রোহণ কুদ্দুস
কার, লসো এবং সেইসারকে নিয়ে হিটলার ঢুকলেন ব্যাঙ্কোয়েট হলের পাশের একটা ছোট ঘরে। ওদিকে গ্যোরিং-এর নেতৃত্বে মিউনিখ পুলিশের অফিসারদের এক জায়গায় নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে। দেড় হাজার পুলিশবাহিনীর জনা চল্লিশই সেই রাতে পাহারায় ছিলেন। ব্যাঙ্কোয়েট হলের অতিথিদের টেবলের কাছেই চেয়ারে উঠে দাঁড়ালেন এক রোগা-পাতলা তরুণ। পরনে বাভেরিয়ার মিলিটারি পোশাক। বয়স ঊনত্রিশ, মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। নাম রুডল্ফ্ হেস। হাতে একটা নামের তালিকা। সে তালিকার শুরু প্রধানমন্ত্রী ফন কিনিলিংকে দিয়ে। আছেন তাঁর মন্ত্রীসভার তিন সদস্য, যুবরাজ রুপরেখ্টের উপদেষ্টা, পুলিশ প্রেসিডেন্ট কার্ল ম্যানটেল এবং উচ্চপদস্থ অন্য এক অফিসার। হিটলারের নির্দেশ এঁদের গ্রেপ্তার করার। পণবন্দি হিসাবে থাকবেন তাঁরা।
অন্তর্মুখী, লাজুক হেস সাত বন্দিকে নিয়ে বিয়ার হলের দোতলার একটা ঘরের দিকে রওনা দিলেন। রুডল্ফ্ হেসের জন্ম আলেকজান্দ্রিয়ায়। বারো বছর বয়সে জার্মানিতে এসে ভর্তি হন রাইনের এক আবাসিক স্কুলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাভেরিয়ান বাহিনীতে ছিলেন। হিটলারের সঙ্গে আলাপ ১৯২০-তে। ওই বছরের জুলাই থেকে নাজি পার্টির অন্যতম সদস্য। তাঁর ওপর হিটলারের অগাধ আস্থা। তাই এই সাত বন্দির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত।
প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য বন্দিদের নিয়ে হেস ব্যাঙ্কোয়েট হল ছাড়তেই পুৎসি অর্থাৎ হানফ্স্ট্যাঙ্গল শশব্যস্ত হয়ে তাঁদের অনুসরণ করলেন। বিদেশী বেশ কিছু সাংবাদিকদের ডেকে এনেছেন তিনি। তাদের সামনে অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে নাজি পার্টির ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জার্মান বাবা আর আমেরিকান মায়ের সন্তান পুৎসি পড়াশোনা করেছেন হাভার্ডে। যুদ্ধের সময় আমেরিকা ছিলেন, কারণ দেশে ফেরার আবেদন করলেও তা মঞ্জুর হয়নি। যুদ্ধের পরে তাঁর বাবার আর্ট প্রিন্টিং এবং রিপ্রোডাকশন ব্যবসার আমেরিকান অংশটি মার্কিন সরকার অধিগ্রহণ করে শত্রু-সম্পত্তি হিসাবে। বাবার ব্যবসা সামলানোর সময় তিনি চার্লি চ্যাপলিন থেকে হেনরি ফোর্ডের মতো বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচিত হন। হাভার্ডে পড়ার সময় টি এস এলিয়ট এবং থিওডোর রুজেভেল্ট জুনিয়রের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিলেন। তুখোড় পিয়ানোবাদক পুৎসি বিয়ে করেন আমেরিকান হেলেন নিয়েমায়েরকে। ১৯২১-এ ষোলো বছরের প্রবাস জীবনের শেষে পুৎসি স্ত্রী এবং শিশুপুত্র ইগনকে নিয়ে ফিরে আসেন জার্মানিতে।
হিটলারের কোনও এক বিয়ার হল বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে পুৎসি নাজি পার্টিতে যোগ দেন। মূলত তাঁর আর্থিক সাহায্যেই দুটো ছাপার যন্ত্র কেনা হয় এবং নাজিদের মুখপত্র ‘ভলক্সাবো উবাখতা’ দৈনিক সংবাদপত্রে পরিণত হয়। মিউনিখে তাঁর বাড়িতে হিটলারের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। কেউ কেউ বলেন এই পুৎসিই হিটলারকে অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে ওঠাবসা করার মতো আদবকায়দা শেখান। স্বভাবতই ওই রাতেও পুৎসি বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে হিটলারের সম্মানরক্ষায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন।
ফিরে আসা যাক হিটলার এবং তাঁর ‘তিন অতিথি’র কাছে। একটা মাঝারি টেবল ঘিরে বসে আছেন সকলে। দেহরক্ষী উলরিখ গ্রাফ হিটলারের দিকে বিয়ারের একটা মাগ এগিয়ে দিলেন। শুকিয়ে আসা গলায় সামান্য পানীয় ঢেলে হিটলার কারের দিকে তাকিয়ে কাষ্ঠ হাসলেন— “যুদ্ধে গ্যাস হামলার ফল। গলা শুকিয়ে আসে যখন তখন।” তারপর গলা খাঁকরে নিজের পিস্তলটা হাতে তুলে ধরলেন— “আমি বলা না পর্যন্ত কেউ এই ঘরের বাইরে পা রাখবেন না। নতুন সরকার। আপনারা তিনজনেই গুরুত্বপূর্ণ পদ পাবেন। জেনারেল লুডেনডর্ফ থাকবেন আর্মির দায়িত্বে।” একটু থেমে যোগ করলেন— “জানি আপনাদের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু দেশের স্বার্থে এটা করা দরকার।” পিস্তলটা দেখিয়ে বললেন— “এতে চারটে গুলি আছে। আমার তিন সহযোগী…” কার, লসো আর সেইসারের দিকে ইঙ্গিত করলেন হিটলার— “তিন সহযোগী আমায় ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদের জন্যে একটা করে।” তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে পিস্তলের নল নিজের কপালের পাশে চেপে ধরলেন— “শেষ বুলেটটা আমার।”
সেইসার এবার মুখ খুললেন— “কিন্তু আপনি কথা দিয়েছিলেন। কোনও বিপ্লব নয়।”
হিটলার শান্তস্বরে উত্তর দিলেন— “আমি দুঃখিত হের সেইসার। পিতৃভূমি রক্ষার জন্যে আমি সেই কথা রাখতে পারছি না।”
লসো ফিসফিসিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলেন কারকে। হিটলার ধমকে উঠলেন— “নিজেদের মধ্যে কথা বলার অনেক সময় পাবেন। আমার সঙ্গে কথা বলুন এখন।”
“আপনি বললেন লুডেনডর্ফ আর্মির দায়িত্বে থাকবেন।” ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন লসো, “জেনারেল এসবের সঙ্গে জড়িত!”
হিটলার কাঁধ ঝাঁকালেন— “অবশ্যই।”
এবার লসো অবিশ্বাসের সুরে বললন, “তাঁকে কোথাও দেখছি না তো।”
“তিনি খবর পেয়েছেন। শীঘ্রই আসবেন।”
কার হিটলারের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে বললেন, “এভাবে সর্বসমক্ষে আমাদের বন্দি করে নিয়ে এলেন আপনি। এবার আমরা যদি আপনার সরকারে যোগও দিই, ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হবে কারও? সবাই ধরে নেবে চাপের মুখে আমরা…”
তাঁর কথা শেষ হল না। হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে যাওয়ায় হিটলার দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বন্দিদের দায়িত্বে রইলেন গ্রাফ এবং গুটিকয় সশস্ত্র এস এ সৈন্য।
কার উঠে গিয়ে দাঁড়ালেন জানালার কাছে। লসো একটা চুরুট ধরালেন। গত মিনিট পনেরো-কুড়ির নাটকীয়তায় স্নায়ু স্থির করার প্রয়োজন পড়েছে। সেইসার দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে হিটলার কোথায় গেলেন বোঝার চেষ্টা করছেন। কার মৃদু গলায় বললেন, “গুন্ডামি এদের রক্তে মিশে গেছে। এভাবে কেউ কী করে আমাদের আটক করতে পারে!”
ব্যাঙ্কোয়েট হলে অন্য অনেকের সঙ্গে সেদিন উপস্থিত ছিলেন মিউনিখ কলেজের ইতিহাস অধ্যাপক কার্ল আলেকজান্ডার ফন ম্যুলার। তাঁর বন্ধুদের একজন জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কী মনে হয়? হিটলার এত সহজে ক্ষমতায় আসবে?” আরেকজন বললেন, “হিটলারের কথা জানি না। কিন্তু কারের কথা ভেবে দ্যাখো। এ তো সুবর্ণ সুযোগ। যেমন চাইছিল নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবে। কারও পদ পাবে নিশ্চিত। অথচ ষড়যন্ত্রের কোনও দায় নিতে হবে না।” ম্যুলার মাথা নাড়লেন— “ব্যাপারটা সুবিধার ঠেকছে না। এত সময় নিচ্ছে কেন ওরা? কিছু একটা সমস্যা হয়েছে।”
আসলে ম্যুলারের চিন্তা অন্য জায়গায়। উপস্থিত জনতা ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছে। গ্যোরিং মঞ্চ থেকে একহাতে একটা পিস্তল নিয়ে শ্রোতা-দর্শকদের শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
“বাভেরিয়ার পুলিশ, আর্মি বা কারের বিরুদ্ধে হিটলারের কোনও অভিযোগ নেই। আমাদের লক্ষ্য বার্লিনের ওই ইহুদি সরকার। আপনার দয়া করে উত্তেজিত হবেন না।” কিন্তু চারদিকে সশস্ত্র এস এ রক্ষীদের মধ্যে বসিয়ে দিয়ে কাউকে উত্তেজিত না হতে বলাটা একটু বাড়াবাড়িই। সামান্য রাগত স্বরে গ্যোরিং বলে চলেছেন, “আপনাদের সামনে বিয়ার আছে, স্টেক আছে। এত চিন্তা কীসের! খান, ফুর্তি করুন।”
ম্যুলার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলেন। এদের মধ্যেই কেউ হঠকারী হয়ে নাজিদের বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলেই কেলেংকারি হবে। তার নিজের তো বটেই, উপস্থিত সকলের সমূহ বিপদ ঘটবে। অলিন্দে রাখা মেশিনগানের দিকে নজর গেল। মুহূর্তের ভুলে রক্তগঙ্গা বয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
জেনারেল লুডেনডর্ফকে নিয়ে আসার জন্যে হিটলার হাজির হলেন ফার্স্ট লেফটেনান্ট ডক্টর ম্যাক্স এরউইন ফন সুবনার-রিখটারের কাছে। সুবনার-রিখটারের জন্ম রুশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ রিগায়। তাঁর বাবা-মা উভয়ই জার্মান ছিলেন। ১৯০৫-এর রুশ বিপ্লবের পর ১৯১০-এ সস্ত্রীক মিউনিখে চলে আসেন। তাঁর সুবনার পদবিটি স্ত্রীর অভিজাত পরিবার থেকে পাওয়া। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি বাভিরিয়ার লাইট ক্যাভেলরি রেজিমেন্টে যোগ দেন। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে তুরস্কের জার্মান দূতাবাসে পাঠানো হয়। সেখানে অটোমান শাসনে সংখ্যালঘু আর্মেনিয়ানদের গণহত্যা প্রত্যক্ষ করেন তিনি। আর্মেনিয়ানদের গ্রামের পর গ্রাম খালি করে নিয়ে যাওয়া হয় পুনর্বাসনের জন্যে। কিন্তু ক্ষুধা, সংক্রমণ এবং গণহত্যায় লাখে লাখে মারা পড়েন তাঁরা। নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি— ৩ থেকে ১৫ লক্ষের মধ্যে ধরা হয় মৃতের হিসাব। এই অবিচারের বিরুদ্ধে সুবনার-রিখটারের প্রতিবাদ মূল্যবান প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মজার ব্যাপার, এক দেশের সংখ্যালঘুর প্রতি সুবনার-রিখটারের এই সহমর্মিতার পাশেই জায়গা পায় তাঁর ইহুদি-বিদ্বেষ। পরে রাশিয়ান ভাষা জানার কারণে তাঁকে বাল্টিক অঞ্চলেও জার্মান বাহিনীর প্রেস অফিসার হিসাবে পাঠানো হয়। বলশেভিকদের উত্থান সম্পর্কেও তাঁর তিক্ত বয়ান পাওয়া যায়। ওই বিপ্লবকে সন্ত্রাসের রাজত্ব আখ্যা দেন তিনি। পুরো ব্যাপারটাই তাঁর কাছে ইহুদি পরিচালিত ষড়যন্ত্র।
১৯২০-র অক্টোবরে তিনি জার্মানিতে অফবাও নামে এক গুপ্ত সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। লক্ষ্য ছিল জার্মান এবং রাশিয়ান জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে বার্লিন এবং মস্কোতে রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। একমাসের মধ্যেই বন্ধু আলফ্রেড রোজেনবার্গের থেকে খোঁজ পেলেন নাজিদের এবং ক-দিনের মধ্যেই সুবনার-রিখটার দলের সদস্য হয়ে গেলেন। অভিজাতদের মধ্যে তাঁর যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে হিটলার বাভেরিয়ার যুবরাজ রুপরেখ্ট্ পর্যন্ত যোগাযোগ স্থাপন করে ফেলেছিলেন। বলাই বাহুল্য, হিটলারের এই বিয়ার হল অভ্যুত্থানে জেনারেল লুডেনডর্ফকে জুড়ে ফেলার কাজটাও সুবনার-রিখটারেরই।
লুডেনডর্ফকে আনার জন্যে সুবনার-রিখটারের সঙ্গে বিয়ার হল থেকে রওনা দিলেন তাঁর বাটলার, লুডেনডর্ফের ভ্যালে এবং লুডেনডর্ফের সৎ ছেলে হেইনজ পারনেট, যিনি সদ্যসমাপ্ত যুদ্ধে জার্মান বিমানবাহিনীর পাইলট হিসাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
সেই রাতে জেনারেল এরিক ফ্রেডরিখ উইলহেল্ম্ লুডেনডর্ফ তাঁর স্টাডিতে পায়চারি করছেন। কিছুক্ষণ আগেই একটা ফোন এসেছে। বারগারভয়কেলায় তাঁর উপস্থিতি একান্ত প্রার্থনীয়। ফোনটা করেছিলেন সুবনার-রিখটার।
আটান্ন বছর বয়সি জেনারেল যুদ্ধ-বিগ্রহের বাইরে সাধারণ নাগরিক হিসাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি এখনও। বারো বছর বয়সে ক্যাডেট হিসাবে তাঁর যাত্রা শুরু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই বেলজিয়ামের লিয়েজে অপ্রত্যাশিত জয়ের মাধ্যমে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য এর থেকেও বড় জয় তাঁর পূর্ব সীমান্তে, তানেনবার্গে। প্রায় ৯০ হাজার রাশিয়ান সৈন্যকে বন্দি করেন তিনি। সমরবিদ হিসাবে লুডেনডর্ফ জার্মানির ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেন। যদিও অধিকাংশ মানুষের মতেই তিনি অহংকারী এবং নিজের ভুল মেনে নিতে অপারগ। অন্যের মত মেনে নেওয়াও তাঁর স্বভাবের পরিপন্থী। স্বভাবতই পশ্চিম সীমান্তে পর্যুদস্ত জার্মান বাহিনী যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হলে লুডেনডর্ফ জার্মানির আভ্যন্তরীণ শত্রুদের অন্তর্ঘাতে সেই বিখ্যাত ‘পিঠে ছুরি মারা’র তত্ত্ব আমদানি করেন। অবশ্য যুদ্ধবিরতির কিছু আগেই ১৯১৮-র অক্টোবরে তিনি সেনাবাহিনী থেকে নিজের পদ খোয়ান। ছদ্মবেশ ধারণ করে নকল পাসপোর্ট নিয়ে তিনি প্রথমে ডেনমার্ক এবং পরে সুইডেনে আশ্রয় নেন। ১৯১৯-এর জানুয়ারিতে লুডেনডর্ফ আবার জার্মানিতে ফিরে আসেন। আক্ষেপ ছিল যুদ্ধের শেষে কর্তৃপক্ষের কথা মেনে নিয়ে সামরিক বিভাগ ছেড়ে না গিয়ে পিতৃভূমির জন্যে কিছু করা উচিত ছিল তাঁর। বছরখানেকের মধ্যে সেনা-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বার্লিনে দক্ষিণপন্থী সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। লুডেনডর্ফ ভগ্ন হৃদয়ে মিউনিখে চলে আসেন। প্রথমে আফবাউতে যোগ দেন তিনি। তারপর সুবনার-রিখটারের সৌজন্যে পরিচয় ঘটে হিটলারের সঙ্গে। ১৯২৩-এর গ্রীষ্মে লুডেনডর্ফের ভিলা মিউনিখে নাজিদের অন্যতম একটা ঘাঁটি হয়ে ওঠে।
বাইরে গাড়ি থামার আওয়াজ হল। সুবনার-রিখটার আর পারনেট ভেতরে এসে দেখলেন জেনারেল একটা বাদামি টুইড জ্যাকেট পরে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন— “সময় বাঁচাতে এটাই পরে নিলাম। চলো।” সামরিক পোশাক না পরার কারণ, পরে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে জেনারেল হিসাবে নন, সাধারণ নাগরিক লুডেনডর্ফ পুরো চক্রান্ত সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতা জানিয়ে ক্ষমাভিক্ষা করতে পারবেন। শীতের সেই রাতে তাঁদের গাড়ি ছুটে চলল গন্তব্য অভিমুখে। তুষারপাত শুরু হয়েছে।
লুডেনডর্ফকে আনতে পাঠিয়ে হিটলার ফিরে এলেন ব্যাঙ্কোয়েট হলের শ্রোতাদের কাছে। কার, লসো এবং সেইসার তাঁর সঙ্গে নেই, তাঁরা হিটলারের সঙ্গে তখনও একমত হতে পারেননি। তাই তাঁদের এক বিশেষ বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন হিটলার। আপাতপদৃষ্টি হিটলার তা-ই বললেন, যা এতক্ষণ গ্যোরিং বলার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু নিজের বিশেষ ভঙ্গিতে। এই আন্দোলন বাভেরিয়ার সরকার, পুলিশ বা সামরিক বিভাগের বিরুদ্ধে নয়; বার্লিনের সরকার, যারা নভেম্বরের অপরাধী, সেই বিশ্বাসঘাতকদের উৎখাত করাই এর লক্ষ্য। তাঁর পরিকল্পনামতো নতুন সরকারের দায়িত্বে থাকবেন কার, লসো এবং সেইসারের মতো ক্ষমতাবান মানুষ। লুডেনডর্ফ হবেন সমরপ্রধান। এক নতুন পরিবর্তনের আশায় উপস্থিত জনতা হিটলারের বক্তৃতায় উদ্বেল। রব উঠল— “হেইল হিটলার!”
“আমাদের অতিথিত্রয়ী এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। নিশ্চিত নন তাঁরা এই সরকারের অংশ হতে পারবেন কি না। আমি কি তাঁদের জানাব মিউনিখের মানুষ তাঁদের সঙ্গে আছে?”
“আশা করি আপনারা শুনতে পেয়েছেন।” হিটলার ফিরে এসেছেন বন্দি তিনজনের কাছে— “মানুষ আমাদের সঙ্গে।”
বাইরে হঠাৎ হর্ষধ্বনি শোনা গেল, আবারও। কেউ মিলিটারি কায়দায় চেঁচিয়ে উঠল— “অ্যাটেনশান।”
দরজায় লুডেনডর্ফ। কারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমিও আপনার মতোই দিশেহারা।” তারপর লসোর দিকে তাকিয়ে— “অবাকও।” ঘরের মধ্যে ঢুকেও তিনি হিটলাকে অগ্রাহ্য করেই তিনজনের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। হতে পারে বাভেরিয়ার তিন প্রভাবশালী মানুষকে জোর করে ধরে রাখায় তিনি রুষ্ট। বা একজন জেনারেল হয়ে তিনি একজন অধস্তন সেনার কথা মানতে বাধ্য হচ্ছেন, এটাও তাঁর অসন্তোষের কারণ হতে পারে। অথবা, এই পুরো অভ্যুত্থানের পেছনে তাঁর দায় ঝেড়ে ফেলার একটা চেষ্টাও থেকে থাকতে পারে। যদিও পারনেট পরে জানিয়েছিলেন, লুডেনডর্ফ হিটলারের পরিকল্পনা সম্পর্কে আগাগোড়া ওয়াকিফহাল ছিলেন। সত্যি যাই হোক, জেনারেল এখন হিটলারের পক্ষে। তিনজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “জার্মানির মঙ্গলের জন্যেই এই বিপ্লব।” সেনাপ্রধান লসো সম্মত হলেন। সেইসার অপেক্ষা করছিলেন প্রথমে আর কেউ এগিয়ে যাওয়ার জন্যে। অতএব তিনিও হাত মেলালেন লুডেনডর্ফের সঙ্গে। কিন্তু কার অত সহজে মেনে নেওয়ার পাত্র নন। তাঁর মতে হয় এই বিপ্লব শুরুতেই ব্যর্থ হবে, নয়তো বেশিদিন টিকবে না। তিনি এর অংশ হতে নারাজ। ডাক পড়ল প্রাক্তন পুলিশ প্রধান আর্নস্ট পোনারের। হিটলারের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে একমাত্র তিনিই কারকে খুব ভালোভাবে চেনেন। কার বরাবরই রাজতন্ত্রের সমর্থক— “আমি এভাবে কোনও নাটকীয় পদক্ষেপ করতে পারি না। রাজসিংহাসনের প্রতি আমি দায়বদ্ধ।” তিনি বাভেরিয়ার সদ্য অবলুপ্ত রাজতন্ত্রের প্রতিনিধি যুবরাজ রুপরেখ্ট্কে নির্দেশ করলেন আসলে। পোনার নিজের টেক্কাটা খেললেন— “এই আন্দোলনে বার্লিন সরকারকে হঠানো মানেই সিংহাসনের প্রতি আনুগত্য দেখানো নয় কি?” হিটলারও পাশ থেকে যোগ দিলেন— “রাজাকে সিংহাসন থেকে নামতে বাধ্য করেছিল কারা? আমরা তো সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতেই এতদূর এগিয়ে এসেছি।” তারপর সামান্য থেমে বললেন, “আপনি কি চান এখন বাইরে গিয়ে বলি, শোনো হে, এসব কিছু হবার নয়! আমরা এতক্ষণ যে আন্দোলনের কথা বলেছি তা আসলে হচ্ছে না?” ঘটনা পরম্পরায় সত্যিই তখন আর পিছিয়ে আসার রাস্তা নেই। প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট তর্ক-বিতর্কের পরে কার নিমরাজি হলেন। তিনি সম্রাটের প্রতিনিধি হিসাবে এই নতুন সরকারে যোগ দিতে ইচ্ছুক।
ব্যাঙ্কোয়েট হলে ফিরে যাওয়ার জন্যে সবাই প্রস্তুত। হিটলার স্মিত হেসে কারকে বললেন, “এখন যা হতে চলেছে... জীবনে এত হাততালি এর আগে আপনি পাননি।”

জেনারেল লুডেনডর্ফ
জেনারেল লুডেনডর্ফ

গুস্তভ ফন কার
গুস্তভ ফন কার

জেনারেল ফন লসো
জেনারেল ফন লসো

কর্নেল ফন সেইসার
কর্নেল ফন সেইসার
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন