নতুন সরকার

রোহণ কুদ্দুস

মিউনিখ পুলিশের অপরাধ দমন শাখার প্রধান চিফ ইন্সপেক্টর ফিলিপ কিফার ক্লোকরুমে ঢুকেছিলেন। হঠাৎ বাইরে গুলির শব্দ শুনে উঁকি দিয়ে দেখলেন নাজি পার্টির এস এ বাহিনী ব্যাঙ্কোয়েট হলের দখল নিয়েছে। মেশিনগানও চোখে পড়ল তাঁর। পুলিশদের অধিকাংশই নাজিদের হাতে বন্দি। একজন পুলিশ অফিসার স্বস্তিকা পতাকা টাঙানোর কাজে সাহায্যও করছেন। কিফার দ্রুত চিন্তা করলেন। কিচেনে বোধ হয় একটা টেলিফোন আছে। সবার নজর এড়িয়ে ধীরে ধীরে রসুই ঘরের দিকে পা বাড়ালেন তিনি। এক নাজি ফোনে কথা বলছে। তাকে পাশ কাটিয়ে খোলা দরজা দিয়ে বিয়ার হলের বাগানে নেমে এলেন কিফার। তারপর কিছুটা দৌড়ে কিছুটা হেঁটে তিনি নিকটবর্তী থানায় পৌঁছে গেলেন। সেখান থেকে হেডকোয়ার্টারে ফোন করে পেলেন না। লাইন ব্যস্ত। বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় মেন ডিউটি রুমে ফোন করে তিনি বিয়ার হলের পরিস্থিতি এত্তেলা করলেন। ওদিকে কর্তব্যরত অফিসার জানালেন ঘুরিয়ে ফোন করছেন।

দশ মিনিট পরে ফোন এল। ওদিকে ডক্টর উইলহেল্‌ম্‌ ফ্রিক। মিউনিখ পুলিশের সুরক্ষা এবং গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান। সমস্ত শুনে বললেন, “কিছু করার নেই। বিয়ার হলে যাঁরা আছেন, তাঁরাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।”

“কিন্তু তাঁরা তো বন্দি।” কিফার উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠলেন, “তাছাড়া আমাদের বাহিনীর অফিসাররাও নাজিদের কব্জায়।”

সামান্য হাসলেন ফ্রিক— “পুলিশ প্রেসিডেন্ট স্বয়ং সেখানে হাজির। তুমি কয়েকজন অফিসারের চিন্তা করছ?” তারপর একটু থেমে বললেন, “যে কোনও মূল্যে রক্তপাত এড়াতে হবে। পরবর্তী নির্দেশের জন্যে অপেক্ষা করো।”

ছেচল্লিশ বছরের ফ্রিক চুয়ান্নর কিফারের থেকে অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আইনে ডক্টরেট করে এক সময় আইনজীবী হিসাবেও কাজ করেছেন। পরে পুলিশে যোগ দিয়ে যুদ্ধের সময় কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে একের পর এক পদোন্নতির মাধ্যমে ফ্রিক ওপরের সারিতে এসে পৌঁছেছেন। এইসব তথ্য কিফার জানতেন। যেটা জানতেন না, ডক্টর উইলহেল্‌ম্‌ ফ্রিক সম্প্রতি নাজি পার্টিতে নাম লিখিয়েছেন।

ওদিকে বিয়ার হলে উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকের সামনে হিটলারের প্রস্তাবে সমর্থন জানাচ্ছেন কার।

“দেশের এই চরম সংকটে সম্রাটের ভাইসরয় হিসাবে আমি দায়িত্বগ্রহণে সম্মত হলাম।” হিটলার ভুল বলেননি। কার সম্ভবত এর থেকে বেশি হাততালি এর আগে পাননি। তাঁর হাত ঝাঁকিয়ে অভিবাদন জানাতে জানাতে হিটলার উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লেন। তারপর একে এক এলেন লসো, সেইসার, লুডেনডর্ফ।

“পাঁচ বছর আগে পাসেভাকে যে শপথ নিয়েছিলাম, সেটা বাস্তবে ঘটতে চলেছে। নভেম্বরের ওই বিশ্বাসঘাতকদের এবার শাস্তি দেওয়ার সময় এসেছে। হতভাগ্য জার্মানির এই ধ্বংসস্তূপ থেকে আমরা গড়ে তুলব মুক্ত, স্বাধীন এবং মহান এক জার্মানি।”

হল কাঁপিয়ে জয়ধ্বনি শুরু হল— “হেইল হিটলার! হেইল হিটলার!”

লুডেনডর্ফও তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে বারবার উল্লেখ করে গেলেন এই অকস্মাৎ অভ্যুত্থানে তিনি দারুণ অবাক হয়েছেন বটে, কিন্তু ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে তিনি দেশের মানুষের পাশে থাকতে বদ্ধপরিকর। পুৎসি একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে বিদেশী সাংবাদিকদের জন্যে দোভাষীর কাজ করে যাচ্ছেন তখন।

সমবেত দর্শক শুরু করেছে জাতীয় সঙ্গীত— ডয়েচল্যান্ড উবের অ্যালস্‌…

পোনার লুডেনডর্ফকে শুনিয়ে স্বগতোক্তি করলেন— “১৯১৪-তে যুদ্ধ ঘোষণার সময় শেষবার মানুষের এই আনন্দ দেখেছিলাম। সেও তো দশ বছর হতে চলল।”

1

বিয়ার হলের অভ্যুত্থান। হেইনরিখ হফমানের তোলা ছবি।

বিয়ার হলের অভ্যুত্থান। হেইনরিখ হফমানের তোলা ছবি।

নতুন জাতীয় সরকারের ঘোষণা আর তার সদস্যদের সমর্থন এবং শপথবাক্য পাঠের পরে হিটলার জমায়েত মানুষজনকে বিয়ার হল থেকে যেতে দিতে প্রস্তুত। গ্যোরিংকে ডেকে নির্দেশ দিলেন— “শুধু যদি কোনও কমিউনিস্টকে পাও…” চোখের ইশারা করলেন— “আর এমনিতেও কেউ যদি নতুন সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলে…” গ্যোরিং ঘাড় নেড়ে বললেন, “সাংবাদিকদেরও এখন ছাড়লে চলবে না। অনেক কিছু বাকি থেকে গেছে এখনও।”

গ্যোরিংকে তাঁর কাজ বুঝিয়ে দিয়ে হিটলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন। হেসের বন্দিদের সঙ্গে মোলাকাতের সময় এখন। প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হিটলার সামান্য ঝুঁকে ক্ষমা চাইলেন— “এই সমস্ত অসুবিধার জন্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আসলে এত তাড়াতাড়ি সব ঘটে গেল…” কথা শেষ হতে না হতেই এগিয়ে এলেন বাভেরিয়ার গৃহমন্ত্রী ফ্রাঞ্জ জেভার জেভার স্যোয়ার। হিটলারের বুকে একটা আঙুল দিয়ে খোঁচা দিলেন— “তুমি…” রাগে কথা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর— “তুমি কথা দিয়েছিলে এইসব করবে না…” বাস্তবিকই হিটলার কথা দিয়েছিলেন সেই বছরের জানুয়ারিতেই। স্যোয়ার বরাবরই নাজিবিরোধী। প্রকাশ্যেই তাদের বিবেকবোধবর্জিত উগ্রপন্থী হিসাবে উল্লেখ করতেন। হিটলার তাই তাঁর কথা উত্তর না দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। হেসকে বললেন, “এঁদের ওপর নজর রাখো।”

শহরের অন্যদিকে আরেক বিয়ার হল লোয়েনভাউকেলায় প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ জড়ো হয়েছে উৎসবের মেজাজে। বিভিন্ন বাহুবন্ধনী আর পতাকা নির্দেশ করছে তাদের বহুদলীয় অস্তিত্ব। দেখা যাচ্ছে এস এ-র স্বস্তিকা। এছাড়া ফ্রেডরিখ ওয়েবারের নেতৃত্বে ওবারল্যান্ড লিগ। জোসেফ সায়ডেলের বুন্ড রাইসক্রিগস্‌ফ্ল্যাগার সদস্যরাও উপস্থিত। একত্রে এদের নিয়ে মাত্র মাস দুয়েক আগেই গঠিত হয়েছে এক আঁতাত— কাম্ফবুন্ড। সংগ্রামী সংঘ। ৩০ সেপ্টেম্বর ন্যুরেমবার্গে হিটলার অন্যান্য জাতীয়তাবাদী দলের নেতাদের সঙ্গে মিলিত হন। ১৮৭১-এ ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে জয়লাভ উপলক্ষ্যে পালিত জার্মান দিবস উদ্‌যাপন ছিল আপাত কারণ। মূল আলোচ্য বিষয় ছিল বাভেরিয়ান সরকার এবং কেন্দ্রের বার্লিন সরকারের দূরত্বের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাদখলের পথে কীভাবে এগোনো যায়। সেই বোঝাপড়া থেকেই জন্ম নিয়েছে এই কাম্ফবুন্ড।

ব্যাঙ্কোয়েট হল সাজানো জার্মান সাম্রাজ্যের সাদা-হলুদ-কালোয় এবং অবশ্যই বাভেরিয়ার সাদা-নীলে। ঈগল আর স্বস্তিকা চিহ্নও উপস্থিত। দুদিকে দুটো আলাদা ব্যান্ড বাজিয়ে চলেছে মিলিটারি মার্চ সঙ্গীত এবং অপেরার সুর। কাম্ফবুন্ডের রাজনৈতিক অধিনায়ক হিটলারের সেদিন বক্তব্য রাখার কথা। কিন্তু হিটলার তখন বারগারভয়কেলায়। তাঁর বদলে মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছেন নাজি মুখপত্রের প্রাক্তন সম্পাদক হেরমান এসার। আড়ালে কেউ কেউ বলে এসার তাঁর জিভ পেয়েছেন স্বয়ং শয়তানের থেকে। কুখ্যাত এই বক্তা মঞ্চে ইহুদিদের মুণ্ডপাত করছেন, এমন সময় হলের একদিকের একটা পে-ফোন বেজে উঠল। বারগারভয়কেলার কিচেনের সেই ফোন থেকে বার্তা এসেছে— “নিরাপদে জন্ম নিয়েছে।” শুধু এটুকুই। জন্ম নিয়েছে জার্মান বিল্পব, হিটলারের জাতীয় আন্দোলন। মঞ্চের সামনেই একটা টেবলে বসে আছেন ক্যাপটেন আর্নস্ট রম। জেনারেল ফন লসোর অধীনে একসময় লড়াই করেছেন বাদামি চুল আর সবুজ চোখের এই জার্মান। প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার চওড়া বুকের এই সৈনিকের নাক থেকে দুই গাল আর চিবুক জুড়ে যুদ্ধের আঁচড় আর ক্ষতচিহ্ন। রম নাজিদের প্রথমদিকের সদস্য, হিটলারের খুব কাছের জন। বাভেরিয়ান রাজতন্ত্রের সমর্থক রম ভার্সাই সন্ধির সরাসরি বিরোধিতা করে যুদ্ধ-পরবর্তী অস্ত্র নানা জায়গায় লুকিয়ে রাখতেন। মিউনিখের আধাসামরিক সংগঠনগুলোকে নিয়মিত অস্ত্র জুগিয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর আরেক নাম— মেশিনগান কিং।

বারগারভয়কেলার সাংকেতিক বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছে গেল মুহূর্তের মধ্যে। রম মঞ্চে উঠে গিয়ে এসারের কানে কানে সে খবর জানালেন। এসার ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো হল ফেটে পড়ল উচ্ছ্বাসে। কাম্ফবুন্ডের সদস্যরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। টেবলের ওপর উঠে নাচছে কেউ কেউ। চিৎকার কোলাহলের মধ্যেই গলা মিলিয়ে শুরু হল জাতীয় সঙ্গীত।

রম পরিকল্পনামতো কাম্ফবুন্ডের সদস্যদের নিয়ে বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। গন্তব্য বারগারভয়কেলা। হিটলার আর গ্যোরিং-এর সঙ্গে মিলে শুরু হবে অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় পর্ব। কাম্ফবুন্ডের শোভাযাত্রার শুরুতে আর শেষে দুটো ব্যান্ড বাজাতে বাজাতে চলেছে। সামনে আছেন রাসায়নিক সার উৎপাদন কারখানার এক কর্মচারী। বয়স বছর তেইশ, চোখে মোটা কাচের রিমলেস চশমা, নাকের নিচে হিটলারের আদলে মাছিগোঁফ— হেইনরিখ হিমলার।

রম এস এ-র একটা ছোট দল পাঠালেন ফ্রানসিসকান অ্যাবে চার্চ অফ সেন্ট অ্যানার দিকে। সেখানে কিছু অস্ত্র লোকানো আছে। কমিউনিস্টরা হঠাৎ বিপ্লব করে বসলে তাদের শায়েস্তা করার জন্যে সেগুলো মজুত করা। কমান্ডার উইলহেল্‌ম্‌ ব্রুগনারের নেতৃত্বে পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে কয়েকজন নেমে গেল চার্চের সেলারে। সেখানে একটা ভল্টে রাখা আছে বন্দুক। চার্চের ফাদার পলিকার্পের সন্দেহ হল। কমিউনিস্টদের গতিবিধি সম্পর্কে কোনও খবর তো নেই। এস এ দলটার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি ফন কারকে ফোন করে যাচাই করতে উদ্যত হলেন। ব্রুগনাররা অবশ্য তাঁকে উপেক্ষা করেই নিজেদের কাজ করে যেতে থাকল। কয়েকজন মঙ্ককেও তারা কাজ লাগাল। সেলার থেকে মানববন্ধনী গড়ে হাতে হাতে ৩৩০০ ইনফ্যান্ট্রি রাইফেল বোঝাই হয়ে গেল ট্রাকে।

হিমলারের নেতৃত্বে রাইসক্রিগস্‌ফ্ল্যাগার একটি দল গেল কর্পহাউস পালেসিয়ায়, জার্মান এবং অস্ট্রিয়ান ছাত্রদের ফেন্সিং কমিউনিটির হোস্টেল। বেসমেন্ট থেকে রাইফেল, গোলাগুলি, হেলমেট এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিস নিয়ে হিমলারের দল ফিরে এল রমের কাছে। বারগারভয়কেলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দলটা, এমন সময় মোটরসাইকেল মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তাদের কাছে হিটলারের নির্দেশ এল— যুদ্ধমন্ত্রকের সদর দপ্তর দখল করতে হবে, যাতে বার্লিন আক্রমণের পরবর্তী পরিকল্পনা করা যায়। রম তাঁর দলবল নিয়ে যুদ্ধমন্ত্রকে গেলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। সেখানে মোতায়েন মিলিটারি কমান্ডার লোকবল এবং অস্ত্রবলে নেহাতই দুর্বল। তাই রমের বাহিনীকে আটকানোর কোনও চেষ্টাই তিনি করলেন না। তার ওপর তাঁদের সর্বময় কর্তা জেনারেল ফন লসো হিটলারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন অভ্যুত্থানে। ফলে একটাও গুলি খরচ না করে কাম্ফবুন্ডের সদস্যরা বাভেরিয়ার যুদ্ধমন্ত্রকের দখল নিল।

ওদিকে যখন এস এ এবং রাইসক্রিগস্‌ফ্ল্যাগা চার্চ আর ছাত্রদের হোস্টেল থেকে অস্ত্র সরাচ্ছে, তখন বুন্ড ওবারল্যান্ড আর্মি ইঞ্জিনিয়ার ব্যারাক থেকে অস্ত্র আনতে রওনা দিয়েছে। এই আধাসামরিক দলটি ফ্রাইকোয়া থেকে গড়ে উঠেছিল। সম্ভবত তিনটে দলের মধ্যে সবথেকে শক্তিশালী। বুন্ড ওবারল্যান্ডের কাজ ছিল ব্যারাক থেকে অস্ত্র নেওয়ার পরে সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনের দখল নেওয়া, যাতে ইহুদিরা হঠাৎ করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পায়। তারা এমনিতেই ওই ছাউনি থেকে অস্ত্র নিয়ে প্রত্যেক সোম আর বৃহস্পতিবার কসরত করে থাকে। অতএব সেভাবে কারও সন্দেহ করার কারণ ছিল না। কিন্তু হিটলারের কাছে খবর এল নির্দেশ দেওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে, কিন্তু বুন্ড ওবারল্যান্ড রেল স্টেশনের দখল নেয়নি। কারণ অজানা। সে রাতে একের পর এক সাফল্যের মাঝে এই ছন্দপতনে হিটলার তিতিবিরক্ত হয়ে নিজেই সেনা ছাউনিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

অকুস্থলে গিয়ে হিটলার দেখলেন পরিস্থিতি বেশ গুরুতর। ওবারল্যান্ডের সদস্যরা অস্ত্র চাইতে ট্রেনিং-এর দায়িত্বে থাকা ক্যাপটেন অস্কার ক্যান্টজ্‌লার সন্দিহান হয়ে পড়েন। তিনি জানান অস্ত্র নিয়ে ট্রেনিং-এর দরকার হলে সেটা ছাউনির মধ্যে থেকেই করতে হবে। ওবারল্যান্ডের কমান্ডার ম্যাক্স রিটার ফন ম্যুলার তর্কাতর্কি করে শেষ পর্যন্ত অস্ত্র নিতে চারশ সদস্যকে নিয়ে ড্রিল হলে ঢোকেন। বলাই বাহুল্য, সেখানে কোনও অস্ত্র ছিল না। কিন্তু ক্যান্টজ্‌লার বাইরে থেকে তাদের তালাবন্ধ করে দেন। তারপর দরজার দিকে দুটো মেশিনগান তাক করে বসিয়ে দেন, যাতে দরজা ভেঙে কেউ বেরিয়ে আসার চেষ্টা না করে।

হিটলার নিজেও বিশেষ কিছু করতে পারলেন না। ক্যান্টজ্‌লার ড্রিল হলের দরজা খুলতে সম্মত নন। হিটলার একবার ভাবলেন দরজা ভেঙে ওবারল্যান্ডের সৈন্যদের বের করে আনবেন। কিন্তু তাতে অস্ত্র পাওয়া যাবে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। তার থেকে বিয়ার হলে ফিরে গিয়ে জেনারেল ফন লসোকে দিয়েই এই সমস্যার সমাধান করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। জেনারেলের আদেশ ক্যাপটেন অমান্য করার সাহস দেখাবেন বলে মনে হয় না।

হিটলার বিয়ার হলে ফিরে এসে দেখলেন ফন লসো নেই। কার এবং সেইসারও অনুপস্থিত। লুডেনডর্ফ ব্যাখ্যা করলেন— “ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এই মানসিক চাপ আর নিতে পারছিল না। তাই ওদের আমি যেতে দিয়েছি।” হিটলার কয়েক মুহূর্ত নিলেন ঘটনাটা বুঝতে। তাঁদের পরিকল্পনার তিন প্রধান বোড়েকে মুক্তি দিয়ে লুডেনডর্ফ তাঁদের দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছেন সেই রাতে আবার তাঁরা যুদ্ধমন্ত্রকে মিলিত হয়ে বার্লিন অভিযানের পরিকল্পনা করবেন।

সুবনার-রিখটার হতাশ গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কোনও রক্ষী ছাড়াই তিনজনকে যেতে দিয়েছেন? ওঁরা ফিরে আসবেন এই আশায়!”

লুডেনডর্ফ প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, “ওঁরা জার্মান অফিসার। কথার খেলাপ করেন না। তাছাড়া…” একটু থেমে তিনি যোগ করলেন, “কয়েক হাজার মানুষ দেখেছে নতুন সরকারের জন্যে ওঁদের সমর্থনের কথা। ফিরে আসতে তো হবেই।”

ব্যাঙ্কোয়েট হলে তখন ইতিউতি ছড়িয়ে কিছু নাজি সমর্থক। বিয়ার আর সসেজ নিয়ে কেউ কেউ গুলতানি করছে। পুৎসি ভাঙা হাটের মাঝে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ততক্ষণে লোয়েনভয়কার থেকে হেরমান এসারও এসে উপস্থিত হয়েছেন— “লুডেনডর্ফ কি পাগল হয়ে গেছেন?” পুৎসি বিড়বিড় করে বললেন, “বন্দিদের তুমি যেতে দিতে পারো না। একটা বিপ্লব হচ্ছে। সাধারণ জ্ঞান…”

রাত এগারোটা নাগাদ তিনটে গাড়িতে হিটলার, লুডেনডর্ফ এবং ‘জার্মান বিপ্লব’-এর অন্য ষড়যন্ত্রীরা রওনা দিলেন যুদ্ধমন্ত্রকের দিকে। তাঁরা তখনও আশা করছেন কার, লসো এবং সেইসারের ফিরে আসবেন এবং একসঙ্গে তাঁরা পরিকল্পনা করবেন বার্লিন আক্রমণের।

রুডল্‌ফ্‌ হেসের জিম্মায় তখন প্রধানমন্ত্রীসহ সাত বন্দি। বন্দুক হাতে কয়েকজন এস এ রক্ষী তাঁদের নিয়ে গিয়ে তুলল অপেক্ষমাণ একটা ট্রাকে। গন্তব্য জুলিয়াস লেম্যানের প্রাসাদোপম বাসগৃহ। তিনি জে এফ লেম্যানস্‌ ভেরলাগ প্রকাশন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। চিকিৎসাশাস্ত্রের বইয়ের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী এবং ইহুদিবিরোধী বইপ্রকাশ তাঁদের বিশেষত্ব। লেম্যান তাঁর বাড়িতে এই বন্দিদের আশ্রয় দিয়েছেন মূলত তাঁর জামাতা ডক্টর ফ্রেডরিখ ওয়েবারের অনুরোধে। ওয়েবার ওবারল্যান্ডের একজন রাজনৈতিক নেতা। লেম্যান বন্দিদের বললেন, “আপনারা আমার অতিথি।”

প্রত্যেক ‘অতিথি’কে আলাদা আলাদা ঘরে রাখার ব্যবস্থা করা হল। প্রত্যেক ঘরের বাইরে পাহারায় রইল দুজন করে এস এ রক্ষী। রাস্তার দিকে তাক করা রইল একটা মেশিনগান, মূল ফটকের সামনে আরেকটা। হেস বন্দিদের শেষবারের মতো সতর্ক করলেন, “বাড়ি থেকে বেরোনোর চেষ্টা করলেই গুলি করার নির্দেশ দেওয়া আছে।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%