থেকে হিটলার ছিলেন মুসোলিনির একনিষ্ঠ ছাত্র। মুসোলিনিই প্রথম শ্রমিকদের জাতীয় সংগঠনের মাধ্যমে দেশপ্রেম আর সমাজতন্ত্রের মিশেল ঘটিয়ে নিজের কার্যসিদ্ধি করেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি এক জনসমাবেশে দলের নতুন নাম ঘোষণা করার সঙ্গেই ড্রেক্সলার এবং হিটলার যৌথভাবে প্রায় ২০০০ সমর্থকের সামনে ২৫ দফা কর্মসূচি তুলে ধরলেন। অখণ্ড জার্মান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, জার্মানিতে কেবলমাত্র জার্মানদের বসবাসের অধিকার, ভার্সাই সন্ধি বাতিল করে জার্মানির উপনিবেশ এবং অধিকৃত অঞ্চল ফিরিয়ে দেওয়া এবং দেশ থেকে ইহুদি বিতাড়ন— এই ছিল মোটের ওপর নাজি পার্টির প্রধানতম দাবি।
হিটলার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন— “দেশের মানুষদের বাঁচাতে ওই রক্তচোষা ইহুদিদের সঙ্গে কী করা উচিত?”
জনতা গর্জে উঠল— “ওদের ফাঁসিতে ঝোলাও।”
নাজি পার্টির প্রধান হিসাবে তাঁর আত্মপ্রকাশ তখন সময়ের অপেক্ষা। ১৯২১-এর ২৯ জুলাই ড্রেক্সলার তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণ হিটলারের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হলেন। রাজনীতিক হিটলারের উত্থান শুরু হল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন