প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

রোহণ কুদ্দুস

২৫ মে ১৯১৩, হিটলার এসে পৌঁছলেন মিউনিখে। কারণ হিসাবে তিনি পরে বলেছেন ভিয়েনার মতো মহান শহর নানা জাতির মিশ্রণে পরিহাসে পরিণত হয়েছে— চেক, পোলস্‌, হাঙ্গারিয়ান, রুথেনিয়ান, সার্বস্‌, ক্রোটস্‌ এবং অবশ্যই মানবসমাজের আগাছা ইহুদি। ফলে তাঁর আশৈশবলালিত স্বপ্নের দেশ জার্মানিতে পাড়ি দিয়েছেন তিনি।

বাস্তবে হিটলার অস্ট্রিয়া ছেড়ে জার্মানি পাড়ি দেওয়ার কারণ অন্য। অস্ট্রিয়ার আইন অনুসারে, তাঁকে অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে যোগ দিতে হত। সেটা এড়াতেই হিটলারের দেশবদল। খুব সত্যি বলতে কী, লড়াইয়ে যেতে তাঁর আপত্তি ছিল না। কিন্তু যুদ্ধে যদি একান্ত যেতেই হয়, তাহলে তিনি জার্মান ইউনিফর্ম পরেই অবতীর্ণ হবেন।

অবশ্য মিউনিখে আসার আরও একটা কারণ ছিল। বাভিরিয়ার এই রাজধানী শহর তখনও তরুণ শিল্পীদের আকর্ষণ করত। শিল্পী হয়ে ওঠার বাসনা হিটলার তখনও লালন করতেন নিশ্চয়। পরে লিখেওছেন এক জায়গায়, আর্কিটেক্ট ড্রাফটস্‌ম্যান হিসাবে দেশের সেবা করার ইচ্ছার কথা।

মিউনিখ তার সোনালি সময়ে অজস্র শিল্পী, ভাস্কর, সঙ্গীতশিল্পী, লেখক, দার্শনিক, ধর্মগুরু, সংস্কারক, স্থপতিকে জায়গা করে দিয়েছে। হিটলারের প্রিয় সঙ্গীতকার রিচার্ড ওয়াগনার এই শহরেই রচনা করেছিলেন তাঁর কালজয়ী কিছু অপেরা। নরওয়েজিয়ান নাট্যকার ইবসেন পাকাপাকিভাবে গদ্য লেখায় মন দিয়েছেন এখানে বসেই। রচিত হয়েছে ‘আ ডলস্‌ হাউস’, ‘গোস্টস্‌’, ‘দ্য ওয়াইল্ড ডাক’-এর মতো সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নাটক। মার্ক টোয়েন এখানেই রচনা করেছেন তাঁর মাস্টারপিস ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারস্‌ অফ হাকল্‌বেরি ফিন’। চিত্রশিল্পেও বিমূর্ত ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেখানে তুঙ্গে। পাবলো পিকাসোর প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল এই শহরেই। অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে মিউনিখ বিদেশী, অনাহূত মুক্তচিন্তকদের সহনশীলতার সঙ্গে আপন করে নিয়েছে। হিটলারের নতুন বাসস্থান থেকে কয়েক-পা এগোলেই এক ছুতোর মিস্ত্রির বাড়ি ছিল। সেখানে ঠাঁই নিয়েছিলেন এক রুশ অতিথি। আসল নাম ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ। ১৯০১-এ মিউনিখে এসে নাম নিলেন লেনিন। পরের দেড় বছর এই শহরের ক্যাফেতে নানা বিতর্ক আর দাবার চালের মধ্যে লেখা হল রাজনৈতিক পুস্তিকা ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান?’। এর সঙ্গে প্রকাশ পেল পত্রিকা ‘ইসক্রা’, যা পাচার করা হত জারশাসিত রাশিয়ায়।

অবশ্য ১৯২০-র আশেপাশেই মিউনিখের অধঃপতনের ছবিটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কাইজারের শাসনের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলা শিল্প-সংস্কৃতির এই রাজধানী থেকে একে একে বিদায় নিচ্ছিলেন প্রতিভাবানরা।

হিটলার মিউনিখে এসেও নিজের অলস, পরিকল্পনাহীন জীবনযাপন বজায় রাখলেন। মে ১৯১৩ থেকে অগাস্ট ১৯১৪— এই সময়টা তাঁর ভাষায় ‘সবথেকে সুখের এবং তৃপ্তির সময়’। এই শহর তাঁর প্রিয় পিতৃভূমির হৃদস্পন্দন বহন করে চলেছে। দিনের বেলায় নিজেকে ঘরে বন্দি রেখে প্যাস্টেল পোস্টকার্ড আঁকা, মাঝে মাঝে লাইব্রেরি থেকে তুলে আনা জার্মান যুদ্ধের ছবির বইয়ের পাতা ওলটানো আর রাতে বিয়ার হলে গিয়ে আরও কিছু সমমনস্কদের সঙ্গে মতবিনিময়— এইভাবেই হিটলার নিজের মতো করে সময় কাটাচ্ছিলেন। ছবি বিক্রি করে গ্রাসাচ্ছদনের ব্যবস্থা মোটামুটি হয়ে যাচ্ছিল। হিটলার পরে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, সেই সময় তাঁর বার্ষিক আয় ছিল ১২০০ মার্ক।

১৮ জানুয়ারি ১৯১৪। অস্ট্রিয়ান পুলিশ অবশেষে হিটলারকে মিউনিখে এসে লিঞ্জে ফেরার আদেশনামা ধরিয়ে দিল। সেনাবাহিনীর কর্তব্য এড়িয়ে পালিয়ে আসার শাস্তি জেল এবং জরিমানা। পরের দিন হিটলারকে মিউনিখে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান কনসুলেটে পেশ করা হল। সন্ত্রস্ত হিটলার আর্নস্ট হেপ নামের এক আইনজীবীর পরামর্শে কোর্টের সহানুভূতি প্রার্থনা করে একটা চিঠি লিখলেন। সেখানে মূলত তাঁর জীবিকানির্বাহের কষ্ট, এক অনাথ তরুণের আর্তি, দারিদ্র— এসবই জায়গা পেল।

৫ ফেব্রুয়ারি সালস্‌বার্গে শুনানি হল। আদালত হিটলারের প্রতি সামান্য নরম হলেন, শাস্তি হল না। ২৩ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীর পরীক্ষায় হিটলারকে মিলিটারি সার্ভিসের জন্যে অযোগ্য বলে দেগে দেওয়া হল। এমনকী হাতিয়ার বহন করার পক্ষেও অনুপযুক্ত। স্বভাবতই এই তথ্য নিজের জীবতকালে সুচারুভাবে গোপন করে গিয়েছিলেন। পরে ১৯৫০ নাগাদ আবিষ্কৃত হয় তাঁর মিউনিখে আসার কারণ ও তার পরবর্তী ঘটনাপরম্পরা।

হিটলারের নিজেকে মহামানবরূপে পুনর্নিমার্ণের আরও একটা উদাহরণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা নিয়ে ‘মাইন ফাম্ফ’-এ তাঁর ভাষ্য। তাঁর মতে ১৯১৩-তে মিউনিখে তিনি বাতাসে যুদ্ধের গন্ধ পেয়েছিলেন। যে কোনও রাজনৈতিক নেতা বা বিশেষজ্ঞর থেকেও তরুণ এই ভবিষ্যদ্বক্তা নাকি অনেক স্পষ্ট দেখেছিলেন আগামীদিনের লড়াইয়ের ছবি।

২৮ জুন ১৯১৪। অস্ট্রিয়ান সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দকে বসনিয়ার রাজধানী সারাজেভোতে সস্ত্রীক হত্যা করলেন গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ নামের এক বসনিয়াবাসী সার্ব। একমাস পরে, ২৮ জুলাই, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গারি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নিঃশর্ত সমর্থনের আশ্বাস দিল। আর্চডিউকের হত্যা নেহাতই অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করা হল। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার সর্বনাশা অপব্যবহার এবং কিছু অযোগ্য মানুষের এই সিদ্ধান্ত অজস্র সাধারণ দেশবাসীর মতো হিটলারকেও অবাক করে দিয়েছিল। যুদ্ধের কারণ সম্পর্কে সামান্যই ধারণা ছিল তরুণ হিটলারের। ফলে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে পরে ‘মাইন কাম্ফ’-এ তিনি উল্লেখ করেছেন, কুড়ি লক্ষ জার্মান শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিল। হিটলারের মতে সারা ইউরোপ এবং অবশ্যই জার্মানির সমস্ত মানুষ যুদ্ধ চাইছিল। কারণ জার্মানির জন্যে এই যুদ্ধ ছিল অস্তিত্বের সংগ্রাম। প্রকৃতপক্ষে, অধিকাংশ মানুষই যুদ্ধ চাননি।

হাতে গোনা কিছু মানুষ অবশ্যই যুদ্ধকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। হিটলারের মতো কিছু মানুষ। যাঁদের লক্ষ্যহীন জীবনে একটা উদ্দেশ্য দরকার ছিল। চব্বিশ বছর বয়স্ক নিঃসঙ্গ এক তরুণ, অনাথ, কর্মহীন, কর্পদকশূন্য— যুদ্ধ তাঁকে এক নতুন দিকনির্দেশ দিয়েছিল অবশ্যই। হিটলারের নিজের ভাষায়— “আমি হাঁটু গেড়ে বসে উদ্বেল হৃদয়ে ঈশ্বরকে প্রণতি জানিয়েছিলাম এমন সময়ের সাক্ষী থাকার সুযোগ পেয়ে।” ১ অগাস্ট সার্বিয়ার পক্ষে থাকার জন্যে জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। মিউনিখ শহরের ওদিয়নপ্লাৎজে হেইনরিখ হফমানের তোলা সেই ঐতিহাসিক ফোটোগ্রাফে দেখা যায় অসংখ্য মানুষের সঙ্গে হিটলারের উপস্থিতি। জার্মানির যুদ্ধঘোষণাপত্র পড়া হচ্ছে, মানুষ উত্তেজিত। উত্তেজিত হিটলারও। তাঁর চোখে আনন্দ, মুখে বিস্ময়, মাথার টুপি নেমে এসেছে হাতে।

অস্ট্রিয়া থেকে হিটলার পালিয়ে এসেছিলেন অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়ার জন্যে। জার্মানির জন্যে লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার জন্যে তাই দুবার ভাবলেন না তিনি। দু-বারের চেষ্টায় ১৯১৪-র ১৬ অগাস্ট হিটলারের নাম জার্মান সেনাবাহিনীতে নথিবদ্ধ হল। বাভেরিয়ান ব্যাটেলিয়ানের ট্রেনি ইনফ্যান্ট্রিম্যান। ‘মাইন কাম্ফ’-এ হিটলার দাবি করেছেন অস্ট্রিয়ার নাগরিক হিসাবে বাভেরিয়ান ব্যাটেলিয়নে যোগ দেওয়ার জন্যে তাঁকে বাভেরিয়ার রাজা তৃতীয় লুডউইগকে চিঠি লিখে সম্মতি আদায় করতে হয়েছিল। বলাই বাহুল্য, আত্মপ্রচারের জন্যে যে যে পরিকল্পিত মিথ্যা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন, এটাও তার একটা। কেউ কেউ আন্দাজ করেন যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে কোনও আধিকারিকের অসাবধানতায় হিটলার অস্ট্রিয়ার নাগরিক হয়েও বাভেরিয়ার সেনাবাহিনীতে ঢুকে পড়েন।

১৬ সেপ্টেম্বর হিটলারের জায়গা হল সিক্সটিন্থ বাভেরিয়ান ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে। দলের কমান্ডার কর্নেল জুলিয়াস লিস্টের নামে লিস্ট রেজিমেন্ট নামেও ডাকা হত এদের। শেষ পর্যন্ত অনিকেত হিটলার ঠাঁই খুঁজে পেলেন। তাঁর রেজিমেন্ট হয়ে উঠল তাঁর পরিবার। সেই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে সাড়ে তিন হাজার সৈন্যের মধ্যে ঘরছাড়া সুযোগসন্ধানী, বেকার এবং হিটলারের মতো অখণ্ড জার্মান রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা স্বেচ্ছাসেবী বেশ কিছুই ছিলেন। লিস্ট রেজিমেন্টের অবস্থান জার্মান সেনাবাহিনীতে বেশ নিচের দিকে ছিল তখন। ট্রেনিং-এর কোনও বালাই নেই। রাইফেলগুলোও মান্ধাতা আমলের, তা দিয়ে লড়াই করার কল্পনা হাস্যকর। ১০ অক্টোবর দলটিকে প্রথম পাঠানো হল ট্রেনিং গ্রাউন্ডে। হিটলারের মতে ট্রেনিং-এর প্রথম পাঁচদিন ছিল তাঁর জীবনের কঠিনতম দিন। মূলত রাইফেল নিশানায় লাগানো, তাঁবু গড়া, রান্না করা— দশদিন ট্রেনিং-এর পরে লিস্ট রেজিমেন্ট রওনা দিল পশ্চিম সীমান্তে। বেলজিয়ামের ইপ্রা শহর দখলের ভার পড়ল হিটলারের দলের ওপর। প্রথমে পৌঁছতে হবে ফ্রান্সের উত্তরে অবস্থিত লিলা শহরে জার্মানির নতুন হেড কোয়ার্টারে। সেখান থেকে বেলজিয়াম। লিস্ট রেজিমেন্ট রওনা দিল ট্রেনে।

জার্মানির বেলজিয়াম দখল নিয়ে কিছু কথা এখানে বলে রাখা জরুরি।

ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরে জার্মানি দেখল জার্মান-ফ্রান্সের সীমানার বাধা টপকানোর থেকে অনেক সহজে বেলজিয়ামের ওপর থেকে গিয়ে উত্তর সীমান্ত থেকে ফ্রান্সকে আক্রমণ করা যায়। স্বভাবতই বেলজিয়াম তাতে রাজি হয়নি। ফলে ১৯১৪-র ৩ অগাস্ট ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে জার্মানি বেলজিয়ামের কড়া নাড়তে শুরু করল।

1

১৯১৪-র ইউরোপ ম্যাপ, nationalarchives.gov.uk সাইট থেকে নেওয়া। জার্মানি আর ফ্রান্সের মাঝে ছোট্ট বেলজিয়াম। বড় দেশগুলোর যুদ্ধে তার বিশেষ কোনও ভূমিকা ছিল না। কিন্তু ফ্রান্সের উত্তর দিক থেকে দ্রুত আক্রমণের জন্যে বেলজিয়ামকে রাস্তা হিসাবে বেছে নিয়েছিল জার্মানি।

৪ অগাস্ট সকালে জেমেনিচের কাছে বেলজিয়াম সীমান্তে একটা টহলদারি দল পাঠাল জল মাপতে। সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে ফিরে গেল বটে, কিন্তু প্রতিরোধের অবস্থানও চিহ্নিত হয়ে গেল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সমস্ত বাধা গুঁড়িয়ে জার্মান বাহিনী বেলজিয়ামের মাটিতে পা রাখল। তিন জেনারেল— আলেকজান্ডার ফন ক্লাক, কার্ল ফন বিউলো, ম্যাক্স ফন হাউসেন-এর নেতৃত্বে তিনটে বাহিনীর আট লক্ষ সৈন্য। নজরদার মোটর সাইকেল, অফিসারদের মোটর গাড়ি, অস্থায়ী রসুইঘর, মেডিকাল ইউনিট, ইঞ্জিনীয়ার, ঘোড়ার গাড়িতে রসদ, ট্রাকে অস্ত্রশস্ত্র। নিজেদের পতাকা উড়িয়ে জার্মানরা ঘোষণা করল, বেলজিয়ানদের থেকে যে কোনও রকম বাধা, সে রাস্তা বা ব্রিজ ভেঙে দিয়ে হলেও, অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে।

কেউই আশা করেনি ছোট্ট দেশটা কোনও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। আদপে সেটা হয়ওনি। কিন্তু পান থেকে চুন খসলেই নির্মম অত্যাচার শুরু হত। কোথাও একটা বিচ্ছিন্ন বিস্ফোরণ, ফ্রান্সের সপক্ষে সামান্য কোনও স্লোগান— পুরো জনপদকে কামানের মুখে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রতিরোধের কোনও প্রমাণ ছাড়াই। জেনারেল ফন ক্লাকের মতে লোকজনকে গুলি করে মারা বা ঘরদোর পুড়িয়ে দেওয়া সামরিক আইন মোতাবেক শাস্তি। অতএব একটা দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের খেসারত তার বাসিন্দারা দিতে বাধ্য। বলাই বাহুল্য, অন্য দুজন জেনারেলও একই মতে বিশ্বাসী।

২০ অগাস্ট, আদেন। একটা, মাত্র একটা গুলির আওয়াজ শোনা গিয়েছিল। জার্মান বাহিনি নির্বিচারে মেশিনগানের গুলি উজাড় করে দিল শহরের ওপর। দোকানবাজার বিধ্বস্ত, পুড়ল অসংখ্য বাড়ি। পরদিন শহরের মানুষজনকে সারি দিয়ে দাঁড় করানো হল রাস্তায়। কেউ বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করলেই গুলি চলতে শুরু করল। প্রায় ৩০০ নাগরিক প্রাণ দিয়েছিলেন আদেনে।

২২ অগাস্ট, তামিনেস। ফ্রান্সের জয়ধ্বনি করেছিল শহরের একটা অংশ। চার্চের সামনে দাঁড় করিয়ে প্রায় ৪৫০ মানুষকে গুলি করে মেরেছিল জার্মান বাহিনী।

২৪ অগাস্ট, নামোর। কোনও প্ররোচনা ছাড়াই বাড়িঘরদোরে আগুন দেওয়া শুরু হয়। এমনকী যারা জ্বলন্ত বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের গুলি করে মারা হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে। ২৬৪টা বাড়ি জ্বালানো হয়েছিল। মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ৩৮৫।

একের পর এক জনপদে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ অবাধে চলতে থাকে। মত্ত সৈন্যদের বাধা দেওয়ার কোনও চেষ্টাই তাদের অফিসাররা করেননি। এমনকী, প্রার্থনা চলাকালীন চার্চের মধ্যে ঢুকে গণহত্যা চালানো হয়েছে। অন্য আরেক জায়গায়, নারী এবং শিশুদের জোর করে দেখানো হয়েছিল তাদের বাবা আর স্বামীদের হত্যা করার সময়। একদল মহিলা বুক চাপড়ে কাঁদছেন— “দোহাই তোমাদের। আমাদেরও গুলি করে মারো।” জার্মানরা সেই ইচ্ছাপূরণে দ্বিধা করেনি।

২৫ থেকে ৩১ অগাস্ট লুভাতে যে বর্বরতার প্রদর্শন ঘটেছিল, সে কলঙ্ক জার্মান সামরিক ইতিহাস থেকে কোনোদিনও মোছার নয়। লুভার ক্যাথিড্রাল আর ইউনিভার্সিটি মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। লুভার লাইব্রেরি, যেখানে ৭৫০টি মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপি ছিল, ২ লক্ষ ৩০ হাজার বইয়ের সঙ্গে ভস্মীভূত হয়। হত্যা করার হয়েছিল ২৪৮ জন মানুষকে।

অগাস্টের শেষে পুরো বেলজিয়াম মধ্যযুগের অন্ধকারময় ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হতে দেখেছিল। এই হত্যা, ধ্বংসলীলা, মানবতার প্রতি এই ক্রূরতা কোনও কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। ১৯০২-এ লিখিত জার্মান মিলিটারি কোড ক্রিগস্‌ফ্রাউয়ে নথিবদ্ধ পরিকল্পনা— যুদ্ধের অপরিহার্য অংশই হল পার্থিব ও নৈতিক সম্পদ ধ্বংস। অর্থাৎ, যে কোনও সম্পত্তি ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গেই শিশু, মহিলাসহ সাধারণ নাগরিকদের হত্যালীলা। মানবিকতার কোনও জায়গা সেখানে নেই। বেলজিয়ামে এই ক্রিগস্‌ফ্রাউ জারি করেছিলেন ফিল্ড মার্শাল কোলমার ফ্রাইহার ফন ডেয়া গলড্‌জ্‌। ফলস্বরূপ অগাস্টের শেষে বেলজিয়ামে নাগরিক প্রাণহানি সামরিক ক্ষয়ক্ষতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

অগাস্টে ব্রাসেলসের পতনে জার্মানদের উল্লাসের মাঝে হিটলারের আশঙ্কা ছিল হয়তো লড়াইয়ে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে। অনভিজ্ঞ তরুণ স্বপ্নেও ভাবেননি তখনও কতখানি যুদ্ধ বাকি।

২১ অক্টোবর হিটলারদের ট্রেন বেলজিয়াম প্রবেশ করে। লিস্ট রেজিমেন্ট প্রত্যক্ষ করল যুদ্ধের স্বরূপ। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মৃত ঘোড়ার দেহাবশেষ। মানুষের ব্যবহার্য সামগ্রী মাঠে-প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে অবহেলায়। বাতাসে তখনও ধর্ষণ আর হত্যার বারুদ।

মিউনিখের যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, তার মালিক জোসেফ পপকে ১৯১৪-র ৩ ডিসেম্বর একটা চিঠিতে হিটলার লুভাকে ভাঙাচোরা পাথরের স্তূপ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তার সেই সুন্দর লাইব্রেরির ২ লক্ষ ৩০ হাজার বই বা শহরের প্রায় আড়াইশ নাগরিককে খুনের কোনও প্রসঙ্গই সেই চিঠিতে আর উঠে আসেনি। পরে কোনও স্মৃতিকথাতেও এ নিয়ে আর কোনও উল্লেখ নেই। একটা প্রাণবন্ত শহর এখন ‘ভাঙাচোরা পাথরের স্তূপ’— এইটুকুই।

বেলজিয়ামে জার্মান বাহিনী যা করেছিল ভবিষ্যত একনায়কের নিশ্চয় তার থেকে একাগ্র পাঠ নিয়েছিলেন। শত্রুদেশের সাধারণ মানুষকে আতঙ্কে রাখাটা যুদ্ধকৌশল হিসাবে আরও বড় আকারে পোল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইউক্রেন এবং আরও নানা দেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। নাজিরা সামান্যতম প্রতিরোধের অজুহাতে পুরো একটা গ্রাম বা শহরের সমস্ত মানুষকে হত্যা করেছে এমন উদাহরণ অজস্র ছড়িয়ে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বেলজিয়ামে বর্বরতা ঘটেছিল ফ্রান্সের ওপর দ্রুত আক্রমণ শানানোর কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে সমস্ত প্রতিরোধী কণ্ঠস্বর বন্ধ করতে। সত্যি-মিথ্যার বিচার ছিল অবান্তর। যেমন, চেকোশ্লোভাকিয়ার লিদিসা আর লেজাকি গ্রাম দুটো। ইহুদি গণহত্যার অন্যতম কারিগর রেনহার্ড হেইডরিচ প্রাগে চেক এবং শ্লোভাক সৈন্যদের আক্রমণে গুরুতর আহত হন। পরে তাঁর মৃত্যু ঘটলে, নাজি গোয়েন্দারা আক্রমণকারীদের আবাসস্থল হিসাবে ওই গ্রাম দুটোকে চিহ্নিত করে। খবরটা সর্বৈব মিথ্যা ছিল। কিন্তু হিটলারের আদেশে দুটো গ্রামেই ষোলো বছরের ওপরে সমস্ত মানুষকে হত্যা করে গ্রাম দুটোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। জীবিতদের স্থান হয়েছিল কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%