ফুয়েরার হিটলার

রোহণ কুদ্দুস

হিটলার মুক্তি পেয়ে প্রথমেই নাজি পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরানোয় প্রয়াসী হন। বাভেরিয়ার মন্ত্রী হেইনরিখ হেল্ডের সঙ্গে দেখা করে তিনি কথা দেন জেনারেল লুডেনডর্ফের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার। একই সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতাদখলের চেষ্টা আর তিনি করবেন না। ১৯২৫-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি আরও একবার প্রতিষ্ঠা হল নাজিদের। বারগারভয়কেলায় দু-ঘণ্টার টানা বক্তৃতায় হিটলার ১৯২৩-এর নভেম্বরে যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই শুরু করলেন। ফলে হিটলারের প্রকাশ্যে বক্তৃতা নিষিদ্ধ হয়ে গেল। একদিক থেকে হিটলারের জন্যে এটা শাপে বর হল। ছোট ছোট সভার মাধ্যমে বিয়ার হলে চড়া দাগের বক্তৃতা দেওয়া হিটলার শিখতে লাগলেন মানুষকে প্রভাবিত করার সূক্ষ্ম কৌশল। একই সঙ্গে চলতে লাগল বাভেরিয়া ছাড়িয়ে জার্মানির অন্য অঞ্চলে দলের সাংগাঠনিক ক্ষমতাবৃদ্ধির নানা পরিকল্পনা।

এর মধ্যে লুডেনডর্ফকে রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক করার সুযোগও এসে গেল। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্রমাগত আক্রমণে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত প্রেসিডেন্ট এবার্ট ১৯২৫-এর ২৮ ফেব্রুয়ারি ৫৪ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে জেতার সম্ভাবনা নেই জেনেও হিটলার ইচ্ছাকৃতভাবে লুডেনডর্ফকে প্রার্থী হিসাবে সমর্থন করেন। প্রথম দফার ভোটে লুডেনডর্ফ মাত্র ১.১ শতাংশ ভোট পান। ৩৮.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে শীর্ষে ছিলেন কার্ল জার্স। কোনও প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়াও দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ হয়। জার্স জেনারেল হিনডেনবার্গকে তাঁর জায়গা ছেড়ে দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এই সমরনায়ক প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্যে খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু বিভিন্ন দলের সমর্থনে এবং নির্বাসিত সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেল্‌মের অনুরোধে দ্বিতীয় দফায় প্রার্থী হিসাবে তিনি আসরে নামেন। ৪৮.৩% ভোট পেয়ে হিনডেনবার্গ জার্মানির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। লুডেনডর্ফের পরাজয়ে খুশি হিটলারও প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন হিনডেনবার্গের নেতৃত্বে জার্মানি নতুন ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হবে।

হিনডেনবার্গের তেমন কোনও কৃতিত্ব না থাকলেও ১৯২৪ থেকে ১৯২৮-এর মধ্যে জার্মান অর্থনীতি দ্রুত উন্নতি করছিল। ১৯২৭-এ শিল্পোৎপাদন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের মাত্রা ছোঁয়। মার্কও তার আগের মূল্যমানে ফিরে এল। এক আমেরিকান ডলারের মূল্য হয়ে দাঁড়াল ৪.২১ জার্মান মার্ক। বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের নিচে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মজুরিও বাড়তে লাগল দ্রুত হারে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে থাকে। সব মিলিয়ে, দেশের সামগ্রিক উন্নতিতে নাজিদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ল। ১৯২৮-এর জাতীয় নির্বাচনে নাজিদের প্রাপ্ত ভোট কমে হল ২.৬ শতাংশ। রাইখস্টাগের ৪৯১টি আসনের মধ্যে তাদের ঝুলিতে এল মাত্র ১২টি আসন। ১৯২৪-এর ডিসেম্বরের নিরিখে ২টি আসন কম। সব মিলিয়ে হিটলারের রাজনৈতিক অস্তিত্ব আরও একবার সংকটের মুখোমুখি।

কিন্তু ১৯২৯-এর আমেরিকার চরম মন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশান জার্মানিকে বিপদের মুখে ঠেলে দিল। আমেরিকার ঋণে নির্ভরশীল জার্মানির রপ্তানিতেও আমেরিকার বাজার ছিল মুখ্য। এক বছরের মধ্যে উৎপাদন অর্ধেক হয়ে গেল। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩-এর মধ্যে বেকারের সংখ্যা ১৫ লক্ষ থেকে বেড়ে হল ৬০ লক্ষ। নাজিরা তাদের প্রচারে আবার নতুন উন্মাদনা ফিরে পেল।

১৯২৮-এর জাতীয় নির্বাচনের পর সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা SPD একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জোট সরকার গঠন করে। চ্যান্সেলর হারমান ম্যুলারের অধীনে থাকা সেই জোটের পতন ঘটে ১৯৩০-এর মার্চের শেষে। ফলে প্রেসিডেন্ট হিনডেনবার্গ সেন্টার পার্টির হেইনরিখ ব্রুনিংকে চ্যান্সেলর হিসাবে নিয়োগ করেন। ব্রুনিংয়ের মূল লক্ষ্য ছিল মন্দার সেই সময়েও ভার্সাই সন্ধি অনুসারে ক্ষতিপূরণ এবং জার্মানির বৈদেশিক ঋণ কম করা। তার জন্যে সাম্প্রতিক সমস্ত মজুরিবৃদ্ধি তিনি রদ করতে চাইলেন। রাইখস্টাগে এই প্রস্তাব বাতিল হলে ব্রুনিং চেষ্টা করেন জরুরি অবস্থা জারি করে তা পাস করানোর। জরুরি অবস্থা জারির সেই চেষ্টাও ভোটাভুটিতে বাতিল হওয়ায় ব্রুনিং প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেন নতুন সরকার গঠনের। ১৮ জুলাই সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় নির্বাচন হয়।

১৯৩০-এর এই নির্বাচন নাজি পার্টির জন্যে আশীর্বাদ হয়ে আসে। অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে হিটলারের প্রচারে সাধারণ মানুষ দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। ফলস্বরূপ মোট ভোটের ১৮.২৫ শতাংশ ভোট নিয়ে নাজিরা ১০৭টি আসন দখল করে। রাইখস্টাগে তারা তখন SPD-র (১৪৩টি আসন) পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। চ্যান্সেলর হিসাবে সে যাত্রা ব্রুনিং-ই থেকে গেলেন। কিন্তু তাঁর নীতি প্রয়োগ করেও অর্থনীতিতে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু উন্নতি আনা গেল না।

১৯৩২-এ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্যে হিনডেনবার্গ খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু ব্রুনিং-এর সেন্টার পার্টি এবং SPD-র সমর্থনে তিনি আরও একবার প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তখন হিটলার। দুই পর্বের এই নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বে হিটলার প্রায় ষাট লক্ষেরও বেশি ভোটে হারলেও প্রথম পর্বের তুলনায় কুড়ি লক্ষেরও বেশি ভোট পান। এপ্রিলে হিনডেনবার্গ আবার প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হলেও ব্রুনিং-এর সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে তাঁর। ৩০ মে ব্রুনিংকে সরিয়ে ১ জুন থেকে ফ্রাঞ্জ ফন পাপেনকে চ্যান্সেলর হিসাবে নিযুক্ত করেন। পাপেনের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ৩১ জুলাই আবার জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়।

নাজিরা এবার ৩৭.২৭ শতাংশ ভোট নিয়ে ৬০৮টি আসনের ২৩০টি আসন দখল করে রাইখস্টাগে বৃহত্তম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। হিটলারকে চ্যান্সেলর ঘোষণা করার পক্ষে একের পর এক অনুরোধ আসতে থাকে হিনডেনবার্গের কাছে। নভেম্বরে ব্যাঙ্কিং, শিল্প, কৃষি— সবক্ষেত্রের ২২ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি একটি স্বাক্ষরিত পিটিশান জমা দেন। আবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন চেম্বার অফ ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্টও। বলাই বাহুল্য, হিটলারের সমর্থক এই শিল্পপতিরা তাঁর নির্বাচনী প্রচারে মোটা অঙ্কই ব্যয় করেছিলেন। এভাবে বহু শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ী হিটলারের পক্ষে সওয়াল শুরু করলে হিনডেনবার্গ মনস্থির করেন। ১৯৩২-এর ৬ নভেম্বরে আবার জাতীয় নির্বাচন হয় এবং নাজিদের সামান্য শক্তিক্ষয় ঘটে। যদিও ১৯৬টি আসন নিয়ে তারা তখনও রাইখস্টাগের বৃহত্তম দল। ১৯৩৩-এর ৩০ জানুয়ারি হিটলার চ্যান্সেলর হিসাবে নিযুক্ত হন। গোড়াপত্তন ঘটে থার্ড রাইখের।

প্রসঙ্গত, ফার্স্ট রাইখ হিসাবে ধরা হয় রোমান সাম্রাজ্যকে (৮০০–১৮০৬ খ্রিস্টাব্দ)। সেকেন্ড রাইখ জার্মান সাম্রাজ্য (১৮৭১-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রকে বলা হয় উইমার বা ভাইমার রিপাবলিক (ভাইমার শহরে নতুন সংবিধান রচিত হওয়ার কারণে)।

১৯৩৪-এর ২ অগাস্ট হিনডেনবার্গের মৃত্যু ঘটলে হিটলার রাষ্ট্রপতি এবং চ্যান্সেলর দুটি পদের অধিকারী হয়ে কার্যতই জার্মানির সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠেন। ফুয়েরার। জার্মান সেনাবাহিনী জার্মানির বদলে অ্যাডল্‌ফ্‌ হিটলারের প্রতি অনুগত থাকার শপথ নিল।

এখনও তর্ক হয়, হিটলারের উত্থান কি ঠেকানো যেত না? বিয়ার হল অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পরে পুরো পাঁচ বছর কারাদণ্ডের পরে যদি হিটলারকে মুক্তি দেওয়া হত? যদি ব্রুনিংকে হিনডেনবার্গ তড়িঘড়ি না সরাতেন? ইতিহাস তার নিজের গতিতে চলে, সেখানে ‘যদি’র কোনও স্থান নেই। কার্য-কারণ প্রেক্ষিতে একজন শিল্পী যশোপ্রার্থী ভবঘুরে মানুষ একদিন জার্মানির একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠলেন। একটা দশক বিশ্ব-ইতিহাসের একটা বড় অংশকে নিয়ন্ত্রণ করবেন তিনি। মানুষের বিরুদ্ধে সংগঠিত অমানবিক অপরাধের জন্যে দৃষ্টান্তে পরিণত হবেন— অজস্র সত্য ও কল্পিত কাহিনির খলনায়ক অ্যাডল্‌ফ্‌ হিটলার।

- প্রথম পর্ব সমাপ্ত -

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%