রোহণ কুদ্দুস
আহত হিটলারকে ধরে কোনোরকমে একটা গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেলেন এস এ-র চিকিৎসক ডক্টর ওয়ালটার সুলৎজ্। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে গাড়িটা দাঁড়িয়েছিল অদূরেই, অর্থমন্ত্রকের সামনে। লুডেনডর্ফ যেখানে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে সতীর্থদের সঙ্গে গ্রেপ্তার হচ্ছেন, সেখানে হিটলারের এই পালিয়ে যাওয়া নিয়ে পরে বিস্তর বিতর্ক হয়। যদিও সেগুলো চাপা দিতে বলা হয়, হিটলার নাকি এক দশ বছরের বাচ্চাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার পাশে দেখতে পান এবং তাকে বয়ে নিয়ে যান অন্যত্র। গ্যোরিংকে তাঁর কিছু সঙ্গী তুলে নিয়ে যান কাছেই এক ইহুদি দম্পতির বাড়ি। নিয়তির পরিহাস বোধ হয় একেই বলে। স্বামী-স্ত্রীর কিছু অভিজ্ঞতা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কল্যাণে। তাঁরা প্রাথমিক শুশ্রূষা করতে সমর্থ হন।
পুৎসি এই মিছিলে ছিলেন না। বিয়ার হল থেকে তিনি গিয়েছিলেন পার্টির মুখপত্র ‘ভলক্সাবো উবাখতা’র অফিসে। হিটলারের এই বিদ্রোহের সাফল্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে থাকায় তিনি নিজের অ্যাপার্টমেন্টে যান প্রয়োজনে শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে। এমন সময় তাঁর বোন ফোন করেন মিছিলের খবর দিতে। তিনি যখন হিটলারদের সঙ্গে শোভাযাত্রায় পা মেলাতে তড়িঘড়ি যাত্রা শুরু করেন, তখন মাঝপথেই পুলিশের সঙ্গে নাজিদের সংঘর্ষের খবর পান। দিশেহারা হয়ে সঙ্গীদের খোঁজ নিতে ওদিয়নপ্লাৎজের কাছাকাছি পৌঁছতে একটি গাড়িতে তিনি দেখতে পান এসার আর এখার্টকে। সঙ্গে ছিলেন ফোটোগ্রাফার হেইনরিখ হফমান, যিনি পরে হিটলারের ফোটোগ্রাফার হিসাবে বিখ্যাত হন। একসঙ্গে হফমানের স্টুডিওতে পৌঁছে যে যারা নিজের রাস্তা ধরেন। পুৎসি এক বন্ধুর সাহায্য নকল পাসপোর্ট নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে অস্ট্রিয়ায় আত্মগোপন করেন।
হিটলারের ৩১ জন সাথিকে মিছিল থেকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এছাড়াও আরও ২০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় পুলিশের সঙ্গে অভব্য আচরণ করা বা বিদ্রোহীদের সহমর্মিতা দেখানোর জন্যে। দুটো নাগাদ রমও আত্মসমর্পণে বাধ্য হন। পুলিশ ওদিয়নপ্লাৎজ সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখে। রক্তাক্ত মৃতদেহ তখনও রাস্তা জুড়ে পড়ে। এমনিতেই গুলি চালানোর ফলে পুলিশ তখন খলনায়ক। মাঝে মাঝেই গুজব উঠছে হিটলার এবং লুডেনডর্ফ মৃত। কেউ বলছেন হিটলার পুলিশের হাত এড়িয়ে আত্মগোপন করেছেন। প্রতিশোধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জায়গায় জায়গায় একত্রিত হয়ে মানুষ স্লোগান দিচ্ছেন— “হেইল হিটলার!” একই সঙ্গে দাবি উঠছে কারের পদত্যাগের।
বিয়ার হলে আন্দোলন দমনের খবর আসতেই গ্যোরিং-এর অনুচররা খেপে গেল। যে খবর এনেছিলে তার মুখে, পোশাকে রক্তের ছিটে লেগে— “শয়ে শয়ে মানুষ মারা গেছে। হিটলার, লুডেনডর্ফ সব্বাই।” মেয়র ও তাঁর সঙ্গীদের একটা ট্রাকে তোলা হল। বন্দিরা ধরে নিলেন এই তাঁদের শেষযাত্রা হতে চলেছে। একজন পারিষদ কিছু বলার চেষ্টা করতেই এক নাজি তাঁর দিকে পিস্তল উঁচিয়ে ধরল— “আর একটা কথা বললেই নিকেশ করে দেব।”
মিউনিখ শহর ছাড়িয়ে মাইল দশেক চলার পর একটা আধাজঙ্গল এলাকায় ট্রাকটা থামল। মেয়র এবং তাঁর পারিষদদের নামানো হল। সবাই যখন বুলেটের অপেক্ষা করছেন, তখন দলপতি যুবকটি এগিয়ে এল— “তাড়াতাড়ি আপনাদের জ্যাকেট, কোট, টুপি খুলে দিন।” যন্ত্রের মতো সবাই আদেশ পালন করলেন। তাঁদের সঙ্গে নিজেদের পোশাক বদলাবদলি করে নাজিরা আবার ট্রাকে ফিরে গেল। দলপতি মেয়রকে নির্দেশ দিল— “এই রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোলেই রেলস্টেশন। আপনারা মিউনিখ ফিরে যেতে পারবেন।” হতবাক মেয়রদের রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে দলটা দ্রুত অন্তর্হিত হল।
ওইদিন অর্থাৎ ৯ নভেম্বর বেলা তিনটের মধ্যে পুলিশ বারগারভয়কেলা থেকে নাজিদের অবশিষ্ট সদস্যদের আটক করে বন্দি পুলিশ অফিসারদের মুক্ত করল। একই সঙ্গে বাজেয়াপ্ত হল চারটে ট্রাকভর্তি অস্ত্রশস্ত্র। লসো বার্তা পাঠালেন কারকে— “লুডেনডর্ফ এবং হিটলারের অভ্যুত্থান সফলভাবে দমন করা হয়েছে।” কিন্তু সরকারি এই ঘোষণার বাইরে আর এক মিউনিখে তখন বিক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। নির্মমভাবে গুলি চালানোর কারণে জনতা জায়গায় জায়গায় একত্রিত হয়ে ‘হেইল হিটলার’ স্লোগান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে ‘বিশ্বাসঘাতক’, ‘খুনে’, ‘ইহুদিদের দালাল’ ইত্যাদি গালিগালাজ করছে। নানা গুজবে বিভ্রান্ত সাধারণ মানুষ ছ-টা নাগাদ রেলওয়ে স্টেশন ঘেরাও করে। আরও কিছু পরে হাজার দুয়েক মানুষ একটা খবরের কাগজের অফিসের চারদিক বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। আগের রাতেই মিউনিখ পোস্টের উদাহরণে কর্তৃপক্ষ চিন্তিত হয়ে পড়েন। ফলে সন্ধ্যা আটটায় শহরে কারফিউ জারি হয়।
সদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়া নাজিদের সদর দপ্তরে হানা দিয়ে বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে হিটলারের সঙ্গে হাঙ্গারির চরম দক্ষিণপন্থী ইহদিবিরোধী একটি দলের আঁতাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেদিন রাতেই ফেরেন্স উলাইন নামে একজন হাঙ্গারিয়ানকে সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে যে নথিপত্র পাওয়া যায়, তাতে বোঝা যায় হাঙ্গারির ওই দলটিকে নাজিরা অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে হাঙ্গারিতেও একটা অভ্যুত্থানে সাহায্য করতে সম্মত হয়েছিল। পরিবর্তে নাজিরা খাদ্যশস্য পাবে। মুদ্রাস্ফীতির চরমে দাঁড়িয়ে জার্মান নাগরিকদের মন জয় করার একটা পন্থা খুঁজে পেতে চাইছিলেন হিটলার। হাঙ্গারির সংগঠনটির আরেকটা পরিকল্পনাও ছিল। তারা দেশের সমস্ত ইহুদিদের একত্রিত করে পণবন্দি করে রাখবে। তাদের বিদ্রোহে কোনও বৈদেশিক শক্তি কোনোরকম হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে ওই ইহুদিদের নির্বিচারে হত্যার হুমকি দেওয়া হবে। বলাই বাহুল্য, মিউনিখের মতোই বুদাপেস্টেও সেই বিদ্রোহ একইভাবে ব্যর্থ হয়। কিন্তু ছাইচাপা আগুনের ব্যাপারে সরকার কোনও আন্দাজই করতে পারল না।
প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য সাত বন্দি যেখানে ছিলেন, সেই লেম্যানের বাড়িতেও অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার খবর এসে পৌঁছেছে। গুজবের মধ্যে কতটা সারবত্তা আছে সে বিষয়ে সকলেই সন্দিহান হলেও গৃহকর্তা লেম্যান এটুকু বুঝতে পারছিলেন, যে কোনও সময়েই পুলিশ হানা দিতে পারে। যদিও এস এ বাহিনীর মধ্যে বন্দিদের প্রতি অত্যাচার বা বিদ্রোহ বিফল হওয়ায় প্রতিশোধ নেওয়ার কোনও মনোভাব তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে তাঁদের এখানে আশ্রয় দেওয়াটা তাঁর কাছে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছিল। রুডল্ফ্ হেসকে সে কথা জানাতে কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে গৃহমন্ত্রী ফ্রাঞ্জ স্যোয়ার এবং কৃষিমন্ত্রী জোহান উৎজহুফারকে নিয়ে অন্যত্র যাওয়া স্থির করলেন। তাঁর মনে হল, পুলিশ এসে প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যদের উদ্ধার করলেও অন্তত এই দুজন মন্ত্রীর বিনিময়ে তিনি কিছু মধ্যস্থতা করতে পারবেন। ফলে ওই দুজন মন্ত্রী, কয়েকজন এস এ রক্ষী এবং কুড়ি ট্রিলিয়ন মার্ক নিয়ে হেস বিকেল চারটে নাগাদ যাত্রা শুরু করলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল আল্পসের কোনও স্কি লজে আত্মগোপন করবেন। কিন্তু পার্বত্য পথে সন্ধ্যায় গাড়ি নিয়ে চলা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছিল। বিশেষত দুজন প্রায়-বৃদ্ধ বন্দি নিয়ে সংকীর্ণ রাস্তা দিয়ে স্কি লজে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। ফলে আশেপাশে কোনও আশ্রয়ের সন্ধানে ওবারল্যান্ড বাহিনীর একজন পূর্বপরিচিত সৈন্যকে নিয়ে তিনি গাড়ি ছেড়ে এগিয়ে গেলেন। ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পরেও হেস ফিরছেন না দেখে এস এ-র বাকি সদস্যরা উৎকণ্ঠায় পড়ল। কিছুক্ষণ বাদানুবাদ করে হেসকে ছাড়াই তারা ফেরার রাস্তা ধরল। রাস্তায় এক ছোট জনপদে দাঁড়িয়ে দুই বন্দিকে ছেড়ে দিয়ে তারা মিউনিখের দিকে গাড়ি ছোটাল। এরপর সেই সদস্যরা বা ওই ২০ ট্রিলিয়ন মার্কের ব্যাপারে আর কিছু জানা যায়নি।
হেস ফিরে এসে অবাক হয়েছিলেন না হতাশ, আন্দাজ করা মুশকিল। কিন্তু এরপর ১৯২৪-এর মার্চের আগে হেসের কোনও খবর পাওয়া যাবে না। বাগদত্তা ইলসা প্রোহল এবং আরও কিছু বন্ধুর সাহায্যে তিনি দীর্ঘ কয়েকমাস প্রশাসনের নজর এড়িয়ে গা ঢাকা দিয়ে থাকেন।
মিউনিখের প্রায় পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দক্ষিণে এক শান্ত গ্রাম উফিং-এ তখন সন্ধ্যা নামছে। এক সম্পন্ন গৃহস্থ বাড়ির খাবার ঘরে হেলেন হানফ্স্ট্যাঙ্গল তাঁর ছেলে ইগনকে নিয়ে ডিনারে বসেছেন। ঘড়িতে প্রায় সাতটা বাজে। হঠাৎ দরজায় করাঘাত। বন্ধ দরজার ও প্রান্তে দাঁড়িয়ে ডক্টর সুলৎজ্, তাঁর এক সহযোগী আর্দালি এবং শ্রান্ত, ভগ্নপ্রায় হিটলার। ময়লা পোশাক, মাথায় টুপি নেই, বাম হাত একদিকে ঝুলছে, কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছেন আর্দালির কাঁধে ভর দিয়ে।
অনাহূত এই অতিথিদের দরজা খুলে দিলেন হেলেন, পুৎসির স্ত্রী।
“তাহলে যা শুনছি, সব সত্যি?”
হিটলার নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন। কিন্তু পুৎসি কোথায় তা নিশ্চিত করে বলতে পারলেন না। শেষ দেখেছিলেন খবরের কাগজের অফিসের দিকে রওনা দিতে। তাই বললেন, “সে নিরাপদেই আছে। এসে যাবে।”
তারপর উন্মত্তের মতো চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমার সামনে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনও রাস্তা খোলা নেই। জেনারেল লুডেনডর্ফ ওই বন্দিদের না ছেড়ে দিলে…” মুহূর্তে বদলে গেল হিটলারের মেজাজ— “এর শেষ দেখে ছাড়ব। যতক্ষণ বেঁচে আছি, শয়তানগুলোকে ছাড়বে না।”
হেলেন এগিয়ে এসে দেখলেন হিটলারের দেহে তাপমাত্রা বাড়ছে। জ্বর আসছে। ডাক্তার জানালেন হিটলারের কাঁধের আঘাতের কথা। হাতটা সকেট জয়েন্ট থেকে খুলে এসেছে। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল অস্ট্রিয়া সীমান্ত পার করে যাওয়া। কিন্তু রাস্তায় গাড়ি বিগড়ে যায়। তাই ড্রাইভারকে গাড়ি সারানোর দায়িত্ব দিয়ে তাঁরা বন-জঙ্গল-মাঠের মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছেন পুৎসির বাড়ির উদ্দেশ্যে। ড্রাইভারকে আরও বলা হয়েছে, গাড়ি ঠিক হলে যেন গ্যোরিং-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সে। বড় রাস্তায় হিটলারের খোঁজে পুলিশের টহল চলছে। তাই পায়ে হাঁটা পথে তিনজন এসেছেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে উফিং ছোট গ্রাম। নতুন মানুষ আসার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। হিটলারের জন্যে এই আশ্রয়ও নিরাপদ নয়।
অ্যাটিকের ঘরটা তাঁর জন্যে খুলে দিলেন গৃহকর্ত্রী। বাকি দুজনের বন্দোবস্ত হল নিচের ঘরে। ৯ নভেম্বরের দীর্ঘ দিনের শেষে অবশেষে রাত নামল।
পরদিন সকালে হিটলার তাঁর অস্ট্রিয়া পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনায় আর্দালিকে পাঠালেন মিউনিখে। পুৎসির একটা পুরনো জ্যাকেট আর টুপি পরে ডিম আর বাটার বিক্রির ছদ্মবেশে কাছের একটা গ্রাম থেকে মিউনিখে যাওয়ার ট্রেন ধরল সে। উদ্দেশ্য হেলেনা বেখস্টাইন নামক এক অভিজাত মহিলার সাহায্যে একটা গাড়ি জোগাড় করা। এই হেলেনার সঙ্গে ১৯২১-এর জুনে পরিচয় হয় হিটলারের এবং এঁর মাধ্যমেই বাভেরিয়ার অভিজাত মহলে হিটলারের প্রবেশ ঘটে। ডক্টর সুলৎজ্ বিপরীত দিকের একটা ট্রেন ধরলেন। তাঁর লক্ষ্য হিটলারের চিকিৎসার জন্যে একজন সার্জেনকে নিয়ে আসা।
১০ নভেম্বর প্রায় সারাদিনই হিটলার হেলেনের সঙ্গে কাটালেন। শিশু ইগন আর পরিচারিকারা যাতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে এই বিশেষ অতিথির ব্যাপারে না মুখ খোলে, সেদিকে হেলেন কড়া নজর রাখলেন। আর্দালির খবর নেই কোনও। সন্ধে নাগাদ সুলৎজ্ ফিরলেন এক চিকিৎসক বন্ধুকে নিয়ে। কিন্তু হিটলারের চোটের ব্যাপারে খুব বেশি সাহায্য তিনি করতে পারলেন না। ফলে দুজনেই অন্য চিকিৎসকের সন্ধানে সে রাতেই রওনা দিলেন মিউনিখের দিকে। রাত এগারোটা নাগাদ সবাই যখন বিছানায়, এক পরিচারিকা এসে জানালেন একজন আগন্তুক ‘বাড়িতে যিনি আছেন’ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। জিজ্ঞাসা করে জানা গেল তিনি গ্যোরিং-এর মালি। লুডেনডর্ফ বার্তা পাঠিয়েছেন। হিটলারদের সেই ড্রাইভার কি তাহলে সত্যিই গ্যোরিং-এর সন্ধান পেয়েছে, না কি এটা পুলিশের পাতা ফাঁদ? সন্দিহান হেলেন পরদিন সকালে আসতে বললেন সেই আগন্তুককে।
১১ নভেম্বর সকালে ওই ব্যক্তি আবার এলে হিটলার আড়াল থেকে দেখে তার নিশ্চিন্ত হয়ে সামনে এলেন। গ্যোরিং-এর মালিই বটে। তাঁদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা হল। পুৎসি পরেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, ওই ব্যক্তি আসলে পুলিশের চরই ছিল। কারণ দুপুরের কিছু পরেই পুৎসির মায়ের ফোন এল। উফিং-এর অদূরেই পুলিশ তাঁদের বাড়িতে তল্লাশি চালাচ্ছে। সেই বার্তালাপের মাঝেই ওদিক থেকে এক পুলিশ অফিসার ফোনটা নিয়ে নিলেন। তারপর হেলেনকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন, “ফ্রাউ হানফ্স্ট্যাঙ্গল, হিটলারকে আপনি কবে শেষ দেখেছেন?” হেলেন শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “আজই।”
হেলেন সম্ভবত আর পারছিলেন না। স্বামীর কোনও খোঁজ নেই। হিটলার বাইরে থেকেও কোনও সাহায্য পাচ্ছেন না। উপরন্তু তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন। তার ওপর এক পলাতককে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে মাথার ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের খাঁড়া। যাই হোক, হিটলারকে গিয়ে তিনি খোলাখুলি জানালেন, পুলিশ তাঁর খোঁজে এ বাড়িতে আসছে।
“সব শেষ হয়ে গেল।” হিটলার নিজের পিস্তল বের করে মাথায় ঠেকালেন— “আমার নাগাল পাওয়ার আগেই…”
হেলেন হিটলারের হাতটা ধরে নামিয়ে আনলেন— “আত্মহত্যাই যদি করবেন, তাহলে এত উদ্যোগ কীসের?” তারপর পিস্তলটা তাঁর হাত থেকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিচে রান্নাঘরে এসে প্রথমেই নজরে এল একটা ময়দার পাত্র। তার মধ্যে অস্ত্রটা লুকিয়ে আবার ফিরে গেলেন অ্যাটিকে। এবার হাতে একটা ছোট নোটবুক। পুলিশ পৌঁছানোর আগে অনুগামীদের জন্যে কোনও শেষ নির্দেশ যদি দেওয়ার থাকে। হিটলার সামান্য চিন্তা করে তাঁর অবর্তমানে নাজি পার্টির নেতৃত্বের ভার দিলেন আলফ্রেড রোজেনবার্গের হাতে। গ্যোরিং, হেস বা আমান নন। প্রতিষ্ঠাতা অ্যানটন ড্রেক্সলার নন। জুলিয়াস স্ট্রাইকার নন। রোজেনবার্গ! নাজিদের মুখপত্রের সম্পাদনা করতেই তাঁর প্রাণ ওষ্ঠাগত, সেই রোজেনবার্গ! সতীর্থদের কেউই প্রায় তাঁকে সম্মান করেন না, তিনি কী করে নাজিদের পরিচালনা করবেন! হয়তো হিটলার চাননি তাঁর অবর্তমানে ক্ষমতা যোগ্য কারও হাতে যাক। কারণ গ্রেপ্তারের পরে তাঁর ভবিষ্যত অনিশ্চিত হলেও ফেরার রাস্তাটা খোলা রাখা জরুরি। বা এ-ও হতে পারে ঘটনার আকস্মিকতায় তাঁর যুক্তিবোধ ঠিকমতো কাজ করছিল না। বাস্তব যাই হোক, হিটলারের স্বাক্ষরিত সেই নির্দেশও পুলিশের নাগাল এড়াতে জায়গা পেল তাঁর পিস্তলের সঙ্গে।
উলহেল্ম্ ডিসট্রিক্ট পুলিশের ফার্স্ট লেফটেনান্ট রুডল্ফ্ বেলভিল হেলেনের বাড়ির দরজায় পৌঁছেছেন ততক্ষণে। বিনাবাক্যব্যয়ে হেলেন তাঁকে নিয়ে গেলেন অ্যাটিকে। বেলভিল নিজেও নাজি সমর্থক। তাই দরজা খোলার আগে এক মুহূর্ত ভাবলেন। তারপর ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে হিটলারকে শোনালেন তাঁর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। কাঁধে ব্যান্ডেজ। পরনে পুৎসির ঢলঢলে পাজামা আর একটা বাথরোব। তার ওপর নিজের ট্রেঞ্চ কোটটা টেনে নিয়ে হিটলার নিচে নেমে এলেন। ইগনের গালে হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর হেলেনের সঙ্গে হাত মেলালেন মৃদু হেসে।
১১ নভেম্বর হিটলারের পরিকল্পনা ছিল বিজয় দিবস উদ্যাপনের। তার বদলে বন্দি হিটলার পুলিশের সঙ্গে রওনা দিলেন মিউনিখের দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন